অধ্যায় ১ – কালীঘাটের এক শীতল ভোরে, যেখানে কলকাতার ভিড় এবং অব্যক্ত কোলাহল দূরের মনে হয়, সেখানে এক প্রাচীন আশ্রমের ভিতরে রহস্যের ছায়া ঘনিয়ে উঠেছিল। ভৃগুনাথ তান্ত্রিকের পুরনো মালা, যা বহু বছর ধরে মাটির ধুলো জমিয়ে রেখেছিল, হঠাৎ করেই ভিজে ওঠে টাটকা লাল রক্তে। আশ্রমের কাঠের মেঝে অন্ধকার এবং আর্দ্রতার সংমিশ্রণে যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছে, আর মালার রঙের সঙ্গে মিলিত হয়ে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত আতঙ্কের ছাপ। স্থানীয় বাসিন্দারা একে অমাবস্যার মতো কালো অঘটনের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখলেন; কেউ কেউ বললেন, “এটি মানুষের রক্ত নয়, কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির ছাপ।” আশ্রমের পুরনো দেয়ালে ঝুলন্ত ছবি এবং তান্ত্রিকের প্রত্নচিহ্নগুলো যেন হঠাৎই জীবন্ত…
-
-
১ অন্ধকার নেমে এসেছে গ্রামের উপর, চারদিকে নিস্তব্ধতা আর ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আকাশে তখন অর্ধচন্দ্র, তার আলোয় গাঢ় ছায়ার মতো ঘিরে আছে তালগাছ আর বাঁশঝাড়। গ্রামের মাঝখানে পুরোনো সেই পুকুর, যেটি নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত থাকলেও এতদিন কেউ বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু সেদিন রাতে হঠাৎ করেই অদ্ভুত কিছু ঘটে। প্রথমে ভেবেছিল হয়তো চাঁদের প্রতিফলন, কিন্তু দেখা গেল পুকুরের তলদেশ থেকে অস্বাভাবিক নীল আলো উঠছে—ধীরে ধীরে জলের উপরিতলে ছড়িয়ে পড়ছে। আলো এতটাই অচেনা আর মায়াবী ছিল যে গ্রামের লোকেরা ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। বাতাস যেন হিম হয়ে গেল, পুকুরপাড়ের কুকুরগুলো হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল,…
-
কেশব চক্রবর্তী অধ্যায় ১ – রাতের কালীঘাট রাত নেমে আসে কালীঘাটের সরু গলিগুলোয় যেন ছায়ার আঁচড়, আর সেই আঁধারের মধ্যে ঢোকে এক অদ্ভুত স্থিরতা। মন্দিরের ঘন্টার টিকটিকি দূরে গুনগুন করে, আর মানুষের ঢল ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। হরিপদ, যিনি প্রতিদিনের মতো মন্দিরের পাশে তার ফুলের টিকিতে বসে বিক্রি করেন, আজ রাতটা কিছুটা ভিন্ন মনে করছিলেন। গলির বাতাস হঠাৎই অস্বাভাবিকভাবে শীতল হয়ে আসে, এমনভাবে যেন ঘন কুয়াশার মতো অদৃশ্য হাত তাঁর গায়ে লেগে থাকে। হরিপদ লক্ষ্য করেন, মন্দিরের আলো দূরে আরও ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, আর সেই ক্ষীণ আলোর মাঝে হঠাৎ এক নীলবসনা মানুষ প্রবেশ করে। সাধকের গায়ে শুধু নীল কাপড়,…
-
ময়ূখ দেব রাতের অন্ধকার যখন গ্রামের কোল ঘিরে নেমে আসে, তখন সবকিছু যেন শান্তির জাল ছড়িয়ে দেয়। ঘুমন্ত গ্রামবাসীর মধ্যেই হঠাৎ একটি অদ্ভুত হাসির শব্দ ভেসে আসে বাতাসে, যা এতটাই রহস্যময়ী যে কেউ সঠিকভাবে বোঝে না এটি কার। কেউ বলছে, এটি দেবীর হাসি, যা গ্রামের লোকদের নিরাপত্তা এবং আশীর্বাদ দেয়; আবার কেউ বলে এটি একটি দুষ্টু পিশাচিনীর হাসি, যা রাতের অন্ধকারে মানুষের মন দানবীয়ভাবে কাঁপিয়ে তোলে। হাসিটি কোনোটিই নয়, বরং এক অদৃশ্য শক্তির আবহ, যা গ্রামের প্রতিটি ঘরে অচেনা ভাবনা এবং অশান্তি সৃষ্টি করে। গ্রামের কিছু বুড়ো বলেন, “এই হাসি আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি নিয়ে আসে। কেউ যদি হঠাৎ শুনে, সে…
-
ইন্দ্রনীল নস্কর ১ প্রায় সন্ধ্যার আগমুহূর্তে অর্ণব সেন পৌঁছালো সেই অজপাড়া গাঁয়ে। শহরের চওড়া রাস্তা, আলো ঝলমলে বিলবোর্ড আর ব্যস্ত ট্রাফিকের ভিড় পেরিয়ে, ধীরে ধীরে যখন গ্রামের সরু কাঁচা পথে প্রবেশ করল, তখন মনে হলো যেন অন্য এক জগতে এসে পড়েছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল মাঝে মাঝে দূরে শোনা যাচ্ছে শিস দিয়ে হাওয়া বয়ে চলার শব্দ। কোথাও কোথাও কয়েকটি ঝুপড়ি ঘর, ছোট ছোট বাঁশবনের আড়াল, আর সেগুলোর ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা গরু-মোষের ঘণ্টাধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছে গোধূলির আলোয়। এই গ্রামটির কথা অর্ণব আগেই শুনেছিল—একটি প্রাচীন লোককথার জন্য বিখ্যাত। নদীর ধারে নাকি এমন সব ঘটনা ঘটে, যা মানুষের কল্পনারও অতীত। অর্ণব ইতিহাস গবেষক,…
-
প্রতীক দত্ত এক গ্রামের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন মন্দির, যার বয়স যেন সময়ের গণ্ডি ছুঁয়ে গেছে। চারপাশে বিশালাকার বটগাছ, শেকড় ঝুলে পড়েছে দেয়ালের উপর, যেন প্রকৃতি নিজেই মন্দিরটিকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। পাথরের দেওয়ালে শেওলার আস্তরণ, ফাটল থেকে জন্ম নিয়েছে ছোট ছোট গাছ, আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধে মন্দিরের ভেতর সবসময়ই মনে হয় কারও উপস্থিতি রয়েছে। শীতের সকালের কুয়াশা কিংবা গ্রীষ্মের দুপুরের রোদ—মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করলে বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশ চোখে পড়ে। এখানে সময় থেমে আছে, আর সেই থেমে যাওয়া সময়ের ভেতর লুকিয়ে আছে অজস্র লোককথা, বিশ্বাস আর আতঙ্ক। গ্রামের প্রতিটি মানুষ এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে, কারণ এখানেই পূজিত…
-
প্রাচীন মন্দির খননের সকালে সূর্যের প্রথম কিরণ ভোরের কুয়াশার মধ্য দিয়ে মাটির ওপরে পড়ে। অধ্যাপক সৌম্য সেনগুপ্ত, যিনি দেশের এক নামকরা প্রত্নতত্ত্ববিদ, একাগ্রভাবে খননক্ষেত্রের দিকে এগোচ্ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন সহকারী অরণ্য দত্ত, যিনি সৌম্যের পাশে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার কাজ করতেন। মাটির স্তর একের পর এক সরানো হচ্ছিল, আর ধুলোমাখা খণ্ডকোণ থেকে প্রাচীন কালকার নানা নিদর্শন উঠে আসছিল। হঠাৎ অরণ্য একটি অস্বাভাবিক আকৃতির বস্তু অনুভব করলেন। তার হাতের মুঠোয় ধরা পড়ল এক অলঙ্কৃত শঙ্খ, যার গায়ে খোদাই করা প্রতীকগুলো যেন কেবল সময়ের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে। শঙ্খের উপর ক্ষীণ লালচে দাগ, যা প্রথমে কেবল মাটির দাগ মনে হলেও, যখন সূর্যের আলোতে…
-
সুব্রত গুহ অধ্যায় ১ – গুরু ও শিষ্যের সাক্ষাৎ প্রাচীন অরণ্যের ভেতর নিস্তব্ধতার মাঝে আশ্রমটি দাঁড়িয়ে ছিল যেন সময়ের স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। ঘন বৃক্ষরাজির আড়ালে লুকোনো এই স্থানে পৌঁছতে হলে সাধারণ মানুষের অনেক সাহস প্রয়োজন, কারণ গ্রামের মানুষজন বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পায়। অরণ্যের পথে যতই গভীরে প্রবেশ করা যায়, ততই প্রকৃতির এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা অনুভূত হয়—পাখির ডাক ক্ষীণ হয়ে আসে, বাতাস যেন ধীর হয়ে পড়ে, আর প্রতিটি ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকে অজানা আতঙ্ক। ঠিক এই নীরবতার ভেতর দিয়েই অর্জুন এগিয়ে আসে, তার অন্তরে ভয় ও কৌতূহলের মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। বয়স মাত্র…
-
সুজন কর্মকার ১ কলকাতার এক শীতল বিকেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অডিটোরিয়ামে জমে উঠেছিল এক বিশেষ বক্তৃতা। উপস্থিত দর্শকদের ভিড় ভরিয়ে দিয়েছিল সাদা দেয়ালঘেরা হলে, যেখানে একদিকে ছাত্রছাত্রীরা তাদের খাতায় দ্রুত নোট নিচ্ছিল, অন্যদিকে কিছু অধ্যাপক কপালে ভাঁজ ফেলে মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিলেন ড. অরিত্র মুখার্জী—একজন প্রখ্যাত পদার্থবিদ, যিনি গবেষণায় যেমন কড়া, তেমনি মতামতে দৃঢ়। লম্বাটে চেহারা, নাকের উপর সোনালি ফ্রেমের চশমা, আর হাতে একটি সাদা চক—এমন ভঙ্গিমায় তিনি যেন একাই এক অদম্য শক্তি। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল স্বচ্ছ, কঠিন অথচ প্রলুব্ধকর। তিনি বোর্ডে জটিল সমীকরণ লিখে বলছিলেন, “এই মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটছে, তার পেছনে আছে গণনা, সূত্র, এবং ব্যাখ্যাযোগ্য পদার্থবিদ্যা।…
-
অসমৰ জঙ্গলেৰে ঘেরা, নদীৰ বুকু ফালি গৈ থকা এঘৰ গাঁও। এই গাঁওখনৰ উত্তৰ ফালে দাঁতুৰ বন আৰু কেঁচা ৰাস্তাৰ মাজত মাথোঁ এটা পথৰে পৌঁছিব পৰা এডাল পুৰণি নামঘৰ বহি আছে। নামঘৰখনৰ বাঁহেৰে কাঁপা ছাঁত, জীৰ্ণ খুঁটি আৰু বাটৰ দুখন থাম যি বৰষুণৰ জলেৰে হʼলে হʼলে কঁপিয়েই থাকে। দিনত এই নামঘৰখন সাধারণ ঠাই বুলি দেখাতো পাৰে, কিন্তু নিশা নামি আহিলেই যেন একেবাৰে বেলেগ ৰূপ লৈ উঠে। বতাহত বাজি উঠা শিসনিৰ শব্দ আৰু কেঁচা মাটিৰ গন্ধত নামঘৰখনৰ গাঢ় আঁতৰুৱা পৰিৱেশে কোনোবাকো ভিতৰলৈ সোমাবলৈ আহ্বান জনায়, কোনোবাকো ভয় দেখুৱাই আঁতৰি যায়। শতাব্দীৰ ইতিহাস বোজাই থকা এই নামঘৰখনক লৈ বহু অলৌকিক কাহিনী গাঁৱৰ মানুহৰ…