দেবাশিস সেন ১ ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গ্রামের পূর্বদিকের পাহাড়ের মাথায় লালচে আভা ফুটে উঠেছে, আর ধানখেতের কুয়াশার ভেতর দিয়ে আস্তে আস্তে ভেসে আসছে পাখিদের ডাক। শত বছরের পুরোনো দুর্গামন্দিরে ভক্তরা ভিড় জমিয়েছে, আজকের সকাল যেন অন্য সব সকালের মতোই ভক্তিময় হওয়ার কথা ছিল। ঘণ্টা বাজছিল, ধূপকাঠির গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল, আর মন্দির চত্বরে ঢাকের মৃদু আওয়াজ মিলিয়ে যাচ্ছিল ভোরের নীরবতার সঙ্গে। মন্দিরের প্রধান পূজারি হরিদাস পণ্ডিত তাঁর স্বভাবসিদ্ধ নিয়মে গঙ্গাজল ছিটাচ্ছিলেন আর ভক্তদের আহ্বান জানাচ্ছিলেন—“এসো, মা দুর্গার চরণে প্রণাম করো।” কিন্তু সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল অপ্রত্যাশিত ঘটনা। আরতির পর যখন সবাই প্রতিমার দিকে তাকালো, তখন হঠাৎ বোঝা…
-
-
ভাস্কর রায় আষাঢ়ের দিনগুলোতে গ্রামটা যেন সবসময়ই এক অদ্ভুত অশুভ আবহে ঢেকে থাকত। নদীর পাড় থেকে শুরু করে পুকুরঘাট পর্যন্ত, চারদিক যেন স্যাঁতস্যাঁতে বাতাসে ভারী হয়ে উঠত। সেদিনও বিকেল থেকেই মেঘ জমতে শুরু করেছিল আকাশে। কালো মেঘের দল যেন ঝাঁকে ঝাঁকে এসে একত্রিত হয়েছে গ্রামটার ওপর, যেন গোটা আকাশটাকে গিলে খাবে। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই মেঘের গর্জনে গ্রাম কেঁপে উঠল। মাটির কুঁড়েঘরের ভেতরে মহিলারা তাড়াতাড়ি প্রদীপ জ্বালিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রার্থনা করতে লাগল। খড়ের ছাউনি ভিজে জলে টপটপ করে পড়ছিল, আর শিশুরা কোলের ভেতরে লুকিয়ে আতঙ্কে চুপ হয়ে গেল। গ্রামে তখন ভয় আর অশুভ সংকেতের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। মানুষজন বলাবলি…
-
সৌমিত্র দাশগুপ্ত এক গ্রামের মাঝখান থেকে সামান্য দূরেই এক পুরোনো পুকুর, যার জলে সবসময় যেন এক অদ্ভুত গা ছমছমে নীরবতা ভেসে থাকে। চারপাশে শ্যাওলা জমে যাওয়া ঘাস, মাটিতে শুকনো পাতার স্তূপ, আর ভোরের কুয়াশা পুকুরের ধারে এক ভয়ানক আচ্ছাদন তৈরি করে। গ্রামের মানুষজন দিনের বেলায় সেখানে জল তুলতে যায়, গবাদি পশুকে গোসল করায়, কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই সেই জলাশয়কে এড়িয়ে চলে যায় সকলে। কারণ সেই পুকুরকে ঘিরে রয়েছে বহু বছরের ভয়ঙ্কর কাহিনি। অকারণে সেখানে ডুবে মরেছে গ্রামের মানুষ, কখনও শিশু, কখনও জেলে, কখনও গৃহবধূ। লোকেরা বলে, জলে সাঁতার জানলেও হঠাৎ পা কেঁচে যায়, শ্বাস আটকে আসে, আর চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে…
-
মানস পাত্র অজিত মুখার্জি ছিল একেবারেই সাধারণ এক গ্রামীণ স্কুলশিক্ষক। বয়স তার ছত্রিশ, মুখে পাতলা দাড়ি, চোখে এক ধরনের ধীরস্থিরতা। শহরের চাকচিক্যময় জীবনের সঙ্গে তার কোনো যোগ নেই—বরং গ্রামের মাটির গন্ধেই সে শান্তি খুঁজে পেয়েছিল। প্রতিদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে সে স্কুলের পড়া প্রস্তুত করত, তারপর ধুতি-পাঞ্জাবি পড়ে সাইকেলে চেপে স্কুলে যেত। সারাদিন ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়ানোই ছিল তার প্রধান কাজ। বাচ্চাদের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অসীম—তাদের হাসি, তাদের ছোট ছোট প্রশ্ন তাকে এক অদ্ভুত আনন্দ দিত। দিনের শেষে যখন পাঠ শেষ হতো, তখন তার ভেতরে একধরনের ক্লান্তি জমত, আর সেই ক্লান্তি দূর করার জন্যই সে প্রতিদিন হাঁটা পথে বাড়ি…