অমিয় রায় এক শৈশবের সেই গ্রামের সকালটা একেবারে জ্যোৎস্নার মতো উজ্জ্বল, কিন্তু তার আলো কখনোই চোখে আঘাত করে না। পলাশ আর তারকা, দুজনেই ছেলেবেলার অদ্ভুত সাহস আর কৌতূহলের সঙ্গে ধানখেতের মধ্যে দৌড়াচ্ছে। ধানের কাঁচা গাছগুলো যেন তাদের হাতছানি দিচ্ছে, আর তাদের খেলা যেন প্রকৃতির সাথে মিশে যাচ্ছে এক অদ্ভুত সমন্বয় তৈরি করে। গ্রামের ঘরে এখনও কেবল ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙছে, কয়েকটা হাঁস কষ্টে হাঁসছে, আর পথের ধুলো কৌতূহল নিয়ে সূর্যের আলোয় ঝকঝকে করছে। নদীর ধারে সোনালী রোদ পড়ছে, আর তার মধ্যে ছোট ছোট মাছেরা ঝলমল করে হেঁটে বেড়াচ্ছে। পলাশ হেসে চিৎকার করে বলল, “তারকা, ধরা পড়বি না!” আর তারকা হাসি…
-
-
তন্ময় বাগচী ১ ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই শহরের রাস্তায় এক অদ্ভুত নীরবতা থাকে। বড় বড় বহুতল ভবনের কাঁচে তখনও আলো এসে পড়েনি, ট্রাফিক সিগন্যালগুলো লাল-সবুজ ঝলকাচ্ছে কিন্তু গাড়ি তেমন নেই। এই আধো-অন্ধকার, আধো-নিস্তব্ধ সময়ে রাস্তার ধারে এক মাঝবয়সী মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে থামে পরিচিত জায়গায়—ফুটপাতের সেই চওড়া জায়গাটিতে যেখানে তার ছোট্ট দোকান বসে প্রতিদিন। তার হাতে কয়েকটা বড় ব্যাগ, যেগুলোতে সাজানো আছে দোকানের মাল—চামড়ার মানিব্যাগ, সস্তা প্লাস্টিকের পার্স, মোবাইল কভার, চাবির রিং, ছোটখাটো অলংকার আর ঘড়ি। ব্যাগ নামিয়ে সে প্রথমে একবার চারপাশে তাকায়। রিকশাওয়ালারা তখনও ঘুমাচ্ছে, পানের দোকান খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেবল ভোরের খবরের কাগজওয়ালারা ব্যস্ত সাইকেল চালিয়ে শহরের…
-
তমালিকা দাস মহামারীর প্রথম ঢেউ এসে যেন শহরের প্রাণ এক নিমেষে কেড়ে নিল। কলকাতার মতো এক কর্মব্যস্ত মহানগর, যেখানে প্রতিদিনের সকাল মানেই ভিড়ে ঠাসা লোকাল ট্রেন, গাড়ির হর্নে মুখরিত রাস্তা, আর মানুষের ভিড়ের কোলাহল—সেই শহর হঠাৎই হয়ে গেল এক বিরান চৌহদ্দি। অদৃশ্য শত্রুর ভয়ে মানুষ ঘরে বন্দি, যেন কেউ আর সাহস করছে না রাস্তায় পা বাড়াতে। দোকানপাটের ঝাঁপ বন্ধ, ফুটপাতের চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা চা নেই, স্কুল-কলেজের ফটকগুলো তালাবন্ধ, সিনেমাহলের আলো নিভে গেছে। শহরের বাতাসে মিশে আছে শুধু আতঙ্ক আর শূন্যতা। এই নিস্তব্ধতায় একমাত্র ভেসে আসে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন—একটা ভৌতিক আর্তনাদের মতো, যা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, মৃত্যু যেন প্রতিদিনই আরও…
-
দিব্যরূপ বক্সী সূর্যাস্তের আগে, আকাশের কোণে ধীরে ধীরে ছায়া নেমে আসে, আর সমুদ্রের নীল জলরাশির উপর লাল-সোনালী রঙের খেলা শুরু হয়। সেই রঙ যেন সমস্ত আকাশকে আঁকাবুঁকি দিয়ে মাখিয়ে দেয়, আর সমুদ্রের ঢেউগুলো নরমভাবে সৈকতের বালির উপর আছড়ে পড়ে, যেন পৃথিবী নিজেই তাদের স্বাগত জানাচ্ছে। দম্পতি প্রথমবার এই নিরিবিলি সৈকতে আসে, এবং নতুনত্বের উত্তেজনা তাদের হৃৎপিণ্ডে স্পন্দন জাগিয়ে তোলে। তারা একে অপরের দিকে তাকায়, চোখে চোখ রেখে হালকা হেসে ওঠে, আর মৃদু বাতাসে একে অপরের চুল ছুঁয়ে যায়। সমুদ্রের নোনা হাওয়া তাদের মুখে মৃদু ছোঁয়া দেয়, যেন প্রকৃতিই তাদের মাঝে একটি অদৃশ্য বন্ধন স্থাপন করছে। তাদের পদক্ষেপে বালির নরম দোলান,…
-
রোহিত মজুমদার ১ গুয়াহাটির ব্যস্ত শহর পেরিয়ে যখন গাড়ি ধীরে ধীরে পাহাড়ি ঘুরপথে উঠতে শুরু করে, তখনই ভ্রমণকারীর মন এক অদ্ভুত উত্তেজনায় ভরে ওঠে। শহরের কোলাহল, যানজট, বাজারের ভিড়—সব যেন দ্রুত পিছনে মিলিয়ে যায়, আর সামনে এসে দাঁড়ায় প্রকৃতির এক নতুন রূপ। সেদিন বর্ষার ভেজা সকাল। আকাশে মেঘ জমে উঠেছিল অনেকক্ষণ ধরেই, কিন্তু পাহাড়ের দিকে এগোতেই সেই মেঘ যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। রাস্তার দু’ধারে ঘন সবুজ গাছ, তাদের ভেজা পাতার উপর বৃষ্টির ফোঁটা জমে চকচক করছে। গাছের গায়ে বেয়ে নামছে অদৃশ্য ছোট ছোট ঝরনা, যার শব্দ মিশে যাচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিনের গুঞ্জনে। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে দেখা যাচ্ছে ছোট গ্রাম,…
-
১ শহরের একেবারে প্রান্তে, ব্যস্ততা ও জনবসতির বাইরে যেন পৃথিবীর ভিন্ন এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরনো শ্মশান। চারদিক ঘন গাছপালা দিয়ে ঢাকা, লতাগুল্মে জড়ানো ভাঙাচোরা ঘাট, অর্ধেক ডুবে থাকা শিলাস্তম্ভ আর শেওলা ধরা সিঁড়ি—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন সময়ের হাতে পরিত্যক্ত। দিনের আলোয়ও এখানে এক অদ্ভুত গা ছমছমে পরিবেশ বিরাজ করে, আর রাতের অন্ধকারে শ্মশান হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ অন্য রূপে। বহু বছর আগে এখানে চিতা জ্বলত নিয়মিত, শবদেহ সৎকারের জন্য আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষ আসত, কিন্তু এখন অনেক বছর হলো কেউ আর এখানে শবদাহ করতে আসে না। ধীরে ধীরে জায়গাটা জনশূন্য হয়ে পড়ে, শুধু কাক, শেয়াল আর বাদুড়েরা এটিকে নিজেদের…
-
১ শহরের একেবারে প্রান্তে, ব্যস্ততা ও জনবসতির বাইরে যেন পৃথিবীর ভিন্ন এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরনো শ্মশান। চারদিক ঘন গাছপালা দিয়ে ঢাকা, লতাগুল্মে জড়ানো ভাঙাচোরা ঘাট, অর্ধেক ডুবে থাকা শিলাস্তম্ভ আর শেওলা ধরা সিঁড়ি—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন সময়ের হাতে পরিত্যক্ত। দিনের আলোয়ও এখানে এক অদ্ভুত গা ছমছমে পরিবেশ বিরাজ করে, আর রাতের অন্ধকারে শ্মশান হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ অন্য রূপে। বহু বছর আগে এখানে চিতা জ্বলত নিয়মিত, শবদেহ সৎকারের জন্য আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষ আসত, কিন্তু এখন অনেক বছর হলো কেউ আর এখানে শবদাহ করতে আসে না। ধীরে ধীরে জায়গাটা জনশূন্য হয়ে পড়ে, শুধু কাক, শেয়াল আর বাদুড়েরা এটিকে নিজেদের…
-
অর্পিতা ঘোষ অধ্যায় ১: প্রথম দেখা শ্রেয়া কলেজে নতুন ভর্তি হয়েছে কয়েক মাস হলো। সে শহরের মফস্বল থেকে এসেছে, চোখেমুখে এখনো একরকম সরলতা লেগে আছে। ক্লাসে ঢুকলেই বুক ধড়ফড় করে, আর অচেনা মুখের ভিড়ে একটু অস্বস্তি কাজ করে। তবে তার ভেতরে একটা আলাদা আত্মবিশ্বাসও আছে—পড়াশোনায় ভালো, তাই সবার থেকে আলাদা করে চোখে পড়ে। আরিয়ান সেই ক্লাসেরই পুরোনো ছাত্র, যার নাম কলেজে একরকম সুনাম কুড়িয়েছে—পড়াশোনা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবকিছুতেই তার উপস্থিতি থাকে। শ্রেয়া যখন প্রথমবার ক্লাসে ঢোকে, কেবল এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখে চোখ পড়ে। সেই ক্ষণিকের দৃষ্টি যেন নীরব প্রশ্নের মতো—“তুমি কে?” আর উত্তর দেওয়ার আগেই মুহূর্তটা মিলিয়ে যায়। কিন্তু…
-
জয়ন্ত চক্রবর্তী অধ্যায় ১ – নতুন বাড়ি অর্পিতা নতুন ভাড়া বাড়িতে ওঠার দিনটি ছিল এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতির। শহরের রাস্তায় গাড়ি, মানুষ আর চেনা ভিড়ের মধ্যে থেকে বের হয়ে নতুন ঠিকানায় পৌঁছানো, মনে একধরনের অচেনা উত্তেজনা এবং অজ্ঞাত ভয়ের সংমিশ্রণ তৈরি করেছিল। বাড়ির বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, এটি যেন এক সাধারণ, পুরনো শহরের বাড়ি—সাদা দাগ, ছেঁড়া রঙের দেয়াল, এবং অল্প গাছপালার ছায়া—কিন্তু ভেতরে ঢুকেই সবকিছু বদলে যায়। লম্বা করিডর, ফাঁকা ঘরের নিস্তব্ধতা এবং ধুলোমাখা জানালার কাচের মাঝে ধীরে ধীরে রোদ পড়া, তার মনকে এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি দিয়ে ভরিয়ে দেয়। অর্পিতা ভাড়া বাড়িতে ওঠার আগে যেমন অনেক সময় চিন্তিত…
-
দিব্যজ্যোতি দে অধ্যায় ১: জন্ম ও উদ্ভাবনা কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে, শহরের গরম ভিজে সড়ক ও গাড়ির হুংকারের মাঝে, শহরের সবচেয়ে আধুনিক ল্যাবের কাচের দেয়াল যেন আলোকিত এক পৃথক জগৎকে ঘিরে রাখে। এই ল্যাবে রাত জেগে কাজ করতেন ডক্টর ঋত্বিক মিত্র, একজন প্রখ্যাত রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞ, যিনি মানবিক আচরণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জটিলতার সঙ্গে এক নতুন সৃষ্টি গড়ে তুলতে ব্যস্ত ছিলেন। তার ল্যাবের একটি নির্দিষ্ট কোণে রাখা হয়েছিল অরুণ, রোবটটি যার জন্মদিন ছিল এই রাতের এক অনির্দিষ্ট সময়ে। অরুণকে তৈরি করতে ঋত্বিক বছরের পর বছর চেষ্টা করেছেন, কেবল তার প্রযুক্তিগত জ্ঞান নয়, বরং তার অন্তর্দৃষ্টি ও মানবিক অনুভূতিকে অরুণের “মন” তৈরির প্রক্রিয়ায় ঢোকানো…