সায়ন্তন ঘোষ
সন্ধ্যার আলো তখন পাহাড়ের ঢালে মিশে যাচ্ছে। সিলেট শহর ছেড়ে চন্দ্রনাথের পথে এগোতে এগোতে রুদ্র অনুভব করছিল এক অদ্ভুত গা ছমছমে শূন্যতা। পাহাড়ের রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে, শুধু কোথাও কোথাও ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে—গ্রামের বাড়িগুলোতে পূর্ণিমার পূজা চলছে। ট্যাক্সির ভেতরে বসে অনন্যা জানলার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে বাইরের অন্ধকার দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, পাহাড় যেন অদৃশ্য চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।
—“এই জায়গাটার মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক আছে, তাই না?” হঠাৎ ফিসফিস করে বলল তিথি।
অভিষেক হেসে উত্তর দিল, —“তুমি আবার ভূতের গল্প শুরু করছো নাকি? আমরা এসেছি বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে। কালো জলের খনিজ উপাদান বের করলে হয়তো একটা বড় জার্নালে পেপার পাব।”
রুদ্র গম্ভীর গলায় বলল, —“লোককথাকে হেলাফেলা করো না। গ্রামের মানুষ এতদিন ধরে যদি এই জল নিয়ে ভয় পেয়ে থাকে, তার পেছনে কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে।”
ট্যাক্সি পাহাড়ের পাদদেশে থামল। চারদিকে নিস্তব্ধতা। শুধু জোনাকির আলোয় অদ্ভুত এক আবহ তৈরি হয়েছে। দূরে, ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ঝর্নার শব্দ ভেসে আসছে। সেটাই তাদের গন্তব্য।
এক বৃদ্ধ গাইড দাঁড়িয়ে ছিল অপেক্ষা করে। তাঁর চোখে কেমন অদ্ভুত শূন্যতা। তিনি শুধু বললেন, —“রাত বেশি হলে ওদিকে যাবেন না বাবু। পূর্ণিমার সময় কালো জল জেগে ওঠে।”
অনন্যা কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, —“জল জেগে ওঠে মানে?”
বৃদ্ধ কিছু না বলে কেবল আঙুল তুলে দেখালেন আকাশের দিকে। বিশাল পূর্ণিমার চাঁদ তখন জঙ্গলমাথায় উঠছে।
চারজনের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। তারা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, বাঁশঝাড়ের শব্দ, আর দূরের জলের গর্জন—সব মিলিয়ে পরিবেশ ক্রমশ ঘন অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল।
প্রায় আধঘণ্টা হাঁটার পর হঠাৎই তারা পৌঁছে গেল এক ফাঁকা জায়গায়। সামনে ঝর্না বয়ে আসছে, আর তার পাদদেশে ছোট এক পুকুরের মতো জলাশয়। প্রথমে সেটা সাধারণ জলের মতোই লাগছিল, কিন্তু অনন্যা এগিয়ে গিয়ে টর্চ ফেলতেই দেখা গেল—জলটা অস্বাভাবিকভাবে গাঢ় কালো। যেন গভীর শূন্যতার রঙ।
তিথি হঠাৎ কেঁপে উঠল, —“আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাদের দেখছে।”
অভিষেক হেসে উত্তর দিল, —“এ জঙ্গলে হরিণ, শেয়াল থাকে। তোমার ভূতের ভয় কাটাতে হবে।”
কিন্তু রুদ্র টের পেল ভেতরে ভেতরে তারও কেমন কাঁপুনি ধরছে। ঝর্নার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, জল যেন নিঃশব্দে ডেকে যাচ্ছে তাকে।
রাত বাড়তে লাগল। চাঁদের আলো পড়তেই দেখা গেল—জল ক্রমশ লালচে ছায়া নিচ্ছে। বাতাস ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎ কোথা থেকে এক ঝোড়ো হাওয়া এসে চারদিকে ছড়িয়ে দিল ধূপের মতো গন্ধ।
অনন্যা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফিসফিস করল, —“এই গন্ধটা কোথা থেকে আসছে? এখানে তো কেউ ধূপ জ্বালায়নি।”
রুদ্র নিঃশব্দে বলল, —“এটাই সেই কালো জলের নিশ্বাস।”
ঝর্নার শব্দ তখন কানে ভেসে আসছিল না, বরং মনে হচ্ছিল অজানা কারও কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে ডাকছে—
“এসো… এসো…”
চারজন একে অপরের দিকে তাকাল। ভয় আর কৌতূহলের মধ্যে তারা দাঁড়িয়ে রইল সেই অন্ধকার জলের সামনে।
রাত নেমে এসেছে ঘন অন্ধকারে। পাহাড়ের মাথায় বিশাল পূর্ণিমার চাঁদ ঝুলে আছে, আর সেই আলো পড়ে সরাসরি ঝর্নার কালো জলে। চারজন গবেষক তখনও দাঁড়িয়ে, অদ্ভুত টান অনুভব করছে। জলের গাঢ় রং যেন প্রতিফলন নয়, বরং এক জীবন্ত অন্ধকার, যা ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে।
রুদ্র ব্যাগ খুলে পরীক্ষার কিট বের করল। কাচের ছোট বোতল নামিয়ে জলের নমুনা নিতে গিয়ে তার হাত কেঁপে উঠল। জলের ভেতর থেকে যেন হিমশীতল কোনো হাত টেনে ধরছে তাকে। বোতল ভরার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশের শব্দ বদলে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক থেমে গেল হঠাৎ। দূরের জঙ্গলে পাখিরা একসঙ্গে ডানা ঝাপটিয়ে উঠল।
তিথি গলা শুকিয়ে ফিসফিস করল, —“তোমরা শুনলে? এই নিস্তব্ধতা অস্বাভাবিক।”
অভিষেক ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, —“এ শুধু প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া। নতুন পরিবেশে অচেনা শব্দে আমাদের মনে ভুল ধারণা তৈরি হয়।”
কিন্তু অনন্যা ইতিমধ্যেই ভয় পেয়ে গেছে। সে বলল, —“না, এটা স্বাভাবিক নয়। বাতাস ভারী হয়ে আসছে, যেন কেউ শ্বাস নিচ্ছে।”
ঠিক তখনই, জলের ওপর ছোট ছোট বুদবুদ উঠতে শুরু করল। যেন নিচ থেকে কেউ ধীরে ধীরে উঠে আসছে। রুদ্র হঠাৎ টর্চ ফেলে দিল। আলো গিয়ে পড়ল জলের গায়ে—একটা মুহূর্তের জন্য চারজন একসঙ্গে দেখল, অদ্ভুত এক ছায়া জলের ভেতর নড়ছে।
তারা সবাই আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। তিথি প্রায় চিৎকার করল, —“কেউ আছে!”
অভিষেক গলা শক্ত করে বলল, —“এটা আলো-ছায়ার খেলা। ভূত-টুত কিছু নেই।” কিন্তু তার নিজের হাতও কাঁপছিল।
রুদ্র কিট গুছিয়ে ব্যাগে রাখল দ্রুত। সে বলল, —“চলো, এখান থেকে বেরোই। রাত বাড়ছে।”
কিন্তু তখনই হঠাৎ বাতাসে ভেসে এল এক গলা। খুবই ক্ষীণ, তবু পরিষ্কার—
“অগ্নিসূত্র… অগ্নিসূত্র…”
চারজনের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। তারা একে অপরের দিকে তাকাল। কারও গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। হঠাৎ ঝর্নার জলে লাল আলো ঝলসে উঠল, যেন চাঁদের প্রতিফলন রক্তে ভিজে গেছে।
অনন্যা কাঁপতে কাঁপতে বলল, —“আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাদের নাম ধরে ডাকছে…”
তিথি ফিসফিস করল, —“আমারও তাই লাগছে।”
তারা দ্রুত জঙ্গলের দিকে ছুটল। অন্ধকারে বাঁশঝাড়ের ডাল ভেঙে পড়ছিল শরীরে। শ্বাসকষ্টে গলা শুকিয়ে আসছিল। কিন্তু সেই ফিসফিসানি যেন পিছন থেকে ধাওয়া করছিল—
“এসো… এসো…”
অবশেষে পাহাড়ের পাদদেশে গাইডের কুঁড়েঘরে পৌঁছল তারা। বৃদ্ধ তখন প্রদীপ জ্বেলে বসে আছেন। চারজনের অবস্থা দেখে তিনি মাথা নাড়লেন।
—“বলেছিলাম, পূর্ণিমার রাতে ওদিকে যেয়ো না।”
রুদ্র হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, —“আপনি জানেন ওখানে কী আছে?”
বৃদ্ধ কণ্ঠ নামিয়ে বললেন, —“ওটা কোনো সাধারণ জল নয়। বহু বছর আগে এক তান্ত্রিক এখানে যজ্ঞ করেছিল। অসমাপ্ত সাধনা রয়ে গেছে এই জলে। পূর্ণিমার রাতে সে জেগে ওঠে, আর যে তার দিকে তাকায় তাকে ডাকতে থাকে।”
তিথি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেল। অনন্যার চোখে অশ্রু জমে উঠল। অভিষেক এবারও যুক্তি খুঁজতে চাইলো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারও বুক কেঁপে উঠছিল।
রাতের নীরবতায় কুঁড়েঘরের ভেতর চারজন বসে রইল নিঃশব্দে। দূরে ঝর্নার শব্দ আবার শোনা যাচ্ছিল—কিন্তু এবার তা জলের শব্দ নয়, যেন অসংখ্য মানুষের একসঙ্গে মন্ত্রপাঠের আওয়াজ।
রাতটা প্রায় কেউ ঘুমোতে পারেনি। ঝড়ো হাওয়া আর দূরের ঝর্নার গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বারবার মনে হচ্ছিল, কুঁড়েঘরের দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অনন্যা কয়েকবার উঠে জানলার ফাঁক দিয়ে তাকিয়েছিল, কিন্তু অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যায়নি। তবুও ভেতরে ভেতরে সে নিশ্চিত ছিল—কেউ তাদের লক্ষ করছে।
ভোরের আলো ফুটতেই চারজন পাহাড়ি গ্রামের দিকে নেমে গেল। দিনের আলোয় সবকিছু যেন স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরের ভয় মুছে গেল না। রুদ্র ব্যাগ থেকে কালো জলের নমুনা বের করে পরীক্ষা শুরু করল। বিস্ময়ের সঙ্গে দেখল, কাচের বোতলের ভেতরে জল সারা রাত অন্ধকারেই থেকেও রঙ বদলে গেছে। স্বচ্ছ নয়, গাঢ় কালচে-লাল। যেন বোতলের ভেতর জমাট বাঁধা রক্ত।
অভিষেক ঠোঁট চেপে বলল, —“এটা কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন। পাহাড়ি খনিজের কারণে এমনটা হতে পারে।”
তিথি জবাব দিল, —“তুমি যা খুশি বলো, আমি জানি ওই জলে কিছু আছে। আমি রাতে শুনেছি কেউ আমাকে নাম ধরে ডাকছিল।”
রুদ্র মাথা নিচু করে রইল। সে জানত, শুধু তিথি নয়, ও নিজেও সেই ডাক শুনেছে। কিন্তু মুখে কিছু বলল না।
দিন যত এগোতে লাগল, অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকল। দুপুরে অনন্যা একা ঘরে বসে নোট লিখছিল। হঠাৎ জানলার কাঁচে ভেতর থেকে কুয়াশার মতো ছায়া জমল। সে ভয় পেয়ে তাকিয়ে দেখল—ওই কুয়াশায় নিজের নাম লেখা হয়ে যাচ্ছে: “অনন্যা…”।
চিৎকার করে সে বেরিয়ে এল। রুদ্র আর তিথি দৌড়ে এল। কাঁচে তখন কিছুই নেই, শুধু তার নিজের ভয়ংকর আতঙ্কে ভেজা মুখ।
অভিষেক হাসার চেষ্টা করল, —“হ্যালুসিনেশন! চাপের কারণে এসব হয়।”
কিন্তু রাত নামতেই তার ওপরেও প্রভাব পড়ল। ঘুমের মধ্যে সে চমকে উঠল—দেখল নিজের শরীর কুঁড়েঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, আর কালো জলের দিকে হাঁটছে। সে চেষ্টা করল চিৎকার করতে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। চোখ মেলতেই দেখল সে ঘরের ভেতরেই শুয়ে আছে, কিন্তু বুকের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসছে।
ভোরবেলায় রুদ্র লক্ষ্য করল, অভিষেকের গলায় হালকা লালচে দাগ। যেন কারও আঙুল চেপে ধরেছিল।
তিথি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল। তার ঘুম আসছিল না। চোখ বুজলেই দেখত—অগ্নিকুণ্ড, তার চারপাশে কালো কাপড় পরা অসংখ্য মানুষ মন্ত্র পড়ছে। মন্ত্রের শব্দ একটাই—“অগ্নিসূত্র… অগ্নিসূত্র…”।
সে কাঁপতে কাঁপতে রুদ্রকে বলল, —“আমরা এখানে কেন এসেছি জানো? কারণ আমরা প্রত্যেকেই তার খেলার অংশ। আমাদের ভেতরের অন্ধকারকে সে জাগিয়ে তুলছে।”
রুদ্র চুপ করে গেল। তার নিজেরও মনে হচ্ছিল সত্যিই তাই। বহুদিনের চেপে রাখা স্মৃতিগুলো যেন মাথা তুলে আসছে। ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যু, বাবার নীরব নির্যাতন—সবকিছু একে একে ফিরে আসছিল।
সন্ধ্যা নামল আবার। পূর্ণিমার দ্বিতীয় রাত। ঝর্নার দিক থেকে অদ্ভুত আলো ভেসে আসছিল। মনে হচ্ছিল কেউ আগুন জ্বালিয়েছে।
গাইড বৃদ্ধ এসে সতর্ক করে দিলেন, —“এখন আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তোমাদের ছেড়ে দেবে না সে।”
রুদ্র কেঁপে উঠে বলল, —“সে? কে?”
বৃদ্ধের চোখে শূন্যতা ভরে গেল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, —“যে তান্ত্রিকের সাধনা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তোমরাই তার যজ্ঞের অঙ্গ।”
চারজন নীরব হয়ে গেল। দূরের ঝর্না থেকে তখন ভেসে আসছিল একসঙ্গে অসংখ্য গলার মন্ত্রপাঠ। আর বাতাসে মিশে ছিল ধূপ আর রক্তের গন্ধ।
গ্রামের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। দূরের পাহাড়ি ঝর্না থেকে কালো জলের গর্জন যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে, যেন সেটি শুধু জলের নয়—এক বিশাল অদৃশ্য প্রাণীর শ্বাস। পূর্ণিমার দ্বিতীয় রাত গভীর হতে থাকল, আর তার সঙ্গে চারজনের ভেতর ভয়ঙ্কর পরিবর্তন শুরু হল।
অনন্যা প্রথমেই ভেঙে পড়ল। সন্ধ্যা থেকেই সে অস্থির হয়ে উঠেছিল। কুঁড়েঘরের এক কোণে বসে নিজের খাতা খুলে লিখতে শুরু করল। কিন্তু রুদ্র কাছে গিয়ে খাতা দেখতে গিয়ে শিউরে উঠল—অনন্যা তার অজান্তেই একটার পর একটা আঁকিবুকি করছে, যেগুলো সবই আগুনের বৃত্ত আর অদ্ভুত মন্ত্রচিহ্ন। তার চোখ ফাঁকা, ঠোঁটে ফিসফিস করছে—
“অগ্নিসূত্র… অগ্নিসূত্র…”
তিথি তাকে টেনে সরাতে চাইলে অনন্যা চেঁচিয়ে উঠল, —“ছুঁয়ো না! ওরা আমাকে লিখতে বলছে!” তার চোখ তখন রক্তাভ, যেন ভিতর থেকে অন্য কেউ তাকিয়ে আছে।
অভিষেক যুক্তি খুঁজে পেতে চাইছিল, কিন্তু সেও ভিতরে ভিতরে ভেঙে যাচ্ছিল। দুপুরে সে গোপনে কালো জলভর্তি বোতল নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়েছিল। এবার দেখল, বোতলের ভেতর কেবল তরল নয়—তার নিজের মুখও ভেসে উঠছে সেখানে। আর সেই মুখ তাকে ঠোঁট নেড়ে বলছে, —“এসো…”
রুদ্র চেষ্টা করছিল সবাইকে একসাথে ধরে রাখতে। কিন্তু তার নিজেরও মন ভেঙে যাচ্ছিল। প্রত্যেকবার সে চোখ বন্ধ করলে মায়ের মৃতদেহের ছবি ভেসে উঠছিল, আর বাবার শীতল মুখ ভেসে আসছিল। যেন কালো জল তার অন্তরের সমস্ত চাপা স্মৃতি বের করে আনছে।
রাত গভীর হলে তারা একসাথে গাইড বৃদ্ধের কাছে গেল। বৃদ্ধ প্রদীপ জ্বেলে বসেছিলেন। তাদের অবস্থা দেখে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“বলেছিলাম না বাবুরা, এখানে এসো না? কালো জল কারও বন্ধু নয়। যে একবার তার দিকে তাকায়, সে আর তার নিজের থাকে না।”
রুদ্র কাঁপা গলায় বলল, —“এ থেকে মুক্তি নেই?”
বৃদ্ধের চোখে শূন্যতা জমল। তিনি ধীরে বললেন, —“মুক্তি আছে শুধু বলিদানে। এই সাধনার পিপাসা থামে না, কাউকে নিতে হয়।”
এই কথায় চারজনের বুক কেঁপে উঠল। মনে হচ্ছিল বাতাস আরও ভারী হয়ে গেছে। হঠাৎ ঝর্নার দিক থেকে একসাথে হাজার মানুষের মতো গলার আওয়াজ উঠল। তারা চারজনই থমকে দাঁড়াল।
তিথি হঠাৎ পাগলের মতো দৌড়ে বেরিয়ে গেল। রুদ্র আর অভিষেক পেছন পেছন ছুটল। কিন্তু দেখা গেল সে সরাসরি ঝর্নার দিকে চলে যাচ্ছে, যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে টেনে নিচ্ছে।
—“তিথি! থামো!” রুদ্র চিৎকার করল।
কিন্তু তিথির চোখ তখন ফাঁকা, ঠোঁটে শুধু একটাই শব্দ, —“অগ্নিসূত্র…”
ঝর্নার কাছে পৌঁছে সে প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে গেল। জলের ওপর পূর্ণিমার আলো পড়ে আগুনের মতো ঝলসে উঠছিল। সেই আলোতে হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠল—জলের গভীরে এক অদ্ভুত ছায়া, মানুষের নয়, তবুও মানুষের মতো গড়ন।
রুদ্র তাকে টেনে সরাতে গিয়ে টের পেল, জলের ভেতর থেকে ঠান্ডা আঙুল বেরিয়ে এসেছে। অভিষেক ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’জনকে টেনে সরাল। তিথি তখনও ফিসফিস করে যাচ্ছিল।
চারজন কুঁড়েঘরে ফিরে এল, কিন্তু বোঝা গেল—এখন আর ফেরার পথ নেই। অনন্যা হঠাৎ গলা চেপে বলল, —“ও আমাদের প্রত্যেককে আলাদা করে ডাকছে। একজনকে না দিলে বাকি সবাইকে নিয়ে যাবে।”
গাইড বৃদ্ধ নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন। তার চোখে আতঙ্কের ছায়া।
—“তান্ত্রিকের যজ্ঞ অসম্পূর্ণ। তোমাদের মধ্যে একজনকে সে চাইবেই। আর তোমরা যেভাবেই হোক, সেই আগুন থেকে পালাতে পারবে না।”
রুদ্র তখন বুঝল, রাত যত এগোবে, কালো জলের ডাক ততই বাড়বে। আর এই ডাক এড়ানো মানে মৃত্যু।
কুঁড়েঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে ছিল। প্রদীপের আলোয় চারজনের মুখে শুধু আতঙ্কের ছায়া। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছিল না—মনে হচ্ছিল প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে ভেতরকার ভয় আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
রুদ্র ধীরে ধীরে বলল, —“আমাদের শান্ত থাকতে হবে। ওর শক্তি আমাদের ভয় থেকেই আসে।”
অনন্যা হঠাৎ তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল, চোখ রক্তাভ। —“তুমি কিছু জানো, রুদ্র। প্রথম দিন থেকেই তোমার চোখে অদ্ভুত টান ছিল। তুমি হয়তো আমাদের এখানে নিয়ে এসেছ।”
অভিষেক গর্জে উঠল, —“অর্থহীন কথা বলছো! সবই কাকতালীয়।” কিন্তু তার নিজের বুকও কাঁপছিল। তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল কালো জলভর্তি বোতলের দিকে, যেটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল। বোতলের ভেতর ছায়ার মতো কিছু নড়ছিল।
তিথি এক কোণে বসে ফিসফিস করছিল নিজের সঙ্গে, —“আমাদের একজনকে দিতেই হবে… নইলে সবাই মরব…” তার গলা এতটাই শীতল যে বাকিরা কেঁপে উঠল।
রুদ্র দাঁড়িয়ে গিয়ে তাকে ধরল, —“তুমি কী বলতে চাইছ?”
তিথি নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল, চোখে অদ্ভুত শূন্যতা। —“যজ্ঞ পূর্ণ না হলে সে ছাড়বে না। আমি স্বপ্নে দেখেছি। আগুনের বৃত্ত, আমাদের চারজন ভেতরে দাঁড়ানো। আর কেবল একজনকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।”
এই কথায় অনন্যা হঠাৎ তীব্রভাবে চিৎকার করে উঠল। —“আমাকে নয়! আমি বাঁচতে চাই!”
তার চোখে ভয় আর ক্রোধ একসঙ্গে ভরে গিয়েছিল।
অভিষেক তখন যুক্তির আশ্রয় নিতে চাইল। —“দেখো, আমরা যদি গ্রামের লোকজনকে বলি, হয়তো সাহায্য পাব। তারা তো জানে এ জলের ইতিহাস।”
কিন্তু বৃদ্ধ গাইড মাথা নেড়ে বললেন, —“গ্রামবাসীরা এই সময় পাহাড়ে আসে না। তারা জানে পূর্ণিমার রাত মানে মৃত্যু। তোমাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
চারজন তখন একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। মনে হচ্ছিল অদৃশ্য কোনো শক্তি তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনন্যা অভিষেকের দিকে তাকিয়ে বলল, —“তুমি তো বোতলটা নিয়েছিলে! তুমি হয়তো ওকে জাগিয়ে তুলেছ।”
অভিষেক রেগে গিয়ে উত্তর দিল, —“তুমি-ই তো মন্ত্র লিখছ খাতায়! তোমার হাত দিয়ে হয়তো সেই তান্ত্রিক লিখছে!”
বাক্যযুদ্ধের মাঝেই হঠাৎ প্রদীপ নিভে গেল। কুঁড়েঘর অন্ধকারে ডুবে গেল। বাইরে থেকে ভেসে এল ঝর্নার গর্জন, কিন্তু তার ভেতরে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল মানুষের গলা—অসংখ্য গলা একসাথে উচ্চারণ করছে,
“অগ্নিসূত্র… অগ্নিসূত্র…”
চারজন থমকে দাঁড়াল। অন্ধকারে হঠাৎ টেবিলের ওপরের বোতলটা ফেটে গেল। ছিটকে পড়া কালো জল মাটিতে ছায়ার মতো ছড়িয়ে পড়ল, আর সেই ছায়ার ভেতর দিয়ে এক হাত বেরিয়ে এল—হিমশীতল, হাড়ের মতো সাদা।
তিথি হঠাৎ যেন সম্মোহিত হয়ে এগিয়ে গেল। রুদ্র ঝাঁপিয়ে তাকে ধরে ফেলল। কিন্তু সেই সঙ্গে সে অনুভব করল, অদৃশ্য ঠান্ডা আঙুল তার হাত চেপে ধরেছে। তার মাথায় গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল—
“একজন… একজন চাই…”
অনন্যা চিৎকার করে উঠল, অভিষেক প্রায় অচেতন হয়ে পড়ল। গাইড বৃদ্ধ প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে বললেন, —“আজ রাত শেষ হলেই পূর্ণিমা সরে যাবে। কিন্তু ততক্ষণে যদি বলিদান না হয়, চারজনকেই নেবে।”
বাতাসে ধূপ আর রক্তের গন্ধ ভরে উঠল। চারজন বুঝল, এখন আর ভয় বা যুক্তির জায়গা নেই—এটা বাঁচা-মরার লড়াই।
কুঁড়েঘরের ভেতর বাতাস যেন জমাট বেঁধে উঠেছিল। মাটিতে ছড়িয়ে থাকা কালো জলের দাগ এখনও নড়ছিল, যেন জীবন্ত। প্রদীপের আলোয় সেটা মাঝে মাঝে লালচে আভা নিচ্ছিল, আর প্রতিবারই চারজনের বুক কেঁপে উঠছিল।
রুদ্র তিথিকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল। তিথির ঠোঁট কাঁপছিল, সে ফিসফিস করছিল, —“আমাদের একজনকে নিতে হবে… ও ছাড়া অন্য পথ নেই।”
অনন্যা তখন দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে, কপালে ঘাম জমে উঠেছে। তার চোখে পাগলামির ছাপ—সে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, —“কেন আমিই হবো বলিদান? কেন আমি? তোমরা সবাই আমাকে দোষারোপ করছো!”
অভিষেক দাঁতে দাঁত চেপে বলল, —“কারণ তোমার হাত দিয়ে মন্ত্র লেখা হয়েছে। তুমি-ই ওর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত।”
অনন্যা রাগে কেঁপে উঠল, —“মিথ্যে! আমি চাইনি এগুলো লিখতে! আমার হাত যেন কারও দ্বারা চালিত হচ্ছিল।”
রুদ্র গম্ভীর গলায় বলল, —“শান্ত হও। ও চাইছে আমাদের ভেতরে বিভেদ হোক। এভাবেই ও দুর্বল করে তুলবে।”
কিন্তু তার নিজের কণ্ঠস্বরও কাঁপছিল। ভিতরে ভিতরে সে জানত, তান্ত্রিকের শক্তি এখন তাদের রক্তে ঢুকে পড়ছে।
হঠাৎ বাইরে ঝর্নার দিক থেকে ভয়ঙ্কর আওয়াজ উঠল। মনে হচ্ছিল হাজার মানুষের একসঙ্গে হাহাকার। সেই সঙ্গে মাটিতে ছড়ানো কালো জলে স্পষ্টভাবে এক মুখ ভেসে উঠল। দাড়িওয়ালা, চোখজোড়া আগুনের মতো লাল, ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি। সে ধীরে ধীরে বলল—
“একজন… শুধু একজন… অগ্নিসূত্র পূর্ণ হবে।”
অনন্যা ভয় পেয়ে কোণে গিয়ে বসে পড়ল। অভিষেক দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, —“তাহলে একজনকে দিতে হবে। নয়তো আমরা সবাই মরব।”
তিথি মাথা নাড়ল নিঃশব্দে, তার চোখে সম্মোহনের ছাপ।
রুদ্র দাঁড়িয়ে উঠল। —“না। আমরা কাউকে দেব না। আমরা লড়ব।”
কিন্তু ঠিক সেই সময় অনন্যা হঠাৎ তার ব্যাগ থেকে ধারালো স্ক্যালপেল বের করে আনল। গবেষণার জন্য রাখা ছিল সেটা, এখন সেটা চকচক করছে প্রদীপের আলোয়।
—“যদি আমাকে দাও, আমি লড়ব না। কিন্তু যদি তোমরা আমাকেই বেছে নাও… আমি নিজেই শেষ করে দেব।”
তার চোখে তখন ভয় নয়, এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। রুদ্র এগিয়ে গিয়ে তার হাত চেপে ধরল। —“এটা তুমি ভাবছো না। ও তোমাকে দিয়ে খেলছে।”
কিন্তু সেই মুহূর্তে ঝর্নার গর্জন এতটাই জোরালো হয়ে উঠল যে মনে হচ্ছিল পাহাড় ভেঙে পড়বে। বাইরে চাঁদের আলো লালচে আভা নিচ্ছিল।
হঠাৎ মাটিতে পড়ে থাকা কালো জলের ছায়া নড়ে উঠল। ছায়ার হাত বেরিয়ে এসে অভিষেকের পা জাপটে ধরল। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, বুক ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগল।
—“আমাকে টেনে নিচ্ছে! বাঁচাও!”
রুদ্র আর তিথি ঝাঁপিয়ে তাকে টানতে লাগল। কিন্তু কালো জলের শক্তি ছিল ভয়ঙ্কর। অভিষেকের শরীর আস্তে আস্তে দরজার বাইরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তার চোখ ফাঁকা হয়ে আসছিল, ঠোঁটে শুধু এক শব্দ—“অগ্নিসূত্র…”
ঠিক তখনই অনন্যা স্ক্যালপেল হাতে চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে নিজের হাতে কেটে রক্ত ঝরিয়ে দিল মাটিতে। মুহূর্তে চারপাশে ভয়ঙ্কর গন্ধ ছড়িয়ে গেল। কালো জলের ছায়া থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
রুদ্র চেঁচিয়ে উঠল, —“না! তুমি কি করছো?”
অনন্যা ফিসফিস করে বলল, —“ও আমার রক্ত চাইছে… আমি দিলে হয়তো তোমরা বাঁচবে।”
অভিষেককে টেনে ভেতরে আনা গেল। কিন্তু মাটিতে ঝরে পড়া অনন্যার রক্ত ধীরে ধীরে কালো জলে মিশে গেল। আর সেই সঙ্গে ঝর্নার আওয়াজ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল—যেন যজ্ঞের ডাকে সাড়া দিচ্ছে।
গাইড বৃদ্ধ হঠাৎ বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠ ভয়ে কাঁপছিল।
—“এখন শুরু হল আসল সাধনা। তোমাদের মধ্যে একজনকে ও চাইবেই… আর পালানোর পথ আর নেই।”
ঝর্নার শব্দ পাহাড় কাঁপিয়ে তুলছিল। মনে হচ্ছিল চন্দ্রনাথ নিজেই শ্বাস নিচ্ছে—প্রতিটি নিঃশ্বাসে অন্ধকার আরও ঘন হচ্ছে। অনন্যার রক্ত মাটিতে পড়ে কালো জলে মিশতেই পুরো পরিবেশ বদলে গেল। বাতাসে ধূপ, ছাই আর জ্বলন্ত কাঠের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
অনন্যা মাটিতে বসে হাঁপাচ্ছিল। তার চোখ আধখোলা, ঠোঁট শুকিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ভেতর থেকে যেন অন্য কারও কণ্ঠ ভেসে আসছিল—
—“অগ্নিসূত্র… সম্পূর্ণ করো…”
রুদ্র তাকে কোলে তুলে ধরতে গিয়ে কেঁপে উঠল। অনন্যার শরীর ঠান্ডা হয়ে এসেছে, কিন্তু তার কপালে অদ্ভুত এক লালচে চিহ্ন ফুটে উঠছে। যেন অদৃশ্য হাতে আগুন দিয়ে আঁকা।
অভিষেক, যে কিছুক্ষণ আগে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছে, ফাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, —“এখন সে অনন্যাকে বেছে নিয়েছে। ও-ই হবে বলিদান।”
তিথি কেঁপে উঠল, —“না! আমরা কাউকে দেব না। কিন্তু… কিন্তু যদি না দিই, সবাই শেষ।”
কুঁড়েঘরের বাইরে হঠাৎ হাজার মানুষের মতো পায়ের শব্দ উঠল। চারজন দরজা দিয়ে উঁকি মেরে তাকাল—জঙ্গলের ভেতর আগুনের আলো। আগুন নয়, যেন আগুনের গোলক। তার চারপাশে ছায়ার মতো অসংখ্য মানুষের আকৃতি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মুখ নেই, চোখ নেই, শুধু ছাই-কালো শরীর আর একসাথে উচ্চারিত মন্ত্র—
“অগ্নিসূত্র… অগ্নিসূত্র…”
রুদ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলল, —“এগুলো ছায়া। ওর সৃষ্টি।”
বৃদ্ধ গাইড হঠাৎ কুঁড়েঘরে ঢুকে ফিসফিস করে বললেন, —“না বাবুরা, এরা ছায়া নয়। ওরা সেই সাধনার অসমাপ্ত সঙ্গী। প্রত্যেকেই কোনো এক সময় এই জলের বলিদান হয়েছে।”
শুনে শরীর শীতল হয়ে গেল সবার। যেন শত শত মৃত আত্মা পাহাড়ের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
হঠাৎ অনন্যা চমকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ রক্তাভ, ঠোঁট নড়ছে, গলা অন্যরকম—
—“যজ্ঞের বৃত্ত সম্পূর্ণ না হলে পাহাড় ভেঙে পড়বে। তোমরা কেউ পালাতে পারবে না। আমাকে যেতে দাও।”
রুদ্র তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, —“না! তুমি আমাদের বন্ধু। আমরা তোমাকে মরতে দেব না।”
অনন্যা কাঁদতে কাঁদতে বলল, —“তুমি বোঝো না রুদ্র। আমি আর আমি নেই। ভেতরে অন্য কেউ আছে। ও আমাকে দিয়ে শেষ করবে।”
ঠিক তখনই মাটিতে আবার কালো জল ফেটে বেরিয়ে এল, যেন ঝর্না কুঁড়েঘরের ভেতর প্রবাহিত হচ্ছে। জল ভিজিয়ে দিল মেঝে, আর তার ভেতর থেকে আবার সেই মুখ ভেসে উঠল—লাল চোখওয়ালা তান্ত্রিক। এবার তার কণ্ঠ আরও স্পষ্ট।
—“অগ্নিসূত্র পূর্ণ করো… বলিদান দাও…”
অভিষেক ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, —“আমাদের বাঁচার একটাই রাস্তা—অনন্যাকে ছেড়ে দিতে হবে।”
রুদ্র গর্জে উঠল, —“চুপ করো! তুমি কি মানুষ না দানব?”
তিথি চোখ বুজে ছিল, কিন্তু তার ঠোঁটে নিঃশব্দে ভেসে আসছিল—
—“একজন… একজনকে যেতেই হবে…”
চারজনের মধ্যে বিভেদ চরমে পৌঁছল। রুদ্র মরিয়া হয়ে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু অন্ধকার ইতিমধ্যেই তাদের ভেতর ঢুকে গেছে।
ঠিক তখন বাইরে বজ্রপাত হল। পুরো পাহাড় কেঁপে উঠল। ঝর্নার কালো জল এক মুহূর্তে লাল হয়ে জ্বলে উঠল। আকাশজুড়ে রক্তিম আলো।
অনন্যা হঠাৎ দরজার দিকে ছুটে গেল। রুদ্র পেছন থেকে চিৎকার করল—
—“থামো!”
কিন্তু সে থামল না। যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে টেনে নিচ্ছে।
বৃদ্ধ গাইডের গলা কাঁপছিল। তিনি বললেন, —“আজকের রাত শেষ হলে পূর্ণিমা কেটে যাবে। যদি ততক্ষণে যজ্ঞ পূর্ণ না হয়, পাহাড় নিজেই ছাই হয়ে যাবে।”
রুদ্র বুঝল, আর সময় নেই। কালো জল শুধু বলিদান চাইছে না—সে চাইছে পুরো পাহাড়কে নিজের মধ্যে গিলে নিতে।
অনন্যা দৌড়ে বেরিয়ে গেল কুঁড়েঘর থেকে। বাইরে পূর্ণিমার আলোয় চারদিক রক্তিম হয়ে উঠেছে। ঝর্নার কালো জল তখন আগুনের মতো জ্বলে উঠছে, আর তার চারপাশে অসংখ্য ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে মন্ত্রপাঠ করছে—
“অগ্নিসূত্র… অগ্নিসূত্র…”
রুদ্র পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে অনন্যার হাত চেপে ধরল, কিন্তু অদৃশ্য শক্তি যেন ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল ঝর্নার দিকে। অনন্যার চোখ ফাঁকা, ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি—
—“ছেড়ে দাও, রুদ্র। আমি যদি যাই, বাকিরা বাঁচবে।”
রুদ্র চিৎকার করল, —“না! এটা তুমি বলছ না। ও বলাচ্ছে।”
অভিষেক আর তিথি দৌড়ে এল পেছন থেকে। কিন্তু অভিষেকের চোখে ভয় আর ক্লান্তি, সে ফিসফিস করে বলল, —“হয়তো ও ঠিকই বলছে। কাউকে না দিলে আমরা মরব।”
তিথি হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকাল, —“তুমি কি বন্ধুকে উৎসর্গ করতে চাইছ?”
অভিষেক কেঁপে উঠল, —“আমি… আমি বাঁচতে চাই।”
এই কথায় রুদ্র রাগে ফেটে পড়ল। সে অভিষেককে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। অনন্যাকে শক্ত করে টেনে কাছে আনল। কিন্তু সেই মুহূর্তে মাটির ভেতর থেকে কালো জল ফেটে বেরোল, আর ঠান্ডা আঙুলের মতো ছায়া রুদ্রকে আঁকড়ে ধরল। তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, বুকের ভেতর বরফের মতো যন্ত্রণা।
অনন্যা কাঁদতে কাঁদতে বলল, —“দেখছো? আমাকে না দিলে তোমাকেও টেনে নেবে।”
রুদ্র দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল, —“তাহলে আমি-ই যাই। কিন্তু তোমাকে যেতে দেব না।”
তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে অনন্যার চোখে জল এসে গেল। কিন্তু তান্ত্রিকের গর্জন তখন আকাশ ভরিয়ে তুলেছে—
“বলিদান দাও… অগ্নিসূত্র পূর্ণ করো…”
হঠাৎ বজ্রপাত হল। আকাশ ফেটে পড়ল, পাহাড় কেঁপে উঠল। ঝর্নার কালো জল এক মুহূর্তে জলোচ্ছ্বাসের মতো ছুটে এল তাদের দিকে। ছায়ামূর্তিগুলো হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
গাইড বৃদ্ধ দৌড়ে এলেন। তার হাতে একটা পুরোনো তামার ঘন্টা। তিনি ঝনঝন করে বাজাতে শুরু করলেন। গলার শিরা ফুলে উঠেছে, তিনি মন্ত্র উচ্চারণ করলেন—
—“মহাকালী, রক্ষা করো! ও অশুভ শক্তিকে থামাও!”
ঘন্টার শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। ছায়ামূর্তিগুলো পেছনে সরে গেল, কিন্তু কালো জল থামল না। বরং আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল।
অনন্যা রক্তিম চোখে তাকিয়ে বলল, —“আমাকে দাও, নইলে তোমরা মরবে।”
রুদ্র মরিয়া হয়ে বলল, —“না! আমি অন্য রাস্তা খুঁজব।”
তখনই তিথি চিৎকার করে উঠল, —“ও শুধু রক্ত চায় না, ভয় চায়! আমরা যদি ভয় না পাই, ও শক্তি হারাবে।”
কথাটা সত্যি কিনা কেউ জানত না, কিন্তু এই মুহূর্তে সেটাই শেষ আশ্রয়। রুদ্র চোখ বন্ধ করল, বুকের ভেতর থেকে শক্ত করে চিৎকার বেরোল—
—“আমরা কাউকে দেব না! আমরা ভয় পাই না!”
অভিষেক কাঁপছিল, কিন্তু অনন্যার হাত ধরে সেও মন্ত্র ভাঙার মতো চিৎকার করল। তিথি চোখ বন্ধ করে একই কথা বলল।
তাদের একসাথে উচ্চারণ পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলল। কালো জল গর্জন করল, ছায়ামূর্তিগুলো কাঁপতে শুরু করল। যেন অদৃশ্য বাঁধনে ফেটে যাচ্ছে তাদের শক্তি।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই তান্ত্রিকের মুখ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল জলের ভেতরে। লাল চোখ আগুনের মতো জ্বলছিল। সে গর্জে উঠল—
—“তাহলে আমি-ই নেব। সবাইকে নেব!”
ঝর্নার জল হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। চারজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আকাশজুড়ে বজ্রপাত, অন্ধকার, আর মন্ত্রপাঠের গর্জন একসাথে মিশে গেল।
পাহাড়ের বুক যেন ফেটে যাচ্ছিল। বজ্রপাতের শব্দে আকাশ কেঁপে উঠছিল বারবার। কালো জল ঝর্না থেকে বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে, আর তার ভেতর লাল চোখওয়ালা তান্ত্রিকের মুখ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রুদ্র, অনন্যা, তিথি আর অভিষেক মাটিতে ছিটকে পড়েছিল। শরীর ভিজে ঠান্ডা, কানে কেবল গর্জন। তবুও তারা টের পাচ্ছিল—তান্ত্রিক শক্তি এখন সম্পূর্ণ জেগে উঠেছে।
গাইড বৃদ্ধ কাঁপা গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, —“আর সময় নেই! পাহাড় ভেঙে যাবে। তোমাদের কাউকে দাঁড়াতে হবে এই শক্তির মুখোমুখি।”
রুদ্র দাঁড়াতে চেষ্টা করল। তার বুক ধড়ফড় করছিল, মাথা ভারী। তবুও সে হেঁচড়ে উঠে দাঁড়াল। কালো জলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল—
—“তুমি কিছুই পাবে না! আমরা কাউকে দেব না।”
তান্ত্রিকের লাল চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। সে গর্জে উঠল—
—“তাহলে আমি সবাইকে নেব। এই পাহাড় হবে আমার অগ্নিকুণ্ড।”
তার সঙ্গে সঙ্গেই মাটি কাঁপতে শুরু করল। গাছ ভেঙে পড়ছিল, পাথর গড়িয়ে আসছিল। অনন্যা চিৎকার করে উঠল, —“রুদ্র! এখনই কিছু করো, নইলে আমরা সবাই মরব!”
তিথি তখন কেঁপে কেঁপে ফিসফিস করছিল, —“আমরা যদি একসাথে দাঁড়াই, হয়তো পারব। সে আমাদের ভেতরের ভয়কেই শক্তি করছে।”
রুদ্র হাত বাড়িয়ে অনন্যা আর তিথিকে ধরল। অভিষেক প্রথমে দ্বিধা করছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেও হাত বাড়াল। চারজন একসাথে বৃত্ত তৈরি করল।
গাইড বৃদ্ধ আবার তামার ঘন্টা বাজালেন। ঘন্টার শব্দ পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলল। রুদ্র চোখ বন্ধ করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল—
—“আমরা ভয় পাই না! আমরা কাউকে দেব না!”
চারজন একসাথে সেই বাক্য উচ্চারণ করল। প্রতিধ্বনি পাহাড়ে গড়িয়ে গেল।
কালো জল হাহাকার করল। তান্ত্রিকের মুখ বিকৃত হয়ে উঠল, লাল চোখে আগুন নেভার মতো ঝলক। চারপাশে ছায়ামূর্তিগুলো কাঁপতে কাঁপতে ভেঙে যেতে শুরু করল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে অভিষেক হঠাৎ বৃত্ত থেকে হাত ছেড়ে দিল। তার চোখে ভয়, মুখে চিৎকার—
—“না! আমি পারব না! আমি বাঁচতে চাই!”
অন্ধকার সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ নিল। কালো জলের ভেতর থেকে ছায়ার হাত বেরিয়ে অভিষেককে টেনে নিল মাটির ওপর দিয়ে। সে চিৎকার করতে লাগল, —“বাঁচাও! বাঁচাও!”
রুদ্র ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধরতে চাইলো, কিন্তু অদৃশ্য শক্তি ছিল ভয়ঙ্কর। অভিষেকের শরীর এক ঝলকে ঝর্নার ভেতর টেনে নেওয়া হল। তার চিৎকার থেমে গেল, আর কালো জলের গর্জন আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল।
অনন্যা ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, —“ওকে নিয়ে নিল… ওকে বলিদান করল…”
বৃদ্ধ কাঁপা কণ্ঠে উত্তর দিলেন, —“হ্যাঁ। একবার বলিদান হলে যজ্ঞ থামে। কিন্তু এবার ওর ক্ষুধা বড় ছিল। তোমরা কি বাঁচবে, নাকি পুরো পাহাড় ভস্ম হবে—এখনও নিশ্চিত নয়।”
ঝর্নার জল তখনও লালচে আলো ছড়াচ্ছিল। পাহাড়ের বুক ফাটার শব্দ থেমে যায়নি। মনে হচ্ছিল পৃথিবীই ভেঙে যাবে।
রুদ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলল, —“না। আমরা এখনও শেষ হইনি। অভিষেকের মৃত্যু বৃথা হতে দেব না। আমি এই যজ্ঞ শেষ করব।”
চাঁদের আলো আরও লাল হয়ে উঠল, ঝর্নার জল গর্জন করতে থাকল, আর অদৃশ্য কণ্ঠ আবার ডাক দিল—
“অগ্নিসূত্র… অগ্নিসূত্র…”
ঝর্নার গর্জন আকাশ ফাটিয়ে তুলছিল। পাহাড়ের বুক থেকে আগুন আর কালো জলের মিশ্র শব্দ বেরোচ্ছিল, যেন ধ্বংস নিজেই জন্ম নিতে চলেছে। অভিষেকের মৃত্যু তাদের সামনে শূন্যতার মতো দাঁড়িয়ে রইল—চোখের সামনে বন্ধুকে গিলে নিল কালো জল।
রুদ্র দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে, মুষ্টি শক্ত। বুকের ভেতর আগুন জ্বলছিল। সে বুঝল—এখন যদি কিছু না করে, বাকি সবাই শেষ। অনন্যা আর তিথি তার পাশে দাঁড়িয়ে, কাঁপছে, কিন্তু চোখে ভয় আর প্রতিজ্ঞা একসঙ্গে।
গাইড বৃদ্ধ কাঁপা হাতে তামার ঘন্টা বাজাচ্ছিলেন। তিনি ফিসফিস করে বললেন, —“শেষ পথটা একটাই। ওর সাধনা ভাঙতে হলে ভয়কে আগুনে পোড়াতে হবে। তোমরা তিনজন একসাথে দাঁড়াও, আর বিশ্বাস করো—ওর শক্তি তোমাদের নয়।”
ঝর্নার কালো জলে তান্ত্রিকের মুখ স্পষ্ট। তার লাল চোখ আগুনের মতো জ্বলছে। সে গর্জে উঠল, —“একজন বলিদান হয়েছে, কিন্তু আরও চাই! পাহাড় আমারই হবে!”
রুদ্র, অনন্যা আর তিথি হাত ধরল একে অপরের। তারা বৃত্ত বানাল। রুদ্র চিৎকার করল—
—“আমরা ভয় পাই না! তুমি আমাদের নিতে পারবে না!”
তান্ত্রিক হেসে উঠল। তার গর্জন আকাশ ভরিয়ে দিল। কালো জলের ভেতর থেকে অসংখ্য হাত বেরিয়ে এসে তাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঠান্ডা, হাড়ের মতো হাত।
কিন্তু এবার তারা ভাঙল না। অনন্যা চোখ বন্ধ করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল, —“অগ্নিসূত্র নয়—আমরা আলো চাই!”
তিথি যোগ দিল, —“আমরা কাউকে দেব না!”
রুদ্র বুক চিরে চেঁচিয়ে উঠল—
—“আমরা বাঁচব!”
হঠাৎ ঘন্টার শব্দ প্রচণ্ড হয়ে উঠল। বৃদ্ধ কণ্ঠ ভেঙে চিৎকার করলেন, —“মহাকালী! অশুভ শক্তি ধ্বংস করো!”
এক মুহূর্তে বজ্রপাত ফেটে পড়ল ঝর্নার ওপর। আগুনের আলোয় কালো জল রক্তের মতো লাল হয়ে জ্বলে উঠল। তান্ত্রিকের মুখ বিকৃত হয়ে গেল। তার গর্জন হাহাকার হয়ে পাহাড় কাঁপিয়ে তুলল। ছায়ামূর্তিগুলো একে একে ভেঙে ধুলোয় মিশে গেল।
রুদ্র অনুভব করল, চারপাশের অন্ধকার আস্তে আস্তে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে। কালো জলের গর্জন থেমে আসছে। শেষবারের মতো তান্ত্রিকের চোখে আগুন ঝলসে উঠল, তারপর ঝর্না প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ছিটকে ছড়িয়ে গেল।
সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কান্না, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি—কিন্তু চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এল। কালো জল আর নেই। ঝর্না এখন স্বচ্ছ, পাহাড়ের বুক থেকে ঝরে পড়ছে সাদা ফেনিল ধারা।
অনন্যা হাঁপাতে হাঁপাতে রুদ্রকে জড়িয়ে ধরল। তিথি ভেঙে পড়ে কাঁদতে লাগল। তারা জানত—অভিষেক আর নেই। কিন্তু তার মৃত্যু হয়তো এই ধ্বংস থেকে তাদের রক্ষা করেছে।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বসে পড়লেন। তাঁর চোখে জল। তিনি বললেন, —“যজ্ঞ ভেঙেছে। শতবর্ষের তন্ত্র আজ শেষ হল। তোমরা বেঁচে গেছো, কিন্তু তার দাগ তোমাদের থেকে যাবে না।”
চাঁদ তখন মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। আলো পড়ল পাহাড়ের ওপর, শান্ত, স্বচ্ছ। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা জানত—চন্দ্রনাথের কালো জল শুধু ঘুমিয়েছে। আবার কখনও হয়তো জেগে উঠবে।
রুদ্র আকাশের দিকে তাকাল। বুকের ভেতর শূন্যতা, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা। সে ফিসফিস করে বলল, —“আমরা বেঁচে আছি। এটাই আমাদের জয়।”
পাহাড়ের বাতাসে তখন হালকা ধূপের গন্ধ মিলিয়ে যাচ্ছিল।
সমাপ্ত




