অরুণিমা দাস
শহরের উত্তাপে ভরা সেই ছোট্ট রাস্তাটি যেন আজ একটু অন্যরকম লাগছিল। সূর্য যখন অর্ধেক আকাশে উঠেছে, তখনও গলির পাশে একদম শান্ত এবং একাকী এক পরিবেশ বিরাজ করছিল। ধোঁয়াশা যেন ধীরে ধীরে গলির পেছনে মিশে যাচ্ছিল আর বাতাসে একটা হালকা আর্দ্রতা।
মেহেদী পাড়া, কলকাতার একটি পুরনো ও ক্ষীণ পাড়া। পাড়ার অনেকগুলো ঘর পাকা নয়, বেশিরভাগই ইটের চালা দিয়ে তৈরি এবং পাঁজর আর নীচে রাখা সিঁড়ির পাশ দিয়ে মাটি ফুটে উঠেছে। গলির কোণে ছোট্ট পুকুরটা আজও শান্ত, তবে তার পাশ দিয়ে ছুটে চলা পাখির ডাক আজ যেন কিছুটা ম্লান। পাড়ার বাসিন্দারা সকালবেলার কাজে ব্যস্ত হলেও কেউ যেন আজ একটু কম হাসছিল। পাড়ার মোড়ে এক অতি সাধারণ ও ছোট্ট ঘরে বসে ছিল রিনা। দশ বছর বয়সী এই মেয়েটি স্কুল থেকে ফিরে কিছু একটা চিন্তা করছিল, যেন তার মনের ভেতরে কোনো বড় চাপ বাসা বেঁধেছে। রিনার মা রান্নাঘরের পাশে ঝাঁপিয়ে ছিল রান্নার কাজে, মাঝে মাঝে বাচ্চাটার দিকে চোখ বুলিয়ে বলছিল, “কেন, আজ এত চুপচাপ? স্কুলে কিছু হলো নাকি?”
রিনা ধীরে ধীরে উঠে বসল। “না মা, কিছু না।” কিন্তু মায়ের সন্দেহ কাটল না।
মা বসে রিনার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “বল তো, কী ভাবছিস?”
রিনা গিলগিল করে বলল, “মা, আমাদের পাড়ায় সবাই যেন একদম দূরে দূরে। আগে তো সবাই একসাথে খেলত, কথা বলত, এখন সবাই নিজের মোবাইলে ব্যস্ত। কেউ কাউকে চিনেও না। এটা ঠিক না, তাই না?”
মা একটু চিন্তিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ বউ, সত্যি কথা বললি। যুগ বদলেছে, মানুষ বদলেছে। কিন্তু সেটা কি আমরা বুঝতে পারিনি? না বুঝলে তুই এখনই বুঝলে ভালো।”
রিনার মনের ভেতর একটা ঝলকানি ধরল। সে ঠিক করল, সে এই ভাঙা সম্পর্ক গুলো ফেরত নিয়ে আসবে। সে জানত, ছোট্ট একটা কাজ বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
পরদিন সকালে রিনা স্কুল থেকে ফিরে এসে বসল তার ছোট্ট টেবিলের সামনে। তার হাতে ছিল রঙিন কাগজ আর পেন্সিল। সে কাগজে বড় বড় করে লিখল, “আমাদের পাড়া, আমাদের শক্তি।”
তারপরে সে লিখল, “একসাথে মিলিত হয়ে পাড়ার সমস্যা সমাধান করি। চল সবাই হাত মেলাই।”
পাড়ার বড়দের সামনে গিয়ে সে বলল, “চলো সবাই মিলে পাড়ার ছোট্ট বাগান পরিষ্কার করি, গাছ লাগাই, একসাথে থাকি।”
শুরুতে অনেকেই অস্বীকৃতি জানালেন, “আমরা তো ব্যস্ত, সময় কোথায়?”
কিন্তু রিনা তার ছোট্ট হাসি দিয়ে বলল, “একদিন, এক ঘণ্টা—এতটুকু তো সবাই দিতে পারে।”
তার কথা শুনে ধীরে ধীরে অনেকেই রাজি হলেন। পরের শনিবার সকালের আলো উঠতেই পাড়ার মানুষজন একত্রিত হলেন। সবাই হাত লাগালেন বাগান পরিষ্কারে। কেউ ঝাড়ু ধরল, কেউ গাছের চারাগুলো পানি দিল, কেউ হাসি দিয়ে বলল, “পুরোনো দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে।”
ছোট ছোট বাচ্চারা খেলতে খেলতে সেই বাগানে এলেন। রিনা তাদের সামনে ফুলের চারা লাগাল আর বলল, “এটা আমাদের নতুন শুরু।”
দিনশেষে পাড়ার অনেকেই বুঝতে পারলেন, ছোট ছোট কাজের মাঝেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মনুষ্যত্ব আর মানুষের সঙ্গে মমত্বের সম্পর্ক আবার গড়ে উঠছে। রিনার মা সন্ধ্যায় এসে বললেন, “তুই সত্যিই বড় মেয়েটি, রিনা। তোর জন্যই হয়তো আমাদের পাড়া আবার জেগে উঠছে।”
রিনা হাসি দিয়ে বলল, “আমরা সবাই যদি একসাথে থাকি, তবে সবই সম্ভব।”
সপ্তাহের প্রথম রোদেলা সকাল। মেহেদী পাড়ার ছোট্ট বাগানটিতে সূর্যের কিরণ পড়ে দেদার আলো ছড়াচ্ছিল। গত সপ্তাহ থেকে পাড়ার লোকজন এখানে এসে একত্রিত হয়ে কাজ করছিল। বাগানটি ছিল তাদের ছোট্ট স্বপ্নের পরিচয়। যেখানে তারা একসাথে কিছু সময় কাটাবে, খুশি হবে, আর একে অপরের কাছে এসে যাবে। সেই সকালটিতে রিনা আর তার মা আগেই পৌঁছে গিয়েছিল বাগানে। রিনার হাতে ছিল নতুন নতুন গাছের চারা, আর তার চোখে জ্বলে উঠেছিল আনন্দের ঝিলিক। আজকের দিনটা ছিল বিশেষ, কারণ পাড়ার সবাই প্রথমবারের মতো একসাথে কাজ করছে।
“মা, দেখো তো, কত সুন্দর হল,” রিনা বলল, ফুলের গাছের দিকে ইঙ্গিত করে।
রিনার মা হাসলেন, “তুই সত্যিই অনেক বড় মেয়ে হয়ে উঠছিস, বাচ্চা। তোর চিন্তাভাবনা পাড়াকে একত্রিত করছে।”
শুরুতেই সবাই ছিল একটু দ্বিধাগ্রস্ত। অনেকেই ভাবছিলো, এই কাজ কি চলবে? কেউ কেউ বলছিলো, “একটা বাগান পরিষ্কার করার চেয়ে বড় সমস্যা তো আমাদের কাছে আরও অনেক।” কিন্তু ধীরে ধীরে সবাই বুঝতে শুরু করল, ছোট্ট একটা কাজ থেকেই বড় পরিবর্তন শুরু হয়। আব্দুল দাদা, যিনি পাড়ার সবচেয়ে বড় মানুষ, হাত বাড়িয়ে বললেন, “দেখো, ছোট ছোট কাজই আমাদের এক করে। আগে এই পাড়ায় আমরা একসাথে বসে গল্প করতাম, এখন সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত। আসো, আমরা সবাই একটু সময় দেব।”
স্কুলের শিক্ষক মিসেস শর্মা বললেন, “এই বাগানটা শুধু গাছ লাগানোর জায়গা নয়, এটা হবে আমাদের নতুন মিলনস্থল।”
পাড়ার কিছু যুবকও এসেছিল। তারা ঝাড়ু ধরছিলো, মাটি খুঁড়ছিলো। ছোট্ট শিশুরাও হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছিলো। হাসি আর আনন্দের মিশ্রণে বাগানটির চেহারা বদলাতে লাগল। দিনের বেলা গরম বাড়ছিলো, কিন্তু কেউ ক্লান্ত হয়নি। রিনা মাঝে মাঝে তাদের জন্য ঠান্ডা জল নিয়ে আসত, আর সবাই তাকে ভালোবেসে ডাকত।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বাগানের পাশে একটি ছোট্ট সভা হল। সবাই একত্রে বসে ভাবলো কীভাবে পাড়ার সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করা যায়।
রিনার মা বললেন, “আমরা সবাই মিলে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করব, আর স্কুলের বাচ্চাদের জন্য একটা ছোট পাঠাগার খুলতে পারি।”
আব্দুল দাদা হাসলেন, “হ্যাঁ, আর মেয়েরা আর ছেলেরা মিলে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করতে পারে।”
সবাই উৎসাহিত হলো। তারা ঠিক করল পরবর্তী সপ্তাহে সবাই মিলে পাড়ার রাস্তা পরিষ্কার করবে, আর মাসে একবার সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা করবে। রিনা খুব খুশি হল। সে ভাবল, তার ছোট্ট কাজ পাড়ার মানুষের মধ্যে একটা ভালোবাসার বীজ বপণ করেছে। তবে পাড়ায় এখনও অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। কেউ কেউ এখনও একে অপরকে ভালো চোখে দেখে না, ভুল বোঝাবুঝি আছে, আর আগের মত বন্ধুত্ব ফিরে আসেনি।
রিনার মনে হল, এই কাজ শুরু হলো শুধু প্রথম ধাপ। এখন আসল পরীক্ষা শুরু হবে — কিভাবে তারা তাদের নতুন বন্ধুত্বকে ধরে রাখতে পারবে। সন্ধ্যা নামল, আর রিনা বাড়ির ছাদে বসে তার মায়ের সাথে আলোচনার সময় বলল, “মা, আমরা একসাথে থাকলে অনেক কিছু সম্ভব। আমি চাই আমাদের পাড়ায় আবার সেই পুরনো সময় ফিরে আসুক।”
মা হাত ধরে বললেন, “হ্যাঁ, বাচ্চা, আর তুই সে আলো চালিয়ে যা।”
রিনা জানত, যে আলো শুধুই তার নয়, পুরো পাড়ার। আর সে সেই আলোকে গড়ে তুলবে।
মেহেদী পাড়ার সেই নতুন আলোটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। পাড়ার মানুষজন এখন একসঙ্গে কিছু সময় কাটানোর অভ্যাস করতে শুরু করেছিল। বাগানটি শুধু গাছ লাগানোর জায়গা নয়, তাদের মিলনের আসর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সবকিছু এত সহজে সমাধান হয়নি।
একদিন বিকেলে, বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে রিনা আর তার মা দেখতে পেলেন দুজন প্রতিবেশী মাঝেমাঝে কথা কাটাকাটি করছে। তারা ছিল দুই পরিবারের প্রধান—মোহন দাদা আর রামপ্রসাদ চাচা। তাদের মাঝে অনেক দিনের যমজ ঝগড়া ছিল। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে তারা একে অপরকে টেনে টানতে শুরু করল।
রিনা মায়ের হাত শক্ত করে বলল, “মা, কেন সবাই একসাথে থাকতে চায় না?”
মা একটু বিষণ্ণ হয়ে বললেন, “মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি খুব সহজে হয় বাচ্চা। কিন্তু মনের মধ্যে যদি ভালোবাসা থাকে, তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়।”
রিনা ভাবতে লাগল, সে কীভাবে মোহন দাদা আর রামপ্রসাদ চাচার মন জয় করবে? সে বুঝল, শুধু কাজ করা আর হাত মেলানোই যথেষ্ট নয়, মানুষের হৃদয়েও পুল তৈরি করতে হবে।
পরদিন স্কুল থেকে ফিরে রিনা বাগানে গিয়ে মোহন দাদা আর রামপ্রসাদ চাচার সামনে দাঁড়াল। সে বিনয়ের সঙ্গে বলল, “দাদা, চাচা, আমি জানি আপনাদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কিন্তু আমরা সবাই পাড়ায় একসঙ্গে সুখে থাকতে চাই।”
মোহন দাদা একটু কঠোর মৃদু স্বরে বললেন, “রিনা, আমরা বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করি না। বড়রা বড়দের মতোই সমস্যার মুখোমুখি হয়।”
রিনা নির্ভয়ে বলল, “আমি জানি দাদা, কিন্তু যদি আমরা একসঙ্গে বসে কথা বলি? হয়তো আমরা ভুল বুঝেছি।”
রামপ্রসাদ চাচাও মন থেকে কিছু বললেন, “হয়তো রিনা ঠিক বলছে। আমরা চেষ্টা করব।”
সেই সন্ধ্যায় পাড়ার সবাই মিলে বসে সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে শুরু করল। তাদের মনে হল, কথা বললে অনেক কিছু সহজ হয়। রিনার ছোট্ট উদ্যোগ একটা বড় পরিবর্তনের সূচনা করল। ভাঙা হৃদয়ের মাঝেও মিলনের আশা জেগে উঠল।
সেই রাত রিনা ঘুমোতে গিয়ে ভাবল, “যদি সবাই একটু মন খুলে কথা বলতো, অনেক বেশি ভাল হতো।”
তারপর ঠিক করল, আগামীদিন থেকে সে ছোট ছোট গ্রুপে পাড়ার মানুষজনের সঙ্গে মিলিত হবে, তাদের সমস্যাগুলো বুঝবে আর একসাথে সমাধানের পথ খুঁজবে।
মেহেদী পাড়ার সকালের রোদে আজ যেন এক অন্য রকম গন্ধ ভেসে আসছিল। বাগানের চারপাশে ছোট ছোট হাসি, কথাবার্তা আর হাত মেলানোর দৃশ্য ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পাড়া ছেয়ে গেছে নতুন এক চেতনার আলোয়, যেখানে পুরনো কাঁটাতার ভেঙে গেছে নতুন বন্ধুত্বের সেতু দিয়ে।
আজ ছিল পাড়ার প্রথম সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার দিন। রিনা আর তার বন্ধু শুভম সন্ধ্যার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। তারা তৈরি করেছিল হাতে বানানো পোস্টার, যেখানে লেখা ছিল, “আমাদের পাড়া, আমাদের বাড়ি — একসাথে গড়ি নতুন স্বপ্ন।”
বাগানের পাশে ছোট্ট মঞ্চ গড়ে উঠেছিল, আর পাশে সজ্জিত ছিল কাগজের বাতি। পাড়ার সব বয়স্ক থেকে শুরু করে বাচ্চারা জমায়েত হয়েছিল। সবাই একসঙ্গে গান গাইবে, নাচবে, আর গল্প শোনাবে — যা একদা ছিল তাদের পাড়ার প্রাণ।
রিনার মা মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে আশার চোখে বললেন, “দেখো, একটা ছোট্ট বাচ্চার চিন্তা কত বড় কাজ করছে।”
শুভম মঞ্চে উঠে বলল, “আমাদের পাড়ার পুরনো গানগুলো আবার একসঙ্গে গাইব। এই গানগুলো আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাস।”
গান গাওয়া শুরু হল। বুড়ো দাদা দিদিরা একসঙ্গে পুরনো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলেন। বাচ্চারা হাসিখুশি নাচল। মন ভরে উঠল এক আলাদা সুখে।
মাঝখানে মোহন দাদা আর রামপ্রসাদ চাচাও মঞ্চের সামনে এসে দুই হাত মিলিয়ে জানালেন, “আমরা ভুল বুঝেছিলাম। এখন আমরা সবাই এক পরিবার।”
রিনার চোখে অশ্রু এসে গেল। সে বুঝতে পারল, সত্যিই একটা নতুন সকাল এসেছে।
সেই রাতে, রিনা তার ঘরে বসে ভাবছিল, “সবাই যদি একসাথে থাকে, তাহলে কোনো কষ্টই স্থায়ী নয়। একতার শক্তি সবচেয়ে বড়।”
সেই থেকে মেহেদী পাড়ায় পুরোনো দুঃখগুলো ভুলে সবাই নতুন করে বন্ধুত্ব ও সাদৃশ্য গড়ে তুলতে শুরু করল।
অবশ্যই! ‘আলোছায়া’ গল্পের পঞ্চম অধ্যায় নিচে বিস্তারিতভাবে লিখছি।
মেহেদী পাড়ার সকালের হাওয়ায় যেন নতুন এক প্রেরণা ভাসছিল। সবাই আগের দিনের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার সফলতা নিয়ে খুবই আনন্দিত ছিল। ছোট-বড় সবাই পাড়ার পরিবর্তনের স্বাদ পাচ্ছিল। এই পরিবর্তন ছিল শুধু বাহ্যিক নয়, অন্তরের এক নরম স্পর্শ, এক আত্মার মিলন।
রিনা আর শুভম আজ বাগানে বসে পরিকল্পনা করছিলেন। তাদের মাথায় ছিল আরও কিছু কাজের খোঁজ, যাতে পাড়া আরও উন্নত এবং একতাবদ্ধ হয়।
“শুভম, আমরা কি স্কুলের বাচ্চাদের জন্য একটা পাঠাগার খুলতে পারি? পড়াশোনার জন্য একটা ছোট্ট জায়গা হলে ভালো হয়,” রিনা বলল।
শুভম উত্তরে বলল, “দারুণ আইডিয়া! আর আমাদের পাড়ার বয়স্করা যদি মাঝে মাঝে সেখানে গল্প শোনাতে আসেন, তাহলে ভালো লাগবে।”
তারা জানল, পাড়ায় এখনই সবচেয়ে বড় দরকার শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক যোগসূত্রের। তাই পাড়ার পুরনো একটা ফাঁকা ঘর পাঠাগারের জন্য নির্বাচন করা হল।
আব্দুল দাদা পাশে এসে বললেন, “তোমাদের উদ্যোগ দেখে আমি আনন্দিত। কিন্তু এটা চলবে সবাই মিলে কাজ করলে। সবাইকে একত্রিত করতে হবে।”
পরের কয়েকদিন পাড়ার সবাই মিলে মেঝে পরিষ্কার করল, বই আনল, আর পাঠাগার সাজাল। ছোটদের জন্য কাগজ পেন্সিলও জোগাড় হল।
একদিন পাড়ায় নতুন এক শিক্ষক এলো, যিনি শিক্ষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা নিয়ে পাড়ার বাচ্চাদের পড়াশোনায় সাহায্য করলেন। তার নাম ছিল মিসেস রানা।
মিসেস রানা বললেন, “শিক্ষা শুধু বই পড়া নয়, এটা মানুষের জীবনে নতুন আলো জ্বালানো।”
শুরুতেই পাঠাগারে শিশুরা জমায়েত হতে লাগল। আর বড়রাও মাঝে মাঝে এসে গল্পের মাধ্যমে বাচ্চাদের জীবন ও মূল্যবোধ শেখাল।
রিনা মায়ের সাথে বসে ভাবছিল, “আমাদের পাড়া এবার সত্যিই নতুন সূর্যের আলোর দিকে এগোচ্ছে।”
তবে পাড়ায় এখনও কিছু অসুবিধা ছিল। অনেকেই নতুন এই পরিবর্তন মানতে চাননি। তারা ভাবতেন পুরনো রীতি ভাঙার চেয়ে যেভাবে ছিল সেটাই ভালো।
রিনা জানত, পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ। তাই সে মনোবল ধরে রাখল, আর বিশ্বাস করল, এক সময় সবাই বুঝবে।
রিনার মায়ের কথা মাথায় ঘুরছিল, “সত্যি আলো ছড়ানোর জন্য ধৈর্য্য আর সাহস লাগে।”
সেই রাতে রিনা তার ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমি চাই আমাদের পাড়ার প্রত্যেক মনের জানালা যেন খোলা থাকে। নতুন আলোর দিকে।”
মেহেদী পাড়ার বাতাস এখন আরও কিছুটা ভিন্ন। বাগানে পড়াশোনা, গান, আর গল্পের আড্ডার মাঝে কোথাও যেন গভীর এক ছায়া লুকিয়ে ছিল। পাড়ার মানুষের মুখে হাসি থাকলেও, কিছু মন খারাপের কারণ এখনও অবশিষ্ট ছিল।
একদিন সন্ধ্যায় রিনা যখন পাঠাগারে বাচ্চাদের পড়াচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই দেখতে পেলো একজন নতুন মুখ—এক মেয়ের, যার নাম ছিল সুমনা। সুমনা পাড়ায় সদ্য এসেছে, কিন্তু সে খুবই লাজুক ও একাকী লাগছিল।
রিনা মনেই মনে ভাবল, “সবাই তো খুশি, কেন সে এত দূরত্ব বজায় রাখছে?”
ধীরে ধীরে রিনা ও সুমনা বন্ধুত্ব গড়ে তুলল। সুমনা বলল, “আমার মা বহুদিন আগেই মারা গেছেন, আর বাবা খুব ব্যস্ত। তাই আমি এখানে একাকী।”
রিনা তার হাতে হাত রেখে বলল, “এখানে সবাই তোমাকে ভালোবাসবে। তুমি আর একা নও।”
তবে সুমনার মন খোলা সহজ ছিল না। তার চোখে ছিল অনেক কষ্টের গল্প। সে পাড়ার অন্য বাচ্চাদের থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে চেয়েছিল।
অন্যদিকে, পাড়ার কিছু লোক এখনও পুরনো দ্বন্দ্বের ছায়ায় বন্দী ছিল। মোহন দাদা মাঝে মাঝে বিরক্ত মুখে বলতেন, “সব কিছু এত সহজ নয়, রিনা। সবাই চাইলে মিলন হয় না।”
রিনার মনে হত, “প্রকৃত একতা মানেই কি শুধু হাতে হাত মেলা? নাকি হৃদয়ের গভীরে থাকা দুঃখ-দূরত্ব কাটানো?”
এক সন্ধ্যায়, রিনা পাড়ার বুড়ো গাছের নিচে বসে ভাবছিল, যখন সুমনা এসে তার পাশে বসল। তারা দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব থেকেছিল।
অবশেষে সুমনা বলল, “আমার মাকে হারানোর ব্যথাটা এখনও ভোলা যায় না। কিন্তু তোমাদের ভালোবাসা আমাকে শক্তি দিচ্ছে।”
রিনা হাসল, “বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় বিজয়, সুমনা।”
সেদিন থেকে, সুমনার হৃদয়েও ধীরে ধীরে এক নতুন আশা জাগতে লাগল। সে বুঝল, শুধু নিজের আয়না নয়, অন্যের মনেও তাকাতে হয়।
পাড়ার সবাই ধীরে ধীরে শিখল, কষ্টে কষ্ট মিলিয়ে, ভালোবাসার আলো ছড়ানো যায়।
মেহেদী পাড়ার বাতাস এখন যেন আরও উজ্জ্বল, আরও প্রাণবন্ত। সারা পাড়া এখন একসঙ্গে কাজ করতে পারার আনন্দ উপভোগ করছিল। পাঠাগারের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের বন্ধনও গড়ছিল।
সুমনা এখন পুরোপুরি পাড়ার অংশ হয়ে উঠেছে। তার চোখে হাসি ফিরেছে, আর সে তার ছোট্ট মনের কথা সবার সঙ্গে শেয়ার করতে শিখেছে।
একদিন পাড়ার মঞ্চে একটি নাটকের আয়োজন হয়েছিল। রিনা ও শুভম নাটকের মুখ্য চরিত্রে ছিলেন। নাটকের নাম ছিল “বন্ধুত্বের সুর”। এই নাটকটি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, ক্ষমা আর সহানুভূতির বার্তা দিচ্ছিল।
নাটক শুরু হওয়ার আগের প্রস্তুতিতে সবাই মিলে বসে আলোচনা করছিল। মোহন দাদা, যিনি একসময় পাড়ার ঝগড়াটে ছিলেন, এবার নাটকের জন্য গান শিখছিলেন। আর রামপ্রসাদ চাচাও সবার সঙ্গে মিলে সাজসজ্জার কাজ করছিলেন।
রিনা ভাবছিল, “কতটা বদলে গেছে সবাই। মানুষ যখন মন খুলে কথা বলে, তখন সত্যিই বন্ধুত্বের সুর বাজে।”
নাটকের দৃশ্যগুলো ছিল হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া। গল্প চলছিল দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ওঠার, যা শেষে এক মেলবন্ধনে পরিণত হয়।
নাটকের শেষে, সবাই দাঁড়িয়ে হাত মিলিয়ে বলল, “আমরা সবাই এক পরিবার। আমরা একসাথে থাকব, একে অপরকে ভালোবাসব।”
পাড়া তখন এক নতুন আনন্দে মাতোয়ার হয়ে উঠল। রিনা মায়ের কাছে গিয়ে বলল, “মা, আমি বিশ্বাস করি আমাদের পাড়ায় একদিন একতা আর ভালোবাসা এমনভাবে জেগে উঠবে, যে কোনো সমস্যাই আমাদের ভাগ করে দিতে পারবে না।”
মায়ের চোখে গৌরবের জল উঠে এলো, “আমার মেয়ে, তুমি সত্যিই একটা বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছ।”
সেই রাত, রিনা জানালার বাইরে চাঁদের আলোয় তাকিয়ে ভাবল, “বন্ধুত্বের সুর কখনও থামবে না, যতক্ষণ আমরা সবাই একসাথে আছি।”
মেহেদী পাড়ার সকালটা ছিল একটু বিষণ্ণ। কিছুদিন আগে যে একতার সুর বাজছিল, তার মাঝে হঠাৎ করেই ছোট ছোট ভাঙন ধরতে শুরু করল। পাড়ার কিছু বাসিন্দা আবার পুরনো মত ভাবতে শুরু করল। নতুন পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কাজগুলোকে তারা সন্দেহের চোখে দেখছিল।
রিনা এই পরিবর্তন অনুভব করল। সে বুঝতে পারল, যে কোনো উন্নতি ও একতার পথে বাধা আসাটা স্বাভাবিক। তাই সে ভাবল, “এখনই সময় কঠোর হলেও ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার।”
একদিন দুপুর বেলায়, পাড়ার ছোট্ট একটি গ্রুপ বসেছিল পাঠাগারের সামনে। তারা নতুন উদ্যোগ নিয়ে কথা বলছিল, কিন্তু তারা সবাই একমত নয়। কেউ কেউ ভাবছিল, “পুরনো রীতিনীতি ও ঐতিহ্য বজায় রাখা উচিত।”
রিনা সেই সময় মঞ্চে উঠে বলল, “আমরা সবাই একসাথে থাকি, কারণ আমরা সবাই চাই ভালো জীবন। আমাদের ঐতিহ্য অনেক সুন্দর, কিন্তু আমরা নতুন চিন্তাভাবনাও গ্রহণ করব।”
শুভম পাশে এসে যোগ দিল, “পরিবর্তন মানেই পুরনো ভুলগুলো ভুলে যাওয়া নয়, বরং সেগুলো থেকে শেখা।”
রিনার ভাষণ শুনে অনেকেই উৎসাহ পেল। তবে কিছু লোক এখনো সন্দেহ পোষণ করছিল। মোহন দাদা বললেন, “সত্যি কথা বলব, নতুন কিছুতে বিশ্বাস করা কঠিন।”
রিনা জানত, এই সময়ে ধৈর্য রাখতে হবে। সে পাড়ার মানুষের সাথে বেশি বেশি কথা বলল, তাদের মন বোঝার চেষ্টা করল।
একদিন সন্ধ্যায়, পাঠাগারে বাচ্চারা মঞ্চে নাটক করছিল। নাটকের মূল বার্তা ছিল ‘ভিন্ন মত হলেও আমরা একসাথে থাকতে পারি’। নাটক শেষে সবাই মিলে হাত মিলিয়ে বলল, “ভিন্নতাকে সম্মান করব, একতাকে বজায় রাখব।”
ধীরে ধীরে পাড়ায় আবার সুসম্পর্ক ফিরে আসতে শুরু করল। বিভাজনের ছায়া কমতে লাগল।
রিনা নিজের মনে বলল, “পরিবর্তনের পথ কখনো সহজ হয় না, কিন্তু একতা ও ভালোবাসাই আমাদের শক্তি।”
সেই রাতে, পাড়ার আকাশে তারা ঝিলমিল করছিল, যেন নতুন আশার প্রতীক।
মেহেদী পাড়ায় নতুন করে সকালের আলো নেমেছে, তবে সবকিছু আগের মতো ঝকঝকে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে যা ঘটেছে, তা পাড়ার মানুষকে একটা বড় পরীক্ষা দিয়েছে। কেউ কেউ এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না যে একতা কতটা জরুরি। আবার কেউ কেউ নতুন পথ চলতে উৎসাহী।
রিনা আজ সকালে পাড়ার প্রাথমিক স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের সাথে কথা বলছিল। সে লক্ষ্য করল, শিক্ষকেরা আগের থেকে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়াচ্ছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু অশান্তির ছোঁয়া এখনো আছে।
রিনা ভাবল, “শিক্ষাই হবে আমাদের প্রকৃত পরিবর্তনের মূল। যদি ছোট বাচ্চাদের মন ভালো হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মের পথ আলোকিত হবে।”
এক বিকেলে, পাড়ার বাগানে সব বাচ্চারা জড়ো হল একটি বড় সভার জন্য। রিনা, শুভম এবং মিসেস রানা সবাই মিলে এক কর্মশালা শুরু করল, যেখানে বাচ্চাদের মধ্যে সহমর্মিতা, বন্ধুত্ব ও সম্মানের বিষয়ে আলাপ হলো।
শিশুরা নিজেদের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা শেয়ার করল—যেমন, কখনো একে অপরকে সাহায্য করার গল্প, কখনো মন খারাপের কথা। এই আলাপ তাদের মাঝে বোঝাপড়া বাড়াল।
অন্যদিকে, বড়রাও নিজেদের কাজ নিয়ে সচেতন হতে শুরু করল। মোহন দাদা আর রামপ্রসাদ চাচা মিলে পাড়ার রাস্তা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিলেন।
একদিন সন্ধ্যায়, পাড়ার সবাই মিলে একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলো প্রতি মাসে একটি ‘সেবা দিবস’ পালন করবে, যেখানে সবাই পাড়ার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বাচ্চাদের পড়াশোনা, এবং বৃদ্ধদের দেখাশোনা করবে।
রিনা বলল, “আমাদের ছোট ছোট এই পদক্ষেপগুলোই বড় পরিবর্তনের সূত্রপাত। সংগ্রাম যতই কঠিন হোক, আমাদের আশা কখনো ম্লান হতে পারে না।”
শুভম যোগ করল, “যেখানে ভালোবাসা ও বিশ্বাস থাকবে, সেখানে কোনও বাধাই অতিক্রম করা কঠিন নয়।”
সেদিন রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উজ্জ্বল ছিল, যেন মেহেদী পাড়ার জন্য এক নতুন শুভ সূচনার প্রতীক।
মেহেদী পাড়ার সকালের সূর্য একটু বেশিই উজ্জ্বল লাগছিল আজ। যেন সারা পাড়া নতুন জীবনের শ্বাস নিচ্ছে। গত কয়েক মাসে যা কিছু হয়েছে, তার পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট চোখে পড়ছিল।
পাড়ার রাস্তাগুলো এখন আগের থেকে অনেক পরিষ্কার। ছোট ছোট গাছ লাগানো হয়েছে সীমানা জুড়ে। রাস্তার দু’ধারে ফুটপাতে বসে থাকা দুঃস্থদের জন্য একটা ছোট ঠাঁই তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে রিনা ও শুভম। তারা সেখানে খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছিল।
শিশুরা স্কুলে আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করছিল, আর তাদের মুখে ফুটে উঠছিল হাসি। রিনা বুঝতে পারছিল, শিক্ষা এবং সেবা মিলেই পাড়ার সত্যিকারের উন্নতি ঘটাচ্ছে।
একদিন সন্ধ্যায়, পাড়ার একটা বড় মিলনমেলা আয়োজিত হয়। সেখানে বাচ্চারা নাটক করল, বড়রা গান করল, আর সবাই মিলে একে অপরের গল্প শোনাল। পুরনো ভুল ভুলে সবাই একত্রিত হচ্ছিল।
রিনা মঞ্চ থেকে বলল, “পরিবর্তন কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। আমরা সবাই যদি হাত মিলাই, তাহলে এই পাড়াকে একটা আদর্শ সমাজে পরিণত করতে পারি।”
মোহন দাদা হাসিমুখে বললেন, “তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছো, রিনা। সত্যিই বদলাতে হবে আমাদের মন, তার পরই বদলাবে পাড়া।”
সেদিন রাতের আকাশে তারা ঝলমল করছিল, যেন মেহেদী পাড়ার প্রতিটি ঘরে নতুন আশার আলো জ্বলছে।
মেহেদী পাড়ায় এক নতুন দিনের সূচনা হলো। আজ পাড়া উৎসবের মেজাজে মেতে উঠেছিল। কারণ, এক মাসের কঠোর পরিশ্রম শেষে, নতুন কমিউনিটি সেন্টার উদ্বোধন করার দিনটি এসে পৌঁছেছে।
রিনা, শুভম, মোহন দাদা আর পাড়ার অনেকেই মঞ্চ সাজানোর কাজ করছিলেন। ছোট ছোট বাচ্চারা গান গাইছিলো, আর পাড়ার বয়স্করা আনন্দে হাসছিলেন। নতুন এই সেন্টারটি শুধু একটি স্থান ছিল না, এটি ছিল আশা ও একতার প্রতীক।
রিনা ভাবছিল, “যত বাধা আসুক না কেন, আমরা একসাথে থাকলেই সব পারি। এই সেন্টার আমাদের জন্য একটা নতুন শুরু।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পাড়ার মান্যবর অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা সবাই একাত্মতা ও সামাজিক সেবার উপর জোর দিলেন।
শুভম বলল, “এই সেন্টার আমাদের পাড়ার জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এখানে আমরা মিলেমিশে পড়াশোনা, সংস্কৃতি, ও সামাজিক কাজ করব।”
রিনা ও মোহন দাদা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। পাড়ার মানুষদের মাঝে এই একতা দেখে তাদের মন গর্বে ভরে উঠল।
সন্ধ্যায়, সবাই মিলে মঞ্চে বসে গান ও নাটক উপভোগ করল। নতুন সূর্যের আলোকচ্ছটা যেন সবার মন আলোড়িত করেছিল।
মেহেদী পাড়ার সকালটা ছিল অন্যরকম। চারদিকে ভালোবাসা, শান্তি আর সমঝোতার বাতাস বইছিল। পাড়ার প্রতিটি ঘর থেকে হাসির শব্দ আসছিল, যেন জীবন নিজেই নতুন করে গান গাইছিল।
রিনা আর শুভম দাঁড়িয়ে দেখছিলেন পাড়ার সবাই একসঙ্গে কাজ করছে — বড়রাও ছোটরাও, ধনী আর দরিদ্র সবাই মিলেমিশে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। আর সেই একতা ছিল মেহেদী পাড়ার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বছরের পর বছর ধরে লড়াই, ধৈর্য, এবং আশা দিয়ে তারা এক নতুন সমাজ গড়ে তুলেছে — যেখানে মানুষ বর্ণ, শ্রেণী, ধর্ম বা মতবাদের পার্থক্য ভুলে, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দিয়েই বসবাস করছে।
রিনা বলল, “আমাদের স্বপ্ন ছিল একটি এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কেউ একা নয়। আজ আমরা দেখলাম সেই স্বপ্ন বাস্তব। আমাদের পথ সহজ ছিল না, কিন্তু আমরা কখনো হাল ছাড়িনি।”
শুভম হাসি দিয়ে বলল, “যে আলো আমরা জ্বালিয়েছি, তা শুধু আমাদের নয়, আশেপাশের অন্য পাড়াগুলোকেও আলোকিত করবে।”
মোহন দাদা মাথা নাড়িয়ে বললেন, “একতার এই শক্তি আমাদের পাড়াকে বদলে দিয়েছে, আর আমরাও বদলে গেছি। এটাই জীবনের সার্থকতা।”
সন্ধ্যার দিকে, মেহেদী পাড়ার পুকুরের ধারে সবাই একসঙ্গে বসে আকাশের তারা গুলো দেখে ভাবল—যারা মিলেমিশে আছেন, তাদের আলো কখনো ম্লান হয় না।
পাড়ার মানুষ বুঝতে পারল, প্রকৃত শক্তি আসে ভালোবাসা, একতা আর পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস থেকে। আর এই আলো ছড়িয়ে যাবে যুগ যুগান্তরে।
সমাপ্ত




