Bangla - ভূতের গল্প

শিমুলডাঙার শাপলা ফুল

Spread the love

শশাঙ্ক মজুমদার


শিমুলডাঙা গ্রামটা যেন বাংলার অখ্যাত কোনো কোণায় লুকিয়ে থাকা এক টুকরো বিস্মৃতি। লাল মাটির আঁকাবাঁকা পথ, বটগাছের ছায়া, আর গাছগাছালির ফাঁকে মৃদু বাতাসে ভেসে আসা শিমুল ফুলের সুবাস। গ্রামের এক প্রান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন জমিদার বাড়ি। এককালে সে বাড়ির ছিল জৌলুস আর আভিজাত্য। এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ—মাছরাঙা আর পাখিদের ডেরায় পরিণত।

জমিদার বাড়ির পেছনে একটা ছোট্ট পুকুর। তার নাম শাপলা পুকুর। দিনের বেলায় জল চিকচিক করে রোদে, কিন্তু রাত নামলেই সেই পুকুরের জল কালো হয়ে যায়। বিশেষ করে অমাবস্যার রাতে পুকুরে শাপলা ফুল ফুটে ওঠে, আর গ্রামের মানুষেরা বলে—ওই শাপলা ফুলে লুকিয়ে আছে এক অভিশপ্ত আত্মা।

গ্রামের বৃদ্ধা সবিতা দাদি একসময় সেই জমিদার বাড়ির কাজের মেয়ে ছিলেন। এখন তার বয়স আশির কোঠায়, তবু শিমুলডাঙার সব গল্প তার ঠোঁটের ডগায়। তিনি বলতেন—

—”ওই শাপলা পুকুরে রাত নামলে কেউ যাবে না। শাপলা ফুল ছুঁলেই ঘোর অমঙ্গল।”

কিন্তু গ্রামের ছেলেপুলেরা দাদির কথায় হাসি দিত। বিশেষ করে বকুল।

বকুল ছিল চঞ্চল আর সাহসী। সে বিশ্বাস করত না ভুত-প্রেতের গল্প। বন্ধুরা যখন দাদির ভয়ানক গল্প শুনে শিউরে উঠত, বকুলের চোখে দেখা দিত কৌতূহল। সে বলত—

—”ওসব কিচ্ছু না। সব বুজরুকি। আমি প্রমাণ করে দেখিয়ে দেব, শাপলা তুললেই কোনো বিপদ হয় না!”

সেদিন ছিল আষাঢ়ের এক অমাবস্যা। দিনের আলো ঢলে পড়েছিল। মেঘে ঢাকা আকাশে চাঁদের দেখা নেই। বকুল আর তার বন্ধুরা মাঠে বসে গল্প করছিল। হঠাৎ বকুল উঠে দাঁড়াল—

—”আজ রাতেই আমি ওই শাপলা তুলে দেখাব। তোমরা দেখবে কিছুই হবে না!”

বন্ধুরা আঁতকে উঠল। অমাবস্যার রাত। বাতাসে যেন অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ। বকুলের বন্ধু পল্টু বলল—

—”পাগল হোস? দাদি তো বারবার বারণ করেছে।”

—”দাদি বুড়ি হয়েছে। তার সব কথাই গুজব,”—বকুল বলল, চোখে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হল। আকাশে তারার আলো নেই। শুধু কুপি লণ্ঠনের আলোয় আলপথ দেখা যায়। বকুল হাতে ছোট্ট একটা বাঁশের লাঠি আর লণ্ঠন নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোল। মায়ের কণ্ঠে দুশ্চিন্তার ছায়া—

—”বাবা, অমাবস্যায় কোথায় যাচ্ছিস?”

—”বন্ধুদের সাথে একটু পুকুরপাড়ে যাব। ভয় নেই মা।”

বকুলের মায়ের মুখের ভাব বলছিল, সে ভয় পেয়েছে। তবু ছেলেকে আটকাতে পারল না।

পথের ধারে বুড়ো বটগাছ। বাতাসে শিস দিয়ে ওঠে, যেন অদৃশ্য কারও শ্বাস। বকুল একাই এগিয়ে চলে। গ্রামের প্রাচীন মন্দির পেরিয়ে সে পৌঁছায় শাপলা পুকুরের ধারে। পুকুরপাড়ে মাটির ঢিবি, আর তার ওপরে শেওলাপড়া ঢেউ। লণ্ঠনের আলোয় জল রূপালি দেখায়।

বকুলের বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হলেও সে ভাবল—

“না, আমি ভয় পেলে হবে না। শাপলা ফুল ছুঁয়ে বন্ধুরা আর দাদিকে দেখিয়ে দেব—সব গল্প মিথ্যা!”

পুকুরের ধার ঘেঁষে নেমে গেল বকুল। ঠাণ্ডা বাতাসে পুকুরের জলে কাঁপুনি। হঠাৎ একপাশে সাদা শাড়ি পরা এক মেয়ের ছায়ামূর্তি দেখা গেল। চুল ভিজে গায়ে লেপ্টে আছে। সে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বকুলের দিকে।

—”কে ওখানে?”—বকুল কাঁপা গলায় ডাক দিল।

কোনো উত্তর নেই।

সে ভাবল—”ভুল দেখছি।” কিন্তু মেয়েটি স্থির দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ করুণ কণ্ঠে বলে উঠল—

—”আমায় ছুঁবে?”

বকুল ভয়ে পেছনে সরে গেল। লণ্ঠনের আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেল—মেয়েটির চোখ থেকে জল ঝরছে, কিন্তু তার পায়ের ছায়া নেই। পুকুরের শাপলার ওপর ভেসে আছে তার পদচিহ্ন।

—”কে… কে তুমি?”—বকুল আবার ডাক দিল।

—”আমি তোর মায়ের পাপ।”

এ কথা শুনে বকুলের গলা শুকিয়ে এল। সে জানত না, তার মা একসময় এই পুকুরে কী করেছিল। সে জানত না, এই পুকুরের শাপলা ফুল কেবল ফুল নয়—ওতে লেগে আছে অমাবস্যার অভিশাপ।

অধ্যায় ৩: দাদির পাপের ছায়া

পুকুরপাড়ের বাতাস কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। বকুলের কাঁধে লণ্ঠনটা ভারী মনে হচ্ছিল। মেয়েটি কাঁপা গলায় আবার বলল—

—”আমি তোর মায়ের পাপ… তোর দাদির পাপের ধারাবাহিকতা…”

বকুল থমকে গেল।

—”দাদির পাপ? কেমন পাপ? দাদি তো সবসময় আমাদের ভালোর জন্যই বলে!”

মেয়েটির চোখ থেকে তখন রক্তঝরা অশ্রু ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ছিল। সে ফিসফিস করে বলল—

—”আমি ছিলাম দাদির মেয়ে। লোকলজ্জার ভয়ে আমাকে অমাবস্যার রাতে এই পুকুরে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল… সেই থেকে আমি এই শাপলার মধ্যে আটকে আছি…”

বকুলের মনে তখন ঢেউ তুলছিল শিউরে ওঠা ভয় আর কৌতূহল। সে চিৎকার করে বলল—

—”তুমি কি ভূত? নাকি দাদির কল্পনা?”

মেয়েটি কষ্টের হাসি হেসে বলল—

—”আমি এখন আর মানুষ নই। পাপের আত্মা… শাপলা ফুলে আমার নিঃশ্বাস লেগে আছে। অমাবস্যার রাতে পাপের গন্ধে আমি জেগে উঠি…”

একইসঙ্গে পুকুরের জল ঢেউ খেলাতে খেলাতে ফেনা উঠল। শাপলার পাপড়ি ফেটে বেরিয়ে এল কঙ্কালসার হাত। সেই হাতগুলো বাতাসে নড়ছে, যেন কারো শ্বাসরোধ করতে আসছে। বকুল চিৎকার করে পেছাতে গিয়ে পা পিছলে পুকুরের জলে পড়ল।

তারপরেই চোখের সামনে দাদিকে দেখতে পেল সে। দাদির চোখ লাল, ঠোঁট কাঁপছে।

—”বকুল! ও পুকুরে যাবি না! আমি অনেক বড় পাপ করেছিলাম… তুই যা!”

কিন্তু বকুল উঠতে পারল না। সেই কঙ্কালসার হাতগুলো তাকে ঘিরে ফেলল। দাদির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বাতাসে শোনা গেল সেই আত্মার কান্না—

—”মা… আমাকে কেন ফেলে গিয়েছিলে? আজও আমি তোমাকে খুঁজছি।”

দাদির চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াল। সে বলল—

—”মা… আমাকে ক্ষমা করে দে। আমি মানুষ হতে গিয়ে অমানুষ হয়েছিলাম। সমাজের ভয়ে… নিজের ইজ্জতের ভয়ে তোকে মেরে ফেলেছিলাম।”

পুকুরের পাড়ে তখন গ্রামের কয়েকজন মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। তাদের চোখের সামনে সবিতা দাদি হাতজোড় করে পুকুরের দিকে কাঁদছে।

—”মা… আমি পাপ করেছি… আমাকে ক্ষমা কর!”

একসময় দাদির গলার স্বর ভেঙে গেল। বাতাসে শোনা গেল মেয়েটির ফিসফিস—

—”তাহলে আমাকেও বাঁচিয়ে দাও… আমাকে পাপমুক্তি দাও!”

দাদির চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে লাগল। পুকুরের শাপলা ফুলগুলো লাল হয়ে উঠল। আর তার মধ্যে থেকে মেয়েটির মুখ যেন ফুটে উঠল—চোখে করুণ আহ্বান।

বকুল তখনো জলে পড়ে কাঁপছে। পুকুরের জল ক্রমশ লাল হচ্ছে। সেই লালজল যেন শাপলার পাপড়ি বেয়ে বকুলের দিকে ধেয়ে আসছে। বকুল চেষ্টা করল উঠতে, কিন্তু শিকড়ের মতো শাপলার ডাঁটা তার পা জড়িয়ে ধরেছে।

দাদি আর এক পা এগিয়ে এসে পুকুরের ধারে বসে পড়লেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন—

—”মা… তোর জন্য আমি এবার সব ছেড়ে দিতে রাজি। আমায় নিয়ে যা।”

ঠিক তখনই বাতাসে ভয়ঙ্কর ঝড়ের মতো শব্দ—শিমুলডাঙার আকাশ আলো করে উঠল। পুকুরের মধ্য থেকে আগুনের মতো আলো ছিটকে বেরিয়ে এল। সেই আলো দাদির গায়ে লাগতেই দাদির চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। তার ঠোঁট নীল হয়ে এলো।

—”দাদি!”—বকুল চিৎকার করল।

কিন্তু তখন দাদির মুখে এক অদ্ভুত শান্তির ছাপ। সে ফিসফিস করে বলল—

—”বকুল, দেখ, আমি ওকে ফিরিয়ে আনতে পারিনি… আমায় ওর কাছে যেতে হবে। ওর অভিশাপ থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই… তুই এখনই পালা!”

এরপরেই পুকুরের শাপলার পাপড়ি দিয়ে তৈরি হাতগুলো দাদির চারপাশে লতিয়ে ধরল। সেই হাতগুলো ধীরে ধীরে দাদিকে টেনে নিল পুকুরের গভীরে। দাদির আর্তনাদ ভেসে এল—

—”বকুল! আমাকে ক্ষমা করিস রে!”

বকুল চোখের সামনে দেখল দাদির লণ্ঠন নিভে যাচ্ছে। পুকুরের জল কালো হতে হতে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু শাপলা ফুলের পাপড়িগুলো লালচে আভায় আলো ছড়াচ্ছে।

—”দাদি…!”—বকুল ফিসফিস করে উঠল।

গ্রামের লোকজন পেছন থেকে বকুলকে ধরে ফেলল। তাদের চোখে ভয়ের ছায়া। বুড়ো প্রহ্লাদ কাকা কাঁপা গলায় বলল—

—”বাবা, তোর দাদি পাপের খেসারত দিয়ে গেল। তুই এ পুকুর থেকে দূরে থাক। না হলে ও তোরও ক্ষতি করবে!”

বকুলের চোখে জল, কণ্ঠ রুদ্ধ। পুকুরের শাপলা ফুলগুলো ধীরে ধীরে আবার সাদা হয়ে উঠছে। বাতাসে সেই মেয়েটির কান্নার আওয়াজ মিলিয়ে যাচ্ছে।

বকুল গ্রামের মানুষদের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল—কেউ আর স্বাভাবিক নেই। সবার মুখে আতঙ্ক, কপালে ভাঁজ, চোখেমুখে শিহরণ। পুকুরপাড়ে অন্ধকার যেন ঘনিয়ে এসেছে, আর বাতাসে এক ধরনের পচা শাপলার গন্ধ ভাসছে।

প্রহ্লাদ কাকা কাঁপা গলায় বলল—

—“বকুল, তোর দাদি ওর পাপের খেসারত দিয়ে গেল। এ পুকুরের অভিশাপ ভাঙা মানুষের সাধ্যের কথা নয়। তুই বাঁচতে চাইলে শিমুলডাঙা ছেড়ে চলে যা।”

কিন্তু বকুলের চোখে তখন দাদির কান্না আর সেই মেয়েটির শূন্য চাহনি ভাসছে। সে ফিসফিস করে বলল—

—“না কাকা, আমি এখানেই থাকব। দাদির পাপ যদি আমাকে না ছুঁয়েও থাকে, তবে ওর শান্তি এনে দেব আমি। পাপকে পুকুরে বেঁধে রাখা আর কতদিন?”

এ কথা শুনে গ্রামের বৃদ্ধ শ্যামল কাকা বললেন—

—“শোন বকুল, ওই শাপলা পুকুরে যে পাপ বাসা বেঁধেছে, তা শুধু তোর দাদির পাপ নয়। জমিদার বাড়ির ভেতরের গোপন ইতিহাসও এর পেছনে আছে। এ গ্রামের অজস্র অমাবস্যা পেরিয়ে এসেছে শাপলার রক্তঝরা গল্প।”

বকুলের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।

—“কি গল্প? বলো কাকা। সব কিছু জানতেই হবে আমাকে।”

শ্যামল কাকা চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর পুকুরের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—

—“এই জমিদার বাড়িতে অনেক কাল আগে রাজনারায়ণ বসু থাকতেন। তিনি ছিলেন অত্যাচারী। গরিব মেয়ে, কাজের মেয়ে, যার চোখে পড়ত তাকেই… খুবই অমানবিক কাজ করত। এক রাতে—অমাবস্যার রাতে—তিনি তোমার দাদিকে লুকিয়ে সেই মেয়েটিকে গর্ভবতী করে দেন। লোকলজ্জায় তোর দাদি তখন মেয়েটিকে এই পুকুরে ফেলে দেয়। তখন থেকেই ওর আত্মা এখানে শাপলার ভেতর বেঁচে আছে। ওই রাতেই ও মরে গিয়েছিল।”

বকুল বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল—

—“তাহলে ও মেয়েটি আমার দাদির বোনের মতো? আর সেই আত্মাই দাদিকে ধরে টেনে নিয়ে গেল?”

শ্যামল কাকা মাথা নিচু করে বললেন—

—“হ্যাঁ, ঠিক তাই। ও তোকে ছাড়বে না, বকুল। তোর রক্তে ওই পাপ আছে।”

বকুলের গায়ে তখন কাঁটা দিয়ে উঠছে। পুকুরের দিকে তাকিয়ে সে দেখল, পুকুরের জলে শাপলার পাপড়িগুলো লালচে আভায় জ্বলছে। মনে হচ্ছে, কারা যেন নিচ থেকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে।

—“তবু আমি ওর শান্তি চাই। ওই পাপ মোচন করতে চাই,”—বকুল দৃঢ় কণ্ঠে বলল।

—“তাহলে তোর জন্য একটাই রাস্তা আছে,”—শ্যামল কাকা বললেন,—“শিমুলডাঙার কুলগাছের নিচে থাকা অশ্বত্থতলায় এক প্রাচীন ব্রাহ্মণ ছিলেন, তার নাতি রামলোচন এখন তন্ত্রসাধনা করে। ওর কাছেই যেতে হবে। ওর কাছে শাপলার পাপমুক্তির উপায় জানতে হবে।”

বকুল সেদিন রাতেই রওনা দিল রামলোচনের বাড়ির দিকে। গ্রামের শেষপ্রান্তে অন্ধকার রাস্তা, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর মাঝে মাঝে শেয়ালের ডাক কানে আসছিল। রামলোচনের কুঁড়েঘরের সামনে এসে সে দাঁড়াল। ভেতরে মোমবাতির আলো। দরজায় টোকা দিতেই দরজা খুলে গেল।

রামলোচন চোখ তুলে তাকাল—লম্বা জটা, কপালে ভস্মের ছাপ, লালচে চোখ।

—“কে?”

—“আমি বকুল। আমার দাদিকে শাপলা-পুকুরে ডুবিয়ে নিয়েছে ওর মেয়ের আত্মা। আমি ওর পাপমুক্তি চাই।”

রামলোচন গম্ভীর স্বরে বললেন—

—“ছেলে, ওই পুকুরের পাপ শিকড় ছড়িয়েছে। শুধু দাদির পাপ নয়—পুরো শিমুলডাঙার পাপ। জমিদার বংশের পাপও ওখানে। ওকে মুক্তি দিতে হলে নিজের রক্তের সিঁদুর ঢালতে হবে। শাপলার পাপড়ির ওপর নিজের রক্ত ছুঁইয়ে দিতে হবে। তাহলেই আত্মা শান্তি পাবে।”

বকুল কেঁপে উঠল। নিজের রক্ত! তবু তার মনে হল—এ ছাড়া আর উপায় নেই।

—“আমি রাজি আছি,”—সে বলল দৃঢ় গলায়।

রামলোচন তখন এক পেতলের পাত্রে তেল ভরে শঙ্খদ্বীপ জ্বালিয়ে দিলেন। তারপর বললেন—

—“তাহলে অমাবস্যার রাতেই শাপলা-পুকুরে যা। নিজের রক্ত ছুঁইয়ে বলবি—‘হে আত্মা, আমি তোমার রক্তের ঋণ শোধ করতে এসেছি। আমাকে শান্তি দাও, তোমায় মুক্তি দিচ্ছি।’ তখন দেখবি আত্মা শান্তি পাবে।”

বকুল সেদিন রাতেই প্রস্তুতি নিল। অমাবস্যার রাত, মেঘলা আকাশ, পুকুরপাড়ে বাতাস কাঁপছে। হাত কেটে রক্ত বের করে পুকুরপাড়ে শাপলার পাপড়িতে ছুঁইয়ে দিল বকুল।

—“হে আত্মা! আমি তোমার রক্তের ঋণ শোধ করতে এসেছি! আমাকে শান্তি দাও, তোমায় মুক্তি দিচ্ছি!”

পুকুরের জলে হঠাৎ কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠল। শাপলার পাপড়ি ফেটে বেরিয়ে এল সেই মেয়েটির মুখ। কষ্টের কান্না ভেসে এল—

—“মা… মা… আমাকে মুক্তি দিচ্ছিস?”

বকুল ফিসফিস করে বলল—

—“হ্যাঁ, মা, দাদির পাপ আর জমিদারের পাপ একসাথে ধুয়ে ফেলতে চাই। তোমার জন্যই সব করছি।”

মেয়েটির মুখ থেকে তখন সাদা আলো বেরিয়ে আসছে। শাপলার পাপড়িগুলো রক্তিম আভায় জ্বলছে। পুকুরের জল ফেটে অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়ছে।

মেয়েটি বলল—

—“তাহলে শিমুলডাঙা রক্তমুক্ত হবে। আমাকে ভালোবাসিস?”

বকুলের গলায় কাঁপুনি—

—“ভালবাসি, মা।”

সঙ্গে সঙ্গে পুকুরের জল শান্ত হয়ে গেল। পাপড়ির রক্তিম আভা মিলিয়ে গেল। সেই মেয়েটির মুখও অদৃশ্য। শিমুলডাঙার বাতাসে যেন শান্তির শ্বাস বয়ে গেল।

শিমুলডাঙার আকাশে তখন পূর্ণিমার আলো। অমাবস্যার ঘন অন্ধকার কেটে গিয়ে আকাশে ঝকঝকে চাঁদ উঠেছে। পুকুরপাড়ে বকুল একা বসে আছে। তার কপাল থেকে রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে। পুকুরের শাপলার পাপড়িগুলো এখন ধবধবে সাদা।

সন্ধ্যা থেকে রাত, রাত থেকে ভোর—সময় যেন থমকে গেছে। বকুলের মনে পড়ছে দাদির কান্না, সেই মেয়েটির ফিসফিস করা স্বর—“মা… আমাকে মুক্তি দাও…”

ভোরের কাক ডাকার শব্দ কানে আসতেই পুকুরের জল হঠাৎ কাঁপল। শাপলার পাপড়ি ফেটে বেরিয়ে এল এক মৃদু সোনালি আলো। সেই আলো ধীরে ধীরে জলের উপর ভাসতে ভাসতে বকুলের দিকে এগিয়ে এল।

বকুল চমকে উঠল। আলোর ভেতর থেকে সেই মেয়েটির মুখ যেন মায়াবী হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে।

—“বকুল… আমি মুক্তি পেয়েছি…”

বকুলের চোখ ভিজে উঠল। কাঁপা গলায় বলল—

—“তুমি শান্তি পেলে তো? আর কাউকে কষ্ট দেবে না তো?”

মেয়েটির মুখ থেকে তখন সাদা পাখির মতো আলো বেরিয়ে এসে আকাশের দিকে উড়ে গেল। পুকুরের জলে তখন শুধু সাদা শাপলা ভাসছে। বাতাসে মিষ্টি সুগন্ধ।

—“দাদির পাপ আর জমিদারের পাপের শিকড় ছিঁড়ে গেছে,”—বকুলের মনের ভেতর থেকে একটা ভার নেমে গেল।

সে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। বাড়ির উঠোনে এসে দেখল, প্রহ্লাদ কাকা, শ্যামল কাকা, গ্রামের আরো কিছু মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে ভয় আর কৌতূহলের মিশ্র ছাপ।

প্রহ্লাদ কাকা এগিয়ে এসে কাঁপা গলায় বলল—

—“বকুল, তুই বাঁচলি বাবা! শাপলার পাপ থেকে শিমুলডাঙা মুক্তি পেলে!”

বকুল হাসল।

—“হ্যাঁ কাকা, ও মেয়েটি এবার শান্তি পেয়েছে। দাদির পাপও ধুয়ে গেছে। পুকুরের শাপলা আর কাউকে ডাকবে না।”

গ্রামের মানুষের চোখে তখন এক ধরনের কৃতজ্ঞতার ছাপ। বাতাসে পাখির ডাক ভেসে এল। সকালের আলোয় পুকুরপাড় স্নিগ্ধ রূপে ধরা দিল।

বকুল মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। পুকুরের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলল—

—“দাদি, আমি তোমায় মাফ করে দিলাম। তুমি এবার শান্তি পেয়ে থাকো।”

দূরে পুকুরের জলে শাপলার পাপড়িগুলো হাওয়ায় দুলতে দুলতে যেন হাসছিল। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে যাচ্ছিল।

শ্যামল কাকা বলল—

—“বকুল, এই পুকুরের গল্প এখন শেষ হলো। কিন্তু তোর মতো সাহসী ছেলে না থাকলে আমাদের বাঁচানো যেত না।”

বকুলের চোখে তখন নতুন ভোরের স্বপ্ন।

—“না কাকা, এটা শুধু আমার নয়—ও মেয়েটির মুক্তির গল্প, দাদির পাপমোচনের গল্প আর আমাদের গ্রামের ন্যায়বিচারের গল্প।”

তখনই বাতাসে বকুলের কানে এল এক মিষ্টি কণ্ঠস্বর—

—“বকুল… ধন্যবাদ…”

সে চমকে তাকিয়ে দেখল, পুকুরের ওপারে এক সাদা শাড়ি পরা মেয়ের অবয়ব হাত নাড়ছে। তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল সকালের রোদের মধ্যে।

শিমুলডাঙা পুকুরপাড়ে আর কোনো শাপলার রক্তজবা ফুটল না। গ্রামের মানুষজন শান্তিতে বসবাস শুরু করল। পাপমোচনের সেই রাতে শিমুলডাঙা পেল নতুন সূর্যোদয়। আর বকুল?

সে রোজ সকালে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে, বাতাসে ভেসে আসা শাপলার সুবাসে দাদির আর সেই মেয়েটির জন্য একরাশ প্রার্থনা করে।

—“যেন আর কখনো কোনো মেয়েকে পাপের পাঁকে ডোবাতে না হয়…”

বকুলের চোখে তখন সাহসের আলো। শিমুলডাঙা তার সাহসী বকুলকে নিয়ে গর্বিত।

শেষ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

1000022857.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *