সন্দীপন ধর খামে মোড়া নীরবতা রমেশচন্দ্র বসু বসে আছেন জানালার ধারে রাখা সেই পুরনো বেতের চেয়ারে। জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া বিকেলের আলো তার রুপোলি চুলে খেলে যাচ্ছে। মাথার ঠিক পাশেই একটা ছোট কাঠের তাক, সেখানে রাখা তার স্ত্রীর একটা ছবি — মেঘলা শাড়ি, মৃদু হাসি, কপালে ছোট্ট টিপ। নাম ছিল তার — কাবেরী। আজ অনেকদিন পর আবার পোস্টম্যান এসেছিল। লাল-হলুদ ইউনিফর্ম, কাঁধে ব্যাগ। সে বলল, “বসুবাবু, আপনার পেনশনের শেষ চেকটা এসেছে।” রমেশচন্দ্র ধীরে হাত বাড়িয়ে খামটা নিলেন। যেন মৃদু এক স্নেহে ছুঁলেন। এই খামে শুধু টাকা নেই, আছে একটা দীর্ঘ জীবনের সমাপ্তি ঘোষণা। অফিসের শেষ বেতন মাসেরও বেশি…
-
-
তিথি বসু পর্ব ১: তাবিজওয়ালা ঘর শহরের কোলাহলের মাঝখানে, যেখান থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ঝাপসা দেখা যায়, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে চৌরঙ্গীর একটি পুরনো হোটেল—‘হোটেল সম্রাট’। বাইরে থেকে দেখলে আধুনিক মনে হলেও ভিতরে ঢুকলেই যেন সময় পিছিয়ে যায়—ফিকে আলো, সাদা কাঠের জানালা, আর মোটা মোটা পর্দা যা আলো ঢুকতে দেয় না। সেই হোটেলের ৩১৫ নম্বর ঘর থেকে পাওয়া গেল এক মৃতদেহ। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দেখে—একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ খাটে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। ঘরের ভিতর অদ্ভুত একটা গন্ধ—মাটির, ধূপের, আর যেন ভেজা ছাইয়ের গন্ধ। মৃতদেহের পাশে পড়ে ছিল একটি তাবিজ—লাল সুতোয় বাঁধা, তাতে শিকল দিয়ে আটকানো একটা ক্ষুদ্র রৌপ্য বাক্স। এই খুনের…
-
রুক্মিণী ভট্টাচার্য পর্ব ১: মেঘ জমেছে হাজরা মোড়ের সেই পুরোনো বাস স্টপটায় দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি। তার পরনে একটা সাদা-লাল ছাপার কুর্তি, হাতে একটা বই, মুখটা মেঘলা আকাশের মতো ভাবনায় ঢাকা। বৃষ্টি নামবে বুঝে ছাতাটা খুলে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু জানত না, এই ছাতাটাই একদিন একটা গল্প হয়ে উঠবে। পাঁচ মিনিট আগেই ট্রামলাইন বরাবর হাঁটছিল একটা ছেলেও। নাম তন্ময়। চোখে চশমা, কাঁধে ব্যাগ, আর কানে হেডফোন। ট্রামটা চলে গেছে, কিন্তু ছেলেটা থেমে দাঁড়ায়—বৃষ্টি তার চুল ভিজিয়ে দিচ্ছে, অথচ সে নড়ছে না। বৃষ্টি বাড়তেই দুজনেই একটু করে সরে আসে স্টপের ছাউনির নীচে। হঠাৎ একটা ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দেয় মেয়েটির কাঁধটা। ছেলেটি একটু এগিয়ে এসে…
-
প্রীতম ১ শিয়ালদহ স্টেশনের বিকেলের চেনা ব্যস্ততা। প্ল্যাটফর্ম নম্বর পাঁচে লোকাল ট্রেন এসে দাঁড়ালে যে শব্দটা ওঠে—লোকের হাঁটার, announcements-এর কণ্ঠস্বর, ভ্যাপসা গরমে বাতাসের কম্পন—সেইসব কৌশিকের কাছে নতুন কিছু নয়। গত ছয় মাস ধরে, রোজ এই সময়েই, সে দাঁড়ায় একই জায়গায়—একটা পুরনো চায়ের দোকানের পাশের হলুদ রঙের খুঁটির সামনে। তার রুটিন প্রায় যন্ত্রের মতো: অফিস থেকে বেরিয়ে ট্রাম ধরে স্টেশন, তারপর সেই নির্দিষ্ট কোচে উঠে বাড়ি ফেরা। কিন্তু আজ কৌশিকের মন একটু অস্থির। সে ঠিক জানে না কেন। হয়তো কারণ, গত তিন দিন ধরে সে যার মুখ খুঁজছিল, সেই মেয়েটিকে দেখতে পাচ্ছে না। মেয়েটির নাম জানে না কৌশিক। তারা কোনোদিন কথাও…
-
সৌমেন লাহা পর্ব ১: স্টেশনের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া শিয়ালদহ স্টেশনের বিকেলের ভিড়ে হঠাৎ এক চিৎকার কানে এলো—”রুচি! রুচি কোথায় গেলি?” লোকজন থমকে দাঁড়াল, কেউ মোবাইল বের করল, কেউ ঝুঁকে তাকাল, কিন্তু কারও চোখে কিছু ধরা পড়ল না। মেয়েটির নাম কৃশা সেন। সাংবাদিক। তার ছোট বোন রুচিরা সেন, প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, হঠাৎ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নম্বর ৮ থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল। কিছু বলার সুযোগই দিল না। দু’জনে একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল, ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিল, আর সেই ফাঁকেই রুচি যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। পুলিশ রিপোর্ট করেও কোনও লাভ হয়নি। কৃশা জানত, পুলিশের হাতে এই কেস দিলে তা জমা থাকবে ফাইলে। তাই…
-
অনির্বাণ দত্ত সেই বিকেলের দেখা গড়িয়াহাট মোড়ের ব্যস্ততা তখন বর্ষার বৃষ্টিতে খানিকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। পথঘাট কাদা আর জলের প্যাচপেচে স্রোতে ভারাক্রান্ত, অথচ সেই মেঘলা বিকেলে কলকাতার আকাশে যেন কোনো অচেনা অপেক্ষার আলো ছড়িয়ে ছিল। ভিড় ঠেলে হাঁটছিল ঈশিতা। হাতে ধরা ছাতাটা বারবার উল্টে যাচ্ছিল হাওয়ায়, আর তার চশমার কাচে জলের ছিটে জমে অদ্ভুত একটা ঝাপসা দৃষ্টি তৈরি করছিল। মনে হচ্ছিল, চারপাশের সবকিছু যেন ভুল ঠিকানায় রাখা ছবি—একটু চেনা, একটু অচেনা। হঠাৎই চোখে পড়ল সেই মুখটা—অরণ্য। পাঁচ বছর পর। মাথার চুলে হালকা পাক ধরেছে, চোখের কোণে একটু বয়সের রেখা, কিন্তু হাসিটা এখনও তেমনই—একটু লাজুক, একটু ঠোঁটের কোণে অসমাপ্ত। তার হাতে কাগজে…
-
ঋজু বসু সাঁইবাবা মন্দিরের পেছনের সরু গলি দিয়ে ঢুকলেই একখানা বাড়ি চোখে পড়ে, তার তিন তলা মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন নিজের অস্তিত্বের প্রতিবাদে, অথচ প্রতিটি জানালায় জীর্ণ কাচ, প্রতিটি দেয়ালে কুয়াশার দাগ। রামেশ্বর লেন ৩। লোকেরা বলে, ওটা ঘড়িওয়ালা বাড়ি। কারণ বাড়িটার ভেতর যত ঘড়ি আছে, সব থেমে আছে—ঠিক রাত বারোটায়। কেউ বলে সেগুলো আর চলে না, কেউ বলে এগুলো নতুন কারও জন্য অপেক্ষায়। ইতিহাসের গবেষক সায়ন্তিকা সাহা এসব কুসংস্কার মানে না, কিন্তু অলৌকিক স্থাপত্য নিয়ে তার থিসিসের জন্য এই বাড়িটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, একরাত কাটিয়ে যাবে। সঙ্গে ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার আর তার বন্ধু চন্দন, যার একটাই…