সুতীৰ্থ সান্যাল
১
কাশীর গঙ্গার ধারে অনন্তকালের মতো জ্বলতে থাকা মহাশ্মশান যেন মৃত্যুর এক অনন্ত নাট্যমঞ্চ। দিনের আলো ঢলে পড়তেই ঘাটের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে গলিত মোমের মতো গরম ধোঁয়া, ছাইয়ের তীব্র গন্ধ, আর কাঠ পুড়বার ফসফস শব্দ। কখনো শোনা যায় শবযাত্রার করুণ সুর, কখনো আবার ভেসে আসে পুরোহিতদের গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ। নদীর জলকেও মনে হয় যেন এক অন্তহীন ছাইয়ের আয়না, যেখানে মৃতদেহ ভেসে আসে, দাহ হয়, আর আগুনের পর শেষ হয়ে যায় সব। আকাশের কালো ধোঁয়া আর লালচে শিখা যেন মিলেমিশে আড়াল করে দেয় চাঁদ-তারা। এই শ্মশানই কাশীর মানুষের কাছে মুক্তির দ্বার, কিন্তু একইসঙ্গে ভয়েরও। কারণ এখানে জীবন আর মৃত্যু দু’জন পাশাপাশি বসবাস করে, কেউ জানে না কোন ছায়া আলো, আর কোনটা অন্ধকার। এই ভয়ংকর অথচ পবিত্র পরিবেশেই প্রবেশ করে অঘোরানন্দ, যে এসেছে নিজের শরীর-মনকে ত্যাগ করে মৃত্যুর ওপারের মুক্তি ছোঁবার জন্য। তার পায়ের ধুলো মিশে যায় ভেজা ছাইয়ে, আর ছাইয়ের মৃদু উষ্ণতা যেন তাকে স্বাগত জানায়।
অঘোরানন্দের চোখ গভীর, জটাজুটে ভরা মাথা, কপালে ছাই লেপা, আর শরীর শুকনো কাঠের মতো—তবু তার মধ্যে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। বহু বছর আগে সংসার ছেড়ে আসা এই সাধক জানে, মহাশ্মশান শুধুই মৃতদের শেষ আশ্রয় নয়; এটি হলো আত্মার প্রকৃত পরীক্ষার স্থান। চল্লিশ দিন ধরে সে মহামৃত্যুঞ্জয় সাধনায় বসবে—এ সাধনার লক্ষ্য, মৃত্যুকে জয় করে শিবের কৃপায় অমৃত আত্মার ছোঁয়া পাওয়া। কিন্তু সহজে কি তা সম্ভব? বাতাসে ভেসে বেড়ানো অশরীরীরা, দাহ হওয়া দেহের আর্তচিৎকার, নদীর জলে ভাসমান মৃতের চোখ—সবই যেন সাধকের সংকল্পকে প্রতিদিন পরীক্ষা করবে। শ্মশানরক্ষক কালু দোম দূর থেকে দেখে, এই আগন্তুকের সাহসের মাপকাঠি। কালু বহু মৃতদেহ পুড়িয়েছে, অসংখ্য সাধক আসতে-যেতে দেখেছে, কিন্তু মহাশ্মশানের রহস্যময় আগুনকে জয় করতে কাউকেই সে সত্যিকারের মুক্তি পেতে দেখেনি। তবুও অঘোরানন্দের আগমন যেন এক নতুন কাহিনির সূচনা।
যখন শবদাহের আগুন কাশীর আকাশ ছুঁয়ে ওঠে, তখন অঘোরানন্দ মাটিতে আসন পেতে বসে যায়। তার সামনে গঙ্গার ঢেউ কেবল জলের শব্দ নয়, মনে হয় যেন মৃতদের অশ্রুধারা। তার কানে ভেসে আসে মন্ত্র—“ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্”—যা সে বারবার উচ্চারণ করতে থাকে। তার শ্বাস ধীরে ধীরে ছন্দময় হয়ে ওঠে, শরীর স্থির হয়, কিন্তু চারপাশের ভয়াবহতা তাকে ঘিরে ধরে এক অদৃশ্য আবেশে। মনে হয়, প্রতিটি দাহ হওয়া মৃতদেহ যেন তার সাধনার সাক্ষী, প্রতিটি শিখা যেন তার প্রতিজ্ঞাকে যাচাই করছে। ছাইয়ের ধোঁয়ায় ভেসে থাকা কাশী যেন কেবল নগরী নয়, বরং মৃত্যু ও মুক্তির মধ্যবর্তী এক অতল জগৎ, যেখানে সময়ের হিসেব থেমে যায়। সেই ভয়ঙ্কর অথচ আধ্যাত্মিক মুহূর্তে শুরু হয় অঘোরানন্দের চল্লিশ দিনের পরীক্ষা—যা হয়তো তাকে দিবে চরম মুক্তি, নয়তো টেনে নেবে এমন এক অন্ধকারে, যেখান থেকে আর কখনো ফিরে আসা সম্ভব নয়।
২
অঘোরানন্দের জীবন একসময় ছিল একেবারেই সাধারণ, কিন্তু সেই সাধারণ জীবনের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল অশান্তির গভীর ঝড়। সে ছিল এক গৃহস্থ মানুষ—স্ত্রী, ছোট্ট এক কন্যাসন্তান আর সাধারণ সংসার নিয়ে। সকালে বাজারে যাওয়া, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা, পূজার ঘরে প্রদীপ জ্বালানো—সবকিছুই চলত নিখুঁত নিয়মে। কিন্তু জীবন তো অনেক সময়ই নিজের নিয়মে চলে না। হঠাৎ এক মহামারীর ছোবলে তার স্ত্রী ও সন্তান দু’জনেই চলে গেল অকালে। একসঙ্গে দুটি শ্মশানযাত্রা অঘোরানন্দকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। গঙ্গার জলে কন্যার মুখ ভেসে ওঠে বারবার, স্ত্রীর গলাধ্বনি শোনা যায় অশরীরীর মতো—এই বেদনাই তার ভিতরের সবটুকু ভেঙে দেয়। সেইদিন থেকেই সংসার তার কাছে অচেনা হয়ে ওঠে; আর ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে নিঃশ্বাস নিতে গিয়েও তার মনে হয়, মৃত্যু যেন তাকে পিছু টেনে ধরে আছে। দিনদিন সেই টান বেড়ে ওঠে এতটাই যে, একসময় সে সব ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে পথে। প্রথমে শ্মশানের ধারে বসে থাকত নিছক বিষাদের ভারে, কিন্তু পরে বুঝল—এই মৃত্যুর ভেতরেই লুকিয়ে আছে মুক্তির পথ। তখন থেকেই শুরু হয় তার অঘোর জীবন, মন্ত্রের অনুশীলন, শরীর ও মনের কঠোর সাধনা।
অঘোরানন্দ জানত, সাধনা মানে কেবল চোখ বুজে বসে থাকা নয়; বরং প্রতিদিন নিজের ভেতরের ভয়কে ভাঙা, মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে স্থির থাকা। সাধারণ মানুষ যেখানে শ্মশানের ধোঁয়া, আগুন, কঙ্কাল দেখে আতঙ্কে পিছিয়ে যায়, সেখানে সে খুঁজে নেয় মহাশূন্যের অমোঘ সত্য। প্রতিটি মৃতদেহের সঙ্গে সে অনুভব করত এক চরম বিচ্ছেদ, কিন্তু একইসঙ্গে এক অদ্ভুত শান্তিও। তার বিশ্বাস জন্মেছিল—শিবের মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র কেবল মৃত্যুকে জেতার নয়, বরং জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী অন্ধকার পর্দা ছিঁড়ে মুক্ত আত্মার পথে এগিয়ে যাওয়ার চাবিকাঠি। সেই বিশ্বাস থেকেই তার প্রতিজ্ঞা আরও দৃঢ় হয়—“এই সাধনায় সফল হলে আমি শিবের কৃপায় অমৃত স্পর্শ পাব, আর যদি ব্যর্থ হই, তবে আর কোনোদিন জীবিত এই দেহ নিয়ে ফিরব না।” প্রতিজ্ঞার এই শব্দগুলো তার কণ্ঠ থেকে বেরোতেই চারপাশে যেন গম্ভীর নীরবতা নেমে আসে, শ্মশানের আগুন মৃদু কাঁপে, আর রাতের বাতাসে ভেসে আসে অদৃশ্য প্রতিধ্বনি। যেন পুরো মহাশ্মশানই সাক্ষী হয়ে রইল তার সংকল্পের।
তার চোখে সেই মুহূর্তে জ্বলে ওঠে এক অদম্য দৃঢ়তা, যা সংসারের মানুষদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। সাধারণ মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়, জীবনকে আঁকড়ে ধরে; কিন্তু অঘোরানন্দ মৃত্যু ও জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল নিজের নিয়তি। সে আর সংসারের মানুষ নয়, সে আর কেবল শ্মশানের দর্শক নয়—সে এখন মৃত্যুকে জয় করার যোদ্ধা। তার অন্তরের যন্ত্রণা তাকে শিখিয়েছে, আসল মুক্তি কেবল সংসার বা ভালোবাসায় নয়, বরং সবকিছু ত্যাগ করে অমরত্বের ছোঁয়া পাওয়ায়। তাই সে মহাশ্মশানের ধূসর ছাইয়ের ভেতর বসে, মন্ত্রের প্রতিটি অক্ষরকে নিজের শ্বাসের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে, আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় নিজেকে জড়িয়ে নেয় এক পরীক্ষার সূচনায়। জানে, চল্লিশ দিনের এই সাধনা হয়তো তাকে শিবের দরজায় পৌঁছে দেবে, নয়তো তাকে শ্মশানের আরেকটি ছাই হয়ে মিশিয়ে দেবে অনন্ত অন্ধকারে। কিন্তু তার কাছে ভয় নেই, দ্বিধা নেই, কেবল আছে এক অমোঘ সংকল্প—যে সংকল্প ভেঙে দেবে সংসারের সব বন্ধন আর বেদনাকে। এখান থেকেই শুরু হয় তার প্রকৃত সাধনা, যা জীবন-মৃত্যুর সীমারেখাকেও চ্যালেঞ্জ জানায়।
৩
রাতের আঁধার যখন গঙ্গার কালো জলে মিশে গিয়ে অদ্ভুত এক স্তব্ধতা তৈরি করে, তখন মহাশ্মশানের ধারে আগুনের ফসফস শব্দই হয়ে ওঠে একমাত্র সঙ্গীত। সেই আগুনের চারপাশে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায় এক বুড়ো মানুষ—কালু দোম। শ্মশানঘাটে যার হাতের ছোঁয়া ছাড়া কোনো দাহ সম্পূর্ণ হয় না, সে বহু বছর ধরে এই ঘাটেরই বাসিন্দা। কালুর মুখের রেখাগুলো যেন সময়ের গভীর খোদাই, তার চোখে মৃত্যু দেখে অভ্যস্ত মানুষের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। তার গায়ের চামড়া পুড়ে যাওয়া কাঠের মতো কালচে, কপালে চিরস্থায়ী ঘামের দাগ, আর হাত দুটো শক্ত হয়ে গেছে অনবরত কাঠ টেনে আনার অভ্যাসে। মৃতদেহের কাছে বসে থাকা, আগুন জ্বালানো, ছাই মেশানো—এসব তার কাছে যেন দৈনন্দিন কাজ, ঠিক যেমন অন্যের কাছে বাজার করা বা জমিতে চাষ। কিন্তু আজ রাতটা আলাদা; কারণ তার সামনে বসে আছে অঘোরানন্দ, যে চল্লিশ দিনের জন্য মৃত্যু আর মুক্তির সঙ্গে লড়াই করার সংকল্প নিয়েছে। কালুর মনে হয়, এ সাধক বাকি সকলের মতো সাধারণ নয়। তবুও সে নিজের অভিজ্ঞতার ভারে চুপ থাকতে পারে না, অচেনা সাধকের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলে ওঠে—“মহাশ্মশান খেলে না, বাবু! এখানে যার সঙ্গে খেলা শুরু হয়, তার শেষ আর নিজের হাতে হয় না।”
অঘোরানন্দের চোখ তখনও অগ্নিশিখার আলোয় জ্বলছে, কিন্তু তার কণ্ঠ স্থির। সে কালুর কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকায়, তারপর ধীরে বলে—“খেলতে নয়, মুক্তি পেতে এসেছি।” কালু হালকা হেসে মাথা নেড়ে দেয়। তার অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে—শ্মশান অনেক সাধককে গিলে নিয়েছে, কেউ কেউ উন্মাদ হয়ে গেছে, কেউ আবার নিখোঁজ হয়ে চিরতরে ছাই হয়ে মিশে গেছে। সে জানে, এই জগতে সাহস যতটা দরকার, ততটাই দরকার মনের শক্তি। তাই সে সতর্ক করতে থাকে। আগুনে নতুন করে কাঠের টুকরো ছুঁড়ে দিতে দিতে সে বলে—“শ্মশান আপনাকে দেখে নেবে। আপনি যতই শিবের নাম করুন, যতই মন্ত্র জপ করুন, এখানে সব পরীক্ষা হবে। যে পরীক্ষা হারতে হারতে সবাই হেরে যায়। মহাশ্মশান কারও দয়া করে না।” তার গলায় ভয় নেই, বরং এক অভ্যস্ত মানুষের নির্লিপ্ততা, কিন্তু কথার ভেতরে অদ্ভুত একটা সতর্ক সংকেত বেজে ওঠে। অঘোরানন্দ সেই সংকেত শুনেও তার মন্ত্রে মনোযোগী থাকে, তবে মনে মনে বোঝে, এ স্থান কেবল মুক্তির দ্বার নয়—এ এক ভয়ংকর খাদের কিনারাও।
কালু দোমের উপস্থিতি যেন মহাশ্মশানের মানুষের মুখ। দিনে সে শ্মশানের জন্য কাঠ জোগাড় করে, রাতে মশাল হাতে মৃতদেহের পাশে বসে থাকে, শ্মশানবাসীদের নিরাপদে দাহ করায়। তার অভ্যস্ত হাতে ছাই মাখা, আগুন জ্বালানো, মৃতদেহ সোজা করে বসানো—সব যেন স্বাভাবিক। অথচ এই ভয়ঙ্কর কাজ করতে করতে সে মানুষের জীবন-মৃত্যুর হিসেবকে এক ভিন্নভাবে দেখতে শিখেছে। তার চোখে মৃত্যু আর ভয় নেই, বরং মৃত্যু এক দীর্ঘসঙ্গী। অঘোরানন্দের দিকে তাকিয়ে সে ভাবে—এই মানুষটি হয়তো সত্যিই মুক্তি খুঁজছে, কিন্তু মুক্তি কি এভাবে পাওয়া যায়? শ্মশান আগুন সবকিছু ভস্ম করে দেয়, মানুষের শরীরের মতোই ভস্ম করে দেয় তাদের স্বপ্ন, তাদের সাধনা, তাদের সংকল্প। তবুও কালু জানে, কেউ যদি সত্যিই মৃত্যুকে জয় করতে পারে, তবে তাকে এই মহাশ্মশানেই করতে হবে। তাই সে সতর্ক করার পরেও চুপচাপ থেকে যায়, মাঝে মাঝে অঘোরানন্দকে দেখে, আবার নিজের কাজে ডুবে যায়। তার অন্তরেও কৌতূহল জাগে—চল্লিশ দিন পর এই সাধক কি ছাই হয়ে মিলিয়ে যাবে, নাকি সত্যিই মহাশ্মশান তাকে কিছু দেবে, যা কালু দোম আজ পর্যন্ত দেখেনি? রাত এগোতে থাকে, গঙ্গার ঢেউ ভেসে আসে, আগুন ধীরে ধীরে নিভে যায়, কিন্তু কালুর চোখে সেই আগন্তুক সাধককে ঘিরে জেগে থাকে অদৃশ্য প্রশ্নচিহ্ন।
৪
চতুর্থ রাত নেমে এসেছে কাশীর মহাশ্মশানে। গঙ্গার বাতাস ভারী হয়ে আছে দাহ হওয়া দেহের ধোঁয়া আর ছাইয়ে, যেন প্রতিটি শ্বাসের ভেতরেও মৃত্যু লুকিয়ে আছে। চারপাশে শ্মশানঘাটের অগ্নিশিখাগুলো একে একে জ্বলে ওঠে, আর সেই আগুনের আলোয় গাঢ় ছায়া নাচে। শ্মশানের রাত সাধারণ মানুষের কাছে ভয়ংকর, কিন্তু সাধক অঘোরানন্দের কাছে এটাই তার পরীক্ষার ক্ষেত্র। সে আসনে বসে মন্ত্রোচ্চারণ করছে, শরীর স্থির, চোখ বন্ধ, কিন্তু চারপাশে অদ্ভুত এক অস্বাভাবিকতা জমাট বাঁধছে। আগুনের শিখাগুলো আচমকা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে থাকে, কখনো লম্বা হয়ে ওঠে, কখনো আবার নিচু হয়ে পড়ে যেন ধপধপ করছে। আর ঠিক তখনই, তার দৃষ্টি পড়ে আগুনের ভেতর এক অচেনা দৃশ্যে। জ্বলন্ত কাঠের ভেতর থেকে, আগুনের ফাঁকে ফাঁকে যেন মানুষের মুখ ভেসে উঠছে—কখনো বিকৃত, কখনো যন্ত্রণায় ভরা, আবার কখনো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকা মুখ। মনে হয়, সেই চোখগুলো সরাসরি তাকিয়ে আছে তার দিকে, এমন এক দৃষ্টি যা তাকে ভেদ করে যাচ্ছে। শ্মশানের চারপাশ নিস্তব্ধ, কেবল আগুনের ফটফট শব্দ, কিন্তু সেই মুখগুলো যেন নিঃশব্দে আর্তনাদ করছে।
অঘোরানন্দ প্রথমে চোখ কচলে নেয়, ভাবে হয়তো ক্লান্তি কিংবা দীর্ঘ ধ্যানের কারণে এমন ভ্রম হচ্ছে। তবুও তার ভেতরে এক শীতল স্রোত বয়ে যায়। সে মন্ত্র উচ্চারণ জোরে জোরে শুরু করে, যাতে মন স্থির থাকে, যাতে ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ না করে। কিন্তু যতই সে মন্ত্র জপতে থাকে, ততই আগুন যেন তাকে নিয়ে খেলা করতে শুরু করে। এক একটি মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কাঠ ভেঙে পড়ার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় যেন সেই মৃতদের ঠোঁট নড়ে উঠছে। “বাবা…” “মুক্তি…”—এমন ভাঙাচোরা শব্দ তার কানে বাজে, যদিও চারপাশে আর কেউ নেই। সে চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে নেয়, মনে মনে ভাবে—এ সবই তার মনের খেলা, এ সব কেবল বিভ্রম। কিন্তু অজান্তেই তার মনের গভীরে ভয় জায়গা করে নেয়, কারণ সে জানে এই মহাশ্মশান কেবল মাটি আর আগুন নয়, এখানে বহু আত্মার অশান্তি ঘোরাফেরা করে। সাধনার চতুর্থ রাতেই যদি এমন বিভ্রম শুরু হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে কি অপেক্ষা করছে তার জন্য?
তবুও অঘোরানন্দ নিজের সংকল্প ভাঙতে দেয় না। সে মনকে দৃঢ় করে আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন চোখে চোখ রেখে মেনে নেয়—এখানে যা কিছু ঘটছে সবই তার পরীক্ষার অংশ। আগুন তার সঙ্গে কথা বলছে, তাকে ভয় দেখাচ্ছে, তাকে টেনে নিতে চাইছে অতলে। হয়তো শ্মশানের এই আগুনই আসল ভাষায় তাকে সতর্ক করছে—“এই পথ সহজ নয়।” তার ভেতরের এক অংশ ভয় পেয়ে উঠলেও, আরেক অংশ শক্ত হয়ে ওঠে। সে মনে মনে ভাবে, “যদি এটাই মৃত্যু, তবে আমি তার মুখোমুখি হব।” রাত যত গভীর হয়, মুখগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, আগুন আবার সাধারণ হয়ে ওঠে। তবু সেই চোখগুলোর দৃষ্টি যেন অঘোরানন্দের মনে গেঁথে যায়, মন্ত্র জপের ফাঁকে ফাঁকে সে তাদের স্মৃতি ঝেড়ে ফেলতে পারে না। শ্মশান নিস্তব্ধ, আগুনের আলো কমে আসছে, কিন্তু অঘোরানন্দ জানে—আজ রাতে সে শুধু আগুনে মুখ দেখেনি, আগুনের ভাষাও শুনেছে। সেই ভাষা তাকে ভীত করেছে, কিন্তু একইসঙ্গে আরও এক ধাপ শক্তিও দিয়েছে, যেন সে বুঝে গেছে মুক্তির পথে প্রতিটি মুহূর্তই ভয় আর বিভ্রমে আচ্ছন্ন হবে। আর সে প্রতিজ্ঞা করেছে—এই ভয় জয় না করলে মুক্তি নেই।
৫
অষ্টম দিনের ভোর গঙ্গার তীরে এক অদ্ভুত নীরবতা নামিয়ে এনেছিল। শ্মশানঘাটে আগুনের ধোঁয়া তখনও হালকা কুয়াশার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে, আর নদীর জলে সেই ধোঁয়া মিলেমিশে যেন অদৃশ্য এক পর্দা টেনে দিয়েছে। অঘোরানন্দ সারা রাত মন্ত্রোচ্চারণ করে কাটিয়েছে, শরীর ক্লান্ত, তবুও তার চোখে অদ্ভুত এক জাগরণ। ভোরের আলো ফোটার সময় সে গঙ্গার ধারে এগিয়ে যায়, ভাবছিল কেবল একটু শীতলতা অনুভব করবে, মন্ত্রপাঠের ক্লান্তি দূর করবে। নদীর জলে মুখ ধোয়ার জন্য ঝুঁকতেই তার দৃষ্টি পড়ে জলে ভেসে ওঠা নিজের প্রতিচ্ছবিতে। প্রথমে সে নিজেকেই দেখে—ক্লান্ত, কপালে ছাই মাখা, গভীর চোখ, শুকনো দেহ—যেমনটা সে জানে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই প্রতিচ্ছবির মুখে ভিন্ন এক ছায়া দেখা দেয়। ঠোঁটে এক অদ্ভুত ব্যঙ্গাত্মক হাসি, চোখে এমন এক ঝলক যা যেন তার মনের গোপনতম ভয়কেই উন্মোচিত করছে। সে চমকে উঠে পেছনে সরে যায়, কিন্তু প্রতিচ্ছবি মিলিয়ে যায় না। বরং নদীর ঢেউ যেন তাকে আরও কাছে টেনে আনে।
সেই মুহূর্তে প্রতিচ্ছবির ঠোঁট নড়ে ওঠে, অথচ চারপাশে নিস্তব্ধতা বজায় থাকে। শব্দ যেন সরাসরি অঘোরানন্দের মনে প্রবেশ করে—“তুমি মুক্তি খুঁজছ, না মৃত্যুকে ডাকছ?” প্রশ্নটা যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করে। অঘোরানন্দ শ্বাস নিতে ভুলে যায় এক মুহূর্তের জন্য। সে তো ভেবেছিল মৃত্যুর ওপারে মুক্তি লুকিয়ে আছে, কিন্তু এই প্রশ্ন যেন তাকে নিজের প্রতিজ্ঞা নিয়েই সন্দেহে ফেলে দেয়। সে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করে—“আমি কি ভুল করছি? আমি কি সত্যিই মুক্তি চাইছি, নাকি কেবল মৃত্যুর অন্ধকারে ডুবতে চাইছি?” প্রতিচ্ছবি মুচকি হেসে উত্তর দেয় না, কেবল স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে, যেন তার মনের গভীরতম গোপনকে উন্মোচন করতে চাইছে। চারপাশে নদীর ঢেউ, শ্মশানের ছাই, আর দাহের গন্ধ—সবকিছু যেন থেমে গিয়ে এই সংলাপের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। অঘোরানন্দ কাঁপতে থাকে ভেতরে ভেতরে, কারণ সে বুঝতে পারছে না—এটা কি কেবল তার ক্লান্ত মনের ভ্রম, নাকি সত্যিই কোনো অদৃশ্য শক্তি তার সঙ্গে কথা বলছে।
সে আবার আসনে বসে চোখ বন্ধ করে, চেষ্টা করে মন্ত্রের জপে মনকে স্থির করতে। কিন্তু যতবার চোখ বন্ধ করে, ততবার প্রতিচ্ছবির সেই প্রশ্ন তার মনে প্রতিধ্বনিত হয়। “মুক্তি খুঁজছ, না মৃত্যুকে ডাকছ?” এই শব্দগুলো যেন তার চারপাশের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। সে ভাবতে থাকে—তার এই সাধনার লক্ষ্য আসলে কী? স্ত্রী ও কন্যার মৃত্যুর পর সে সংসার ছেড়েছিল, কিন্তু মুক্তির খোঁজে এসেছে নাকি শ্মশানের আগুনে নিজেকে বিলীন করার জন্য? তার অন্তরের ভাঙন যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই প্রশ্নের আঘাতে। অনেকক্ষণ ধ্যান করে, অঘোরানন্দ অবশেষে চোখ খোলে। তার দৃষ্টি আবার পড়ে গঙ্গার জলে, কিন্তু এবার প্রতিচ্ছবি নিঃশব্দ, কেবল ঢেউয়ে ভেঙে ভেঙে যায়। সে গভীর শ্বাস নেয়, বুঝতে পারে, এই পরীক্ষাগুলো কেবল বাইরে নয়, তার ভেতরেও চলছে। শ্মশান কেবল মৃতদের আগুনে পূর্ণ নয়, বরং জীবিত মানুষের মনেও আগুন জ্বালায়। আর সেই আগুনের শিখায় জ্বলে ওঠে ভয়, সন্দেহ, আকাঙ্ক্ষা। সে আবার প্রতিজ্ঞা করে—ভয় তাকে ভাঙতে পারবে না। কিন্তু অন্তরের এক অদৃশ্য কাঁপন রয়ে যায়, যা হয়তো তার ভবিষ্যতের সাধনার পথ আরও ভীতিকর করে তুলবে।
৬
সেদিন রাতটা ছিল অঘোরানন্দের জন্য একেবারে ভিন্নতর। আকাশে পূর্ণিমার আলো, গঙ্গার বুকে সেই আলো ভেঙে পড়ছিল হীরের মতো ঝিকমিক করে, আর চারদিকে শ্মশানের চিরন্তন আগুন দপদপ করে জ্বলছিল। সাধক মন্ত্রপাঠে নিমগ্ন, কিন্তু অদ্ভুত এক অস্থিরতা তার মনে ভর করেছিল। মনে হচ্ছিল, অদৃশ্য কারও দৃষ্টি তার ওপর নিবদ্ধ হয়ে আছে। হঠাৎ করেই কানে ভেসে আসে কারও পায়ের শব্দ—নরম, স্নিগ্ধ, যেন গঙ্গার ধারে বালির ওপর দিয়ে ভিজে পা ফেলে এগিয়ে আসছে কেউ। সে চোখ মেলে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে যায়। চাঁদের আলোয় এক নারীকে দেখতে পায়—সাদা শাড়ি, ভেজা কাপড় শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, লম্বা চুল কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে, আর তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। নারী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, তার পদক্ষেপে যেন আশেপাশের আগুনও দপ করে কেঁপে ওঠে। অঘোরানন্দ প্রথমে ভেবেছিল হয়তো শ্মশান-ঘাটের কোনো শোকার্ত আত্মীয়া ভুল করে এখানে চলে এসেছে, কিন্তু তার পরেই বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে, কারণ ওই নারীকে ঘিরে ছিল এক অব্যাখ্যাত অতিলৌকিক আবহ, যেন সময় ও স্থান তার চারপাশে অন্যভাবে প্রবাহিত হচ্ছে।
নারী এসে তার সামনে দাঁড়াল। কণ্ঠস্বর মৃদু, কিন্তু তাতে এমন এক আকর্ষণ যা অঘোরানন্দকে অবচেতনেই টেনে নিল ভেতরে। সে বলল—“তুমি শেষ করো সাধনা, আমি তোমাকে মুক্তির পথ দেখাব।” কথাগুলো যেন সান্ত্বনা, আবার আদেশও। অঘোরানন্দের মনে হলো, এ নারী কেবল মানুষ নয়, হয়তো কোনো দেবীসত্তা, যে তাকে পথ দেখাতে এসেছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখে ধরা পড়ে অন্য এক স্রোত—নারীর দৃষ্টিতে এক ভয়ংকর রহস্যের ঝিলিক। চাহনিতে ছিল এক অজানা হিংস্রতা, এক অদ্ভুত দহন, যেন সে একইসাথে স্নেহময়ী মা, আবার ভয়ংকর শ্মশানকালী। অঘোরানন্দ চেষ্টা করে নিজেকে সামলাতে, নিজের মন্ত্রে মন স্থির রাখতে, কিন্তু তার কানে ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে সেই মায়াবী কণ্ঠস্বর। নারী ধীরে ধীরে তার চারপাশে হাঁটতে শুরু করে, আর তার ভেজা শাড়ি থেকে টপটপ করে জল ঝরে পড়ছে শ্মশানের ধুলোয়। প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের বাতাস যেন আরও শীতল হয়ে উঠছে। অঘোরানন্দের মনে হলো, এ নারী যদি সত্যিই মুক্তির পথ দেখায়, তবে সে আজীবনের সাধনা সফল হবে, কিন্তু একইসাথে তার বুকের ভেতর তীব্র ভয় জমাট বাঁধতে শুরু করল। কারণ সে বুঝতে পারছে না—এই আশ্বাস কি মুক্তির ডাক, নাকি মৃত্যুর ফাঁদ?
নারী তখন তার সামনে থেমে আবার বলল—“তুমি ভয় পেয়ো না, আমি আছি।” তার চোখের গভীর অন্ধকারে যেন হাজার মৃত আত্মার ছায়া লুকিয়ে আছে। অঘোরানন্দ শ্মশানের চারপাশে তাকাল—আগুনগুলো যেন হঠাৎ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আর দূরে কোথাও শবদাহ চলছিল, তার মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল অন্য এক অচেনা সুর। নারী হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে, সাদা শাড়ির ভেজা আঁচল বাতাসে দুলে উঠল, আর সেই মুহূর্তে অঘোরানন্দের বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে হাত বাড়াবে কি বাড়াবে না—এই দ্বিধায় জমে গেল। একদিকে মুক্তির লোভ, অন্যদিকে ভয়ংকর অজানার অন্ধকার। নারী তখন মুচকি হেসে বলল—“সব প্রশ্নের উত্তর আছে, কিন্তু কেবল তার জন্যই, যে ভয়ের সীমানা পেরোতে পারে।” কথাগুলো শেষ হতেই তার চারপাশের ছায়াগুলো যেন একসঙ্গে নড়েচড়ে উঠল, শ্মশানঘাটের নীরবতা ভেঙে উঠল মৃদু হাহাকার। অঘোরানন্দের মনে হলো—তার সাধনার সত্যিকারের পরীক্ষা শুরু হয়েছে আজ রাতে। নারীটি কি সত্যিই মুক্তির পথের দূত, নাকি শ্মশানের অতৃপ্ত আত্মাদের মায়াজাল—সে জানে না। শুধু জানে, এই রাতের পর তার জীবন আর সাধনা কোনোভাবেই আগের মতো থাকবে না।
৭
ত্রয়োদশ রাতের শ্মশানঘাট ছিল অন্য রাতগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক নীরব। কাশীর আকাশে চাঁদ অর্ধেক, তার ক্ষীণ আলো নদীর জলে ভেঙে ভেঙে পড়ছিল, যেন অস্থির ছায়ার খেলা। গঙ্গার ধারে অনন্ত দাহের আগুন তবু জ্বলছিল, ছাই আর ধোঁয়ায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। অঘোরানন্দ আজ দীর্ঘ সময় ধরে মন্ত্রোচ্চারণ করছিল, তার কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে উঠেছিল, চোখ দুটো লালচে। শরীর দুর্বল হলেও তার সংকল্প ভাঙেনি। কিন্তু মনের গভীরে আজ এক অদ্ভুত অশান্তি জন্ম নিয়েছিল। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অর্ধদগ্ধ মৃতদেহগুলো যেন আজ বিশেষভাবে তার উপস্থিতি টের পাচ্ছিল। আগুনের ভেতর শুয়ে থাকা সেই দেহগুলোর ভাঙাচোরা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, মুখে ছাই মাখা চামড়া, কঙ্কালের মতো হাত—সবই যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে সে ভেবেছিল—ক্লান্তির কারণে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই বুকের ভেতর হিম হয়ে গেল, কারণ স্পষ্ট দেখতে পেল—দাহ হতে থাকা প্রতিটি মৃতদেহের চোখ যেন হঠাৎ জীবিত হয়ে উঠেছে। সেই চোখগুলো নিস্পলক, অনন্ত গভীর, আর তার দৃষ্টিকে বিদ্ধ করে ছুঁড়ে মারছে।
অঘোরানন্দ চমকে উঠে চারপাশে তাকাল। আগুনের ভেতরে যে দেহগুলো ধীরে ধীরে ছাই হয়ে যাচ্ছে, তারা সকলেই যেন তাকে লক্ষ্য করছে। দগ্ধ মুখের খোলা চোখ, ফাঁকা চাহনি, আর সেই চাহনির ভেতরে জমাট বাঁধা অভিযোগ, হাহাকার কিংবা এক অদ্ভুত টান। সাধকের মন্ত্রোচ্চারণ কেঁপে উঠল, ঠোঁট শুকিয়ে এল, কিন্তু শব্দ থামল না। সে জানত—এ তার সাধনার পরীক্ষা। কিন্তু চোখগুলোর ভেতরে যেন ভয়ংকর এক অদৃশ্য শক্তি লুকিয়ে আছে। প্রতিটি দৃষ্টি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এমন এক জগতে, যেখানে মৃত্যু ও জীবন আলাদা নয়, বরং এক অদ্ভুত মিলনে আবদ্ধ। সে অনুভব করল, তার শরীর ধীরে ধীরে ভারী হয়ে যাচ্ছে, মাটির সঙ্গে আটকে যাচ্ছে, যেন আগুন থেকে দাহমান ছাই উঠে এসে তাকে গ্রাস করছে। বাতাসে ভেসে বেড়ানো গন্ধ আরও তীব্র হয়ে উঠল, আর শ্মশানঘাটের হাহাকার যেন মন্ত্রের সঙ্গে মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করল। চোখ বন্ধ করতে চাইলেও পারল না, কারণ মৃতদের চোখ তাকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করল। তার মনে হলো, এই দৃষ্টি কেবল দেখছে না, তাকে ভেতর থেকে উল্টে পাল্টে দিচ্ছে, তার পাপ, তার ভয়, তার কামনা—সবকিছুকে উন্মোচন করছে।
ধীরে ধীরে অঘোরানন্দ অনুভব করল, সে একা নয়। দাহ হওয়া দেহগুলোর ভেতর থেকে অদৃশ্য কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে—কেউ ফিসফিস করে ডাকছে, কেউ কাঁদছে, কেউ আবার তীব্র শ্বাসে তাকে নাম ধরে ডেকে বলছে, “এসো… এসো…”। গঙ্গার হাওয়ার সঙ্গে সেই ডাক মিশে গিয়ে আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, মৃতদের এই চোখ ও কণ্ঠস্বর তাকে কোনো এক অদৃশ্য জগতে টেনে নিতে চাইছে। সেটা কি মুক্তির জগত, নাকি অন্ধকারের অতল গহ্বর—সে জানে না। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, বুকের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। একদিকে ভয় তাকে বিদ্ধ করছে, অন্যদিকে এক অদ্ভুত আকর্ষণ তাকে সেই চোখগুলোর দিকে টেনে নিচ্ছে। সে হাত তুলে মন্ত্রোচ্চারণ আরও জোরে করতে লাগল, চেষ্টা করল এই ভয়ংকর মায়া ভাঙতে। কিন্তু চোখগুলো নিভে গেল না, বরং এক অদৃশ্য অগ্নিশিখার মতো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেই চোখের দৃষ্টিতে ছিল না কেবল মৃত্যু, ছিল এক অনন্ত ডাক—যেন সমগ্র মহাশ্মশান তাকে নিজের অঙ্গ করে নিতে চাইছে। অঘোরানন্দ তখন বুঝল, তার সাধনার ত্রয়োদশ রাত মানে কেবল সময়ের অতিক্রম নয়, বরং মৃতদের সঙ্গে তার আত্মার প্রথম প্রকৃত মিলন। আর এই মিলন থেকে সে ফিরতে পারবে কি না, সে বিষয়ে তার আর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
৮
চতুর্দশ রাতের গাঢ় অন্ধকারে কাশীর মহাশ্মশান ঘাট যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছিল। গঙ্গার জল সেদিন অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ, কোনো ঢেউ নেই, কেবল মাঝেমধ্যে মৃতদেহ ভাসিয়ে আনা নৌকার কাঠের শব্দ। অঘোরানন্দ মন্ত্রোচ্চারণে নিমগ্ন, কিন্তু তার মনের ভেতর কেমন এক শূন্যতা চেপে বসেছিল। প্রতিদিনের মতো কালু দোমের পায়ের শব্দ, তার কর্কশ কণ্ঠে শবদাহের ঘোষণা, কিংবা চিতায় কাঠ রাখার আওয়াজ—সবকিছুই এ রাতে অনুপস্থিত। চারদিকে ছাই, ধোঁয়া, আর দাহমান আগুন জ্বলছিল, অথচ দোমের অস্তিত্ব নেই। প্রথমে অঘোরানন্দ ভেবেছিল, হয়তো দোম কোথাও অন্য শ্মশানে গেছে, কিংবা নৌকা টেনে নিয়েছে মৃতদেহ অন্য ঘাটে। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, ততই সে বুঝল, কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটেছে। কারণ মহাশ্মশানের মতো জায়গায় দোম ছাড়া কাজ হয় না, অথচ আগুন জ্বলছিল নিজের মতো। সেই আগুনে শুয়ে থাকা দেহগুলোর কাঠ কেউ রাখল না, কেউ ঘি ঢালল না, তবুও শিখা যেন নিজে থেকেই উঠে আসছিল। শ্মশানের বাতাসে ছড়িয়ে থাকা ছাই হঠাৎ যেন তার কণ্ঠরোধ করে দিল, আর সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই অঘোরানন্দ অনুভব করল, সে একা হয়ে পড়েছে—একেবারেই একা।
হঠাৎ করে চারপাশে অশরীরী ফিসফিস ধ্বনি ভেসে আসতে শুরু করল। যেন বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকা হাজার মৃত আত্মার নিঃশ্বাস তাকে ঘিরে ধরছে। “এসো… এসো… তুমি একা…”—এমন সব আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। অঘোরানন্দের বুক কেঁপে উঠল। এতদিন কালু দোমের উপস্থিতি তাকে একরকম মানুষের জগতের সাথে বেঁধে রেখেছিল। শ্মশানের ভয়াবহতা সত্ত্বেও দোমের কাজের শব্দে সে আশ্বাস পেত যে, সে পুরোপুরি অশরীরীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। কিন্তু আজ সেই মানুষটিও নেই। কালু দোম কোথায় গেল, তা কেউ জানে না। আগুনগুলো এখন নিজের মতো দাউদাউ করে জ্বলছে, ছাই হাওয়ায় উড়ছে, নদীর ধারে শূন্যতা আরও গভীর হচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো, কালুর অদৃশ্য হওয়ার সঙ্গে এই শ্মশানের রহস্যজনক শক্তির কোনো যোগ আছে। হয়তো কালু দোমকেও শ্মশান গ্রাস করেছে। আর সেই সত্য উপলব্ধি হতেই অঘোরানন্দের মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে তাকাল চারদিকে—গঙ্গার ধারে সাদা কুয়াশা জমে উঠছে, ছাইয়ের গন্ধ আরও ঘন হচ্ছে, আর ফিসফিসানি শব্দগুলো ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে।
অঘোরানন্দ চোখ বন্ধ করে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল, যেন নিজেকে রক্ষা করতে পারে এই ভৌতিক ফাঁদ থেকে। কিন্তু মন্ত্রের শব্দ তার নিজের কানে পৌঁছানোর আগেই ফিসফিসানির স্রোতে ডুবে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার মনে হলো, কালু দোম যেন এই অশরীরী ফিসফিসানির ভেতর মিশে গেছে। কোথাও থেকে কর্কশ গলায় একটি শব্দ উঠল—“আমি নেই… আমি নেই… তুমি একা…”। বুকের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা বেরিয়ে এলো, কারণ এই শব্দ দোমের কণ্ঠস্বরের মতো শোনাচ্ছিল। চারদিকে তাকালেও কাউকে দেখতে পেল না, শুধু আগুনগুলো আরও উঁচু হয়ে উঠছিল, যেন প্রতিটি শিখা তাকে ঘিরে ধরছে। অঘোরানন্দ বুঝল, আজ থেকে তার সাধনা আর মানুষ ও মৃত্যুর মাঝের কোনো সীমারেখায় নেই। আজ সে পুরোপুরি মৃতদের জগতের সাথে মুখোমুখি। কালু দোম ছিল এই শ্মশানের শেষ মানবিক সেতু—তার অন্তর্ধান মানে সেই সেতুও ভেঙে যাওয়া। এখন অঘোরানন্দ একেবারে নিঃসঙ্গ, আর এই নিঃসঙ্গতার ভেতরেই শ্মশানের ভয়ংকর সত্য ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে চলেছে।
৯
চল্লিশতম রাতের কাশী যেন আর কাশী নেই, বরং অন্য কোনো অদ্ভুত জগতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। গঙ্গার জল সেই রাতে অস্বাভাবিকভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছিল, ঢেউগুলো ভাঙতে ভাঙতে এমন শব্দ তুলছিল যেন তারা এক অদৃশ্য ভাষায় ডাক দিচ্ছে। চাঁদ ছিল পূর্ণ, কিন্তু তার আলো গঙ্গার বুকে পড়েই যেন রক্তিম হয়ে যাচ্ছিল। অঘোরানন্দ সারা দিন উপবাসে কাটিয়েছিল, কেবল অন্তরের শক্তিকে জাগ্রত রাখার জন্য। সে জানত, আজই সেই রাত, আজই সেই পরীক্ষা, যা তার সাধনার পরিণতি নির্ধারণ করবে। চারপাশে দাহের আগুন জ্বলছিল, কিন্তু আজ সেই আগুনের রঙও অদ্ভুত, কখনো সবুজ, কখনো নীল, কখনো রক্তিম হয়ে উঠছিল। অঘোরানন্দের বুকের ভেতর তীব্র স্পন্দন চলছিল। বসে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করতেই সে অনুভব করল—চারপাশের জগৎ ভেঙে যাচ্ছে। মৃতদের চাহনি যেন তার চারপাশে গাঢ় অন্ধকারের মতো ঘন হয়ে উঠছে। প্রতিটি চোখ, প্রতিটি মুখ, প্রতিটি ছাই তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন তারা সবাই আজ রাতে তার আত্মার হিসেব চাইছে।
এই মুহূর্তে হঠাৎই আবার চন্দ্রাবতীর আবির্ভাব ঘটে। ভেজা সাদা শাড়ি, ঠোঁটে সেই অদ্ভুত রহস্যময় হাসি, চোখে লুকানো গভীর অন্ধকার। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, গঙ্গার ঢেউয়ের শব্দের সাথে তার হাসি মিশে গিয়ে শ্মশানের ভেতরে এক অচেনা সঙ্গীত তুলতে থাকে। সে ফিসফিস করে বলে—“তুমি শেষ করেছো সাধনা, এসো, মুক্তির পথে চল।” কিন্তু সেই কণ্ঠের ভেতর লুকানো ছিল এক অদ্ভুত টান, যেন সে অঘোরানন্দকে টেনে নিতে চাইছে এমন এক পথে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। একইসাথে ছায়ার সেই পুরোনো প্রশ্নও আবার ফিরে আসে—“তুমি মুক্তি খুঁজছ, না মৃত্যুকে ডাকছ?” প্রতিচ্ছবি, মৃতদের চোখ, চন্দ্রাবতীর হাসি—সব মিলেমিশে চারপাশে এক ভয়াবহ ঘূর্ণাবর্ত তৈরি করে। অঘোরানন্দ জপ চালিয়ে যায়, কিন্তু যত জোরে সে মন্ত্র উচ্চারণ করে, ততই মনে হয় মন্ত্র নিজেই তাকে গ্রাস করছে। প্রতিটি শব্দ যেন তার অন্তর থেকে শক্তি শুষে নিচ্ছে, প্রতিটি অক্ষর যেন আগুন হয়ে জ্বলে তার মস্তিষ্ক দগ্ধ করছে।
তার শরীর ধীরে ধীরে ভারী হয়ে মাটিতে নুইয়ে পড়ছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু তবুও সে থামল না। গঙ্গার ঢেউয়ের শব্দে মৃতদের চিৎকার মিশে যাচ্ছিল, ছায়ারা তার চারপাশে ঘুরছিল, চন্দ্রাবতীর হাত তার দিকে বাড়ানো, আর সেই রহস্যময় চোখ যেন অনন্ত অন্ধকারের দরজা খুলে দিচ্ছে। অঘোরানন্দ তখন অনুভব করল, এ কেবল পরীক্ষা নয়, বরং এক দ্বন্দ্ব—সে কি নিজের আত্মাকে মৃত্যুর ভেতর বিলীন করবে, নাকি সমস্ত ভয়, সমস্ত মায়া অতিক্রম করে মুক্তির সত্য পথ খুঁজে বের করবে? প্রতিটি মন্ত্রের উচ্চারণে সে নিজের ভিতরে ভাঙন অনুভব করছিল, তবুও জপ থামাচ্ছিল না। চারপাশের আগুন তখন একসাথে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল, আর সেই আগুনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল হাজার মৃত আত্মার ছায়া। তাদের চোখ স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে—কেউ অভিযোগ করছে, কেউ ডাকছে, কেউ মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এই সমস্ত শক্তির মাঝখানে বসে অঘোরানন্দ বুঝল, তার সাধনার শেষ মুহূর্তে কেবল মৃত্যু নয়, মুক্তিও তার চারপাশে উপস্থিত। আর তার নিজের সংকল্পই নির্ধারণ করবে, সে কোন পথে যাবে। এই ভয়ঙ্কর রাতে, শ্মশানের আগুন, গঙ্গার ঢেউ, মৃতদের চোখ, আর মায়াবী নারীর হাসি—সব মিলেমিশে এক অদৃশ্য শক্তিতে রূপ নিল, যা তার আত্মাকে ভস্ম করে দিতে উদ্যত।
১০
শেষ রাতের শেষ প্রহর। কাশীর আকাশ তখন ফিকে, রাত আর ভোরের মাঝের অদ্ভুত এক অন্ধকারে ঢেকে আছে মহাশ্মশান। গঙ্গার ঢেউ ধীরে ধীরে ভাঙছে, কিন্তু সেই শব্দ যেন আজ অন্যরকম—কান পেতে শোনা যায়, প্রতিটি ঢেউ মন্ত্রের মতো গুনগুন করছে, আবার প্রতিটি গর্জনে মৃত্যুর ডাকও লুকিয়ে আছে। আগুনগুলো রাতভর জ্বলতে জ্বলতে এখন নিস্তেজ, ছাইয়ের ধোঁয়া বাতাসে মিলেমিশে ঘন হয়ে ঝুলে আছে। অঘোরানন্দ বসে আছে নিজের আসনে, মুখমণ্ডল ছাইমাখা, চোখ বন্ধ, ঠোঁটে শেষ জপ। তার শরীর কাঁপছে, ক্লান্তি আর যন্ত্রণার সীমা ছাড়িয়ে গেছে বহু আগেই, কিন্তু তার কণ্ঠ এখনও স্থির। সে জানে, আজ আর ফিরবার পথ নেই। “মহামৃত্যুঞ্জয়” মন্ত্রের প্রতিটি অক্ষর এখন শুধু উচ্চারণ নয়, যেন তার আত্মার গভীর থেকে ফেটে আসা চূড়ান্ত শক্তি। চোখ বন্ধ করেও সে দেখতে পাচ্ছে—চন্দ্রাবতীর রহস্যময় হাসি, মৃতদের ফাঁকা চোখ, গঙ্গার প্রতিচ্ছবি আর অশরীরী ছায়ারা সবাই তার চারপাশে ঘুরছে, শেষবারের মতো তাকে ভাঙতে চাইছে। কিন্তু সে নিজেকে সঁপে দিয়েছে এই মন্ত্রে। তার বিশ্বাস, যদি মুক্তি কোথাও থাকে, তবে এ মন্ত্রের ভেতরেই তা লুকিয়ে আছে।
হঠাৎ চারপাশের সব শব্দ মিলিয়ে গেল। ঢেউ থেমে গেল, আগুন নিভে গেল, এমনকি ছায়ার ফিসফিসানিও থেমে গেল। কেবল তার কণ্ঠস্বরই বেজে উঠল—“মহামৃত্যুঞ্জয়… মহামৃত্যুঞ্জয়…”। প্রতিটি উচ্চারণের সঙ্গে তার শরীর হালকা হয়ে আসতে লাগল, যেন সে ধীরে ধীরে শরীর ছাড়িয়ে অন্য কোনো স্তরে পা রাখছে। চোখ বন্ধ অবস্থায় সে দেখল, তার সামনে এক বিশাল দরজা খুলে যাচ্ছে—অতল আলোর দরজা, আবার তারই ছায়ায় অন্ধকারের অতল গহ্বরও। দুটো পথ পাশাপাশি, দুটোই ডাকছে তাকে। একপাশে মুক্তি, অন্যপাশে মহাশ্মশানের শাশ্বত অভিশাপ। চন্দ্রাবতীর কণ্ঠ শেষবারের মতো শোনা গেল—“এসো… আমি তোমাকে মুক্তি দেব…”। কিন্তু একইসাথে মৃতদের চোখও গর্জে উঠল—“তুমি আমাদেরই অংশ, তুমি এখানেই থাকবে চিরকাল…”। অঘোরানন্দের বুকের ভেতর শেষবারের মতো ঝড় বয়ে গেল। মন্ত্রের প্রতিটি অক্ষর তার অন্তর ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছিল, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরেই সে নিজেকে খুঁজে পেল না, কেবল এক অসীম শূন্যতাকে পেল। তার শরীর কাঁপতে কাঁপতে একসময় স্থির হয়ে গেল, ঠোঁট থেমে গেল, চোখ চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে গেল।
ভোরে সূর্যের প্রথম আলো গঙ্গার জলে পড়তেই মহাশ্মশান আবার নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। কালু দোম নেই, শ্মশানের আগুন নিভে গেছে, আর শ্মশানের মাঝখানে যেখানে অঘোরানন্দ বসেছিল, সেখানে কেবল ছাইয়ের স্তূপ। কারো দেহ নেই, কেবল এক মুঠো ভস্ম, যা বাতাসে উড়ে গঙ্গার জলে মিশে যাচ্ছিল। কেউ জানল না—অঘোরানন্দ মুক্তি পেয়েছিল কি না। কেউ বলল, সে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের শক্তিতে দেবলোকের পথে মুক্তি লাভ করেছে। আবার কেউ ফিসফিস করে বলল, মহাশ্মশানের অভিশাপ তাকে আরেক আত্মায় পরিণত করেছে, যে আজও শ্মশানের অন্ধকারে বন্দি। সত্যিটা অদৃশ্য রয়ে গেল, কিন্তু কাশীর মহাশ্মশান ঘাটে সেই দিন থেকে নতুন এক কাহিনি ছড়িয়ে পড়ল। বলা হলো, ভোরের ছাইয়ের মধ্যে মাঝে মাঝে অঘোরানন্দের চোখ ভেসে ওঠে, আর নদীর ঢেউয়ের শব্দে শোনা যায় তার অপূর্ণ মন্ত্রের প্রতিধ্বনি। মুক্তি নাকি অভিশাপ—এই প্রশ্ন অনন্তকাল ধরে জেগে রইল, আর মহাশ্মশান তার রহস্য আরও গাঢ় করে তুলল।
-সমাপ্ত-




