অয়ন চক্রবর্তী ১ গ্রীষ্মের দুপুর যেন রোদে গলে যাওয়া মিছরি। দক্ষিণ কলকাতার অলি-গলি পেরিয়ে রবীন্দ্র সরোবরের ঘন ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া যেন শীতলতার অভিজ্ঞান। আজ ছিল স্কুলের শেষ দিন। আর আজ থেকেই শুরু সেই কাঙ্ক্ষিত ছুটি। তিন বন্ধু—ঋভু, সোহিনী আর আদিত্য—প্রায় রোজের মতোই দেখা করল লেকের কাছে। তাদের তিনজনের ছুটির প্রথম দিনের আড্ডা শুরু হলো পাথরের বেঞ্চে বসে পাঁপড় ভাজা খেতে খেতে। হালকা বাতাসে কদমগাছের পাতা দুলছিল, আর জলের ওপরে সূর্যের আলো রুপোর মাছরাঙার মতো লাফিয়ে পড়ছিল। ঋভু বলল, “এই লেকের নিচে যদি কিছু লুকানো থাকে রে? ধর, কোনো গুপ্তধন বা পুরনো রহস্য?” আদিত্য এক চুমুক দিয়ে বলল, “তোর গোয়েন্দাগিরির শুরু…
-
-
হিমাংশু কাকতি অসম বিশ্ববিদ্যালয়ৰ জেড হোস্টেলৰ তিন নম্বৰ ব্লকৰ চৌপাশত গভীৰ নিশাৰ নীৰৱতা জাপ মাৰি আছিল। আকাশখনত খৰাসৰা জোনাকিয়ে হোস্টেলৰ টিনৰ ছাদত মিহলি আলোকেৰে এক অব্যক্ত রহস্যৰ আবৰণ সৃষ্টি কৰিছিল। ৰুম নম্বৰ 217 ত তিনিজন বন্ধুই বহি আছিল—অভিষেক, ঋত্বিক আৰু মীম। তেওঁলোকে সদায় ৰাতিপুৱা বসি আড্ডা মাৰিছিল, চাহ খাইছিল, কেতিয়াবা বিশ্ববিদ্যালয়ৰ নৱতম গুজব বা কেতিয়াবা নিজৰ কল্পনাৰ অভিযানে মগ্ন হৈছিল। সেয়াই চলি আছিল সেই নিশাটোতেও। অভিষেক এজন চঞ্চল আৰু কৌতুহলী ছাত্ৰ, যিজনে সদায় পুরণি কিতাপ বা নথিপত্র সংগ্ৰহ কৰিবলৈ ভাল পায়। সেই ৰাতি তেওঁ পুৰণি গ্ৰন্থাগাৰৰ এটা নিলামত পোৱা ১৯৭০ চনৰ অসম বিশ্ববিদ্যালয়ৰ আনুষ্ঠানিক আলোচনীখন লৈ আহিছিল। কিতাপখনত থকা ফটোৰ…
-
শৌনক বসু ১ পুরনো দিল্লির অন্ধগলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে ড. অনির্বাণ চক্রবর্তী প্রথমবারের মতো অনুভব করল যেন সময়ের চামড়া একটু একটু করে খসে পড়ছে। চকবাজারের ঘিঞ্জি পথ, পানের দোকানের কড়া গন্ধ, আর মাটির উপরে গড়াগড়ি দেওয়া জ্যান্ত মশাগুলোর মধ্যেও কিছু ছিল, যা তাকে এই জায়গাটার দিকে ফের টেনেছিল বহু বছর পর। সে একবার এখানে এসেছিল ২০০৯ সালে, তখন সে এম.ফিল ছাত্র। আজ ২০২৫—আরও পরিণত, আরও ক্লান্ত, কিন্তু সেই পুরোনো আগ্রহটা আবার যেন জেগে উঠেছে। তার ব্যাগে ছিল পাণ্ডুলিপির মতো পুরনো এক নকশা—এক মুঘল কেল্লার অংশবিশেষ, যা কোনও সরকারি দলিলেও নেই, কিন্তু আগ্রহী কেউ কেউ বলেন, ওটা “মেহরআলী কেল্লা”—একটা হারিয়ে যাওয়া…
-
সায়ন্তনী দে গরমের সন্ধ্যা নামছিল ধীরে ধীরে। দক্ষিণ কলকাতার পুরনো লাইব্রেরিটির জানালায় আলোর রেখা এসে পড়ছিলো এক আড়ষ্ট ঢেউয়ের মতো। ঈশান বসেছিল লাইব্রেরির কাঠের ডেস্কে—একদিকে ছড়িয়ে রাখা বইয়ের স্তূপ, অন্যদিকে তার নিজের নোটবুক। চারপাশে খুব বেশি পাঠক নেই আজ, শুধু দূরের কোণায় বসে একজন মাঝবয়সী মানুষ মগ্ন হয়ে পত্রিকা উল্টাচ্ছেন। এমন শান্ত সন্ধ্যা ঈশান ভালোবাসে, যখন পৃষ্ঠার শব্দ, দূরের হকারের আওয়াজ আর রোদের ক্লান্ত আলো মিলে এক অদ্ভুত গল্প রচনা করে চারপাশে। তার চোখ হঠাৎ জানালার বাইরে গিয়ে ঠেকে। রোদের ঝলকে ধরা পড়ে এক মেয়ে—চুপচাপ দাঁড়িয়ে, লাইব্রেরির জানালার পাশেই। তার হাতে একটা পুরনো বই, “শরতচন্দ্রের উপন্যাস সমগ্র – প্রথম খণ্ড।”…
-
নীলাদ্রি দে এক হাসপাতালের বহির্বিভাগের করিডোরে হাঁটছিলেন ড. অর্ণব মুখার্জী, সবে মাত্র দুপুর গড়িয়েছে। এক হাতে কফির কাপ, অন্য হাতে মেডিকেল ফাইল। এই হাসপাতালেই তিনি রেডিওলজি বিভাগের প্রধান, গত আট বছর ধরে। সবকিছুই যেন রুটিনের মতো চলছিল, যতক্ষণ না রিসেপশন থেকে ফোন আসে—“ডাক্তারবাবু, একজন নতুন রোগী এসেছেন, বুকের ব্যথা নিয়ে, কিন্তু একটু অদ্ভুত আচরণ করছেন।” ড. অর্ণব চোখ কুঁচকে রুমে ঢুকলেন। রোগীর নাম রোহিত সেন, বয়স আনুমানিক সাতাশ-আটাশ, স্মার্ট পোশাক, চুপচাপ চোখ। প্রথমে দেখে মনে হয় না খুব গুরুতর কিছু, তবে রোহিতের চোখদুটো যেন ঘুমহীন আতঙ্কে ধকধক করছিল। প্রশ্নের জবাব দিল সংক্ষেপে—“বুকটা মাঝে মাঝে এমন টান মারে, যেন কেউ ভিতর…
-
কুহেলী ধর ১ বাড়ির বারান্দায় রোদ এসে পড়েছে। মেঘলা গামছা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে দাঁড়িয়ে রইল জানলার ধারে। নীচে প্যান্ডেলের বাঁশ বেঁধে গাঁদার মালা ঝোলানো হচ্ছে, ঢাকিরা এসেছে, ঢাকের প্রতিটা আওয়াজে যেন বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে। ঘরের ভেতরে চায়ের কাপ রাখা, তাতে ধোঁয়া উঠছে না — কারণ মেঘলা আর চা খায় না, কবে যে নিজের পছন্দের তালিকা থেকে চা নিজেই বাদ দিয়েছে, তার ঠিক নেই। বরং, স্বামী রণদীপ আর মেয়ের জন্য রোজ সময়মতো ব্রেকফাস্ট বানানোই এখন তার কাছে ‘প্রিয় কাজ’। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে আটটায় দাঁড়িয়ে, স্বামী অফিসের কথা বলে আজ একটু দেরিতে উঠেছে। মেয়েটা পাশের ঘরে অনলাইন ক্লাসে ব্যস্ত, অথচ…
-
সৌম্যজ্যোতি ঘোষাল সকালটা ছিল অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। পাখিদের কিচিরমিচির যেন কেউ কেটে নিয়েছে আকাশ থেকে। উত্তর কলকাতার বাঘবাজারের গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে রেণুকা দেবী প্রতিদিনের মতো এসে ঢুকলেন হরিপদ দত্তর বাড়িতে। পুরনো রকমের বাড়ি, মেঝের ওপর কাঠের পাটাতন, খোলামেলা বারান্দা আর লোহার গেট। হরিপদবাবু সাধারণত খুব ভোরে উঠতেন—বারান্দায় বসে জল খেতেন, আর তার পোষা শালিখ পাখি ‘কলু’-কে খাওয়াতেন। কিন্তু আজ বারান্দার দরজা খোলা, অথচ তিনি কোথাও নেই। পাখির খাঁচা পাশে ঝুলছে, কলু ঘাড় একদিকে কাত করে তাকিয়ে আছে রেণুকার দিকে, আর বলছে সেই অদ্ভুত কথাটি—”তিনটে বাজে… ও পেছনে তাকিও না!” কাঁপা কাঁপা পায়ে রেণুকা এগিয়ে গেলেন। বারান্দার কোণায়, বাঁশের চেয়ারটিতে…
-
সমীক দাশগুপ্ত ১ বারাণসীর গলির গাঢ় ধুলো, ভাঙাচোরা ঘাট আর প্রাচীন মন্দিরের শিলালিপির মাঝখানে হাঁটতে হাঁটতে অরুণাভ ক্যামেরা হাতে পৌঁছে গিয়েছিল মণিকর্ণিকা ঘাটের একটু দূরের একটি পুরনো শ্মশানে। খুব বেশি কেউ আসে না এখানে। জায়গাটির একধরনের পবিত্র ভয়াবহতা আছে—যেন কেউ নিঃশব্দে দেখছে সব, পুড়তে থাকা কাঠের ফাঁক দিয়ে, আগুনের গন্ধে মিশে থাকা পুরোনো আত্মার নিঃশ্বাসে। অরুণাভ এমনটাই খুঁজছিল। তার ফটোগ্রাফির বিষয়বস্তু বরাবরই ছিল ‘আত্মা আর দেহের অন্তরালের গল্প’। সে বলে, “জীবন নয়, মৃত্যু সত্যি, তাই আমি তাকেই দেখি।” এমন একটা কথা শুনে কেউ হেসে উড়িয়ে দিলেও, অরুণাভ নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে বেড়ায় এক নিঃসঙ্গ দর্শন — যে মৃত্যু দেখেছে, সে…
-
সমীরণ সেনগুপ্ত এক রাত বারোটার কিছু পর। কলকাতার বুক জুড়ে যেন নিঃশব্দ এক বিষণ্নতা নেমে এসেছে। গলির পর গলি পেরিয়ে ডঃ অভিজিৎ ধর এসে দাঁড়ালেন জাফরান রোডের মোড়টায়—বামদিকে একটি পুরনো, ভাঙাচোরা বাড়ির পাশে লাগোয়া সংকীর্ণ দেওয়াল, যার গায়ে ছায়ার মতো কিছু একটার টলোমলো প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হচ্ছে। চারদিক ফাঁকা, তবে বাতাস ভারী। এক অদ্ভুত চুলকানির মতো অনুভব হচ্ছে তার মস্তিষ্কের ভেতর—এমন যেন কোনও অজানা কম্পন, অতি নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে মগজকে ঘিরে ধরেছে। এই জায়গাটায় বহু বছর আগে এসেছিলেন তিনি, শেষবার স্ত্রী রীণার হাত ধরে, তখনও জানতেন না—এই নির্জন গলি একদিন তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। গলির শেষপ্রান্তে একটা হলদে আলো টিমটিম করছিল,…
-
তন্বী মিত্র ১ কলকাতার এক পুরনো দোতলা বাড়ির ছাদে বসে ঈশিতা প্রতিদিন রাত নামার অপেক্ষায় থাকে। ঘড়ির কাঁটা নয়, তার সময়টা চলে আকাশের আলো বদলের সঙ্গে। সন্ধ্যা নামার একটু পরেই যখন শহরের কোলাহল মিইয়ে আসে, আর হালকা ঠান্ডা হাওয়া এসে কানে ফিসফিসিয়ে বলে—”এবার ওঠো,” তখন সে তার কাঠের চেয়ারে বসে ছাদে এসে হাজির হয়। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি থাকে না, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত ঝিলিক খেলে যায়, যেটা শুধুই তারার আলোয় খুঁজে পাওয়া যায়। ঈশিতা জানে, সে একটা বিশেষ তারার জন্যই প্রতিদিন অপেক্ষা করে—একটা তারার যেটা প্রতিরাতে ঠিক একই জায়গায় জ্বলে, একই রকমভাবে, একইভাবে একা। তার ছাদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে…