Bangla - তন্ত্র

দেহতরঙ্গ

Spread the love

সুব্রত গুহ


অধ্যায় ১ – গুরু ও শিষ্যের সাক্ষাৎ

প্রাচীন অরণ্যের ভেতর নিস্তব্ধতার মাঝে আশ্রমটি দাঁড়িয়ে ছিল যেন সময়ের স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। ঘন বৃক্ষরাজির আড়ালে লুকোনো এই স্থানে পৌঁছতে হলে সাধারণ মানুষের অনেক সাহস প্রয়োজন, কারণ গ্রামের মানুষজন বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পায়। অরণ্যের পথে যতই গভীরে প্রবেশ করা যায়, ততই প্রকৃতির এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা অনুভূত হয়—পাখির ডাক ক্ষীণ হয়ে আসে, বাতাস যেন ধীর হয়ে পড়ে, আর প্রতিটি ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকে অজানা আতঙ্ক। ঠিক এই নীরবতার ভেতর দিয়েই অর্জুন এগিয়ে আসে, তার অন্তরে ভয় ও কৌতূহলের মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। বয়স মাত্র পঁচিশ, কিন্তু তার চোখে এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা, এক অশান্তি—যা তাকে অজানার সন্ধানে ঠেলে দেয়। গ্রামের বাকি ছেলেদের মতো নয়, অর্জুনের ভেতরে সবসময় প্রশ্ন জমে থাকে—জীবন কি শুধু শরীরের সীমায় আবদ্ধ, নাকি এর বাইরে আরও কোনো শক্তি আছে? মৃত্যুর পরে কি সত্যিই আত্মা ভেসে বেড়ায়, নাকি সবকিছু শেষ হয়ে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সে বহুদিন ধরে শুনে আসা গুরু শ্রীনাথ তান্ত্রিকের কাছে এসেছে।

আশ্রমে প্রবেশ করে অর্জুন প্রথমেই দেখল বিশাল বটগাছের ছায়ায় বসে আছেন গুরু শ্রীনাথ। তার চেহারা যেন শিলার মতো কঠিন, কিন্তু চোখের গভীরে অগ্নির মতো দীপ্তি। সাদা-কালো মেশানো দাড়ি বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে, কপালে লাল রক্তচন্দনের তিলক, গায়ের চাদর জীর্ণ কিন্তু এক অদ্ভুত আভায় ভরপুর। চারপাশে ভেষজ গাছের গন্ধ, ধূপের ধোঁয়া আর অগ্নিকুণ্ডের মৃদু শিখা পরিবেশকে অলৌকিক করে তুলেছিল। আশ্রমে কোনো আড়ম্বর নেই—মাটির কুটির, প্রাচীন শাস্ত্রের পুঁথি, ভগ্ন প্রাচীর, তবু সবকিছুতেই এক ধরনের অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। অর্জুন প্রথমবার গুরুকে প্রণাম করতেই তাঁর কণ্ঠ গম্ভীরভাবে উচ্চারিত হলো—“কৌতূহল ভালো, কিন্তু কৌতূহল যদি অস্থির হয় তবে সে আগুন হয়ে সবকিছু ভস্ম করে। তুই কী খুঁজতে এসেছিস?” অর্জুন একটু দ্বিধা নিয়ে উত্তর দিল—“আমি শরীরের সীমা ছাড়িয়ে আত্মার শক্তিকে জানতে চাই। আমি জানতে চাই আত্মা সত্যিই ভ্রমণ করতে পারে কিনা।” গুরু শ্রীনাথ এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে রইলেন, যেন অর্জুনের অন্তর ভেদ করে দেখতে চাইছেন। তারপর ধীরে বললেন—“যে পথে হাঁটতে চাস, সেখানে আর ফেরার রাস্তা থাকে না। সেই শক্তি জানলে তুই আর আগের মতো থাকবি না।”

এরপর শুরু হলো প্রথম পাঠ। গুরু শিষ্যকে নিয়ে বসলেন অগ্নিকুণ্ডের সামনে, যেখানে আগুনের শিখা কেবল আলো দিচ্ছিল না, বরং অদ্ভুতভাবে নড়াচড়া করে যেন কোনো ভাষা বলছে। শ্রীনাথ গুরু অর্জুনকে শেখালেন শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ, মনকে শূন্য করার প্রক্রিয়া এবং কল্পনার ভেতর দেহ থেকে আত্মাকে আলাদা করে দেখার কৌশল। অর্জুন চোখ বন্ধ করে চেষ্টা করল, প্রথমে তার ভেতরে অশান্তি, নানা রকম চিন্তা তাকে বিচলিত করছিল, কিন্তু গুরুর কণ্ঠ যেন মন্ত্রের মতো কাজ করছিল—“তোর দেহ হলো পাত্র, আর তোর আত্মা হলো তরঙ্গ। শিখ শ্বাসের ভেতর সেই তরঙ্গের ওঠা-নামা দেখতে, তুই নিজেকে শুধু শরীর ভাবিস না, তুই এক স্রোত, এক আলো।” অগ্নিকুণ্ডের পাশে বসে অর্জুন অনুভব করল যেন তার শরীর ভারী হয়ে যাচ্ছে, অথচ মন অদ্ভুতভাবে হালকা। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে বিভ্রমে দেখল নিজের শরীরটাকে বাইরে থেকে, যেন সে নিজেই তার দেহকে তাকিয়ে দেখছে। সঙ্গে সঙ্গে তার বুক কেঁপে উঠল, চোখ খুলে আতঙ্কে চেয়ে রইল। গুরু শান্ত গলায় বললেন—“এটা শুধু শুরু। ভয় পাবি না, কারণ ভয়ই তোর সবচেয়ে বড় শত্রু।” সেই রাতে অর্জুনের মনে এক নতুন জগতের দরজা খোলা গেল—সে বুঝল গুরু শ্রীনাথের আশ্রমে তার জন্য অপেক্ষা করছে এমন এক শিক্ষা, যা তার জীবন সম্পূর্ণ বদলে দেবে। কিন্তু সে তখনও জানত না, এই পথ তাকে কেবল মুক্তিই দেবে না, টেনে নিয়ে যাবে এক ভয়াল ফাঁদে, যেখানে আত্মা আর দেহের সীমা মুছে যাবে চিরতরে।

অধ্যায় ২ – আত্মভ্রমণের শিক্ষা

অরণ্যের রাতগুলোতে আশ্রম যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠত। চারদিকে গাঢ় অন্ধকার, মাঝে মাঝে শেয়ালের হুক্কাহুয়া, দূরে পেঁচার ডাক আর বাতাসে পাতা নড়ার শব্দ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তৈরি করত। ঠিক সেই রাতের নীরবতার ভেতর গুরু শ্রীনাথ ও অর্জুন অগ্নিকুণ্ডের সামনে বসেছিল। শিষ্যের চোখে তখনও প্রথম অভিজ্ঞতার আলো ঝলমল করছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে বিভ্রান্তও বটে। গুরুর গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো—“আজ থেকে তুই আসল শিক্ষার পথে হাঁটবি। দেহ আর আত্মা—এই দুইয়ের সম্পর্ককে যদি বুঝতে পারিস, তবে তোর জন্য পৃথিবীর দরজা বদলে যাবে।” অর্জুন গভীর মনোযোগে শুনছিল। গুরু বোঝাতে লাগলেন যে মানুষের দেহ আসলে একখানি পাত্র, একখানি অস্থায়ী আশ্রয়, যেখানে আত্মা সাময়িকভাবে অবস্থান করে। শ্বাস-প্রশ্বাস, চিন্তা-ভাবনা, আবেগ—সবই দেহকে নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু আত্মা এদের ঊর্ধ্বে। আত্মা হলো প্রবাহ, আলো, এক তরঙ্গ—যা এক দেহ থেকে অন্য দেহে, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতে সক্ষম। কিন্তু এই ভ্রমণ বিপজ্জনকও বটে, কারণ দেহ যখন আত্মাহীন হয়, তখন সেটি ফাঁকা ঘরের মতো হয়ে পড়ে, আর সেই ফাঁকা জায়গায় অন্য কোনো শক্তি প্রবেশ করতে পারে। এ কারণে গুরু শ্রীনাথ প্রথমেই অর্জুনকে সতর্ক করলেন—“তুই যদি আত্মাভ্রমণের সাধনা করতে চাস, তবে মনে রাখিস, তোর দেহকে রক্ষা করার দায়িত্ব তোরই। এক মুহূর্তের অসতর্কতায় তোর দেহ অন্য কোনো শক্তির হাতে চলে যেতে পারে।”

এরপর গুরু ধীরে ধীরে সাধনার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন। প্রথম ধাপ হলো দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে নিস্তেজ করে ফেলা—যেন শরীরের উপস্থিতি মুছে যায়, আর মন কেবলমাত্র শ্বাসের সঙ্গে যুক্ত থাকে। গুরু বললেন—“প্রথমে চোখ বন্ধ কর, তারপর অনুভব কর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি। প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে তোর দেহ ভারী হচ্ছে, আর প্রতিটি প্রশ্বাসের সঙ্গে তোর আত্মা হালকা হয়ে উঠছে। ভাব, তোর শরীর একখানি শূন্য খোলস, আর তুই সেই খোলস থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছিস।” অর্জুন মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করতে লাগল। ধীরে ধীরে তার হাত-পা অসাড় হয়ে এলো, কানে দূরের শব্দ ম্লান হয়ে গেল, মনে হলো যেন চারপাশের সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। হঠাৎই সে অনুভব করল, তার ভেতর থেকে কোনো অদৃশ্য আলো ওপরে উঠতে চাইছে, বুকের ভেতর থেকে মাথার শীর্ষ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল, ভেতরে ভয় কাজ করল, কিন্তু গুরুর কণ্ঠ আবার ভেসে এলো—“ভয় পাবি না। এটা হলো আত্মার স্বাভাবিক ভ্রমণ। তুই যদি ভয় পাস, তবে হঠাৎ ভেঙে পড়বি।” গুরু বোঝালেন যে আত্মার ভ্রমণ মানে শরীর থেকে চেতনার মুক্তি, যেখানে মানুষ নিজের শরীরকে বাইরে থেকে দেখতে পায়। তবে এটিকে মায়া ভেবে ভুল করলে চলবে না, কারণ এটিই হলো আধ্যাত্মিক জগতের আসল দরজা।

অর্জুন চোখ বন্ধ অবস্থায় অনুভব করছিল সে ধীরে ধীরে নিজের দেহ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। অগ্নিকুণ্ডের আলো ঝলমল করছে, কিন্তু সেই আলোও যেন ভিন্ন রূপে প্রতিফলিত হচ্ছে তার চোখে। সে দেখল নিজের দেহ নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে, অথচ সে নিজে উপরে ভেসে উঠেছে। এই অভিজ্ঞতা তাকে একইসঙ্গে বিস্মিত ও ভীত করল। সে ভাবল—“আমি কি তবে সত্যিই শরীর থেকে আলাদা হতে পারি? যদি এইভাবেই চিরতরে আলাদা হয়ে যাই?” সেই মুহূর্তেই গুরু শক্ত কণ্ঠে বললেন—“মনে রাখিস, দেহ হলো তোর ঘর। যত দূরেই যাস, ঘরে ফিরে আসতে হবে। যদি দেহের সঙ্গে বন্ধন ছিঁড়ে ফেলিস, তবে আর কখনও ফেরত আসতে পারবি না।” অর্জুন গভীর আতঙ্কে শ্বাস নিতে লাগল, তার শরীর কাঁপতে লাগল, কিন্তু গুরুর মন্ত্রোচ্চারণে সে আবার ধীরে ধীরে নিজের দেহে ফিরে এলো। চোখ খুলে চারপাশ দেখতেই অশ্রুসিক্ত চোখে শ্বাস ফেলে বসে রইল। গুরু তখন তাকে শান্ত গলায় বললেন—“আজ তুই যা দেখলি, সেটি কেবল শুরু। মনে রাখিস, আত্মাভ্রমণ একাধারে মুক্তি আর সর্বনাশ দুই-ই হতে পারে। তুই যদি নিজের দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাস, তবে দেহে ঢুকবে এমন এক সত্তা, যাকে তুই চিনিস না। তাই সবসময় মনকে স্থির রাখতে শিখ।” সেই রাতে অর্জুনের মনে একদিকে অদ্ভুত গর্ব—কারণ সে এমন এক জগতের দরজা খুলেছে, যা খুব কম মানুষ দেখতে পায়, আর অন্যদিকে প্রবল ভয়—যদি কোনোদিন সত্যিই নিজের দেহে ফিরতে না পারে তবে কী হবে? এই দ্বন্দ্বই তার ভবিষ্যতের পথকে আরও জটিল করে তুলবে।

অধ্যায় ৩ – প্রথম অভিজ্ঞতা

অরণ্যের গভীর রাত, চারদিকে নিস্তব্ধতা, আকাশে পূর্ণিমার আলো গাছের পাতা ভেদ করে অদ্ভুত নকশা আঁকছিল মাটির উপর। অগ্নিকুণ্ডের শিখা তখনও নিভে যায়নি, মৃদু দপদপ করে জ্বলছিল, আর সেই আলোয় গুরুর চোখ যেন লালচে আভায় জ্বলজ্বল করছিল। গুরু শ্রীনাথ শিষ্যকে তৃতীয় রাত্রির সাধনায় বসিয়েছিলেন, কারণ এই রাতেই আত্মা প্রথমবার দেহ ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে বাইরে বেরোবার ক্ষমতা অর্জন করে। অর্জুনের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি—ভয়, কৌতূহল আর উত্তেজনা। সে জানত, আজকের রাত তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। গুরু ধীরে ধীরে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করলেন, ধূপের ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, আর চারদিকে যেন ঘন কুয়াশা নেমে এলো। অর্জুন চোখ বন্ধ করে মনোনিবেশ করল, শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে গভীর হলো, শরীর নিস্তেজ হয়ে এলো। কিছুক্ষণ পর সে অনুভব করল বুকের ভেতর থেকে যেন এক আলোকরেখা ওপরে উঠছে, মাথার শীর্ষ ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসছে। হঠাৎই এক তীব্র শিহরণ তার সমগ্র দেহজুড়ে ছড়িয়ে গেল, আর সে বুঝতে পারল—সে দেহ ছেড়ে বাইরে এসে গেছে। প্রথমে আতঙ্ক তাকে আচ্ছন্ন করল, কিন্তু তারপরই চোখের সামনে ভেসে উঠল আশ্রমের দৃশ্য—সে নিজের শরীরকে দেখছে, গুরু শ্রীনাথের পাশে স্থির হয়ে বসে আছে, অথচ সে নিজে তার ওপরে ভাসছে, এক অদ্ভুত মুক্তির অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরল।

প্রথমবার নিজের শরীরের বাইরে এসে অর্জুনের মনে হলো সে যেন এক অদৃশ্য সত্তা, যার কোনো ওজন নেই, কোনো বাঁধন নেই। সে অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে ঘুরতে লাগল, মাটির গায়ে গা ঘষলেও কিছু অনুভব হলো না, বাতাসের মধ্যে দিয়ে ভেসে বেড়ানো যেন খেলনার মতো সহজ হয়ে উঠল। বাইরে বেরিয়ে সে প্রথমবার গ্রামের দিকে তাকাল, অরণ্যের গাছপালা, নদীর স্রোত, দূরের গ্রাম—সবকিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল, অথচ সবকিছুর মধ্যে এক অদ্ভুত আলোকচ্ছটা জড়িয়ে আছে। মানুষের ঘরবাড়ি থেকে হালকা ধোঁয়া বেরোচ্ছে, আবার কারও দেহ থেকে আলোর রেখা উঠছে আকাশের দিকে, যা সে আগে কখনও দেখেনি। কৌতূহল তাকে আরও দূরে টেনে নিয়ে গেল। সে দেখল এক কুঁড়েঘরের মধ্যে এক অসুস্থ বৃদ্ধা ঘুমিয়ে আছেন, তাঁর শরীর নিস্তেজ, শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে। বৃদ্ধার দেহ থেকে এক মৃদু আলো কেঁপে কেঁপে বেরোতে চাইছে, যেন আত্মা দেহ ছাড়তে চাইছে। এই দৃশ্য দেখে অর্জুন অবাক হয়ে গেল। হঠাৎই তার মনে হলো, যদি আমি তার শরীরে প্রবেশ করি তবে কেমন হবে? এক অদম্য কৌতূহল তাকে গ্রাস করল। গুরু যদিও তাকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছিলেন—অন্যের দেহে প্রবেশ করা বিপজ্জনক, কিন্তু সেই মুহূর্তে কৌতূহল ও দুঃসাহস তাকে সব ভুলিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে বৃদ্ধার দেহের দিকে এগিয়ে গেল, তারপর হঠাৎই প্রবল আকর্ষণে টেনে নেওয়া হলো ভিতরে।

প্রথমেই যেন বজ্রাঘাতের মতো এক ধাক্কা খেল অর্জুন। তার চারপাশের আলো মিলিয়ে গিয়ে সে অন্ধকারে ডুবে গেল, তারপর অনুভব করল ভারী ও ক্লান্ত শরীরের ভেতরে সে ঢুকে পড়েছে। চোখ খুলতেই সে অবাক হয়ে গেল—সে আর তার নিজ শরীরের ভেতরে নেই, বরং সেই বৃদ্ধার চোখ দিয়ে দেখছে। তার শরীর দুর্বল, শ্বাসকষ্টে ভুগছে, গা ব্যথায় অবশ, কিন্তু এই অনুভূতি এতটাই বাস্তব যে অর্জুন আতঙ্কে চিৎকার করতে চাইলো, অথচ তার গলা থেকে কেবল কর্কশ শব্দ বেরোল। সে চেষ্টা করল উঠে দাঁড়াতে, কিন্তু বৃদ্ধার দেহে তা সম্ভব হলো না। তার ভেতরে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল—“আমি কি ফেঁসে গেলাম? আমার শরীরের কাছে যদি আমি ফিরতে না পারি তবে কী হবে?” সেই সময় দূর থেকে তার নিজ শরীরকে দেখল, অগ্নিকুণ্ডের পাশে স্থির বসে আছে, আর গুরুর কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে মন্ত্রোচ্চারণ। সে মরিয়া হয়ে চেষ্টায় করল দেহ থেকে বেরিয়ে আসতে, কিন্তু বৃদ্ধার দেহ যেন তাকে আটকে রাখছিল। ঠিক তখনই এক অদ্ভুত কণ্ঠ ভেসে এলো, যেন বৃদ্ধার আত্মাই তার সঙ্গে কথা বলছে—“তুমি কে? আমার ভেতরে কেন এলে?” অর্জুন কেঁপে উঠল। সে বুঝল, নিজের কৌতূহলের জন্য সে ভয়ঙ্কর ভুল করে ফেলেছে। কোনোভাবে প্রচণ্ড চেষ্টা করে আবার আলোকরেখার মতো হয়ে দেহ থেকে বেরিয়ে এল, আর প্রাণপণে নিজের শরীরের দিকে ছুটল। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল, তার দেহ স্থির হয়ে বসে আছে, আর সেই শরীরের ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠছে। যেন অন্য কেউ সেখানে প্রবেশ করেছে। আতঙ্কে তার মন শূন্য হয়ে গেল—“আমার দেহ কি তবে ইতিমধ্যেই দখল হয়ে গেছে?” সে অসহায়ভাবে ভেসে থাকতে থাকল, চারপাশের অরণ্য নিস্তব্ধ হয়ে এল, আর পূর্ণিমার আলোতে তার আত্মা যেন ভাসমান ছায়ার মতো কাঁপতে থাকল। সে তখনও জানত না, এই এক ভুল কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে যাবে এমন এক ভয়াল খেলায়, যেখান থেকে ফেরার পথ খুব সহজ হবে না।

অধ্যায় ৪ – ফাঁদের শুরু

অর্জুনের চোখে প্রথমে অন্ধকার ভেসে উঠল। যেন এক অদৃশ্য সুড়ঙ্গের মধ্যে আটকে আছে সে। শরীর নেই, হাত নেই, কেবল এক ভাসমান অস্তিত্ব। আত্মাভ্রমণের প্রথম অভিজ্ঞতায় সে বিস্মিত হয়েছিল, কিন্তু এবার ভয় তাকে চেপে ধরতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল—এবার তাকে নিজের দেহে ফেরার সময় এসেছে। সে অনেক চেষ্টা করল, নিজের শরীরের দিকে ধাবিত হতে চাইল, কিন্তু অদ্ভুত এক প্রতিরোধ তাকে ঠেলে দিল বাইরে। যেন তার পরিচিত খোলস আর তাকে জায়গা দিচ্ছে না। বিস্মিত হয়ে অর্জুন দেখতে পেল—তার শরীর চোখ খুলে বসে আছে, কিন্তু সেই চোখ তার নয়। সেই চোখে সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে, যেন এক অচেনা দৃষ্টির ফাঁদে ধরা পড়েছে। ভেতর থেকে সে তাকিয়ে থাকল নিজের পরিচিত মুখের দিকে, অথচ অনুভব করল ভয়ের হিমশীতল ছায়া। কে এই অচেনা সত্তা যে তার দেহ দখল করে বসেছে? কেন সে নিজের ঘরে বসেও বাইরের অতিথির মতো হয়ে পড়েছে? আতঙ্কে অর্জুন চেষ্টা করল কথা বলতে, হাত নড়াতে, কিন্তু বুঝল—তার শরীর আর তার নয়, সে যেন বন্দি হয়ে পড়েছে নিজের ভেতরেই, এক স্বচ্ছ কাচের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক, অথচ নাটকের মঞ্চে অভিনয় করছে অন্য কেউ।

ধীরে ধীরে সেই অপরিচিত দৃষ্টি তার ভেতরে ঢুকে পড়তে লাগল। অর্জুন অনুভব করল এক অদ্ভুত উপস্থিতি—যেন কোনো পুরোনো, অশরীরী ছায়া তার দেহের ভেতর নিজের আধিপত্য বিস্তার করছে। বাইরের মানুষদের চোখে সে যেন স্বাভাবিক অর্জুনই, কিন্তু আসলে তার ভেতরে রয়েছে অন্য কেউ। এই অদ্ভুত পরিস্থিতি তাকে একদিকে অসহায় করে তুলল, অন্যদিকে শিহরিত করে তুলল ভয়ের অদ্ভুত স্পর্শে। সে লক্ষ্য করল, তার শরীর নিয়ন্ত্রণকারী অচেনা সত্তা আয়নায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আয়নায় প্রতিফলিত সেই চোখে ভেসে উঠল বিদ্রূপের ছায়া—অর্জুন বুঝল এই সত্তা তাকে চিনতে পেরেছে, তার বন্দিত্ব উপভোগ করছে। আতঙ্কে তার মনে উঠল একের পর এক প্রশ্ন—এ সত্তা কে? কতদিন ধরে সে অপেক্ষা করছিল? নাকি এটি তার আত্মাভ্রমণের সময়কালেই মুক্তি পেয়েছে? অর্জুন অনুভব করল নিজের দেহের প্রতিটি অঙ্গ এখন যেন দূরে চলে যাচ্ছে, তাকে আর মানছে না। বাইরে থেকে সে দেখছে, তার শরীর স্বাভাবিকভাবে হাঁটছে, কথা বলছে, কিন্তু প্রতিটি শব্দ আর অঙ্গভঙ্গি অপরিচিত। তার চারপাশের মানুষরা কিছু টের পাচ্ছে না, অথচ সে জানে—এটা তার জীবন, তার আত্মা, তার নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে চলে গেছে। এই অচেনা অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে এক ভয়ানক ফাঁদে পরিণত হলো।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্জুন বুঝতে পারল, এই খেলা কেবল শুরু। সে যেন কোনো এক গভীর ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছে। অচেনা সত্তা তার দেহকে নিজের মতো করে ব্যবহার করছে, অথচ ভেতরে বন্দি হয়ে সে কেবল দেখছে। চেষ্টা করেও কোনো যোগাযোগ ঘটাতে পারছে না, কণ্ঠস্বর যেন কারও দ্বারা দমিত। হাহাকার করে উঠতে চাইলেও কেবল নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরের চোখে সে অর্জুন, কিন্তু ভেতরে সে যেন এক ভূত, নিজের অস্তিত্বের ওপর থেকে অধিকার হারানো এক প্রাণ। আতঙ্কের মাঝে তার মনে পড়ল গুরুজির সতর্কবাণী—“আত্মাভ্রমণ এক তীক্ষ্ণ তরবারি, সামান্য ভুলেই তা নিজের বুকে বিঁধে যেতে পারে।” হয়তো এটাই সেই ভুল, আর হয়তো এই অপরিচিত সত্তা অনেক আগে থেকেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ফাঁদ ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকল। অর্জুন অনুভব করল, যদি এখনই কিছু না করে, তবে সে চিরতরে হারিয়ে যাবে নিজের দেহ থেকে। ভয় তাকে গ্রাস করল, কিন্তু তার সঙ্গে এক অদম্য লড়াইয়ের তৃষ্ণাও জেগে উঠল—কোনো না কোনোভাবে তাকে এই অচেনা বন্দিত্ব থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ছিল কেবল শুরু, কিন্তু সে জানত—এই ফাঁদ ভাঙা সহজ হবে না।

অধ্যায় ৫ – অধিকারী আত্মার উন্মোচন

অর্জুন যখন নিজের ভেতরে সেই অচেনা সত্তার উপস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে টের পেল, তখন তার বুকের ভেতর যেন হাহাকার উঠলো। সে অনুভব করছিল নিজের দেহে প্রবেশ করার চেষ্টা করলেও আর সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসতে পারছে না। নিজের হাত-পা, চোখ-মুখ সবকিছুই যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। তার শরীর এখন অন্য কারও ইচ্ছায় চলাফেরা করছে, আর সে শুধুমাত্র ভেতর থেকে নির্বাক দর্শক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে এক ঠান্ডা, শ্বাসরুদ্ধ করা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, যেন বুকের ভেতর থেকে কারও কান্নার মতো শব্দ বেরোচ্ছে—“তুমি আমাকে চিনতে পারছ না, অথচ আমি তোমার দেহের ভেতর আছি। বহু বছর ধরে আমি এক অন্ধকার বন্দিশালায় আটকে ছিলাম। আজ অবশেষে আমার মুক্তি হয়েছে।” অর্জুন স্তব্ধ হয়ে গেল। কণ্ঠস্বর তারই ভেতর থেকে আসছে, কিন্তু তা তার নয়। যেন কেউ তার অন্তরে লুকিয়ে ছিল বহু বছর ধরে, আর এই মুহূর্তে সুযোগ বুঝে উঠে এসেছে। অর্জুন একদিকে আতঙ্কিত, অন্যদিকে অদ্ভুতভাবে কৌতূহলী—কে এই সত্তা? কেনই বা তার দেহকে আশ্রয় হিসেবে বেছে নিলো? ভেতর থেকে প্রতিটি স্পন্দন টের পাচ্ছে সে, কিন্তু নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারছে না। ধীরে ধীরে সেই অচেনা উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে লাগল, যেন তার আত্মার ভেতর আরেক আত্মার উন্মোচন ঘটছে।

মুহূর্তের ভেতরেই সেই কণ্ঠস্বর আরও ভারী, আরও দৃঢ় হয়ে উঠলো। “আমি এই পৃথিবীতে একসময় মানুষ ছিলাম,” আত্মাটা বলতে লাগল, “কিন্তু আমার অস্তিত্ব মুছে দেওয়া হয়েছিল নিষ্ঠুরতার আগুনে। আমার জীবন শেষ হয়েছিল অসময়ে, বিশ্বাসঘাতকতার আঁধারে। মৃত্যুর পরও আমি শান্তি পাইনি। আমাকে এক শিকলবন্দী অবস্থায় আটকে রাখা হয়েছিল, যাতে আমি পুনর্জন্ম নিতে না পারি, মুক্ত আকাশে উড়তে না পারি। শত শত বছর ধরে আমি বন্দী ছিলাম অন্ধকার শক্তির কারাগারে। তোমার আগমন সেই কারাগারের শেকল ভেঙে দিয়েছে।” অর্জুন ভেতর থেকে ভেসে আসা প্রতিটি শব্দ শুনছিল, এবং তার শরীর কেঁপে উঠছিল ভয় আর বিস্ময়ে। সে বুঝতে পারছিল—এ কেবল কোনো সাধারণ আত্মা নয়, বরং এক প্রাচীন সত্তা, যে ন্যায়বিচার পায়নি, যে প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ হয়ে থেকেছে যুগের পর যুগ। এখন সেই আত্মা তার দেহে জায়গা করে নিয়েছে, আর অর্জুনের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ব্যবহার করছে নতুন জীবনের মতো। নিজের ভেতরে প্রতিটি রক্তকণা যেন জমাট বাঁধছে, অথচ কোথাও গিয়ে সে উপলব্ধি করলো, আত্মাটি তার শত্রু নয়। বরং তার কথা, তার ব্যথা, তার দীর্ঘ বন্দিত্ব—সবকিছু যেন এক গভীর বেদনার কাহিনি। অর্জুন দ্বিধায় পড়ল—এটা কি শাপ, নাকি কোনো অদৃশ্য দায়িত্ব? তার নিজের ভেতরেই এখন এক অন্য অস্তিত্ব দোলা দিচ্ছে, যে একদিকে তাকে গ্রাস করছে, আবার অন্যদিকে তাকে এক অজানা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।

সেই রহস্যময় আত্মা নিজের গল্পের পর্দা একে একে সরাতে লাগল। অর্জুন অনুভব করলো, তার হৃদস্পন্দন আত্মার শব্দে মিলেমিশে যাচ্ছে। আত্মাটি জানাল, বহু শতাব্দী আগে সে ছিল এক সাধারণ মানুষ, কিন্তু অতি শক্তিশালী কিছু তান্ত্রিকের ষড়যন্ত্রে নিজের জীবন হারিয়েছিল। তার মৃত্যুটা ছিলো পরিকল্পিত, আর সেই মৃত্যুর পরও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। অদৃশ্য মন্ত্রে বেঁধে রাখা হয়েছিল, যেন সে পুনর্জন্ম না নিতে পারে, মুক্তি না পায়। তাই সে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিঃসঙ্গ, বন্দী, দুঃসহ অন্ধকারে কাটিয়েছে। তার অস্তিত্ব ঝুলে ছিল না পৃথিবীতে, না পাতালে—মাঝখানে এক ভয়াবহ শূন্যতায়। আজ যখন অর্জুন সেই নিষিদ্ধ জায়গায় প্রবেশ করলো, তখনই তার দেহ আত্মার কাছে এক আশ্রয় হয়ে দাঁড়ালো। আত্মাটি বলল, “তুমি আমার মুক্তির সেতু। তোমার রক্তে যে অগ্নিশক্তি আছে, সেটাই আমাকে পুনরায় বাঁচার অধিকার দিয়েছে। এখন থেকে আমি তোমার দেহেই থাকবো। তুমি আমার কাছে দেহ ধার দিয়েছ, আর আমি তোমাকে এমন সব সত্য দেখাব, যা তোমার কল্পনারও বাইরে।” অর্জুন নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল। তার মস্তিষ্কে যেন হাজারো প্রশ্ন ঘুরছিল, কিন্তু মুখে কিছুই বলতে পারছিল না। ভেতরে ভেতরে বুঝতে পারছিল, এখন আর সে একা নয়—তার প্রতিটি পদক্ষেপে এক অধিকারী আত্মার ছায়া থাকবে। আর এই ছায়া তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা সে কল্পনাও করতে পারছিল না। তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না—এ যেন নতুন এক ফাঁদের শুরু, যেখানে সত্য আর মিথ্যা, দেহ আর আত্মা, আলো আর অন্ধকার মিশে যাচ্ছে একে অপরের ভেতর।

অধ্যায় ৬ – মায়ার সন্দেহ

মায়ার মনে ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল। প্রথম কয়েক দিন সে ভেবেছিল অর্জুন হয়তো অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে বা চাপের কারণে আচরণে পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু ঘটনাগুলো যত এগোতে লাগল, ততই স্পষ্ট হচ্ছিল যে ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়। অর্জুন হঠাৎ হঠাৎ গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকত, চোখে এমন এক ঠান্ডা শূন্যতা যা সে আগে কখনো দেখেনি। একসময় যে মানুষটি প্রাণবন্ত, হাসিখুশি আর যত্নশীল ছিল, এখন যেন তার মধ্যে অন্য কারো ছায়া লুকিয়ে আছে। তার ভাষা বদলে গেছে, তার অঙ্গভঙ্গিতে এসেছে এক অদ্ভুত ভারী ভাব, যেন অন্য কারো স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তার দেহে প্রবাহিত হচ্ছে। মায়া লক্ষ্য করেছিল অর্জুন মাঝেমধ্যেই প্রাচীন ভাষার মতো কিছু শব্দ আওড়ায়, যা তার অজানা। এক রাতে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়ে সে দেখেছিল অর্জুন আঙিনায় দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে এক অচেনা মন্ত্রপাঠ করছে, তার কণ্ঠস্বর কর্কশ আর ভারী, যা তার স্বাভাবিক কণ্ঠের সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পায়নি। মায়ার বুক কেঁপে উঠেছিল, ভয় আর সন্দেহে সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছিল—কিন্তু নিজের চোখে দেখা সত্যি অস্বীকার করার উপায় ছিল না। অর্জুন যেন আর অর্জুন নেই, বরং তার ভেতরে অন্য কেউ বাস করছে।

এরপর থেকে মায়া একটানা চিন্তায় ভুগতে লাগল। দিনের বেলায় অর্জুনকে স্বাভাবিক মনে হলেও, রাতে বা নির্জন মুহূর্তে তার আচরণ অদ্ভুত হয়ে যেত। একদিন বাজার থেকে ফেরার পথে মায়া তাকে ডাকলে অর্জুন হঠাৎ ঘুরে তাকায়, কিন্তু তার চোখে যে দৃষ্টি ছিল তা শীতল আর অচেনা, যেন কোনো অপরিচিতের চোখ দিয়ে তাকাচ্ছে। মায়া ভয় পেয়ে থেমে যায়, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই অর্জুন হেসে ফেলে, যেন কিছুই হয়নি। এভাবে দুই রূপের খেলায় মায়ার মন ভেঙে পড়তে থাকে। এক রাতে স্বপ্নে মায়া অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখে—অর্জুন দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকার এক অরণ্যের মাঝে, তার চারপাশে ঘুরছে কালো ছায়া, আর হঠাৎ সে দেখতে পায় অর্জুনের আত্মা যেন দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। সেই আত্মা তাকে হাত নেড়ে ইঙ্গিত করছে, যেন সাহায্য চাইছে। স্বপ্নে অর্জুনের সেই আসল আত্মা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে—“আমি বন্দী, আমি এখানে নেই, আমার দেহে অন্য কেউ ঢুকেছে।” মায়ার ঘুম ভেঙে যায় আতঙ্কে, তার বুকের ভেতর ধ্বকধ্বক করতে থাকে, ঘামে ভিজে যায় শরীর। সে বুঝতে পারে এই স্বপ্ন শুধুই কল্পনা নয়, বরং কোনো গোপন সংকেত, অর্জুনের ভেতরে সত্যিই কিছু ভয়ংকর আটকে আছে।

এরপর মায়া আর নিশ্চুপ থাকতে পারে না। সে মনস্থির করে সত্যি অনুসন্ধান করবে। সে অর্জুনের প্রতিটি আচরণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে শুরু করে। সকালে চায়ের সময় সে খেয়াল করে অর্জুন বাম হাতে লিখছে, অথচ সে ছিল পুরোপুরি ডানহাতি। কখনো কখনো সে এমন জায়গার কথা বলে যেখানে সে জীবনে যায়নি, এমন স্মৃতি টেনে আনে যা তার জীবনের সঙ্গে মেলে না। মায়ার সন্দেহ তখন নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত হয়—অর্জুনের দেহে অন্য কারো অস্তিত্ব বাস করছে। কিন্তু একা সে কাকে বলবে? গ্রামে এসব কথা বললে সবাই পাগল ভাববে। তবু মায়া সিদ্ধান্ত নেয় যে তাকে অর্জুনকে রক্ষা করতেই হবে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে অর্জুনের আসল আত্মাকে মুক্ত করবে, সেই ভ্রাম্যমাণ আত্মাকে আবার তার দেহে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে আত্মা তার স্বামীর দেহ দখল করেছে, সে কে? কেন এলো? এবং কিভাবে সে তাকে পরাস্ত করবে? মায়ার বুক কেঁপে ওঠে অনিশ্চয়তায়, তবুও তার চোখে একরাশ দৃঢ়তা জমে ওঠে—এই লড়াই সে একাই লড়বে, কারণ অর্জুন এখন আর নিজের হয়ে লড়তে পারছে না।

অধ্যায় ৭ – গুরু’র হস্তক্ষেপ

গভীর রাত্রি নেমেছে, চারদিকে ঘন কুয়াশার মতো অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ যেন বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, প্রতিটি দিক থেকে অদ্ভুত এক চাপের অনুভূতি আসতে শুরু করেছে। এই সময়ে গুরু শ্রীনাথ ধ্যানমগ্ন অবস্থায় হঠাৎ চমকে ওঠেন। তার শরীর কেঁপে ওঠে, যেন কোনো অদৃশ্য শিখা তার অন্তরে ঢুকে গেছে। তিনি চোখ খুলতেই দেখেন আগুনের মতো দপদপে দৃশ্য ভেসে উঠছে সামনে—অর্জুন এক অচেনা কণ্ঠে কথা বলছে, তার দৃষ্টিতে অমানবিক শীতলতা। গুরু বুঝতে দেরি করেন না যে তন্ত্রসাধনার সময় ভয়ঙ্কর ভুল হয়ে গেছে, যে আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল, সেটাই অর্জুনের শরীর অধিকার করে নিয়েছে। শ্রীনাথ জানতেন এই ধরনের ভুল কেবল অদক্ষ সাধক বা অহংকারে ভরা কারও হাতেই ঘটে, আর অর্জুনের মধ্যে উভয় দোষই ছিল। কিন্তু এখন সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই, কারণ এই আত্মা যদি সম্পূর্ণরূপে শক্তি পেয়ে যায় তবে কেবল অর্জুন নয়, পুরো গ্রাম অশান্ত হয়ে উঠবে। গুরু গভীর শ্বাস নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে শুরু করলেন। তার বহু বছরের সাধনা ও অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে—অশুভ শক্তিকে ভয় দিয়ে নয়, বরং বুদ্ধি ও ধৈর্যের মাধ্যমে বশ মানাতে হয়।

এদিকে মায়া, যে অর্জুনের শৈশবসাথী, সে বুঝতে শুরু করেছে যে কিছু একটা ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ঘটে গেছে। অর্জুনের আচরণ বদলে গেছে—তার চোখে অনবরত লাল আভা, কণ্ঠে এমন শব্দ যা মানুষের নয়, আর মাঝে মাঝে সে এমন সব কথা বলে ওঠে যেগুলো মায়ার শরীর শীতল করে দেয়। মায়া প্রথমে ভেবেছিল হয়তো সাধনার প্রভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে, কিন্তু পরে উপলব্ধি করল, এখানে তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে। যখন মায়া শ্রীনাথের কাছে ছুটে আসে, তখন গুরু ইতিমধ্যেই এই সত্য উপলব্ধি করেছেন। গুরু মৃদু কণ্ঠে বলে ওঠেন, “তোমার বন্ধু এখন আর পুরোপুরি অর্জুন নেই, তার ভেতর অন্য কেউ এসে জায়গা করে নিয়েছে।” মায়ার চোখ ভিজে ওঠে, সে কাঁপা গলায় বলে, “গুরুজি, তাকে বাঁচাতে হবে, অর্জুনকে আমরা হারাতে পারি না।” শ্রীনাথ মায়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকান, তার চোখে একদিকে করুণা, অন্যদিকে দৃঢ়তা। তিনি জানালেন, এই কাজ সহজ নয়, কারণ আত্মা এখনো অর্জুনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। সময় আছে, কিন্তু সেই সময় খুব সীমিত। যদি তারা দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে দেহ আর আত্মা এক হয়ে যাবে, আর তখন কোনো সাধনাই তাকে আলাদা করতে পারবে না।

গুরু শ্রীনাথ পরিকল্পনা করতে শুরু করলেন। তিনি জানতেন এই আত্মা সাধারণ কোনো প্রেত নয়, বরং বহু বছর ধরে বন্দী থাকা এক শক্তিশালী সত্তা, যে মুক্তির জন্য তৃষ্ণার্ত। তাই তাকে কেবল মন্ত্রোচ্চারণে বশ করা যাবে না, বরং এক বিশেষ যজ্ঞের আয়োজন করতে হবে—যেখানে অর্জুনকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বেঁধে রাখতে হবে, যাতে তার দেহ থেকে আত্মাকে আলাদা করার সময় তা পালাতে না পারে। তিনি মায়াকে বললেন, “তুমি অর্জুনের কাছ থেকে দূরে থেকো না, কারণ আত্মা তার সবচেয়ে কাছের মানুষের আবেগ ব্যবহার করে আরও শক্তি পেতে চাইবে। তোমার উপস্থিতি দরকার, তবে সাবধান থেকো। ভয় দেখাবে না, ঘৃণা দেখাবে না, বরং মনে মনে তার নাম ডাকবে, তাকে মনে করাবে যে সে এখনো অর্জুন।” মায়া দৃঢ় কণ্ঠে প্রতিশ্রুতি দিল যে সে কিছুতেই অর্জুনকে ছাড়বে না। গুরু গোপনে কয়েকজন বিশ্বস্ত শিষ্যকে খবর পাঠালেন, যারা আগামী পূর্ণিমার রাতে এই যজ্ঞে অংশ নেবে। পুরো পরিবেশ যেন আরও ভারী হয়ে উঠল, কারণ সবাই জানে এখন সময়ের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধ শুরু হতে চলেছে। মায়ার চোখে ভয়ের ছাপ থাকলেও, তার হৃদয়ে এক অদম্য বিশ্বাস জন্ম নিল—অর্জুনকে ফেরানো সম্ভব, যদি তারা গুরু’র নির্দেশ মেনে চলে। আর শ্রীনাথ, যিনি বহু তান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে লড়াই করেছেন, এবারও এক অটল দৃঢ়তায় প্রস্তুত হলেন—অশুভ আত্মাকে উন্মোচন করার, আর অর্জুনকে তার নিজের দেহ ফিরিয়ে দেওয়ার।

অধ্যায় ৮ – তন্ত্রযুদ্ধ

গভীর অন্ধকারের মধ্যে গুরু আসন গ্রহণ করলেন, চারপাশে কালীমন্দিরের চৌহদ্দি যেন ঝড়ের মতো কেঁপে উঠছিল। ভোরের আলো তখনও ফোটেনি, কিন্তু আকাশে যেন রক্তরঙা অগ্নিগোলক ভাসছিল, যেন মহাশক্তির আগমন ঘটতে চলেছে। চারদিকে ঢাক-ঢোলের শব্দ থেমে গিয়ে নিস্তব্ধতা নেমে এলো, কেবলমাত্র গুরু মন্ত্রপাঠ শুরু করতেই অদ্ভুত কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি তুলল। অর্জুনের শরীর কাঁপছিল, তার চোখে তখন আর মানুষ নেই, ভিন্ন এক শক্তির আগুন জ্বলছিল। অধিকারী আত্মা যেন অর্জুনের দেহকেই যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে ফেলল। গুরু কুণ্ডলিনীর মন্ত্র আওড়ালেন, চতুর্দিকে রক্ষাচক্র আঁকতে লাগলেন, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা ভেদ করে আত্মা তার ভয়ঙ্কর আকারে আবির্ভূত হলো—লম্বা দেহ, রক্তচক্ষু আর আগুনে পুড়ে যাওয়া মুখ, যেন মৃত্যুর ছায়া। গুরু শান্ত কণ্ঠে বললেন—”তুমি বহুদিনের দুঃখ বহন করেছো, কিন্তু আজ তোমার মুক্তি অবধারিত।” আত্মা গর্জন করে উঠল, “আমি মুক্তি চাই না, আমি চাই প্রতিশোধ।” সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের বৃক্ষগুলো হাওয়ায় কাঁপতে লাগল, মাটির নিচ থেকে কালো ধোঁয়া উঠল, আর আকাশে ছিন্নবিচ্ছিন্ন বজ্রপাত ছড়িয়ে পড়ল।

তখন শুরু হলো প্রকৃত তন্ত্রযুদ্ধ। গুরু তার রুদ্রাক্ষে ভরা মালা হাতে তুলে মন্ত্র জপ করতে লাগলেন, প্রতি উচ্চারণে বজ্রের মতো শব্দ উঠতে লাগল, যেন আকাশ-পাতাল একাকার হয়ে গেছে। অন্যদিকে আত্মা অগ্নিশিখা ছুড়ে দিচ্ছিল, মাটির ভেতর থেকে কঙ্কালের হাত বেরিয়ে আসছিল, যেন মৃতেরা তাকে সাহায্য করতে চাইছে। অর্জুনের দেহ প্রতিটি মন্ত্রে কেঁপে উঠছিল, আর আত্মা তার শরীরকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে গুরুর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। গুরু যজ্ঞকুণ্ডে ঘৃত আहुতি দিলেন, আর মুহূর্তের মধ্যে সোনালি আগুনের জ্বালা উঠল, যা অন্ধকারের প্রতিটি ছায়াকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল। আত্মা সেই আলো সহ্য করতে না পেরে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। হঠাৎ করে তার অট্টহাসি চারপাশে প্রতিধ্বনিত হলো, “তুমি ভাবছো মন্ত্র আমাকে আটকে রাখতে পারবে? আমি শত বছর ধরে এই মাটির অভিশাপ!” কিন্তু গুরু থামলেন না, বরং নিজের প্রাণশক্তি ঢেলে দিলেন প্রতিটি মন্ত্রে, কপালে তিলক জ্বলজ্বল করে উঠল, কণ্ঠস্বর মহাশক্তির গর্জনের মতো ধ্বনিত হলো। তখন মাটির নিচ থেকে লাল অগ্নি উঠল, যা একদিকে আত্মাকে শক্তি দিচ্ছিল আবার অন্যদিকে গুরুর মন্ত্রে ভেঙে ভেঙে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। এই টানাপোড়েনে রাত যেন রক্তরঙা হয়ে উঠল, আকাশ যেন আক্রমণাত্মক অগ্নিগোলকে পরিণত হলো।

গুরু তখন নিজের চূড়ান্ত শক্তি প্রয়োগ করলেন। তিনি শঙ্খ বাজালেন, যার শব্দে আকাশের নক্ষত্রও কেঁপে উঠল, আর চারপাশের অন্ধকার ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করল। আত্মা ভীষণ যন্ত্রণায় কাঁপতে লাগল, অর্জুনের শরীর ছটফট করতে লাগল, আর একসময়ে তার মুখ থেকে দুটো কণ্ঠ বের হতে লাগল—একটি অর্জুনের দুর্বল, কষ্টে ভরা কণ্ঠ, আরেকটি আত্মার রাগে ভরা অগ্নিগর্জন। গুরু নিজের ত্রিশূল তুলে ধরলেন, মন্ত্রের শক্তিকে সেই অস্ত্রে প্রবাহিত করে আত্মার ওপর আঘাত হানলেন। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের বিশাল বিস্ফোরণ হলো, আত্মা হাহাকার করে উঠল, আকাশে ছিটকে গেল তার ছায়া, আর অর্জুন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল, কিন্তু বাতাসে এখনো সেই যুদ্ধে ব্যবহৃত শক্তির সাড়া শোনা যাচ্ছিল। গুরু হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ বন্ধ করলেন, জানলেন এই যুদ্ধ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি—কারণ আত্মা দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিঃশেষ হয়নি। সামনে যে লড়াই আসছে, তা আরও ভয়ঙ্কর, আরও অমানবিক হতে চলেছে। তন্ত্রযুদ্ধের এই প্রথম অধ্যায় কেবল শুরু।

অধ্যায় ৯ – আত্মার দ্বন্দ্ব

অন্ধকারাচ্ছন্ন যজ্ঞমণ্ডপে বাতাস হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল, যেন পৃথিবীর সমস্ত দম বন্ধ হয়ে আসছে। চারপাশে জ্বলতে থাকা ধূপকাঠির ধোঁয়া সর্পিল হয়ে ঘুরে গিয়ে অদ্ভুত আকার নিচ্ছিল। গুরু তাঁর মন্ত্রোচ্চারণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে অর্জুন অনুভব করল, যেন এক অদৃশ্য শক্তি তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। চোখের সামনে মশালের আলো কেঁপে উঠল আর অর্জুন দেখতে পেল—নিজেরই আরেকটি ছায়া, মুখে ভয়ঙ্কর হাসি, লাল জ্বলন্ত চোখ, দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। এটাই সেই অধিকারী আত্মা, যে এতদিন তার দেহ ও মনকে বন্দি করে রেখেছিল। অদ্ভুত যন্ত্রণা আর ক্রোধের মিলিত প্রকাশে আত্মার দেহটা ভারী হয়ে উঠল। অর্জুন চিৎকার করে উঠতে চাইলো, কিন্তু গলায় কোনো শব্দ বের হলো না—শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ ধরা দিল। চারপাশের সব শব্দ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল, শুধু দুই আত্মার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার ভারে বাতাস কেঁপে উঠল। অধিকারী আত্মা ঠাণ্ডা হাসি হেসে বলল, “এই দেহ আমার, তুমি শুধু এক ক্ষণস্থায়ী অতিথি। এখন বলো, তুমি কি পারবে নিজের অধিকার ফেরত নিতে?” অর্জুন চোখ বন্ধ করে নিজের মনের গভীরে ঢুকতে লাগল। সে অনুভব করল নিজের স্মৃতি, নিজের হাসি, নিজের পরিবার—সবকিছু যেন ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। সে জানত, এ লড়াই কেবল আত্মার নয়, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

অধিকারী আত্মা প্রথমেই আক্রমণ করল। ভীষণ এক ঝড়ের মতো শক্তি অর্জুনের আত্মাকে ছিঁড়ে ফেলতে চাইলো। চারপাশের আগুনগুলো হঠাৎ করে উঁচু হয়ে জ্বলে উঠল, মশালগুলো কেঁপে উঠল, আর বাতাসে যেন মৃত্যু গন্ধ ভেসে উঠল। অর্জুন নিজের শক্তি জড়ো করে দাঁত চেপে প্রতিরোধ করল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনগুলোর স্মৃতি, যখন সে গ্রামের মাঠে দৌড়ে বেড়াত, যখন তার মা তাকে কোলেপিঠে করে গল্প শোনাত, আর যখন প্রথমবারের মতো সে এই অন্ধকার শক্তির আঘাতে ভেঙে পড়েছিল। সেই সব স্মৃতি তাকে নতুন করে সাহস দিল। সে বুক চিতিয়ে বলল, “এ দেহ আমার, আমার শ্বাস, আমার রক্ত—তুমি যতই শক্তিশালী হও না কেন, আমার ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানতেই হবে।” কথাটা বলা মাত্র তার চারপাশে যেন আলোকবলয় ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু আত্মা থামল না। অধিকারী আত্মা এক বিভীষিকাময় রূপ নিল—অর্ধেক মানব, অর্ধেক অগ্নিশিখার মতো জ্বলন্ত দেহ, চোখে প্রচণ্ড ক্রোধের ঝলক। সে অর্জুনকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিল। মাটির ভেতর থেকে অদ্ভুত সব হাত বেরিয়ে এসে অর্জুনকে টেনে ধরতে চাইলো, যেন তাকে গভীর অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাবে। কিন্তু অর্জুন সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই হাতগুলো ছিঁড়ে ফেলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক বজ্রনাদ, “আমি হেরে যাব না!” মন্ত্রোচ্চারণরত গুরু এই সংঘর্ষের কম্পন টের পাচ্ছিলেন। তার মনে হচ্ছিল, মণ্ডপের ভেতরে দুটি দানবীয় শক্তি আছড়ে পড়ছে, আর প্রতিটি মুহূর্তেই অর্জুনের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে।

শেষ লড়াই শুরু হলো। অর্জুনের আত্মা এবার আক্রমণে নামল। সে সমস্ত শক্তি দিয়ে অধিকারী আত্মার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ভয়ের বদলে এক অদ্ভুত শূন্যতা দেখা গেল, যেন হাজার বছরের যন্ত্রণা জমে আছে। অর্জুন বুঝতে পারল—এ আত্মা শুধু দেহের অধিকার চাইছে না, তার পেছনে আছে অভিশাপ আর প্রতিশোধের আগুন। অর্জুন বুকের ভেতর থেকে এক গভীর কণ্ঠে বলল, “তুমি আমাকে গ্রাস করতে পারবে না, কারণ আমার আত্মা আলো দিয়ে গড়া। আমি জীবনের জন্য লড়ছি, তুমি কেবল অন্ধকার।” সেই মুহূর্তে তার চারপাশে আলোকরশ্মি বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ল। অধিকারী আত্মা চিৎকার করে উঠল, তার দেহ ভাঙতে লাগল, ভস্ম হয়ে ছড়িয়ে যেতে লাগল বাতাসে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সে বলে উঠল, “তুমি জিতেছ, তবে মনে রেখো, অন্ধকার কখনও সম্পূর্ণ হার মানে না।” আর্তনাদ ভেসে গেল চারপাশে, তারপর নিস্তব্ধতা। অর্জুন হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীর যেন একেবারে ক্লান্ত, কিন্তু চোখে ভেসে উঠল নতুন আলো। গুরু এগিয়ে এসে হাত রাখলেন তার মাথায়। তিনি বললেন, “তুমি জয়লাভ করেছ, তবে লড়াই এখানেই শেষ নয়। আত্মার দ্বন্দ্ব থেমে গেলেও, অন্ধকার আবার আসতে পারে। প্রস্তুত থেকো।” অর্জুন নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে জানত, আজকের এই দ্বন্দ্বে সে দেহ ফিরে পেয়েছে, কিন্তু এই যুদ্ধ কেবল শুরু। অগ্নিশিখার আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা অর্জুন যেন আর আগের মতো সাধারণ যুবক নয়—সে হয়ে উঠেছে আলো আর অন্ধকারের লড়াইয়ের প্রতীক, যে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবে।

অধ্যায় ১০ – সমাপ্তি ও শিক্ষা

শেষ লড়াইয়ের আবহ যেন প্রকৃতিকে কাঁপিয়ে তুলেছিল। অর্জুনের শরীরের ভিতরে চলছিল ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্ব—একদিকে তার নিজের আত্মা, অন্যদিকে সেই প্রাচীন অধিকারী আত্মা যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে ছিল। মুহূর্তে মুহূর্তে মনে হচ্ছিল শরীরটা যেন দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে, হাড়গোড় কেঁপে উঠছে, রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছে। অর্জুন বারবার অনুভব করছিল, যদি এই যুদ্ধে হেরে যায় তবে সে চিরতরে নিজের অস্তিত্ব হারাবে, তার নাম, তার স্মৃতি, সব মুছে যাবে, আর শরীরটা হয়ে যাবে শুধু এক যন্ত্র—যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে সেই দানবীয় শক্তির হাতে। কিন্তু অর্জুনের ভিতরে ছিল তার মা-বাবার মুখ, ছিল গ্রামের সেই মাটির গন্ধ, ছিল সেই দিনগুলির স্মৃতি যখন সে নিষ্পাপ হাসিতে ভরিয়ে দিত চারপাশ। এই আবেগই তার শক্তি হয়ে দাঁড়াল। এক মুহূর্তে সে অনুভব করল যেন অন্ধকারের গভীরে একটা আলো জ্বলে উঠছে—এ আলো কেবল তার নিজের ভেতরের বিশ্বাসের আলো। আত্মার সেই দ্বন্দ্ব ক্রমশ ভয়ঙ্কর হলেও অর্জুনের সংকল্প আরও কঠিন হয়ে উঠল। সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে আত্মাকে ধরে রাখল, মনে মনে উচ্চারণ করল গুরু প্রদত্ত মন্ত্র, আর সেই মন্ত্রের প্রতিধ্বনি যেন একেকটা বজ্র হয়ে দানবীয় আত্মার ওপর আছড়ে পড়তে লাগল। প্রাচীন আত্মা চিৎকার করে উঠল—সে বুঝে গিয়েছিল অর্জুন আর সাধারণ মানুষ নেই, সে এখন জাগ্রত এক তন্ত্রশক্তির বাহক, যে নিজের শরীর রক্ষার জন্য মৃত্যুকেও তুচ্ছ করছে।

শেষ মুহূর্তে সংঘর্ষ এমন জায়গায় পৌঁছাল যে মনে হচ্ছিল দেহটা ভেঙে যাবে, চারপাশের বাতাসে আগুন লেগে উঠবে। হঠাৎ গুরু এক বজ্রনাদে উচ্চারণ করলেন—“যে আত্মা নিজের পথ ভুলে যায়, সে আলোর দ্বারা দগ্ধ হয়।” মন্ত্রের শক্তি যেন এক ঝলক বিদ্যুতের মতো অর্জুনের শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে প্রাচীন আত্মার চিৎকার ধ্বনিত হল, আর তার কালো ছায়া দুলতে দুলতে অর্জুনের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে লাগল। অর্জুন হঠাৎ অনুভব করল নিজের বুকের ভেতর থেকে একটা বিশাল চাপ মুক্ত হয়ে গেল। তার নিঃশ্বাস যেন আবার ফিরে এল, শরীরের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হল, আর চোখে জ্বলে উঠল স্বস্তির আলো। কিন্তু সেই আলো অর্জুনের নয় একা—গুরুর চোখেও জ্বলে উঠল। গুরু ধীরে ধীরে বললেন, “তুমি জয়ী হয়েছ অর্জুন, কিন্তু মনে রেখো, এই জয় কোনো সাধারণ জয় নয়। তুমি আজ নিজেকে রক্ষা করলে, কিন্তু সেই আত্মাকে দগ্ধ করার পেছনে যে তন্ত্রশক্তি ব্যবহৃত হল, তার দায় তোমার কাঁধেও রইল।” অর্জুন মাটিতে বসে হাপাচ্ছিল, তার দেহে ঘাম ঝরছিল প্রবল বৃষ্টির মতো। কিন্তু তার মুখে ছিল শান্তির হাসি—সে নিজের অস্তিত্ব ফিরে পেয়েছে, নিজের মানুষ হয়ে উঠেছে আবার।

গুরু তখন গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সবাইকে শিক্ষা দিলেন। তিনি বললেন, “আজ তোমরা প্রত্যক্ষ করলে—তন্ত্র কোনো খেলা নয়। তন্ত্রশক্তি যদি লোভ, প্রতিশোধ বা অহংকারের কারণে ব্যবহৃত হয় তবে তা ধ্বংস ডেকে আনে, যেমন এই প্রাচীন আত্মার কাহিনি প্রমাণ করে দিল। অর্জুনকে যে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হল, সেটাই প্রমাণ করে তন্ত্রশক্তি কতটা ভয়ঙ্কর এবং কতটা দায়ভারপূর্ণ। মনে রেখো, প্রকৃতি ও আত্মার মধ্যে যে সূক্ষ্ম সামঞ্জস্য আছে, তাকে ভাঙার অধিকার কারও নেই। যে তন্ত্রী সত্যিকারের সাধক, সে শক্তির ব্যবহার করে না নিজের স্বার্থে, বরং মানবতার কল্যাণে।” চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে এল। গ্রামের মানুষরা মাথা নিচু করে গুরু’র কথা শুনছিল। অনেকেই কেঁপে উঠছিল এই ভেবে যে তারা একসময় মজা করে বা কৌতূহলবশত তন্ত্র নিয়ে খেলতে চেয়েছিল। অর্জুন ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে গুরুর চরণে প্রণাম করল। তার চোখে জল জমে উঠেছিল—সে জানত আজকের শিক্ষা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। গুরু তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “তুমি আজ এক অমূল্য পাঠ শিখেছ। এই শিক্ষা তোমার জীবনকে রক্ষা করবে এবং অন্যদের রক্ষার শক্তিও দেবে। মনে রেখো, আসল শক্তি তন্ত্রে নয়, আত্মসংযমে।” গ্রামের মানুষরা অর্জুনকে ঘিরে ধরল, কেউ তার হাত ধরল, কেউ কাঁধে হাত রাখল। তারা সবাই জানত—আজ তারা শুধু এক যুবকের লড়াই দেখেনি, বরং দেখেছে কেমন করে আলো অন্ধকারকে জয় করে। এই অভিজ্ঞতা তাদের জীবনে চিরকালের জন্য এক শিক্ষা হয়ে থাকবে।

সমাপ্ত

 

1000059265.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *