মহেন্দ্র গায়েন
পর্ব ১: বনে পা রাখা
পুব আকাশে রোদ ভোরের ঘুম কাটিয়ে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে। একচিলতে নৌকো মেঘনার কোল ধরে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণের দিকে। পানির ঢেউয়ে পাটাতনের নিচে টুপটাপ শব্দ—তার সঙ্গে নৌকার চালকের টানা হুঁকোর গুমরে ওঠা। তার পাশে বসে দশ বছরের ছোট্ট ছেলেটা অদ্ভুত উত্তেজনায় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে চারপাশে। চোখেমুখে স্পষ্ট কৌতূহল।
সে ছোট ছেলেটির নাম সুবর্ণ। পাশে বসে থাকা মানুষটি তার বাবা, নাম তপন মণ্ডল। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও প্রকৃতি ও ইতিহাসের প্রতি অসম্ভব আগ্রহী। ছেলেকে নিয়ে এবার এসেছেন সুন্দরবন দেখতে, শুনতে আর বুঝতে—এই বনের গল্পগুলো সে ছেলেবেলায় বাবার মুখে শুনত, আর এখন নিজের ছেলের হাত ধরে এসেছে বাস্তবে সেই গল্পের গভীরে।
“বাবা, এটা কি সত্যিই সেই সুন্দরবন, যেখানে বাঘ থাকে?” — সুবর্ণ জিজ্ঞেস করে।
তপন হেসে বলেন, “হ্যাঁ বাবু, এই যে সবুজ বন যা তুই দেখতে পাচ্ছিস, তার ভেতরেই বাস করে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। তবে সে সবসময় চোখে পড়ে না। তবুও তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। বাতাসে, গন্ধে, নিঃশব্দে তার চলাফেরায়।”
ছোট ছেলেটা যেন আরো বেশি মনোযোগ দিয়ে তাকায়—গভীর সবুজের ভেতর তার দৃষ্টি গলে যায়। নৌকো এখন নামখানা ঘাটের কাছে এসে পৌঁছেছে। সামনে ছোট্ট একটি গ্রাম, কিছু কাঁচা-পাকা ঘর, আর তার পেছনেই শালুক, হরিণখালির দিকের জঙ্গল। যাত্রী ঘাটে নামতেই অভ্যর্থনা জানায় এক গাইড—মুকুন্দ দা, বছর পঁইত্রিশের পরিশ্রমী, হৃষ্টপুষ্ট মানুষ। চোখে চটপটে ভঙ্গি, পিঠে একটি সাদা কাপড়ের ব্যাগ আর কাঁধে জলের বোতল ঝোলানো।
“আপনারাই বোধহয় কলকাতা থেকে এসেছেন? আজ রাতের থাকার ব্যবস্থা বনদফতরের কটেজে। কাল সকালে চলব জঙ্গলের ভেতরে।”
তপন মাথা নেড়ে বলেন, “হ্যাঁ, সুবর্ণকে সুন্দরবন দেখাতে চেয়েছিলাম অনেকদিন ধরেই। ওর তো বাঘ নিয়ে খুব আগ্রহ।”
মুকুন্দ দা হেসে বলেন, “এই জঙ্গলে পা দিলে সবাই একবার না একবার বাঘের কথা ভাবেই। কিন্তু বাঘ তো আর সবসময় দেখা দেয় না। ওরা রাজা—চুপচাপ নজর রাখে, যখন খুশি, তখনই দেখা দেয়।”
সেই রাতে তারা বনবিভাগের একটি কটেজে ওঠে। কাঠের তৈরি সেই ঘরটার ছাদে টিন, আর চারপাশে জাল দিয়ে ঘেরা বারান্দা। কটেজ থেকে সামনেই নদী, পেছনে ধু-ধু চর আর ঘন অরণ্য। সন্ধ্যায় চারদিকে নিস্তব্ধতা নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বনজ শব্দের আসর—কখনো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, কখনো দূরের হরিণের চিৎকার, আবার কখনো বনের গহীন থেকে ভেসে আসে অচেনা গর্জন। সুবর্ণ তখনও ঘুমোয়নি। সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঝাঁঝালো হাওয়া গায়ে মেখে তাকিয়ে আছে বনপথের দিকে। হঠাৎ সে বাবাকে টেনে বলে, “বাবা, ঐ দূরে কি একটা আওয়াজ পেলি? যেন বাঘ গর্জন করল!”
তপন কান খাড়া করে শোনে। সত্যিই একটা গম্ভীর গর্জনের মতো শব্দ দূরে কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে। তিনি শান্ত গলায় বলেন, “হতে পারে, তবে ভয় পাস না। এখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে। বনের গভীরে বাঘ থাকে, তবে তারা মানুষের চেয়ে মানুষের গন্ধকেই বেশি এড়িয়ে চলে।”
রাতের খাবার ছিল সরল—ডাল, ভাত, আলু পোস্ত আর একটা টুকরো ভাজা মাছ। সেই স্বাদ ছিল উপচে পড়া গল্পে, নিঃসঙ্গ বনের গন্ধে। রাতভর ঝিঁঝিঁ আর দূর-দূরান্তের শব্দে কানে এসে লাগে সুর। বনের সঙ্গীত যেন। সকালবেলা সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গাইড মুকুন্দ দা এসে পৌঁছায়। রেডি হতেই তারা হাঁটা শুরু করে পায়ে চলা বনপথ ধরে। হালকা কুয়াশা, ভিজে মাটি আর গাছের পাতার গায়ে জমে থাকা শিশির—সুবর্ণ যেন হেঁটে যাচ্ছে এক রূপকথার জগতে। মুকুন্দ দা হাঁটতে হাঁটতে বলছিলেন, “এই যে রাস্তা ধরে আমরা চলছি, এটাকে বলে চিংড়িঘাটা ট্রেইল। এর একপাশে গরান গাছ, আরেকপাশে হালকা কেওড়া। এই গাছগুলোর মাঝেই ছোট ছোট খাল—সেখানেই বসবাস করে কাঁকড়া, ছোট মাছ আর কচুরিপানার দল। অনেক সময় এই খালের পাশে হরিণের খোঁজ মেলে।”
সুবর্ণ জিজ্ঞেস করে, “আর বাঘ?”
মুকুন্দ দা হেসে বলেন, “বাঘ তোর আগেই চোখে পড়লে বুঝবি না। ওরা ছায়ার মতো চলে। যদি কোনদিন তোর দিকে তাকায়, তুই হয়ত জানতেও পারবি না। শুধু অনুভব করতে পারবি।”
পথে তারা এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। গাইড আঙুল দিয়ে দেখায়—“ওই যে, গাছের গায়ে আঁচড়! এটা বাঘের নিশান। ওরা নিজেদের সীমানা চিহ্নিত করে এভাবে।”
সেই দাগে বাঘের থাবার ছাপ এখনো টাটকা। তপন গম্ভীর হয়ে বলেন, “মানুষ এই বনকে ভয় পায়, কিন্তু একইসঙ্গে এর ওপর নির্ভরও করে। মধু সংগ্রাহক, জেলে, কাঠুরে—সবার জীবন গড়ে উঠেছে এই বনকে ঘিরে।”
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটাও থামে। এক বাঁশের ছাউনি ঘরে সবাই বসে বিশ্রাম নেয়। মুকুন্দ দা একটুখানি গল্প বলতে শুরু করে: “আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন একবার আমার কাকা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে আর ফেরেনি। বাঘ নিয়ে গিয়েছিল তাকে। মা বলত, ‘বনে গেলে দেবতা ডাক দে, বাঘের চোখ যেন তোকে না দেখে।’ তখন বুঝিনি, এখন বুঝি—এই বাঘ আমাদের শত্রু নয়, আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সে ভয়ংকর, তবে তারও তো বন দরকার বাঁচার জন্য।”
সুবর্ণ বিস্ময়ে বলে, “তাহলে মানুষ আর বাঘ কি একসাথে থাকতে পারে?”
তপন বলেন, “এই তো মূল গল্প, বাবু। মানুষ বন ছাড়তে চায় না, বাঘও তার রাজ্য ছাড়ে না। কিন্তু দুইজনেরই সহাবস্থান দরকার—না হলে কেউই টিকবে না।”
দিন শেষে তারা ফিরে আসে কটেজে। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছিল, লাল আভায় রঙিন হয়ে উঠেছে জল, গাছের ছায়া যেন দীর্ঘ হয়ে পড়েছে মাটিতে। সুবর্ণ সেই সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলে, “বাবা, আমি ভাবতাম বাঘ খালি গল্পে থাকে। কিন্তু এখন বুঝলাম, এটা তার নিজের রাজ্য। আমরা অতিথি মাত্র।”
তপন ছেলেকে বুকে টেনে বলেন, “তুই একদিন বুঝবি, প্রকৃতি আমাদের শিখিয়ে যায় বিনয় কী, সহাবস্থান কী, আর বেঁচে থাকার মানে কী।”
সেদিন রাতে, বারান্দার মশারির ভেতর শুয়ে, ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ে বাঘের স্বপ্ন নিয়ে। তার স্বপ্নে বাঘ হেঁটে আসে নিরিবিলি এক বনপথ ধরে, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি—কিন্তু তাতে নেই কোনো হিংস্রতা। বরং যেন বোঝাতে চায়—“আমি এখানে আছি, যেমন তুমিও।”
পর্ব ২: হানিমুনবাগান ও বিপদের গন্ধ
সকালের হালকা রোদ গায়ে মেখে সুবর্ণ আর তার বাবা তপন মণ্ডল আবার রওনা দিয়েছেন সুন্দরবনের আরও গভীরে। আগের দিনের অভিযানে তারা যেমন ছিল বিস্মিত, আজ তারা যেন আরও প্রস্তুত, আরও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে এই বনময় জীবনের সঙ্গে।
গাইড মুকুন্দ দা আজ তাদের নিয়ে যাচ্ছেন সুন্দরবনের এক বিশেষ অংশে, যাকে স্থানীয়রা বলে ‘হানিমুনবাগান’। নাম শুনে প্রথমে সবাই হেসে ফেললেও মুকুন্দ দা একটু থেমে গম্ভীর হয়ে বললেন, “এই জায়গাটা নামেই মিষ্টি, কিন্তু বনের এক সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল এটা। এখানেই সবচেয়ে বেশি বাঘের আনাগোনা।”
তপন একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তবে নামটা হানিমুনবাগান কেন?”
মুকুন্দ দা বললেন, “এইখানে বহু আগে এক দম্পতি এসেছিল ঘুরতে। তারা এই নির্জন জায়গার প্রেমে পড়ে যায়। তখনও এই এলাকাটা সংরক্ষিত ছিল না। তাদের কেউ আর খুঁজে পায়নি। তখন থেকেই নামটা রয়ে গেছে, যদিও এই গল্প কতটা সত্যি কেউ জানে না। তবে স্থানীয় লোকেরা বলে, বাঘের ছায়া পড়েছিল তখনও।”
সুবর্ণের চোখ বড় হয়ে যায়। সে বাবার হাত শক্ত করে ধরে বলে, “বাবা, আমরা সেখানে যাচ্ছি তো? তাহলে বাঘ যদি হঠাৎ চলে আসে?”
তপন মাথা ঠুকিয়ে বলেন, “ভয় পাস না। আমরা তো গাইডের সঙ্গে যাচ্ছি। আর বনের নিয়ম মানলে বাঘও সাধারণত আক্রমণ করে না।”
পথটা সরু, দু’পাশে কেওড়া আর সুন্দরী গাছের ঘন সারি। কাঁটাঝোপ পেরিয়ে যেতে হয় খুব সাবধানে। কয়েকটা জায়গায় তো হাঁটুসমান কাদাও পেরোতে হয়েছে। পাশে ছোট একটা খাল, যেখানে দেখা গেল কাঁকড়ার আস্তানা, কিছু নাম না-জানা পাখির ডানা ঝাপটানো। হঠাৎ এক জায়গায় তারা থেমে যায়।
মুকুন্দ দা ফিসফিস করে বলেন, “এই জায়গাটা হলো ‘প্যাঁচার গলি’। এখানে খুব সাবধানে চলতে হবে। কয়েকদিন আগেই একজন মধু সংগ্রাহকের মৃতদেহ পাওয়া গেছে এখানেই।”
চারপাশ নিঃস্তব্ধ। হঠাৎ এক ঝাঁক পাখি উড়ে যায় মাথার ওপর দিয়ে। বন যেন কিছুর ইশারা দিচ্ছে। সুবর্ণের বুক ধুকপুক করে। তার মনে হচ্ছে, কেউ যেন গাছের আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে। তারা ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। হঠাৎ মুকুন্দ দা থামেন। তিনি আঙুল দিয়ে দেখান সামনের মাটিতে একটা বড় থাবার ছাপ। চারটি দাগ একে অপর থেকে সমদূরত্বে। নিচু হয়ে তপন বলেন, “এটা তো একদম টাটকা ছাপ!”
মুকুন্দ দা মাথা নাড়েন, “হ্যাঁ। এই পথেই চলেছে ও। গতরাতেই বোধহয়।”
সুবর্ণের গা ঠান্ডা হয়ে যায়। কিন্তু সেও কিছুটা সাহসী—সে বাবাকে বলে, “বাবা, ও কি এখন আমাদের আশেপাশেই আছে?”
তপন একটুখানি থেমে বলেন, “হতে পারে, তবে আমরা হিংস্র নই, আর ওও সেভাবেই দেখে আমাদের।”
একটু এগোতেই পৌঁছায় সেই হানিমুনবাগানে। জায়গাটা দেখলে সত্যিই মন কাড়ে। সামনে ঘন গাছের ছায়া, মাঝখানে একটা খোলা চত্বর, আর তার মাঝে ছোট্ট একটা জলাশয়। ঝিরঝিরে হাওয়া আর পাখিদের ডাক মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ। মুকুন্দ দা বলেন, “এই জলাশয়েই বাঘেরা অনেক সময় আসে জল খেতে। এখানে বসে থাকলে কখনো ভাগ্য ভালো হলে দেখা মেলে।”
তারা একটা উঁচু বাঁশের মাচায় উঠে বসে। জায়গাটা জালের মতো ঘেরা, নিরাপত্তার জন্য। তপন একটা ক্যামেরা বার করে ছবি তুলতে থাকেন। সুবর্ণ ছায়ায় বসে পড়ে, সে চারপাশের শব্দ শুনতে থাকে মন দিয়ে। হঠাৎ দূরে গাছের আড়ালে কিছু একটা নড়ে ওঠে। সুবর্ণ উত্তেজিত হয়ে বাবাকে বলে,
“বাবা! কিছু একটা চলল ওখানে! বাঘ না তো?”
তপন ক্যামেরা তাক করেন। কিন্তু পাতার ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। মুকুন্দ দা বাইনোকুলার চোখে দিয়ে চেয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ পরে বলেন,
“হরিণ। তবে খুব অস্বাভাবিকভাবে ছুটছে। সম্ভবত কোনো শিকারি তার পেছনে।”
হঠাৎ বনের নিস্তব্ধতা যেন চিৎকারে ফেটে পড়ে। একরাশ গর্জন! তীব্র, গম্ভীর। সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সুবর্ণের শরীর জমে যায়। বাঘ! ঠিক পেছনের জঙ্গল থেকে গর্জন করল সে।
মুকুন্দ দা তখন সাবধান করে বলেন, “সবাই চুপ। নড়াচড়া বন্ধ। বাঘ খুব কাছেই।”
তিনজনেই নিঃশ্বাস চেপে ধরে বসে থাকে। গর্জনের পর সবকিছু চুপচাপ। শুধু দূরে একটা পাখি ঘন ডানায় উড়ে যায়। সময় যেন থমকে গেছে। এক মিনিট, দুই মিনিট, তিন মিনিট পেরিয়ে যায়। কিন্তু আর কিছু শোনা যায় না।
মুকুন্দ দা ফিসফিস করে বলেন, “হয়তো সে আমাদের দেখে নীরবে চলে গেছে। এটাই ওদের স্টাইল। কাউকে না জানিয়ে আসা, কাউকে না জানিয়ে চলে যাওয়া।”
তারা নিচে নেমে জলাশয়ের ধারে যায়। সেখানে দেখা যায় হরিণের পায়ের ছাপ, আর পাশে বড় বড় থাবার দাগ—জলের পাশ দিয়ে হেঁটে গেছে সেই অপরূপ বনরাজ।
তপন ছেলেকে বলেন, “দেখলি, মানুষ আর বাঘ—একই জল খায়, একই মাটিতে হেঁটে যায়। শুধু একজন রাজা, আরেকজন অতিথি।”
সুবর্ণ তখন বলেন, “বাবা, আমি বড় হয়ে বনবিজ্ঞানী হতে চাই। আমি এই বন, এই বাঘ আর এই মানুষদের সম্পর্কে সবাইকে জানাবো।”
তপনের চোখ ছলছল করে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন, তার ছেলে এখন শুধু পর্যটক নয়, সে প্রকৃতির এক নতুন বন্ধু হতে চলেছে। ফেরার পথে আবার সেই প্যাঁচার গলি পেরোতে হয়। এবার আর তারা ভয় পায় না। যেন বাঘের উপস্থিতি তাদের অভ্যস্ত করে তুলেছে।
কটেজে ফিরে রাতে সুবর্ণ ডায়েরিতে লেখে: “আজ আমি বাঘের গর্জন শুনেছি। আমি জানি, সে কোথাও ছিল। সে আমাদের দেখেছে, আর আমরাও তাকে অনুভব করেছি। আমরা যেন দুজন দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে, এক বনের দুই জীবন। মানুষ ও বাঘ একসঙ্গে বাঁচতে শিখলেই প্রকৃতি রক্ষা পাবে।”
পর্ব ৩: মৌয়ালদের মুখে বনের ভাষা
সকালটা মেঘলা। আকাশে রোদ নেই, কিন্তু বাতাসে এক ধরনের রোমাঞ্চ ছড়িয়ে আছে। আগের দিনের হানিমুনবাগানের অভিজ্ঞতা সুবর্ণ আর তপন মণ্ডলের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। বাঘের গর্জন, হরিণের ছুট, জলাশয়ের পাশের থাবার ছাপ—সব মিলিয়ে যেন তারা একটা নতুন জগতে প্রবেশ করেছে। আজ তাদের যাওয়ার কথা মৌয়ালপাড়া, যেখানে বনের প্রাচীনতম বাসিন্দাদের মধ্যে অন্যতম, মধু সংগ্রাহকরা—স্থানীয় ভাষায় যাদের বলে মৌয়াল।
গাইড মুকুন্দ দা ভোরবেলায় এসে জানালেন, “আজ আমরা যাচ্ছি সেই মানুষদের কাছে, যারা বছরের পর বছর ধরে বাঘের সঙ্গে সহাবস্থান করে আসছে, কিন্তু এখন শহরের মানুষের চোখে তারা হারিয়ে যেতে বসেছে।”
তপন ভাবলেন, সুবর্ণের প্রকৃতি শেখার এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে চলেছে।
নৌকায় চড়ে তারা রওনা দেয় একটি সরু খালের দিকে, যাকে সবাই বলে রায়মঙ্গল খাল। খালের দু’পাশে কেওড়া আর গরান গাছের সারি, মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে কাঁকড়া ধরার জাল পাতা, আর কিছু জায়গায় ধোঁয়া উড়ছে—মৌয়ালদের অস্থায়ী ক্যাম্প।
মুকুন্দ দা বলেন, “মৌয়ালরা বছরে মাত্র ২-৩ বার মধু সংগ্রহ করতে আসে। একেকটা অভিযানে থাকতে হয় ১০-১৫ দিন। গাছ চেনে, মৌমাছির ডেরা চেনে, আর বাঘের চেহারা তো রক্তে মিশে গেছে।”
সুবর্ণ একটানা দেখে চলেছে চারপাশ। হঠাৎ দূরে দেখা যায় একঝাঁক মৌমাছি উড়ছে। তার পাশেই কয়েকজন মানুষ, মাথায় গামছা বাঁধা, গায়ে মাটির রঙের জামা, আর হাতে ধোঁয়ার কুন্ডলি ছেড়ে চলেছে। তারা পৌঁছে যায় মৌয়ালপাড়ার অস্থায়ী শিবিরে। তাঁবু বানানো হয়েছে গরান কাঠ আর পলিথিন দিয়ে। আশপাশে কয়েকটা বড় হাঁড়ি, কিছু শুকনো কাঠ, আর মৌচাক ভরা টিনের বাক্স। তাদের স্বাগত জানান এক বৃদ্ধ মৌয়াল—কুলদীপ মোল্লা, বছর পঁচাত্তর, চোখে কাচবিহীন ফ্রেম, মুখে একজোড়া গাম্ভীর্য।
তপন এগিয়ে গিয়ে বলেন, “আমরা শহর থেকে এসেছি, জানতে চাই আপনারা কীভাবে এত বছর বাঘের ভয়কে ছাড়িয়ে এই কাজ করে গেছেন।”
কুলদীপ মুচকি হেসে বলেন, “ভয় মানেই যদি জীবন থেমে যায়, তাহলে তো সুন্দরবনের একটাও মানুষ বাঁচত না। আমরা বাঘের কাছে মানুষ, আর মানুষ হিসেবে থাকলেই বাঁচা যায়।”
সুবর্ণ বলল, “আপনি কখনো বাঘের সামনে পড়েছেন?”
কুলদীপ একটু নরম সুরে বলেন, “তিনবার। একবার তো কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তার চোখে চোখ রেখে গামছাটা মাথা থেকে খুলে একহাতে নাড়ালাম—এক ধরনের ভাষা ও বুঝে। ও চলে গেল। আমাদের এই অরণ্যের ভাষা শহরের মানুষ বুঝবে না, এখানে শব্দ নয়, শরীর ভাষা কথা বলে।”
সুবর্ণ আর তপনকে নিয়ে কুলদীপ তাদের একটি অভিযানে নিয়ে গেলেন। একটু দূরের গাছে একটি বড় মৌচাক ঝুলছে। কুলদীপ ও তার দুই সঙ্গী ধোঁয়ার পাত্র জ্বালিয়ে, মাথায় মধু পোড়ানো কাপড় বেঁধে, অত্যন্ত ধীরে ধীরে গাছে উঠতে শুরু করলেন।
মুকুন্দ দা বললেন, “এই গাছ উঠার সময় সবচেয়ে বিপজ্জনক। বাঘ থাকলে এই সুযোগে আক্রমণ করে। একচোখ খোলা রাখে তারা।”
সুবর্ণ নিঃশ্বাস আটকে দেখছে পুরো প্রক্রিয়া। মৌমাছিরা উড়ছে চারদিকে, কিন্তু ধোঁয়ার কারণে তারা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।অবশেষে নিচে নামলেন কুলদীপ, হাতে এক টিনভর্তি ঝরানো মধু আর মৌচাকের ভাঙা অংশ।
কুলদীপ বলেন, “এই মধু হচ্ছে ‘মৌসুন্দরি’। মে মাসের মধু। এইটার দাম এখন হাজার টাকার উপরে উঠেছে। কিন্তু আমরা পাই সামান্য, বেশি যায় দালালের হাতে।”
তপন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তা হলে এই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন কেন?”
কুলদীপ হাসলেন, “আমাদের রক্তেই বন। ঝুঁকি না নিলে আমাদের পেট চলবে না। আর এই বনের গন্ধ ছাড়া ঘুম হয় না।”
তারা খালপথে ফিরছিলেন। হঠাৎ একজায়গায় নৌকা থামে। সামনে একগাছি জায়গায় দেখা যায় কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে। কুলদীপ বলেন, “একজন মৌয়াল গত সপ্তাহে নিখোঁজ হয়েছিল। আজ তার ঝুলন্ত ব্যাগ পাওয়া গেছে এখানে।”
চারদিকে নিস্তব্ধতা। পাখিরা থেমে গেছে। গাছের পাতার নড়াচড়াতেও একটা শোক ভেসে বেড়াচ্ছে।
সুবর্ণ বলে ওঠে, “তবে কি বাঘ…?”
কুলদীপ মাথা নাড়েন, “হয়তো। হয়তো নয়। কিন্তু আমরা কখনো বাঘকে দোষ দিই না। বাঘ নিজের জায়গায় ছিল, মানুষ ভুল পথে পা দিয়েছে। যারা মারা যায়, তাদের পরিবার বাঘের মৃত্যুদণ্ড চায় না। বরং চায় সম্মান।”
মুকুন্দ দা বলেন, “এই জন্যই এদের বলা হয় প্রকৃতির সন্তান।”
ফেরার পথে নৌকায় সুবর্ণ শান্ত ভাবে বসে আছে। তার চোখে জল টলমল করছে। তপন পিতাস্নেহে জিজ্ঞেস করেন,
“কি রে? কাঁদছিস কেন?”
সুবর্ণ বলে, “বাবা, শহরে মানুষ একটা গাছ কেটে কেবল তার কাঠ দেখে। এখানে মানুষ বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও তাকে সম্মান করে। আমি এতদিন যা জানতাম, আজ বুঝলাম প্রকৃতি মানে শুধু সবুজ নয়, মানুষ, বাঘ আর সহাবস্থান—এই মেলবন্ধনটাই প্রকৃতি।”
তারা বিদায় নিচ্ছিলেন। কুলদীপ হাতে একটা ছোট্ট মৌচাক দিয়ে সুবর্ণকে বলেন,
“এইটা রাখ। এটা শুধু মধু নয়, এটা আমাদের শ্রম, সাহস আর বাঘের সঙ্গে চুক্তির প্রতীক।”
সুবর্ণ সেই চকে একফোঁটা মধু নিয়ে বলে, “এই মধুর স্বাদ আমি সারাজীবন ভুলব না।”
পর্ব ৪: কিশোরী রানু আর ম্যানগ্রোভের গান
সেদিন সন্ধ্যায় গোধূলির আলোয় তপন ও সুবর্ণ ফিরছিলেন নৌকায়। চারদিকে রূপালি জলের মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছিল ঝাউগাছের ছায়া। দূরে কোথাও পাখি ডাকছিল। আর সেই সময়ই এক হালকা গলার গান কানে এলো— একটা মেয়ের কণ্ঠে, যেন নদীর ঢেউ ছুঁয়ে গেছে কানে কানে।
“এই গানের সুরটা কোথায় শিখলি?”—সুবর্ণ জিজ্ঞেস করল গাইড মুকুন্দ দাকে।
“ওটা রানুর গলা। ও থাকে গড়মারি দ্বীপে। এখন সন্ধ্যায় মাঠের কাজ সেরে গঙ্গার পাড়ে বসে গান করে।”
সেই রাতে সুবর্ণ ঘুমোতে পারল না। তার মধ্যে এক নতুন জিজ্ঞাসা জেগে উঠেছে—কে এই রানু? কীভাবে বড় হচ্ছে সে সুন্দরবনের বুকে? সে কি বাঘকে দেখে ভয় পায় না?
পরদিন সকালের নৌকা নিয়ে পৌঁছানো হল গড়মারি দ্বীপে। দ্বীপে ছোট ছোট কুঁড়েঘর, মাটির রাস্তায় ছাগল ছুটছে, আর মাঝেমধ্যে নারকেল গাছের ছায়ায় বসে আছে বয়স্ক মানুষ।
“ওই যে হাঁটছে, ওই রানু”—মুকুন্দ দা দেখালেন।
রানু, বছর ষোলর কিশোরী। মুখে একধরনের চঞ্চল জ্যোতি। হাতে মাটির হাঁড়ি, চোখে জল লেগে আছে রোদে।
তপন এগিয়ে গেলেন— “তুমি কি রানু? তোমার গান শুনেছি আমরা। খুব সুন্দর।”
রানু একটু লজ্জায় মাথা নিচু করল। তারপর বলল, “গান তো আমি শেখার সুযোগ পাইনি। মা গাইতেন। উনিই শিখিয়েছেন।”
সুবর্ণ বলল, “তুমি কি পড়াশোনা করো?”
“করতাম। কিন্তু নদীভাঙনে স্কুলটা ভেসে গেছে দুই বছর আগে। এখন শুধু মাঝে মাঝে গাইডদের সঙ্গে কাজ করি। গাইড হতে চাই। সুন্দরবনকে লোকজন যেন বুঝতে পারে, তাই শেখাতে চাই।”
রানু তাদের নিয়ে গেল তার কাঁকড়া সংগ্রহের কাজে। হাঁটু পর্যন্ত কাদা, হাতে ছোট একটা লোহার ঝাঁড়ু আর জালের মতো ফাঁদ। বনের একাংশে মেয়েরা দল বেঁধে কাজ করে। ঘাড়ে গামছা, মাথায় বালতি।
রানু বলল, “আমার মা এখানে কাঁকড়া ধরতে ধরতে হারিয়ে গেছেন। তিন বছর আগে। সবাই বলল বাঘ নিয়েছে। কিন্তু আমি জানি মা হারিয়ে যাননি, উনি বনে রয়ে গেছেন। আমি প্রতিদিন কাজ করতে যাই, হয়তো কোনোদিন দেখা হবে।”
সুবর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল। মেয়েটার চোখে এতটুকু জল নেই। শুধু জেদ।
“তুমি কি কখনো বাঘ দেখেছ?”—তপনের প্রশ্ন।
রানু হাসল।
“দুইবার। একবার ছায়া দেখেছিলাম, একবার খুব কাছ থেকে চোখ। কিন্তু ও যেমন আমায় দেখল, আমিও দেখিয়ে দিলাম আমি দুর্বল নই।”
সুবর্ণ ও তপন রানুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এলেন এক বিশাল ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে। এখানকার গাছগুলোর শেকড় ভাঙা সুরের মতো পানির বাইরে উঠে আছে।
রানু বলল, “এই গাছগুলো আমাদের রক্ষা করে। ঝড় আসে, জল উঠে যায়, কিন্তু এই গাছ ছাড়া আমরা মরতাম।”
সুবর্ণ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কিন্তু শহরে তো মানুষ গাছ কেটে বাড়ি বানায়।”
রানু মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “ওরা গাছ কাটে, আমরা গাছ রোপণ করি। মা বলতেন, সুন্দরবনের প্রতিটা গাছ একেকটা পাহারাদার।”
তপন বিস্ময় নিয়ে দেখতে লাগলেন—ছোট ছোট মেয়েরা গাছ লাগাচ্ছে, মাটি চেপে ধরে বলছে মন্ত্রের মতো, “তুই বড় হ, আমাদের রক্ষা কর।”
সন্ধ্যায় রানু তাদের নিয়ে এল গ্রামের কাছে নদীর ধারে। সূর্য ডুবে গেছে, শুধু আকাশের নিচে হালকা কমলা আলো ছড়িয়ে আছে। রানু বসে একটা পুরনো বাঁশি বাজাতে লাগল। তারপর গাইতে শুরু করল—
“জলেতে আছে রূপ, বনে আছে প্রাণ,
বাঘের চোখে আছে এক সোনালি জ্ঞান।
ভয় নয়, ভালবাসা চাই,
সুন্দরবনের ডাক শুনে হাই।”
সুবর্ণের চোখ ভিজে এল। মেয়েটা তার স্কুল হারিয়েছে, মা হারিয়েছে, তবু তার মুখে সাহসের গান।
রানু গান থামিয়ে বলল, “ভাইয়া, আমি বড় হয়ে সুন্দরবনের প্রথম মহিলা রেঞ্জার হতে চাই। যাতে আমার মতো মেয়েরা আর হারিয়ে না যায়। যাতে বাঘকে মানুষ না ভাবলেও, অন্তত শত্রু ভাবে না।”
রানুর হাত ধরে বিদায় নিল তপন ও সুবর্ণ। মেয়েটা তাদের হাতে উপহার দিল একটা ছোট গাছের চারা—ম্যানগ্রোভেরই।
“এটা নিয়ে যান, শহরে লাগান। ও আপনাদেরও রক্ষা করবে।”
সুবর্ণ বলল, “তুমি যেদিন রেঞ্জার হবে, আমি আসব আবার তোমার সঙ্গে কাজ করতে।”
রানু হেসে বলল, “তখন তোমাকেও ধমক দেব, বলব—সিডিউল মেনে চলো।”
তাদের নৌকা চলে গেল জলের বুকে। রানু হাত নাড়ল, পিছনে তার কণ্ঠ ভেসে এল—
“জল, কাদা, বাঘ আর গান,
এই সুন্দরবনেই আমার প্রাণ…”
পর্ব ৫: বাঘের চোখে মানুষ — এক পুরনো বনরক্ষীর গল্প
বোসবারি ক্যাম্পে ঘুম ভাঙল সুবর্ণ আর তপনের। চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। নিঃশব্দ সকাল, শুধু দূরে কোথাও একটি পাখি হাহাকার করছে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তপন বলল,
“সুন্দরবন এত শান্ত কেন লাগে জানো? যেন বাঘও নিঃশব্দে হাঁটে, নদীও কাঁপে না। যেন একটা গোপন রহস্য সবসময় এখানে লুকিয়ে থাকে।”
এই ক্যাম্পেই কর্মরত একজন প্রবীণ বনরক্ষীর সঙ্গে দেখা হয় তাদের—নাম দেবেন্দ্র সাঁতরা, স্থানীয়রা ডাকেন দেবা কাকু। বছর ষাটের কাছাকাছি বয়স, মুখে ধূসর দাড়ি, চোখে অভিজ্ঞতার রেখা।
তপন জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কতদিন ধরে সুন্দরবনে কাজ করছেন?”
দেবা কাকু ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন, “এই তো সাঁইত্রিশ বছর। যখন বন ঘন ছিল, ট্যুরিস্ট ছিল না, মোবাইল তো দূরের কথা, গা-ছমছমে নির্জনতাই ছিল সঙ্গী। আর তখনই প্রথম আমি বাঘের চোখের সামনে পড়ি।”
১৯৯১ সালের কথা। দেবা তখন নবীন কর্মী। জঙ্গলের গভীরে একটি বাঘের গতিবিধি নজরে রাখতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল শুধু একটি লাঠি, আর পুরনো সাইকেল।
“সেদিন আমি একা ছিলাম। আমার সঙ্গে রেডিও সেট ছিল, কিন্তু সিগন্যাল পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ শুনি পাতার খসখসানি। ভেবেছিলাম হরিণ হবে। কিন্তু না, সামনে এসে দাঁড়াল সে—একটি পূর্ণবয়স্ক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পেটের রঙে কাদার দাগ, চোখে অপার বিস্ময়।”
সুবর্ণ শিহরিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কী করলেন?”
“আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ওও দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের মধ্যে পাঁচ মিটার দূরত্ব। ওর চোখে কেমন যেন এক প্রশ্ন ছিল—‘তুই কে রে? এখানে কেন?’ আমি ধীরে ধীরে মাথা নত করলাম। আর ঠিক তখনই বাঘটা ঘুরে চলে গেল।”
তপন বললেন, “ভয় পাননি?”
দেবা কাকু মৃদু হেসে বললেন, “ভয় তো ছিলই। কিন্তু তার চেয়ে বড় অনুভূতি ছিল শ্রদ্ধা। ও যেন আমাকে বলল—‘তুই থাক, আমিও থাকি। কিন্তু সীমা মেনে চল।’”
তাদের সঙ্গে বসে গল্প করতে করতে দেবা কাকু তাদের নিয়ে গেলেন বনরক্ষীদের ছোট ক্যাম্পে। কাঠের ঘর, মশারি ঢাকা খাট, দেয়ালে হাতে আঁকা মানচিত্র—কোথায় বাঘ দেখা গেছে, কোথায় নদীভাঙন হয়েছে, কোথায় চোরাকারবারিরা ঢুকেছে।
“আমরা বন পাহারা দিই, ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা বাঘ মারি বা তাড়াই। বরং আমরা ওদের বাঁচাই।”
তিনি দেখালেন একটা পুরনো ছবি—এক বাঘিনী আর তার দুই শাবক ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে।
“এই বাঘিনীকে আমি নাম দিয়েছিলাম—‘মা-রাণী’। কারণ ও নিজের সন্তানদের জন্য একটা হেলিকপ্টার আওয়াজ শুনেই বনের ভেতর চলে গিয়েছিল, অথচ তিনদিন পর বাচ্চাদের নিয়ে আবার ফিরেছিল।”
সুবর্ণ বিস্ময়ে বললেন, “এত ভালোবাসা, অথচ মানুষ ভাবে বাঘ খুনি!”
দেবা কাকু চোখ বন্ধ করে বললেন, “বাঘ তার রাজত্বে থাকে। সে শুধু তখনই আক্রমণ করে, যখন সে বুঝতে পারে মানুষ তার সীমা ছাড়িয়েছে।”
দেবা কাকু বললেন, “সুন্দরবনে বাঘ আর মানুষ একসঙ্গে বাস করে—এই কথা বলাটা সহজ, কিন্তু বাস্তবে তার জন্য প্রচণ্ড পরিশ্রম দরকার।”
তিনি ব্যাখ্যা করলেন কীভাবে সুন্দরবনের প্রতিটি গ্রামে এখন ‘ট্র্যাপ ক্যামেরা’, ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’, আর বনবিবির পূজা দিয়ে বাঘের আগমন বোঝা যায়।
“মানুষ যদি মেনে চলে, বাঘ আক্রমণ করে না। কিন্তু লোভ, মাছ ধরা, কাঠ কাটা, চোরা শিকার—এসব যখন ঢুকে পড়ে, তখনই বিপদ হয়।”
সুবর্ণ জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে সমাধান কী?”
দেবা কাকু বললেন, “মানুষকে বাঘের মতো ধৈর্য ধরতে শিখতে হবে। শেখাতে হবে যে শুধু বাঁচা নয়, অন্যকে বাঁচিয়ে বাঁচাটাই আসল।”
তিনি একটি কাহিনি শোনালেন—২০১৪ সালে এক চোরাশিকারি রাতে ঢুকেছিল সুন্দরবনে। বাঘ তাকে হত্যা করে। কিন্তু সেটাই খবর হয়নি, খবর হয়েছিল বাঘ একজন ‘মানুষ খেয়ে ফেলেছে’।
“তখন মিডিয়া এসেছে, ক্যামেরা এসেছে। কেউ বলেনি লোকটা বন্দুক নিয়ে ঢুকেছিল, কেউ বলেনি সে চোরা শিকারি। শুধু বলেছে—‘বাঘ খুনি’। অথচ ওটা ছিল আত্মরক্ষা।”
এই প্রসঙ্গে তপন বললেন, “আমরা শহরের মানুষ আসলে জানিই না—বাঘও ভয় পায়, বাঘও ভুল করে না।”
দেবা কাকু বললেন, “ঠিক তাই। বাঘ তার রুটিন মেনে চলে। মানুষই হঠাৎ লোভে পড়ে বাঘের রাস্তায় পড়ে যায়।”
দেবা কাকু জানালেন, এই বছরই তার অবসর। কিন্তু একটা স্বপ্ন তিনি রেখে যেতে চান— “আমি চাই একটি মিউজিয়াম হোক সুন্দরবনে, যেখানে থাকবে শুধু বাঘ আর মানুষের সম্পর্ক নিয়ে জিনিসপত্র। থাকবে গল্প, ছবি, স্মৃতি। আমি চাই, আমার নাতি-নাতনিরা বুঝুক—বাঘ খারাপ নয়, বন দুর্বল নয়, শুধু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।”
সুবর্ণ তাঁকে কথা দিল, “এই কথাগুলো আমরা পৌঁছে দেব শহরের লোকের কাছে। বই লিখে, ছবি তুলে, গল্প বলে।”
তপন কাঁধে হাত রেখে বললেন, “আপনার গল্পটাই আসল গল্প। আপনি তো শুধু বনরক্ষী নন, আপনি সুন্দরবনের ভাষ্যকার।”
সন্ধ্যায় যখন নৌকা নিয়ে তাঁরা ফিরে চলেছেন, দূরে এক বাঘের পায়ের ছাপ দেখা গেল কাদায়। নতুন নয়, তবে স্পষ্ট।
দেবা কাকু জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “ও আছে। এই তো কোথাও কাছেই। ও দেখে গেছে, আমরা এসেছি। হয়তো ভাবছে—এই মানুষগুলো ঠিক আছে কিনা।”
সুবর্ণের বুকের ভেতর একটা গভীর নিঃশ্বাস উঠে এল। সে বুঝে গেল—সুন্দরবন শুধু বন নয়, এটি একটি পরীক্ষাগার, যেখানে প্রতিনিয়ত চলছে মানুষের ধৈর্য, সহানুভূতি, ও সহাবস্থানের পরীক্ষা।
পর্ব ৬: সমাপ্তি – সহাবস্থানের পাঠ
সুন্দরবনের ভ্রমণ শেষ করে যখন সুবর্ণ আর তপন ফিরে এলেন কলকাতায়, শহরের কোলাহল যেন আরও বেশি কানে বাজতে লাগল। মেট্রোর গর্জন, হর্নের আওয়াজ, ব্যস্ত মানুষের মুখ দেখে তপন বলল, “সুন্দরবনের নিঃশব্দতা এখন বড্ড বেশি টানছে।”
সুবর্ণ জানলার ধারে বসে বলল, “তুই বুঝিস তপন, আগে জানতাম না—নীরবতাও একটা ভাষা। বাঘ তার চোখ দিয়ে কথা বলে, বন তার শব্দ দিয়ে।”
দুজনেই জানত, এই অভিজ্ঞতা শুধু ভ্রমণ ছিল না। এটি ছিল এক শিক্ষণ, যেখানে প্রকৃতি মানুষকে শিখিয়েছে নিজেদের সীমারেখা চিনতে।
ফেরার পরেই সুবর্ণ নিজের ক্যামেরার সমস্ত ছবি, রেকর্ড করা কথোপকথন আর নোট নিয়ে বসে গেল। সে ঠিক করল—একটা ডকুমেন্টারি বানাবে। নাম রাখবে “বাঘের চোখে মানুষ”। অন্যদিকে তপন নিজের পরিচিত লেখক-সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলল। তারা ঠিক করল, দেবা কাকুর বলা প্রতিটি গল্প লেখার আকারে ছাপা হবে বাংলা ও ইংরেজি—একটি বই হিসেবে। আরো বড় ভাবনা ছিল—দেবা কাকুর স্বপ্ন। সুন্দরবনে একটি ছোট মিউজিয়াম গড়ে তোলার ভাবনা।
সুবর্ণ তৎক্ষণাৎ একটা ফান্ডরেইজিং পেজ খুলল: “দেখুন, সুন্দরবনের এক বনরক্ষীর স্বপ্ন আমরা কীভাবে পূরণ করতে পারি।”
মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কলকাতার বহু মানুষ, এমনকি দেশের বাইরের কিছু সংস্থা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন সাহায্য করতে।
এই সময়ে তপন একদিন হঠাৎ রাত তিনটেয় সুবর্ণকে ফোন করল।
“ঘুমোচ্ছিস?”
“না, বাঘ নিয়ে ঘুম আসে নাকি?”
তপনের গলা থমথমে, কিন্তু গা ছমছমে নয়—একধরনের ভাবনাচিন্তার ভার।
সে বলল, “ভেবেছিস? আমরা মানুষ, যারা বারবার মনে করি আমরা বাঘের থেকেও শ্রেষ্ঠ। কিন্তু ওরা কখনো শহর দখল করতে আসে না। আমরা বরং ওদের রাজত্বে হানা দিই।”
সুবর্ণ বলল, “ওদের রাজত্বে গিয়ে ছবি তুলি, ভিডিও করি, ফেসবুকে পোস্ট দিই, আর ভাবি আমরা প্রকৃতিকে জানলাম! অথচ প্রকৃতিকে জানতে হলে তো আগে নিরবতা জানতে হয়, নত হতে জানতে হয়।”
তাদের রাত কাটে কথা বলতে বলতে—নিসর্গ, নিঃশব্দতা, ন্যায্যতা আর নৈতিকতার কথা।
তিন মাস পর এক অনুষ্ঠানে গেল সুবর্ণ ও তপন—সুন্দরবনের কুলতলি রেঞ্জ অফিসে দেবা কাকুর অবসর গ্রহণ অনুষ্ঠান।খোলা চত্ত্বরে গ্রামবাসীদের সামনে বসে আছেন দেবা কাকু, চোখে অল্প অশ্রু, কিন্তু মুখে প্রশান্তি। অফিসাররা ফুল, সনদ আর উপহার দিলেও সবচেয়ে বড় উপহার এল সুবর্ণের হাত থেকে—একটি অবচাপমুক্ত ছবি। ছবিতে দেবা কাকু দাঁড়িয়ে আছেন—পেছনে বনের গাঢ় সবুজ, সামনে কাদায় এক জোড়া বাঘের পায়ের ছাপ।
সঙ্গে সঙ্গে তপন ঘোষণা করল—“এই ছবিটা হবে আমাদের মিউজিয়ামের প্রথম দেওয়ালে টাঙানো স্মৃতি।”
দেবা কাকুর চোখ ঝাপসা হয়ে এল। তিনি বললেন, “আমি চলে যাচ্ছি, ঠিকই, কিন্তু জানি—আমার কথা, আমার বাঘের গল্প, আমার বন—এগুলো থাকবে। তোমাদের মধ্যে দিয়ে।”
ছয় মাস পরে কলকাতার এক ছোট গ্যালারিতে প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলো—“বাঘের চোখে মানুষ”। ডকুমেন্টারিতে দেবা কাকুর কণ্ঠে বাঘের মুখোমুখি হওয়ার সেই দৃশ্য, পুরনো ক্যাম্পের চিত্র, শাবকদের ছবি, বনবিবির পূজা—সব উঠে এসেছে নিপুণভাবে। দর্শনার্থীরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
একজন বললেন, “বাঘকে এবার বুঝলাম। শুধু ভয় নয়, শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি হল।”
একজন শিক্ষক নিজে এসে তপনকে বললেন, “আমাদের স্কুলে এই ভিডিও দেখাবো। ছাত্রদের বোঝাতে হবে প্রকৃতি নিয়ে গল্প কেবল টেক্সটবুকে আটকে থাকে না, মানুষের বুকে জায়গা করে নেয়।”
এক বছর কেটে গেছে। একদিন সকালে খবর এল—দেবা কাকু হৃদরোগে প্রয়াত হয়েছেন। সুবর্ণ আর তপন দুজনে কুলতলি গিয়ে কাঁদলেন বনরক্ষীদের সঙ্গে। তারা একটি ছোট ফলক বানালেন:
“দেবেন্দ্র সাঁতরা স্মৃতি কেন্দ্র”—সুন্দরবনের এক সন্তান, যিনি বাঘের চোখে মানুষের ছবি দেখেছিলেন।”
ফলকের নিচে লেখা হলো দেবা কাকুর শেষ কথা: “বাঘ খারাপ নয়, বন দুর্বল নয়, শুধু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।”
তিন বছর পর—তপন এখন একটি এনজিও চালান সুন্দরবনে, যেখানে বনরক্ষীদের সন্তানদের শিক্ষা দেওয়া হয়। সুবর্ণ এখন একজন ন্যাচারালিস্ট-চিত্রগ্রাহক, যিনি নিয়মিত সুন্দরবন নিয়ে ছবি তোলেন। তারা দুজনে একসাথে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত দ্বীপে গিয়েছেন আবার—এইবার ভ্রমণকারীর মতো নয়, বরং পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে। একদিন কাদামাটির ওপর আবার একটি নতুন পায়ের ছাপ দেখে সুবর্ণ দাঁড়িয়ে পড়ল।
তপন হাসল, “ও আছে রে। তুই যেমন বলতিস—এই পৃথিবীর নিরব প্রতিরক্ষী।”
সুবর্ণ মৃদু গলায় বলল, “হয়তো ওর চোখেই আজ আমরা মানুষ বলে গণ্য হতে পেরেছি।”
বাঘ আর মানুষের সম্পর্ক কখনো সহজ নয়। কিন্তু দেবা কাকুর মতো মানুষরা প্রমাণ করে যান—ভয় নয়, সহাবস্থানই প্রকৃতির সত্য। বনকে ভালোবেসে, বাঘকে সম্মান দিয়ে, মানুষ তার নিজস্বতা খুঁজে পেতে পারে। আর এই গল্প, শুধু একটি বনরক্ষীর অভিজ্ঞতা নয়—এটি আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি আয়না, যেখানে প্রকৃতি আমাদের প্রশ্ন করে—
“তুই কে রে, এখানে কেন?”
সমাপ্ত




