• Bangla - তন্ত্র

    চৌষট্টি যোগিনী

    গৌরব মিত্র কলকাতার আর্চিওলজি ডিপার্টমেন্টের সেমিনার রুমে বসেছিলেন দীপাংশু মুখার্জী। দেওয়ালের একপাশে প্রাচীন শিবমূর্তির ছবি, অন্যপাশে মধ্যযুগীয় মন্দিরের স্থাপত্যের স্লাইড প্রজেক্টর থেকে আলো ফেলে ঝলমল করছে। টেবিলের ওপর ছড়ানো নোটবুক, কাগজপত্র, আর তার হাতের পরিচিত সিগারেটের ধোঁয়া মিলেমিশে যেন কক্ষটিকে এক অদ্ভুত আবহে ভরিয়ে তুলেছিল। সেমিনার চলাকালীনই দপ্তরের এক চতুর্থশ্রেণির কর্মী এসে একটি খাম দিয়ে গেল—সাধারণ বাদামি রঙের, কোন প্রেরকের নাম নেই, কেবল কালো কালিতে লেখা তাঁর নাম আর ডিপার্টমেন্টের ঠিকানা। খানিকটা অবাক হয়ে খাম খুলতেই চোখ আটকে গেল মাত্র এক লাইন লেখায়—“চৌষট্টি যোগিনীর পূজা অসমাপ্ত, তুমি কি দেখতে চাও?”। মুহূর্তেই শরীরের ভেতর শিরশিরে একটা শীতলতা ছড়িয়ে গেল। ‘চৌষট্টি যোগিনী’…

  • Bangla - তন্ত্র

    মায়াবী তাবিজ

    শুভ্রা গুহ রায় ১ রঘু ওঝা সেই রাতটি কখনও ভুলতে পারবে না। মেঘঢাকা আকাশে বজ্রপাতের শব্দ বেজে চলছিল, আর বৃষ্টির মতোই ঝড়ো হাওয়া বনভূমির গহীনতার মধ্যে প্রবেশ করেছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে তার পায়ের নীচে ভেজা পাতা ফেটে যেত, আর বাতাসের দমকা তাকে সামান্যই সামলাতে দিচ্ছিল। সে জানত, এমন সময় বনের মধ্যে একা থাকা বিপজ্জনক, কিন্তু মানসিক উদ্যম এবং অনুসন্ধিৎসা তাকে থামতে দিতে পারছিল না। হঠাৎ, একটি অদ্ভুত আলো তার চোখে ধরা দিল—এক ধরণের ঝলমলে চকমক যা ঘিরে ছিল ঘন অন্ধকার। রঘু প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো এটি কোনো দ্যুতি বা দূর থেকে পড়া বজ্রপাতের প্রতিফলন, কিন্তু যত কাছে গেল, ততই বুঝতে পারল এটি…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    ছিন্নমাথার বরযাত্রী

    ফাল্গুনী মিশ্র এক গভীর অন্ধকারে ডুবে থাকা সেই গ্রাম, নাম মালঞ্চপুর। দিনের বেলায় এ গ্রাম চিরচেনা ছবির মতো শান্ত, ধানখেতের সবুজ গালিচা, কুঁড়েঘর আর দিঘির জলে ছেলেদের হাসি-ঠাট্টা। কিন্তু সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন অন্য এক ছায়াময় আবহ নামত এখানে। বিশেষত গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পুরোনো বটগাছটি যেন অজস্র রহস্য গিলে রেখেছে। সেই গাছের নিচে প্রতিদিন সন্ধের পরে ভিড় জমত, গল্পগুজব করতে করতে গ্রামের লোকেরা আসত, কেউ কেউ তামাক টানত, কেউবা পাকা পান চিবোতে চিবোতে নিজের শোনা লোককথা খুলে ধরত। আর এইসব গল্পকথার ভিড়েই ছিলেন গদাধর কাকা—আশি ছুঁইছুঁই এক বুড়ো মানুষ, সাদা দাড়ি বুক অবধি নেমে এসেছে, চোখদুটো যেন…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    দোতলার লাল আলো

    অধ্যায় ১ — উত্তর কলকাতার পুরনো পাড়াগুলোর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে—গলির ভেতর ঢুকলেই সময় যেন কয়েক দশক পিছিয়ে যায়। আধুনিক শহরের ব্যস্ততার বাইরে, এখানে এখনো ছিমছাম পুরনো দোতলা-তিনতলা বাড়ি, কার্নিশে শ্যাওলা জমে থাকা দেওয়াল, এবং ধুলো জমা বারান্দার খিলান। সেই রকমই এক সরু, বাঁকানো গলি—যেখানে দিনের বেলাতেও আলো ঠিকমতো ঢোকে না। গলির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন দোতলা বাড়ি, যার লোহার গেট মরচে পড়ে বাদামি হয়ে গেছে, আর তার ওপরে গাছের লতা-পাতা জট বেঁধে পড়ে আছে। লোকজন দিনের বেলায়ও বাড়িটির দিকে তাকাতে সাহস পায় না, রাতের কথা তো বাদই দিলাম। কারণ গুজব বলে, রাত নামলেই দ্বিতীয় তলার এক জানালায় জ্বলে…

  • Bangla - রহস্য গল্প

    ফিসফিসে কবরস্থান

    ঋতা মিত্র পর্ব ১: কাঁচের নাম বিকেলের আলো যেদিন জঙ্গলের কিনারায় ঢালু হয়ে পড়ে, সেদিনই নীলার ক্যামেরা সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকে; যেন আলোটা সরে যাওয়ার আগেই তা ধরে ফেলতে চায়। শহরের উত্তর-পশ্চিমে, পুরনো রেললাইনের পাশে, গলানো টার আর ঘাসের গন্ধমেশানো একটা ফাঁকা জমিতে দাঁড়িয়ে ছিল কবরস্থানটা—চুনসুরকির মলিন রঙ, বুজে থাকা লোহার ফটক, আর তার উপর দিয়ে বুনো লতাগুল্মের চক্রাকার আঁচড়। জায়গার নাম বোর্ডে নেই, মানচিত্রে নেই; তবু গুগল ম্যাপে জুম করলে একটা অচেনা ছোপ, যেন পুরনো দাগের মতো, চোখে পড়ে। নীলা প্রথমে ভেবেছিল বোধহয় এটা একটা ব্যক্তিগত জমি—পুরনো পরিবারের কবরখানা—যেখানে কেউ আসে না, কেবল সময় এসে পড়ে থাকে। কিন্তু লোহার…

  • Bangla - তন্ত্র

    রক্তমন্ত্র

    অগ্নিভ চক্রবর্তী ১ কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের পুরনো ভবনটার করিডোর সবসময়ই যেন একটু অন্ধকার আর আর্দ্র গন্ধে ভরা থাকে, বিশেষ করে বর্ষার রাতে। বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ, জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসছে ঠান্ডা বাতাস, আর কোথাও দূরে হাসপাতালের করিডোরে ভিজে স্লিপারের শব্দ ভেসে আসছে। অয়ন মুখার্জী, তৃতীয় বর্ষের মেডিকেল ছাত্র, নিজের ঘরে বসে নোটস লিখছিল, কিন্তু মনটা অস্থির। সেদিন বিকেল থেকে বন্ধুর ফোনে কোনো উত্তর নেই—ঋত্বিক সেন, যে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, সবসময় সময়মতো খবর দেয়, তার এই নীরবতা অয়নকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। রাত প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ হঠাৎ পাশের ঘর থেকে আসা একটা ধাক্কার শব্দ অয়নকে চমকে দিল। শব্দটা…

  • Bangla - তন্ত্র

    শ্মশানের সিংহাসন

    শৌর্য সেনগুপ্ত অধ্যায় ১ অরিন্দম সেন কলকাতার এক নামী দৈনিকের অনুসন্ধানী সাংবাদিক, যার জীবনের মূল নীতি হলো—কোনো খবরের সত্যতা যাচাই না করে তা প্রকাশ করা নয়। এক বর্ষার বিকেলে অফিসের কাজ শেষ করে সে যখন চা খেতে রাস্তার ধারের ছোট্ট দোকানে দাঁড়িয়েছিল, তখনই পরিচিত এক বৃদ্ধ লোক, হরিদাসবাবু, এসে বসে পড়েন তার পাশে। হরিদাসবাবু একসময় পত্রিকার ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার ছিলেন, তবে গত কয়েক বছর ধরে তিনি গ্রামের নানা রহস্যময় কাহিনি ও লোকগাথা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। সেদিন কথায় কথায় তিনি এক অদ্ভুত ঘটনার উল্লেখ করেন—তারাপীঠের কাছের এক পুরোনো শ্মশানে, প্রতি পূর্ণিমার রাতে, নাকি কিছু তান্ত্রিক গুরুদের গোপন সভা বসে। লোকমুখে শোনা যায়,…

  • Bangla - রহস্য গল্প

    কুমিরদ্বীপের অশরীরী

    এক সকালবেলার আকাশে একধরনের হালকা ধূসর আভা, বাতাসে নোনা জল আর কাদার মিশ্রিত গন্ধ। কলকাতা থেকে লঞ্চে নামার পর ছোট্ট এক কাঠের বোটে পা রাখলেন ড. সমীরণ ঘোষ। সরকারি পরিবেশ গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে এবার তাঁর গন্তব্য সুন্দরবনের এক প্রত্যন্ত দ্বীপ—স্থানীয়দের মুখে যার নাম কুমিরদ্বীপ। নদীর ঘোলাটে জলে বোট দুলে উঠতেই তিনি কাঁধের ব্যাগ শক্ত করে ধরে বসেন। বোটের হাল ধরে থাকা মানুষটির গায়ে মলিন ফতুয়া, চোখে চওড়া ফ্রেমের কালো চশমা, মুখে এক অদ্ভুত রুক্ষতা—সে মোক্তার শেখ। সমীরণের হাতে ধরা নোটবুকে দ্বীপের মানচিত্র, কয়েকটি গবেষণা নোট, আর বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের সরঞ্জামের তালিকা। যাত্রা শুরুর মুহূর্ত থেকেই মোক্তার তাঁকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে লক্ষ্য…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    চৌরঙ্গীর লিফট

    কলকাতার চৌরঙ্গীর ব্যস্ত রাস্তার কোলাহল পেরিয়ে হঠাৎই যেন সময় থমকে যায় যখন চোখে পড়ে হোটেল নীহারিকা রেসিডেন্স। লাল-ইটের গাঁথুনি, কড়িকাঠের বারান্দা, আর চারতলার মাথায় পুরনো দিনের ঘড়িঘর—যার কাঁটা আজ বহু বছর ধরে নড়েনি। এই হোটেলটা যেন এক প্রাচীন জীবাশ্ম, চারপাশের আধুনিক কাচের ভবনের ভিড়ে হার মানতে না চেয়ে গোপনে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে ঢোকার গেটের ওপরে ঝুলছে বড় বড় অক্ষরে নাম, তবে রঙ মুছে গেছে, কিছু অক্ষর ভাঙা। দরজার দুইপাশে দুটো পাথরের সিংহ, যাদের চোখে জমে থাকা ধুলোতে একটা চাপা বিষণ্ণতা। অরিন্দম মুখার্জী, তিরিশের শেষের এক অভিজ্ঞ ইনভেস্টিগেটিভ সাংবাদিক, ধীর পায়ে গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে ছোট্ট একটি নোটবুক আর…

  • Bangla - তন্ত্র

    শ্যামার রক্তরেখা

    সৌম্যজিত লাহিড়ী ১ অক্টোবরের সূর্য তখন রক্তিম হয়ে অস্ত যাচ্ছে, বিষ্ণুপুর শহরের উপর ধীরে ধীরে নেমে আসছে পুজোর সন্ধ্যা। বাঁকুড়ার ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে ঋষভ সেনগুপ্ত তার DSLR-টা কাঁধে ঝুলিয়ে নামল লোকাল বাস থেকে। বেশ কিছুদিন ধরেই সে পরিকল্পনা করছিল দুর্গাপুজোর এক বিশেষ সিরিজ করবে — শহর থেকে দূরে, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এমন পুজো, যেগুলো এখন কেবল ইতিহাসের পাতায় টিকে আছে। বিষ্ণুপুরের এক স্থানীয় গাইড তাকে বলেছিল, শহরের প্রান্তে একটা পোড়া রাজবাড়ি আছে যেখানে কোনো এক সময় দুর্গাপুজো হত, আজ আর কেউ যায় না, কিন্তু একটা প্রতিমা নাকি এখনও প্রতি বছর বানানো হয় এবং অল্প কিছু মানুষ সেখানে পুজো করে। কৌতূহলবশত…