মিঠু নন্দী
১
গ্রামের মাঝামাঝি জায়গাটায় ছিল সেই পুরনো আটচালা। চারদিকে খোলা, শুধু ছাদের উপর কড়িকাঠ বসানো, টালির চালে ঢাকা, আর আটখানা পিলার সেই চালের ভার ধরে রেখেছে বলেই তার নাম আটচালা। বহু পুরনো ইতিহাস জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে—কোনো এক সময় এই আটচালাতেই পূজা-পার্বণের আসর বসত, অন্নপ্রাশন হতো, গ্রামীণ নাটক-মুকাবিলা কিংবা যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতো। সারা গ্রাম তখন একসাথে জমে যেত, শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই সেই আনন্দে শরিক হতো। দিনের বেলায় কিংবা উৎসবের কালে আটচালা যেন গ্রামীণ জীবনের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু যখন রাত নামে, গ্রাম ডুবে যায় নিস্তব্ধতায়, আর বাতাসে ভেসে ওঠে শেয়ালের ডাক কিংবা দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার সুর, তখন এই আটচালা দাঁড়িয়ে থাকে নীরব, অচল, কালো ছায়ায় ঢাকা। দূর থেকে দেখতে যেন এক রহস্যময় স্থাপনা, যার প্রতিটি কোণে জমে আছে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। গ্রামের মানুষ দিনের বেলা যতটা সহজেই এ পথে হেঁটে যায়, রাত নামলেই ততটাই এড়িয়ে চলে এই জায়গা। তাদের মনে হয়, আটচালা যেন এক অদৃশ্য চোখে অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে।
এক রাতে, গ্রামের আকাশে যখন পূর্ণিমার আলো ছড়াচ্ছে, গ্রামীণ পথগুলো প্রায় ফাঁকা, কেবল কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ দূরে কোথাও ভেসে আসছে, তখন হঠাৎই আটচালার দিক থেকে এক অচেনা সুর বাজতে শুরু করল। বাঁশির টান—কোনো সাধারণ বাঁশির শব্দ নয়, তাতে যেন ছিল এক গভীর যন্ত্রণা, এক অদ্ভুত মায়া, যা শুনে শিউরে উঠল গ্রামবাসী। সবাই জানত, এই সময়ে তো গ্রামে কেউ বাঁশি বাজায় না। কে থাকতে পারে আটচালায়? আর যদি কেউ বাজায়ও, এত নিখুঁত সুর বাজাতে পারে কে? বাঁশির সুর যেন অন্ধকার ছেদ করে সবার ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ল, ভীত-অবাক গ্রামের মানুষরা আতঙ্কে দরজা জানালা বন্ধ করে দিল। মায়েরা শিশুদের বুকে চেপে ধরল, বৃদ্ধরা বিছানার কোণে বসে নাম জপতে লাগল। কেউ কেউ ফিসফিস করে বলতে লাগল—“এ নিশ্চয়ই রামকৃষ্ণের আত্মা, সেই বাজনদার যে অসমাপ্ত সুর শেষ করতে পারেনি। সেই আক্ষেপেই তার আত্মা আটচালায় ফিরে আসে।” কথাগুলো যেন আরও ভয় জাগিয়ে দিল। বাঁশির টান ক্রমশ দীর্ঘ হতে লাগল, মাঝে মাঝে একেবারে থেমে যাচ্ছে আবার হঠাৎই শুরু হচ্ছে। এই ওঠা-নামার ভেতর গ্রামবাসীর বুক কেঁপে উঠতে লাগল—যেন কেউ অদৃশ্য হাত দিয়ে তাদের হৃদয় নাড়িয়ে দিচ্ছে।
কিছু সাহসী মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনতে লাগল, কিন্তু কেউ এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেল না। রাতের অন্ধকারে আটচালা যেন আরও ভয়ংকর লাগছিল, চাঁদের আলোয় তার পিলারগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে মাটিতে পড়ছিল, যেন এক-একটা দানব দাঁড়িয়ে আছে। বাঁশির সুরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল সেই ছায়াদের নড়াচড়া, আর বাতাসে ভেসে আসছিল গন্ধ—কখনো পুরনো ধূপকাঠির, কখনো শুকনো পাতার। গ্রামের প্রবীণ হরিদাস কাকা জানালা ফাঁক করে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখে-মুখে ভয়ের পাশাপাশি একটা অদ্ভুত শ্রদ্ধা—“হ্যাঁ, ও রামকৃষ্ণ ছাড়া আর কেউ নয়। এ সুর বাজাতে পারে না কেউ।” তিনি ফিসফিস করে বললেন, আর তাঁর গলা কাঁপছিল। এইভাবে গ্রাম এক অদ্ভুত আতঙ্কে নিমজ্জিত হলো। সেই রাতের পর থেকে আটচালার নাম উচ্চারণ করলেই মানুষ আঁতকে উঠতে লাগল। কেউ কেউ প্রতিজ্ঞা করল, রাতের পরে আর ওই দিক মাড়াবে না। তবুও বাঁশির রহস্য আরও গভীর হলো—এটা কি সত্যিই মৃত আত্মার ফিরে আসা, নাকি অন্য কোনো লুকানো সত্য? প্রশ্নটা অন্ধকারে ভেসে রইল, আর আটচালা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকল চাঁদের আলোয়, এক শূন্য অথচ সজীব রহস্যের প্রতীক হয়ে।
২
গ্রামের প্রবীণ মানুষদের মুখে মুখে এক গল্প বহমান, যার প্রতিটি বাঁক যেন অশরীরী অন্ধকারে ঢেকে আছে। সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু রামকৃষ্ণ—এক অভূতপূর্ব বাঁশিবাদক। প্রায় দশ-বারো বছর আগে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল শুধু গ্রামেই নয়, আশপাশের বাজার, মেলা, এমনকি শহরের মানুষজন পর্যন্ত। রামকৃষ্ণের বাঁশি শুনলে যে-কোনো মানুষ মুগ্ধ হয়ে যেত। তার বাঁশির সুরে ছিল এক অদ্ভুত টান, যেন প্রকৃতির নিস্তব্ধতা আর মানুষের গভীরতম অনুভূতি মিলেমিশে সুর হয়ে বেরিয়ে আসত। বৃষ্টির দিনে তার বাঁশি শুনলে মনে হতো আকাশ যেন নিজেই ভিজে যাচ্ছে সুরে, আর গ্রীষ্মের রাতে যখন মাঠে বসে বাজাত, তখন মনে হতো চাঁদ তার জন্য আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রামকৃষ্ণ এক অদ্ভুত সাধনায় নিমগ্ন হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক রাগ সৃষ্টি করতে, যা হবে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্ম। গ্রামের লোকেরা বলে, সেই রাগের নাম ছিল “মালকোষ”—যেটা অসম্ভব কঠিন, যার শেষ তান কেউ পুরো করতে পারে না। রামকৃষ্ণ প্রতিদিন আটচালায় বসে, ঘন্টার পর ঘন্টা সেই রাগের সুরে নিমগ্ন থাকতেন। কিন্তু তাঁর চোখেমুখে তখন একটা অদ্ভুত চাপা যন্ত্রণা ফুটে উঠত, যেন তিনি বুঝতে পারছিলেন এই অসমাপ্ত সুর তার জীবনের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লোককথা অনুযায়ী, সেই রাতে গ্রামে ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল। আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যেন বজ্রপাত নেমেছিল চারদিকে, অথচ আটচালায় রামকৃষ্ণ বসেছিলেন বাঁশি হাতে, তাঁর চোখে তখন এক অদ্ভুত উন্মাদনা। গ্রামবাসী দূর থেকে তাঁকে দেখেছিল—বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে তিনি বাঁশি বাজাচ্ছেন, সুর উঠছে, থেমে যাচ্ছে, আবার ঝড়ের গর্জনের সাথে লড়াই করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলেছিল সেই যন্ত্রণাময় চেষ্টা। অবশেষে যখন ভোরের আলো ফোটার সময় হলো, তখন মানুষ দেখতে পেল রামকৃষ্ণের নিথর দেহ পড়ে আছে আটচালার মাটিতে, হাতে শক্ত করে ধরা বাঁশি। তাঁর ঠোঁট তখনও বাঁশির ফুঁক দেওয়ার ভঙ্গিতে ছিল, কিন্তু সুর আর বেরোয়নি। গ্রামের অনেকেই বলেছিল—শেষ তান তিনি তুলতে পারেননি। সেই অসমাপ্তির আক্ষেপই তাঁর প্রাণ কেড়ে নিল। কেউ কেউ বলে, রামকৃষ্ণ বাঁশি বাজাতে বাজাতে অচেতন হয়ে পড়েন, কেউ বলে বজ্রাঘাত হয়েছিল, আবার কারো বিশ্বাস তিনি স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দেন অসমাপ্ত রাগকে পূর্ণ করার জন্য। কিন্তু যাই হোক, সেই রাতের পর থেকে গ্রামবাসীর মনে স্থায়ী হয়ে যায় এক ভয়ানক বিশ্বাস—রামকৃষ্ণের আত্মা শান্তি পায়নি। তিনি ফিরে আসেন সেই আটচালায়, প্রতি পূর্ণিমায়, প্রতি নিস্তব্ধ রাতের আঁধারে।
সময়ের সাথে সাথে এই কিংবদন্তি আরও রঙ চড়ে মানুষের মুখে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলে, রাতে আটচালার পাশ দিয়ে গেলে হঠাৎ বাঁশির সুর কানে আসে, তারপর চারপাশে অদ্ভুত ঠান্ডা নেমে আসে। আবার কেউ দাবি করে, চাঁদের আলোয় এক ছায়ামূর্তি দেখা যায়—সাদা ধুতি আর চাদরে মোড়া, হাতে বাঁশি নিয়ে বসে আছে, ঠোঁট বাঁশির ফুঁক দেওয়ার ভঙ্গিতে। কিছু সাহসী যুবক একবার ভেবেছিল এই ভৌতিক কাহিনি শুধু কুসংস্কার, তারা মিলে রাতের বেলা আটচালায় ঢুকেছিল। কিন্তু পরদিন সকালে শোনা গেল তাদের একজন জ্বরে ভুগছে, বারবার চিৎকার করে উঠছে—“আমি শুনেছি, অসমাপ্ত সুর! শেষ হয়নি… শেষ হয়নি!” সেই ঘটনার পর থেকে আর কেউ সাহস করেনি রাতের বেলা আটচালার কাছে যেতে। প্রবীণরা সন্তান-সন্ততিদের শাসন করে বলত—“রামকৃষ্ণের সুর অসমাপ্ত, সেই আক্ষেপ তাকে আজও বেঁধে রেখেছে। তার বাঁশি যখন বাজে, মানুষকে টেনে নেয় অতৃপ্ত আত্মার জগতে।” এভাবে রামকৃষ্ণ গ্রামবাসীর মনে হয়ে ওঠেন এক কিংবদন্তি—একাধারে শ্রদ্ধেয় শিল্পী, আবার ভয়ের প্রতীক। আর আটচালা হয়ে যায় শুধু গ্রামের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নয়, এক রহস্যের স্থান, যেখানে প্রতি নিশীথ রাতে মিশে থাকে অসমাপ্ত সুরের প্রতিধ্বনি।
৩
গোপাল ছিল গ্রামের অন্য ছেলেদের থেকে আলাদা। তার বয়স সবে ষোলো, কিন্তু চিন্তাভাবনায় অনেকটা বড়দের মতো। অন্য কিশোররা যেখানে দিনভর মাঠে খেলাধুলা আর নদীতে সাঁতার কাটতে ব্যস্ত, সেখানে গোপালের চোখে-মনে এক অদ্ভুত কৌতূহল কাজ করত। সে ছোট থেকেই গল্প শুনতে ভালোবাসত, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস আর কুসংস্কারকে কখনোই মেনে নিতে পারত না। যখনই কারো মুখে ভূতের কাহিনি শুনত, তখনই প্রশ্ন করত—“ভূতকে কেউ চোখে দেখেছে? প্রমাণ কী?” গ্রামের লোকেরা বলত—“তুই খুব চালাক হচ্ছিস, একদিন শাস্তি পাবে।” তবুও গোপাল থামত না। তার বাবাকে প্রায়ই লোকেরা অভিযোগ করত—“তোমার ছেলেটা বড় বেয়াড়া, বাপু। বিশ্বাস করে না কিছু।” কিন্তু গোপালের বাবা-মা জানতেন, তাদের ছেলেটা আসলে অন্যরকম। মায়ের ভেতরে ভেতরে ভয় থাকলেও ছেলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর সাহসী মনোভাবকে তিনি মুগ্ধ চোখে দেখতেন। তবে আটচালার বাঁশির ঘটনাটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার পর, গোপালের মা-বাবার আতঙ্ক বেড়ে গিয়েছিল। মায়ের চোখে আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট—“শোন গোপাল, ওই জায়গার কাছেও যাস না। রামকৃষ্ণের আত্মা যে এখনও শান্তি পায়নি, সেটা সকলে জানে।” কিন্তু গোপালের মনে তখন উল্টো কৌতূহল জেগে উঠল। কেন সবাই এত ভীত? কেন এই বাঁশির সুর সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলছে? যদি সত্যিই আত্মা থাকে, তবে তাকে দেখাই যাক। আর যদি না থাকে, তবে এই ভয় দেখানোর পেছনে কোনো মানুষের কৌশলই কাজ করছে।
গোপাল সিদ্ধান্ত নিল, সে একদিন এই রহস্য ফাঁস করবেই। সে লক্ষ্য করত, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকেই গ্রামের মানুষ আতঙ্কে ঘরে ঢুকে যায়, কেউ রাত নামার পর আটচালার রাস্তায় পা বাড়ায় না। অথচ সে জানে, অন্ধকার মানেই শূন্যতা নয়—অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে এমন কিছু, যেটাকে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সত্যিটা সবসময় থেকে যায়। একদিন রাতে খাওয়ার সময় বাবা হঠাৎ বললেন, “আজ আবার পূর্ণিমা। সাবধান থাকিস গোপাল, আজ রাতে বাঁশির সুর শোনা যেতে পারে।” মা থালা সরাতে সরাতে ফিসফিস করে বললেন, “ও ছেলে, জানিস না কত মানুষ ভয় পেয়েছে ওখান দিয়ে যেতে গিয়ে? কারও শরীর কাঁপতে শুরু করেছে, কারও জ্বর এসেছে। তুই ওই পথ ঘেঁষিও না।” কিন্তু গোপাল হেসে উত্তর দিল, “মা, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মানুষকে ভয় দেখানোর কাজ হয়তো মানুষই করছে। ভূত বলে কিছু নেই।” তার কথা শুনে বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, “চুপ কর! গ্রামে যদি সবাই বিশ্বাস করে, তবে তুই একা কেন তর্ক করবি? বয়স কম, এখনও অনেক কিছু বোঝিস না।” কিন্তু গোপালের মনে তখন দৃঢ় সংকল্প—সে প্রমাণ করবেই, কুসংস্কারের পেছনে কোনো না কোনো বাস্তব কারণ লুকিয়ে আছে।
সেই রাতে গোপাল শুয়ে থেকেও ঘুমোতে পারল না। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে ঢুকছিল, আর দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। তার বুকের ভেতরটা কেমন দোলা দিচ্ছিল। ভয়ের সঙ্গে মিশে ছিল অদ্ভুত উত্তেজনা। সে যেন অনুভব করছিল, আজ যদি বাঁশির সুর ওঠে, তবে সে চুপ করে শুয়ে থাকবে না, বরং লুকিয়ে বেরিয়ে গিয়ে সত্যটা দেখবে। মায়ের গা ঘেঁষে শোয়া অবস্থায়ও তার চোখে-মুখে ভেসে উঠছিল আটচালার ছবি—চাঁদের আলোয় ছায়ামূর্তি, বাতাসে দুলতে থাকা পিলার, আর অন্ধকারের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা অদ্ভুত সুর। সে যেন ইতিমধ্যেই শুনতে পাচ্ছিল বাঁশির টান, যা পুরো গ্রামকে আতঙ্কে শিহরিত করে তুলছে। নিজের বুকের ভেতর হাত রেখে সে বলল, “আমি ভয় পাব না। আমি জানব, সত্যি কী লুকিয়ে আছে।” এই দৃঢ় প্রত্যয়ে গোপালের চোখে ঘুম নামল না। জানালার ওপারে রাত গাঢ় হতে লাগল, আর চাঁদের আলোয় গ্রাম যেন নিঃশব্দ এক রহস্যের আবরণে ঢেকে গেল। গোপাল জানত, আগামী রাতগুলো তার জীবনে নতুন এক অধ্যায় খুলে দেবে—যেখানে ভয়, কুসংস্কার আর সত্যের সংঘর্ষ ঘটবে। আর সেই সংঘর্ষের নায়ক হবে সে নিজেই।
৪
গোপাল সেই বিকেলবেলায় একা বেরিয়ে পড়েছিল। ভোরের কুয়াশা ইতিমধ্যেই কেটে গিয়ে রোদ ঝলমলে হয়ে উঠেছিল চারদিক, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ছিল এক অজানা সংশয়ে। গ্রামে আগমনের পর থেকে বারবার শুনেছে রাতের অদ্ভুত সুর, শিহরণ জাগানো বাঁশবনের নীরবতা আর মানুষের কুসংস্কারে ভরা ভয়—সবকিছুর সঙ্গে যেন এক অলক্ষ্য সূত্রে যুক্ত রামকৃষ্ণের অসমাপ্ত সঙ্গীত। তাই গোপাল যখন রামকৃষ্ণের বিধবা স্ত্রী নিরুপমার কথা শুনল, যে তিনি বহুদিন ধরে নিঃসঙ্গতায় দিন কাটাচ্ছেন, তখন সিদ্ধান্ত নিল সেদিকেই যাবে। গ্রামের শেষ প্রান্তে, তালগাছ আর কদমগাছে ঘেরা এক পুরনো কুঁড়েঘরে থাকে নিরুপমা। চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই গোপালের চোখে পড়ল মলিন আলোতে ভরা এক ঘর, যার দেওয়ালে ঝোলানো ভাঙা ছবির ফ্রেম, পাশে রাখা একটি পুরনো তানপুরা, আর জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া ম্লান রোদ। নিরুপমা বসেছিলেন মাটির মাদুরে, সাদা শাড়ি আর কপালে বিধবার সিঁদুরহীনতা যেন তাঁর দুঃখের সাক্ষ্য বহন করছে। গোপাল ভদ্রতার সঙ্গে কুশল জিজ্ঞেস করে তাঁর সামনে বসল। নিরুপমার কণ্ঠে তখন গভীর ক্লান্তি, কিন্তু চোখে এখনও জ্বলছিল অদ্ভুত এক শোকের আগুন। তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন রামকৃষ্ণের শেষ দিনগুলোর কথা, কেমন করে সুর আর সাধনাই ছিল তাঁর জীবন, আর কীভাবে তাঁর মৃত্যুর পরও সেই সুর এই পৃথিবীতে যেন অপূর্ণ থেকে গেছে।
নিরুপমা জানালেন, রামকৃষ্ণ সারা জীবন চেষ্টা করেছেন “মালকোষ” নামের এক রাগ সম্পূর্ণ করার জন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই রাগ যদি সম্পূর্ণভাবে গাওয়া যায় তবে তা শ্রোতার অন্তরে এমন এক গভীর আলোড়ন তুলবে যা মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দিতে পারে। রাতের পর রাত, গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে শুরু করে শীতের কুয়াশা—সবকিছুর মধ্যেও তিনি সাধনায় মগ্ন থাকতেন। তানপুরার টংকারে ভোরের নীরবতা কেঁপে উঠত, বাঁশবনের পাখির ডাক থেমে যেত তাঁর গলার টানে। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। নিরুপমা বললেন, “শেষ রাতে, মৃত্যুর ঠিক আগে, উনি আমাকে বলেছিলেন—‘শোনো নিরু, মালকোষ আমার গলা থেকে আজও সম্পূর্ণ বেরোলো না। আমি জানি, আমি চলে গেলে এই সুর মাঝপথেই আটকে যাবে।’” এই বলে নিরুপমার চোখ ভিজে উঠল। গোপাল স্পষ্ট অনুভব করল, এই অসমাপ্ত সুরই যেন আজও বাতাসে ঘুরে বেড়ায়, আর গ্রামবাসীর কানে পৌঁছে দেয় এক রহস্যময় ভয়ের সুর। নিরুপমা বললেন, মৃত্যুর পর বহুবার তিনি নিজে শুনেছেন সেই সুর। ভোররাতে হঠাৎ তানপুরার শব্দ কানে বাজে, যেন রামকৃষ্ণ ঘরে বসে গাইছেন। তিনি ছুটে গিয়ে দেখেছেন—তানপুরা একা দাঁড়িয়ে আছে, কেউ নেই, অথচ তার তারগুলো কেঁপে উঠছে। তাঁর গলার স্বর নিঃশব্দ কাঁপুনিতে আটকে গেল, যেন ভয় আর শোক মিলে তাঁকে আজও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
গোপাল নিরুপমার কথা শুনে নির্বাক হয়ে বসে রইল। সে বুঝতে পারল, এই গ্রামে যা ঘটছে তার শেকড় শুধুই কোনো অশরীরী ভয় বা কুসংস্কারে নয়, বরং এক অসমাপ্ত শিল্পে, এক অপূর্ণ সাধনায় লুকিয়ে আছে। রামকৃষ্ণের আত্মা হয়তো শান্তি খুঁজে পাচ্ছে না, কারণ তাঁর সঙ্গীত পূর্ণতা লাভ করেনি। গোপাল একদিকে অনুভব করল গভীর দুঃখ, অন্যদিকে অদ্ভুত কৌতূহল। যদি সত্যিই সেই সুর এখনও বাজে, তবে তার ব্যাখ্যা কী? হতে পারে গ্রামবাসীর কানে তা অলৌকিক মনে হয়, কিন্তু কোথাও হয়তো এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। আবার অন্যদিকে, শিল্প ও সাধনার এমন অসমাপ্তি হয়তো আত্মার এক চিরন্তন তৃষ্ণা তৈরি করে, যা মৃত্যুর পরেও মেটে না। নিরুপমা তাঁকে এক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন, তারপর নরম গলায় বললেন, “তুমি শহরের লোক, হয়তো এসব বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমি জানি, ওর সুর এখনও বাতাসে বেঁচে আছে। ওর অসমাপ্ত মালকোষই রাতে শোনা যায়।” গোপাল ধীরভাবে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু তাঁর বুকের ভেতরে তখন বাজছিল সেই শব্দ, যেটি নিরুপমা সারা জীবন ধরে বহন করে চলেছেন। সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামে ফেরার পথে, যখন সূর্যাস্তের লাল আলো বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছিল, গোপাল অজান্তেই মনে করতে লাগল রামকৃষ্ণের অসমাপ্ত সুর, আর ভাবতে লাগল—এ কি কেবলই দুঃখের স্মৃতি, নাকি সত্যিই মৃত্যুর পরও শিল্পীর সাধনা থেমে থাকে না?
৫
গ্রামের পাকা মাটির উঠোনে বসে বিকেলের দিকে হরিদাস কাকার সঙ্গে গোপালের কথোপকথন শুরু হয়। কাকার চেহারায় বয়সের ভার স্পষ্ট, কুঁচকে যাওয়া গালে অভিজ্ঞতার ছাপ, চোখদুটো লালচে হয়ে আসে মাঝে মাঝে, যেন দীর্ঘদিনের দুঃখের বোঝা বয়ে চলেছেন। তিনি লাঠি ঠুকে একসময় গম্ভীর গলায় বলেন—“শোন গোপাল, তুই কি জানিস বাঁশবনের ওই বাঁশি শুনলে কেমন সর্বনাশ ঘটে?” চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা, কেবল দূরে কোনো বউঝি কলসিতে জল তুলছে। গোপাল এক চিলতে হাসি দিয়ে উত্তর দিলেও, ভিতরে ভিতরে তার কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। কাকা বলতে শুরু করেন, “এই গ্রামে আমি ছোটবেলায়ই শুনতাম—যেদিন ওই বাঁশির সুর ভেসে আসে, সেদিন কেউ না কেউ নিখোঁজ হয়। আমার ঠাকুরদা বলতেন, বাঁশবনের ভেতরে এক অদ্ভুত ছায়া ঘুরে বেড়ায়। আর সেই ছায়াই বাঁশি বাজায়, মানুষকে ডাক দেয়, টেনে নেয় অন্ধকারে।” হরিদাস কাকার গলা যেন থমকে থমকে আসে, তিনি হাপরের মতো নিঃশ্বাস ফেলেন। “তুই যদি সাহসী হস, তাও রাতের বেলা ওখানে যাবি না, তোর প্রাণ যাবে। আমি আমার চোখে দেখেছি অজিতের হারিয়ে যাওয়া। বাঁশির ডাক শুনে সে এক রাতে চুপিসারে চলে গিয়েছিল, আর কোনোদিন ফিরল না। সেদিন তার মা সারারাত কেঁদেছিল, কিন্তু কেউ তাকে ফেরাতে পারেনি।” কাকার কণ্ঠে আতঙ্ক ও ব্যথার মিশ্রণ গোপালকে প্রথমে চমকে দেয়, কিন্তু তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত উত্তেজনা জন্ম নেয়। মানুষ অজানাকে ভয় পায়, কিন্তু কৌতূহল মানুষকে সেই ভয় ভেদ করতে বাধ্য করে—গোপালের ক্ষেত্রেও তাই হলো।
কাকা যখন অতীতের গল্প খুলে বলছিলেন, গোপালের মনে বারবার ভেসে উঠছিল অদ্ভুত সব প্রশ্ন। বাঁশির সুর কি সত্যিই কোনো অলৌকিক শক্তির কাজ? না কি এর পিছনে লুকিয়ে আছে কোনো রহস্য, কোনো মানুষের কৌশল? গোপাল বুঝতে পারছিল, হরিদাস কাকার সতর্কবাণী আসলে একরকম অভিজ্ঞতার ফল, কিন্তু অভিজ্ঞতা সবসময় সত্যকে ব্যাখ্যা করে না, অনেক সময় ভয়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে। গ্রামের প্রবীণরা অন্ধকার, ছায়া আর অজানা শব্দকে ভৌতিক রূপ দিয়ে বিশ্বাস করে এসেছে যুগের পর যুগ। গোপালের চোখে সেই ভয়কে ভাঙার ইচ্ছা জেগে উঠল। তবু হরিদাস কাকার কণ্ঠে যে দৃঢ় সতর্কবার্তা ফুটে উঠছিল, সেটি তাকে ভাবিয়ে তুলল। কাকা স্পষ্ট বললেন—“গোপাল, শোন, রাত নামলেই বাঁশবনে ওই বাঁশি বাজে। যদি শোনিস, কান বন্ধ করে ফেলিস, বাইরে বেরোবি না। অনেকে কৌতূহলবশত গিয়েছিল, কারও হাড়গোড় পর্যন্ত মেলেনি।” কথাগুলো শোনার সময় গোপালের হাতের তালুতে অদ্ভুত ঘাম জমছিল। কিন্তু মনের ভিতরে কৌতূহলের আগুন জ্বলতে থাকল—কেন অজিতের মতো অনেকে হারিয়ে গেল? কারা বা কী টেনে নিল তাদের? যদি সত্যিই কোনো অলৌকিক শক্তি না থেকে থাকে, তবে নিশ্চয়ই কারও কৌশলে হচ্ছে সবকিছু। হরিদাস কাকার চোখে জল টলমল করছিল, তার কণ্ঠে যেন ভয়ের পাশাপাশি অসহায় স্বীকারোক্তির ছায়া। তিনি জানেন কিছু, কিন্তু তা বললে হয়তো গ্রামবাসী তাকে পাগল ঠাওরাবে। গোপাল অনুভব করল, এই সতর্কবাণীর আড়ালে এমন কোনো গোপন কাহিনি আছে, যা পুরো গ্রাম অস্বীকার করে এসেছে বছরের পর বছর।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আলো-অন্ধকারের খেলায় বাঁশবনের মাথা দুলতে শুরু করল, দূর থেকে কুয়াশা নামছিল। গোপালের মনে তখন একদিকে ভয়, অন্যদিকে উত্তেজনা—ঠিক যেন দুই মেরুর টান। হরিদাস কাকার লাঠি ঠুকে ঠুকে দূরে চলে যাওয়ার শব্দ মিলিয়ে যেতেই গোপাল একলা উঠোনে বসে রইল। মাথার ভেতর কাকার সতর্ক বাণী প্রতিধ্বনির মতো বাজছিল—“ওই বাঁশি শোনার মানেই সর্বনাশ।” অথচ এই সতর্কবাণীই যেন তাকে আরও টেনে নিয়ে যাচ্ছিল অজানার দিকে। সে মনে মনে ভাবল, ‘যদি সত্যিই সর্বনাশ ঘটে, তবে সেটা দেখা দরকার। না দেখলে এই ভয় কখনো কাটবে না।’ সেই মুহূর্তে গোপাল বুঝল, কৌতূহল মানুষের এক অদম্য শক্তি, যা ভয়কে অতিক্রম করে সত্যকে জানার তাগিদ দেয়। রাতের আঁধারে বাঁশবনে পা বাড়াবার সিদ্ধান্ত সে তখনই নিয়ে ফেলল। জানত ঝুঁকি আছে, হয়তো জীবনও হারাতে হতে পারে, কিন্তু হরিদাস কাকার চোখের ভয়ের সঙ্গে বেঁচে থাকার চেয়ে সত্যকে খুঁজে পাওয়া তার কাছে বেশি জরুরি হয়ে উঠল। গোপাল বুঝল, সতর্কবার্তা মানুষকে রক্ষা করে, কিন্তু কখনো কখনো সেই সতর্কবার্তাই সাহসী মনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। আর আজ সে সেই পথে পা রাখতে প্রস্তুত।
৬
কানাই ছিল গ্রামের এক গায়ক, বয়সে তরুণ, কিন্তু স্বভাবের মধ্যে তীব্র আত্মপ্রশংসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছাপ। ছোটবেলা থেকেই সে গান-বাজনা শিখেছিল, হাটে-মেলায় ভাটিয়ালি, বাউল কিংবা আধুনিক গান গাইতেও সে পারদর্শী ছিল। কিন্তু তার মধ্যে এক অদ্ভুত হীনমন্যতা কাজ করত—যতই মানুষ তার গান শুনে হাততালি দিক, সে মনে করত তাকে যথেষ্ট স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। সেই কারণেই যখনই রামকৃষ্ণের বাঁশির নাম উঠত, কানাইয়ের বুকের ভেতর কেমন যেন জ্বলে উঠত। সে মুখে হাসলেও ভিতরে ভিতরে ঈর্ষার বিষে দগ্ধ হত। এই ঈর্ষারই বহিঃপ্রকাশ ঘটল এক গ্রামীণ আসরে। সবাই মিলে গল্প করছে, হঠাৎ কেউ বলল, “রামকৃষ্ণের মতো বাঁশি আজও কেউ বাজাতে পারেনি। তাঁর সুরে যে জাদু ছিল, তাতে চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে যেত।” তখনই কানাই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলে উঠল—“ওসব বাজে কথা! রামকৃষ্ণ অত বড়ো কেউ ছিল না। বাঁশি বাজে তো আমি-ই বাজাই। আজ চাইলে আমি এমন সুর তুলে দেব, সবাই ভুলে যাবে।” তার এই কথায় কেউ হেসে উঠল, কেউ আবার চুপ করে রইল। কিন্তু সেই মুহূর্তে গ্রামের মধ্যে সন্দেহ ঢুকে গেল—যদি রাতের অদ্ভুত বাঁশির সুরটা আসলে কানাই-ই বাজায়, তবে কেন লোকে এত ভয় পাচ্ছে? হয়তো সবটাই তার দম্ভ আর প্রদর্শনীর খেলা।
তবে সত্যি বলতে, কানাইয়ের বাঁশিতে রামকৃষ্ণের মতো কোনো অদ্ভুত আবেশ ছিল না। সে ভালো গায়, কিন্তু তার সুর মানুষের মনকে নাড়া দিতে পারে না সেইভাবে। কানাই চেষ্টা করল কয়েক রাত ধরে বাঁশি বাজানোর, গ্রামীণ উঠোনে বসে সুর তুলল। গ্রামের লোকজনও শুনল। কেউ কেউ বলল, “হ্যাঁ, বাঁশি বাজাতে তো পারে।” কিন্তু তারপরই অন্য কেউ বলে উঠল, “আরে ধুর! রামকৃষ্ণের বাঁশি শোনোনি নাকি? সেই সুরে যেমন রাত কেঁপে উঠত, তেমন জাদু এ বাঁশিতে নেই।” আর ঠিক সেই সময়ই, গভীর রাতে আবার শোনা গেল সেই রহস্যময় সুর, যা কানাইয়ের বাজনার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাতাস যেন থমকে দাঁড়ায়, গাছপালার পাতায় অচেনা কম্পন ছড়িয়ে যায়, আর দূরের কুকুররা ডেকে ওঠে। লোকেরা তখন বুঝতে পারল, কানাই যতই বড়াই করুক, এই সুর তার বাজানো নয়। বরং তার দম্ভগ্রস্ত স্বভাবই গ্রামে নতুন সন্দেহ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। কয়েকজন গ্রামের প্রবীণ কানাইকে তিরস্কারও করল, “যদি পারিস, প্রমাণ কর রাতের সেই বাঁশি তুই বাজাচ্ছিস। শুধু মুখে বললে হবে না।” কানাই তখন রাগে ফুঁসতে লাগল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার বুকের ভেতরেও একটা অদ্ভুত আতঙ্ক বাসা বাঁধল—যদি সত্যিই কোনো অলৌকিক শক্তি থাকে?
এই ঘটনার পর কানাইয়ের মানসিক অবস্থা ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠল। সে দিনরাত ভাবে কীভাবে প্রমাণ করা যায় যে সবার মনে যে রামকৃষ্ণের বাঁশির ছায়া ভর করেছে, তা আসলে নিছক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। সে এক রাতে একাই বাঁশি নিয়ে বাঁশবনের ধারে বসে সুর তুলতে লাগল। চাঁদের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নেমে এসেছে, চারপাশ নিস্তব্ধ। প্রথমে সে নিজেই নিজের সুরে মগ্ন হল, ভাবল এবার নিশ্চয়ই প্রমাণ হবে। কিন্তু হঠাৎ দূরে, অজানা কোনো দিক থেকে ভেসে এল অন্য এক সুর—গভীর, শিহরণজাগানো, যেন জীবনের বাইরের কোনো জগত থেকে আসা। কানাই থেমে গেল, তার বাঁশি কাঁপতে লাগল হাতে। যে সুর তার সামনে ভেসে উঠল, তাতে সে মুহূর্তেই বুঝে গেল—এ জাদু তার সাধ্যের বাইরে। চোখের সামনে অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে এলো, বাঁশবনের ছায়া নড়ে উঠল, আর দূরে যেন কারো ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। কানাই কাঁপতে কাঁপতে ফিরে এল গ্রামে, কিন্তু সে আর কোনোদিন প্রকাশ্যে দাবি করার সাহস পেল না যে রামকৃষ্ণের বাঁশির রহস্য আসলে তারই তৈরি। অথচ ততদিনে তার কথায় সন্দেহের বীজ ছড়িয়ে গেছে গ্রামজুড়ে। কেউ ভাবছে, কানাই বাজাচ্ছে, আবার কেউ মনে করছে কোনো অদৃশ্য শক্তি সত্যিই উপস্থিত। কানাইয়ের অহংকার তাই শুধু তাকে নয়, পুরো গ্রামকেই আরও দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলল—সত্যিই কি এটা একজন মৃত সঙ্গীতজ্ঞের আত্মার বাঁশি, নাকি কোনো জীবিত মানুষের হাতের কৌশল? এই প্রশ্নই গ্রামবাসীর মনে রাতের অন্ধকারের মতো ঘনীভূত হয়ে উঠল।
৭
রাতটা ছিল অদ্ভুত নিস্তব্ধ। গ্রামের চারপাশে হালকা কুয়াশা নেমেছে, বাতাসে শীতলতার ছোঁয়া। দূরে বাঁশবনের দিক থেকে মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে, আর আকাশে ফিকে চাঁদ যেন কেবল কিছুটা আলো ছড়িয়ে চারদিককে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। গোপাল সেই অন্ধকার রাতেই সাহস করে বেরিয়েছে আটচালার দিকে। সে জানে, এতদিন ধরে গ্রামে যে ভয়ানক কথাগুলো ছড়িয়ে পড়েছে—রাত নামলেই নাকি বাঁশবনে বাজে মনকাড়া বাঁশির সুর, আর দেখা যায় অদ্ভুত এক সাদা ছায়া—তার সত্যতা খুঁজে বের করতে হলে তাকেই যেতে হবে। গোপাল মনে মনে বলল, “ভয় পেলে চলবে না। সত্য যদি জানতে চাই, তবে সরাসরি মুখোমুখি হতে হবে।” আটচালার এক কোনায় গিয়ে সে লুকিয়ে বসল। বাতাসে গাঢ় স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ, মনে হচ্ছিল পুরোনো কাঠের গায়ে শ্যাওলা জন্মেছে। কুকুরের ডাক একবার থেমে গেলেই হঠাৎ চারপাশ যেন আরও স্তব্ধ হয়ে উঠল। গোপাল ধীরে ধীরে একটা বিড়ি ধরাল, ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে, যেন নিঃশব্দে রাতের অন্ধকারকে আরও ভারী করে তুলল।
মুহূর্তের মধ্যেই সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। গোপালের কানে ভেসে এল বাঁশির সুর—মোলায়েম, মধুর অথচ হাড় হিম করে দেওয়া এক সুর। গোপাল প্রথমে ভাবল হয়তো তার কল্পনা, কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারল, না, এই সুর বাস্তবেই বাজছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সুরটা যেন দূর থেকে আসছে, কিন্তু আবার তার চারপাশে ঘুরছে। সে যতই কান খাড়া করে শুনতে চাইছে, ততই মনে হচ্ছে বাঁশির সুর একবার দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, আবার হঠাৎ পাশে যেন বাজছে। গোপালের বুকের ভেতর ধকধক শব্দ শুরু হলো, কপালে ঘাম জমে উঠল। তবু সে চোখ কুঁচকে অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরেই, সেই সুরের সঙ্গে মিলেমিশে উঠল এক অদ্ভুত হালকা হাওয়া। বাতাস যেন সশব্দে আটচালার খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে তার মুখে লাগল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে গোপাল দেখতে পেল—সামনের বাঁশবনের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে সাদা পোশাকে এক ছায়ামূর্তি। আলো নেই, তবুও পোশাকের শুভ্রতা চোখে পড়ার মতো। সাদা চাদরে ঢাকা লম্বা এক মানুষ যেন ধীরে ধীরে হাঁটছে, কিন্তু হাঁটার ভঙ্গিটা এত অস্বাভাবিক যে মনে হচ্ছিল সে ভেসে আসছে। বাঁশির সুর বাজছিল তখনও, আর গোপালের কানে মনে হচ্ছিল সুরটা ওই সাদা ছায়ার থেকেই বেরোচ্ছে। তার বুকের ভেতর ভয় আর কৌতূহল মিলেমিশে এমন এক চাপ তৈরি করল, যেন সে একসঙ্গে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আবার দৌড়োতে চাইছে। তবুও সে নিজেকে আটকাল।
গোপাল চোখ বড়ো করে দেখল, ছায়ামূর্তিটি আটচালার একেবারে সামনের মাঠে এসে দাঁড়াল। মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু সেই পোশাক, সেই ভঙ্গি—সবকিছুতেই এক রহস্যময় আতঙ্ক মিশে ছিল। বাঁশির সুর হঠাৎ থেমে গেল। নিস্তব্ধতা ফিরে এল, কিন্তু গোপালের কান যেন তখনও বাজছিল, মগজের ভেতর বাঁশির প্রতিধ্বনি ঘুরছিল। সাদা ছায়াটি এক ঝলক যেন তার দিকে তাকাল—ঠিক সেই মুহূর্তে গোপালের মনে হলো ঠান্ডা বরফের মতো এক শীতল হাওয়া তার শরীর ভেদ করে গেল। সে কেঁপে উঠল, চোখের পাতা ফেলতেও সাহস পেল না। হঠাৎ করেই ছায়াটি ঘুরে আবার বাঁশবনের দিকে চলে যেতে শুরু করল, যেমন অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে এসেছিল, তেমন করেই সরে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সুরও মিলিয়ে গেল, অন্ধকারে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এল। গোপাল নিজের বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বুঝতে পারল, আজ সে সত্যিই এমন কিছু দেখেছে যা শুধু গুজব নয়। তার হাত কাঁপছিল, বিড়ির অর্ধেক ছাই তার কোলে ঝরে পড়েছে। তবুও সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—এই রহস্যের শেষ না করা পর্যন্ত সে পিছু হটবে না। রাতের সেই প্রথম অভিযানে গোপাল উপলব্ধি করল, ভয় যদি তাকে তাড়িয়ে দেয় তবে সত্য কখনও ধরা পড়বে না, আর তাই আগামীর রাতগুলো তাকে আরও গভীর অন্ধকারে ঠেলে নিয়ে যাবে।
৮
পরদিন সকালেই গ্রামে এক অদ্ভুত আলোড়ন শুরু হয়। সকালের হাটে, পুকুরঘাটে, এমনকি নামঘরের বারান্দায় বসেও সবাই একই আলোচনা—গতরাতের বাঁশির আসল রহস্য ফাঁস হয়েছে। জানা গেল, কয়েক মাস ধরে রাত গভীর হলে যে ভৌতিক বাঁশির সুর বাজত, তার আসল কারিগর ছিল কানাই। সে-ই লুকিয়ে বাঁশবনে গিয়ে বাঁশি বাজাত, আর গ্রামের মানুষদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে রাখত। তার উদ্দেশ্য ছিল খুব হিসেবি—গ্রামে অনেকেই তাকে রামকৃষ্ণ তান্ত্রিকের উত্তরসূরি মনে করতে শুরু করে, যেন সে-ই অলৌকিক শক্তির অধিকারী। এই ভয় দেখিয়ে সে ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বিস্তার করছিল। গ্রামবাসীর কেউ ফসল নষ্ট হলে, কেউ অসুখে পড়লে, কানাই অল্প কিছুর বিনিময়ে তাবিজ-কবচ দিয়ে বলত—“রামকৃষ্ণ ঠাকুরের আশীর্বাদ এতে আছে।” ফলে, তাকে গ্রামের আধ্যাত্মিক গুরুর মতো মানতে শুরু করে অনেকে। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও একটা প্রশ্ন থেকেই গেল—গতরাতের যে ছায়ামূর্তি বাঁশবনের ধারে দেখা গেছে, তার সঙ্গে কানাইয়ের মিল একেবারেই নেই।
গোপাল প্রথমে মুখ চেপে রেখেছিল, কারণ সে জানত এই কথা বললে মানুষ তাকে বিশ্বাস নাও করতে পারে। কিন্তু হাটের ভিড়ে দাঁড়িয়ে সে হঠাৎ বলেই ফেলল—“তোমরা সবাই কানাইকে দোষ দিচ্ছ, কিন্তু আমি যা দেখেছি সেটা আলাদা। গতরাতে বাঁশির আওয়াজ যখন থেমে গেল, আমি খালের ধারে একটা মানুষকে দেখেছিলাম—লম্বা চাদর গায়ে, মুখটা পুরো ঢাকা। সে একেবারেই কানাই নয়।” তার এই কথায় চারদিক স্তব্ধ হয়ে গেল। গ্রামের প্রবীণরা একে-অপরের মুখ চাওয়া-চাওি করতে লাগল। কানাইকে ডেকে আনা হল। সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্বীকার করল যে সত্যিই সে বহুদিন ধরে বাঁশি বাজিয়ে ভয়ের আবহ তৈরি করেছে। কিন্তু গতরাতের ঘটনার কথা শুনে সেও অবাক হয়ে মাথা নিচু করে রইল। তার মুখে অস্পষ্ট স্বীকারোক্তি—“আমি বাঁশি বাজাই ঠিকই, কিন্তু যে ছায়ামূর্তির কথা গোপাল বলছে, সেটা আমি নিজেও জানি না।” গ্রামের মানুষের বুকের ভেতর তখন নতুন ভয় ঢুকে গেল। যদি কানাই-ই বাঁশি বাজাত, তবে গতরাতে যে মানুষটিকে দেখা গেল সে-ই বা কে?
সন্ধ্যার পর থেকে গোটা গ্রামে এক অস্থিরতার ছাপ পড়ল। নামঘরের আলোয় সবাই একসাথে বসে আলোচনা শুরু করল। কারও মতে, গোপাল হয়তো ভয়ে ভুল দেখেছে, আবার কারও বিশ্বাস, কানাইয়ের পাশাপাশি আরও কেউ এই খেলায় যুক্ত আছে। গ্রামপঞ্চায়েতের মধুসূদনবাবু গম্ভীর গলায় বললেন—“এখন আর কানাইকে শাস্তি দিলেই হবে না। আমাদের জানতে হবে আসল সত্যি কী। কে এই অচেনা ছায়া?” গোপালের মনে তখন আতঙ্কের সঙ্গে জেদও জন্ম নিচ্ছিল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, গ্রামের ভেতরে এখনও এমন এক গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে যা ফাঁস হয়নি। কানাই কেবল আড়ালের অংশ, আসল খেলোয়াড় কেউ অন্য। বাতাসে তখনো হালকা বাঁশির সুর ভেসে আসছে মনে, যদিও কোথাও বাজছে না। আর সেই অদৃশ্য সুর যেন গ্রামবাসীর মনকে বলে দিচ্ছিল—মুখোশ শুধু আংশিক খুলেছে, এখনও সম্পূর্ণ সত্যি ধরা দেয়নি।
৯
রাত্রির ঘন নীরবতার ভেতরে আটচালার বাতাস যেন থমথমে হয়ে ছিল। গ্রামজুড়ে দিনের কোলাহল শেষ হয়ে গেছে, কেবল দূরে শেয়ালের ডাক শোনা যায় মাঝে মাঝে। নিরুপমা চুপচাপ বসে আছে বাঁশের মাদুরে, হাতে ছোট একটা প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের আলোয় তার মুখে ছায়া-আলো খেলা করছে, চোখে ভাসছে এক অদ্ভুত ভয়ের সঙ্গে মিশ্রিত শ্রদ্ধা। সে গোপালের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “আজ রামকৃষ্ণদার অসমাপ্ত রাগটা আমরা গেয়ে বা বাজিয়ে শেষ করার চেষ্টা করি, জানো গোপাল? কতদিন ধরে গ্রামের লোকেরা বলে আসছে, ওই সুরটা শেষ না হওয়ার জন্যই এ বাড়িটা শান্তি পায়নি।” গোপাল একটু ইতস্তত করল। ছোটবেলা থেকে সে বাঁশি বাজাতে ভালোবাসত, কিন্তু রামকৃষ্ণের মতো নিপুণ হওয়ার সাহস তার ছিল না। তবুও আজকের রাত যেন তাকে ঠেলে দিল এক অদৃশ্য শক্তির দিকে। সে বাঁশিটা ঠোঁটে তুলল, হাত কাঁপছে সামান্য। প্রথমে সুরটা কাঁচা শোনাল, কিন্তু ধীরে ধীরে ছন্দে মিশে গেল রাতের বাতাস। নিরুপমা গলায় আলগোছে একটা স্বর ধরল, তার গলা ভরাট না হলেও আবেগে ভরা। মনে হচ্ছিল, রাগ যেন একটু একটু করে জীবন্ত হয়ে উঠছে, যেভাবে বহুদিন ধরে কারো বুকের ভেতরে বন্দি হয়ে ছিল। বাতাসে একটা চাপা কম্পন তৈরি হলো, প্রদীপের শিখা কেঁপে উঠল অকারণে।
গোপাল সুরে সুরে এগোতে থাকল, তার বাঁশির টান যেন চারদিকে মায়ার মতো ছড়িয়ে পড়ল। নিরুপমার চোখে জল এসে গেল, মনে হচ্ছিল এ সুরে শুধু সঙ্গীত নেই—আছে কারো অসমাপ্ত জীবনের হাহাকার, কারো অদম্য সাধনার উত্তরাধিকার। কিন্তু হঠাৎ যখন শেষের দিকে পৌঁছল, গোপালের নিঃশ্বাস যেন জড়িয়ে গেল। শেষের তানটা সে তুলতে পারল না, হাত কেঁপে উঠল, বাঁশির সুর ভেঙে গেল হঠাৎ। চারপাশ হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল—এমন নিস্তব্ধতা, যেন পৃথিবী এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে। নিরুপমা হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, তার কানে এল এক অচেনা অথচ পরিচিত সুর। বাঁশির ভেতর থেকে নয়, গোপালের ঠোঁট থেকেও নয়—মনে হচ্ছিল আটচালার ভেতরেই কেউ অদৃশ্য হয়ে বসে আছে, সে-ই বাজাচ্ছে সেই অপূর্ণ তান। সুরটা এত নিখুঁত, এত অদ্ভুত সুন্দর যে নিরুপমা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল। বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল, মাটির তলা থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়া কেঁপে কেঁপে উঠল। গোপাল বিস্ফারিত চোখে চারপাশ দেখল, কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। শুধু প্রদীপের আলো হঠাৎ নীলচে আভা ছড়াতে লাগল, আর তার ভেতরেই যেন এক ক্ষণিক ছায়া ভেসে উঠল—রামকৃষ্ণের মতো কারো মুখ, চোখ বন্ধ করে সুরে ভেসে যাচ্ছে।
সুরটা যখন ধীরে ধীরে শেষ হলো, তখন আটচালার ভেতরে এমন নিস্তব্ধতা নেমে এল যে মনে হচ্ছিল আকাশ, মাটি, গাছ—সব একসাথে শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। নিরুপমা আর গোপাল দুজনেই অবশ হয়ে বসে রইল, কথা বলার মতো শক্তিও যেন তাদের নেই। অনেকক্ষণ পর গোপাল কাঁপা গলায় বলল, “দেখলে নিরু… ওর অসমাপ্ত রাগটা আজ সম্পূর্ণ হলো।” নিরুপমা কোনো উত্তর দিল না, কেবল তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু প্রদীপের আলোয় ঝলমল করতে লাগল। তাদের দুজনের মনে হলো, আজ যেন একটা অদৃশ্য বাঁধন ছিঁড়ে গেছে, বহুদিনের চাপা ব্যথা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু সেই মুক্তির ভেতরেও ভয় রয়ে গেল—কারণ তারা জানত, আজ যে সুর তারা শুনল, তা মানুষের সাধ্য নয়। এ সুর এসেছে অন্য এক দিক থেকে, এমন এক জগত থেকে যেখানে রামকৃষ্ণ আজও তাঁর সঙ্গীতের অপূর্ণ সাধনা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রাতের আকাশে হালকা হাওয়া বইতে শুরু করল, দূরে ভোরের পাখির ডাক শোনা গেল। নিরুপমা বাঁশির দিকে তাকিয়ে দেখল, যেন তা অদ্ভুতভাবে ঝলমল করছে। তাদের মনে হলো—অসমাপ্ত রাগ শেষ হলেও, এই গল্প এখনও শেষ হয়নি। এটি কেবল নতুন রহস্যের দরজা খুলে দিয়েছে।
১০
আটচালার ভেতরটা যেন এক অদ্ভুত শক্তির ভারে ঝিমিয়ে ছিল। বাঁশির সুর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসতেই, রামকৃষ্ণের অশান্ত আত্মা যেন মুক্তি পেল। চারপাশের বাতাসে একটা হালকা স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল। এতদিন ধরে যে সুরে গ্রামের মানুষ ভয়ে আতঙ্কিত হতো, আজ সেই সুরই হয়ে উঠল শান্তির প্রতীক। মানুষ বুঝতে পারল—এই বাঁশির সুর কোনো অভিশাপ নয়, বরং এক শিল্পীর অসম্পূর্ণ ব্যথার আর্তনাদ। শিল্পী রামকৃষ্ণ জীবদ্দশায় যে অসম্পূর্ণতা নিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন, সেই অসমাপ্ত সুর আজ পূর্ণতার স্বাদ পেল, এবং তার আত্মা মুক্তি পেল। আটচালা, যা এতদিন ধরে গ্রামের কাছে অশুভ আর ভয়ের জায়গা বলে মনে হয়েছিল, আজ যেন একেবারে নতুন রূপ পেল—এখানে এখন আর ভূতের আতঙ্ক নেই, বরং আছে এক শিল্পীর আত্মার শান্তির গল্প। গ্রামের প্রবীণরা যারা এতদিন কুসংস্কার আঁকড়ে ছিলেন, তারাও বুঝলেন, ভয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে জানতে হলে চোখ খুলে দেখতে হয়।
গোপাল, যে এই রহস্য উদঘাটনের মূল চরিত্র, সে যেন আজ এক নতুন শিক্ষার আলো পেল। সে বুঝতে পারল, ভয়কে জয় করতে হলে শুধু কুসংস্কার দূর করলেই হবে না, তার সঙ্গে দরকার সত্যকে খুঁজে বের করার সাহস। গ্রামের মানুষ যখন ভয়ে একে অপরকে আতঙ্কিত করে তুলছিল, তখন গোপালই ছিল একমাত্র যে সত্য অনুসন্ধানে অটল ছিল। সে জানত—অলৌকিকের আড়ালে অনেক সময় বাস্তব লুকিয়ে থাকে। আজ তার বিশ্বাসেরই জয় হলো। বাঁশির সুর থেমে যাওয়া মানেই রামকৃষ্ণের আত্মার শান্তি, এবং এটিই প্রমাণ করে যে মানুষের অন্ধ বিশ্বাস কতটা ভ্রান্ত হতে পারে। গোপাল চারপাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখল, তারা যেন ধীরে ধীরে ভয় কাটিয়ে সাহস পাচ্ছে। তাদের চোখে আর আতঙ্ক নেই, আছে নতুন উপলব্ধি। গোপাল মনে মনে ঠিক করল, ভবিষ্যতে আর কখনো কুসংস্কারকে সত্য ভেবে ভয় পাবে না, বরং মানুষের মনকে মুক্ত করার জন্য সবসময় সত্যকে সামনে আনবে।
আটচালার নিস্তব্ধতার সঙ্গে গ্রামের পরিবেশও যেন পাল্টে গেল। চারদিকে একটা হালকা হাওয়া বয়ে গেল, গাছের পাতাগুলো শান্তভাবে দুলতে লাগল। মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল—যেন তারা সবাই মিলে অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে এল। রামকৃষ্ণের আত্মা শান্তি পাওয়ায় শুধু একটি আত্মাই মুক্ত হলো না, মুক্ত হলো পুরো গ্রামের মন। তারা বুঝল, ভয় মানুষকে বেঁধে রাখে, কিন্তু সত্য মানুষকে মুক্ত করে। গোপালের চোখে জল এসে গেল, তবে তা দুঃখের নয়—বরং গর্বের। সে অনুভব করল, রামকৃষ্ণ শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সত্য ও সৌন্দর্যের পথপ্রদর্শক। বাঁশির সুর থেমে গেলেও, তার প্রতিধ্বনি থেকে গেল মানুষের হৃদয়ে। গ্রামের মানুষ আজ নতুন করে শিখল—ভূত নেই, অভিশাপ নেই; আছে কেবল মানুষের স্মৃতি, শিল্পের অসম্পূর্ণ ব্যথা, আর সত্যের জয়।
শেষ




