এক
জমিদারবাড়ির বিশাল প্রাসাদটি যেন সময়ের ভারে নুয়ে পড়েছে। একদা কত প্রজাপতি, দাস-দাসী আর অতিথির কোলাহলে মুখরিত ছিল এই প্রাসাদ, অথচ আজ তার চারপাশে নীরবতা আর ধ্বংসের ছাপ। লতাগুল্মে ঢাকা উঠোন, ভাঙাচোরা বারান্দা, কড়কড়ে দরজার কপাট—সব মিলিয়ে জায়গাটিকে ভূতের প্রাসাদের মতোই মনে হয়। কিন্তু এই ভগ্নদশার মাঝেই লুকিয়ে আছে এমন এক ধন, যা নিয়ে সমগ্র গ্রামে আজও গুঞ্জন থেমে নেই। গুপ্তমণি—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদারবাড়ির কুলদেবতার আসনে রাখা এই মণিকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে শত কাহিনি, শত গুজব। গ্রামের মানুষ বলে, মণির ভেতরে এমন এক শক্তি লুকিয়ে আছে যা শুধু প্রকৃত তান্ত্রিকের হাতেই জাগ্রত হয়। কেউ বলে, একবার মণি যদি ভুল হাতে পড়ে তবে ধ্বংস আসবে সবার জীবনে। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করে, এই মণিই জমিদার পরিবারকে একসময় সমৃদ্ধি আর ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল।
প্রাসাদের বর্তমান কর্তা, বৃদ্ধ জমিদার হেমন্তনারায়ণ, শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন বহুদিন ধরে। তার দেহে প্রাণের সঞ্চার ক্ষীণ হলেও চোখে এখনো তেজের ঝিলিক। শোনা যায়, যৌবনে তিনি তন্ত্রসাধনায় হাত দিয়েছিলেন, তবে আসল শক্তির দ্বার কখনো খোলেনি। বারবার চেষ্টা করেও তিনি গুপ্তমণিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। ফলে, শেষ বয়সে এসে তিনি এই মণির ভাগ্য নিয়ে এক অদ্ভুত আতঙ্কে ভুগছেন। হেমন্তনারায়ণের চার সন্তান—অরিন্দম, দীপঙ্কর, অমৃতা আর ছোটোতমা কন্যা অনিন্দিতা—প্রতিটি সন্তানই জানে মণির কথা, প্রতিটি হৃদয়েই আছে অদম্য কৌতূহল আর লোভ। কিন্তু কারো সাহস হয়নি খোলাখুলি বাবার কাছে মণির দাবি তুলতে। কেবল গোপনে গোপনে প্রত্যেকেই ভাবে, বাবার মৃত্যুর পর এই গুপ্তমণির অধিকারী সে-ই হবে। মণির সঙ্গে যুক্ত কিংবদন্তি, ভয় আর শক্তির গুঞ্জন তাদের রক্তে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
একদিন দুপুরে, প্রবল বজ্রঝড়ের ভেতর, হেমন্তনারায়ণ সন্তানদের চারজনকেই শয্যার পাশে ডেকে পাঠালেন। কাঁপা গলায় বললেন, “আমাদের পরিবারের রক্তের সঙ্গে বাঁধা আছে এই মণি… কেবল প্রকৃত সাধকই এর অধিকারী হতে পারবে। লোভ, ক্রোধ কিংবা প্রতারণার পথে গেলে মণি অগ্নিশিখার মতো গ্রাস করবে তোমাদের। আমার জীবন প্রায় শেষ… তোমাদের ভবিষ্যৎ তোমাদের হাতে।” তার কণ্ঠে ছিল একইসাথে সতর্কবার্তা আর অদ্ভুত শীতলতা। ঘরজুড়ে তখনো ঝড়ের হাহাকার, বিদ্যুতের ঝলকানিতে মূহূর্তে আলো-অন্ধকার খেলছিল। চার সন্তানের চোখে তখন এক রহস্যময় দীপ্তি—যেন প্রত্যেকেই মনে মনে শপথ করল, যেভাবেই হোক গুপ্তমণি নিজের করে নেবে। বৃদ্ধ জমিদার চোখ বন্ধ করলেন, অথচ তার ঠোঁটের কোণে ছিল এক অচেনা হাসি—যেন তিনি জানেন, সন্তানদের লোভই তাদের ভবিষ্যতের অন্ধকারের দরজা খুলে দেবে।
দুই
ঝড় থেমে যাওয়ার পর প্রাসাদের ভেতর যেন আরও গাঢ় অন্ধকার নেমে এলো। মেঝেতে জমে থাকা বৃষ্টির জল, ফোঁটা ফোঁটা করে পড়তে থাকা ছাদের চুঁইয়ে ধারা আর আর্দ্রতার গন্ধ পুরো পরিবেশটিকে করে তুলেছিল অস্বস্তিকর। হেমন্তনারায়ণের কণ্ঠস্বরের সতর্কবার্তা চার সন্তানের মনে গভীরভাবে ঢুকে গেলেও, প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা ভেবে চলল কীভাবে মণিকে নিজের অধিকারে আনা যায়। অরিন্দম, সবচেয়ে বড় ছেলে, মনে মনে হিসেব কষছিল—পরিবারের মধ্যে কর্তৃত্ব তার হাতে, বাবার মৃত্যুর পর প্রাসাদ এবং সম্পত্তির স্বাভাবিক উত্তরাধিকারীও সে-ই। তাই মণিও তার প্রাপ্য। কিন্তু সমস্যা হলো দীপঙ্কর। দ্বিতীয় ভাই হলেও তার বুদ্ধি ও কৌশল সবসময় অরিন্দমকে টেক্কা দিয়েছে। সে জানে, শক্তি বলপ্রয়োগে নয়, কূটনীতির জালে ফাঁসিয়েই মণি দখল করতে হবে। আর অমৃতা, একমাত্র বিবাহিতা বোন, শ্বশুরবাড়ির আঙিনা থেকেই চোখ রাখছে প্রাসাদের অভ্যন্তরে। তার বিশ্বাস, মণির অধিকারী হলে কেবল নিজের নয়, স্বামীর পরিবারকেও সমৃদ্ধি এনে দিতে পারবে।
অন্যদিকে অনিন্দিতা, সবার ছোট, প্রায় অদৃশ্যের মতোই এই প্রতিযোগিতায় দাঁড়িয়ে আছে। ভাইবোনেরা তাকে শিশুসুলভ ভেবে উপেক্ষা করলেও, তার চোখে লুকিয়ে আছে অন্যরকম শান্তি। মণির প্রতি তার কৌতূহল আছে, কিন্তু লোভ নেই। তবু, পরিবারে এমন এক পরিবেশ তৈরি হলো যেখানে সবাই একে অপরের প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে উঠতে লাগল। ভোজনের টেবিলে কথার আড়ালে কাঁটার খোঁচা, নিঃশব্দে চোখাচোখি আর পরোক্ষ ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে জমিদারবাড়ির আঙিনা হয়ে উঠল অদ্ভুত ভারী। প্রত্যেকে ভেবেছিল অন্যজনকে ধোঁকা দিয়ে এগিয়ে যাবে, অথচ কেউই বুঝতে পারছিল না কার হৃদয়ে আসলে কতটা অন্ধকার ঘনীভূত হয়েছে।
এই অবস্থায় প্রাসাদের পুরোনো দাস-দাসীরা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে উঠল। তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলত, “মণি জাগলে সর্বনাশ হবে, আবার কেউ মরবে।” জমিদারবাড়ির আশেপাশে গ্রামের মানুষও এই অস্বাভাবিক টানটান পরিবেশ অনুভব করছিল। রাত বাড়লেই প্রাসাদের ভেতর থেকে শোনা যেত অদ্ভুত পায়ের শব্দ, দরজার কপাটের ধাক্কা কিংবা করিডরে মৃদু মৃদু হাসির প্রতিধ্বনি। কেউ জানত না এগুলো সত্যিই ঘটছে, নাকি পরিবারের ভেতরের ভয় আর অবিশ্বাসের ফসল। কিন্তু একথা নিশ্চিত—মণিকে কেন্দ্র করে ভাইবোনদের মধ্যে যে কলহ শুরু হয়েছে, তা কেবল সময়ের অপেক্ষা—শীঘ্রই রক্তাক্ত রূপ নেবে।
তিন
প্রাসাদের উত্তর দিকের এক নির্জন কোণে ছিল পুরোনো গ্রন্থাগার, বহুদিন ধরে যেটি ধুলো আর মাকড়সার জালে ঢাকা পড়ে আছে। মলিন কাঠের তাকগুলোয় স্তূপ হয়ে পড়ে আছে শত বছরের পুরোনো পুঁথি, লিপি আর চামড়ার বাঁধাই করা বই। সেখানে সাধারণত কেউই যায় না, শুধু শীতকালে মাঝে মাঝে কাজের লোকরা আগুন ধরানোর জন্য শুকনো কাগজ টেনে আনে। কিন্তু গুপ্তমণির রহস্য নিয়ে ভাইবোনদের কৌতূহল তীব্র হওয়ার পর সেই অন্ধকার ঘরটির দিকে টান অনুভব করতে লাগল অরিন্দম ও দীপঙ্কর। একদিন গভীর রাতে, যখন প্রাসাদের অন্যান্য ঘর নিস্তব্ধ, তারা দু’জনে মশাল হাতে গ্রন্থাগারে প্রবেশ করল। ধুলোবালি উড়ল, বাতাসে ভেসে উঠল পুরোনো কালি ও চামড়ার গন্ধ। তাকের এক কোণে রাখা একটি কালো চামড়ার মোটা পুঁথি তাদের নজরে পড়ল। অরিন্দমের হাত কাঁপতে কাঁপতে বইটির মলাট ছুঁলো। মলাটে তামার পাত দিয়ে উৎকীর্ণ এক অদ্ভুত চিহ্ন ছিল—অর্ধচন্দ্র, তার নিচে অগ্নিশিখা, আর মাঝখানে একটি চোখ। দীপঙ্কর বইটি খুলতেই কেঁপে উঠল মশালের আলো, যেন শিখাটিও হঠাৎ ভয়ে দপ করে নিভে যাবে। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা ছিল অজানা সংস্কৃত মন্ত্র, আর পাশে আঁকা ছিল তান্ত্রিক সাধনার ভয়ঙ্কর চিত্রকল্প—অগ্নিকুণ্ড, মৃতদেহ, মণ্ডল আঁকা মাটি, আর মণির ভেতর থেকে আলো বেরোনো।
পুঁথির এক জায়গায় স্পষ্ট লেখা ছিল, “পূর্ণিমার রাত, শ্মশানমণ্ডল, রক্তের আর্চনা আর অন্তরের নির্লোভ সাধনা ছাড়া গুপ্তমণি জাগ্রত হয় না।” আরও লেখা ছিল, “যদি মিথ্যা মন, লোভ বা প্রতারণা নিয়ে সাধনায় প্রবেশ করা হয়, তবে মণি রুদ্রশিখার মতো প্রলয় ডেকে আনে।” দু’ভাই একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের চোখে ভয় আর লোভের অদ্ভুত মিশ্রণ খেলা করছিল। অরিন্দম ফিসফিস করে বলল, “বাবা যা বলেছিলেন, এ-ই সেই গোপন রহস্য। যদি আমরা একসাথে করি, তবে মণি আমাদের অধীনে আসতে বাধ্য।” দীপঙ্করের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটল। সে জানত, একসাথে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত জয় একার হবে। তবু আপাতত সে অভিনয় করে সম্মতি জানাল। গ্রন্থাগারের বাইরে তখন ঝড়ো বাতাস বইছে, জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ছে শিস দেওয়া হাওয়া, আর কাগজগুলো উড়ে উড়ে উঠছে। মনে হচ্ছিল যেন প্রাসাদ নিজেই তাদের সতর্ক করছে—“পথ ভুল কোরো না।” কিন্তু সেই সতর্কবার্তা কে শোনে?
এদিকে, অমৃতা যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছিল ক’দিনের জন্য, সে-ও কাকতালীয়ভাবে শুনে ফেলে দুই ভাইয়ের গোপন আলোচনা। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে এক সন্ধ্যায় সেও প্রবেশ করল গ্রন্থাগারে। ধুলোর স্তূপ সরিয়ে পুঁথি পড়তে গিয়ে তার মনে হলো, এ লেখা কেবল পুরুষের লোভ নয়, নারীর আত্মিক শক্তিকেও পরীক্ষা করবে। সে বুঝতে পারল, তন্ত্রসাধনার মূলে আছে আত্মসংযম, নিঃস্বার্থতা আর ভক্তি, যা তার ভাইদের মধ্যে নেই। কিন্তু তার নিজের মনেও তখন প্রবল দ্বন্দ্ব—যদি মণি পেয়ে যায়, তবে তার স্বামীর ভগ্নদশাগ্রস্ত ব্যবসা আবারো ফুলে-ফেঁপে উঠবে। তাই দ্বিধার ভেতরেও সে সংকল্প নিল মণি অর্জনের। আর এইসব ষড়যন্ত্র, প্রতিযোগিতা, গোপন পরিকল্পনা থেকে একেবারে দূরে ছিল অনিন্দিতা। তবু সে একদিন নিজেকে গ্রন্থাগারে টেনে নিয়ে গেল, যেন এক অদৃশ্য শক্তি তাকে ডাকছে। অন্যদের মতো মন্ত্রের জটিলতা ও তন্ত্রচিত্র তার ভয়ের কারণ হয়নি; বরং সে বইয়ের প্রান্তে হাত বুলিয়ে শান্তি অনুভব করল। অমৃতা কিংবা দুই ভাই যেভাবে মণিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিল, তার মনে সেভাবে লোভ জন্মাল না। বরং সে পুঁথির এক জায়গায় পড়ল—“অন্তরের সত্য যদি নির্মল হয়, তবে মণি আলো হয়ে রক্ষা করে; অন্তর যদি অন্ধকারে ভরা, তবে মণি আগুন হয়ে ধ্বংস করে।” তার ঠোঁটে নিঃশব্দে ফোটে উঠল একটি হাসি, যা কারো চোখে পড়ল না। সেই হাসি ছিল অদ্ভুত শান্ত আর রহস্যময়।
চার
প্রাসাদের চারদিকে তখনো ছড়িয়ে আছে অস্বস্তির বাতাস। হেমন্তনারায়ণ দিনের পর দিন শয্যায় শুয়ে আছেন, তার চোখের দৃষ্টি যেন পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব ভেদ করে প্রত্যেকের ভেতরের লোভ দেখে ফেলছে। ভাইবোনেরা প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে গ্রন্থাগারের সেই পুঁথি ঘেঁটে আরও রহস্য উদ্ধার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, প্রত্যেকের মনে হচ্ছিল—যতই পড়া হোক, মণির প্রকৃত রহস্য অধরা রয়ে যাচ্ছে। এমন এক সময়েই গ্রামের মানুষদের কানে এল এক আশ্চর্য খবর। দক্ষিণ দিকের শ্মশানের ঘাটে নাকি এক অচেনা সাধক আশ্রয় নিয়েছে। কালো বস্ত্র পরিহিত, লম্বা জটাজুট, হাতে রুদ্রাক্ষের মালা, চোখে ভয়ানক তেজ—মানুষেরা বলাবলি শুরু করল যে সে-ই সেই তান্ত্রিক, যে গুপ্তমণির শক্তি জাগাতে সক্ষম। গ্রামের সাধারণ মানুষ ভয় পেয়ে দূরে সরে গেলেও, খবর পৌঁছে গেল প্রাসাদের চার দেওয়ালের ভেতর। অরিন্দম ও দীপঙ্কর প্রথমেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। তারা মনে করল, এই সাধকই হয়তো তাদের লক্ষ্যপূরণের একমাত্র সিঁড়ি। অমৃতার মনেও কৌতূহল জাগল, কিন্তু ভয়ের ছায়াও ক্রমে ঘনীভূত হতে লাগল।
কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায়, যখন প্রাসাদের করিডরে কেবল প্রদীপের টিমটিমে আলো, তখনই আগন্তুক সাধক প্রথম প্রবেশ করল জমিদারবাড়িতে। তার পদক্ষেপ ছিল ধীর কিন্তু ভয়ার্ত, যেন মেঝে কাঁপিয়ে উঠছে। দাসীরা একে একে ভয়ে পালিয়ে গেল, কেবল কয়েকজন বৃদ্ধ কর্মচারী কৌতূহল নিয়ে দূর থেকে তাকিয়ে রইল। সাধক সোজা গিয়ে হেমন্তনারায়ণের কক্ষে প্রবেশ করল। বৃদ্ধ জমিদার বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় ছিলেন, আর তার চোখদুটো হঠাৎ জ্বলে উঠল আগন্তুককে দেখে। দু’জনের মধ্যে কোনো শব্দ বিনিময় হলো না, কিন্তু চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সাধকের মুখে রহস্যময় হাসি, আর জমিদারের মুখে শীতলতার ছাপ। তারপর সাধক ধীরে ধীরে ঘুরে সন্তানদের দিকে তাকাল। তার চোখে এমন দৃষ্টি ছিল যা হৃদয়ের গভীরে গিয়েও লুকানো লোভকে বের করে আনে। অরিন্দম সাহস করে এগিয়ে এসে বলল, “আপনি কি সত্যিই মণির শক্তি জাগাতে পারেন?” সাধক কোনো উত্তর দিল না, শুধু মালার দানা ঘুরাতে ঘুরাতে মৃদুস্বরে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল। তার কণ্ঠস্বর ঘরজুড়ে গুমগুম করে উঠল, আর হঠাৎ মনে হলো যেন প্রাসাদের দেওয়ালগুলো কেঁপে উঠছে।
এরপর থেকে সাধক প্রায়ই প্রাসাদে আসতে শুরু করল। কখনো তিনি আঙিনায় ধূপজ্বালিয়ে বসে থাকেন, কখনো আবার গ্রন্থাগারে গিয়ে অজানা ভাষায় মন্ত্রপাঠ করেন। ভাইবোনেরা প্রত্যেকেই তাকে নিজেদের দিকে টানতে চাইল। অরিন্দম তাকে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রতিশ্রুতি দিল, দীপঙ্কর কৌশলে তাকে একান্তে বোঝানোর চেষ্টা করল যে মণি কেবল তারই প্রাপ্য। অমৃতা একদিন গোপনে সাধকের পায়ের কাছে বসে প্রার্থনা করল, যেন সে-ই শক্তি পায়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, সাধক সবার প্রস্তাব উপেক্ষা করত। শুধু অনিন্দিতার দিকে তাকালে তার চোখে ফুটে উঠত একরকম নরম দৃষ্টি। অনিন্দিতা তবু কখনো তার কাছে কিছু দাবি করেনি। বরং দূর থেকে দেখত, কীভাবে সাধক ধীরে ধীরে পরিবারটিকে নিজের রহস্যময় ছায়ায় আচ্ছন্ন করছে। গ্রামের মানুষরা বলত, সাধকের আগমনের পর থেকে রাতের বেলা শ্মশান থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়, আবার প্রাসাদের ছাদে কখনো কখনো জ্বলজ্বল আলো ফুটে ওঠে। কেউ বলত, এ কেবল ভ্রম, আবার কেউ শপথ করে বলত, তারা নিজের চোখে দেখেছে। কিন্তু নিঃসন্দেহে একথা স্পষ্ট ছিল—প্রাসাদের ভেতর আগন্তুক সাধকের আবির্ভাবের পর থেকে অশুভ শক্তির ছায়া ঘন হয়ে আসছে, আর গুপ্তমণির ভবিষ্যৎকে ঘিরে লোভ, ভয় আর রহস্য আরও গভীর হয়ে উঠছে।
পাঁচ
সাধকের আগমনের পর থেকে জমিদারবাড়ির ভেতর অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। দিনের বেলা যেন সবকিছু স্বাভাবিক, কিন্তু রাত নামলেই করিডরে শোনা যেত অদ্ভুত আওয়াজ—কোথাও মৃদু হাসি, কোথাও পায়ের শব্দ, আবার কখনো ঝড়ো হাওয়ার মতো হাহাকার। দাসীরা আতঙ্কে চাকরি ছাড়তে চাইছিল, কিন্তু পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে কেউ-ই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছিল না। তাদের মন ভরে গিয়েছিল কেবল গুপ্তমণি আর সাধকের রহস্যময় আশ্বাসে। ধীরে ধীরে, একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস বাড়তে লাগল। অরিন্দম আর দীপঙ্কর একে অপরের পরিকল্পনা আঁচ করতে পারছিল। দু’জনেই আলাদা আলাদা ভাবে সাধকের সঙ্গে দেখা করত, তাকে নিজের দিকে টানতে চাইত। অমৃতাও বুঝতে পারছিল, এই প্রতিযোগিতা রক্তাক্ত হতে বাধ্য। আর অনিন্দিতা, সবার ছোট, কেবল নীরবে দেখছিল—যেন অদৃশ্য ভবিষ্যৎ তার সামনে ধোঁয়ার মতো ভেসে উঠছে।
এক রাতে, দীপঙ্কর গোপনে সাধকের সঙ্গে দেখা করল। প্রাসাদের পেছনের পুরোনো অশ্বত্থতলার নিচে আগুন জ্বেলে সাধক বসে ছিল। দীপঙ্কর মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল, কণ্ঠে লোভের আভাস—“আমি চাই, মণির শক্তি কেবল আমার হাতে আসুক। বড়ভাই হয়তো ভাবছে সে উত্তরাধিকারী, কিন্তু আপনি যদি আমাকে সাহায্য করেন, আমি আপনাকে যা চাইবেন তাই দেব।” সাধকের মুখে তখনও সেই রহস্যময় হাসি। সে মৃদু গলায় বলল, “মণি নিজেই বেছে নেয় কাকে সে শক্তি দেবে… কিন্তু পথ যদি রক্তে ভিজে যায়, তবে শক্তি তোমার দেহে নেমে আসবে না, তোমাকে ভস্ম করে দেবে।” দীপঙ্কর কাঁপল, কিন্তু মন থেকে ভয় ঝেড়ে ফেলতে পারল না। সে বুঝতে পারল, সরাসরি কিছু করা যাবে না, তবে গোপনে ভাইকে সরিয়ে দিলে হয়তো পথ পরিষ্কার হবে। আর সেই রাতে তার মনে জন্ম নিল এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা।
পরের কয়েকদিনে পরিবারের ভেতরকার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠল। অরিন্দম লক্ষ্য করল, দীপঙ্কর তাকে এড়িয়ে চলছে। গ্রন্থাগারে ঢুকলেই মনে হয় কেউ আগে থেকেই সেখানে এসেছে। বইয়ের পৃষ্ঠায় অদ্ভুত দাগ, ধূপকাঠির ছাই, আর পায়ের ছাপ দেখতে পেল। অমৃতাও হঠাৎ হঠাৎ ভয় পেতে লাগল, যেন কেউ তাকে অনুসরণ করছে। এসবের মাঝেই একদিন খবর এলো—পূর্ণিমা আসছে, আর সেই রাতই নাকি মণি জাগানোর সর্বোত্তম সময়। পরিবারের সবাই তখন গোপনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। কিন্তু দীপঙ্করের মনের ভেতরে লুকানো বিশ্বাসঘাতকতার ছায়া আরও ঘন হয়ে উঠছিল। সে জানত, পূর্ণিমার রাতেই তাকে বড়ভাইকে সরাতে হবে। আর সাধক? সে নীরবে সবার খেলা দেখছিল, তার চোখে অদ্ভুত রহস্যের দীপ্তি, যেন জানত—এই বাড়িতে শিগগিরই রক্ত ঝরবে, আর সেই রক্তেই লেখা হবে গুপ্তমণির ভবিষ্যৎ।
ছয়
পূর্ণিমার রাত নেমে এলো অদ্ভুত নীরবতায় মোড়া হয়ে। আকাশ জুড়ে রূপালি আলো ছড়িয়ে পড়লেও প্রাসাদের ভেতরকার অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠল। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল ধূপ-ধুনোর গন্ধ, চারদিকে শোনা যাচ্ছিল দূরের শ্মশান থেকে আসা কুকুরের হাহাকার। জমিদারবাড়ির পেছনের প্রাচীন আঙিনায়, যেখানে একসময় পুজোর আয়োজন হতো, সেখানেই এবার সাজানো হলো তন্ত্রসাধনার আসন। মাটির ওপর আঁকা হলো অগ্নিমণ্ডল, চারপাশে রাখা হলো প্রদীপ আর মন্ত্রলিখিত তামার পাত। মাঝখানে রাখা হলো সেই গুপ্তমণি, কালো সিন্দুক থেকে বার করা—সবুজাভ আলো ছড়িয়ে যেন নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। হেমন্তনারায়ণ শয্যায় শুয়ে থেকেও ভেতর থেকে সব টের পাচ্ছিলেন; তার চোখে তখনো ছিল সতর্কতার ঝিলিক। কিন্তু চার সন্তান, আর আগন্তুক সাধক—তাদের চোখে তখন কেবল লোভ আর কৌতূহলের আগুন।
সাধক গভীর কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করলেন। অগ্নিকুণ্ডে ঘি আর নীল ফুল ফেলা হচ্ছিল, ধোঁয়া উড়ছিল আকাশের দিকে। অরিন্দম আর দীপঙ্কর দু’জনেই অগ্নিমণ্ডলের পাশে বসে হাত জোড় করে মন্ত্র উচ্চারণ করার ভান করছিল। কিন্তু তাদের চোখের কোণে লুকিয়ে ছিল প্রতিযোগিতার ঝিলিক—কে আগে এগোবে, কে আগে মণির স্পর্শ পাবে। অমৃতা সিঁদুর মাখা কপাল নিয়ে অগ্নিশিখার দিকে তাকিয়ে ছিল, যেন প্রার্থনা করছে দেবশক্তির কাছে। আর অনিন্দিতা শান্ত চোখে বসে ছিল কোণে, মন্ত্রপাঠ করছিল না, শুধু গভীরভাবে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। মন্ত্রের তালে তালে মণি থেকে আলো বেরোতে শুরু করল। প্রথমে তা ছিল নরম সবুজাভ দীপ্তি, তারপর ধীরে ধীরে তা তীব্র হয়ে উঠল—যেন চারপাশের দেয়ালগুলো ভেদ করে আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে। সাধকের কণ্ঠ আরও গম্ভীর হলো, শব্দগুলো কানে না ঢুকলেও হৃদয় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, দীপঙ্কর সুযোগ পেল। অগ্নিকুণ্ডের আড়ালে রাখা ধারালো ছুরি সে হঠাৎ বের করে অরিন্দমের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু অরিন্দম আগে থেকেই সাবধান ছিল, তাই আঘাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো, কেবল তার কাঁধ কেটে গেল। রক্ত ঝরে পড়তেই মন্ত্রপাঠ থেমে গেল, আর মণির আলো ভয়ঙ্কর অগ্নিশিখায় রূপ নিল। অরিন্দম চিৎকার করে উঠল, অমৃতা আতঙ্কে পিছিয়ে গেল, অনিন্দিতার চোখ বড় হয়ে উঠল। সাধক থেমে গিয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন—“মিথ্যা মন প্রবেশ করেছে সাধনায়… মণি ক্রুদ্ধ!” মুহূর্তেই অগ্নিকুণ্ডের শিখা দ্বিগুণ উঁচু হয়ে উঠল, মণি থেকে নির্গত আলো অগ্নিশিখায় মিশে ভয়ার্ত ঝড়ের সৃষ্টি করল। দীপঙ্করের মুখে তখনো হিংস্র হাসি, কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই আলো তার শরীরে গিয়ে পড়ল। প্রচণ্ড দগ্ধ যন্ত্রণায় চিৎকার করে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মাংস জ্বলতে জ্বলতে তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে অচেতন হয়ে নিথর পড়ে রইল। প্রাসাদজুড়ে তখন আতঙ্কের ঝড় বইছে—লোভের প্রথম শিকার মিলল, আর গুপ্তমণির শক্তি তার ভয়ঙ্কর রূপের পরিচয় দিল।
সাত
অগ্নিকুণ্ডের শিখা ধীরে ধীরে স্তিমিত হলো, কিন্তু তার লেলিহান আভা দীপঙ্করের নিথর দেহকে এখনো জ্বলন্ত ছাইয়ের মতো করে রেখেছিল। আকাশের পূর্ণিমা ঢেকে গেল কালো মেঘে, যেন প্রকৃতিও মুখ ফিরিয়ে নিল জমিদারবাড়ির এই সর্বনাশা দৃশ্য থেকে। অরিন্দম কাঁধে রক্ত মুছতে মুছতে স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মৃত ভাইয়ের দিকে। তার চোখে ছিল ভয়, ঘৃণা আর এক অদ্ভুত তৃপ্তির মিশ্র ছাপ—যেন ভাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি সে প্রত্যক্ষ করে স্বস্তি পেয়েছে, অথচ বুঝতে পারছে না পরের মুহূর্তে এই শিখা তাকেও গ্রাস করতে পারে। অমৃতা আছড়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল, তার চোখের সামনে স্বপ্নভঙ্গ হলো—সে চেয়েছিল মণির শক্তি দিয়ে সমৃদ্ধি, অথচ এখন দেখল তার পরিবার ধ্বংসের পথে হাঁটছে। আর অনিন্দিতা, শান্ত চোখে মণির দিকেই তাকিয়ে রইল। মণি তখনও সবুজাভ আলো ছড়াচ্ছিল, তবে সেই আলোয় আর কোনো দীপ্তি নেই, বরং ছিল ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা।
সাধক তখনো স্থির বসে ছিল, তার মুখে কোনো আবেগ নেই। ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে তার গলা বেজে উঠল, “আমি বলেছিলাম, মণি শুধু সত্যিকারের সাধককে বেছে নেয়। তোমরা লোভ নিয়ে সাধনায় এসেছিলে, তাই এই প্রলয়।” তার দৃষ্টি একে একে সবার ওপর ঘুরল। “এখনো সময় আছে… কিন্তু যদি আবার কেউ মিথ্যা মন নিয়ে হাত বাড়ায়, তবে সে-ও দগ্ধ হবে।” তার কথায় হেমন্তনারায়ণের কক্ষে থাকা প্রদীপ হঠাৎ দপ করে নিভে গেল, আর মনে হলো প্রাসাদজুড়ে অশুভ শক্তি ঘনীভূত হয়ে উঠছে। অরিন্দম ভয়ে পিছিয়ে গেল, তবে চোখে এখনো একরকম দাবিদাওয়া—সে ভাবছিল, দীপঙ্কর মারা যাওয়ায় পথ পরিষ্কার হলো, মণি এবার কেবল তারই হবে। কিন্তু মণির দীপ্তি যেন তার দিকে তাকিয়ে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল।
রাত গভীর হলো। দীপঙ্করের দেহ আঙিনায় মাটিতে পড়ে রইল, দাস-দাসীরা আতঙ্কে কাছে আসতে সাহস পেল না। কেউ কেউ ফিসফিস করে বলল, “এ বাড়িতে অশুভ ছায়া নেমে এসেছে।” হঠাৎ করিডরের অন্ধকারে অদ্ভুত আওয়াজ উঠল, যেন অদৃশ্য কেউ হাসছে। অমৃতা সেই শব্দ শুনে শিউরে উঠল, মনে হলো মৃত ভাইয়ের আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনিন্দিতা নিঃশব্দে মন্ত্রোচ্চারণ করল, যেন সে-ই একমাত্র চেষ্টা করছে অশুভ শক্তিকে শান্ত করতে। কিন্তু তার ভেতরের শান্তি আর আত্মবিশ্বাসের ছায়া এখনো কারো নজরে পড়ল না। সেই রাতে জমিদারবাড়ির চার দেয়ালের ভেতরে সবাই বুঝতে পারল—গুপ্তমণি কেবল অলৌকিক রত্ন নয়, বরং এক অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে লোভ, প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি মৃত্যু ছাড়া আর কিছু নয়।
আট
দীপঙ্করের মৃত্যুর পর জমিদারবাড়ির চারপাশ যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। দিনেও প্রাসাদ অস্বাভাবিক নীরব থাকত, আর রাত নামলেই চারদিকে ঘনিয়ে আসত অদ্ভুত অন্ধকার। গ্রামের মানুষ দূর থেকে প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করত—“ওই বাড়ি অভিশপ্ত হয়ে গেছে।” কুকুরেরা হঠাৎ করেই হাউমাউ করে উঠত, গরুগুলো গোয়ালে অস্থির হয়ে উঠত, আর মাঝরাতে বাতাসে ভেসে আসত অজানা করুণ সুর। দাস-দাসীদের অনেকে চাকরি ছেড়ে পালিয়ে গেল। কেউ কেউ দাবি করল, তারা করিডরের কোণে দীপঙ্করের অগ্নিদগ্ধ ছায়া হাঁটতে দেখেছে। খবর ছড়িয়ে পড়ল পুরো গ্রামে—গুপ্তমণি রুষ্ট হয়েছে, আর জমিদার পরিবার ধ্বংসের পথে।
প্রাসাদের ভেতরকার অবস্থা আরও করুণ। অরিন্দম চেষ্টা করছিল নিজেকে দৃঢ় দেখাতে, কিন্তু রাতের পর রাত সে দুঃস্বপ্নে জেগে উঠছিল। স্বপ্নে সে দেখত, দীপঙ্কর জ্বলন্ত চোখে দাঁড়িয়ে আছে, আর মণি তার হাত থেকে আগুনের মতো আলো ছড়িয়ে তার শরীর গ্রাস করছে। অমৃতা দিনরাত কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ল। সে চেয়েছিল মণির মাধ্যমে পরিবারের পুনর্জাগরণ, কিন্তু পেল মৃত্যু আর আতঙ্ক। হেমন্তনারায়ণ প্রায় নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন, চোখে কেবল শূন্যতা—মনে হচ্ছিল তিনি সব আগেই জানতেন, কেবল সন্তানদের পতন প্রত্যক্ষ করছেন। আর অনিন্দিতা, যদিও বাইরের সবাইকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছিল, ভেতরে ভেতরে অনুভব করছিল—এই অশুভ ছায়া শুধু পরিবার নয়, পুরো গ্রামকে গ্রাস করতে পারে।
সাধক তখনও প্রাসাদের আঙিনায় উপস্থিত থাকত, কিন্তু তার উপস্থিতি এখন আর আশার আলো নয়, বরং আতঙ্কের ছায়া। তিনি বললেন, “মণি এখন রুষ্ট। যার অন্তর যত অন্ধকার, তার ওপরই এর অভিশাপ নেমে আসবে।” কথাগুলো শোনার পর ভাইবোনদের মধ্যে নতুন এক সন্দেহের জন্ম নিল। অরিন্দম ভাবল অমৃতা অভিশাপ ডেকে আনছে, অমৃতা ভাবল অনিন্দিতা কোনো গোপন শক্তি ব্যবহার করছে। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। পূর্ণিমার রাতের ঘটনার পর থেকে প্রাসাদের প্রতিটি কোণ অচেনা হয়ে উঠল—আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা যেত, সিঁড়ির ধাপ হঠাৎ কেঁপে উঠত, আর মাঝরাতে হাওয়ার মধ্যে ভেসে আসত অজানা মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ। গ্রাম-প্রাসাদ মিলিয়ে সবাই বুঝে গেল, গুপ্তমণি আর আশীর্বাদের প্রতীক নেই—এখন সেটি এক অন্ধকারের অভিশাপ, যা ধ্বংস ছাড়া আর কিছু আনবে না।
নয়
অন্ধকারের অভিশাপ যেন দিন দিন প্রাসাদকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। চারদিকে কেবল আতঙ্ক আর সন্দেহের আবহ। অরিন্দম ও অমৃতা দু’জনেই এখন একে অপরকে শত্রু মনে করছে—কে লুকিয়ে মণির শক্তি দখল করতে চাইছে, তা নিয়ে তাদের মনে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। সাধক মাঝে মাঝে এসে অদ্ভুত মন্ত্রপাঠ করত, কিন্তু কোনো ফল মিলত না। বরং প্রতিবার তার উপস্থিতির পর প্রাসাদে আরও অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটতে থাকত—কারো গলায় হঠাৎ আঁচড়ের দাগ দেখা যেত, করিডরে পদশব্দ শুনে ছুটে গেলে দেখা যেত শূন্যতা, আবার কখনো মণির সিন্দুকের চারপাশে অগ্নিশিখার দাগ ফুটে উঠত। এসব দেখে গ্রামবাসীরা আরও ভয়ে সরে গেল। তারা আর প্রাসাদের দিকে চোখ তুলেও তাকাতে চাইত না।
এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মাঝেই অনিন্দিতা নিজেকে আলাদা করে রাখতে লাগল। সে বইয়ের ঘরে গিয়ে পুঁথিগুলো পড়তে শুরু করল, তবে লোভ নিয়ে নয়, বোঝার চেষ্টা করল আসলে তন্ত্রসাধনার অর্থ কী। দিনরাত ধ্যান করতে করতে সে বুঝতে পারল—শক্তি অর্জন কোনো লোভ বা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, বরং ভেতরের শান্তি, আত্মসংযম আর সত্যের ওপর নির্ভর করে। তার মনের মধ্যে ছিল না ভাইয়ের মতো আধিপত্যের বাসনা, না বোনের মতো স্বার্থপর স্বপ্ন। বরং সে চেয়েছিল পরিবারের ভেতরের অশুভ শক্তি থেমে যাক, সবাই শান্তিতে থাকুক। পুঁথির একটি জায়গায় লেখা ছিল—“যে মন নির্লোভ, যে হৃদয় নির্মল, মণি তাকে আশীর্বাদ দেবে।” এই কথাটিই তার ভেতরে শক্তি সঞ্চার করল। রাতের পর রাত সে মন্ত্রপাঠ করল না, শুধু নীরব প্রার্থনা করল, আর ধীরে ধীরে তার চারপাশে এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
পূর্ণিমার আরেক রাতে, যখন প্রাসাদজুড়ে আবার ভয়ের ছায়া নেমে এসেছে, হঠাৎ মণি রাখা সিন্দুক থেকে ক্ষীণ আলো বেরোতে শুরু করল। অরিন্দম ও অমৃতা ছুটে এলো, ভাবল কেউ হয়তো মন্ত্রপাঠ করছে। সাধকও উপস্থিত হলো, চোখে রহস্যময় দীপ্তি নিয়ে। কিন্তু দেখা গেল, আলো কারো মন্ত্রে নয়—অনিন্দিতার নীরব উপস্থিতিতে মণি নিজে থেকেই দীপ্ত হয়ে উঠছে। সে ধীরে ধীরে সিন্দুকের কাছে গিয়ে হাত রাখল, আর মুহূর্তেই পুরো আঙিনা শান্ত আলোর বৃত্তে ভরে গেল। আগুন, অশুভ ছায়া, আতঙ্ক—সব যেন মিলিয়ে গেল। অরিন্দম বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল, অমৃতার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল, আর সাধক নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে বুঝে গেল—এই পরিবারের প্রকৃত সাধক অনিন্দিতাই। তার ভেতরের নির্মলতা আর নির্লোভ মন মণিকে শান্ত করেছে। সেই রাতে প্রাসাদের ইতিহাস নতুন দিকে মোড় নিল—প্রথমবার মণি ধ্বংস নয়, আশীর্বাদের আলো ছড়িয়ে দিল।
দশ
অনিন্দিতার স্পর্শে গুপ্তমণি যে আলো ছড়িয়েছিল, তা কেবল প্রাসাদের অশুভ ছায়া মুছে দেয়নি, আশেপাশের গ্রামেও শান্তির আবহ ফিরিয়ে দিয়েছিল। কয়েক দশক ধরে যে অন্ধকার ভয়ের আচ্ছাদন গ্রামবাসীর মনে ছড়িয়ে ছিল, তা ভোরের আলোয় গলে যাওয়া কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল। যারা পালিয়ে গিয়েছিল, তারাও ধীরে ধীরে ফিরে এলো। তারা অবাক হয়ে দেখল—প্রাসাদ আর অন্ধকারে ঢাকা নেই, যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মণি তখনো দীপ্তিমান, কিন্তু তার আলো আর চোখ ঝলসে দেওয়া ভয়ঙ্কর ছিল না, বরং প্রশান্তির মতো নরম ও মায়াবী।
হেমন্তনারায়ণ, যিনি এতদিন সবকিছু চুপচাপ দেখে যাচ্ছিলেন, অনিন্দিতাকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললেন। তিনি বুঝতে পারলেন, উত্তরাধিকার মানে কেবল সম্পদ নয়—বরং সেই শক্তি, যা সঠিক হাতে সঠিক সময়ে ব্যবহৃত হয়। অরিন্দম নিজের লোভ আর অহংকারের পরিণতি বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হলো। সে অনিন্দিতার সামনে মাথা নত করল, আর প্রতিজ্ঞা করল যে আর কখনো মণির শক্তি নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবে না। অমৃতা, যিনি দীর্ঘদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন সমৃদ্ধির, এবার বুঝলেন প্রকৃত সমৃদ্ধি হলো শান্তি আর ঐক্য। তিনি ভগ্নস্বপ্নের কান্না থামিয়ে বোনকে আশীর্বাদ করলেন। পরিবার, যা এতদিন ভেঙে পড়ছিল, মণির আলোয় নতুন করে বাঁধা পড়ল।
সাধক সেই রাতে নিঃশব্দে প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেলেন। যাবার সময় শুধু বললেন, “মণি এখন যার কাছে আছে, সে-ই এর যোগ্য। মনে রেখো, শক্তি কখনো অধিকার নয়, দায়িত্ব।” অনিন্দিতা মণিকে আর সিন্দুকে বন্দি রাখল না; সে মন্দিরের অন্তঃস্থলে সেটি স্থাপন করল, যেখানে কেউ একে লোভের জন্য স্পর্শ করবে না, বরং প্রার্থনার জন্য মাথা নত করবে। গুপ্তমণি হয়ে উঠল গ্রামের অভিভাবক, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ। আর অনিন্দিতা হয়ে উঠল সেই পরিবারের ইতিহাসে প্রথম নারী, যিনি সত্যিকারের সাধক হিসেবে স্মরণীয় রইলেন। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হলো শেষ বাক্য—“গুপ্তমণির শক্তি মানুষের নয়, মানুষের অন্তরের আলোকেই তার শক্তি জাগ্রত হয়।” এভাবেই শেষ হলো লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা আর অন্ধকারের কাহিনি, আর শুরু হলো নতুন ভোরের যাত্রা।
সমাপ্ত



