শুভ্রা গুহ রায়
১
রঘু ওঝা সেই রাতটি কখনও ভুলতে পারবে না। মেঘঢাকা আকাশে বজ্রপাতের শব্দ বেজে চলছিল, আর বৃষ্টির মতোই ঝড়ো হাওয়া বনভূমির গহীনতার মধ্যে প্রবেশ করেছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে তার পায়ের নীচে ভেজা পাতা ফেটে যেত, আর বাতাসের দমকা তাকে সামান্যই সামলাতে দিচ্ছিল। সে জানত, এমন সময় বনের মধ্যে একা থাকা বিপজ্জনক, কিন্তু মানসিক উদ্যম এবং অনুসন্ধিৎসা তাকে থামতে দিতে পারছিল না। হঠাৎ, একটি অদ্ভুত আলো তার চোখে ধরা দিল—এক ধরণের ঝলমলে চকমক যা ঘিরে ছিল ঘন অন্ধকার। রঘু প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো এটি কোনো দ্যুতি বা দূর থেকে পড়া বজ্রপাতের প্রতিফলন, কিন্তু যত কাছে গেল, ততই বুঝতে পারল এটি কোনো সাধারণ আলো নয়। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত বৃদ্ধি পেল, এবং মনে হল যেন সে নিজেরই কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে না—কেবল বাতাসের শীতল স্পর্শ আর বৃষ্টির নিঃশব্দ রাগই চারপাশে। সেই ঝলক তাকে যেন টেনে নিয়ে চলে এক অজানা রহস্যের দিকে, যা তার দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসের সব সীমা পরীক্ষা করতে চায়।
যতক্ষণ রঘু সেই আলো অনুসরণ করছিল, তার মনে হঠাৎ এক অচেনা সাধুর চিত্র ভেসে উঠল—এক পুরনো রাশির ধনুক হাতে, সাদা চামড়ার ধোতিতে আবৃত এবং চোখে অদ্ভুত জ্যোতি। হঠাৎই সে একটি মাটির ফাটলের মধ্যে স্থাপিত ছোট্ট বাক্স দেখতে পেল, যা প্রায় পাতা ও কচুরিপানার আড়ালে লুকানো ছিল। রঘু যত কাছে গিয়ে তাকাল, বাক্সটি যেন নিজেই খোলার চেষ্টা করছিল। কানের কাছে একটি অদ্ভুত শব্দ হল—মৃদু ঝনঝনানি, যা তাকে বলছিল, “আমার মধ্যে যা আছে, তা শুধু সাহসী মনই খুঁজে পেতে পারে।” রঘু চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিল, হাত বাড়িয়ে সেই বাক্সে রাখল। বাক্সের ঢাকনা খুলতে সাথে সাথে, বাতাস যেন স্থির হয়ে গেল, আর ঝলমলে আলোটি আরও জোরে জ্বলে উঠল। তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল—কেননা বাক্সের ভেতর ছিল এক অদ্ভুত তাবিজ, যার চারপাশে প্রাচীন চিহ্ন এবং অচেনা লিপি খোদাই করা। মনে হচ্ছিল তাবিজটি যেন প্রাণিত, তার নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি দ্বারা আলোকিত। রঘু তা ছুঁয়ে দেখল, এবং হঠাৎ তার শরীরে এক অদ্ভুত কম্পন ছড়িয়ে পড়ল—এক ধরণের শক্তি যা মনে করিয়ে দিল, এটি কোনো সাধারণ জিনিস নয়।
রঘু বুঝতে পারল, এই তাবিজের সঙ্গে তার যোগাযোগ তার জীবনের নিয়মিত ধারার বাইরে নিয়ে যাবে। বাতাসে অদ্ভুত গন্ধ ভেসে এল—প্রাচীন ঘাস, মাটির সুরভি আর অজ্ঞাত কোনো মন্ত্রের খাঁজ। তাবিজটি যেন তার ইচ্ছাকে পড়তে পারছে—রঘু যতই চেষ্টা করুক, সে তার আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, তার প্রতি মুহূর্তে তাবিজটি এক ধরনের প্রলোভন তৈরি করছে, যা তাকে বন থেকে বের হওয়া ও সাধারণ জীবনে ফিরে যাওয়ার পথটি বন্ধ করে দিচ্ছে। সে বুঝতে পারল, এই সন্ধ্যার পরে কিছুই আগের মতো থাকবে না। রঘুর মনে কৌতূহল, আতঙ্ক এবং এক অজানা আকর্ষণের সংমিশ্রণ কাজ করছে। সে হঠাৎ ভাবল, যদি এই তাবিজ তার ইচ্ছা পূরণ করতে পারে, তবে কতটা মূল্য দিতে হবে? এবং এ মূল্য শুধু তার নয়, হয়তো কারো প্রাণের বিনিময়ে। ঝড়ের মধ্যে দোলা দিয়ে থাকা বনের গাছগুলো যেন হালকা কেঁপে উঠল, আর ঝলমলে তাবিজটি তার হাতে জ্বলতে জ্বলতে এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বর শোনাচ্ছিল—“সাহসী, তুমি আমার খোঁজ করেছ, এখন তুমি আমার রহস্যের অংশ।” সেই মুহূর্তে রঘু বুঝতে পারল, বন কেবল গাছ আর অন্ধকারের জায়গা নয়; এটি এক প্রাচীন শক্তির ঘর, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ একটি নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। তাবিজটি তার হাতে ধরা, রঘুর হৃদয় নতুন এক অভিযান, নতুন এক রহস্যের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করল, যা তার জীবনের নিয়মিত পথ পরিবর্তন করে দেবে এবং তাকে নিয়ে যাবে এক অজানা, অন্ধকার আর বিপজ্জনক জগতে।
২
রঘু ওঝা তাবিজটি হাতে নিয়ে সেই রাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা পেছনে রেখে বাড়ি ফিরে এলো, কিন্তু ঘরের শান্তি তাকে কোনো স্বস্তি দিতে পারছিল না। তাবিজটি একটি পুরনো কাপড়ে মোড়ানো, আর তার হাতের নরম আলো যেন তার কানে অদ্ভুত ফিসফিস করে বলছিল—“আমি চাইছি, তুমি আমাকে ব্যবহার করো।” প্রথমে রঘু এটিকে কেবল অবিশ্বাস এবং মানসিক চাপের ফল মনে করল। রাতে সে বার বার তাবিজটি দেখছিল, তার দিকে তাকাতে গিয়ে নিজেকে থামাতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, এই অদ্ভুত বস্তুটির মধ্য দিয়ে সে এমন শক্তি অনুভব করছে যা মানুষের সাধারণ ইন্দ্রিয়ের বাইরে। পরদিন সকালে, রঘু গ্রামের বাজারে গেলে এক চমকপ্রদ ঘটনা ঘটল। তার ছোট চাচাতো ভাই, যে কয়েক মাস ধরে খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে খিটখিট করছিল, হঠাৎ হঠাৎ ভালো লাগার লক্ষণ দেখাতে শুরু করল। রঘু প্রথমে ভাবল, এটি শুধু এক ধরণের দৈবক্রম বা আশ্চর্যজনক সুস্থতা, কিন্তু তারপরই বুঝতে পারল—তাবিজের উপস্থিতি তার চিন্তাভাবনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। আর এটি কেবল শুরুর প্রমাণ ছিল; যতই সে তাবিজটির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল, ততই তার চারপাশের ঘটনা ক্রমেই অদ্ভুত হয়ে উঠছিল।
কিছুদিন পর, রঘু এক বন্ধুর ইচ্ছা পূরণের জন্য তাবিজ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল। তার বন্ধু চেয়েছিল, গ্রামের মেলায় প্রথম পুরস্কার জিতুক। রঘু তাবিজটি হাতে ধরে তার ইচ্ছা প্রকাশ করল, অজস্র আশ্চর্যজনক আলো তার হাতে জ্বলে উঠল। তবে পরের দিন, মেলার সময় সেই বন্ধুর প্রতিদ্বন্দ্বী হঠাৎ করেই একটি অদ্ভুত দুর্ঘটনায় মারা গেল। রঘুর হৃদয় চেপে ধরল; সে বুঝতে পারল, শুধু ইচ্ছা পূরণ নয়, তাবিজের শক্তি কোনো জীবনের বিনিময়ে কাজ করছে। প্রথমে সে এটি কেবল দৈবঘটনা মনে করল, কিন্তু পরপর আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটতে লাগল—যেখানে ইচ্ছা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশে কোনো না কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটত। এই সত্য রঘুর মনে ধাক্কা দেয়। একদিকে তার বন্ধু বা পরিবারের খুশি, অন্যদিকে অজানা মানুষদের অকালমৃত্যু—এই দ্বন্দ্ব তাকে মানসিকভাবে অচেনা সীমায় নিয়ে গেল। তাবিজটি যেন তাকে পরীক্ষা করছিল, কতদূর সে মানুষের সুখ এবং দুঃখের ভার নিতে পারে।
রঘুর অবস্থা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠল। সে রাতে শোবার সময় তাবিজটি হাতের কাছে রাখত, কিন্তু ঘুমাতে পারত না—মনের ভেতরে দ্বন্দ্ব এবং ভয় বিরাজ করত। হঠাৎ এক রাতে, তাবিজটি নিজেই হালকা কাঁপতে শুরু করল, আর রঘু অনুভব করল যেন এটি তার কাছে অদ্ভুত কিছু নির্দেশ করছে। সে বুঝতে পারল, তাবিজের শক্তি সীমাহীন নয়; প্রতিটি ইচ্ছার সঙ্গে একটি মূল্য জড়িত, যা মূলত জীবন বা মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। তার কাছে প্রশ্ন ওঠল—কি সে এ শক্তিকে ব্যবহার করে মানুষের ভালো করতে পারবে, নাকি এটি এক অন্ধকার পথে নিয়ে যাবে? দিনের আলোয় গ্রামের মানুষদের হাসি-আনন্দ দেখে সে কিছুটা স্বস্তি পেত, কিন্তু রাতের অন্ধকারে তাবিজের ফিসফিসানিতে মনে হত, প্রতিটি সুখের বিনিময়ে কোনো প্রাণের দাম দিতে হবে। এই দ্বন্দ্ব এবং আতঙ্কের মধ্যে, রঘু অজান্তেই নিজেকে তাবিজের জালে ফেঁসে যেতে দেখল। সে বুঝতে পারল, তার জীবনের এই নতুন অধ্যায় শুধুই শুরু—এটি তাকে নিয়ে যাবে এমন রহস্যের জগতে, যেখানে শক্তি, আগ্রহ, লোভ এবং নৈতিকতার সীমা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে, আর রঘুর মন ও আত্মাকে চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে হবে।
৩
রঘু ওঝা সেই সকালে ঘরের আঙিনায় বসে থাকল, তাবিজটি হাতে নিয়ে এক অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব করছিল। তার মন এখনও প্রথম ইচ্ছার পরিণতি নিয়ে চাপে ছিল—একটি মানুষের সুখ এবং অন্য এক মানুষের মৃত্যু, সবই তার হাতে ঘটেছিল। ঠিক সেই সময়, নির্মল নামে গ্রামের একজন পরিচিত কৃষক রঘুর কাছে এল। নির্মল ছিল সাধারণ, পরিশ্রমী, কিন্তু আর্থিক সমস্যা তার জীবনকে স্থির করতে দেয়নি। সে জানালো যে সে দীর্ঘদিন ধরে চেয়েছে—জমি বৃদ্ধি হোক, আর টাকা যেন যেন সহজে আসে। রঘু কিছুটা দ্বিধা অনুভব করলেও, নির্মলের দরিদ্র চোখ দেখে এবং তার ভয়, কষ্ট আর আশা দেখে শেষ পর্যন্ত তাবিজটি তার হাতে ধরাল। রঘু মৃদু ফিসফিস করে বলল, “তোমার ইচ্ছে পূরণ হোক, তবে মনে রেখো, এর সঙ্গে একটি দাম জড়িত।” নির্মল কিছুটা অবিশ্বাসে তাকাল, কিন্তু তাবিজের নরম আলো তার আশা এবং কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে দিল।
পরের দিন সকালে গ্রামের মানুষরা বিস্ময়ে লক্ষ্য করল নির্মলের জমি হঠাৎ সমৃদ্ধ, ফসল ভালো হয়েছে, এবং নগদ অর্থ অপ্রত্যাশিতভাবে তার হাতে এসেছে। নির্মল আনন্দে উল্লাস করতে থাকল—সব কিছু যেন তার স্বপ্নের মতো ঘটেছে। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হতে পারল না। গ্রামের এক প্রতিবেশী হঠাৎ করেই অকারণে মৃত্যুবরণ করল। কেউও তা বুঝতে পারল না; তার মৃত্যুর কারণ কোন স্বাভাবিক রোগ বা দুর্ঘটনা নয়। গ্রামের মানুষরা আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। মানুষের মুখে মুখে আতঙ্কের গল্প ছড়াতে শুরু করল—রঘুর ঘরের কাছাকাছি কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, অদ্ভুত আলো এবং শব্দের সঙ্গে। রঘু নিজেই বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল। নির্মলের খুশি এবং প্রতিবেশীর অকালমৃত্যু—সবই যেন একসাথে তার চোখের সামনে ঘটছে। তাবিজের জ্বলে ওঠা আলো তাকে মনে করিয়ে দিল, এই শক্তি কেবল ইচ্ছা পূরণের জন্য নয়; এর সাথে একটি অদৃশ্য দুঃস্বপ্নও যুক্ত।
গ্রামের পরিবেশ ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠল। মানুষরা হঠাৎ করেই অচেনা ভয় অনুভব করতে লাগল। রাস্তায় চলাফেরায় সাবধানতা, ঘরে ঘরে দ্বিধা ও সন্দেহ—সব কিছু যেন এক অদ্ভুত সুরে বাঁধা পড়েছে। রঘু নিজে হতবাক, তিনি জানতেন যে তাবিজের শক্তি সত্যিই ভয়ঙ্কর এবং অনিয়ন্ত্রিত। নির্মলের খুশি, জমির সমৃদ্ধি, আর টাকা—এ সব কিছুই তার জন্য আনন্দের বিষয়, কিন্তু এই আনন্দের মূল্য হয়তো একাধিক প্রাণের বিনিময়ে পরিণত হতে পারে। সে বুঝতে পারল, গ্রামের মানুষদের সঙ্গে তার জীবন আর আগের মতো হবে না। সে রাতভর বসে থাকল, তাবিজটি হাতে নিয়ে, এবং তার মনের ভেতর একটি প্রশ্ন জেগে উঠল—এ শক্তি কি তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি এটি তার জীবন ও গ্রামের জীবনকে এক অন্ধকার পথে ঠেলে দেবে? সেই রাত থেকে, রঘু বুঝতে পারল যে তাবিজের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই কেবল ইচ্ছা নয়, বরং প্রতিটি ইচ্ছার সঙ্গে অদৃশ্য মৃত্যু, ভয় এবং আতঙ্কও যুক্ত—এটি তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরীক্ষা শুরু হয়েছে, যেখানে নৈতিকতা, সাহস এবং মানবিকতার সীমা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ করবে।
৪
রঘুর বাড়িতে সন্ধ্যার সময় সবকিছু যেন স্থির হয়ে গেছে, কিন্তু ভেতরে একটি অদ্ভুত চাপ বিরাজ করছিল। কমলা, রঘুর স্ত্রী, দিনরাত অস্থির, চিন্তিত চোখে তার স্বামীকে পর্যবেক্ষণ করছিল। সে লক্ষ্য করেছিল, গ্রামের অকালমৃত্যুর সঙ্গে রঘুর আচরণ ক্রমেই অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ইচ্ছার পরেই, রঘুর মুখে এক অজানা আনন্দের ছায়া, আর চোখে এক ধরণের উন্মাদনার ছাপ। কমলা প্রথমে ভাবল, হয়তো রঘু মানসিক চাপের কারণে এমন হচ্ছে, কিন্তু পরপর ঘটমান অদ্ভুত ঘটনা—নির্মলের খুশি এবং প্রতিবেশীর মৃত্যু, গ্রামের আরেকটি অকারণে মৃত্যু—সব মিলিয়ে তাকে এক অদ্ভুত সঙ্গতি বোঝাতে বাধ্য করল। কমলা বুঝতে পারল, এই সবের সঙ্গে তাবিজের সম্পর্ক অস্বীকার করা যায় না। সে রঘুকে শান্ত স্বরে বলল, “রঘু, এই তাবিজের শক্তি যেন শুধু খুশি দেয় না—এটি প্রাণও ছিনিয়ে নিচ্ছে। তুমি কি দেখছো না, প্রতিটি ইচ্ছার সঙ্গে কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে?” রঘু প্রথমে তার কথা অবহেলা করল, মনে করল, কমলা অতিরিক্ত চিন্তা করছে। কিন্তু কমলার চোখে সত্যের একটি গভীর আভা ছিল, যা রঘুর কনজুসময়ে কিছুটা অশান্তি সৃষ্টি করল।
পরের কয়েকদিন রঘু স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাবিজ ব্যবহার করতে শুরু করল। সে গ্রামের মানুষদের খুশি দেখার জন্য ছোট ছোট ইচ্ছা পূরণ করত—কেউ ভালো ফসল চাইত, কেউ ব্যবসায় লাভ। আর প্রতিটি ইচ্ছার সঙ্গে সঙ্গেই, এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে—কেউ অকারণে মারা যায়, কেউ অদ্ভুতভাবে আহত হয়। কমলা ক্রমেই হালকা আতঙ্কে ভুগতে লাগল। সে রঘুর কাছে বারবার বলল, “রঘু, তুমি যদি এভাবে চলতে থাকো, আমরা আমাদের নৈতিকতার সীমা হারাব। এই শক্তি শুধুই খুশির আড়ালে মৃত্যু লুকিয়ে রাখছে।” কিন্তু রঘু শুনতে চাইল না। তার মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি, এক মত্ত আনন্দ কাজ করছিল। তাবিজের শক্তি তাকে প্রলুব্ধ করছিল, এবং প্রতিটি ইচ্ছা পূরণের পর সে নিজেকে এক ধরনের ঈশ্বর মনে করছিল। কমলার সতর্কবার্তা যেন বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
এক রাতে, কমলা ঘরে একা বসে রঘুর হাতে ধরা তাবিজটি দেখে ভীত হয়ে ভাবল, এই জিনিসটি তাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ একেবারেই বদলে দিতে পারে। সে তার স্বামীকে বারবার প্রোথিত করার চেষ্টা করল, কিন্তু রঘু তার কথার দিকে একেবারেই মনোযোগ দিচ্ছিল না। তার চোখে তাবিজের আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল, আর মনে হচ্ছিল এটি তাকে নতুন এক শক্তি, নতুন এক ক্ষমতা দিচ্ছে। কমলা বুঝতে পারল, এই মুহূর্ত থেকে তার স্বামীর সঙ্গে তার যুদ্ধে শুধু যুক্তি নয়, এক ধরনের নৈতিক দ্বন্দ্বও জড়িয়ে যাবে। তার অন্তরের ভয় ক্রমেই বাস্তবে রূপ নিচ্ছিল—যে মানুষটি তার জীবন সঙ্গী, এখন এক অদ্ভুত শক্তির প্রভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে চলেছে। এবং সে জানত, এই দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে গ্রামের মানুষদেরও বিপদ আসতে পারে, কারণ রঘুর মত্তি এবং তাবিজের অদৃশ্য শক্তি এক সঙ্গে এক অচেনা, অন্ধকার পথে তাদের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে।
৫
গ্রামের মধ্যে ক্রমেই এক অদ্ভুত উত্তেজনা এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। রঘুর ঘর থেকে তাবিজের আলো যেন প্রতিদিনই বেশি জ্বলজ্বল করত, আর তার প্রভাব গ্রামবাসীর মানসিকতায় অদৃশ্যভাবে প্রবেশ করছিল। গোকুল, রঘুর শিষ্য, প্রথমে রঘুর সতর্কতাকে উপেক্ষা করে তাবিজকে কেবল অন্বেষণ এবং পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তার লোভের আগুন জ্বলতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, তাবিজ শুধু ইচ্ছা পূরণ করে না, বরং সে যাকে চাইবে তার ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম। নিজের স্বার্থসিদ্ধি এবং ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষায় মত্ত হয়ে, গোকুল এক রাত হঠাৎ করেই নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করল—শ্রমসাধ্য জমির মালিকানা, নগদ অর্থ, গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ। তাবিজের অদ্ভুত আলো তার হাতে জ্বলে উঠল, আর সে প্রথমবারের মতো অনুভব করল, এই শক্তি কেবল ইচ্ছা নয়, এটি বাস্তবেই মানুষকে তার ইচ্ছামাফিক রূপান্তর করতে সক্ষম।
কিন্তু যতই গোকুলের ইচ্ছা পূর্ণ হচ্ছিল, ততই গ্রামে অকারণে মৃত্যু বৃদ্ধি পেতে থাকল। যারা তার স্বার্থের পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াত, তারা হঠাৎ করেই অদ্ভুতভাবে মারা যেত। গ্রামের মানুষরা প্রথমে হতবাক, কিন্তু কয়েকটি দুর্ঘটনার পর বুঝতে পারল, এসব স্বাভাবিক ঘটনা নয়—কিছু অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে। শোকের বদলে গ্রামের মানুষদের মনে ভয়, সন্দেহ এবং অদ্ভুত হাহাকার জন্ম নিল। কেউ নিজে বাইরে বের হতে সাহস পেত না, কেউ নিজের বাড়ির জানালা বন্ধ রাখত। গোকুল নিজের লোভে এতটাই মগ্ন হয়ে গেল যে সে আর গ্রামবাসীর মৃত্যু, শোক বা আতঙ্কের কথা ভাবত না। তার মনে শুধু একটাই ছিল—তার ইচ্ছা পূর্ণ, তার ক্ষমতা বৃদ্ধি, আর তাবিজের শক্তি যেন তাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যায়।
রাতের অন্ধকারে, রঘু কমলার সতর্কবার্তার কথা মনে পড়ল। সে বুঝতে পারল, তার শিষ্য কেবল তাবিজের মায়ায় পড়ে গ্রামে মৃত্যুর খেলা শুরু করেছে। কিন্তু রঘু নিজেও এখন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে—একদিকে তাবিজের ক্ষমতা এবং লোভের মধুর প্রলোভন, অন্যদিকে কমলার চোখে প্রতিফলিত সত্য। গোকুলের অমৃত্যু কামনা, লোভ এবং অন্ধকার আগ্রহ গ্রামের মধ্যে অদ্ভুত হাহাকার ছড়িয়ে দিয়েছে। রঘু বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে তার সিদ্ধান্ত, তার পদক্ষেপ, এবং তাবিজের ব্যবহার—সবই গ্রামের মানুষের জীবনের উপর প্রভাব ফেলছে। আর এই প্রভাব ক্রমেই একটি অদৃশ্য জালের মতো গড়ে উঠছে, যা নৈতিকতা, মানবতা এবং জীবন-মৃত্যুর সীমার মধ্যে এক ধ্বংসাত্মক সংঘাত তৈরি করছে। গোকুলের লোভ এবং তার ইচ্ছার ফলাফল শুধু তার নিজের জন্য নয়, পুরো গ্রামের জন্য বিপদের দারজা খুলে দিয়েছে, আর রঘু এখন সেই শক্তির দায়িত্ব এবং নিয়ন্ত্রণের নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি।
৬
গ্রামের প্রতিটি ঘটনা ধানেশ মাস্টারের দৃষ্টি এড়ায় না। শিক্ষক হিসাবে তার স্বভাব ছিল যতটা সম্ভব যুক্তি, পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করা। যখন গ্রামের মানুষরা আতঙ্কে ভুগছিল, রঘু, কমলা এবং গোকুল তাবিজের প্রভাব নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, তখন ধানেশ মাস্টার ঘরের কোণায় বসে ঘটনার প্রতিটি কুঁড়ি-পানি খতিয়ে দেখছিলেন। তিনি মৃতদের নাম, মৃতদেহের অবস্থান, ইচ্ছার ধরণ এবং সময়কাল—all—নিশ্চিতভাবে নোট করছিলেন। তিনি প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে কোনো প্রাকৃতিক কারণ খুঁজে বের করতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোথাও মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। তার শিক্ষক মনের বিশ্লেষণ বলছিল, কোনো অদৃশ্য শক্তি বা প্রাচীন অভিশাপ কাজ করছে, যা মানুষের ইচ্ছার সঙ্গে সংযুক্ত। তিনি বুঝতে পারলেন, এখানে কোনো দৈবঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত প্রভাব আছে—যে প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দু তাবিজ এবং তার অভিশাপ।
ধানেশ মাস্টার তখন গ্রামের ইতিহাস, পুরনো লোককথা এবং অজানা সূত্রাবলী খুঁজতে শুরু করলেন। তিনি দেখতে পেলেন, বহু বছর আগে সেই বনাঞ্চলে এক সাধু বসবাস করতেন, যার নাম কেউ ঠিক মনে রাখতে পারছে না, কিন্তু তার তাবিজের শক্তি আজও সক্রিয়। তিনি অজানা চিহ্ন, খোদাই করা লিপি এবং প্রাচীন মন্ত্রের সূত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যাচাই করলেন। প্রতিটি ইচ্ছার সঙ্গে মৃত্যুর অনুপাত, ধরণের প্রভাব এবং তাবিজের আলো—সব মিলিয়ে তিনি একটি রূপরেখা তৈরি করলেন। ধানেশ মাস্টার বুঝতে পারলেন, তাবিজ মানুষের ইচ্ছা পূরণের ক্ষমতা রাখে, কিন্তু প্রতিটি ইচ্ছার সঙ্গে একটি প্রাণের বিনিময় বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, এটি কোনো সহজ বস্তু নয়; এটি একটি অভিশপ্ত শক্তি, যা মানুষের স্বার্থ এবং লোভকে পরীক্ষা করে, এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ন্যায় বা ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।
তিনি যখন এই সত্য রঘু, কমলা এবং কিছু বিশ্বস্ত গ্রামবাসীর কাছে প্রকাশ করলেন, তখন পুরো গ্রামে এক অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে গেল। ধানেশ মাস্টার বললেন, “এই তাবিজ শুধুই ইচ্ছা পূরণের যন্ত্র নয়, এটি একটি অভিশাপ, যা মানুষের লোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং নৈতিকতার সীমা যাচাই করে। তোমরা যতই আনন্দ বা স্বার্থের জন্য এটি ব্যবহার করবে, প্রতিটি ইচ্ছার সঙ্গে মৃত্যুর সম্ভাবনা জড়িত থাকবে। এই সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না।” রঘু কিছুটা হতবাক, কমলা শান্ত হতে পারল না, আর গোকুল—যিনি লোভের জালে নিজেকে আটকে রেখেছিলেন—হঠাৎ করেই বুঝতে পারলেন তার কার্যকলাপ কতটা বিপজ্জনক। ধানেশ মাস্টার দেখালেন যে, এই তাবিজের রহস্য, এর অভিশাপ এবং মানুষের উপর এর প্রভাব বোঝা না গেলে, গ্রাম কখনো শান্তি পাবে না। তিনি সবার কাছে একটি সতর্কবার্তা দিলেন—তাবিজের শক্তি ব্যবহার করা মানে শুধু সুখ নয়, বরং মৃত্যুর ছায়া প্রত্যেকের জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকবে, এবং এটি প্রতিটি মানুষের নৈতিকতা ও বিবেকের পরীক্ষার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত।
৭
হরিচরণ প্রধান, গ্রামে ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করা ব্যক্তি, তাবিজের রহস্যের খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ নিজের পরিকল্পনা আঁকতে শুরু করল। তার চোখে লোভ এবং আধিপত্যের জ্বালা জ্বলছিল—একটি শক্তি যা মানুষের ইচ্ছা পূরণ করতে পারে, তা যদি তার হাতে চলে আসে, তাহলে গ্রামের উপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। প্রধান নিজেই ভেবেছিল, গ্রামের মানুষদের প্রতি করুণা দেখানো বা ন্যায়বিচারের চিন্তা করার সময় নেই; শুধুই শক্তি এবং ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য। হঠাৎই সে উপলব্ধি করল, শুধুমাত্র সরাসরি তাবিজটি হাতিয়ে নেওয়া যথেষ্ট নয়, বরং গ্রামে ভয়, বিভ্রান্তি এবং সন্দেহ তৈরি করতে হবে, যাতে রঘু নিজের অবস্থান থেকে সরে আসে। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রামের লোকদের মধ্যে গুজব ছড়াতে শুরু করল—রঘু একজন খারাপ ওঝা, যে মানুষের ক্ষতি করছে, যে গ্রামের শান্তি বিঘ্নিত করছে।
প্রধানের ষড়যন্ত্র দ্রুত কার্যকর হতে লাগল। গ্রামে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এবং সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হল। তিনি রাত্রে গোপনে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটালেন, যাতে মনে হয়, রঘুর হাতেই সব সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। গ্রামবাসীরা বিভ্রান্ত হয়ে গেল, কেউ রঘুর দিকে চোখ উঁচু করে তাকায়, কেউ বা সজাগ চোখে তার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে। এই পরিস্থিতিতে, রঘুর উপর মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেল। রঘু বুঝতে পারছিল, প্রধান শুধু তাবিজ চাইছে না, বরং তার বিশ্বাস, মর্যাদা এবং পরিবারকে লক্ষ্য করে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। কমলা বারবার সতর্ক করছিল, “রঘু, প্রধানকে উপেক্ষা করো না, সে শুধু শক্তি চাইছে, তুমি না সাবধান হলে পুরো গ্রামের বিপদ ঘটবে।” কিন্তু রঘুর মন এখনও তাবিজের মায়ায় মত্ত, এবং প্রধানের ষড়যন্ত্রের গভীরতা সে পুরোপুরি বুঝতে পারছিল না।
দ্বন্দ্ব ক্রমেই উন্মুক্ত হতে লাগল। হরিচরণ প্রধান রঘুর ঘরের সামনে হাজির হয়ে সরাসরি চাপ তৈরি করল, তাবিজটি ছেড়ে দিতে বলে। রঘু প্রথমে প্রতিরোধ করল, কিন্তু প্রধানের কঠোরতা এবং গ্রামবাসীর বিভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি তাকে এক অদ্ভুত অবস্থায় ফেলে দিল। গ্রামে ভয়, লোভ এবং ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা একত্রিত হয়ে একটি অদৃশ্য যুদ্ধের আভাস দিচ্ছিল। প্রধানের ষড়যন্ত্র কেবল রঘুর ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়, বরং পুরো গ্রামের নৈতিকতা, সংহতি এবং নিরাপত্তার পরীক্ষা। রঘু বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে শুধু তাবিজের শক্তি নয়, তার বিচক্ষণতা, সাহস এবং নৈতিকতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ। এবং তার মনে এক প্রশ্ন জাগল—এই যুদ্ধ কে জিতবে: লোভ ও আধিপত্যের অন্ধকার, নাকি সততা, মানবতা এবং সচেতন বুদ্ধি?
৮
গ্রামের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল, যখন হঠাৎ এক রহস্যময় ভিক্ষুক গ্রামে প্রবেশ করল। তার পোশাক পুরনো এবং ক্ষীণ, মাথায় এক ধরণের খোল, হাতে কুঁড়ি ও ঝুড়ি, আর চোখে এমন এক গভীর দৃষ্টি, যা প্রথম মুহূর্তেই সকলকে শিহরিত করল। গ্রামের মানুষরা প্রথমে তাকে অবহেলা করলেও, রঘু, কমলা এবং ধানেশ মাস্টার কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। ভিক্ষুকটি, ধীর স্বরে কথা বলতে বলতে, গ্রামবাসীদের চোখের সামনে প্রাচীন রহস্য উন্মোচন করতে শুরু করল। সে বলল, “আমি সেই সাধু, যিনি বহু শতাব্দী আগে এই তাবিজ তৈরি করেছিলেন। এটি কোনো সাধারণ বস্তু নয়। প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ হয়, কিন্তু প্রতিটি পূরণের সঙ্গে একটি প্রাণের বিনিময় বাধ্যতামূলক। তাই এটি অভিশপ্ত—যে কেউ তাবিজ ব্যবহার করবে, তার চারপাশে মৃত্যু এবং বিপদ ছড়াবে।” গ্রামের মানুষের মুখে চমক, ভয় আর বিস্ময়—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। রঘুর মনে এক অদ্ভুত চাপ কাজ করল; এতদিন তিনি ভেবেছিলেন, তাবিজ শুধু ইচ্ছা পূরণের জন্য, কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পারলেন, এর গভীরতা কতটা ভয়ঙ্কর।
সাধু ভিক্ষুক তার কথার সঙ্গে প্রমাণ দেখাতে থাকল। তিনি পুরনো লিপি, তাবিজের খোদাই করা চিহ্ন এবং বহু বছর আগের ঘটনার বর্ণনা গ্রামবাসীর সামনে উন্মুক্ত করলেন। প্রতিটি উদাহরণ এবং তথ্য শুনে রঘু, কমলা ও ধানেশ মাস্টার অবাক হয়ে গেল। ভিক্ষুক ব্যাখ্যা করলেন, “তাবিজটি শক্তিশালী, কিন্তু এর ব্যবহার মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। এটি স্বার্থ, লোভ ও ইচ্ছার প্রলুব্ধির মাধ্যমে মানুষের নৈতিকতা পরীক্ষা করে। তাই, একমাত্র পথ যা বাকি আছে, তা হলো তাবিজকে উৎসর্গ করা, বনের অগ্নিকুণ্ডে ফেলা। অন্য কোনো পন্থা নেই যা এই অভিশাপকে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” এই মুহূর্তে গ্রামের মানুষরা বুঝতে পারল, তাদের মধ্যে যত আতঙ্ক এবং হাহাকার ছড়িয়ে গেছে, তার মূল উৎস হচ্ছে এই অভিশপ্ত শক্তি। রঘু মনের ভেতরে দ্বন্দ্ব অনুভব করল; তিনি জানতেন, তাবিজের শক্তি কেবল প্রলোভন নয়, এটি তার এবং গ্রামের সকলের জন্য এক ধ্বংসাত্মক পরীক্ষা।
সাধু ভিক্ষুক আরও বললেন, “যদি কেউ সাহস দেখায় এবং নিজের স্বার্থের জন্য নয়, বরং গ্রাম এবং মানুষের নিরাপত্তার জন্য তাবিজকে উৎসর্গ করে, তখন অভিশাপ চূড়ান্তভাবে শেষ হবে। তবে এটি সহজ নয়—এটি এক ধরনের আত্মত্যাগ এবং সত্যিকার সাহসের প্রমাণ।” রঘু, গোকুল এবং কমলার চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা জাগল। তারা বুঝতে পারল, শুধু শক্তি পাওয়া বা লোভ মেটানোই নয়, বরং নৈতিকতার পাথেয় এবং সাহসের পরীক্ষা এখন তাদের হাতে। গ্রামের চারপাশে মৃত্যুর ছায়া, হাহাকার এবং আতঙ্ক এখন এক মুহূর্তের জন্য স্থগিত হলেও, সকলের মনে ধীর কিন্তু গভীরভাবে একটি জ্বালা জন্ম নিল—এই তাবিজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, এবং এর চূড়ান্ত সমাধান শুধুই বনের অগ্নিকুণ্ডে ফেলার সাহসিকতার মধ্য দিয়ে সম্ভব। এই সত্যের উপলব্ধি রঘুর মনকে পরিবর্তিত করল, এবং গ্রামবাসী ধীরে ধীরে বোঝতে শুরু করল, যে ভয়, লোভ এবং মৃত্যু—সবই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব যদি তারা সাহসিকতা, নৈতিকতা এবং এক ধরনের আত্মত্যাগ দেখাতে পারে।
৯
রঘু ওঝা এখন তাবিজের শক্তিতে এতটাই মত্ত যে ছাড়ার কথা ভাবতেই পারছিল না। তার মনে প্রতিদিনই এক অদ্ভুত প্রলুব্ধি কাজ করছিল—যে শক্তি মানুষের ইচ্ছা পূরণ করতে পারে, তার হাতে থাকা মানেই প্রায় ঈশ্বরের ক্ষমতা পাওয়া। কিন্তু গ্রামের অন্য দিকে হরিচরণ প্রধানও তাবিজ হাতিয়ে নেবার জন্য প্রস্তুত ছিল। তিনি একদিকে গ্রামের মানুষদের ভয় দেখিয়ে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করছিলেন, অন্যদিকে রঘুর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন, যেন রঘু বিনা ইচ্ছায় তাবিজ ছেড়ে দেয়। এই অবস্থায় গ্রামের মানুষদের মধ্যে বিভাজন ঘটতে লাগল—কেউ রঘুর সঙ্গে, কেউ প্রধানের সঙ্গে। গ্রামের ছোট বড় সবাই যেন একটি অদৃশ্য দ্বন্দ্বের অংশ হয়ে গেল। প্রতিটি গলি, প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি চোখে অদ্ভুত সন্দেহ এবং আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। সেই দুই শক্তির সংঘর্ষে শুধু লোভ এবং ক্ষমতার লড়াই নয়, গ্রামবাসীর জীবন, শান্তি এবং নিরাপত্তা—সবই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেল।
দ্বন্দ্ব ক্রমেই খোলাখুলিভাবে সংঘর্ষে রূপ নিল। রঘু তাবিজ ব্যবহার করে প্রধানের সামরিক পদক্ষেপ এবং পরিকল্পনাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু প্রধানও গ্রামে অশান্তি সৃষ্টি করে গ্রামের লোকদের প্রলুব্ধ করতে লাগল। এই সংঘর্ষে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ল—গ্রামের গলি, আঙিনা এবং মাঠে ধ্বংস এবং আতঙ্কের ছাপ দেখা দিল। কেউ ঘরে নিরাপদভাবে থাকতে পারছিল না, কেউ বাইরে বের হলে অদ্ভুত বিপদের সম্মুখীন হচ্ছিল। কয়েকজন অজ্ঞাত মানুষের মৃত্যু ঘটল—কেউ প্রতিবেশীর দোষে, কেউ আকস্মিক দুর্ঘটনায়। এই দৃশ্য দেখে কমলা, পদ্মা এবং ধানেশ মাস্টার বুঝতে পারল, এখন সময় এসেছে একত্রে কাজ করার। তারা রঘুর ওপর চাপ দিচ্ছিলেন, তাকে বোঝাচ্ছিলেন, তাবিজের প্রলুব্ধি একপাশে রেখে ন্যায়, সাহস এবং নৈতিকতার পথে এগোনোর।
শেষ পর্যন্ত, কমলা, পদ্মা এবং ধানেশ মাস্টার একসাথে তাবিজ দখল করার চেষ্টা করলেন। তারা রঘুর হাত থেকে তাবিজ ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছিল। রঘু প্রথমে প্রতিরোধ করল, তাবিজের আলো জ্বলজ্বল করে তার মত্তি আরও দৃঢ় করছিল। কিন্তু ধানেশ মাস্টারের যুক্তি, কমলার আবেগ এবং পদ্মার দৃঢ়তা ক্রমেই তার মনকে 흔াতে লাগল। এই চূড়ান্ত দ্বন্দ্বে শুধু শক্তির লড়াই নয়, বরং নৈতিকতা, সততা এবং আত্মত্যাগের পরীক্ষাও ছিল। গ্রামে তখন এক অদ্ভুত উত্তেজনা, ভয় এবং আশার মিশ্রণ বিরাজ করছিল। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত—সবই গ্রামবাসীর ভাগ্য নির্ধারণ করতে শুরু করল। এবং রঘু বুঝতে পারল, এই দ্বন্দ্ব শুধু তার জন্য নয়, পুরো গ্রামের জন্য—যেখানে জীবন, মৃত্যু, শক্তি এবং ন্যায় একসাথে পরীক্ষা নিচ্ছে তাদের ধৈর্য এবং সাহসিকতা।
১০
গ্রামের আকাশ অন্ধকার এবং ভয়ঙ্কর, কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতর এক অদ্ভুত আশা জ্বলছিল। কমলা, পদ্মা এবং ধানেশ মাস্টার নিজেদের সাহস ও নৈতিকতায় একত্রিত হয়ে তাবিজটি দখল করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা হাতে নিলেন। রঘু এবং হরিচরণ প্রধান—দুইজনেই তাবিজের প্রলুব্ধি এবং শক্তির মায়ায় মত্ত—তাদের পথ বাধা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কমলার দৃঢ়তা, পদ্মার সাহস এবং ধানেশ মাস্টারের যুক্তি এক সুরে মিশে, রঘুর কাছে তাবিজের প্রকৃত বিপদ বোঝাতে শুরু করল। রঘু প্রথমে প্রতিরোধ করল, তার হাত তাবিজের ঝলক ধরে রাখছিল, কিন্তু হঠাৎ করে তাবিজের অদ্ভুত আলো এবং সাধুর উপস্থিতি তাকে এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি করল। সে বুঝল, এই শক্তি কেবল ইচ্ছা পূরণের জন্য নয়, বরং মৃত্যু এবং ধ্বংসের একটি চক্র।
সবাই বনজঙ্গলের অন্ধকার পথে এগিয়ে চলল, যেখানে সাধু প্রাচীন অগ্নিকুণ্ডের পাশে অপেক্ষা করছিলেন। কমলা তাবিজটি হাতে নিয়ে রঘু এবং প্রধানকে বোঝালেন, যে এই শক্তি ছাড়া তারা কখনো শান্তি বা ন্যায় পাবেন না। রঘু এবং প্রধান তখনও প্রলুব্ধ, কিন্তু কমলার আবেগ, পদ্মার দৃঢ়তা এবং সাধুর শান্ত অথচ শক্তিশালী উপস্থিতি ক্রমেই তাদের মনকে কাঁপাতে লাগল। শেষে, রঘু এবং প্রধানের লোভের কারণে তারা নিজেদের কল্পনার প্রলুব্ধি মুছে ফেলতে পারল না, আর তাবিজ শেষ পর্যন্ত কমলার হাতে ছুটল। কমলা তাবিজকে অগ্নিকুণ্ডে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন, যেখানে আগুন তার অভিশপ্ত শক্তিকে ভস্ম করে দিল। সেই মুহূর্তে গ্রামের আশেপাশে একটি অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল—মৃত্যুর চক্র থেমে গেল, এবং গ্রামবাসী শ্বাস নেওয়ার মতো শান্তি পেল।
কিন্তু রঘু এবং প্রধান—যাদের চোখে লোভ এবং প্রলুব্ধির আঁধার—তাদের প্রলুব্ধি এবং অহংকারের কারণে চিরতরে ধ্বংস হল। তারা নিজেরা বনজঙ্গলের অন্ধকারে হারিয়ে গেল, আর তাবিজের অভিশাপের শেষ চিহ্ন হিসেবে তাদের ধ্বংস একটি শিখা হয়ে রয়ে গেল। আগুনের ভেতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওঠতে লাগল, যা অশরীরী হাসির মতো বনের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিল। সেই হাসি যেন বলছিল, শক্তি এবং লোভের মায়ায় বিভ্রান্ত মানুষ কখনোই জয়ী হতে পারে না, এবং প্রকৃত ন্যায় ও সাহসের বিজয় চিরকাল অক্ষয়। গ্রামবাসী শান্তির নিঃশ্বাস ফেলল, বনের নীরবতা আবার আগের মতো স্থির হয়ে গেল, আর সবাই বুঝতে পারল, কখনো কখনো সাহস, আত্মত্যাগ এবং নৈতিকতা—এই তিনটি গুণই মৃত্যুর ছায়া কাটিয়ে জীবনের সত্যিকারের আলো ফিরিয়ে আনে।
****




