রজত মিত্র
দূরপাল্লার লোকাল ট্রেনটা ধীরে ধীরে গ্রামের ছোট্ট স্টেশনে এসে থামল। বিকেলের নরম আলোয় প্ল্যাটফর্মটা যেন হালকা সোনালি ধুলোয় মোড়া। ট্রেন থেকে নেমে চারপাশের নিস্তব্ধতা অনুভব করতেই মোহনাদের কলকাতার কোলাহলের সঙ্গে একেবারে বিপরীত এক জগৎ মনে হল। হাতে ছোট্ট ট্রলিব্যাগ, আর কাঁধে স্লিংব্যাগ নিয়ে সে স্টেশনের গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। গ্রামের রাস্তা নির্জন, দু’পাশে শিউলি আর শালবনের সারি। দূরে দেখা যায়, ধূসর এক প্রাসাদসদৃশ বাড়ি, আকাশের নিচে একাকী দাঁড়িয়ে আছে—সেটাই রায়চৌধুরী বাড়ি। বাবার মুখে অনেক শুনেছে এ বাড়ির গল্প, কিন্তু বাস্তবে দেখে যেন বুকের ভিতরে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। অটোরিকশা চালক যখন ভাড়া নেওয়ার পর তার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, “মেমসাহেব, ওই বাড়িতে একা থাকবেন না… পুজোর সময় খুব অদ্ভুত জিনিস হয়,” তখন মোহনা হেসে উড়িয়ে দিল, কিন্তু মনে কোথাও এক কাঁপুনি থেকে গেল।
গেটের ভেতরে ঢুকতেই ভাঙা পাথরের পথ, তার ফাঁক দিয়ে ঘাস গজিয়েছে। বাড়ির দেয়ালে সময়ের ছাপ স্পষ্ট—খসে পড়া প্লাস্টার, কালচে শ্যাওলার দাগ, আর জঙ্গলে ঢাকা কোণে কোণে মাকড়সার জাল। তবু অদ্ভুতভাবে, এই জরাজীর্ণতার মাঝেও আছে এক আভিজাত্যের ছোঁয়া—দরজার খোদাই, বারান্দার লোহার রেলিং, আর ছাদের নকশা যেন এখনও গর্ব করে পুরনো দিনের গল্প বলে যায়। ব্রজেন সর্দার, রাজবাড়ির পুরনো কর্মচারী, গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। চোখেমুখে আনন্দ আর চিন্তার মিশ্রণ নিয়ে সে বলল, “মোহনা মেমসাহেব, এতদিন পর এলেন? বাবু খুব খুশি হবেন।” বাড়ির ভেতরে ঢোকার সময় মোহনা অনুভব করল, চারপাশে যেন এক অদৃশ্য স্তব্ধতা চেপে বসেছে—যেখানে পাখির ডাকও যেন কেমন থমকে গেছে।
ভেতরের বসার ঘরে নীলচন্দ্র রায়চৌধুরী বসে ছিলেন, মাথার চুল সাদা হলেও চোখের দৃষ্টি কঠিন ও তীক্ষ্ণ। বাবার সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দে মোহনা এগিয়ে গেল, কিন্তু তার চোখে খেয়াল হল—নীলচন্দ্র যেন অদ্ভুতভাবে ক্লান্ত, যেন অজানা কোনও চিন্তা তাকে গ্রাস করে রেখেছে। কিছু সৌজন্য বিনিময়ের পর তিনি চুপচাপ জানালেন, “এবার পুজোটা একটু সাবধানে কাটাতে হবে, মুন… অনেক বছর ধরে যা চলে আসছে, এ বছরও সেটা হবে।” মোহনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি বলছেন? ওই অগ্নি-আচার?” নীলচন্দ্র কোনও উত্তর দিলেন না, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। রাতে খাওয়ার পর মোহনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাল। দূরে গ্রামের আলো যেন ভয়ে জ্বলছে, আর বাড়ির বাইরে কোনও মানুষের আওয়াজ নেই। যেন এই রাজবাড়ির চারপাশে এক অদৃশ্য সীমানা টানা আছে, যা কেউ পেরোয় না।
পরে ব্রজেন এসে পাশে দাঁড়িয়ে ধীর স্বরে বলল, “আপনি হয়তো শহরে এসব বিশ্বাস করেন না, কিন্তু এখানে সবাই জানে—পুজোর আগে তান্ত্রিক আচার শুরু হয়, আগুন জ্বলে ওঠে, আর শেষ হলে… কেউ না কেউ হারিয়ে যায়। কতবার বলেছি বাবুকে, কিন্তু তিনি কিছুই বদলান না।” মোহনা হেসে বলল, “ব্রজেনদা, এগুলো কুসংস্কার ছাড়া কিছু না।” কিন্তু মনে মনে সে স্বীকার করল—এ বাড়িতে আসার পর থেকেই এক অদ্ভুত চাপা ভয় তার ভেতরে জমে উঠছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে সে দেখল, আকাশের ওপরে অর্ধেক চাঁদ ভাসছে, আর রাজবাড়ির গায়ে সেই চাঁদের আলো পড়ে ছায়াগুলো আরও গভীর হয়ে উঠছে। সেই ছায়ার ভেতর কোথাও যেন লুকিয়ে আছে অজানা এক রহস্য, যা আগামী দিনগুলোয় ধীরে ধীরে মুখ তুলে ধরা শুরু করবে।
–
দক্ষিণেশ্বর থেকে ছেড়ে আসা বাসটি বিকেলের শেষ আলোয় ধুলো উড়িয়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় ঢুকে পড়ল। জানালার ধারে বসে দেবাশিস মুখোপাধ্যায় মনের মধ্যে তার অ্যাসাইনমেন্টের পরিকল্পনা সাজাচ্ছিল। কলকাতার একটি জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ করে সে, আর এইবার তার সম্পাদক তাকে পাঠিয়েছে এমন একটি গল্প কভার করতে, যা “অতিপ্রাকৃত” কলামের শিরোনামে কয়েকদিন ধরে ভাইরাল হয়ে আছে—রায়চৌধুরী রাজবাড়ির অগ্নি-আচার ও নিখোঁজের ঘটনা। সাংবাদিক হিসেবে দেবাশিস যুক্তিবাদী, কিন্তু পাঠকের মন টানতে হলে রহস্যের গন্ধ চাই—এবং এই কাহিনিতে সেটি প্রচুর আছে। গ্রামে নামতেই সে টের পেল, বাতাসে যেন একটা অদ্ভুত গন্ধ—শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাসের সঙ্গে কোথাও পোড়া কাঠের হালকা ধোঁয়ার আভাস, যা অস্বস্তি তৈরি করল। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে যখন সে রাজবাড়ির রাস্তা জানতে চাইলো, দোকানদারের চাহনিতে স্পষ্ট ছিল অনিচ্ছা, যেন রাজবাড়ির নাম উচ্চারণ করাটাই অপশকুন।
সন্ধের দিকে, কাঁচা রাস্তা ধরে হেঁটে রাজবাড়ির গেটে পৌঁছাল দেবাশিস। ভেতরে পা রাখার আগেই গেটের ধারে দেখা হল ব্রজেন সর্দারের সঙ্গে। পাকা বয়সের মানুষ, মুখের ভাঁজে জমে থাকা অভিজ্ঞতার ছাপ, আর কণ্ঠে চাপা আতঙ্ক। দেবাশিস নিজেকে সাংবাদিক বলে পরিচয় দিতেই ব্রজেন তাকে ভেতরে ডাকল, তবে চোখে এক অদ্ভুত সাবধানবাণীর ঝলক ছিল। বসার ঘরে বসে চা হাতে নিয়ে ব্রজেন শুরু করল গল্প—“সত্তর বছর হলো, প্রতি বছর পুজোর আগে এই আচার হয়। তান্ত্রিক আসে, আগুন জ্বলে, আর শেষ হলে গ্রাম থেকে একজন মানুষ উধাও হয়ে যায়। কেউ জানে না তারা কোথায় যায়, আর তাদের দেহ কখনও পাওয়া যায়নি।” তার কণ্ঠে এমন নিশ্চয়তা ছিল যে, যুক্তিবাদী দেবাশিসও কিছুটা নীরব হয়ে গেল। সে নোটবুকে দ্রুত কিছু লিখে নিল, কিন্তু মনেই ঠিক করে ফেলল—এই রহস্যের মূলে যেতে হবে, হয়তো কোনও অপরাধী গোষ্ঠী এই আচারকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করছে।
রাত নামার পর ব্রজেন তাকে রাজবাড়ির কিছু পুরনো গল্প শোনাল—কীভাবে একসময় রাজবাড়ির পুজোয় হাজার লোক জড়ো হত, কিন্তু আজ শুধুই ভাঙাচোরা দেয়াল আর আতঙ্কগ্রস্ত গ্রামের মানুষ। কথার ফাঁকে ফাঁকে ব্রজেন জানাল, গত বছর এক যুবক—রত্না পালের স্বামী—আচারের রাতের পর থেকে নিখোঁজ। কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। “ওই আগুনে কিছু আছে বাবু,” ব্রজেনের কণ্ঠে একধরনের গা-ছমছমে ভয়। দেবাশিস মৃদু হাসি দিয়ে বলল, “আচ্ছা, আমি কিন্তু এবার ওই রাতটা রাজবাড়ির ভেতরে কাটাবো। ছবিও তুলব, ভিডিওও করব। দেখি কতটা সত্যি এই গল্প।” ব্রজেন কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, “আপনি যদি ওখানে থাকেন, সাবধানে থাকবেন—ওই আগুনে চোখ রাখবেন না।” এই সতর্কবাণী যেন কানে লেগে রইল, যদিও দেবাশিস তখনও বিশ্বাস করছিল না, এ সব কেবল কুসংস্কার।
নিজের ঘরে ফিরে ল্যাপটপে কিছু পুরনো খবর ঘেঁটে দেখল দেবাশিস—বিগত কয়েক দশকের মধ্যে এই গ্রাম থেকে প্রতি দুর্গাপূজার আগে অন্তত একজন মানুষের নিখোঁজ হওয়ার সরকারি রেকর্ড আছে। সব ঘটনাই রহস্যজনক, কোনও সাক্ষী নেই, আর নিখোঁজের আগে প্রত্যেককে শেষবার রাজবাড়ির কাছাকাছি দেখা গেছে। তথ্যের এই মিল তাকে খানিকটা চমকে দিল। বাইরে তখন অমাবস্যার কালো রাত, বাতাসে অদ্ভুত স্থিরতা, যেন গ্রামের সমস্ত শব্দ কেউ শুষে নিয়েছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে সে দেখল রাজবাড়ির উঠোনে এক মুহূর্তের জন্য কোনও ছায়ামূর্তি নড়ে উঠল, তারপর মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি কিছুটা বেড়ে গেলেও, মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করল—যা-ই ঘটুক, এই রহস্য সে উন্মোচন করেই ফিরবে, আর আচারের রাতের আগে রাজবাড়ির প্রতিটি কোণ ঘুরে দেখবে।
–
সকালবেলায় মোহনা রাজবাড়ির বাগানের পেছনের দিকটা ঘুরতে বেরিয়েছিল। শিউলি গাছের নীচে সাদা ফুলের গালিচা, কুয়াশায় ঢাকা ঘাসের গন্ধ—সবকিছু যেন কলকাতার ব্যস্ততা থেকে বহু দূরের এক শান্ত জগৎ। কিন্তু সেই শান্তির মধ্যে হঠাৎই তার চোখে পড়ল—একপাশে ঝোপের আড়াল দিয়ে একটি সরু পথ চলে গেছে জঙ্গলের দিকে। কৌতূহলবশত সে সেই পথে এগিয়ে গেল। কিছুটা হেঁটেই দেখা মিলল এক ভাঙাচোরা মন্দিরের, লাল ইটের দেয়াল শ্যাওলা আর মস দিয়ে ঢেকে গেছে, আর ছাদের অর্ধেকটাই ভেঙে পড়েছে। ভিতর থেকে ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে আসছিল, সঙ্গে গভীর, গম্ভীর স্বরে কোনও মন্ত্রপাঠ। চুপচাপ দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়েই সে প্রথম দেখল মহাদেব তান্ত্রিককে—গেরুয়া পোশাক, জটাজুট চুল, কপালে চন্দন আর সিঁদুরের মিশ্রণ, আর চোখ দুটো অস্বাভাবিক ভাবে উজ্জ্বল।
মন্দিরঘরের ভিতরটা যেন বাইরের দিনের আলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক জগৎ। অন্ধকারে মোমবাতির হলুদ আলো ঝিকমিক করছে, দেয়ালে আগুনের প্রতীক আঁকা—লেলিহান শিখার মতো বাঁকানো রেখা, মাঝে মাঝে মানুষের মুখের ছায়া যেন ফুটে উঠছে। মাটিতে গেরুয়া রঙের পাউডার দিয়ে আঁকা অদ্ভুত চিহ্ন, যা মোহনাকে মনে করিয়ে দিল প্রাচীন কোনও যজ্ঞবেদীর কথা। তান্ত্রিক বসে আছেন মাটিতে, চোখ বন্ধ, ঠোঁট নড়ছে দ্রুত, যেন শব্দের ধারায় বাতাসও কেঁপে উঠছে। হঠাৎই তিনি থেমে চোখ মেলে তাকালেন—সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা, যা মুহূর্তে মোহনাকে স্তব্ধ করে দিল। কোনও প্রস্তাবনা ছাড়াই তিনি বললেন, “আগুনই রাজবাড়িকে রক্ষা করে। আগুনকে খুশি না করলে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।” তার গলায় এক ধরণের অচেনা ভারী প্রতিধ্বনি, যেন মন্দিরের দেয়ালও সেই কথা পুনরাবৃত্তি করছে।
মোহনা একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল, “আপনি কি ওই অগ্নি-আচারের কথা বলছেন? এটা কি সত্যিই দরকারি?” তান্ত্রিক হালকা হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা ছিল না—বরং ছিল ভয়ঙ্কর নিশ্চয়তার আভাস। “দরকারি নয়, অপরিহার্য। তোমার পূর্বপুরুষরা এই চুক্তি করেছে—প্রতি বছর অগ্নিকে অর্ঘ্য না দিলে রাজবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে, গ্রামও রক্ষা পাবে না। এই শিখার মধ্যে দিয়ে আত্মারা মুক্তি পায়।” মোহনার মনে হল, তান্ত্রিকের প্রতিটি শব্দ যেন ঘন ধোঁয়ার মতো তার চারপাশে পাক খাচ্ছে, আর সে যত শ্বাস নিচ্ছে, ততই অদৃশ্য অন্ধকার তার ফুসফুসে ঢুকে পড়ছে। একটা চাপা ভার, যেন কারও অদৃশ্য হাত তার কাঁধে রেখে ধীরে ধীরে মাটির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে চাইল না। বাইরে বেরিয়ে এল, কিন্তু দেখল দিনের আলোও যেন এখানে কম উজ্জ্বল। গাছের পাতা, মাটির রং—সবকিছু যেন অল্প অল্প কালচে ছায়ায় ঢেকে আছে। হাঁটতে হাঁটতে তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল, মনে হল এখনও যেন তান্ত্রিকের চোখ তার পেছনে লেগে আছে। দূর থেকে রাজবাড়ির বারান্দা দেখা গেল, যেখানে বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকে দেখছেন। মোহনা এক অজানা শঙ্কায় ভরে উঠল—মন্দিরঘরের ভিতরের সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ কি কেবলই কুসংস্কারের ছায়া, নাকি সত্যিই কোনও অদৃশ্য শক্তি রাজবাড়িকে ঘিরে আছে? তার অজান্তেই মনে প্রশ্ন জাগল—আগুন কি সত্যিই রক্ষা করে, নাকি ধ্বংস ডেকে আনে?
–
দুপুরের দিকে গ্রাম চত্বরের পাশে এক পানের দোকানে বসে দেবাশিস খাতায় কিছু নোট লিখছিল। হঠাৎই ব্রজেন এসে ইশারায় তাকে ডেকে নিয়ে গেল সরু গলির ভেতর, যেখানে একটি ছোট, মাটির দেয়ালের ঘর। ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক তরুণী—মুখ শুকনো, চোখের নীচে গভীর কালচে দাগ, গায়ে মলিন শাড়ি। ব্রজেন পরিচয় করিয়ে দিল, “এই রত্না পাল… গত বছরের দুর্গানবমীর রাতে স্বামীকে হারিয়েছে।” রত্নার চোখে কেমন একটা ফাঁকা দৃষ্টি, যেন দুঃখের সব রং মুছে গেছে। ভিতরে নিয়ে গিয়ে তারা বসতে না বসতেই রত্না নিজের গল্প শুরু করল—“সেই রাতে মাইক বাজছিল, ঢাকের আওয়াজে চারদিক ভরে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখি, আমার স্বামী চন্দন—চোখ যেন কারও মন্ত্রে বাঁধা—ধীরে ধীরে রাজবাড়ির দিকে হাঁটছে। আমি ডাকলাম, কাঁধ টেনে ধরলাম, কিন্তু সে যেন আমাকে চিনতেই পারছিল না। আগুনের কাছাকাছি যেতেই লোকজন সরে গেল, আর এক ঝলক আগুনের আলোয় তাকে শেষবার দেখলাম… তারপর আর কখনও পাইনি।”
রত্নার কণ্ঠে কোনও নাটকীয়তা নেই—শুধুই একধরনের ক্লান্ত অবিশ্বাস, যেন এত বছরেও সে ঘটনাটা সত্যি বলে মেনে নিতে পারেনি। সে স্পষ্ট বলল, “সবাই বলে অভিশাপ, কিন্তু আমি জানি, এটা মানুষের কাজ। ওই নীলচন্দ্র—তোমাদের রাজবাড়ির মালিক—ওই আচারের আড়ালে কিছু লুকোচ্ছে। আমার স্বামী আগে রাজবাড়ির গোপন ঘরে কাজ করত, অনেক পুরনো সিন্দুক-তালা ঠিক করত। দুর্ঘটনার কয়েকদিন আগে সে বলেছিল, ‘রত্না, আমি কিছু পেয়েছি… যা আমাদের জীবন বদলে দেবে।’ তারপরেই সব শেষ।” দেবাশিস খেয়াল করল, এই বক্তব্যে নতুন একটা সূত্র আছে—রাজবাড়ির ভিতরে হয়তো সত্যিই কিছু গোপন ধন বা প্রমাণ আছে, আর সেই কারণেই নিখোঁজের ঘটনা ঘটছে। সে রত্নাকে শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করল, কোনও প্রমাণ বা জিনিস কি তার স্বামীর কাছে ছিল? রত্না মাথা নাড়ল, “সব গায়েব হয়ে গেছে। ওর ঘরের কাগজপত্র, ব্যাগ—সব।”
দেবাশিস নোটবুকে দ্রুত কয়েকটি পয়েন্ট লিখে রাখল—রত্নার স্বামী, রাজবাড়ির গোপন ঘর, পুরনো সিন্দুক, দুর্গানবমীর আগুন। ঘটনাগুলির মধ্যে যেন কোনও যোগসূত্র আছে, কিন্তু এখনই পরিষ্কার নয়। তার সাংবাদিক প্রবৃত্তি বলছিল, কেউ ইচ্ছে করে এই আচারকে ভয়ঙ্কর ও অলৌকিক রূপ দিয়ে প্রকৃত অপরাধকে আড়াল করছে। “হয়তো এটা স্রেফ পাচারের রুট,” মনে মনে ভাবল দেবাশিস, “অথবা পুরনো ধনসম্পদ চুরির কৌশল।” কিন্তু একই সঙ্গে তার মাথায় প্রশ্ন ঘুরছিল—যদি সত্যিই কারও উপর কোনও মানসিক প্রভাব বা মাদক ব্যবহার করে আগুনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে সেটা কীভাবে এত বছর ধরে কারও চোখে পড়েনি? ব্রজেনও পাশে বসে ধীরে ধীরে বলল, “রত্না মেয়েটা যা বলছে, তাতে কিছু সত্যি আছে বোধহয়। কিন্তু গ্রামে এসব নিয়ে কেউ মুখ খোলে না—ভয় আছে, আর ভয়ের চেয়েও বড়, অভ্যাস।”
রত্না হঠাৎই দেবাশিসের চোখে চোখ রেখে বলল, “আপনি যদি এই গল্প লিখতে চান, তবে সত্যিটা খুঁজে লিখবেন। শুধু অভিশাপের কথা লিখে মজা নেবেন না। আমি চাই সবাই জানুক, আমার স্বামীকে কেউ নিয়েছে, আগুন নয়।” তার কণ্ঠে দৃঢ়তা ছিল, কিন্তু সেই দৃঢ়তা ঢেকে রেখেছিল বছরের পর বছর জমে থাকা যন্ত্রণা। দেবাশিস চুপ করে মাথা নাড়ল—এই মেয়েটির জন্য হলেও তাকে সত্যিটা খুঁজে বের করতেই হবে। ঘর থেকে বেরিয়ে রোদে পা রাখতেই মনে হল, রাজবাড়ি যেন দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করছে—তার ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে, পোড়া দেয়ালের অদৃশ্য ফাঁক দিয়ে। আর সেই দৃষ্টির ভেতরে হয়তো লুকিয়ে আছে রত্নার স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার উত্তর।
–
সেই রাতে রাজবাড়িতে যেন অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। দিনের বেলায় যেখানে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজে বাতাস কেঁপে থাকে, সেখানে এখন কেবল নীরবতা, এতটাই গভীর যে নিজের শ্বাসের শব্দও বেশি জোরে শোনা যায়। মোহনা তার ঘরে বসে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে ছিল। চাঁদ মেঘের আড়ালে, কেবল মাঝে মাঝে ফাঁক দিয়ে রুপোলি আলো বেরিয়ে এসে রাজবাড়ির ভাঙা বারান্দা ও বাগানের শুকনো গাছগুলোকে ভূতের মতো দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎই তার দৃষ্টি থমকে গেল—দূরে, পুরনো কুয়ার পাশে, এক কালো চাদরে ঢাকা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মুখ ঢাকা, চাদর এত লম্বা যে প্রায় মাটিতে লেগে গেছে, আর চাঁদের আলোতেও শরীরের কোনও অংশ বোঝা যাচ্ছে না। যেন এক ছায়া মানুষের রূপ নিয়েছে।
প্রথমে মোহনা ভেবেছিল, হয়তো গ্রামের কেউ। কিন্তু স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি, সেই নিস্তব্ধ উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু টানটান হয়ে উঠল। মানুষের চোখ না দেখেও, সে অনুভব করল যে কালো চাদরের নিচ থেকে সেই মানুষটা সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে। বুকের ভেতরে ধপধপ শব্দ বেড়ে গেল, কণ্ঠ শুকিয়ে এল। ঠিক তখনই মেঘের ফাঁক দিয়ে হালকা আলো পড়তেই দেখা গেল, চাদরের নিচে এক অদ্ভুত নড়াচড়া—যেন বাতাসের বিপরীতে চাদর একটু ফুলে উঠল, অথচ আশেপাশের গাছের পাতাগুলো একটুও নড়ছে না। মোহনা দ্রুত জানালা থেকে সরে এল, কিন্তু কৌতূহল ও ভয়ের মিশ্রণে আবার উঁকি দিতে গিয়ে দেখল—সে মানুষটা নেই, যেন কখনও ছিলই না।
মোহনার মনে অস্বস্তি আরও বাড়ল, তাই সে নিচে গিয়ে ব্রজেনকে খুঁজে বের করল। ব্রজেন যখন শুনল সে কী দেখেছে, তখন তার মুখে এক অদ্ভুত গম্ভীরতা নেমে এল। “তুমি ওকে দেখেছ? কালো চাদরের মানুষ?” সে ধীরে ধীরে বলল, “ওকে দেখলে বুঝে নাও, আচার শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। ও হল সেই ইঙ্গিত, যা প্রতি বছর আগুনের আগে দেখা যায়। গ্রামের সবাই জানে, ওর মুখ কেউ দেখলে আর বেশিদিন বাঁচে না—অথবা বেঁচে থাকলেও অদৃশ্য হয়ে যায়।” ব্রজেনের গলায় কাঁপুনি ছিল না, বরং এক ধরনের অভিজ্ঞতার নিশ্চয়তা, যেন সে অনেকবার এই কথা বলেছে। মোহনা চেষ্টা করল যুক্তি দিয়ে বোঝার—“তাহলে ও কে? রাজবাড়ির লোক?” কিন্তু ব্রজেন মাথা নাড়ল, “না, ও রাজবাড়িরও নয়, গ্রামেরও নয়। ও যেন শুধু এই সময়ে আসে, আর আচারের পর অদৃশ্য হয়।”
রাত বাড়তে থাকল, কিন্তু মোহনার চোখে ঘুম এল না। জানালাটা বন্ধ করে দিলেও মনে হচ্ছিল বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, নীরবে তাকিয়ে আছে তার ঘরের দিকে। একসময় বাতাসে ধূপের মতো এক গন্ধ ভেসে এল—জ্বালানির ধোঁয়া, কিন্তু তাতে ছিল অদ্ভুত মিষ্টি ভাব, যা তাকে অস্বস্তিকরভাবে মনে করিয়ে দিল তান্ত্রিকের মন্দিরঘরের গন্ধ। সেই গন্ধ যেন ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকে তার মস্তিষ্কে কুয়াশা ছড়িয়ে দিচ্ছে। মোহনা বিছানায় বসে নিজের হাতের তালু জড়িয়ে ধরল, চেষ্টা করল মনকে শান্ত রাখতে। কিন্তু মনে হল, রাজবাড়ির চারপাশের অন্ধকার, সেই কালো চাদরের মানুষ আর আসন্ন অগ্নি-আচার—সব মিলে কোনও অজানা ফাঁদ তার দিকে এগিয়ে আসছে, যেখান থেকে মুক্তি পাওয়া হয়তো আর সম্ভব হবে না।
–
দুর্গানবমীর আগের দিন ভোর থেকেই রাজবাড়ির উঠোনে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা শুরু হয়েছিল। গাছের ডাল, পুরু বাঁশ আর বিশাল কাঠের গুঁড়ি টেনে আনা হচ্ছে গ্রামসংলগ্ন বনের দিক থেকে। একে একে উঠোনের মাঝখানে একটি অস্বাভাবিক বড় কাঠের চিতা তৈরি হতে লাগল—এত বড় যে মনে হয় একসাথে কয়েকজন মানুষকে পোড়ানো যাবে। কাঠের গন্ধ, মাটি খোঁড়ার শব্দ আর মাঝে মাঝে তান্ত্রিকের গভীর মন্ত্রোচ্চারণে উঠোনের বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, গ্রামবাসীরা কেউ সরাসরি কাজ করতে দেখা না গেলেও, ব্রজেনের সূত্রে দেবাশিস বুঝতে পারল—গ্রামের কয়েকজন গোপনে তান্ত্রিককে সাহায্য করছে। তারা রাতের অন্ধকারে কাঠ এনে রাখে, তারপর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। কেউ কোনও প্রশ্ন করে না, আর সেই নীরবতাই যেন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।
দেবাশিস সাংবাদিকের প্রবৃত্তি থেকে নিজের ক্যামেরা নিয়ে উঠোনের এক কোণে গিয়ে ছবি তুলতে শুরু করল। প্রতিটি কাঠের স্তূপ, প্রতিটি বাঁশের বাঁধন—সব কিছু তার মনে করিয়ে দিচ্ছিল এটি শুধু একটি চিতা নয়, বরং কোনও বিশেষ আচার পালনের জন্য পরিকল্পিত কাঠামো। মন্ত্রপাঠ থামার পর তান্ত্রিক একবার চিতার চারপাশ ঘুরে এসে মাটিতে গেরুয়া রঙে কিছু চিহ্ন আঁকল। দেবাশিস জুম লেন্সে দেখে অবাক হয়ে গেল—চিহ্নগুলো আগুনের শিখার আকারের, আর প্রতিটি যেন ভেতরে কোনও পুরনো ভাষায় লেখা কিছু বহন করছে। সে আরও কয়েকটি ছবি তুলতে গিয়েই হঠাৎ বুঝল, ক্যামেরার স্ক্রিন কালো হয়ে গেছে। ব্যাটারি ঠিক আছে, লেন্স ঠিক আছে, কিন্তু ক্যামেরা যেন এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সে এক মুহূর্তের জন্য ঠান্ডা ঘাম অনুভব করল—এত বছর সাংবাদিকতায় থেকেও এমন ঘটেনি।
নীলচন্দ্র সারা সময়ই উঠোনের একপাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সাধারণত তিনি খুব সক্রিয়, রাজবাড়ির কাজকর্মে যুক্ত থাকেন, কিন্তু আজ তিনি অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ। তাঁর মুখে গভীর চিন্তার ছায়া, চোখ যেন দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, তিনি কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু ঠোঁট নড়লেও শব্দ বেরোচ্ছে না। মোহনা, যিনি সারা দিনই বাবার মনের অবস্থা লক্ষ্য করছিলেন, বুঝতে পারলেন—নীলচন্দ্রের কাঁধে কোনও সিদ্ধান্তের বোঝা আছে, যা তাঁকে ভেতর থেকে চেপে ধরছে। দেবাশিসও এই নীরবতা খেয়াল করল—এমন নীরবতা যা কোনও ভয়ের নয়, বরং আত্মত্যাগ বা অপরিহার্য মেনে নেওয়ার মতো অনুভূতির।
বিকেল গড়িয়ে আসতেই উঠোনের চিতা সম্পূর্ণ হয়ে গেল। তান্ত্রিক তার চারপাশে ধূপ ও প্রদীপ বসিয়ে দিল, আর হালকা ধোঁয়া উঠতে শুরু করল। ধোঁয়ার গন্ধে ছিল এক অদ্ভুত মিষ্টি-তিক্ত মিশ্রণ, যা শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় কেমন যেন চাপ সৃষ্টি করছিল। মোহনা অনুভব করল, এই প্রস্তুতি যেন কেবল আগুন জ্বালানোর জন্য নয়—বরং আগুনের ভিতর কিছু বা কাউকে আহ্বান করার জন্য। দূরে মেঘ জমে উঠছিল, যেন আকাশও এই ঘটনার সাক্ষী হতে প্রস্তুত হচ্ছে। আর রাজবাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি জানালা যেন অপেক্ষা করছে—কিসের জন্য, তা কেউ স্পষ্ট জানে না, কিন্তু সবাই বোঝে, আজকের এই প্রস্তুতি আগামী রাতের ভয়াবহতার শুরু।
–
রাত নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজবাড়ির চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়ল। চাঁদ ছিল আকাশে, কিন্তু মেঘের আস্তরণে তার আলো বারবার ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল, ফলে উঠোন আর বারান্দা অর্ধেক আলো-অর্ধেক ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছিল। চারপাশে কেবল দূরের পেঁচার ডাক আর বাতাসে শুকনো পাতার খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ঠিক মধ্যরাতের আগে রাজবাড়ির উঠোনে তান্ত্রিক এসে দাঁড়াল, কালো ধুতি আর গেরুয়া চাদরে মোড়া, হাতে তামার ঘণ্টা আর একটি বড় শাঁখ। ধীরে ধীরে গ্রামের কয়েকজন গোপন সহায়ক, যাদের মুখ চেনা যায় না, এসে চিতার চারপাশে বসে পড়ল। তান্ত্রিক চোখ বন্ধ করে গভীর সুরে মন্ত্রপাঠ শুরু করল—প্রথমে ধীর, তারপর ধীরে ধীরে তীব্র। সেই শব্দে উঠোনের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল, আর মনে হচ্ছিল, অন্ধকার নিজেই নড়াচড়া করছে।
মন্ত্রপাঠের মাঝেই তান্ত্রিক একটি মশাল চিতার নিচে ধরল। প্রথমে ধোঁয়ার সরু রেখা উঠল, তারপর হঠাৎই আগুন ফেটে বেরিয়ে এল—লাল, কমলা আর সোনালি শিখা মিলেমিশে এক অদ্ভুত রঙ তৈরি করল। সেই শিখা যেন সাধারণ আগুন নয়; প্রতিটি শিখার মাথায় হালকা নীল আভা জ্বলজ্বল করছিল। আগুন কয়েক মুহূর্তে এত উঁচু হয়ে উঠল যে মনে হচ্ছিল, আকাশ ছুঁতে চলেছে। গ্রামের মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, কেউ কাছে আসার সাহস পেল না। তাদের মুখে ছিল আতঙ্ক, বিস্ময় আর কিছুটা অদ্ভুত শ্রদ্ধার মিশ্র অভিব্যক্তি। মাঝে মাঝে কারও মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরোচ্ছিল—প্রার্থনা না অভিশাপ, বোঝা যাচ্ছিল না। আগুনের আলোতে রাজবাড়ির পুরনো দেওয়ালগুলো লালচে হয়ে উঠছিল, আর জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ছায়াগুলো নড়ছিল, যেন কেউ বা কিছু সেখান থেকে তাকিয়ে আছে।
এই ভয়ঙ্কর দৃশ্যের মাঝেই মোহনা আর দেবাশিস চুপিচুপি বারান্দার পেছন দিক দিয়ে রাজবাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কাছ থেকে আচারের আসল রহস্য দেখা, কিন্তু ভিতরে ঢুকতেই তারা অনুভব করল ভিন্ন এক পরিবেশ—বাইরের আগুনের তাপ এখানে পৌঁছাচ্ছে না, বরং ভিতরে বাতাস ঠান্ডা, এবং তাতে এক ধরনের ধূপ-গন্ধ মিশে আছে যা মাথা ঘুরিয়ে দেয়। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় তারা শুনতে পেল, উপরের তলা থেকে যেন হালকা ফিসফিসানি আসছে—একজনের নয়, অনেক কণ্ঠের, যাদের মন্ত্রপাঠ তান্ত্রিকের মন্ত্রের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলছে। করিডোরের শেষে পৌঁছেই দেবাশিস হঠাৎ থমকে দাঁড়াল—একটি ঘরের দরজা আধখোলা, আর ভেতরে আগুনের প্রতিফলনে নাচছে কিছু ছায়া। তারা বুঝতে পারল, আসল আচার সম্ভবত চিতার কাছে নয়, বরং এই ঘরের ভেতরে ঘটছে।
তান্ত্রিকের মন্ত্রপাঠ ক্রমশ দ্রুততর হচ্ছিল, আর বাইরে আগুন এমনভাবে জ্বলছিল যে শিখার ধারে হালকা মানবাকৃতির অবয়ব দেখা যাচ্ছিল। কেউ কেউ বলত, এগুলো অতৃপ্ত আত্মা, আবার কেউ বিশ্বাস করত এগুলো দেবতার দূত। কিন্তু মোহনা আর দেবাশিস কাছে এসে দেখল, অবয়বগুলো আগুন থেকেই জন্ম নিচ্ছে না—বরং চিতার পেছনের অন্ধকার থেকে এগিয়ে এসে আগুনে ঢুকে যাচ্ছে, যেন কোনও অদৃশ্য শক্তি তাদের টেনে নিচ্ছে। সেই মুহূর্তে মোহনা অনুভব করল, তারা এমন এক ঘটনার মধ্যে রয়েছে যা যুক্তি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। দেবাশিস দ্রুত তার নোটবুকে কয়েকটি লাইন লিখে নিল, কিন্তু বুঝতে পারল—এখান থেকে বেরিয়ে বেঁচে যাওয়াটাই এখন তাদের প্রথম কাজ, কারণ এই রাত কেবল রাজবাড়ির নয়, সমগ্র গ্রামের জন্য ভয়ের চূড়ান্ত মুহূর্ত হয়ে উঠছে।
–
আগুনের শিখা এখন এমনভাবে আকাশ ছুঁতে চাইছে যে মনে হচ্ছিল, মেঘ ভেদ করে তারা ছুঁয়ে ফেলবে। মোহনা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে দেখল—শিখার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে কিছু অবয়ব বেরিয়ে আসছে। প্রথমে মনে হচ্ছিল, এগুলো কেবল ধোঁয়া ও আলোয় তৈরি ভ্রম, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই বোঝা গেল, এগুলো মানুষের মতো আকৃতি—কেউ লম্বা, কেউ খাটো, কেউ হাত উঁচু করে যেন কিছু চাইছে, আবার কেউ কাঁধ ঝুঁকিয়ে হাঁটছে, যেন ক্লান্ত বা আহত। আগুনের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তাদের পোড়া গন্ধ আসছিল না, বরং এক ধরনের শীতলতা ছড়াচ্ছিল তাদের উপস্থিতি। শিখার প্রতিটি নড়াচড়ায় তাদের মুখে ভেসে উঠছিল অব্যক্ত যন্ত্রণা, চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা, যেন বহু যুগ ধরে অন্ধকারে আটকে থেকে অবশেষে বাইরে বেরিয়েছে। সেই মুহূর্তে তান্ত্রিক উঁচু গলায় ঘোষণা করল, “দেখো! এরা অভিশপ্ত আত্মারা—অগ্নির মাধ্যমে মুক্তি পেতে এসেছে!” তার কণ্ঠের প্রতিটি শব্দে আগুন যেন আরও উঁচু হয়ে উঠছিল।
গ্রামের মানুষ দূর থেকে সবকিছু দেখছিল, কিন্তু কারও সাহস হচ্ছিল না এগিয়ে যাওয়ার। অনেকের মুখে প্রার্থনার ফিসফিসানি, আবার কারও চোখে বিস্ময় ও অবিশ্বাস। তান্ত্রিক দুই হাত তুলে আগুনের দিকে মন্ত্র পাঠ করছিল, আর আগুন থেকে বেরিয়ে আসা আত্মাগুলো একে একে চিতার চারপাশে ঘুরছিল, তারপর আবার শিখার ভেতরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় মোহনার চোখ পড়ল এক নারীর দিকে—রত্না পাল, যিনি ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চোখ অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে গেছে, ঠোঁট ফাঁকা, যেন কোনও অদৃশ্য শক্তি তাকে ডাকছে। ধীরে ধীরে সে সামনে এগোতে শুরু করল, পা যেন নিজের ইচ্ছায় নয়, কোনও অজানা নির্দেশে চলছে। মানুষের ভিড় তাকে থামানোর চেষ্টা করল না, যেন সবাই বুঝে গেছে—যাকে আগুন ডাকে, তাকে আর কেউ আটকাতে পারে না।
ঠিক তখনই, আগুনের অন্য প্রান্তে দেখা দিল সেই কালো চাদরে ঢাকা মানুষটি, যাকে মোহনা আগে জানালার বাইরে দেখেছিল। চাদরের ভাঁজে মুখ ঢেকে রাখা, কিন্তু তার ভঙ্গি যেন রত্নাকে আহ্বান করছে। ধীরে ধীরে সে রত্নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর মাথা নাড়ল—এমন এক অঙ্গভঙ্গি, যা পথ দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়। রত্না তার পিছন পিছন হাঁটা শুরু করল, সরাসরি চিতার দিকে। আগুনের আলোয় কালো চাদরটি কখনও লালচে, কখনও নীলচে হয়ে উঠছিল, আর তার ছায়া এমনভাবে মাটিতে পড়ছিল যেন তা নিজস্ব জীবন নিয়ে নড়ছে। মোহনা শ্বাস আটকে তাকিয়ে ছিল; তার মনে হচ্ছিল, রত্না কোনও নেশার মধ্যে আছে, যেখানে ভয়, বেদনা, যুক্তি—সব কিছু হারিয়ে গেছে।
দেবাশিস স্বত reflex রত্নার দিকে ছুটে যেতে চাইছিল, কিন্তু মোহনা তার হাত চেপে ধরল। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল, ওই আগুনে একবার প্রবেশ করলে আর ফিরে আসা যায় না। রত্না ক্রমশ চিতার কাছে পৌঁছে গেল, আর কালো চাদরের মানুষটি এক মুহূর্ত থেমে তার দিকে তাকাল—সে দৃষ্টি ছিল এমন, যেন মানুষের চোখ নয়, বরং অন্তহীন অন্ধকারের গভীরতা। তারপর সে চাদরের ভাঁজ সামান্য উঁচু করল, আর রত্না এক নিমিষে শিখার মধ্যে ঢুকে গেল। কোনও চিৎকার, কোনও প্রতিরোধ ছিল না—শুধু আগুন এক মুহূর্তের জন্য নীল হয়ে উঠল, তারপর আবার লালচে-কমলা রঙে ফিরে এল। গ্রামের মানুষ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, আর তান্ত্রিকের মন্ত্রপাঠের তীব্রতা সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে আরও ভয়ঙ্করভাবে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
–
দেবাশিস চুপিচুপি রাজবাড়ির ভিতরের অন্ধকার করিডোরে হাঁটছিল, মেঝের পুরনো কাঠের তক্তা মাঝে মাঝে কড়মড় শব্দ করছিল, যা সে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিল। সে জানত, তান্ত্রিক বা তার অনুসারীরা যদি তাকে ধরে ফেলে, তাহলে তার ভাগ্যও রত্নার মতো হবে। ধুলো জমা এক পুরনো ঘরে পৌঁছে সে একটি অর্ধভাঙা কাঠের আলমারি সরিয়ে দিল, আর তার পেছনে দেখা গেল এক গোপন কুঠুরি। ভিতরে ছিল অদ্ভুত অগ্নি-প্রতীক আঁকা কাপড়, শুকনো রক্তের দাগ লেগে থাকা পাথরের বাটি, এবং কয়েকটি পুরনো পুঁথি। একটি পুঁথি খুলতেই দেবাশিস বুঝল, এগুলো কেবল গল্প নয়—এ এক প্রাচীন গোষ্ঠীর আচার, যার ভিত্তি মানববলিতে। পুঁথির ভাষা ছিল সংস্কৃত আর প্রাচীন বাংলা মিশ্রিত, কিন্তু কিছু শব্দ সে স্পষ্টভাবে পড়তে পারল: “অগ্নি ভক্ষয় মানবপ্রাণ, তবেই শত্রু-ছায়া বিনাশ হয়।” অর্থাৎ, আগুনে মানব আত্মা উৎসর্গ না করলে “শত্রু-ছায়া” নামে এক অদৃশ্য বিপদ গ্রাম ও রাজবাড়িকে গ্রাস করবে—এই বিশ্বাসই ছিল তাদের আচার চালিয়ে যাওয়ার মূল কারণ।
এই সময় পেছন থেকে নরম কণ্ঠে কেউ বলল, “তুমি অনেক কিছু জেনে গেছ।” দেবাশিস চমকে ঘুরে দাঁড়াল—দেখল নীলচন্দ্র দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে ছিল গভীর ক্লান্তি, কিন্তু চোখে কোনও রাগ নয়—বরং এক ধরনের স্বীকারোক্তির প্রস্তুতি। নীলচন্দ্র ধীরে ধীরে বলল, “আমি এই সব কিছু বন্ধ করতে চাই, কিন্তু পারি না। প্রতি বছর একজনকে উৎসর্গ না করলে গ্রামটা নাকি আগুনে ভস্ম হয়ে যাবে। আমার দাদু থেকে শুরু করে সবাই এই বিশ্বাসে বাঁধা ছিল। আমি যদি বাধা দিই, তাহলে গ্রামের লোকই আমাকে শেষ করে দেবে।” দেবাশিস অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি নিজে বিশ্বাস করো এসব?” নীলচন্দ্র এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “আমি জানি, এটা অমানবিক। কিন্তু যেদিন থেকে আমি দায়িত্ব নিয়েছি, দেখেছি—উৎসর্গ বন্ধ করার বছরেই গ্রামে ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। কাকতালীয় হোক বা না হোক, কেউ তা পরীক্ষা করতে রাজি নয়।”
নীলচন্দ্রের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছিল অনুশোচনা, কিন্তু তার চোখে এক গভীর ভয়ও লুকিয়ে ছিল। সে বলল, “তান্ত্রিক মহাদেব এই গোষ্ঠীর শেষ গুরু। সে আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি যদি একজনকে না দিই, তাহলে অভিশাপ আমাকে বেছে নেবে। গত বছর রত্নার স্বামীকে সে টেনেছিল—আমি জানতাম, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি।” দেবাশিসের ভেতরে রাগ জমে উঠছিল—একদিকে সে যুক্তিবাদী, এসবকে অন্ধবিশ্বাস ভাবছিল; অন্যদিকে, গ্রামের মানুষদের আতঙ্কে ভরা মুখগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছিল, এই বিশ্বাস তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারছিল, এ শুধু কুসংস্কার নয়—এ এক সামাজিক শৃঙ্খল, যা ভেঙে ফেলার জন্য যুক্তি যথেষ্ট নয়, প্রমাণ প্রয়োজন।
দূরে তান্ত্রিকের মন্ত্রপাঠ আবার শুরু হল, তার সঙ্গে মিলল ডামাডোলের শব্দ—মানে, আচারের শেষ ধাপ কাছে চলে এসেছে। নীলচন্দ্র দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি চাইলে এখনই চলে যেতে পারো, কিন্তু মনে রেখো, এখানে থাকলে হয়তো তুমিও সেই আগুনে শেষ হবে।” দেবাশিস জানত, এখান থেকে চলে যাওয়া মানে এই ভয়ংকর সত্য চাপা পড়ে যাবে, আর বছরের পর বছর এই বলি চলতে থাকবে। তার নোটবুকে ইতিমধ্যেই যতটুকু তথ্য আছে, তা দিয়ে একটা প্রতিবেদন লেখা সম্ভব, কিন্তু সে অনুভব করল—এখন না থামালে হয়তো আর কোনও দিন সুযোগ আসবে না। বাইরে শিখার আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরে ঢুকছিল, আর সেই আলোর লাল আভায় দেবাশিসের মনে হচ্ছিল, রাজবাড়ি যেন কোনও দৈত্যের গলায় ঝুলে থাকা অগ্নিমালা পরে আছে—যা খুলে দেওয়া হয়তো অসম্ভব, কিন্তু চেষ্টা না করাই হবে আসল অপরাধ।
–
ভোরের আগের সেই গভীর সময়—যখন আকাশ এখনও কালো, কিন্তু দূরে কোথাও ফিকে আলোয় সূর্যের আগমনের ইঙ্গিত—রাজবাড়ির উঠোনে আগুন তখনও নিভেনি। চিতার কাঠ ধীরে ধীরে ভস্মে পরিণত হচ্ছে, কিন্তু শিখাগুলোর ভেতরে এখনও যেন কোনও গোপন প্রাণ আছে, যা নিভতে চাইছে না। দেবাশিস নিঃশব্দে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল, আর দেখছিল নীলচন্দ্র ধীরে ধীরে চিতার দিকে এগোচ্ছে। তার চোখে সেই অদ্ভুত দৃঢ়তা, যা মৃত্যুভয়কে অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। ঠোঁটে এক হালকা হাসি, যেন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়ে শান্তি পেয়েছে। তান্ত্রিক তখনও মন্ত্র জপ করছে, কিন্তু এবার তার কণ্ঠে উত্তেজনা নয়—বরং বিভ্রান্তি, যেন সে আন্দাজও করতে পারেনি যে নীলচন্দ্র এই পথ বেছে নেবে। বাতাসে ছাই আর ধোঁয়ার গন্ধ ঘনীভূত হচ্ছিল, আর তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল অদৃশ্য এক প্রত্যাশা—কিছু একটা এখন ঘটতে চলেছে।
নীলচন্দ্র চিতার কাছে পৌঁছে হঠাৎই দেবাশিসের দিকে ফিরে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল এক ধরনের নীরব অনুরোধ—“সব লিখে রেখো, যাতে সত্য চাপা না পড়ে।” এক মুহূর্তের জন্য দেবাশিসের মনে হল, দৌড়ে গিয়ে তাকে থামায়, কিন্তু পা যেন শিকলে বাঁধা। তান্ত্রিক তখন প্রচণ্ড গর্জে উঠল, “না! এটা নিয়ম নয়! আগুন বেছে নেবে—তুমি নয়!” কিন্তু নীলচন্দ্র তার কথা উপেক্ষা করে চাদর খুলে ফেলল এবং ধীরে ধীরে শিখার মধ্যে প্রবেশ করল। আশ্চর্যজনকভাবে, প্রথমে আগুন তাকে গ্রাস করেনি—বরং তাকে পথ করে দিচ্ছিল, যেন সে এরই অংশ। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই আগুন হঠাৎ লেলিহান হয়ে উঠল, শিখাগুলো আকাশ ছুঁতে লাগল, আর সেই তীব্র তাপ রাজবাড়ির প্রতিটি দেয়ালকে গিলে ফেলতে শুরু করল। তান্ত্রিক চিৎকার করে মন্ত্র পড়তে লাগল, কিন্তু এবার তার কণ্ঠে ভয়ের কাঁপন স্পষ্ট ছিল।
বাতাসে তখন কেবল আগুনের গর্জন আর কাঠ ভাঙার শব্দ। রাজবাড়ির ছাদ ধসে পড়ল, দেয়ালের গায়ে আঁকা পুরনো প্রতীকগুলো মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে গেল। দেবাশিস যতটা সম্ভব দূরে সরে গিয়ে দেখছিল—তান্ত্রিকও এখন আগুনে আটকে পড়েছে। সে চেষ্টা করছিল মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে শিখা নিয়ন্ত্রণে আনতে, কিন্তু আগুন যেন তাকে চিনেই আরও তীব্র হয়ে উঠছিল। এক ঝলকে দেবাশিস দেখল, তান্ত্রিকের চারপাশে নীলচে শিখার বৃত্ত তৈরি হয়েছে, আর সেই বৃত্ত ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হচ্ছে। পরের মুহূর্তেই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মতো শব্দে রাজবাড়ির মূল অংশ ধসে পড়ল, আর নীলচন্দ্র ও তান্ত্রিক—দুজনেই আগুনের ভেতরে মিলিয়ে গেল। চারদিকের অন্ধকারকে ভেদ করে শিখার আলো যেন শেষ বিদায় জানিয়ে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল।
সকাল গড়িয়ে এলে, গ্রামের মানুষজন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের সামনে এসে দাঁড়াল। এখন সেখানে কেবল পোড়া কাঠ, ভাঙা ইট, আর ধোঁয়া ওঠা ছাই—নীলচন্দ্র বা তান্ত্রিকের কোনও চিহ্ন নেই। কেউ কেউ বলল, তারা নীলচন্দ্রকে আগুনের ভেতরে দাঁড়িয়ে হাত তুলতে দেখেছে, যেন অভিশাপকে বিদায় জানাচ্ছে। দেবাশিস নীরবে নোটবুকে শেষ কয়েকটি লাইন লিখল: “শেষ বলি ছিল স্বেচ্ছায়, আর তার পর থেকে আগুন আর রাজবাড়িকে ডাকেনি।” গ্রামের প্রবীণরা ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল—সেই রাতের পর থেকে আর কোনও অগ্নি-আচার হয়নি, রাজবাড়ি এখন কেবল এক টুকরো ইতিহাস। তবুও, রাতে বাতাসে কখনও কখনও পোড়া কাঠের গন্ধ ভেসে আসে, আর কিছু লোক দাবি করে—পূর্ণিমার রাতে তারা ছায়ার মতো একজন মানুষকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হাঁটতে দেখেছে, যার চেহারায় নীলচন্দ্রের শান্ত হাসি লেগে থাকে।
_____




