Bangla - তন্ত্র

কালরাত্রির ডাকে

Spread the love

প্রিয়াংশু মুখোপাধ্যায়


অধ্যায় ১
গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে কাঁদামাটি ধীরে ধীরে কালচে ধূসর বালিতে মিশে গেছে, আর গঙ্গার একটি পরিত্যক্ত শাখা নদী যেন মৃত সাপের মতো স্থির হয়ে শুয়ে আছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রাচীন শ্মশান। দিনের বেলাতেও এখানে ছায়া ঘন হয়, আর রাত নামলে মনে হয় যেন অদৃশ্য কোনো প্রহরী অন্ধকারের চাদর মেলে দিয়েছে। প্রায় তিনশো বছরের পুরনো এই শ্মশান একসময় জমিদারদের পারিবারিক চিতা স্থল ছিল, পরে ধীরে ধীরে সবার জন্য উন্মুক্ত হয়। তার ভাঙাচোরা প্রবেশদ্বারের ওপরের পাথরের খোদাইয়ে ক্ষীণভাবে এখনও দেখা যায় কালো দাঁত বের করা দেবীমূর্তি, যার চোখে লাল সিঁদুর লেপ্টে আছে। আশেপাশের পুরনো শিমুল, শিরীষ আর বটগাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় ছাই রঙের মাটি, যার গন্ধে আছে পোড়া কাঠ, ধূপের ধোঁয়া আর কোনও অজানা গন্ধের মিশ্রণ—যা কারও কারও কাছে কেবলমাত্র মৃত্যুর গন্ধ। এই বছরের শরতের পূর্ণিমা আসছে কয়েক দিনের মধ্যে, আর তাতে গ্রামের প্রধান মন্দির ও শ্মশান চত্বরে একসাথে হবে মহাকালীপুজো। ছোটবেলা থেকেই এই পুজো নিয়ে কৌতূহল থাকলেও, অদ্ভুত এক ভয়ও কাজ করত অভিজিৎ পালের মনে। কালীপুজোর রাতে শ্মশান প্রায় লোকে ভর্তি থাকে, কিন্তু এর মাঝেই হঠাৎ কিছু ঘটনা ঘটে যায়—যেমন কেউ নিখোঁজ হওয়া বা গভীর রাতে শ্মশান থেকে অদ্ভুত শব্দ শোনা। এবারও পুজোর কয়েক দিন আগে গ্রামে হঠাৎ গুজব ছড়ায়—নদীপারের গোপাল নায়েককে কেউ শেষবার শ্মশানের দিকে যেতে দেখেছিল, কিন্তু তারপরে আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরিবার ভেবেছিল হয়তো শহরে আত্মীয়ের কাছে গেছে, কিন্তু তিনদিন কেটে গেলেও তার কোনও খোঁজ মেলেনি।
সন্ধ্যার দিকে গ্রামের একমাত্র চায়ের দোকান—রঘুর চায়ের আড্ডায়—এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। তেলের আলোয় ছায়াগুলো লম্বা হয়ে চায়ের ভাঁড়ের ধোঁয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছিল, আর চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে লোকজন মুখ গম্ভীর করে গল্প করছিল। কেউ বলছিল, “এ তো আগেও হয়েছে, পূর্ণিমার আগে কেউ না কেউ হারিয়ে যায়।” কেউ ফিসফিস করে বলছিল, “মানুষ হারাচ্ছে মানে… কোনও তান্ত্রিকের কাজ, বুঝলি!” অভিজিৎ চুপচাপ বসে সব শুনছিল। তার চোখের কোণে একধরনের অনুসন্ধিৎসু ঝিলিক, যেন এই ঘটনার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের দরজা খুঁজে পেতে চায়। এমন সময় দোকানে ঢুকল রত্না মণ্ডল—তার পুরনো স্কুলের সহপাঠী, এখন সদ্য ডাক্তারি পড়া শেষ করে গ্রামে ফিরে এসেছে। সাদা কুর্তা-পায়জামা, চুল খোঁপায় বাঁধা, মুখে হালকা ক্লান্তি কিন্তু চোখে দৃঢ়তার ছাপ। চা নিতে নিতে সে অভিজিতের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই কি এসব বাজে গুজবও শুনছিস? হারিয়ে যাওয়া মানুষ মানেই তান্ত্রিক বা ভূত? হয়তো সে কোথাও চলে গেছে, বা অন্য কোনও ঘটনা।” অভিজিৎ হালকা হাসল, “রত্না, তুই তো জানিস, আমি এসব গুজবে বিশ্বাস করি না, কিন্তু ইতিহাসে প্রায়ই দেখা গেছে—কুসংস্কার আর অপরাধের মাঝের রেখাটা খুব পাতলা।” রত্না ভ্রু কুঁচকে বলল, “তোর মানে, তুই ভেবেছিস এটা কোনও অপরাধ?” অভিজিৎ চায়ের শেষ চুমুক দিয়ে বলল, “শুধু অপরাধ নয়, এটা হয়তো পুরনো কোনও রীতি… যা এখনও কেউ চালিয়ে যাচ্ছে।”
চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে শ্মশানের দিকে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রত্না হালকা শিউরে উঠল। পথটা লম্বা, কাঁচা, আর দুপাশে ঘন গাছের সারি—মনে হয় যেন এই পথটা দিনের আলোতেই অন্ধকারে ঢেকে আছে। হাওয়ায় এখন থেকেই ধূপ, কাঁচা চন্দনের গন্ধ ভেসে আসছে—সম্ভবত কালীপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। দূরে শোনা যাচ্ছিল ঢোলের ধ্বনি, যা প্রতি বছর এই সময় শ্মশানপাড়ায় প্রতিধ্বনিত হয়। অভিজিৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল, চাঁদ এখনো পুরোপুরি গোল হয়নি, কিন্তু আলো অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল, যেন পূর্ণিমা আগেভাগেই এসে গেছে। রত্না বলল, “তুই যদি সত্যিই ভাবিস, এখানে কিছু হচ্ছে, তাহলে প্রমাণ জোগাড় করতে হবে।” অভিজিৎ মাথা নাড়ল, “হবে। কিন্তু প্রমাণ জোগাড় করতে হলে ওই শ্মশানের ভিতরে যেতে হবে—যেখানে পূর্ণিমার রাতে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে।” রত্না কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় দূরে কোথাও কুকুরের আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে এল, তারপর হঠাৎ থেমে গেল। তারা দু’জনেই নীরবে একে অপরের দিকে তাকাল—আর সেই নীরব দৃষ্টিতে যেন এক অদৃশ্য চুক্তি হল—এ রহস্যের মুখোশ এবার সরাতেই হবে।
অধ্যায় ২
পরের দিন বিকেলে, সূর্যের আলো যখন নদীর ওপরে ঢলে পড়ে তামাটে রঙে, অভিজিৎ একা রওনা দিল শ্মশানের দিকে। পথটা নির্জন, শুধু মাঝে মাঝে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে শোনা যায় পাখির ডাক আর শুকনো পাতার খসখস শব্দ। শ্মশানের কাছাকাছি আসতেই বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ ভেসে আসে—পোড়া কাঠ, ধূপ, আর পুরনো ফুলের পচা গন্ধের মিশ্রণ। এই শ্মশান গ্রামের লোকজনের কাছে শুধু মৃত্যুর স্থান নয়, বরং এক ভয়ানক কাহিনির কেন্দ্র, যেখানে রাতের আঁধারে নাকি মৃতেরা হাঁটে, আর অদ্ভুত মন্ত্রপাঠ ভেসে আসে নদীর দিক থেকে। ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল হরিপদ মাঝি বাঁশের বেড়া মেরামত করছে। পঞ্চাশোর্ধ্ব, রোদে পোড়া কালো মুখ, মাথায় পুরনো গামছা বাঁধা, চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা। এই মানুষটিই বহু বছর ধরে শ্মশানের রক্ষক—চিতার কাঠ জোগাড় করা থেকে শুরু করে মৃতদেহের দাহসজ্জা, সবই তার হাতে হয়। অভিজিৎ এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করল, আর কিছুক্ষণ আনুষ্ঠানিক কথা বলার পর মূল প্রসঙ্গে এল। “হরিপদ কাকা, গোপাল নায়েকের হারিয়ে যাওয়ার কথা তো জানেন?”—অভিজিৎ জিজ্ঞেস করতেই তিনি হাতের কাজ থামিয়ে এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন, তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, “হুঁ, জানি। কিন্তু এই প্রথম নয়, বাবু। এর আগেও এমন হয়েছে। কিছু কিছু পূর্ণিমার রাতে… অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে।”
অভিজিৎ একটু এগিয়ে বসল, “কী রকম ঘটনা?” হরিপদ ধীরে ধীরে বলতে লাগল, যেন প্রতিটি শব্দ মেপে উচ্চারণ করছে—“কখনও কখনও চিতার আগুন হঠাৎ নিভে যায়, যেন কেউ ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল। আবার কখনও রাত গভীর হলে শোনা যায় এমন মন্ত্রপাঠ, যা আমি জীবনে কোনও সাধুর মুখে শুনিনি। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হল… কখনও কখনও দেখেছি, কারও ছায়া মাটিতে পড়ছে না।” শেষ কথাটা শুনে অভিজিৎ শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। হরিপদ চোখ নামিয়ে বাঁশে হাত চালিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার কণ্ঠে স্পষ্ট ছিল আতঙ্কের ছোঁয়া। অভিজিৎ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, “আপনি কি জানেন কারা মন্ত্রপাঠ করে?” হরিপদ প্রথমে কোনও উত্তর দিল না, তারপর কেমন যেন এড়িয়ে বলল, “মন্ত্র তো শ্মশানে শোনা যায়, কিন্তু কে করে, সেটা দেখার সাহস হয় না। বাবু, সব কিছু জানা ভালো নয়।” তার কণ্ঠে এমন এক সতর্কতার সুর ছিল, যেন সত্য জানলেই বিপদ এসে পড়বে। অভিজিৎ বুঝতে পারছিল, হরিপদ অনেক কিছু জানে, কিন্তু সব খুলে বলছে না।
ঠিক সেই সময় দূরের গঙ্গার শাখানদীর ওপারে কয়েকটা কাক একসাথে অদ্ভুতভাবে ডাকতে শুরু করল, তারপর হঠাৎ থেমে গেল। হরিপদ মাথা তুলে শুনল, তারপর তাড়াতাড়ি বলল, “বাবু, সন্ধ্যা নামছে, এখন এখান থেকে চলে যান। পূর্ণিমা আসছে, আর এই সময় শ্মশানে বেশিক্ষণ থাকা ভালো নয়।” তার চোখে তখন এক ধরনের গোপন আতঙ্ক, যেন অন্ধকারের আগমনী বার্তা সে আগেই পেয়ে গেছে। অভিজিৎ উঠে দাঁড়াল, কিন্তু মনে হচ্ছিল এই কথোপকথন আসলে অনেক বড় কিছুর ইঙ্গিত রেখে গেল। বেরোনোর সময় সে লক্ষ্য করল, শ্মশানের এক কোণে ধূপের ধোঁয়া পাক খাচ্ছে, অথচ সেখানে কোনও চিতা বা পুজো হচ্ছিল না। বাতাসে ভাসছিল ক্ষীণ গন্ধ, আর দূরে নদীর দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, জলের ওপর কোথাও এক টুকরো ছায়া নড়ে উঠল—যা কোনও মানুষের নয়। অভিজিৎ জানত, এখানেই থেমে গেলে সত্য জানা যাবে না; কিন্তু একইসঙ্গে বুঝতে পারছিল, যত এগোবে, ততই বিপদের গভীরে ঢুকতে হবে।
অধ্যায় ৩
শ্মশানের রক্ষক হরিপদের রহস্যময় সতর্কবাণী অভিজিৎকে আরও অস্থির করে তুলেছিল। পরদিন দুপুরে সে রত্নার সঙ্গে দেখা করে সমস্ত কথাবার্তা খুলে বলল, আর প্রস্তাব রাখল—তাদের গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের ধুন্ধুম গাছের তলায় যে কুঁড়েঘরটা আছে, সেখানেই নাকি থাকে মহেন্দ্রনাথ তান্ত্রিক। লোকমুখে শোনা যায়, একসময় সে নেপাল ও কামাখ্যার মঠে তন্ত্রসাধনা করত, পরে হঠাৎ সব ছেড়ে এই গ্রামে এসে বাসা বাঁধে। রত্না প্রথমে আপত্তি তুলল, “তুই কি জানিস, লোকটা কী রকম? যদি ও সত্যিই কোনও অশুভ সাধনা করে থাকে, তবে ওখানে যাওয়াই বিপদ।” কিন্তু অভিজিৎ দৃঢ় স্বরে বলল, “যদি এখানে কারও হাতে মানুষ হারিয়ে যায়, তবে ওর কাছেই সূত্র আছে।” বিকেলের দিকে, গাছপালার ছায়ায় ঢাকা সরু পথ ধরে তারা দু’জন হাঁটতে লাগল। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা—পাখি নেই, বাতাস নেই, শুধু শুকনো পাতা মাড়ানোর শব্দ। কুঁড়েঘরের কাছে পৌঁছতেই তীব্র ধূপের গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারল—গন্ধ এতটাই ঘন যে মনে হল পুরো শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাবে। দরজাটা আধখোলা, ভিতর থেকে মৃদু মন্ত্রপাঠের আওয়াজ আসছিল, যা যেন এক অচেনা ভাষায় উচ্চারিত হচ্ছে।
অভিজিৎ দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই রত্না হালকা শিউরে উঠল। কুঁড়েঘরের দেওয়ালগুলো কালো কাপড়ে ঢাকা, তাতে ঝুলছে রুদ্রাক্ষমালা, তামার ঘণ্টা, আর মাঝেমাঝে সাদা-কালো খুলি—কিছু মানুষের, কিছু পশুর। মেঝেতে কুঠারের মতো ধারালো অস্ত্র, ছোটো মাটির পাত্রে লালচে তরল, আর তান্ত্রিক যন্ত্র আঁকা কাপড়। কোণে এক তামার হাঁড়িতে ফুটছিল অচেনা কোনও ভেষজের মিশ্রণ, যার গন্ধে ধূপের সঙ্গে এক ধরনের ধাতব, প্রায় রক্তের মতো গন্ধ মিশে গিয়েছিল। মহেন্দ্রনাথ তান্ত্রিক তখন এক লাল আসনে বসে, চোখ বন্ধ করে জপ করছিল। তার গায়ে গেরুয়া কাপড়, কপালে কালো চন্দনের টান, গলায় নানা আকারের মালা। অভিজিৎ ও রত্নার উপস্থিতি বুঝেই সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল—চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে তীক্ষ্ণ, যেন কারও ভেতরের ভাবনা পড়ে ফেলতে পারে। কণ্ঠে ছিল এক কর্কশ কিন্তু গভীর সুর, “জানি, কেন এসেছ। এখানে উত্তর খুঁজে পেতে এসেছ, কিন্তু উত্তর সবসময় মানুষকে মুক্তি দেয় না।”
রত্না নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করল, “গোপাল নায়েকের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে আপনি কিছু জানেন?” মহেন্দ্রনাথ ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি টেনে বলল, “গোপাল ছিল অস্থির, তার কপালে কালো ছায়া ছিল বহুদিন। পূর্ণিমার আগের রাত তার জন্য ছিল শেষ রাত।” অভিজিৎ বিরক্ত হয়ে বলল, “এসব রহস্যময় কথা নয়, আমি সত্য জানতে চাই।” তান্ত্রিক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, তারপর শ্মশানের দিকে হাত তুলে বলল, “মা কালী এবার রক্ত চাইবেন। আগামী পূর্ণিমায় নদীর ধারে লাল চক্র আঁকা হবে, আর তার মাঝে উৎসর্গ হবে এক মানবদেহ। এটি থামাতে চাইলে তোমাদেরও রক্ত ঝরবে।” কথাগুলো বলার সময় তার চোখে এক অদ্ভুত উন্মাদনা, আর চারপাশের ধূপের ধোঁয়া যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। রত্না অভিজিতের হাত চেপে ধরল, যেন বলতে চাইছে—এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা ঠিক নয়। বেরিয়ে আসার সময় তারা দু’জনই অনুভব করল, বাইরে দিনের আলো থাকা সত্ত্বেও কুঁড়েঘরের অন্ধকার যেন তাদের গায়ে লেগে আছে, আর মহেন্দ্রনাথের কণ্ঠস্বর তাদের কানে বারবার বাজছে—“আগামী পূর্ণিমায় রক্ত চাইবে মা।”
অধ্যায় ৪
পরদিন সকালেই রত্না একা বেরিয়ে পড়ল, উদ্দেশ্য—গত কয়েক বছরের সমস্ত নিখোঁজের ঘটনার খোঁজ জোগাড় করা। সে জানত, অভিজিৎকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে হলে কেবল গুজব বা ভয় দেখানো গল্পে ভরসা করলে চলবে না। শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে গ্রামের সরু মাটির পথ ধরে যেতে যেতে রত্না প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে কথা বলতে লাগল। অধিকাংশ পরিবারই চুপচাপ বিষয়টা এড়িয়ে গেল, কেউ কেউ আবার আতঙ্কে কথা বলতে গিয়ে কাঁপছিল। এক বৃদ্ধ বলল, “এই ঘটনা নতুন নয় মা, পূর্ণিমার রাতে বহু বছর ধরে মানুষ উধাও হচ্ছে। শুধু লোক বদলায়, কিন্তু রাত আর সময় বদলায় না।” রত্না নোটবুকে তারিখ লিখে রাখল—অবাক হয়ে দেখল, বেশিরভাগ ঘটনাই পূর্ণিমার আগের বা ঠিক পূর্ণিমার রাতেই ঘটেছে। দুপুরের দিকে সে পৌঁছাল গ্রামের প্রাচীন কালীমন্দিরের পাশে মাটির তৈরি একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরে, যেখানে থাকে মল্লিকা দাসী। লম্বা, চাপা রঙের মহিলা, চোখে গভীরতা আর গলায় অদ্ভুত গাম্ভীর্য। মল্লিকা দাসী মন্দিরের পূজারিণী, কিন্তু লোকের মুখে শোনা যায়, তার কাছে এমন কিছু তান্ত্রিক জ্ঞান আছে যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসেছে।
রত্না নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, “আমি নিখোঁজ ঘটনাগুলো নিয়ে তথ্য খুঁজছি, শুনেছি আপনার স্বামীও বহু বছর আগে হঠাৎ নিখোঁজ হয়েছিলেন।” মল্লিকা দাসী কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে তাকালেন, যেন মাপছেন, রত্না সত্যিই শুনতে প্রস্তুত কিনা। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, “হ্যাঁ, প্রায় পনেরো বছর আগে। সেদিন ছিল শীতের শেষ, আর পূর্ণিমার রাত। আমার স্বামী সন্ধ্যায় শ্মশানের দিকে গিয়েছিলেন—কোনও মৃতদেহের জন্য কাঠ নিয়ে যেতে। আমি জানতাম, ও রাতে শ্মশানে পুজো হয়, কিন্তু ভয় পাইনি, কারণ ও তো সেখানেই কাজ করত। কিন্তু রাত বাড়তেই আকাশে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল—পুরো আকাশ যেন নীলচে আলোয় ভরে উঠল, কিন্তু সেটা চাঁদের আলো ছিল না। আলোটা নরম, অথচ তীক্ষ্ণ, আর কোথাও থেকে ধোঁয়ার মতো নিচে নেমে আসছিল। সেই আলোয় পুরো গ্রাম, শ্মশান, নদীপাড়—সব যেন অন্য জগতে ঢেকে গিয়েছিল।” রত্নার শ্বাস আটকে যাচ্ছিল, সে জানত এ ধরনের আলো কোনো প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়। মল্লিকা দাসী গলা নামিয়ে বললেন, “আলো মিলিয়ে যাওয়ার পর আমি অনেক খুঁজেছি, কিন্তু আমার স্বামী আর ফেরেনি। কেউ বলেছে, তান্ত্রিকরা তাকে নিয়ে গিয়েছে, কেউ বলেছে, ওখানে ওর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু আমি জানি—ওর শরীর মাটিতে নেই, ও অন্য কোথাও আছে, এমন জায়গায়, যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসে না।”
এই কথা বলার সময় মল্লিকা দাসীর চোখে জল চিকচিক করছিল, কিন্তু তার গলায় রাগের কাঁপনও ছিল। তিনি রত্নার দিকে ঝুঁকে বললেন, “তুমি আর অভিজিৎ যদি সত্যিই খুঁজে বের করতে চাও, তবে পূর্ণিমার রাতটিকে উপেক্ষা কোরো না। সেদিন নদীর ধারে যে আলো নামে, সেটাই সব রহস্যের চাবি। কিন্তু সাবধান থেকো—এই আলো কেবল পথ দেখায় না, কেড়ে নেয়।” রত্না নীরবে মাথা নাড়ল, আর মনে মনে ভাবল—এতদিন ধরে যারা নিখোঁজ হয়েছে, তাদের সবার পেছনে হয়তো এই অদ্ভুত নীল আলোরই হাত আছে। বেরিয়ে এসে সে লক্ষ্য করল, দুপুরের রোদ এখনও আছে, তবু মল্লিকা দাসীর কুঁড়েঘরের চারপাশ যেন হালকা অন্ধকারে ঢেকে আছে, যেন অতীতের কোনও অশরীরী এখনও সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রত্না জানত, এই তথ্য অভিজিতের সঙ্গে ভাগ করে নিলে ওদের তদন্ত এক নতুন মোড় নেবে—কিন্তু সেই সঙ্গে বিপদও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।
অধ্যায় ৫
সন্ধ্যার পরেই বিনোদ বাগচী গ্রামে এসে পৌঁছেছিল। শহরের পরিচিত ক্রাইম ফটোগ্রাফার হিসাবে তার খ্যাতি ছিল, কিন্তু এইবারের লক্ষ্য ছিল অন্য—অতিপ্রাকৃত কিছু ধরা ক্যামেরায়। অভিজিৎ তাকে আগে থেকেই শ্মশানের গল্প শুনিয়েছিল, আর বিনোদের মধ্যে যেন এক রোমাঞ্চকর আগুন জ্বলে উঠেছিল। গ্রামবাসীর অনেকেই তাকে সাবধান করেছিল, বলেছিল রাতের পর ওই পথে না যেতে, কিন্তু বিনোদ সেইসব কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। রাত দশটার দিকে, কাঁধে বড় ক্যামেরা, ট্রাইপড, আর টর্চ নিয়ে সে শ্মশানের দিকে পা বাড়ায়। চারদিক নিঃশব্দ, শুধু দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ। চিতাগৃহের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, ঠান্ডা হাওয়া যেন হাড়ের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। আকাশে মেঘে চাঁদ ঢাকা, মাঝে মাঝে ফাঁক দিয়ে অল্প আলো এসে পড়ছে পুরনো চিতাগুলোর উপর। বিনোদ ট্রাইপড বসিয়ে লং-এক্সপোজার শট নিতে শুরু করল। প্রথম কয়েকটি ফ্রেমে কিছু অস্বাভাবিক ধরা পড়েনি, কিন্তু হঠাৎ তার চোখ পড়ল ক্যামেরার স্ক্রিনে—একটি চলমান ছায়া, যা মানুষের মতো হলেও তার গতি ছিল অবিশ্বাস্য। ছায়াটি যেন মাটি ছুঁয়েও হাঁটছে না, ভেসে বেড়াচ্ছে শ্মশানের গায়ে। বিনোদের মনে শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল, কিন্তু ভয়ের চেয়ে কৌতূহলই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেল।
সে ক্যামেরাটি হাতে তুলে নিয়ে সরাসরি ভিডিও রেকর্ড করতে শুরু করল। শ্মশানের একদম পেছনের দিকে, যেখানে পুরনো, ব্যবহারহীন চিতাগুলি পড়ে আছে, সেখানেই ছায়াটি আবার দেখা দিল—কিন্তু এবার আরও কাছে। লম্বা, কৃশদেহী আকৃতি, চোখের জায়গায় অদ্ভুত নীলচে আলো, আর এক ধরণের নিঃশব্দ চলাফেরা যা মানুষের নয়। বিনোদের বুক ধুকপুক করছিল, কিন্তু সে পিছিয়ে এল না। বরং ছায়ার দিকে আলো ফেলল। টর্চের আলো যেই পড়ল, মুহূর্তের জন্য ছায়াটি মিলিয়ে গেল, কিন্তু অদ্ভুত এক চাপা গর্জন শোনা গেল চারপাশে। যেন কেউ বা কিছু গাছের আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে। বাতাস ভারী হয়ে গেল, ধূপ আর পচা গন্ধের মিশ্রণে শ্বাস নেওয়া কষ্টকর লাগতে লাগল। হঠাৎ পিছন থেকে নরম পায়ের শব্দ এগিয়ে এল—খুব ধীরে, কিন্তু সরাসরি তার দিকে। বিনোদ টর্চ ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল ছায়াটি আবার, কিন্তু এবার তা আর দূরে নেই। সে ক্যামেরা তুলল, ঠিক তখনই চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে গেল, যেন চাঁদ, তারা, আলো সব গিলে খেয়েছে এই অদৃশ্য শিকারি। তার চিৎকার বা শব্দ কেউ শুনল না, শুধু ফ্ল্যাশের মতো এক মুহূর্তের আলো দেখা গেল দূরে, তারপর সব নিঃশব্দ।
পরদিন সকালে, গ্রামের লোকজন শ্মশানের পাশে বিনোদের ট্রাইপড আর ব্যাগ খুঁজে পায়, কিন্তু ক্যামেরা নেই। ঘাসে ভিজে শিশির জমে আছে, আর কাদা মাটিতে দেখা যায় কিছু অদ্ভুত পদচিহ্ন—মানুষের নয়, যেন লম্বা আঙুলওয়ালা কোনো প্রাণীর। অভিজিৎ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে, ব্যাগ খুলে দেখে ভেতরে বিনোদের নোটবুক রয়েছে, যেখানে শেষ পাতায় কাঁপা হাতের লেখা—“ওরা শিকার করে… আলো এলে থামে না… পূর্ণিমায় আরও বড় কিছু হবে।” এই লাইনগুলো পড়েই তার বুকের ভেতরে ভয়ের সাথে এক অদ্ভুত দায়িত্ববোধ জন্ম নেয়। রত্না এসে চারপাশ দেখে বুঝতে পারে, এই ঘটনা আর কাকতালীয় নয়—গত কয়েক মাসে যারা নিখোঁজ হয়েছে, তাদের সবার শেষ দেখা জায়গা এই শ্মশানের কাছেই। গ্রামের প্রবীণরা মুখ বুজে আছে, যেন এমন কিছু জানে যা তারা কাউকে বলতে চায় না। বিনোদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পুরো গ্রাম স্তব্ধ, আর অভিজিৎ বুঝে যায়, এই রহস্য যত গভীরে গড়াচ্ছে, ততই কাছে চলে আসছে কোনও ভয়ংকর, রক্তপিপাসু সত্য। পূর্ণিমা আসতে আর মাত্র কয়েক রাত বাকি, আর তার আগে এই শিকারিদের থামানোর উপায় খুঁজে বের করতেই হবে।
অধ্যায় ৬
শীতল বাতাসে শ্মশানের নীরবতা যেন আরও ঘনীভূত হয়েছিল যখন অভিজিৎ ও রত্না সতর্ক পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। সকালের কুয়াশা এখনও পুরোপুরি কাটেনি, আর গাছপালার ছায়া মাটিতে অদ্ভুত আকার তৈরি করছিল। বিনোদের নিখোঁজ হওয়ার খবর গ্রামে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল, আর তার ক্যামেরা খুঁজে পাওয়া ছিল একমাত্র সূত্র। ক্যামেরাটি পাওয়া গেল শ্মশানের উত্তর কোণের একটি পুরনো অশ্বত্থ গাছের গোড়ায়, কাদায় আধা ডোবা অবস্থায়। অভিজিৎ সাবধানে সেটি তুলে মুছে নিল, যেন কোনো প্রমাণ নষ্ট না হয়। রত্নার চোখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট—সে বিনোদের সাথে শেষবার কথা বলেছিল, আর তার কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছিল, যেন সে কিছু অবিশ্বাস্য জিনিস দেখেছে। ক্যামেরাটি চালু করতেই তারা দেখতে পেল রাতের অন্ধকারে বিনোদের হাত কাঁপতে কাঁপতে শ্মশানের দিকে এগোনোর দৃশ্য। বাতাসে তখন ভারী ধূপগন্ধ ভাসছিল, যা বিনোদের মাইক্রোফোনে স্পষ্ট ধরা পড়েছিল। হঠাৎ করে ফ্রেমে দেখা গেল মাটির ওপর রক্তের মোটা রেখা, যা ঘুরতে ঘুরতে একটি নিখুঁত বৃত্ত তৈরি করেছে। ক্যামেরার ফোকাস সামান্য কাঁপছিল, কিন্তু তবুও বোঝা যাচ্ছিল—এটি কোনো সাধারণ চিহ্ন নয়, বরং একটি সুচারুভাবে আঁকা তান্ত্রিক চক্র।
ভিডিওর পরের মুহূর্তগুলো আরও অস্বস্তিকর ছিল। চাঁদের ফিকে আলোয় বৃত্তের ভেতর কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে, সবার শরীরে সাদা কাপড়, মুখ ঢাকা কালো কাপড়ে। তাদের হাতে লম্বা বাঁশের মশাল, যার আগুন অস্বাভাবিকভাবে নীলাভ। বৃত্তের কেন্দ্রে কিছু রাখা ছিল, কিন্তু ক্যামেরার কোণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। তারা সবাই একসাথে এক গভীর সুরে মন্ত্রোচ্চারণ করছিল, যা শুনে শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। মন্ত্রের ধ্বনি যত তীব্র হচ্ছিল, ততই বাতাসে অদ্ভুত চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল, যেন চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে এসেছে। রত্না ভিডিও দেখে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, “এটা সেই তান্ত্রিক চক্র, যেটা মহেন্দ্রনাথের ঘরে ঝুলছিল ছোট আকারে। কিন্তু এখানে… এটা জীবন্ত।” অভিজিৎ ভিডিও থামিয়ে কয়েকবার পুনরায় চালাল, যেন কোনো পরিচিত মুখ খুঁজে পায়, কিন্তু মুখ ঢাকা থাকায় কিছু বোঝা গেল না। তবুও তার মনে হলো, তাদের চলাফেরায় গ্রাম্য কোনো বিশেষ মানুষের ভঙ্গি লুকিয়ে আছে—যেন চেনা, অথচ অচেনা।
শেষ অংশে বিনোদের ক্যামেরা আচমকা কাঁপতে শুরু করে, আর মন্ত্রোচ্চারণ থেমে গিয়ে এক ভৌতিক নীরবতা নেমে আসে। এরপর হঠাৎই ফ্রেমের এক প্রান্ত থেকে দ্রুত নড়ে আসা ছায়ামূর্তি দেখা গেল—মানুষের মতো হলেও চলার গতি ও ভঙ্গি একেবারেই অস্বাভাবিক। ক্যামেরা মাটিতে পড়ে গেল, শুধু দেখা যাচ্ছিল কাদামাটির ওপর বিনোদের হাত এবং মশালের আলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। তারপর স্ক্রিন সম্পূর্ণ অন্ধকার। অভিজিৎ ও রত্না ভিডিও বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাতাসে এখনও সেই শ্মশানের গন্ধ যেন ভাসছিল, আর তাদের মনে হচ্ছিল, বিনোদের সাথে যা ঘটেছে, তা কোনো এক অশুভ পূজারই অংশ। অভিজিৎ নীরবে বলল, “আমাদের সময় খুব কম আছে… পূর্ণিমা আসতে বেশি দেরি নেই।” রত্না জানত, এই চক্রের রহস্য উন্মোচন না করলে পরবর্তী শিকার যে কারও হতে পারে—হয়তো তার নিজেরও। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল, এবার সত্যের খোঁজে আরও গভীরে নামতে হবে, যত ভয়ঙ্করই হোক না কেন।
অধ্যায় ৭
পূর্ণিমার আগের সেই রাত যেন গোটা গ্রামকে নিঃশ্বাসহীন করে রেখেছিল। আকাশের চাঁদ তখনও সম্পূর্ণ গোল হয়নি, কিন্তু তার আলোয় চারপাশের ধূসর ছায়াগুলো যেন ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠছিল। গ্রামের প্রত্যন্ত প্রান্তে, অন্ধকারে মোড়া কাঁচা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মল্লিকা দাসীর পুরোনো, কুঁচকে যাওয়া মুখ—যেখানে ভয়, তাড়াহুড়া আর এক অদ্ভুত দৃঢ়তা মিশে ছিল। সে কাঁপা হাতে অভিজিতের দিকে এগিয়ে দিল একটি পুঁথি, যার চামড়ার মলাট ছেঁড়া, পাতাগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছে বয়সে, আর চারপাশে গন্ধ ছড়াচ্ছিল পুরনো ধূপ-অরঘ্যের মিশ্রণ। ফাটল ধরা ঠোঁটে সে শুধু বলল, “এটা তুই রাখ, কিন্তু সাবধানে… এর ভিতরে যা আছে, তা জানলে তুই আর শান্তিতে ঘুমোতে পারবি না।” অভিজিৎ বইটা হাতে নিয়ে অনুভব করল, পাতা উল্টাতেই যেন এক শীতল হাওয়া তার আঙুল বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। তন্ত্রপুঁথির লিপি ছিল প্রাচীন বাংলা ও সংস্কৃতের মিশ্রণে লেখা, যেখানে কালি লালচে দাগে পরিণত হয়েছে—যেন রক্ত দিয়েই লেখা হয়েছিল। পাতায় পাতায় ভয়াল চিত্রাঙ্কন—মানুষের কাটা মাথা, আগুনের চারপাশে নাচতে থাকা মুখোশ পরা ছায়া, আর মাটিতে আঁকা বৃত্ত, যার মাঝখানে শুয়ে আছে এক দেহ, রক্তে ভিজে। মল্লিকা দাসী ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, “অনেক বছর আগে, এই গ্রামেই এই রীতি চালু ছিল—পূর্ণিমার রাতে একজনকে উৎসর্গ করলে শ্মশানের প্রেতরা নিয়ন্ত্রণে থাকে, আর গ্রামে রোগ বা মহামারি আসে না। কিন্তু এই রীতির মূল্য দিতে হয় মানুষের প্রাণ দিয়ে।” তার গলা কাঁপছিল, চোখের মণি যেন অতীতের কোনো ভয়াবহ স্মৃতিতে আটকে গেছে। অভিজিৎ বইটা বন্ধ করল, কিন্তু বুকের ভেতর যেন এক তীব্র দপদপানি শুরু হল—একদিকে ভয়, অন্যদিকে এক অদ্ভুত কৌতূহল।
রাত যত গভীর হচ্ছিল, ততই গ্রামে নিস্তব্ধতা নেমে আসছিল। শুধু দূরে কুকুরের হাওয়া দেওয়ার শব্দ, মাঝে মাঝে কোনো জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা ভয়ার্ত চোখ, আর মাটির ঘরে চাপা কণ্ঠে মন্ত্রপাঠের আওয়াজ। অভিজিৎ জানত, এ সব কাকতালীয় নয়—কেউ না কেউ এখনও এই প্রাচীন তান্ত্রিক রীতি চালু রেখেছে, আর পূর্ণিমার আগের রাত তাদের প্রস্তুতির শেষ ধাপ। রত্না, যে দিনভর তার সঙ্গে ছিল, উদ্বেগে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “তুই বুঝতে পারছিস তো, এ বার ওরা থামবে না। যদি সত্যিই বলি হয়, তবে কাল রাতেই হবে।” অভিজিৎ পুঁথির শেষের পাতায় একটি দাগ কাটা নোট পেল—‘পূর্ণিমার আগের রাত—রক্তের বৃত্ত সম্পূর্ণ কর, শ্মশান দ্বার খুলবে’। এই বাক্যটা তার মনে গেঁথে গেল, যেন অদৃশ্য কোনো ঘন্টা মাথার ভেতর বেজে উঠছে। সে জানত, বিনোদের ফুটেজে যে রক্তের চক্র দেখা গিয়েছিল, সেটাই এই রীতির অংশ। প্রশ্ন ছিল—ওই মুখ ঢাকা সাদা পোশাকের দল কারা? তারা কি গ্রামেরই মানুষ? নাকি বাইরের কোনো গোপন সংঘ? বাতাসে যেন অদ্ভুত ভারী গন্ধ ভাসছিল—পোড়া কাঠের ধোঁয়া, মরা ফুলের গন্ধ, আর দূরে শ্মশানের দিক থেকে ভেসে আসা ধাতব শব্দ, যেন কেউ লোহার চেন টানছে।
অভিজিৎ ও রত্না সিদ্ধান্ত নিল, কাল রাতের আগেই তাদের এই রহস্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছোতে হবে, নাহলে আর কোনো সুযোগ মিলবে না। কিন্তু সমস্যাটা হল—গ্রামের মানুষদের মুখে ভয় এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, কেউ কিছু বলতে চাইছে না। হরিপদ মাঝি, যে শ্মশানের রক্ষক, আজ সকাল থেকে অদৃশ্য; তার কুঁড়েঘরের দরজা খোলা, কিন্তু ভিতরে শুধু উল্টে পড়া চেয়ার আর মেঝেতে শুকনো রক্তের দাগ। মল্লিকা দাসীও রাত গভীর হওয়ার আগেই দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, বাইরে ঝোলানো ঝাড়ফুলে লাল রঙের সুতো বাঁধা—তন্ত্রে ব্যবহৃত ‘রক্ষার বাঁধন’। পূর্ণিমার চাঁদ তখনও উঠেনি, কিন্তু আকাশে এক ধরণের অসুস্থ নীলাভ আভা ভাসছিল, যেন আগাম সংকেত দিচ্ছে। অভিজিৎ বইয়ের পাতায় আঙুল বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল, “যদি আমরা কাল রাতের আগেই ওদের হাত থেকে কাউকে বাঁচাতে না পারি, তবে এই চক্র চলতেই থাকবে…” দূরে, শ্মশানের দিক থেকে হঠাৎ এক দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ ভেসে এল—যা মানুষ বা পশুর নয়, বরং এক মৃতপ্রাণের ক্রন্দন—যা শুনে রত্নার চোখে আতঙ্কের ছায়া আরও ঘন হল, আর অভিজিতের হাতে ধরা পুঁথি যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
অধ্যায় ৮
পূর্ণিমার সেই রাতের আগে গ্রাম যেন নিশ্বাস বন্ধ করে বসে ছিল। বাতাসে হালকা শীত আর সোঁদা গন্ধে ভরে উঠেছিল চারপাশ, যেন মাটি নিজেই অজানা আতঙ্কে কাঁপছে। অভিজিৎ, রত্না এবং সাত-আটজন সাহসী গ্রামবাসী — যাদের মুখে দৃঢ়তার ছাপ থাকলেও চোখে লুকোনো ভয়, তারা সন্ধ্যার আগেই শ্মশানের দক্ষিণ দিকের পুরোনো বটগাছের আড়ালে আশ্রয় নেয়। হাতে শুধুই কিছু টর্চ, বাঁশের লাঠি আর একটি পুরনো ক্যামেরা। রত্নার গলায় ঝোলানো তাবিজটিতে চাঁদের আলো পড়ে যেন এক অদ্ভুত আভা ছড়াচ্ছিল, আর অভিজিৎ বারবার তন্ত্রপুঁথির পাতাগুলো আঁকড়ে ধরে পড়ছিল, যেন সেই শব্দগুলো তাদের সাহস জোগাচ্ছে। রাত গভীর হতে হতে শ্মশানজুড়ে কুয়াশা নেমে আসে, আগুনের চিতা নিভে গিয়ে শুধু ধোঁয়ার দমকা গন্ধ ভেসে বেড়ায়। হঠাৎ, দূরে কোথাও থেকে এক ভারী ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসে, যার শব্দ ক্রমশ কাছে আসতে থাকে। গ্রামবাসীরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, কারও মুখে কোনও কথা নেই, শুধু চাপা নিঃশ্বাস। ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে ঢোলের ধুপধুপ শব্দ মিলতে শুরু করে, আর সেই তালে যেন বাতাস কেঁপে ওঠে। অভিজিৎ বুঝতে পারে—কালরাত্রির ডাক শুরু হয়ে গেছে।
মুহূর্তের মধ্যেই কুয়াশার ভেতর থেকে কালো ছায়াগুলো ভেসে ওঠে। প্রথমে দেখা যায় কয়েকটি লম্বা, ঢেকে রাখা মশাল, যার শিখা লালচে-হলুদ নয়—বরং এক ধরনের অস্বাভাবিক নীলচে আলো ছড়াচ্ছিল। তারপর সেই মশালের আভায় ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয় কালো পোশাকে ঢাকা মুখোশধারী একদল লোক। তাদের মাথায় হুড টানা, আর মুখে অদ্ভুত কাঠের মুখোশ, যেগুলোর চোখের ফাঁক থেকে যেন এক শীতল দৃষ্টি বেরিয়ে আসছিল। সবাই এক বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে শ্মশানের মাঝখানে একটি চক্র তৈরি করছিল, আর সেই চক্রের মাঝখানে রাখা ছিল একটি বড়ো পাথরের বেদি, যার উপর ছোপ ছোপ লাল দাগ শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। তখনই কুয়াশার আড়াল ভেদ করে মহেন্দ্রনাথকে দেখা যায়—তার গায়ে কালো রেশমের পোশাক, মাথায় একটি ত্রিশূল আকৃতির মুকুট, আর গলায় ঝোলানো নানারকম হাড়ের মালা। তার হাতে একটি রক্তমাখা খড়গ, যা পূর্ণিমার আলোয় ঠাণ্ডা ঝিলিক দিচ্ছিল। সে বৃত্তের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল, যার শব্দ এত গভীর যে মনে হচ্ছিল মাটি কেঁপে উঠছে। গ্রামবাসীদের বুক ধকধক করতে লাগল, আর রত্না অভিজিৎ-এর বাহু চেপে ধরল, যেন এই শব্দ তাকে গিলে ফেলবে।
বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মুখোশধারীরা ধীরে ধীরে বৃত্তের মধ্যে প্রবেশ করতে লাগল, প্রত্যেকে হাতে ধরা ছিল সাদা কাপড়ে মোড়া কিছু বস্তু, যা দেখে অভিজিৎ-এর শরীরে শীতল স্রোত বয়ে গেল—ওগুলো মানুষের হাড়। ঢোলের গতি বাড়তে থাকল, ঘণ্টাধ্বনি তীব্র হয়ে উঠল, আর মহেন্দ্রনাথের মন্ত্রপাঠ একপ্রকার চিৎকারে রূপ নিল। হঠাৎ, এক মুখোশধারী লোক সেই পাথরের বেদির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে একটি বড়ো পিতলের পাত্র থেকে লাল তরল ছিটিয়ে দিল চারপাশে, যা মাটিতে পড়েই এক ধরনের ধোঁয়া উঠতে লাগল। রত্না ফিসফিস করে বলল, “এটা রক্ত… মানবরক্ত…”—তার কণ্ঠ কাঁপছিল। অভিজিৎ তড়িঘড়ি ক্যামেরা চালু করল, কিন্তু তার আঙুল থরথর করছিল। বৃত্ত সম্পূর্ণ হলে মহেন্দ্রনাথ আকাশের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘ চিৎকার দিল, যা যেন শ্মশান, গাছ, মাটি—সবকিছুর ভেতরে ঢুকে গেল। হঠাৎ, কুয়াশার ভেতর থেকে কিছু অদৃশ্য সত্তার উপস্থিতি অনুভূত হতে লাগল, বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে গেল এতটাই যে নিশ্বাস ফেলতেও কষ্ট হচ্ছিল। গ্রামবাসীরা বুঝে গেল—আজ রাত শুধু এক মানববলি নয়, তার সঙ্গে কিছু এমন ঘটতে যাচ্ছে যা এই গ্রাম চিরকাল মনে রাখবে… যদি কেউ বেঁচে থাকে তা দেখার জন্য।
অধ্যায় ৯
শ্মশানের অন্ধকারের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত শীতল বাতাস বইছিল, যেন মাটির গভীর থেকে মৃতদের দীর্ঘশ্বাস উঠে আসছে। আগুনের ম্লান আলোয় ধোঁয়ার সর্পিল ঘূর্ণি নাচছিল, আর তার মাঝেই দেখা গেল—দু’জন মুখোশধারী লোক কাঁধ ধরে এক যুবককে টেনে আনছে, যার মুখ কাপড়ে বাঁধা, চোখে আতঙ্কের ছাপ। রক্তের চক্রের কেন্দ্রে একটি পাথরের বেদি রাখা, চারপাশে সাজানো কাঁসার থালা, তেলের প্রদীপ, শুকনো ফুল আর লাল গুঁড়ো। মহেন্দ্রনাথ সেই বেদির সামনে দাঁড়িয়ে, কালো পোশাকে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে এক লম্বা ছুরি যার ফলা আগুনের আলোয় লালচে ঝলক দিচ্ছিল। চারপাশে মুখোশধারীরা মন্ত্র পড়ছে—গভীর, গম্ভীর, ভয়ানক। শব্দ যেন শ্মশানের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে গিয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল। অভিজিৎ ও রত্না, ঝোপের আড়াল থেকে সব দেখছিল, বুকের ভেতর ধকধক ধ্বনি যেন মন্ত্রের তালে তালে বাড়ছিল। রক্তের গন্ধ, ধোঁয়ার কটু গন্ধ আর সেই প্রাচীন মন্ত্রের ধ্বনি মিলেমিশে এক অদৃশ্য অন্ধকার শক্তি তৈরি করছিল, যা যেন ধীরে ধীরে পুরো শ্মশানকে গ্রাস করছে।
হঠাৎই যুবকটিকে বেদির ওপর ফেলে দেওয়া হলো, আর দু’জন মুখোশধারী তার হাত-পা শক্ত করে বেঁধে ফেলল। মহেন্দ্রনাথ চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ তুলল, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে কথা বলছে। তার গলার আওয়াজ হঠাৎ কর্কশ হয়ে উঠল, ছুরির ফলা উঁচু করে সে মন্ত্রপাঠে তীব্রতা আনল। সেই মুহূর্তেই অভিজিৎ আর রত্না আর সহ্য করতে পারল না—ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ল ছায়া থেকে, হাতে বাঁশ, লাঠি, যা পেয়েছে। পিছন থেকে আরও কয়েকজন গ্রামবাসী দৌড়ে এল, মন্ত্রপাঠের ভেতর লড়াইয়ের শব্দ ঢুকে পড়ল। মুখোশধারীরা তেড়ে এল, ছুরি আর লাঠির আঘাতে বাতাস ছিঁড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—যখনই ওরা লড়াই শুরু করল, চারপাশ যেন আরও অন্ধকার হয়ে গেল, আগুন নিভে আসতে লাগল, বাতাসে ঠান্ডা ছায়া ঘনিয়ে এল। মন্ত্রের শব্দ যেন শূন্য থেকে আরও জোরে ফিরে আসছিল, আর সেই অদৃশ্য চাপের তলায় অভিজিৎ ও রত্না লড়াই করেও দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। যুবকটি বেদির ওপর ছটফট করছিল, কিন্তু দড়ি নড়ছিল না, যেন ওটা কেবল দড়ি নয়—কোনো অদৃশ্য বাঁধন।
ঠিক তখনই, দূর থেকে শোনা গেল শঙ্খের গম্ভীর ধ্বনি—একটা দীর্ঘ, কম্পমান, প্রাণকাঁপানো আওয়াজ, যা যেন রাতের বুক চিরে বেরিয়ে এলো। সবাই চমকে উঠল—মন্ত্রপাঠের তাল কেটে গেল, মহেন্দ্রনাথের কণ্ঠ থেমে গেল, মুখোশধারীরা এক মুহূর্তের জন্য দুলে উঠল। শঙ্খ বাজাচ্ছিল হরিপদ মাঝি—তার চোখে তীব্র জেদ, মুখে শ্মশানের ধুলো, কিন্তু হাতে সেই শঙ্খ, যা মল্লিকা দাসীর দেওয়া তন্ত্রপুঁথিতে “কালরাত্রি ভঙ্গের শঙ্খ” হিসেবে উল্লেখ ছিল। শঙ্খের আওয়াজে চারপাশের অন্ধকার যেন পিছিয়ে যেতে লাগল, বাতাসের ভার কমতে লাগল, আর দড়ি হঠাৎ ঢিলে হয়ে যুবকটি গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। অভিজিৎ দ্রুত তাকে টেনে সরিয়ে নিল, রত্না শেষ শক্তি দিয়ে একজন মুখোশধারীকে লাঠি মেরে ফেলে দিল। মহেন্দ্রনাথ দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল, কিন্তু এবার তার চোখে ভয় ফুটে উঠেছে। শঙ্খের ধ্বনি অবিরত বাজছিল, আর সেই সাথে রাতের ভয়াবহতা ভেঙে যেতে লাগল—যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি বাধ্য হচ্ছে পশ্চাদপসরণে, আর মৃত্যুর বেদি আজ আর রক্ত দেখবে না।
অধ্যায় ১০
পুলিশের সাইরেনের শব্দে যেন রাতের ঘন অন্ধকার চিরে গিয়ে শ্মশানের দিকে ধেয়ে আসে আলো। টর্চের ঝলকানি, বন্দুকধারী কনস্টেবলদের ছুটে আসা, আর একসঙ্গে চিৎকার—সব মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কের রঙ বদলে যায় শ্মশানের প্রান্তরে। মহেন্দ্রনাথ কালো পোশাকেই দাঁড়িয়ে ছিল, মুখে এক অদ্ভুত নিশ্চুপ হাসি, যেন সে আগেই জানত এই পরিণতি অবধারিত। তার চারপাশের মুখোশধারী লোকেরা হঠাৎ চমকে ওঠে, কেউ পালানোর চেষ্টা করে, কেউ আবার অদ্ভুত ভঙ্গিতে মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকে, যেন শেষ মুহূর্তেও কোনও গোপন শক্তিকে আহ্বান করার মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু পুলিশ দ্রুত ঘিরে ফেলে সবাইকে, হাতকড়া পড়তে দেরি হয় না। রত্না তখনও শ্বাস নেবার চেষ্টা করছে, হাতে ধরা লাঠিটা কাঁপছে; অভিজিৎ তার পাশে দাঁড়িয়ে, চোখ স্থির মহেন্দ্রনাথের দিকে। “তুমি জানো না তুমি কি থামিয়ে দিলে,” মহেন্দ্রনাথ একবার শুধু বলল, কণ্ঠস্বর এত ঠান্ডা যে শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে আসে। হরিপদ মাঝি তখনও দূরে দাঁড়িয়ে, হাতে তার সেই শঙ্খ, মুখে ক্লান্ত কিন্তু সন্তুষ্ট হাসি—যেন সে জানে এই একটিমাত্র শব্দই রাতের ভয়ঙ্কর জাদুকে ভেঙে দিয়েছে।
পরদিন ভোরের আলো যখন ধীরে ধীরে গঙ্গার ওপরে নেমে আসে, শ্মশান তখন আবার নির্জন। পুলিশ নিয়ে গেছে মহেন্দ্রনাথ ও তার গোষ্ঠীর সবাইকে, তদন্তে উঠে এসেছে বহু পুরনো সত্য—এই দলটি একটি নিষিদ্ধ তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অংশ, যারা বিশ্বাস করত মানববলিই তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধির পথ। তাদের কাছে পাওয়া গেছে অজস্র তান্ত্রিক সামগ্রী, রক্তে দাগ লাগা ছুরিসহ একাধিক আচার-সংক্রান্ত পুঁথি, যেখানে লেখা ছিল বহু আগে এই শ্মশানেই অজস্র বলি দেওয়া হয়েছে। গ্রামের মানুষ ভিড় করে এসেছে দূর থেকে, কেউ দেখছে, কেউ মাথা নাড়ছে, কেউ আবার ভয়ে চুপচাপ সরে যাচ্ছে। মল্লিকা দাসী পুলিশের জেরায় সব খুলে বলেছে, কেমন করে মহেন্দ্রনাথ তার প্রপিতামহের তন্ত্রপুঁথি থেকে শেখা মন্ত্রগুলো আবার চালু করার চেষ্টা করছিল, আর কেমন করে এই পূর্ণিমার রাতে সব শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। তবু অভিজিতের মনে প্রশ্ন—যে গোপন পথ ধরে তারা শ্মশানে ঢুকেছিল, তার গভীরের দিকে যে টান অনুভব করছিল সে, সেটা কি শুধু কাকতালীয়? কেন মহেন্দ্রনাথ গ্রেপ্তারের মুহূর্তে বলেছিল “সব শেষ হয়নি”?
রাত নামার পর শ্মশান আবার তার প্রাচীন নীরবতায় ঢেকে যায়। বাতাসে আগুনে পোড়া কাঠের হালকা গন্ধ, আর দূরে গঙ্গার স্রোতের মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে যেন রাতটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু অভিজিৎ জানে, নীরবতার আড়ালে অনেক সময় সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে থাকে। সে দাঁড়িয়ে থাকে চিতার ছাইয়ের কাছে, রত্না পাশে এসে ধীরে বলে, “সব শেষ, না?” অভিজিৎ তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে, তারপর খুব নিচু গলায় বলে, “শেষ নয়… শুধু বিরতি।” রত্না তার চোখে সেই অনিশ্চিত দৃষ্টি দেখে বুঝতে পারে—এই শ্মশান হয়তো আবার ডেকে নেবে তাদের, কোনও অজানা রাতে, কোনও নতুন পূর্ণিমায়। দূরে, ঘন অন্ধকারের ভেতর, যেন হালকা এক ফিসফিস শোনা যায়—কারও ডাক, নাকি বাতাসের শব্দ, বোঝা যায় না। আর অভিজিৎ অনুভব করে, শ্মশানের এই শেষ প্রহর হয়তো আসলে কোনও কিছুর শুরু।

1000052432.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *