এক জমিদারবাড়ির বিশাল প্রাসাদটি যেন সময়ের ভারে নুয়ে পড়েছে। একদা কত প্রজাপতি, দাস-দাসী আর অতিথির কোলাহলে মুখরিত ছিল এই প্রাসাদ, অথচ আজ তার চারপাশে নীরবতা আর ধ্বংসের ছাপ। লতাগুল্মে ঢাকা উঠোন, ভাঙাচোরা বারান্দা, কড়কড়ে দরজার কপাট—সব মিলিয়ে জায়গাটিকে ভূতের প্রাসাদের মতোই মনে হয়। কিন্তু এই ভগ্নদশার মাঝেই লুকিয়ে আছে এমন এক ধন, যা নিয়ে সমগ্র গ্রামে আজও গুঞ্জন থেমে নেই। গুপ্তমণি—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদারবাড়ির কুলদেবতার আসনে রাখা এই মণিকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে শত কাহিনি, শত গুজব। গ্রামের মানুষ বলে, মণির ভেতরে এমন এক শক্তি লুকিয়ে আছে যা শুধু প্রকৃত তান্ত্রিকের হাতেই জাগ্রত হয়। কেউ বলে, একবার…
-
-
কেশব চক্রবর্তী অধ্যায় ১ – রাতের কালীঘাট রাত নেমে আসে কালীঘাটের সরু গলিগুলোয় যেন ছায়ার আঁচড়, আর সেই আঁধারের মধ্যে ঢোকে এক অদ্ভুত স্থিরতা। মন্দিরের ঘন্টার টিকটিকি দূরে গুনগুন করে, আর মানুষের ঢল ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। হরিপদ, যিনি প্রতিদিনের মতো মন্দিরের পাশে তার ফুলের টিকিতে বসে বিক্রি করেন, আজ রাতটা কিছুটা ভিন্ন মনে করছিলেন। গলির বাতাস হঠাৎই অস্বাভাবিকভাবে শীতল হয়ে আসে, এমনভাবে যেন ঘন কুয়াশার মতো অদৃশ্য হাত তাঁর গায়ে লেগে থাকে। হরিপদ লক্ষ্য করেন, মন্দিরের আলো দূরে আরও ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, আর সেই ক্ষীণ আলোর মাঝে হঠাৎ এক নীলবসনা মানুষ প্রবেশ করে। সাধকের গায়ে শুধু নীল কাপড়,…
-
সুব্রত গুহ অধ্যায় ১ – গুরু ও শিষ্যের সাক্ষাৎ প্রাচীন অরণ্যের ভেতর নিস্তব্ধতার মাঝে আশ্রমটি দাঁড়িয়ে ছিল যেন সময়ের স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। ঘন বৃক্ষরাজির আড়ালে লুকোনো এই স্থানে পৌঁছতে হলে সাধারণ মানুষের অনেক সাহস প্রয়োজন, কারণ গ্রামের মানুষজন বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পায়। অরণ্যের পথে যতই গভীরে প্রবেশ করা যায়, ততই প্রকৃতির এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা অনুভূত হয়—পাখির ডাক ক্ষীণ হয়ে আসে, বাতাস যেন ধীর হয়ে পড়ে, আর প্রতিটি ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকে অজানা আতঙ্ক। ঠিক এই নীরবতার ভেতর দিয়েই অর্জুন এগিয়ে আসে, তার অন্তরে ভয় ও কৌতূহলের মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। বয়স মাত্র…
-
দেবব্রত সরকার নিঃসঙ্গ শ্মশানের অন্ধকারে সায়ন ধীরে ধীরে তার আসন গ্রহণ করে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শ্মশানশিল্পের অবচেতন ছায়া তার মনকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। দূরে দূরে পঁচা পাতার ঘন স্তূপে কাকেরা কাঁকড়ির মতো ডাকছে, যেন শ্মশান নিজেই তার নিঃশ্বাসে সচেতন। বাতাস শীতল, ঠোঁট কামড়ে যায়, এবং হাওয়ার সঙ্গে মাটির ঘ্রাণ মিশে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ সৃষ্টি করছে। সায়নের চোখ বারবার অন্ধকারে মেলে—প্রায় মনে হচ্ছে, অদৃশ্য কোনো চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে মনে মনে গুরুজীর নির্দেশ অনুসরণ করে, নিজের নিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু শ্মশানের অন্ধকার যেন তার প্রত্যেকটি পদক্ষেপকে ওজন দিচ্ছে। আগুনের ক্ষীণ আলো তার সামনে নাচতে নাচতে অদৃশ্য রূপে অঙ্কন…
-
নন্দিতা রায় শর্মা এক গ্রামের ঘর-বাড়ির বারান্দায়, চায়ের দোকানের মাচায়, এমনকি পুকুরের ধারে বসে গল্প করা বৃদ্ধাদের মুখে—সবখানে কালীপাহাড়ের কাহিনি ঘোরে। অন্ধকার নেমে এলে পাহাড়ের ঝোপঝাড়ের মধ্যে চিৎকার এবং অদ্ভুত আওয়াজ শোনা যায় বলে তারা বলে। কেউ বলে, অমাবস্যার রাতে এখানে অঘোরী সাধনা হয়; কুচক্রী মানুষেরা গোপন মন্ত্রপাঠ করে এমন কাজ করে যা সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে। আরেকটু বাড়িয়ে বলা হয়, যারা পাহাড়ের অজপাশে গিয়ে রাত কাটায়, তারা কখনও ফেরে না, বা ফেরে এক অদ্ভুত পরিবর্তিত রূপে। শিশুদের চোখে কল্পনার আঁধার নেমে আসে, কিন্তু বয়সে বড়রা নিজেদের কষ্ট এবং বাস্তবতার সঙ্গে সেই কাহিনিকে মেলাতে চায়। অভীক এই সব গল্পকে হাস্যকর…
-
সুজন মুখোপাধ্যায় অধ্যায় ১: অর্পিতা ছিলো ইতিহাসের ছাত্রী, গবেষণার কাজে তার এক বিশেষ আগ্রহ ছিলো লোকাচার, লোকবিশ্বাস আর প্রাচীন দেবীসাধনা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন—অসম্পূর্ণ একটি প্রবন্ধের জন্য মাঠপর্যায়ের কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সেই সূত্রেই সে পৌঁছাল এক বহু পুরোনো, প্রায় ভগ্নদশা মন্দিরে, যা এখন আর কারও তীর্থক্ষেত্র নয়, কেবলমাত্র গ্রামবাসীদের চোখে ভয়ের প্রতীক। চারিদিকে বুনো লতাগুল্মে ঢাকা, মন্দিরের প্রাচীর ভেঙে গেছে অনেক জায়গায়, পাথরের মূর্তি গুলো অর্ধেক মাটির নিচে চাপা পড়েছে। মন্দির চত্বরে প্রবেশ করতেই অর্পিতা অনুভব করল এক অদ্ভুত শীতলতা, যদিও বাইরের রোদ ছিলো প্রবল। বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি জেগে উঠল তার, তবুও সে এগোলো—কারণ গবেষণার…
-
সঞ্চারী নাগ উত্তরাধিকার চৌধুরী বাড়িটা যেন কলকাতার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক টুকরো ইতিহাস। বাইরের রাস্তায় কোলাহল, গলিপথে ঠেলাঠেলি অটো আর ছেঁড়া পোস্টারের ভিড়, কিন্তু উঁচু পাঁচিল ঘেরা সেই বনেদি বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই যেন সময় একেবারে অন্য গতিতে বয়ে চলে। আঙিনার মাঝখানে একটা বিশাল আমগাছ, তার চারপাশে বিক্ষিপ্ত ছায়া পড়ে আছে, আর সেই ছায়ার মধ্যে পড়ে আছে বহু প্রজন্মের অগণিত স্মৃতি। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেই প্রথমেই চোখে পড়ে একপাশের শীতল ঘরখানা, যেখানে ঢাকা দেওয়া আছে পুরোনো কাঠের আসবাবপত্র। ধুলো জমে থাকা পর্দার ফাঁক গলে আসা আলোয় দেখা যায় দেয়ালের কোণায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল আয়না, লম্বা কাঠের ফ্রেমে বসানো, যার…
-
অরুণাভ বসু অমাবস্যার সন্ধ্যা নামার অনেক আগেই আকাশে অদ্ভুত একটা চাপা গুমোট তৈরি হয়েছিল, যেন দিনের আলোও বাতাসে লুকিয়ে থাকা অজানা আশঙ্কাকে অস্বীকার করতে পারছিল না। নীরজ সেই সকাল থেকেই গুরুর নির্দেশমতো ঘর ছাড়িয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি জিনিস জোগাড় করতে বেরিয়েছিল—একটি প্রাচীন লাল কাপড়ের টুকরো, কালো মোমবাতি, শিবের জীর্ণ মূর্তি, আর সেই দুর্লভ পুঁতির মালাটি, যা এক সময় গুরুর গুরু তার হাতে তুলেছিলেন। প্রতিটি জিনিস যেন নিজের ভেতর গোপন কোনো স্পন্দন বহন করছিল, নীরজ মনে মনে বুঝতে পারছিল, এ রাত শুধু আরেকটা সাধনার রাত নয়; এ রাতে এমন কিছু ঘটতে চলেছে, যার ওজন বহন করা সহজ নয়। শহরের ভাঙা প্রাচীন অলিগলি,…
-
দেবায়ন মুখোপাধ্যায় এক পিতার মৃত্যুর পরে বছরখানেক কেটে গেছে, কিন্তু ঋষভের জীবনে সেই শূন্যতা যেন আজও পুরোপুরি ভরেনি। শহরের ব্যস্ততা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ আর বন্ধুদের হাসিঠাট্টার মাঝেও কিছু একটা চুপচাপ গুমরে গুমরে উঠত ভেতরে—একটা অপূর্ণতা, একরকম গোপন আর অজানা অভাব। এবার গ্রীষ্মের ছুটিতে সে ফিরে এসেছে পুরনো বাড়িতে—উত্তর কলকাতার অন্ধকার আর ধূলিধূসর অট্টালিকা, যার প্রতিটি দেয়ালে, জানালায়, এমনকি বাতাসে লেগে আছে সেই মানুষটার ছায়া, যাঁকে সে পুরোপুরি চিনতেই পারেনি কখনও। দেবদ্যুতি সেন—ঋষভের বাবা—ছিলেন এক সময়ের বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত, কিন্তু পরবর্তী জীবনে তাঁর আচরণ হয়ে উঠেছিল রহস্যময়, চাপা, এমনকি ভীতিকরও কিছুটা। নিজের ঘরে একা একা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা, কুঠুরি বন্ধ…
-
অগ্নিভ বসু ১ মেঘে ঢাকা আকাশ, ছেঁড়া ছেঁড়া কুয়াশার চাদরে মোড়া বাঁকুড়ার পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটি জিপ। স্টিয়ারিংয়ের পাশে বসে ডঃ নীলাভ মুখার্জী ডায়েরির পাতায় অস্থির হাতে কিছু নোট নিচ্ছিলেন—যার বেশির ভাগই ছিল স্থানীয় পুরাতাত্ত্বিক মানচিত্রের হালনাগাদ তথ্য। তাঁর মুখে সিগারেট, চোখে ক্লান্তির ছাপ। পেছনে বসে ছিলেন গবেষক মালবিকা রায়, যিনি জানালার কাঁচ সরিয়ে বাইরের পাহাড়ঘেরা দিগন্তে তাকিয়ে ছিলেন, যেন কোন কিছু চেনার চেষ্টা করছেন—যা হয়তো কোনো ছবি বা কাহিনি পড়ে মনে গেঁথে গিয়েছিল। গাড়িচালক রঘু হাঁসদা হঠাৎ বলে উঠল, “আর একটু সামনে গেলেই গোবিন্দপাহাড়পুর, বাবু। আপনারা যেই দেউলের খোঁজ করছেন, সেটার ধ্বংসস্তূপ ওই গ্রামের ওপারেই। তবে লোকজন…