• Bangla - তন্ত্র

    রুদ্রসাধক

    দেবায়ন মুখোপাধ্যায় এক পিতার মৃত্যুর পরে বছরখানেক কেটে গেছে, কিন্তু ঋষভের জীবনে সেই শূন্যতা যেন আজও পুরোপুরি ভরেনি। শহরের ব্যস্ততা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ আর বন্ধুদের হাসিঠাট্টার মাঝেও কিছু একটা চুপচাপ গুমরে গুমরে উঠত ভেতরে—একটা অপূর্ণতা, একরকম গোপন আর অজানা অভাব। এবার গ্রীষ্মের ছুটিতে সে ফিরে এসেছে পুরনো বাড়িতে—উত্তর কলকাতার অন্ধকার আর ধূলিধূসর অট্টালিকা, যার প্রতিটি দেয়ালে, জানালায়, এমনকি বাতাসে লেগে আছে সেই মানুষটার ছায়া, যাঁকে সে পুরোপুরি চিনতেই পারেনি কখনও। দেবদ্যুতি সেন—ঋষভের বাবা—ছিলেন এক সময়ের বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত, কিন্তু পরবর্তী জীবনে তাঁর আচরণ হয়ে উঠেছিল রহস্যময়, চাপা, এমনকি ভীতিকরও কিছুটা। নিজের ঘরে একা একা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা, কুঠুরি বন্ধ…

  • Bangla - তন্ত্র

    নির্বাচিত

    ঋদ্ধি চক্রবর্তী   পর্ব ১: কালির চোখ কলকাতা শহরের মধ্যভাগে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরোনো পাঠাগার—“রায় রে’ডিং রুম”—তেমন কোনও বিখ্যাত জায়গা নয়। অথচ সেখানে প্রতিদিন দুপুর তিনটার সময় ঠিক এক জন মহিলা এসে বসেন, বাম দিকের দ্বিতীয় সারির তৃতীয় টেবিলে। তাঁর নাম অনামিকা বাগচী। বয়স আটাশ। পেশায় গবেষক, জাদুবিদ্যা ও তন্ত্রশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে তাঁর আসল কাজ শুরু হয় যখন বইয়ের পাতাগুলো শেষ হয়, আর প্রশ্নগুলো মুখে না থেকে ঢুকে পড়ে মগজে। সেদিন দুপুরেও অনামিকা এসে বসেছিল টেবিলটায়। লাল কাপড়ে মোড়া একটা পুরনো খাতা তার সামনে। নাম নেই, লেখকের উল্লেখ নেই। পাতাগুলোতে শুধুই আঁকা—ত্রিকোণ, মন্ডল,…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    বিবর্ণ পটচিত্র

    প্রশান্ত ভৌমিক এক ডঃ অনির্বাণ দত্ত ট্রেন থেকে নামলেন বোলপুর স্টেশনে, অগস্টের একটি অলস দুপুরে। তাঁর কাঁধে ক্যাম্ব্রিক কাপড়ের ব্যাগ, ভেতরে নোটবুক, একটি পুরনো ক্যামেরা, আর কিছু প্রয়োজনীয় গবেষণা-সামগ্রী। শান্তিনিকেতনের এই আশপাশের অঞ্চলে তিনি বারবার এসেছেন, কিন্তু এবারের উদ্দেশ্য কিছুটা ব্যতিক্রম। পূর্ব ভারতের লোকজ শিল্পের উপর একটি দীর্ঘ গবেষণাপত্রের কাজ করছেন তিনি, যার জন্য বিশেষ করে বীরভূম জেলার হারিয়ে যাওয়া পটচিত্রের খোঁজে এসেছেন। তিনি শুনেছিলেন, বোলপুর থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে এক গ্রামে এমন একটি পটচিত্র আছে, যা কেবল শিল্পগুণের জন্য নয়, তার অদ্ভুত, অলৌকিক ইতিহাসের জন্যও লোকের মুখে মুখে ফেরে। এই গল্প প্রথম তিনি শুনেছিলেন তাঁর গুরু প্রণবেশ মিত্রর…

  • Bangla - রহস্য গল্প

    কাগজের মানুষ

    সৌরভ রায় এক বহু বছর পর পাহাড়ের পাদদেশে পুরনো কাঠের বাড়িটায় ফিরেছেন অনিরুদ্ধ মুখার্জি। সময়টা নভেম্বরের শেষ, হিমেল বাতাস জানালার কাঁচে ঘষটে যাচ্ছে, আর গাছের ডালপালা কেমন যেন সুর করে কাঁপছে। কলকাতার শহুরে কোলাহল থেকে পালিয়ে আসা এই লোকটা একসময় নামী সাইকোলজিকাল থ্রিলার লেখক ছিলেন, কিন্তু গত ছয় বছর ধরে তার কলমে শব্দ নেই, চরিত্র নেই, কেবল এক শূন্যতা। বাড়িটা ছোট, কাঠের, একটু ঝুঁকে পড়েছে যেন সময়ের ভারে, কিন্তু তবু গৃহস্থালি আবহে নরম একটা শান্তি আছে এখানে। একসময় এই বাড়ির ঘরে ঘরে শব্দ ভেসে বেড়াত—পাখির ডাক, টাইপরাইটারের শব্দ, আর মাঝেমধ্যে হাসির ছায়া। এখন শুধুই নীরবতা, আর তাতে ভর করে আছে…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    চতুষ্পথে দাঁড়িয়ে

    মেঘলা রায় পর্ব ১: সেই চিঠি পূর্ব ক্যালকাটা কর্পোরেশনের ঘিঞ্জি কোয়ার্টার, হরিদেবপুরের বাসা। সেইখানেই প্রতিদিন ঠিক আটটায় ঘুম ভাঙে সৌম্য মিত্রর। ঘুম থেকে উঠেই বাম দিকের দেয়াল ঘেঁষে থাকা পুরনো লোহার আলমারিটা খোলে—চাবি নেই, সরাসরি তালা ভেঙে রাখা। সেই তালার ভেতরেই পুরোনো চিঠিগুলো থাকে, মায়ের লেখা, ভাইয়ের পাঠানো, কয়েকটা সরকারি চিঠি, দু-তিনটে কাটা টিকিট। কিন্তু আজ সকালটা যেন কেমন অন্যরকম। জানলা গলে ঢুকছে একরাশ ঝিরঝিরে ঠান্ডা আলো, যেটা কলকাতার চেনা আষাঢ়ে মেলে না। আর তার ফাঁক দিয়ে, ছেলেবেলায় শোনা মাধবীলতার ঘ্রাণ এসে পড়ছে বিছানার বালিশে। হাতের প্রথম চিঠিটা হলুদ হয়ে যাওয়া খামে মোড়া। উপরে কালো কালিতে বড় বড় হরফে লেখা—সৌম্য…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    শ্বেতপাথরের বালিশ

    এক মাঘ মাসের শেষে মুর্শিদাবাদ শহরের ভেজা শীত এখনও হাড়ে হাড়ে কাঁপায়। গঙ্গার পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা রাজবাড়ির ছায়ায়, ড. সায়ন্তনী মুখোপাধ্যায় একটি পুরাতন প্রত্নতাত্ত্বিক ফাইল হাতে নিয়ে চুপ করে বসেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি অনুদানের ভিত্তিতে তিনি এসেছেন মুর্শিদাবাদের হারিয়ে যাওয়া ফোক-কালচার আর মুঘল-পরবর্তী ইসলামি নির্মাণকলা নিয়ে গবেষণার জন্য। কিন্তু আসল আগ্রহ তাঁর ছিল এক রহস্যময় বস্তু নিয়ে—যার নাম কেবলমাত্র একটি ডকুমেন্টে পাওয়া গিয়েছিল: “শ্বেতপাথরের বালিশ।” নথিতে লেখা ছিল, এটি এক সময় একটি প্রাচীন মসজিদের গোপন কামরায় রাখা হত এবং বলা হত যেই এই বালিশে একবার মাথা রাখে, সে মৃতদের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে—তাদের যন্ত্রণার স্মৃতি, তাঁদের না-বলা ইতিহাস যেন…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    মৃত্যুস্থান বনাম মুক্তিস্থান

    দীপঙ্কর মাহাতো পুরুলিয়ার দক্ষিণ প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটিতে ঢোকার পথটাই যেন শহরজীবনের ব্যস্ততা থেকে এক অলক্ষ্য ছেঁটে ফেলা। ঝাউগাছ, শাল, পিয়াল আর মহুয়ার সারি সারি গাছের ফাঁকে রাস্তা বেঁকে গেছে পাহাড়ের বুক চিরে। মে মাসের শুকনো রোদ আর ধুলোভরা বাতাসের মধ্যেও সেখানে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল, যেন প্রকৃতি নিজেই শব্দ চেপে বসে আছে। এমনই নিঃসঙ্গ, প্রায় বিস্মৃতপ্রায় এই জায়গাতেই নিজের শেষ জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডা. অনিরুদ্ধ গুহ। কলকাতার এক খ্যাতনামা হাসপাতালে চব্বিশ বছর ধরে সার্জারি বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি, সহকর্মী আর ছাত্রছাত্রীদের কাছে ছিলেন এক কঠোর অথচ নীতিনিষ্ঠ পথপ্রদর্শক। তবে সময়ের নিয়মে অবসরের দিন ঘনিয়ে এলে…

  • Bangla - তন্ত্র

    পদ্মপীঠের অভিশাপ

    স্নেহা মুখার্জী অধ্যায় ১: আগমন পৃথিবীতে কিছু আগমন নিতান্তই ঘটনাক্রম নয়, বরং পূর্বনির্ধারিত ছক, যা কারও অজান্তে বুনে চলে ভাগ্যের জাল। অরিন্দম মুখার্জির শান্তিনিকেতনে আগমন তেমনই এক আগমন। আপাতদৃষ্টিতে গবেষণার জন্য শান্ত, নির্জন পরিবেশে এসে লোকসাহিত্য নিয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে এসেছেন তিনি, কিন্তু বাস্তবে—এই যাত্রা ছিল অতীতের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়ের টান। এক মেঘলা শরতের দুপুর। খোলা রিকশায় বসে অরিন্দম শান্তিনিকেতনের দিকে এগোচ্ছে। রাস্তার ধারে লালমাটির পথ, পাশে শাল-পলাশের অরণ্য, মাঝে মাঝে কাঁঠালের গন্ধ ভেসে আসে বাতাসে। আকাশে রোদ-আলোর সঙ্গে মিশে আছে হালকা কুয়াশা, যেন প্রকৃতিই কিছু লুকিয়ে রেখেছে। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞাসা করল, — “আপনার বাড়ি কোথায়, বাবু?” — “কলকাতা। তবে এখন…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    চন্দ্রাবতীর কুঠিবাড়ি

    সমীর দাস ১ শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন কুঠিবাড়ি—জমকালো অতীতের ক্লান্ত ছায়া যেন তার শরীরজুড়ে বসে আছে। কাঁচা রাস্তা ধরে বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ঈশান ও মিতালি প্রথম দিন বাড়িটায় পা রাখল। চারপাশে নির্জনতা, কেবল পাখির ডাক, আর মাঝেমধ্যে ঝোপের মধ্যে কী যেন সরসর শব্দ। দূরে ধীরে বয়ে চলেছে একটি অলস নদী—তার পাড়ে শাল, সেগুন আর করমচা গাছে ঘেরা এই প্রাসাদসমান কাঠামোটি যেন নিঃশ্বাস ফেলে। ঈশান, একজন শহরের স্থপতি, পুরনো স্থাপত্য ভালোবাসে। বহুদিন ধরেই ওর ইচ্ছে ছিল এমন এক নিঃসঙ্গ জায়গায় থাকা, যেখানে আধুনিক দুনিয়ার ছোঁয়া কম, এবং নিজের কাজের জন্য নির্মল নিঃশব্দতা পাওয়া যাবে।…

  • Bangla - তন্ত্র

    তান্ত্রিকের দেউল

    অগ্নিভ বসু ১ মেঘে ঢাকা আকাশ, ছেঁড়া ছেঁড়া কুয়াশার চাদরে মোড়া বাঁকুড়ার পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটি জিপ। স্টিয়ারিংয়ের পাশে বসে ডঃ নীলাভ মুখার্জী ডায়েরির পাতায় অস্থির হাতে কিছু নোট নিচ্ছিলেন—যার বেশির ভাগই ছিল স্থানীয় পুরাতাত্ত্বিক মানচিত্রের হালনাগাদ তথ্য। তাঁর মুখে সিগারেট, চোখে ক্লান্তির ছাপ। পেছনে বসে ছিলেন গবেষক মালবিকা রায়, যিনি জানালার কাঁচ সরিয়ে বাইরের পাহাড়ঘেরা দিগন্তে তাকিয়ে ছিলেন, যেন কোন কিছু চেনার চেষ্টা করছেন—যা হয়তো কোনো ছবি বা কাহিনি পড়ে মনে গেঁথে গিয়েছিল। গাড়িচালক রঘু হাঁসদা হঠাৎ বলে উঠল, “আর একটু সামনে গেলেই গোবিন্দপাহাড়পুর, বাবু। আপনারা যেই দেউলের খোঁজ করছেন, সেটার ধ্বংসস্তূপ ওই গ্রামের ওপারেই। তবে লোকজন…