সঞ্জয় দে পর্ব ১: বাড়ির রহস্য অভিজিৎ ছিল ইতিহাসের ছাত্র। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল পুরনো বাড়িগুলোর ইতিহাস খোঁজা, বিশেষত সেগুলোর যেগুলো সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে অথবা কেউ তাদের কাহিনী জানে না। একদিন, তার বন্ধু প্রীতম তাকে একটি পুরনো বাড়ির কথা জানায়, যে বাড়ি সম্পর্কে নানা গুজব ছড়িয়ে আছে। লোকজন বলে, এখানে অদ্ভুত হাসির শব্দ শোনা যায় এবং অনেক মানুষ এখানে হারিয়ে গেছে। সেই রাতের পর থেকেই বাড়িটির নাম তার মনের মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। অভিজিৎ ভেবেছিল, এই বাড়ির রহস্য উন্মোচন করতে পারলে তার গবেষণায় নতুন একটি দিক যোগ হবে। তাই এক সকালে, তার গবেষণার জন্যই সেদিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত…
-
-
শুভ্রজিৎ দত্ত অধ্যায় ১: চরকালী গ্রামটি একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া তেমন পড়েনি। চারপাশে শুধু সবুজ ক্ষেত-খামার, নদী এবং পুরনো বাড়ি-ঘর। তবে গ্রামের সবচেয়ে রহস্যময় স্থান ছিল তার পুকুরটি। পুকুরটির পানি এমন স্বচ্ছ ছিল, যা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করত, কিন্তু তার নিচে এক অদৃশ্য বিপদ lurked করত। স্থানীয়দের মধ্যে একটি গুজব প্রচলিত ছিল যে, পুকুরের পানিতে একটি দানবের আত্মা বাস করে। শোনা যায়, রাতের অন্ধকারে পুকুরের কাছে গেলেই শুনতে পাওয়া যায় এক অদ্ভুত হাসির গুঞ্জন, যেন কেউ বা কিছু জঙ্গলে হেসে চলেছে। কোনো এক সময়, কিছু মানুষ পুকুরের কাছে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, আর কখনো ফিরে আসেনি। গ্রামের…
-
শুভাশীষ পাল পর্ব ১: পাহাড়ের গা থেকে যাত্রা শিলিগুড়ি থেকে জিপ ছাড়ল সকাল আটটায়। ঋষভ জানালার ধারে বসে রেকর্ডারটা হাতে নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে একটা লাইন বলল, “আজ আমরা যাচ্ছি দার্জিলিং জেলার গভীর এক গ্রামে, যেখানে এখনও লোকমুখে ভয়ের সুরে উচ্চারিত হয় এক অঘোরী তান্ত্রিকের নাম—ভৃগুনাথ।” শান পিছনের সিটে বসে ক্যামেরার ব্যাগ আঁকড়ে ধরেছিল। মাথায় হালকা ঠান্ডা, বাইরে কুয়াশা। সামনে বসে গাইড টেমবা চুপচাপ পাহাড়ি রাস্তা দেখে গাড়ি চালাচ্ছিল, তার চোখে ছিল একটা অদ্ভুত স্থিরতা, যেন সে জানে তারা কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু চায় না তারা সেখানে পৌঁছাক। চিলোংবস্তির নামটা প্রথম শোনা গিয়েছিল এক পুরোনো তান্ত্রিক পাণ্ডুলিপিতে, যেটা ঋষভ সংগ্রহ করেছিল…
-
দেবায়ুধ পাল গাড়ি থামল কুঁয়োডাঙায় কুঁয়োডাঙা গ্রামের নামটা প্রথম শুনে মনে হয়েছিল কোথাও একটা গভীর কুয়ো আছে—শুধু গভীর না, এমন কিছু একটা যার দিকে তাকালেই গা ছমছম করে ওঠে। সুজয় যখন গাড়ি থামাল, তখন সন্ধে নামছে। পুরো গ্রাম যেন অন্ধকারের গায়ে চাদর মুড়িয়ে বসে আছে। অল্প আলোয় দেখে বোঝা গেল চারপাশে মাটির ঘর, তাল-খেজুর গাছ, আর একটাই পাকাবাড়ি—লাল ইটের একতলা, বন্ধ জানালায় কালো কাঁচ। ওটাই নাকি ‘ওদের’ বাড়ি। সুজয় কলকাতার একজন ছোটখাটো ইউটিউবার। নিজের চ্যানেল ‘ভূতুড়ে বাংলায়’ মাঝেমাঝেই চেনা-অচেনা ভৌতিক জায়গায় গিয়ে ভিডিও তোলে। আজ তার সঙ্গে এসেছে ক্যামেরাম্যান অলোক আর নতুন যুক্ত হওয়া সাউন্ড টেকনিশিয়ান রোহিনী। রোহিনী কিছুটা চুপচাপ…
-
১ ঋভু সেনগুপ্ত ভোরবেলা কলকাতা থেকে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছেই বুঝে গিয়েছিল—এই যাত্রা তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত আর অন্ধকার পথে নিয়ে যাবে। সাংবাদিক জীবনে সে বহু ঘটনা দেখেছে, বহু মানুষ, কিন্তু এমন এক গুহার অস্তিত্ব—যেখানে আজও ‘দক্ষিণাগ্নি’ নামে তান্ত্রিক যজ্ঞ হয়, তা শুনে প্রথমে অবিশ্বাসই করেছিল। কয়েক সপ্তাহ আগেই তার হাতে এসে পড়েছিল এক পুরনো চিঠি, যা লিখেছিলেন একজন মৃত প্রত্নতত্ত্ববিদ—ড. বিভাস মুখোপাধ্যায়। চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল ঝাড়খণ্ডের অন্তর্গত এক অরণ্যঘেরা গুহার, যেখানে “দেহান্তরণ” নামক এক প্রাচীন তন্ত্রচর্চা আজও গোপনে চলে। চিঠিতে লেখা ছিল একটি মাত্র লাইন: “যদি সত্য জানতে চাও, তবে আগুনকে ভয় পেও না। দক্ষিণাগ্নি সব জানে।” সেই লাইন…
-
অরূপ কুমার সেনগুপ্ত এক উৎসব মিত্র গাড়ি থেকে নামতেই তার চোখে পড়ল গ্রামের সেই ধূসর রঙা বিকেল, যেন ছায়ায় মোড়া এক মৃত সময়। গড়ভানিপুর — নামটা যতটা রূপকথার মত, বাস্তবটা যেন ঠিক ততটাই নিঃসাড়। কলকাতা থেকে ট্রেনে এসে তিন ঘণ্টা বাস জার্নি আর এক ঘণ্টা ইজে রিকশার পর, অবশেষে তার গবেষণার গন্তব্যে সে পৌঁছল। একটি পুরনো, প্রায় ভেঙে পড়া পাকা ঘর তার থাকার জায়গা; গ্রামের পাশেই গাছপালার ছায়ায় ঢাকা এই রাজবাড়ির ভগ্নাংশ। ছাদে শালপাতার স্তর, দেওয়ালে ছোপ ছোপ শ্যাওলা, আর মাঝে মাঝে ঘুঘুর ডাক। উৎসব ইতিহাসের ছাত্র— তার থিসিস “উনবিংশ শতকের বাংলার সামন্তপ্রথা ও মন্দির সংস্কৃতি” নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেফারেন্স লাইব্রেরিতে…
-
১ শীতের শুরুতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়া সকালটা চক্রপুর রেলস্টেশনে থেমেছিল মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য। ছোট একটা প্ল্যাটফর্ম, দুই পাশে ধানখেত, মাঝখানে লালমাটির পথ—নেমেই অরিজিৎ বুঝে গিয়েছিল, এখানে সময় একটু ধীরে চলে। তার পায়ের কাছে গুটিগুটি করে হেঁটে যাওয়া কুকুরটা যেন তাকিয়ে বলছিল, “তুমি নতুন এসেছো, বুঝি?” সল্টলেক থেকে বেরিয়ে প্রায় ছ’ঘণ্টার সফর শেষে সে পৌঁছেছে এই প্রত্যন্ত গ্রামে, গবেষণার কাজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি বিভাগের অন্তর্গত একটি সাবজেক্ট — “লোকজ তন্ত্র এবং বাংলার গ্রামীণ সমাজে তার প্রভাব” — এর ওপর MPhil থিসিস করছে অরিজিৎ। বহু পড়াশোনার পর ও খোঁজ পেয়েছিল এই চক্রপুর গ্রামের, নদীর ধারে এক অচেনা নাম,…
-
ইমন দে পর্ব ১ শিলিগুড়ির দক্ষিণ চৌরঙ্গী এলাকায় একটা পুরনো দোতলা বাড়ি। লাল ইটের সেই বাড়িটা বেশিরভাগ সময়ই নির্জন। দিনের বেলায় স্থানীয়রা পাশ কাটিয়ে যায়, রাত হলে কেউই পথ মাড়ায় না। লোকজন বলে, বাড়িটার পাশের গলিতে মাঝরাতে কার যেন হেঁটে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়, আবার জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় এক মেয়ের মুখ—মাথায় লাল ঘুঙুরের টিপ, চোখে নিঃশব্দ আর্তি। এই এলাকাতেই নবাগত পরিবার দত্তরা নতুন ভাড়া নিয়েছে। রণদীপ দত্ত, তার স্ত্রী পৌলমী এবং একমাত্র মেয়ে রিয়া। পৌলমীর স্কুলে চাকরি হয়েছে, আর রণদীপ ব্যাঙ্কে। বাড়িভাড়া কম, চারপাশে গাছপালা, তাদের বেশ ভালোই লেগেছিল। প্রতিবেশীরা প্রথমে একটু অবাক হলেও পরে আর কিছু বলেনি।…
-
ঈশান বসু বেলপাহাড়ি গ্রামটা দিনের আলোয় যেমন নিস্তরঙ্গ, রাতের অন্ধকারে ততটাই অজানা। সন্ধ্যে নামতেই চারপাশের কুঁড়ে ঘরগুলোতে আলো জ্বলে উঠলেও, গ্রামের এক প্রান্তে একটা জায়গা থেকে সব আলো যেন ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়—সেই জায়গাটার নাম কানা মসজিদ। মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় তার নাম, তবে কেউ স্পষ্ট করে বলে না এর ইতিহাস। শুধু এটুকু বলে, মসজিদের পাশের পুরনো কবরস্থানে গেলে ফিরে আসা যায় না। আর যদি ফিরেও আসো, তুমি আর আগের মানুষ থাকো না। সেই জায়গায় রাত কাটাতে এল সোহম মিত্র। শহরের ছেলে, ইউটিউবার, ভয়হীন এক যুবক যে বিশ্বাস করে, ভূত বলে কিছু নেই—যতসব মনস্তাত্ত্বিক ছায়া। “DarkLens” নামের তার ইউটিউব…
-
সায়ন্তন চক্রবর্তী ১ আকাশ ছিল ধূসর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল পেরিয়ে এসেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু সূর্য যেন সকালেই হেরে গিয়েছে মেঘের জোরে। শান্তিনিকেতনের মাঠ তখন প্রায় ফাঁকা, হেমন্তের শুষ্ক হাওয়া ঝরে পড়া পাতাগুলোকে ঘূর্ণির মতো ঘুরিয়ে নিচ্ছে। অনির্বাণ নিজের হোস্টেলের ঘরের জানালার পাশে বসে শেষ পৃষ্ঠা পড়ছিল একটি পুরোনো কাগজের কাটিং—যেখানে অর্ধশতক আগে ছাপা হয়েছিল এক আশ্চর্য সংবাদ: “পাথরঘাটার গোপন ঘরে তান্ত্রিকের ছায়া—ভয়ের আতঙ্কে গ্রাম ছেড়েছে বাসিন্দারা।” খবরটা ছিল ভাসা-ভাসা, তেমন নির্ভরযোগ্য না, কিন্তু গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত তিন বছর ধরে অনির্বাণ কাজ করছে বাংলার লোকবিশ্বাস ও তান্ত্রিক সাধনার উপর। শান্তিনিকেতনের বিশ্ববিদ্যালয়ে তার গবেষণার বিষয় ছিল, “পূর্বভারতের লুপ্তপ্রায় তন্ত্রশিক্ষা ও জনচর্চা: বাস্তবতা…