১ অমল ছিল এক সাধারণ গ্রামীণ ডাকপিয়ন, যার জীবন প্রতিদিনের রুটিন আর নির্দিষ্ট পথেই আবদ্ধ ছিল। সকালবেলায় সে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত, চিঠির ব্যাগ কাঁধে নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি যেত, আর বিকেলের মধ্যেই সব বিলি শেষ করে বাড়ি ফিরত। কিন্তু সেদিনটা অদ্ভুতভাবে ভিন্ন হয়ে দাঁড়াল। অফিসে কিছু অতিরিক্ত কাজের জন্য তাকে দেরি হয়ে গেল, আর সন্ধ্যার আলো যখন ম্লান হতে শুরু করল, তখনও অমল চিঠির ব্যাগ নিয়ে রওনা দেয়নি। সে জানত, গ্রামের মানুষরা চিঠির অপেক্ষায় থাকে, আর দেরি করলে তাদের মুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে। তাই অমল নিজের ক্লান্তি উপেক্ষা করে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। পথে হাঁটতে হাঁটতে সে লক্ষ্য করল,…
-
-
ঋতম মুখাৰ্জী ১ কলকাতার এই শতবর্ষপ্রাচীন গ্রন্থাগারটির নাম আজকাল প্রায় কেউই উচ্চারণ করে না, অথচ একসময় তা শহরের বৌদ্ধিক প্রাণকেন্দ্র ছিল। উচ্চ সিলিং, কাঠের খোদাই করা বুকশেলফ, আর দীর্ঘ করিডরজুড়ে পেতলের ল্যাম্পের আলো—এমনই ছিল এককালের আভিজাত্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নতুন প্রজন্মের পাঠকরা ইন্টারনেটের মোহে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, আর গ্রন্থাগার রয়ে যায় বিস্মৃত, প্রায় পরিত্যক্ত। দিনের আলোতেও ভেতরে ঢুকলে কেমন এক চাপা অন্ধকার অনুভূত হয়; কাঠের পুরোনো টেবিলগুলো কেমন যেন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, আর বুকশেলফে সাজানো চামড়ার বাঁধাই বইগুলোর গায়ে জমে থাকা ধুলো যেন কালের সাক্ষী হয়ে নীরবতা রক্ষা করে। অদিত্য, কলকাতারই এক কলেজপড়ুয়া ছাত্র, পড়াশোনার কাজে প্রয়োজনীয় রেফারেন্স…
-
সুনন্দা সোম বীরভূমের দেউলতলা গ্রামটি যেন সময়ের গতির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে ঢেউখেলানো মাঠ, মাটির ঘর, পাখিদের ডাক আর নিরিবিলি দুপুর—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তির আবহাওয়া। কিন্তু এই শান্ত গ্রামটির বুকেই দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন মন্দির, যেন ইতিহাসের এক নিঃশব্দ সাক্ষী। কেউ কেউ বলে মন্দিরটির বয়স চারশো বছরেরও বেশি, আবার কেউ বলে আরও প্রাচীন। দিনের বেলায় এখানে গ্রামের মানুষ আসে পুজো দিতে, গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেয়, মন্দিরের চাতালে বসে বাচ্চারা খেলা করে। কিন্তু সূর্য ডুবে গেলেই সবকিছু যেন পাল্টে যায়। মন্দিরটিকে ঘিরে এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে আসে, এমন নীরবতা যেন কেউ অদৃশ্য হয়ে সারা পরিবেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। গ্রামবাসীরা…
-
প্রমিত চৌধুরী ১ শান্তিনগর গ্রামের প্রাচীন জমিদারবাড়িটি যেন এক ইতিহাসের দলিল, কিন্তু সেই ইতিহাস আজ ধ্বংসস্তূপের স্তূপে চাপা পড়ে আছে। লাল ইটের গা বেয়ে নেমে এসেছে লতাপাতা, জানালার কাঠের খাঁচাগুলো ভেঙে পড়েছে, আর দালানের ছাদের টালিগুলো অর্ধেক জায়গায় খসে গিয়ে আকাশের আলো ঢুকে পড়েছে ভেতরে। গ্রামবাসী দিনের আলোয় জমিদারবাড়ির পাশ দিয়ে গেলেও ভেতরে প্রবেশ করতে ভয় পায়, কারণ তারা বিশ্বাস করে এখানে কেবল ভগ্নদালান নয়, লুকিয়ে আছে অভিশপ্ত অতীত। তবে এই জমিদারবাড়ির ধ্বংসস্তূপের মাঝেও যেটি অদ্ভুতভাবে টিকে আছে তা হলো আটচালা। প্রাচীন কালের মতোই তার খিলানদ্বারগুলো দাঁড়িয়ে আছে, অর্ধেক জায়গায় ধসে গেলেও এক ধরনের অদ্ভুত দৃঢ়তায় সে দাঁড়িয়ে থেকে যেন…
-
নন্দিতা দাস ১ শীতলপুর নামের ছোট্ট গ্রামটি যেন সময়ের স্রোতকে অগ্রাহ্য করে দাঁড়িয়ে আছে। মাটির বাড়ি, কাঁচা রাস্তা, চারপাশে গাছপালা আর মাঝে দিয়ে বয়ে চলা শান্ত কুশাবতী নদী—সব মিলিয়ে গ্রামের এক সহজ, নিরিবিলি ছবি। দিনের বেলায় নদীর ধারে হাট বসে, গ্রামের ছেলে-বুড়ো সেখানে বসে গল্প করে, গৃহিণীরা আসে কলসি ভরতে। কিন্তু রাত নামলেই এই কুশাবতী নদীর চেহারা যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। আকাশজোড়া চাঁদ উঠলে নদীর কালো জলের ওপর ঝিলমিল আলো পড়ে, গাছের ছায়া জলে মিশে যায়, আর সেই নির্জনতাকে ভেঙে কখনও শোনা যায় এক অচেনা কান্নার শব্দ। গ্রামবাসী অনেক বছর ধরে সেই কান্নাকে চন্দ্রাবতীর অভিশাপ বলে মানে। কারণ বহু আগে,…
-
শৌনক দে অধ্যায় ১ – ঝড়ের রাতে রাতটা ছিল অদ্ভুত অশুভ। পশ্চিম আকাশে মেঘ জমে গিয়েছিল সারাদিন, কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই বজ্রপাতের সাথে শুরু হল তীব্র ঝড়। গাছপালা হেলে পড়ছে, গ্রামের কুঁড়েঘরের চালা একে একে খুলে উড়ে যাচ্ছে, আর বাতাসের সাথে মিশে আসছে শ্মশানঘাট থেকে ভেসে আসা শীতল গন্ধ। সেই রাতে সাধারণত গ্রামের মানুষ ঘর থেকে বের হয় না, কারণ বিশ্বাস করা হয়—শ্মশানের আত্মারা ঝড়ের সাথে বেরিয়ে আসে। কিন্তু গ্রামের ওঝা ভবানী সাধু, যার মাথায় গেরুয়া কাপড়, হাতে ত্রিশূল, চোখে রহস্যময় দৃষ্টি—সে বেরিয়েছিল এক মৃতদেহ দাহের কাজে সাহায্য করতে। হঠাৎ বজ্রের আলোয় দেখা গেল শ্মশানের এক কোণে এক সন্ন্যাসী শুয়ে আছেন,…
-
দিব্যেন্দু হালদার ১ গ্রীষ্মের শেষ বিকেল। গঙ্গার একটি শাখানদী নীরবে বইছে বাংলার এক অজ পাড়াগাঁয়ের পাশ দিয়ে। চারদিক জুড়ে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে, গাছের পাতায় হাওয়ার মৃদু সুর বাজছে, অথচ গ্রামের মানুষজনের মধ্যে এক অদ্ভুত কৌতূহল ছড়িয়ে পড়েছে। খবর এসেছে—বারাণসী থেকে এক অঘোরী সাধক হঠাৎ এ গ্রামে এসে উপস্থিত হয়েছে। কালো অর্ধফাটা চাদর জড়ানো দেহ, গায়ে চন্দনের বদলে শ্মশানের ছাই, লম্বা জটাজুট বাঁধা চুল, গলায় কপালের মালা আর হাতে একটিমাত্র খুলি। তাকে দেখে প্রথমে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভয়ে কেঁপে উঠেছিল। গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ বলল, “ওরা অঘোরী—শ্মশানই ওদের ঘর।” সত্যিই, সন্ধ্যা নামতেই তাকে দেখা গেল গ্রামসংলগ্ন শ্মশানঘাটে বসতে। একলা আগুন জ্বালিয়ে…
-
ৰূপকেশ শইকীয় অৰুণৰ জীৱন সেই দিনটোৰে আৰম্ভ হৈছিল, যেতিয়া তেওঁ দেখিলে মাক তীব্ৰ অসুখত পৰা অৱস্থাত। গাঁওখনৰ সৰু ঘৰখনৰ কোঠাত মাক বেডত শুই আছিল, মুখত বেছি জ্বৰ আৰু শৰীৰত অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা গৈছিল। অৰুণৰ হৃদয় কঁপিবলৈ ধৰিলে, কিয়নো মাক তেওঁৰ বাবে সকলো আছিল—দুখৰ সময়ত আশ্ৰয়, আনন্দৰ সময়ত হাঁহিৰ উৎস। গাঁওখনৰ চিকিত্সকে মাকক ওষুধৰ পৰামৰ্শ দিলে, কিন্তু সেই সকলো চেষ্টা কোনো প্ৰভাৱ দেখুওৱা নাছিল। অৰুণ চকু ভৰাই কান্দিবলৈ ধৰিলে, মাকৰ দুখ আৰু কষ্টৰ আগ্ৰহত তেওঁ নিজক অসহায় বুলি অনুভৱ কৰিলে। তেওঁ অনুভৱ কৰিলে, কোনো সাধাৰণ চিকিত্সা, কোনো সৰু গাঁওৰ ডাক্তৰৰ সলাহ, মাকক বাঁচাবলৈ যথেষ্ট নহ’ব। অৰুণৰ মনত দৃঢ় সংকল্প জন্ম ল’লে—তেওঁ…
-
এক জমিদারবাড়ির বিশাল প্রাসাদটি যেন সময়ের ভারে নুয়ে পড়েছে। একদা কত প্রজাপতি, দাস-দাসী আর অতিথির কোলাহলে মুখরিত ছিল এই প্রাসাদ, অথচ আজ তার চারপাশে নীরবতা আর ধ্বংসের ছাপ। লতাগুল্মে ঢাকা উঠোন, ভাঙাচোরা বারান্দা, কড়কড়ে দরজার কপাট—সব মিলিয়ে জায়গাটিকে ভূতের প্রাসাদের মতোই মনে হয়। কিন্তু এই ভগ্নদশার মাঝেই লুকিয়ে আছে এমন এক ধন, যা নিয়ে সমগ্র গ্রামে আজও গুঞ্জন থেমে নেই। গুপ্তমণি—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদারবাড়ির কুলদেবতার আসনে রাখা এই মণিকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে শত কাহিনি, শত গুজব। গ্রামের মানুষ বলে, মণির ভেতরে এমন এক শক্তি লুকিয়ে আছে যা শুধু প্রকৃত তান্ত্রিকের হাতেই জাগ্রত হয়। কেউ বলে, একবার…
-
পাৰ্থ প্ৰতিম মুখার্জী পূর্ণিমার রাত ছিল শান্তিনিকেতনের। আশ্রমের চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, শুধু দূরে মাঠের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। এমন রাতে আকাশে এক বিরল দৃশ্য ফুটে উঠল—দিগন্ত জুড়ে টানা লালচে আগুনের রেখা, যেন কেউ জ্বলন্ত মশাল ছুড়ে দিয়েছিল আকাশের বুকের ভেতর দিয়ে। গ্রামের ছেলেরা উল্লাস করে চিৎকার করল—“উল্কাপাত!” মহিলারা মন্দিরের ঘন্টার শব্দ তুলল, ভাবল দেবতার আশীর্বাদ নেমে এসেছে। কিন্তু বৃদ্ধ লোকেরা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তাদের চোখে ভয়, কপালে ঘাম, ঠোঁটে নিঃশব্দ ফিসফিসানি। তারা জানত, এটা কেবল কোনো নক্ষত্রপতন নয়—এটা “তান্ত্রিক পথ,” যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অন্ধকার ইতিহাস। বহু বছর আগে শোনা গিয়েছিল, এক তান্ত্রিক পূর্ণিমার রাতে এই…