অমিয় মল্লিক
১
ভোরের ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন আকাশের গাঢ় নীল ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে রঙ নেয় কমলা-সোনালি আভা, গ্রামের মানুষদের ঘুম যেন এক অদৃশ্য শক্তি ভেঙে দেয়। একে একে কুঁড়েঘরের দরজা খুলে যায়, উঠোনে আলো ফোটার আগেই গৃহস্থরা চমকে ওঠে—দূর থেকে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত সুর, এক চণ্ডীপাঠের গম্ভীর ধ্বনি। মাটির ভেতর থেকে যেন শিকড় টেনে আনে সেই শব্দ, আর সকালের শিউলি গাছের ফুলের মতো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামবাসী জানে, সেই বাড়িটা বহু বছর ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে, তাতে আর কেউ থাকে না। তবু প্রতি মহালয়ার ভোরেই শোনা যায় এই পাঠ। বৃদ্ধারা চোখে আতঙ্ক মাখে, কিশোররা সাহস দেখাতে গিয়ে ফিসফিস করে বলে—“ওই সুর পুরোহিতের আত্মা ছাড়া অন্য কারো হতে পারে না।” বাতাসে গা ছমছমে এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে, মনে হয় অদৃশ্য কোনো সত্তা গ্রামটিকে আপন করে নিয়েছে।
কিছু মানুষ ভোরের অন্ধকার কাটতে না কাটতেই উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়, মনে হয় সুরটা দিগন্ত থেকে আসছে। কেউ আবার বলে, “ওই ভাঙা বাড়ির দিক থেকে ভেসে আসছে স্পষ্ট।” কৌতূহল আর ভয়ের মিশ্রণ সবাইকে টেনে নেয় সেই দিকের দিকে, যদিও কেউ একবারও সাহস করে ভেতরে পা রাখে না। দাওয়ায় বসে থাকা প্রবীণরা সাদা চুলে কাঁপা হাত তুলে প্রার্থনা করে—“যেন আত্মা শান্তি পায়।” কিন্তু একই সঙ্গে তাদের গলায় ভয়ের সুর, কারণ তারা জানে এক সময় সেই বাড়িতে সত্যিই পূজা হতো, আর রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের মতো এক পুরোহিত ছিলেন, যিনি নিজের কণ্ঠে সমগ্র গ্রামকে ভোরে জাগিয়ে তুলতেন। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে পূজা বন্ধ, বাড়ি ভেঙে গিয়েছে, কিন্তু কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি যেন থেকে গেছে আকাশে-বাতাসে, গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে অবিচ্ছেদ্য রহস্য হিসেবে। ভোরের কাক ডাক, ধোঁয়ায় ভরা রান্নাঘরের গন্ধ, আর এই অদৃশ্য পাঠের ধ্বনি মিলেমিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি করে—যা ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে এক গভীর শ্রদ্ধার অনুভূতিও জাগায়।
গ্রামটিকে ঘিরে থাকা অরণ্যের ভেতর দিয়ে হালকা কুয়াশা নেমে আসে, সেই কুয়াশার ভেতরেই যেন সুরের ঢেউ ভেসে চলে। শিউলি ফুল ঝরে পড়া পথে শিশুরা বিস্ময়ে চোখ মেলে দাঁড়ায়, কেউ কেউ কান চেপে ধরে দৌড়ে যায় বাড়ির ভেতরে, আবার কেউ নিঃশব্দে শোনে সেই অদ্ভুত সুর। মহিলারা কলসি হাতে পুকুরে জল তুলতে গিয়ে হাঁটতে থেমে যায়, কারণ তাদের বুকের ভেতরেও সেই সুর এক ধরনের শিহরণ তোলে। প্রত্যেকেই জানে, বাড়িটা বহুদিনের পরিত্যক্ত, তবুও সেই শব্দে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা, যা উপেক্ষা করা যায় না। ভোরের সোনালি আলো বাড়ির ভাঙা দেওয়ালে পড়তে না পড়তেই গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এক অঘোষিত গুজব—“পুরোহিতের আত্মা এখনও মুক্ত হয়নি।” কারও মনে ভয়, কারও মনে বিশ্বাস, আবার কারও মনে কৌতূহল—কিন্তু সবাই জানে এই ভোরের সুর একদিন তাদের ভাগ্যের দিকটাই বদলে দেবে। যেন অদৃশ্য এক হাত গ্রামের প্রতিটি প্রাণকে স্মরণ করিয়ে দেয়, মৃত্যুতেও কিছু সুর থেকে যায়, আর সেই সুরের ধ্বনি হয়তো এক অসমাপ্ত কাহিনির সূচনা।
২
শহরের কোলাহল থেকে কিছুদিনের ছুটি কাটাতে অরিত্র এসেছিল মামাবাড়ি, এই প্রত্যন্ত গ্রামে। ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করা ছেলেটা বই আর লোককথার মধ্যে রহস্য খুঁজতে ভালোবাসে, কিন্তু সবসময় যুক্তিবাদী চোখে জিনিসগুলোকে বিচার করার অভ্যেস তার রক্তে মিশে আছে। মামাতো ভাই-বোনেরা তাকে গ্রামের পুরোনো গল্প শোনাত, বিশেষত মহালয়ার ভোরের সুরের কথা। প্রথমে শুনে অরিত্র হাসি চেপে বলেছিল—“আরে, এটা কারও সাজানো ব্যাপার, হয়তো কেউ মজা করতে বা ভয় দেখাতে এসব করে।” তার কাছে ভৌতিক ব্যাপারগুলো নিছক অন্ধবিশ্বাস, যা মানুষের ভয়কে ব্যবহার করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু যখন গভীর রাতে দাওয়ায় বসে চারপাশের গ্রামের নীরবতা টের পেল, আর চারপাশে অদ্ভুত গাম্ভীর্য ছড়িয়ে পড়ল, তখন মনে হল—হয়তো এই কাহিনির ভেতরে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে। ইতিহাস পড়া মানুষ হিসেবে তার কৌতূহল বেড়ে গেল, কারণ গ্রামের মানুষগুলো গল্প বলার সময় যে ভয়ের ছায়া চোখে নিয়ে কথা বলে, তা নিছক গুজব বা নাটক নয়।
অরিত্রর প্রথম ভোরের অভিজ্ঞতা যেন তার বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিল। মহালয়ার দিন, আকাশে তখনো আলোর আভা ফোটেনি, কিন্তু দূর থেকে হঠাৎ শোনা গেল গম্ভীর এক চণ্ডীপাঠ। ঘুম ভেঙে অরিত্রর মনে হল কেউ যেন বাড়ির পাশেই পাঠ করছে। সে তাড়াহুড়া করে উঠোনে এসে দাঁড়াল। মামাবাড়ির সবার চোখে তখন বিস্ময়, ভয়ে মেশানো আতঙ্ক। অরিত্র কান খাড়া করে শুনল—সুরটা একেবারে স্পষ্ট, যেন বাতাসে ভেসে আসছে সোজা ভাঙা বাড়ির দিক থেকে। সে নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই যে এত বছর ধরে ভাঙাচোরা পড়ে থাকা জায়গায় কারও বসবাস নেই, অথচ সেখানে থেকে ভেসে আসছে এত স্পষ্ট সুর—বিজ্ঞান বা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। গ্রামবাসীরা হাত জোড় করে প্রণাম করছিল, কেউ কেউ চুপচাপ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করছিল। অরিত্রর ভেতরে ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে এক অদম্য কৌতূহল জন্ম নিল। সে অনুভব করল, এই অভিজ্ঞতা কেবল শোনা কাহিনি নয়, বরং চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এক অলৌকিক ঘটনা। তার মনের ভেতরে কাঁপুনি ছড়িয়ে গেল, কিন্তু যুক্তিবাদী মন বলল—“না, অবশ্যই এর পিছনে কোনো ব্যাখ্যা আছে।”
তবু সেদিন সকালটা তার ভেতরের সমস্ত আত্মবিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। শহরে থেকে যতই বিজ্ঞানের যুক্তি শিখে আসুক, গ্রামে দাঁড়িয়ে এই অভিজ্ঞতা তার বুকের গভীরে শিহরণ ছড়িয়ে দিয়েছিল। মামাতো বোন শিউলি তাকে বলল, “দেখলে তো? আমরা মিথ্যে বলিনি। প্রতি মহালয়াতেই এই হয়।” অরিত্রর চোখে ততক্ষণে অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা। সে বুঝতে পারল, এই রহস্যের মধ্যে প্রবেশ না করলে তার ভেতরের কৌতূহল কখনও শান্ত হবে না। যদিও গ্রামের প্রবীণরা বারবার সতর্ক করল—“ওখানে যাস না বাপু, ও বাড়িতে এখনো পুরোহিতের আত্মা বন্দি।” অরিত্র কেবল মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, “যতই ভয়ঙ্কর হোক, আমি নিজে না দেখে শান্তি পাব না।” তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস থাকলেও হৃদয়ের গভীরে যে একটা অদ্ভুত ভয়ের তরঙ্গ তাকে নাড়া দিয়ে গেছে, তা অরিত্র নিজেও অস্বীকার করতে পারছিল না। যুক্তি আর ভয়ের এই দ্বন্দ্বই তাকে আস্তে আস্তে টেনে নিল ভাঙা বাড়ির দিকের পথে, যেখানে অচিরেই তাকে অপেক্ষা করছিল এক অদ্ভুত বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়ার যাত্রা।
৩
অরিত্রর দিদি শিবানী ছোট থেকেই গ্রামে থেকেছে, আর তাই তার শৈশবের প্রতিটি স্মৃতি জড়িয়ে আছে সেই পরিত্যক্ত বাড়ির ভৌতিক ছায়ার সঙ্গে। স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে সে অনেককিছু বুঝে, তবু মনে গভীরে এক অদৃশ্য ভয় বাসা বেঁধে আছে। ছোটবেলায় সে দেখেছিল মহালয়ার ভোরে তার ঠাকুমা চোখ মুছে প্রণাম করছেন, আর গ্রামের মানুষ আতঙ্কে ভেঙে পড়েছে সেই সুর শোনার পর। শিবানী তখনো বুঝতে পারেনি কেন সবাই ভীত, কিন্তু বছর কেটে যাওয়ার পর সে টের পেয়েছিল, পুরোহিতের অসমাপ্ত পূজা আর অকালমৃত্যুর কাহিনি কেবল গুজব নয়, মানুষের বিশ্বাসে গভীরভাবে গেঁথে থাকা এক আতঙ্ক। অরিত্র শহর থেকে আসার পর, ভোরে সেও সেই সুর শুনে রোমাঞ্চিত হয়েছিল। কিন্তু অরিত্রর চেহারার কৌতূহল ও সাহস দেখে শিবানীর বুক কেঁপে ওঠে। সে জানত, ভাই যদি একবার ওই বাড়ির দিকে পা বাড়ায়, তবে হয়তো এমন কিছু ঘটবে যা তাদের পুরো পরিবারকে বিপদে ফেলতে পারে। তাই শিবানী কঠোর স্বরে বলল—“অরিত্র, আমার কথা শোনো, তুমি যতই শহরের যুক্তি শিখে এসো, এখানে সেগুলো কাজ করবে না। ও বাড়ি থেকে দূরে থাকাই ভালো।”
শিবানীর সতর্কতায় অরিত্র প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দিদির চোখের গাম্ভীর্য ও ভয় তাকে থমকে দিল। শিবানী রাতে আলো-আঁধারির মধ্যে দাওয়ায় বসে ভাইকে শোনাল সেই কাহিনি, যা সে ঠাকুমার মুখে শুনেছিল। বহু বছর আগে, রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য নামের সেই পুরোহিত প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ করবেন। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলায় এক মহালয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। অসম্পূর্ণ প্রতিজ্ঞার বাঁধনে তাঁর আত্মা মুক্তি পায়নি। গ্রামবাসীরা বলে, সেই সুরই প্রতি বছর শোনা যায়, যেন তিনি আজও তাঁর অসমাপ্ত কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। শিবানীর কণ্ঠে ভয়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত বেদনা মিশে ছিল। “তুমি বুঝতে পারছো না অরিত্র, আমরা শুধু ভয় পাচ্ছি না, আমরা সম্মানও করি সেই আত্মাকে। আমাদের বিশ্বাস, ও বাড়ির ভেতরে কেউ গেলে আত্মা অশান্ত হয়ে ওঠে।” দিদির চোখে অশ্রু চিকচিক করছিল, মনে হচ্ছিল সে যেন অতীতের প্রতিটি ঘটনা আবার চোখের সামনে দেখছে।
অরিত্র দিদির আবেগ বুঝলেও নিজের কৌতূহলকে দমন করতে পারল না। তার মনে হচ্ছিল, শিবানী ভয় পেয়েই এসব বলছে। কিন্তু শিবানীর কণ্ঠে যে দৃঢ়তা ছিল, তা নিছক ভয় বলে মনে হচ্ছিল না, বরং পরিবারের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর সুরক্ষার আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া সতর্কবার্তা। শিবানী বলল, “তুমি হয়তো ভাবছো আমি তোমাকে আটকে রাখছি, কিন্তু আমি চাই না তুমি এমন কোনো শক্তির মুখোমুখি হও যা বোঝার বাইরে। তুমি তো আমাদের একমাত্র আশা, আমাদের পরিবারের গর্ব। তোমার কোনো ক্ষতি হলে আমি বাঁচব না।” সেই কথাগুলো অরিত্রর বুক কাঁপিয়ে দিল। তবু ভেতরে ভেতরে সে টের পেল, ভয় আর রহস্যের এই টানাপোড়েনে সে ইতিমধ্যেই জড়িয়ে পড়েছে। শিবানী যতই তাকে আটকে রাখতে চায়, তার মনের ভেতরে এক প্রবল আকর্ষণ কাজ করছে। কিন্তু দিদির চোখে জল দেখে সে কেবল মৃদু স্বরে বলল, “আমি কিছুই করব না দিদি, চিন্তা কোরো না।” যদিও সেই আশ্বাস কেবল দিদিকে শান্ত করার জন্য, কারণ অরিত্র জানত—যতই ভয় থাকুক, ভোরের সুরের সত্য খুঁজে বের করার টান থেকে সে কোনোদিনই নিজেকে আটকাতে পারবে না।
৪
গ্রামের প্রবীণ হরিপদ কাকা যেন হাঁটতে–চলতে এক জীবন্ত ইতিহাস। তার সাদা চুল, কাঁপা হাত আর চোখের ভাঁজে জমে থাকা স্মৃতি যেন গ্রামটার এক অমূল্য সম্পদ। প্রতি সন্ধ্যায় গ্রামের মানুষজন চৌপালের বটগাছের নিচে জড়ো হয়, আর হরিপদ কাকা নিজের ভাঙা কণ্ঠে গল্প বলতে শুরু করেন। সেদিনও সবাই বসেছিল মাটির মঞ্চে, কেরোসিন লণ্ঠনের আলোয় তৈরি হয়েছিল রহস্যময় আবহ। অরিত্র শিবানীর পাশেই বসেছিল, মনে মনে ভেবেছিল—আজ হয়তো সেই পুরোহিতের আসল কাহিনি জানা যাবে। হরিপদ কাকা একদৃষ্টিতে লণ্ঠনের আলোয় তাকিয়ে যেন অতীতে ডুবে গেলেন। কণ্ঠে ভারী সুর এনে বললেন—“অনেক বছর আগের কথা, তখন আমি তোমাদের মতোই যুবক। এই গ্রামটা তখন পূজার জন্য দূরদূরান্তে বিখ্যাত ছিল। আর সেই সুনামের কারণ ছিলেন রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য।”
“তিনি ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত ব্রাহ্মণ, মহালয়ার ভোরে তাঁর চণ্ডীপাঠের সুরে গোটা গ্রাম জেগে উঠত। বিশ্বাস করো, সেই কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যা শুনলেই শরীরে কাঁটা দিত। গ্রামের প্রতিটি মানুষ ভোরের অপেক্ষায় থাকত, যেন দেবী নিজে এসে আশীর্বাদ করছেন। কিন্তু হায়, মানুষের জীবনে ভাগ্যের মতো অদ্ভুত কিছু নেই। এক বছর মহালয়ার আগের রাতেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন ভট্টাচার্য মশাই। অনেকে বলেছিল, শ্বাসকষ্টে মারা গিয়েছিলেন, আবার কারও দাবি তিনি পূজার আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—‘আমি এই পূজা শেষ করতে পারব না।’ মহালয়ার দিন ভোরে তাঁর মৃত্যু ঘটে, আর অসম্পূর্ণ থেকে যায় সেই প্রতিজ্ঞা।” হরিপদ কাকার চোখে অদ্ভুত এক ভয়ের ছায়া ভেসে উঠল। সবাই নিঃশব্দে শুনছিল, কেবল বাতাসের শব্দ আর পাতার খসখসানি শুনে মনে হচ্ছিল চারপাশে কিছু অদৃশ্য উপস্থিত আছে।
হরিপদ কাকা গলা নিচু করে বললেন—“তারপর থেকে প্রতি মহালয়ার ভোরে আমরা সেই একই সুর শুনি। কেউ বলেন, এটা ভট্টাচার্য মশাইয়ের অদম্য সাধনা, কেউ বলেন এটা তাঁর আত্মার শাপ। অসমাপ্ত পূজা তাঁর আত্মাকে মুক্তি দেয়নি। অনেকে সাহস করে বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিল, কিন্তু কেউ বেশি দূর এগোতে পারেনি—কখনো ঠান্ডা বাতাসে জ্ঞান হারিয়েছে, কখনো ভাঙা প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে শুনেছে কান্নার শব্দ। আমি নিজে সেই বাড়ির সামনে গিয়েছিলাম যৌবনে। জানো, কী হয়েছিল? মনে হয়েছিল কেউ কানে ফিসফিস করে বলছে—‘আমার কাজ শেষ করো।’ সেই ভয় আমাকে আজও তাড়া করে বেড়ায়।” কথাগুলো শুনে উপস্থিত সকলের গা শিউরে উঠল। অরিত্রর ভেতরেও এক অদ্ভুত স্রোত বয়ে গেল। যুক্তিবাদী মন বারবার বলছিল—এ সব কুসংস্কার, কিন্তু হরিপদ কাকার চোখের ভয় আর কণ্ঠের কাঁপুনি যেন বলে দিচ্ছিল, এই কাহিনির ভিতরে অস্বীকার করা যায় না এমন সত্য লুকিয়ে আছে। গ্রামের নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় সেই গল্প শেষ হলে লণ্ঠনের আলো কেঁপে উঠল, আর সবাই নিঃশব্দে ঘরে ফিরে গেল—যেন প্রত্যেকের বুকেই বন্দি হয়ে রইল সেই পুরোহিতের অসমাপ্ত সুরের কান্না।
৫
গ্রামের গলিঘুঁজির ছায়ার মধ্যে মীনা ছিল যেন এক রোদঝলমলে কণা। বয়স দশের বেশি নয়, কিন্তু তার চোখে সবসময় কৌতূহলের দীপ্তি খেলে বেড়ায়। অন্য বাচ্চারা যখন খেলাধুলা বা দুষ্টুমিতে মেতে থাকে, মীনা তখন চুপচাপ চারপাশের ঘটনা লক্ষ্য করে। সে প্রায়ই একা একাই পুকুরপাড়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে। এক বিকেলে অরিত্র স্কুলঘর থেকে ফেরার পথে মীনাকে পুকুরঘাটে বসে থাকতে দেখল। অরিত্রর মনে হচ্ছিল, মীনাই হয়তো এমন কাউকে, যে ভয়কে তুচ্ছ করে সেই পরিত্যক্ত বাড়ি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারে। তাই সে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল—“মীনা, তুই কি কখনো ও বাড়ির কাছে গেছিস?” শিশুটি প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিল, কিন্তু তারপর চুপ করে বসে থেকে ফিসফিস করে বলল—“আমি অনেকবার গেছি। আমি তো ভয় পাই না।” অরিত্রর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মীনার সরল স্বীকারোক্তি তাকে একই সঙ্গে অবাক ও কৌতূহলী করে তুলল।
মীনা তার নিষ্পাপ কণ্ঠে বলতে শুরু করল সেই সব অভিজ্ঞতা, যা শুনে অরিত্রর বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। “প্রতি মহালয়ার ভোরে, সবাই ঘুমিয়ে থাকে। আমি একা একা বাইরে বেরোই, আর ওই সুর শুনতে পাই। অনেক সময় মনে হয় যেন সুরটা আমার নাম ধরে ডাকছে। আর জানো, একদিন আমি বাড়িটার জানলার পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম—ভেতরে এক লম্বা ছায়া এদিক-ওদিক হাঁটছে।” মীনার চোখ চকচক করছিল ভয়ের বদলে এক অদ্ভুত আনন্দে। শিশুর মতো সরলতায় সে জানাচ্ছিল যে তার কাছে এটা ভয়ের বিষয় নয়, বরং বিস্ময়ের এক অভিজ্ঞতা। “আমি ভয় পাই না দাদা,” মীনা মৃদু হেসে বলল, “ও তো আমাদের পুরোহিত ঠাকুর। তিনি খারাপ কিছু করবেন না।” কথাগুলো শুনে অরিত্রর মনে হল, এই শিশুর মুখের সাদামাটা কথা হয়তো এমন সত্যকে স্পর্শ করছে, যা বড়রা ভয় পেয়ে স্বীকার করতে পারে না। যুক্তিবাদী মন যতই বলুক এসব কল্পনা, মীনার চোখের আন্তরিকতা দেখে মনে হচ্ছিল, সে মিথ্যে বলছে না।
অরিত্র সেই রাতে বারবার মীনার কথাগুলো মনে করছিল। ছোট্ট মেয়েটির নিষ্পাপ চোখে এমন দৃঢ়তা, এমন বিশ্বাস, যা তার যুক্তিবাদী মনকে নড়িয়ে দিয়েছিল। শিশুরা অনেক সময় যেটা দেখে, বড়রা তা ভয় বা অবিশ্বাসে অস্বীকার করে—এই ভাবনা অরিত্রর মনে গেঁথে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল, ঘটনাটা নিছক গুজব বা অযৌক্তিক ভয় নয়; কিছু না কিছু ঘটছে ওই ভাঙা বাড়ির ভেতরে, যা শুধুই অনুভব করা যায়। মীনার মতো সরল একটি শিশু যদি প্রতিবার সেই সুর শুনতে পায়, তবে এটিকে কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং মনে হচ্ছিল, শিশুর হৃদয়ের স্বচ্ছতায় লুকিয়ে আছে সেই সত্য, যা রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হতে পারে। অরিত্র এবার দৃঢ়সংকল্প করল—সে নিজে গিয়ে সেই ভাঙা বাড়ির ভেতরে দাঁড়াবে, শুনবে, দেখবে, আর খুঁজে বের করবে সেই পুরোহিত আত্মার সত্য। মীনার নিষ্পাপ কৌতূহল যেন তার নিজের কৌতূহলকে আরও উসকে দিল, আর সে বুঝল—এখন আর পিছু হটার উপায় নেই।
৬
ভোরের কুয়াশা তখনো গ্রামকে ঘিরে রেখেছে। দূরে ধানের ক্ষেতে শিশিরের আলো ঝলমল করছে, আর গ্রামের মাটির গন্ধ ভেসে আসছে হালকা বাতাসে। অরিত্রর মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা অন্যরকম হতে চলেছে। বহুদিনের দ্বিধা আর চিন্তাভাবনার পর অবশেষে সে স্থির করল ভগ্নপ্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করবে। চারপাশে তখন নীরবতা, শুধু গাছের পাতায় পাতায় শিশির ঝরে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল বাড়িটার দিকে, যার দরজাটা অর্ধভাঙা, কড়িগুলো মরচে ধরে লালচে হয়ে গেছে। ভেতরে পা দিতেই তার মনে হল যেন কোনো অদৃশ্য হাত তার কাঁধে ভর করছে। ধুলোয় ঢাকা মেঝে, ভাঙা ইটের গন্ধ, আর এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে শীতলতা তাকে এক অজানা জগতে টেনে নিল। মাকড়সার জালে ভরা দেয়ালগুলো যেন চোখ মেলে তাকিয়ে আছে, প্রতিটি ছায়া যেন জীবন্ত। এক সময় দূরে ভগ্ন প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে সে অনুভব করল, ভেতরে এক অদ্ভুত কম্পন বয়ে যাচ্ছে—যেন মাটির নিচ থেকে হালকা গুঞ্জন উঠছে। অরিত্র থমকে দাঁড়াল, তার শ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে এল, গা দিয়ে শীতল ঘাম ঝরতে লাগল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর অরিত্র সাবধানে ভেতরের অন্ধকার ঘরগুলোতে হাঁটতে শুরু করল। প্রতিটি ঘরে পা ফেললেই ধুলো উড়ে উঠছিল, আর কাঠের মেঝেতে পোকামাকড়ের খটখট শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। ভাঙা প্রতিমাগুলোর চোখমুখে ছিল ভীতিকর শূন্যতা, যেন তারা যুগের পর যুগ ধরে এই ঘরে আটকে আছে। হঠাৎ করেই অরিত্রর মনে হল, কেউ যেন তার কানে ফিসফিস করে কিছু বলছে—কিন্তু সে স্পষ্ট শুনতে পেল না। শব্দটা ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকল, যেন কোনো মন্ত্রের উচ্চারণ, খুব হালকা অথচ শক্তিশালী। অরিত্রর বুক ধড়ফড় করতে লাগল, সে চারদিকে তাকাল, কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই। খালি ঘরের ভেতরেই যেন সেই অদৃশ্য ধ্বনি বয়ে যাচ্ছে। দেয়ালের ফাটল দিয়ে ভেতরে আলো এসে পড়েছিল, আর সেই আলোয় অরিত্রর চোখে পড়ল মাটিতে আঁকাবাঁকা দাগ—যেন কারও পায়ের ছাপ এখনো তাজা আছে। তার মনে হল হয়তো এগুলো বহু বছরের পুরনো চিহ্ন, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওগুলো যেন একেবারে নতুন, যেন কেউ আজ ভোরে এসেই রেখে গেছে। তার শরীরে কাঁটা দিল, বুকের ভেতর ভয় আর কৌতূহল একসাথে উঁকি দিল।
এক সময় সে সাহস সঞ্চয় করে আরও ভেতরে ঢুকল। ঘরটা যত গভীরে যাচ্ছিল, ততই অন্ধকার আর শীতল হয়ে উঠছিল। বাতাসে এক ধরনের অচেনা ভার অনুভূত হচ্ছিল, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে আটকে দিচ্ছে। হঠাৎ করেই দূরে থেকে এক হালকা ধ্বনি ভেসে এল—চণ্ডীপাঠের সেই অচেনা, ভৌতিক সুর। অরিত্র হঠাৎ স্থির হয়ে গেল, তার কান ঝনঝন করতে লাগল, গা শিউরে উঠল। মনে হল যেন এই সুর কেবল তার কানেই পৌঁছাচ্ছে, চারদিকের পৃথিবী থেকে আলাদা করে তাকে ডেকে নিচ্ছে। সে চোখ বন্ধ করল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। যখন চোখ খুলল, দেখল প্রতিমার ভাঙা টুকরোগুলো যেন নড়ছে, আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করছে। মাটির উপর পড়ে থাকা অর্ধেক ভাঙা একটি মুখ যেন তাকে ঘুরে তাকিয়ে দেখছে। সেই দৃষ্টি অরিত্রর অন্তরে কাঁপন ধরিয়ে দিল। তখনই তার মনে হল, হয়তো হরিপদ কাকার বলা কাহিনি নিছক গল্প ছিল না। এই ভগ্নপ্রাসাদের ভেতর সত্যিই কিছু আছে, যা অসম্পূর্ণ, যা এখনো মুক্তি পায়নি। ভয়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত আকর্ষণ তাকে স্থির করে রাখল—অরিত্র বুঝল, একবার এখানে প্রবেশ করার পর আর তার পিছু হটার পথ নেই। এখানেই তার অনুসন্ধান শুরু হয়েছে, আর এর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সে শান্তি পাবে না।
৭
অরিত্রর ভেতরে কৌতূহল ও ভয়ের অদ্ভুত মিশ্রণ ক্রমেই গভীর হতে লাগল। প্রথমবারের অভিজ্ঞতার পর তার মন শান্ত হচ্ছিল না। সে স্থির করল, আবারও ভোরে ভগ্নপ্রাসাদের ভিতরে যাবে। এবার তার ভেতরে যেন এক অন্যরকম দৃঢ়তা কাজ করছিল, মনে হচ্ছিল, কেবলই ভয় নয়, কোনো অদৃশ্য সত্যের আহ্বান তাকে ডেকে নিচ্ছে। ভোরের কুয়াশায় বাড়ির চারপাশটা ভিজে উঠেছিল শিশিরে, বাতাসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা—যেন গোটা গ্রাম শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। দরজার পাট মচমচ শব্দে ভাঙা কাঠের মতো বাজতে বাজতে খুলতেই অরিত্র হঠাৎ থমকে দাঁড়াল—ভেতর থেকে যেন ধূপের হালকা গন্ধ ভেসে আসছে! অথচ বাড়িটা তো বহু বছর পরিত্যক্ত। ছিন্নবস্ত্র, ভাঙা প্রতিমা, জীর্ণ দেওয়াল—তার মাঝেই এই অচেনা গন্ধ যেন অরিত্রর শিরদাঁড়া ঠান্ডা করে দিল। সে ধীরে ধীরে ভিতরে এগোতে লাগল, প্রতিটি পদক্ষেপে কাঁটা দেওয়া ভয় যেন বুক চেপে ধরছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, নিস্তব্ধ অন্ধকার ভেদ করে ভেসে এলো এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর—“অরিত্র…”। যেন নাম ধরে কেউ ডাকছে। কণ্ঠে কোনো হিংসা নেই, বরং এক অদ্ভুত দুঃখ আর আকুতি। অরিত্রর বুক ধকধক করতে লাগল, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল, তবুও সে পিছিয়ে গেল না। তার চোখের সামনে কোনো মানুষ নেই, অথচ চারদিকে শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মুহূর্তেই আলো-অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা অস্পষ্ট অবয়ব ফুটে উঠল। অরিত্র একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল—এ কি তবে সেই পুরোহিত রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের আত্মা? মাথায় ঝাঁকড়া চুল, কপালে চন্দনচিহ্ন, গায়ে জীর্ণ সাদা ধুতি, অথচ শরীরটা আধো-আলোয় অস্পষ্ট, স্বচ্ছ কুয়াশার মতো। তার চোখদুটো লালচে দীপ্তিতে ঝলসে উঠছিল, কিন্তু ভয়ঙ্কর না হয়ে অদ্ভুত করুণাময়। পুরোহিতের আত্মা গভীর গলায় বলল, “আমার শেষ মহালয়া অসম্পূর্ণ রয়ে গেল, তাই মুক্তি পাইনি। শতবর্ষ ধরে এখানে বন্দি হয়ে আছি। আমার অর্ধেক মন্ত্র, আমার অসম্পূর্ণ পূজা আমাকে এই ভগ্নগৃহে আটকে রেখেছে।”
অরিত্রর মাথার ভেতর শিউরে ওঠা প্রশ্ন জমা হতে লাগল। এতদিন সে যা শুনে এসেছিল, সব কেবল গুজব ভেবেছিল, কিন্তু আজ সত্যি দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। পুরোহিত আত্মা আবার বলল, “যেদিন মহালয়ার প্রভাতে আমি পূজার অর্পণ করছিলাম, সেদিনই হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে আমার প্রাণ বেরিয়ে যায়। আমার ঠোঁটে তখনও অর্ধেক মন্ত্র আটকে ছিল। দেবীর আহ্বান অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তাই আমার আত্মা শান্তি খুঁজে পায়নি। আজও ভোরের সূর্য ওঠার আগে আমার সেই অসম্পূর্ণ সুর ভেসে ওঠে এই গৃহের ভেতরে।” অরিত্র যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার শরীর কাঁপছিল, চোখে পানি এসে যাচ্ছিল, তবুও সে দাঁড়িয়ে রইল। পুরোহিতের আত্মা অনুরোধ জানাল—“অরিত্র, তুমি শিক্ষিত, যুক্তিবাদী। কিন্তু তোমার ভেতর সাহস আছে। আমার অসমাপ্ত পূজা শেষ করে দাও। আমাকে মুক্তি দাও।” সেই মুহূর্তে অরিত্র বুঝল, এ কেবল কোনো ভূতের ডাক নয়—এ এক অসহায় আত্মার আকুতি, যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুক্তির পথ খুঁজছে।
৮
গ্রামের নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় অরিত্র নিজের অস্বস্তি সামলাতে হরিপদ কাকার দাওয়ায় গিয়ে বসে। তার মুখে এখনও সকালের ঘটনার ছাপ লেগে আছে—সেই অদৃশ্য কণ্ঠ, সেই ধূপের গন্ধ, আর পুরোহিত আত্মার বেদনাময় আর্জি। হরিপদ কাকা চুপচাপ অরিত্রর কথা শোনে, মাঝে মাঝে দাড়ি টেনে হুঁকোর ধোঁয়া ছাড়ে। শেষে ভারী কণ্ঠে বলে, “বাবা রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য এককালে গ্রাম রক্ষা করতেন, কিন্তু অসম্পূর্ণ চণ্ডীপাঠ তার আত্মাকে বন্দি করে রেখেছে। ওর মুক্তি না হলে গ্রামের শান্তি আসবে না।” অরিত্র বুঝতে পারে, বিষয়টা শুধু অজানা কোনো রহস্য বা ভূতের ভয় নয়—এটা অনেক বড় এক অসমাপ্ত দায়িত্ব, এক মৃত মানুষের শাপের ভার। তার যুক্তিবাদী মন প্রথমে দ্বিধা করে, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন একটা টান কাজ করে, যেন তাকে এই দায়িত্ব পালন করতেই হবে। সেদিন রাতে অরিত্র নিজের মনের দ্বন্দ্ব নিয়ে বাড়ি ফেরে, আর দেখে শিবানী তার জন্য উৎকণ্ঠায় বসে আছে। শিবানী বারবার সতর্ক করে—”ওই ভগ্নপ্রাসাদের ছায়া কারও মঙ্গল বয়ে আনেনি। তুই কেন বারবার ওখানে যাচ্ছিস?” অরিত্র কিন্তু এবার দৃঢ়। সে জানায়, ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলে পুরোহিতের আত্মা চিরকাল অশান্ত থেকে যাবে, আর হয়তো গ্রামও শান্তি পাবে না। এই কথা শুনে শিবানী প্রথমে কেঁদে ওঠে, কিন্তু অরিত্রর চোখে যে এক অটল দৃঢ়তা, সেটা দেখে সে আর কিছু বলতে পারে না।
পরদিন সকালে অরিত্র, শিবানী ও হরিপদ কাকা একত্রে বসে পরিকল্পনা করে। হরিপদ কাকা বলে, মুক্তির একমাত্র পথ হলো মহালয়ার ভোরে পূর্ণাঙ্গ চণ্ডীপাঠ আর প্রতিমার পূজা সম্পন্ন করা, যেটা পুরোহিত অসম্পূর্ণ রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যাটা হলো, এতদিনের পরিত্যক্ত বাড়িতে সেই কাজ করা সহজ হবে না। ভাঙাচোরা প্রতিমার জায়গায় নতুন প্রতিমা আনতে হবে, আবার গ্রামের মানুষকেও এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে। শিবানী ভয় পায়, গ্রামে অনেকে অন্ধবিশ্বাসে বিশ্বাস করে, তারা হয়তো ভয়ে অংশ নেবে না। কিন্তু হরিপদ কাকা আশ্বাস দেয়—”যখন জানবে পুরোহিতের আত্মা মুক্তি চাইছে, তখন গ্রামের লোকজনও বুঝবে, এই পূজাই একমাত্র সমাধান।” অরিত্র এই পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়। তার যুক্তিবাদী মনও এবার সায় দেয় যে, অন্তত একবার চেষ্টা করা উচিত, কারণ সত্যি যদি কোনো আত্মা বন্দি হয়ে থাকে, তবে এই আচার-অনুষ্ঠানই তার মুক্তির একমাত্র পথ। এই আলোচনা যেন গ্রামে নতুন এক স্রোত বইয়ে দেয়। অরিত্রর মনে হয়, সে যেন শুধু এক রহস্য ভেদ করতে যাচ্ছে না, বরং একটা অসম্পূর্ণ ইতিহাসকে শেষ করার দায়িত্ব নিয়েছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে গা ছমছমে অন্ধকার নেমে আসে, কিন্তু অরিত্রর মনের ভেতর আলো জ্বলে ওঠে। শিবানী স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলে, “যদি সত্যিই পূজার মাধ্যমে আত্মার মুক্তি হয়, তবে হয়তো এতদিনের ভয়, অশান্তি সব দূর হবে।” অরিত্র চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে—তার চোখে ভয়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত আশ্বাস জেগে আছে। হরিপদ কাকা শেষবারের মতো বোঝায়, “মুক্তি দেওয়া মানেই শুধু আত্মাকে শান্ত করা নয়, এর মানে হলো গ্রামকে অন্ধকার থেকে মুক্ত করা।” এই কথাগুলো শুনে অরিত্র মনে মনে স্থির করে নেয়, মহালয়ার ভোরে সে চণ্ডীপাঠ আর প্রতিমার পূজায় নেতৃত্ব দেবে। তার চোখে যেন এক অদৃশ্য জ্যোতি ফুটে ওঠে, যেন সে আর এক সাধারণ শহুরে যুবক নয়—সে হয়ে উঠছে ইতিহাসের এক দায়ভার বহনকারী, গ্রামের মুক্তির এক যোদ্ধা। ভগ্নপ্রাসাদের ভয় আর অজানা সুরের রহস্য তাকে আর কাঁপায় না। বরং তার ভেতরে জন্ম নেয় এক অদম্য সাহস, যে সাহস অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথে এগিয়ে যায়। পুরোহিত আত্মার মুক্তির পথ এখন আর শুধু একটি গল্প নয়, বরং অরিত্রর জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৯
মহালয়ার দিন যেন গোটা গ্রামকেই অন্য এক আবহে মুড়ে ফেলেছিল। দিনের বেলায়ই গ্রামবাসী, শিবানী, হরিপদ কাকা আর অরিত্র একসঙ্গে জড়ো হয়ে ভগ্নপ্রাসাদের চারদিক পরিষ্কার করার কাজে লেগে যায়। বহু বছর ধরে যেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে গাছের শেকড়, আগাছা আর ধুলোর আস্তরণ জমে গিয়েছিল—এ যেন মানুষের ভয়ে থমকে যাওয়া এক অচল সময়ের নিদর্শন। কিন্তু আজ মানুষের হাতের ঝাড়ু, বালতি, কাঁসার পাত্রের টুংটাং শব্দে ভরপুর হয়ে উঠল সেই নীরব প্রাসাদ। নারীরা আঙিনায় জল ছিটিয়ে ধুলো চেপে দেয়, পুরুষরা মাকড়সার জাল সরায়, শিশুরা উচ্ছ্বাসে ছোটাছুটি করে। গ্রামের প্রবীণরা বলছিলেন—“আজ যদি পূজা সফল হয়, তবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভয় দূর হবে।” এই কাজ করতে করতে গ্রামবাসীর মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তি কাজ করছিল, যেন ভয় আর সংশয়ের বদলে এক যৌথ বিশ্বাস আর ঐক্য তাদের জড়ো করে দিয়েছে। কিন্তু অন্তরে অন্তরে শিবানী আর অরিত্র জানত—সত্যিই কি আত্মা মুক্তি পাবে? নাকি আরও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে মহালয়ার রাতে?
সন্ধ্যার পর থেকেই এক অদ্ভুত আবেশ নেমে এলো ভগ্নপ্রাসাদের চারপাশে। ধূপের গন্ধে বাতাস ভরে উঠল, মাটির প্রদীপের আলো টিমটিম করে জ্বলে উঠতে শুরু করল। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ পুরোহিত চণ্ডীপাঠের আসর বসালেন, আর গ্রামের নারী-পুরুষ সকলে মিলে সেই মন্ত্রোচ্চারণে অংশ নিল। ভগ্নপ্রাসাদের অন্ধকার কোণগুলোতেও যেন মন্ত্রধ্বনির প্রতিধ্বনি ভেসে যেতে লাগল। হঠাৎ করেই চারদিক যেন আরও গম্ভীর হয়ে উঠল—বাতাস ভারী হয়ে এল, অজানা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল। অরিত্র অনুভব করল, তার বুক কেঁপে উঠছে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। মন্ত্রোচ্চারণ তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবার চোখে ভয়ের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঠিক তখনই, ভগ্নপ্রাসাদের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেসে এল এক মৃদু সুর, যা প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করতে পারল না। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই সুর যেন স্পষ্ট হতে শুরু করল—এটি কোনো মানুষের নয়, যেন এক অশরীরী আত্মার কণ্ঠস্বর, বিষণ্ণ অথচ শক্তিশালী।
পুরোহিত রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের আত্মা—এ কথা কারও মুখে না উঠলেও সকলের বুকের ভিতরেই কাঁপুনি ছড়িয়ে দিল। গানের মধ্যে যেন এক অপূর্ণতার আক্ষেপ, মুক্তির আকুতি আর অসম্পূর্ণ পূজার ভার লুকিয়ে ছিল। গ্রামের মানুষজন চোখ মেলল, কেউ ভয়ে হাত জোড় করে প্রণাম করল, কেউ আবার ভয় পেয়ে কেঁপে উঠল। শিবানী অরিত্রর হাত শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল—“দেখেছো? আমি যা বলেছিলাম!” অরিত্রর নিজের শরীরও গা শিউরে উঠছিল, কিন্তু তার চোখে তখন এক দৃঢ় সংকল্প। হরিপদ কাকা চোখ মুছতে মুছতে বললেন—“আজ যদি পূজা সম্পূর্ণ হয়, তবে ওঁর মুক্তি মিলবেই।” আরেকবার জোরে মন্ত্রপাঠ শুরু হলো, প্রদীপের আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ধূপের ধোঁয়া আকাশে পাক খেতে লাগল। আত্মার কণ্ঠ ধীরে ধীরে থেমে গেল, কিন্তু তার শীতলতা যেন চারপাশে ছড়িয়ে থেকে গেল। গ্রামবাসী তখনই বুঝল—এ রাত হবে দীর্ঘ, এবং এ রাতের শেষে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেটি শুধু এক আত্মার মুক্তির নয়, গোটা গ্রামের ভবিষ্যতের সঙ্গেই জড়িত।
১০
অরিত্রর হাত কাঁপছিল, তবুও সে দৃঢ় মনে প্রদীপটি জ্বালালো। সেই প্রদীপের আলো ধীরে ধীরে প্রতিমার মুখমণ্ডল আলোকিত করল। এতদিনের অন্ধকার, ধুলো, আর শূন্যতার মাঝে হঠাৎ যেন প্রাণের সঞ্চার হলো। গ্রামের মানুষ যারা চারদিকে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা একসঙ্গে নিঃশ্বাস ফেলল, যেন অদৃশ্য এক ভয় তাদের বুক থেকে নামল। মৃদু সুরে শঙ্খ বাজছিল, ঢাকের শব্দ ধীরে ধীরে উঠতে লাগল, আর মন্ত্রোচ্চারণে পরিবেশ ভরে উঠল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই আবার ভেসে এলো সেই অদ্ভুত কণ্ঠস্বর—পুরোহিত আত্মার গভীর অথচ শান্ত কণ্ঠ। কণ্ঠে আর ভয়ের কোনো ছাপ নেই, বরং এক ধরনের প্রশান্তি ও স্বস্তি। সে যেন বলছে, “আমার অসমাপ্ত যজ্ঞ আজ সম্পূর্ণ হলো… আমার মুক্তি হলো।” গ্রামবাসীরা একে অপরের দিকে চমকে তাকাল, অরিত্র চোখ বন্ধ করে মাথা নত করল। মুহূর্তটা যেন বাস্তব আর অতিপ্রাকৃতের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা এক সেতু—যেখানে ভয় আর ভক্তি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রদীপের শিখা যেন হাওয়ায় দুলে উঠল, ঠিক যেমন দুলছিল মানুষের অন্তর, এক অচেনা অনুভূতির স্পর্শে।
ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল দিগন্তে। রাতভর চলা পূজার সমাপ্তি ঘটল, আর সকালের শান্ত আলোয় সেই ভগ্নপ্রাসাদ যেন নতুন রূপে জেগে উঠল। মাকড়সার জাল, ধুলোর স্তূপ, ভাঙা প্রতিমা—সব কিছু সত্ত্বেও ভেতরে যেন এক পবিত্র আবহ তৈরি হয়েছিল। গ্রামের লোকেরা নীরব ভক্তিভরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো, তাদের চোখেমুখে বিস্ময় আর স্বস্তি মিলেমিশে ছিল। কারো চোখে জল, কারো ঠোঁটে প্রার্থনার মৃদু উচ্চারণ। হরিপদ কাকা ধীরে ধীরে বললেন, “আজ থেকে আমাদের অভিশাপ কাটল।” শিবানীর চোখ অরিত্রর দিকে গেল—তার মনে হচ্ছিল, যদি অরিত্রর সাহস না থাকত, তবে এই মুক্তির কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যেত। মীনা, যে প্রথমে ছায়া দেখেছিল, তার চোখে আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠল। সে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে বলল, “কাকা আর ভয় দেখাবে না, তাই তো?” গ্রামের সবাই হেসে উঠল, যেন এতদিনের বোঝা নামল। অরিত্র জানত, এটা শুধু এক পুরোহিত আত্মার মুক্তি নয়, বরং গ্রামবাসীর ভয়, সন্দেহ আর আতঙ্কের মুক্তি। এ এক নতুন অধ্যায়, যেখানে অন্ধকারের জায়গা নেবে আলো।
যখন সূর্যের কিরণ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল, তখন ভগ্নপ্রাসাদটির সামনে দাঁড়িয়ে সবাই একসঙ্গে প্রণাম করল। প্রতিমার সামনে প্রদীপ এখনও জ্বলছিল, তার আলোয় ভেসে যাচ্ছিল মুক্তির প্রতীক। হাওয়া বইছিল শান্তভাবে, যেন প্রকৃতিও নতুন জীবনকে স্বাগত জানাচ্ছে। অরিত্র মনে মনে শপথ নিল—এই জায়গাকে আর কখনো অভিশপ্ত মনে করা হবে না। এখানেই গ্রামবাসীরা আগামী বছর থেকে নতুন করে পূজা করবে, আর মহালয়ার রাত আর আতঙ্কের নয়, হবে উৎসবের। সেই ভোরে, যখন সবাই ঘরে ফিরছিল, তখন আকাশে পাখির ঝাঁক উড়ে গেল, যেন তারাও আনন্দে গেয়ে উঠল মুক্তির গান। অরিত্র একবার ফিরে তাকাল ভগ্নপ্রাসাদের দিকে। সেখানে আর কোনো অদ্ভুত ছায়া নেই, কোনো ভৌতিক সুর নেই—শুধু শান্তি। তার হৃদয় যেন হালকা হয়ে গেল। শিবানী পাশে এসে মৃদু হেসে বলল, “তুই আমাদের মুক্ত করলি অরিত্র।” আর সেই মুহূর্তে সে বুঝল—এ শুধু পুরোহিত আত্মার শেষ সুর নয়, বরং সমগ্র গ্রামের নতুন জীবনের শুরু। ভোরের আলোয় গ্রাম যেন হয়ে উঠল এক নতুন আশ্রয়, যেখানে ভয় নয়, বরং শান্তি ও ঐক্যের ছায়া চিরদিন বিরাজ করবে।
শেষ




