দীপায়ন চক্রবর্তী
১
শহরের ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও অয়নের মন সবসময় অদ্ভুত রহস্যের খোঁজে ঘুরে বেড়াত। তার ইউটিউব চ্যানেল মিস্ট্রি অফ বেঙ্গল ইতিমধ্যেই হাজার হাজার সাবস্ক্রাইবার পেয়ে গেছে, কারণ সে এমন সব ঘটনা খুঁজে আনে যা সাধারণ মানুষ কেবল গুজব বলে উড়িয়ে দেয়। এক শীতের সকালে যখন ফোনে এক অপরিচিত নাম্বার থেকে ভিডিও ক্লিপ আসে, প্রথমে ভেবেছিল এটাও হয়তো কারো প্র্যাঙ্ক। কিন্তু প্লে বাটনে চাপ দিতেই চোখ বড় হয়ে যায়—ঘন সাদা কুয়াশায় ঢাকা গোপালগঞ্জের এক সরু রাস্তা, আর সেই কুয়াশার গভীর থেকে ভেসে আসছে নারীর এক বিকৃত, কাঁপা কাঁপা হাসি। হাসিটা যেন দূর থেকে, কিন্তু আবার কানে হালকা ফিসফিস করে বাজছে। ভিডিওতে হঠাৎই একটা ছায়ামূর্তি দেখা যায়—ম্লান আলোয় অস্পষ্ট, লম্বা চুলে মুখ ঢাকা, সাদা শাড়ি গায়ে। পর মুহূর্তেই ভিডিও থেমে যায়, যেন ক্যামেরার চোখ জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ দৃশ্য অয়নকে কাঁপিয়ে তোলে, কারণ গোপালগঞ্জই তার মাতৃগ্রাম—ছোটবেলায় শোনা অনেক ভুতুড়ে গল্পের পটভূমি। সে জানত, কুয়াশা শীতকালে গ্রামে নামেই, কিন্তু এমন ভোরের হাসির কথা সে কখনো শোনেনি। কৌতূহল আর পেশাগত আগ্রহ মিলিয়ে সে ঠিক করে, এবার গ্রামে গিয়ে সরাসরি এই ঘটনার সাক্ষী হতে হবে। ক্যামেরা, ড্রোন, সাউন্ড রেকর্ডার—সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে রওনা দেয় দক্ষিণ ২৪ পরগনার পথে।
গ্রামে পৌঁছে প্রথম দিনের সকালটা অয়নের জন্য অবাক করা অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। ঠান্ডা বাতাসে ভোরবেলার হালকা আলো ফুটতেই সে দেখে নদীর পাড় থেকে ধীরে ধীরে ঘন সাদা কুয়াশা এগিয়ে আসছে। কুয়াশা যেন বাষ্পের মত নয়, বরং ধোঁয়ার মত—ভারী, মোটা, গাঢ় সাদা। গ্রামের মানুষজন তখনও ঘুমে, কেবল কয়েকজন চা-ওয়ালা আর মাছওয়ালা সকালের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। অয়ন তার ক্যামেরা অন করে রেকর্ড করতে থাকে, কিন্তু প্রথম দিন কোনো অদ্ভুত শব্দ শোনে না। তবে গ্রামের কিছু বয়স্ক মানুষ তাকে দেখে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে, যেন এই কুয়াশার মধ্যে না ঢোকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুপুরে অয়ন বাজার ঘুরে ভিডিও শুট করে, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে, এবং রাতে গ্রামের প্রান্তে এক পরিত্যক্ত কুঁড়েঘরে ক্যামেরা সেটআপ করে। গ্রাম তখন অন্ধকারে ডুবে, কেবল দূরে নদীর জল ধীরে ধীরে বইছে, মাঝে মাঝে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ভেসে আসছে। অয়নের চোখে ঘুম নেই—সে অপেক্ষা করছে ভোরের জন্য। রাত তিনটার পর থেকেই তাপমাত্রা হঠাৎ নেমে আসে, বাতাসে অদ্ভুত শীতলতা ভরে ওঠে।
ভোর প্রায় পৌঁছলেই হঠাৎই চারপাশে কুয়াশা নেমে আসে, এত ঘন যে হাতের সামনের জিনিসও অস্পষ্ট হয়ে যায়। অয়নের রেকর্ডারের মাইক্রোফোনে প্রথমে ভেসে আসে এক হালকা ফিসফিস শব্দ, যেন দূরে কেউ খুব আস্তে হাসছে। ধীরে ধীরে সেই শব্দ স্পষ্ট হয়—এখন সেটা নারীর কণ্ঠস্বর, কিন্তু স্বাভাবিক নয়, বরং লম্বা টেনে দেওয়া, যেন ঠাট্টা করে হাসছে আর সাথে সাথে ভয় ঢেলে দিচ্ছে। অয়নের শরীর শিরশির করে ওঠে, তবুও সে ক্যামেরা শক্ত করে ধরে রাখে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে হঠাৎই এক নারীমূর্তি ভেসে ওঠে—সাদা শাড়ি, মুখ ঢেকে রাখা চুল, আর সেই বিকৃত হাসি। মূর্তিটা যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, কিন্তু পা নড়ছে না—শুধু ভেসে যাচ্ছে কুয়াশার সঙ্গে। অয়নের ক্যামেরার স্ক্রিনে ফিগারটা ক্রমশ বড় হতে থাকে, আর ঠিক যখন মুখ দেখা যাওয়ার উপক্রম, তখনই ক্যামেরার স্ক্রিন কালো হয়ে যায়। একই সঙ্গে হাসির শব্দ থেমে যায়, আর কুয়াশা যেন অদৃশ্য শক্তির মতো তাকে ঘিরে ধরে। মুহূর্তটাতে অয়নের মনে হয়, কেউ ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, গরম শ্বাস ফেলছে তার ঘাড়ে—কিন্তু ঘুরে তাকাতেই শুধু সাদা, শূন্য কুয়াশা। এভাবেই গোপালগঞ্জের প্রথম ভোরে অয়নের সঙ্গে মুখোমুখি হয় সেই হাসি, যা তার তদন্তের পথকে অদৃশ্য অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
২
সকালের সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার পর অয়নের মন শান্ত থাকতে পারল না। সে সারাদিন গ্রামের ভেতর ঘুরে বেড়াল, মানুষজনের সঙ্গে কথা বলল, কিন্তু কেউ স্পষ্ট কিছু বলতে রাজি নয়—শুধু অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে যায় বা বিষয়টা এড়িয়ে যায়। বিকেলের দিকে চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায়, দোকানদার হঠাৎই আঙুল তুলে ইশারা করল, “ওই দেখো, অরুণেশ মাস্টার আসছেন।” অয়নের চোখের সামনে দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন এক লম্বা, পাতলা, ধবধবে সাদা চুল ও গোঁফওয়ালা মানুষ—ধুতি, পাঞ্জাবি আর চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। অরুণেশ দত্ত, গ্রামের প্রাক্তন স্কুলশিক্ষক, যিনি নাকি গোপালগঞ্জের ইতিহাস মুখস্থ জানেন। তিনি চুপচাপ এসে অয়নের পাশে বসে চা নিলেন, তারপর সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি কুয়াশার ভিডিও তুলতে এসেছ?” অয়ন অবাক হয়ে মাথা নাড়ল, আর অরুণেশের ঠোঁটে একরকম গম্ভীর হাসি ফুটল। “তাহলে আমার কথা ভালো করে শোনো। এই কুয়াশা শুধু শীতের সময় আসে না—এটা ডাকা হয়।” এই অদ্ভুত বাক্যে অয়নের চোখ বড় হয়ে গেল, কিন্তু অরুণেশ শান্তভাবে বলতে লাগলেন, “যখন কেউ ভুলে যায়, তখন সে নিজের কথা মনে করাতে আসে। আর তার কথা মানে… হাসিমুখী বউ-এর কথা।”
চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছিল, আর তার ভেতর দিয়ে যেন কুয়াশার ভৌতিক ছবি ভেসে উঠছিল অয়নের মনে। অরুণেশ দত্ত ধীরে ধীরে গল্প শুরু করলেন—প্রায় একশো বছর আগে, গোপালগঞ্জ ছিল জমিদারি শাসনের অধীনে। গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে ছিল বড় জমিদারবাড়ি, যেখানে ধনসম্পদের অভাব ছিল না, কিন্তু মানুষের প্রতি দয়া ছিল না। সেই বাড়িতে এক তরুণ বউ এসেছিলেন, নাম মাধবী। সুন্দরী, শান্ত স্বভাবের, কিন্তু ভেতরে ছিল অসীম সাহস। গ্রামবাসীর দুঃখ-দুর্দশা দেখে তিনি স্বামীকে অনুরোধ করেছিলেন জমির খাজনা কমাতে, কিন্তু এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জমিদার পরিবার। গোপন ষড়যন্ত্রে এক শীতের ভোরে মাধবীকে নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়—কথিত আছে, গলা কেটে ফেলার পরও তার ঠোঁটে ছিল এক অদ্ভুত হাসি। মৃত্যুর আগে তিনি নাকি অভিশাপ দিয়ে গিয়েছিলেন—”আমার হাসি ভোরের কুয়াশায় বাজবে, আর যে শুনবে, সে আমার সঙ্গে যাবে।” সেই থেকে শীতের ভোরে এই কুয়াশা নামে, আর হাসির শব্দ শোনা যায়। বহু বছর ধরে এমন অনেকেই ভোরে হারিয়ে গেছে, যাদের দেহ আর কখনো পাওয়া যায়নি। অরুণেশ বললেন, “তুমি যদি এখানে সত্যি কিছু রেকর্ড করতে চাও, তাহলে জানবে—এটা শুধু গল্প নয়, এটা প্রতিশোধ।”
অয়নের মন অদ্ভুতভাবে দ্বিধায় পড়ে গেল—একদিকে তার কৌতূহল আর পেশার টান, অন্যদিকে এই শীতল সতর্কবার্তা। অরুণেশের চোখে তখন এক গভীর ছায়া, যা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন অতীতের কোনো ঘটনার ভার বয়ে চলেছেন। হঠাৎ তিনি ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে বললেন, “যদি কিছুতেই তদন্ত করতেই চাও, তবে দক্ষিণ প্রান্তে ভোরের কুয়াশায় যেও না। নদীর ধারের বড় বটগাছের পাশটা এড়িয়ে চলো—ওখানেই সে প্রথম দেখা দেয়।” তারপর দাঁড়িয়ে চলে গেলেন, রেখে গেলেন চায়ের কাপের ধোঁয়া আর ভয়ের এক ভারী অনুভূতি। অয়ন চুপচাপ বসে রইল, তার মাথায় বারবার বাজছিল সেই কথাগুলো—”এটা ডাকা হয়” আর “যে শুনবে, সে তার সঙ্গে যাবে।” সন্ধ্যার আলো নেমে এলে গ্রামের চারপাশে আবার ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল, আর অয়নের মনে হচ্ছিল, হয়তো সে ইতিমধ্যেই এমন এক খেলায় পা রেখেছে, যেখান থেকে ফেরার পথ নেই।
৩
পরদিন সকালে অয়ন যখন নদীর পাড়ে শুটিং করছিল, তখন হঠাৎ পিছন থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল—সাহসী কিন্তু কৌতূহল মিশ্রিত, “আপনি কি সত্যিই কুয়াশার ভিডিও তুলতে এসেছেন?” ঘুরে দাঁড়াতেই দেখতে পেল, মাঝারি গড়নের, শ্যামলা ত্বকের এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে, পরনে সাদামাটা শাড়ি, চুল বিনুনিতে বাঁধা। মীরা পাল—স্থানীয় কলেজের ছাত্রী, যে গ্রামের ইতিহাস ও লোককথা নিয়ে পড়াশোনা করে। পরিচয়ের পর প্রথমেই সে অয়নকে জানায়, “আপনি যা খুঁজছেন, সেটা শুধু একটা গল্প নয়। গত পঞ্চাশ বছরে অন্তত ১৭ জন মানুষ ভোরের কুয়াশায় হারিয়ে গেছে, আর তাদের কেউ আর ফিরে আসেনি।” অয়ন বিস্মিত হয়, কারণ এত সংখ্যক নিখোঁজের ঘটনা কোনো সরকারি রেকর্ডে পাওয়া যায়নি। মীরা ব্যাখ্যা করে, “পুলিশ ফাইলগুলো হয় বন্ধ হয়ে গেছে, নয়তো হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমার কাছে কিছু খবরের কাগজের কাটিং আছে, আর কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষের মুখে শোনা গল্পও।” তার চোখে তখন এক ধরনের দৃঢ়তা, যেন সে বহুদিন ধরেই কাউকে এই সত্যটা বলতে চাইছিল।
বিকেলের দিকে মীরা অয়নকে নিয়ে যায় তার বাড়িতে, যেখানে পুরনো কাঠের আলমারি থেকে একগাদা হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ বের করে। তাতে ১৯৭৪ সালের একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের শিরোনাম—“কুয়াশার মধ্যে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ যুবক”—নিচে ছোট্ট প্রতিবেদনে লেখা, কিভাবে ভোরে নদীর ধারে মাছ ধরতে গিয়ে এক যুবক আর ফিরে আসেনি। একইভাবে ১৯৮২, ১৯৯৩, ২০০১—প্রায় প্রতি কয়েক বছরে একবার করে কারও নিখোঁজ হওয়ার খবর মেলে। মীরা প্রতিটি ঘটনার তারিখ, সময়, আবহাওয়ার বিবরণ দিয়ে দেখায় যে, সবই শীতের সকালে, এবং অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে নদীর ধারের কাছাকাছি। এরপর মীরা জানায়, তার ঠাকুরদা নাকি একবার দূর থেকে সেই সাদা শাড়ি পরা নারীকে দেখেছিলেন—যার মুখে ছিল এক অস্বাভাবিক, দীর্ঘায়িত হাসি। মীরার ঠাকুরদা বলতেন, “সে হাঁটে না, কুয়াশার সঙ্গে ভেসে আসে, আর তার চোখে যেন কুয়াশার রঙ।” অয়ন প্রতিটি খবর ও কাহিনি নিজের নোটবুকে লিখে রাখে, আর মনে মনে পরিকল্পনা করে এই সব ডেটা দিয়ে একটা টাইমলাইন তৈরি করবে।
সন্ধ্যা নামতেই অয়ন ও মীরা মিলে গ্রামের এক পুরনো গুদামঘরে বসে ল্যাপটপে স্ক্যান করা খবরের কাটিং আর পুলিশ রিপোর্ট মিলিয়ে দেখতে থাকে। অয়ন লক্ষ্য করে, প্রতি ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তির বয়স ১৮ থেকে ৩০-এর মধ্যে, এবং তারা সবাই কোনো না কোনো কারণে ভোরের আগে নদীর ধারে গিয়েছিল। এই প্যাটার্ন অয়নের মনে শীতল স্রোত বইয়ে দেয়—যেন হাসিমুখী বউ শুধুই তরুণদের টেনে নেয়। মীরা তখন ফিসফিস করে বলে, “আমার মা আমাকে শিখিয়েছে, কুয়াশার ভেতর হাসি শুনলে দৌড়ে পালাতে হবে, কিন্তু কখনোই পিছনে তাকানো যাবে না। নাকি পিছনে তাকালেই সে তোমার চোখের ভেতর ঢুকে পড়ে।” অয়ন এই কথাকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলেও তার মনের গভীরে হালকা অস্বস্তি জন্মায়। বাইরে তখন বাতাসে শীত বাড়ছে, আর দূরে নদীর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, ধীরে ধীরে সাদা পর্দা নেমে আসছে—যেন কেউ অদৃশ্য হাতে সেই কুয়াশা নামাচ্ছে, ঠিক আগামী ভোরের প্রস্তুতিতে।
৪
গ্রামের পুবদিকের ঘাটে গিয়ে অয়ন ও মীরা দেখল, নদীর ধারে বসে জাল মেরামত করছে এক কুঞ্চিত মুখের, গা-গামছা জড়ানো বৃদ্ধ—হারাধন মাঝি। গ্রামের মানুষ তাকে নিয়ে ভয় পায় না, কিন্তু তার দিকে তাকিয়ে যেন এক ধরণের নীরব শ্রদ্ধা প্রকাশ করে, কারণ সে নদী ও কুয়াশার অনেক কিছু দেখেছে। মীরা তাকে দেখেই ডাক দিল, “হারাধন কাকা, আপনি তো নদীর ভোরের দৃশ্যের সাক্ষী। অয়নদাকে একটু বলবেন, কুয়াশার ভেতর কী হয়?” প্রথমে তিনি কিছু বলতে চাননি, শুধু জাল গুটিয়ে রাখছিলেন। তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “এত বছর পরে মনে করাবেন না মা… ওই দৃশ্য এখনও ঘুমের মধ্যে আসে।” তার চোখে জল চিকচিক করছিল, আর কণ্ঠে এক অদ্ভুত শীতলতা। অয়ন সাবধানে রেকর্ডার চালু করল, কারণ সে জানত এই সাক্ষ্য হয়তো রহস্যের টুকরো জোড়া লাগাতে সাহায্য করবে।
হারাধন বলতে শুরু করলেন, “সেদিন পৌষ মাসের শেষ দিক, শীত খুব বেশি ছিল। ভোরের আগে আমি আর আমার ভাই গোপাল নদীতে মাছ ধরতে নেমেছিলাম। কুয়াশা এমন ঘন ছিল যে, হাত বাড়ালেই নিজের আঙুলও দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু হঠাৎ আমি শুনতে পেলাম, নদীর অপর পাড় থেকে এক নারীর খিলখিল হাসি ভেসে আসছে—না, সেটা আনন্দের হাসি ছিল না, বরং এমন এক শব্দ, যা শুনলে শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। আমি ভাইকে বললাম চলো ফিরে যাই, কিন্তু সে বলল হয়তো কেউ সাহায্য চাইছে। আমরা নৌকা থামালাম, তখনই কুয়াশার মধ্যে থেকে ভেসে এল এক সাদা রঙের অবয়ব। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো—সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা, যার মুখ আড়াল করা ছিল লম্বা ভেজা চুলে। তার পা মাটি ছোঁয় না, যেন কুয়াশার স্রোতে ভেসে আসছে। আমি ভয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, কিন্তু আমার ভাই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো নৌকা থেকে নেমে জলের দিকে এগিয়ে গেল।” হারাধনের কণ্ঠ কেঁপে উঠল, আর তার হাত জালের গিঁটে শক্ত করে চেপে ধরল।
“আমি চিৎকার করলাম, কিন্তু সে যেন কিছুই শুনল না। মহিলাটি মাথা ধীরে ধীরে তুলল, আর চুলের ফাঁক দিয়ে আমি দেখলাম—তার ঠোঁট অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হয়ে আছে, এতটা যে মুখের কোণ প্রায় কানের কাছে পৌঁছে গেছে। সেই হাসির মধ্যে কোনো উষ্ণতা নেই, শুধু এক শূন্য, জমাট প্রতিশোধ। আমার ভাই নদীর কিনারায় পৌঁছাতেই কুয়াশা ঘূর্ণি খেয়ে তাকে গিলে নিল, আর আমি শুধু জলের ভেতর এক সাদা আভা মিলিয়ে যেতে দেখলাম। তারপর সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল—না চিৎকার, না শব্দ, শুধু ঠান্ডা হাওয়া আর ফাঁকা নদী।” হারাধন থামলেন, তার গলায় জমে থাকা কান্না গিলে নিলেন। “পরে গ্রাম খুঁজে দেখল, কিন্তু তার কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না—যেন সে কখনো ছিলই না। আমি তখন থেকেই ভোরে নদীর দিকে তাকাই না।” কথাগুলো শেষ করে তিনি জাল কাঁধে তুলে ধীরে ধীরে চলে গেলেন। অয়ন ও মীরা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল—চারপাশে শুধু নদীর গন্ধ, ঠান্ডা হাওয়া আর মনে গেঁথে থাকা সেই শূন্য, জমাট হাসি।
৫
অয়ন ও মীরার হাতে যতটুকু নিখোঁজের তথ্য জোটে, তা নিয়ে তারা সন্ধ্যায় অরুণেশ দত্তের বাড়িতে যায়। কাঠের তাকভরা পুরনো বই, ধুলো জমা কাগজপত্র আর ছেঁড়া নোটবুকের মাঝে বসে অরুণেশ মৃদু হাসলেন, “তোমরা যতই আধুনিক ক্যামেরা ব্যবহার করো না কেন, গোপালগঞ্জের কুয়াশার রহস্য প্রযুক্তি দিয়ে ধরা যাবে না, কারণ এর শিকড় সময়ের গভীরে।” তিনি ধীরে ধীরে আলমারি থেকে একটি মোটা খাতা বের করলেন—পাতাগুলো হলদেটে, প্রায় ভেঙে যাচ্ছে স্পর্শ করলে। “এটা আমার দাদুর ডায়েরি,” তিনি বললেন, “যেখানে তিনি ১৯১৫ সালের এক ঘটনার কথা লিখেছেন।” অরুণেশ পড়তে শুরু করলেন—সেই সময় এই গ্রামে ছিল বড় জমিদারবাড়ি, যেটির মালিক রণজিৎ নারায়ণ চৌধুরী। শোনা যায়, তার ছেলে নতুন বিয়ে করেছিল শহরের এক সুন্দরী মেয়েকে, নাম ছিল কুমুদিনী। কিন্তু জমিদারবাড়ির অন্তর্গত ঈর্ষা, লোভ আর ষড়যন্ত্রে সে একদিন অমানবিক মৃত্যুর শিকার হয়। কেউ বলে, রান্নাঘরে দুর্ঘটনা, কেউ বলে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে পুড়িয়ে মারে—কারণ সে জমিদারের সম্পত্তিতে অধিকার দাবি করেছিল।
অরুণেশ কণ্ঠ ভারী করে বললেন, “দাদুর লেখা অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে কুমুদিনী নাকি ভয়ঙ্করভাবে হাসছিল, সেই হাসিতে ছিল তিক্ততা আর অভিশাপ। তার শেষ কথা ছিল—‘আমার হাসি ভোরের কুয়াশায় বাজবে, আর যারা শোনে তারা আমার সঙ্গে যাবে।’ সেই রাতে শীতল বাতাসে নাকি জমিদারবাড়ির চারপাশে ঘন কুয়াশা নেমে এসেছিল, আর সকালের মধ্যে কুমুদিনীর মৃতদেহ মিলিয়ে গিয়েছিল। কেউ কবর দেখতে পায়নি, কেউ চিতাও করেনি—যেন সে কুয়াশার সঙ্গেই মিশে গেছে।” এই ঘটনার পর থেকে প্রতি কয়েক বছরে একবার করে কেউ না কেউ ভোরের কুয়াশায় হারিয়ে যায়, আর প্রত্যেকবারই নদীর ধারে শোনা যায় সেই একই খিলখিল হাসি। অয়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু জমিদারবাড়ি এখন কোথায়?” অরুণেশ বললেন, “দক্ষিণ প্রান্তের পুরনো বটগাছের পেছনে ধ্বংসাবশেষ আছে, কেউ যায় না, কারণ বলা হয় সেখানে আজও কুয়াশা জমে থাকে এমনকি গ্রীষ্মকালেও।”
গল্প শোনার সময় অয়নের মনের মধ্যে যেন ছবির মতো ভেসে উঠছিল—অন্ধকার রান্নাঘর, কুমুদিনীর চোখে ক্রোধ, ঠোঁটে সেই অস্বাভাবিক প্রসারিত হাসি, আর জানালার বাইরে ধীরে ধীরে নেমে আসা সাদা কুয়াশা। মীরা চুপচাপ শুনছিল, কিন্তু তার চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা—যেন এই কাহিনি তাকে ব্যক্তিগতভাবে স্পর্শ করেছে। অরুণেশ শেষবার সতর্ক করলেন, “তোমরা যদি সত্যিই কুয়াশার রহস্যের শেষ দেখতে চাও, তাহলে জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষে যাওয়ার আগে প্রস্তুত হও—এটা শুধু অতীতের গল্প নয়, এটা জীবন্ত অভিশাপ।” বাইরে তখন হাওয়া বইছিল, আর জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল চাঁদের আলোয় নদীর ধারে হালকা সাদা পর্দা নেমে আসছে, যেন কুয়াশা তাদের নাম ধরে ডাকছে।
৬
রাত তিনটের সময় অয়ন, মীরা ও অরুণেশ দত্ত গ্রাম ছেড়ে দক্ষিণ প্রান্তের পথে বেরোল। শীতের রাতের ঠান্ডা বাতাসে তাদের নিঃশ্বাস ধোঁয়ার মতো বেরোচ্ছিল, হাতে শক্ত করে ধরা ছিল ড্রোনের রিমোট, নাইট-ভিশন ক্যামেরা ও সাউন্ড রেকর্ডার। অয়নের চোখে ছিল এক ধরনের উত্তেজনা—যেন সে একটি অনন্য ফুটেজ পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। মীরা, যদিও ভেতরে ভয় লুকিয়ে রেখেছিল, তবু নিজেকে দৃঢ় দেখানোর চেষ্টা করছিল, কারণ সে জানত এই মুহূর্তে অয়নকে একা রাখা বিপজ্জনক। অরুণেশ হাঁটছিলেন ধীর পায়ে, কিন্তু তাঁর চোখে ছিল গভীর সতর্কতা। তারা যখন পুরনো বটগাছের কাছে পৌঁছাল, তখন আকাশে হালকা আলো ফুটতে শুরু করেছে, তবে পূর্ণ ভোর আসেনি। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা, শুধু দূরে নদীর স্রোতের ক্ষীণ শব্দ। অয়ন প্রথমে ড্রোন উড়াল—নাইট-ভিশন ক্যামেরার স্ক্রিনে ধ্বংসপ্রায় জমিদারবাড়ির ছায়া দেখা যাচ্ছিল।
হঠাৎ কুয়াশা নামতে শুরু করল—প্রথমে পাতলা, তারপর ধীরে ধীরে এত ঘন হয়ে গেল যে হাত বাড়ালেও নিজের আঙুল দেখা যায় না। স্ক্রিনে শুধু দুধসাদা অন্ধকার, কোনো রঙ বা আকার নেই। সাউন্ড রেকর্ডার হালকা স্ট্যাটিক শব্দ ধরতে লাগল, কিন্তু তার মধ্যে খুব ক্ষীণভাবে শোনা গেল নারীর হাসির প্রতিধ্বনি—যেন অনেক দূর থেকে, তবুও ভয়ানক স্পষ্ট। অয়ন রিমোট চাপতে লাগল, কিন্তু ড্রোনের লাইভ ফিড হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল, স্ক্রিনে শুধু কালো। মীরা একবার ক্যামেরা চেক করল—নাইট-ভিশনও বন্ধ। অরুণেশের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল, “আমি বলেছিলাম—এই কুয়াশা শুধু আবহাওয়া নয়, এটা কিছু শোষণ করে… বিদ্যুৎ, আলো, শব্দ।” অয়ন কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই কুয়াশার মধ্যে কোথাও জলের ছপছপ শব্দ শোনা গেল—যেন কেউ ধীরে ধীরে তাদের চারপাশে ঘুরছে।
তাদের তিনজনের নিঃশ্বাস একসঙ্গে ভারী হয়ে উঠল। মীরা হাত চেপে ধরল অয়নের বাহু, আর অরুণেশ সাউন্ড রেকর্ডার উঁচু করে ধরলেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সব যন্ত্র নিস্তব্ধ হয়ে গেল—ড্রোন, ক্যামেরা, রেকর্ডার, সব মৃতের মতো নিশ্চুপ। কুয়াশা এতটাই ঘন যে তারা একে অপরের মুখও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না। সেই নীরবতার মাঝেই আবার সেই হাসি শোনা গেল—এবার যেন অনেক কাছে, কানের পাশ দিয়ে বয়ে গেল ঠান্ডা নিশ্বাসের মতো। অয়ন প্রবল কৌতূহলে এক পা সামনে বাড়াল, আর তখনই মনে হলো তার পায়ের নিচে মাটি যেন নরম হয়ে গেছে, যেন কাদার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। মীরা চিৎকার করে তার হাত ধরল, কিন্তু কুয়াশার মধ্যে যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাদের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে। অরুণেশ তাড়াহুড়ো করে বললেন, “এখান থেকে ফিরে চলো—এখনই!” কিন্তু ঠিক তখনই দূরে কুয়াশার ভেতরে এক সাদা অবয়ব দেখা গেল, দাঁড়িয়ে, স্থির, কিন্তু তার ঠোঁটে সেই প্রসারিত শূন্য হাসি।
৭
কুয়াশার সেই ঘন সাদা দেয়ালের ভেতরে প্রথমে অবয়বটা অস্পষ্ট ছিল—মনে হচ্ছিল, হয়তো কল্পনার খেলা। কিন্তু ধীরে ধীরে আকারটা স্পষ্ট হতে লাগল। সাদা শাড়ির আঁচল কুয়াশার সঙ্গে মিশে গেছে, পা যেন মাটি ছুঁয়েও ছুঁয়েও হাঁটছে না। নারীর মাথা সামান্য কাত, আর ঠোঁটজোড়া অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত—হাসি নয়, বরং এক বিকৃত অভিব্যক্তি, যেখানে আনন্দের চেয়ে ভয় অনেক বেশি। মীরা হাঁপাতে হাঁপাতে পেছাতে লাগল, কিন্তু কুয়াশার ঘেরাটোপে পিছনের পথ কোথায় তা বোঝা যাচ্ছিল না। অয়নের হাতের ক্যামেরা কাঁপছিল, লেন্সের ভেতরে লাল আলো জ্বলছিল, কিন্তু ফুটেজের মধ্যে কেবল বিকৃত দানা দানা ছবি—হাওয়া, ছায়া আর সেই অবয়বের দুলতে থাকা শাড়ির অংশ। অরুণেশের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল; তিনি প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন, “ওই-ই… হাসিমুখী বউ।”
নারীর মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল—কারণ চোখের জায়গায় কিছুই নেই, শুধু দুটি গভীর কালো গর্ত, যেখান থেকে বেরোচ্ছে হালকা কুয়াশার ধোঁয়া। প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের ঠান্ডা আরও তীব্র হয়ে উঠছিল, যেন কেউ শ্বাস নিচ্ছে না। দূরের নদীর শব্দও থেমে গেছে, পাখির ডাক নেই, কেবল হৃদস্পন্দনের ধাক্কা আর মেয়েটির হাসির প্রতিধ্বনি কানে বাজছে। মীরা কাঁপতে কাঁপতে অয়নের বাহু চেপে ধরল, কিন্তু অয়নের চোখে তখন এক ধরনের অদ্ভুত মোহ—যেন সে সেই শূন্য কালো চোখের ভিতরে ডুবে যাচ্ছে। “এটাই… এটা সত্যি…” সে প্রায় নিজের সঙ্গেই কথা বলল। ঠিক তখনই ক্যামেরার স্ক্রিনে এক ঝলক জ্বলে উঠল—এক সেকেন্ডের জন্য নারীর মুখ স্পষ্ট ধরা পড়ল—শাড়ি ছিঁড়ে গেছে, চুল এলোমেলো, ঠোঁটে শুকনো রক্তের দাগ, আর সেই ঠান্ডা, শূন্য হাসি।
হঠাৎ ক্যামেরাটা অদ্ভুতভাবে কাঁপতে শুরু করল, যেন ভেতরে কিছু আটকে গেছে, তারপর এক মুহূর্তে সব বন্ধ হয়ে গেল। লাল আলো নিভে গেল, স্ক্রিন কালো। অয়ন বোতাম টিপে, লেন্স ঘুরিয়ে চেষ্টা করল, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। কুয়াশার মধ্যে সেই অবয়ব তখন আরও কাছে এসে গেছে—মাত্র কয়েক হাত দূরে। নারীর মাথা এবার ধীরে ধীরে ঘুরে মীরার দিকে তাকাল, ঠোঁটের কোণে হাসি আরও প্রশস্ত হলো, আর কুয়াশার মধ্যে ভেসে উঠল ঠান্ডা নিশ্বাসের শব্দ, যেন কেউ সরাসরি তার কানের কাছে ফিসফিস করছে। অরুণেশ গলা উঁচু করে মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন, গলার স্বর কাঁপছিল, কিন্তু চোখে ছিল মরিয়া চেষ্টা। কুয়াশার মধ্যে যেন হঠাৎ একটা টান তৈরি হলো, বাতাস ঘুরপাক খেতে লাগল, আর সেই অবয়ব এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল—যেন আঘাত পেয়েছে। তবুও তার ঠোঁটের সেই বিকৃত হাসি এক বিন্দুও মিলিয়ে গেল না।
৮
কুয়াশার ভেতর থেকে কোনোরকমে ফিরে এসে তারা তিনজন পুরনো পাঠশালার ভেতর জড়ো হলো। মীরার হাত এখনও ঠান্ডায় জমে ছিল, অয়নের চোখে ভয় আর কৌতূহল মিশে এক অদ্ভুত চাহনি। তখনই অরুণেশ গভীর শ্বাস নিয়ে কথা শুরু করলেন, যেন বহুদিন ধরে বুকের মধ্যে চেপে রাখা এক গোপন কথা বেরিয়ে আসছে। “শোনো,” তাঁর কণ্ঠ ভারী, “ও শুধু কোনো অভিশপ্ত আত্মা নয়… ও ছিল এই গ্রামের জমিদারের বউ—শোভাময়ী দেবী। প্রায় একশো বছর আগে, এই বাড়ির অন্দরমহলে তার জীবনের অবসান ঘটানো হয়।” তিনি ধীরে ধীরে বলে চললেন—জমিদারের ভাই ও কয়েকজন আত্মীয় লোভে পড়ে তার স্বামীকে বাইরে পাঠিয়ে দেয়, আর শোভাময়ীকে রাতের আঁধারে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, কারণ তার বাবার দেওয়া জমি ও সম্পত্তি তারা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। মরার আগে শোভাময়ীর ঠোঁটে নাকি সেই অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠেছিল—যেন শিকারীর ফাঁদে ফেঁসে যাওয়া শিকার শেষ মুহূর্তে কিছু বুঝে গেছে। সেই হাসির সঙ্গে সে দিয়েছিল ভয়ঙ্কর অভিশাপ—“যতদিন আমার রক্তের দাগ এই মাটিতে আছে, ভোরের কুয়াশায় আমার হাসি বাজবে, আর যারা শুনবে তারা আমার সঙ্গে যাবে।”
অরুণেশের কণ্ঠ ধীরে ধীরে গা শিউরে ওঠা সুরে রূপ নিল। “শত বছর কেটে গেছে, কিন্তু তার আত্মা মুক্তি চায় না… চিরকাল বন্দি থেকেও সে শিকার খোঁজে। যারা কুয়াশায় তার হাসি শোনে, তাদের আত্মা সে কেড়ে নেয়—যেন নিজের দুঃখের ভার ভাগ করে নিতে চায়। কেউ কেউ বলে, সে তার শিকারকে নিজের হারানো সাজঘরে নিয়ে যায়, যেখানে এখনও তেলের প্রদীপ জ্বলে, আর দেয়ালে ঝুলে থাকে লাল বেনারসী শাড়ি।” মীরা ভয় পেয়ে কাঁপতে লাগল, “মানে… ওদের ফেরানো যায় না?” অরুণেশ ধীরে মাথা নাড়লেন, “যতদূর জানি, ফেরানো যায়নি। আর একবার কুয়াশা ডাক দিলে, সেখান থেকে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।” অয়ন, যদিও ভয় পেয়েছিল, তবুও তার কণ্ঠে দৃঢ়তা ছিল—“যদি ওকে মুক্তি না দিতে চাই, তাহলে কি ও থামবে? নাকি থামানোই অসম্ভব?” অরুণেশ জানালেন, থামানো যেতে পারে, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন প্রাচীন ‘পিঞ্জরপাঠ’ আচার—যা একপ্রকার আত্মার পথ বন্ধ করার পদ্ধতি, কিন্তু এতে ঝুঁকি প্রচণ্ড।
ঘরের ম্লান আলোয় তিনজন একে অপরের দিকে তাকাল। বাইরের কুয়াশা তখনও জানালার কাঁচে জমে ছিল, যেন নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে। অরুণেশ বললেন, “এই আচার করতে হলে ভোরের আগে দক্ষিণ প্রান্তে যেতে হবে, জমিদারবাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত অন্দরমহলের ঠিক সামনে। সেখানে কিছু নির্দিষ্ট মন্ত্র, তেলের প্রদীপ, আর লাল ধানের শিকড় রাখতে হবে। ভুল হলে… ওর ক্রোধ আমাদের সবার জন্য শেষ হয়ে যাবে।” মীরার মুখে অসহায়তা ফুটে উঠল, “কিন্তু আমরা কি নিশ্চিত যে এটা কাজ করবে?” অরুণেশের চোখে তখন এক অদ্ভুত জেদ—“শতবর্ষের প্রতিশোধ থামাতে হলে ঝুঁকি নিতেই হবে।” অয়ন গলায় গামছা শক্ত করে বাঁধল, যেন মানসিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছে, আর বাইরের কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠল, যেন শোভাময়ী নিজেই তাদের পরিকল্পনা শুনে হেসে উঠছে, অদৃশ্যভাবে।
৯
রাত গভীর হতে থাকল, আর পাঠশালার ভেতর টিমটিম করে জ্বলা প্রদীপের আলোয় ছায়ারা নাচছিল। মীরা পুরনো তামার সিন্দুক থেকে তুলে আনা হলদেটে পুঁথি খুলে বসে আছে—পাতাগুলো ভঙ্গুর, হাত দিলেই যেন গুঁড়ো হয়ে যাবে। সে অরুণেশের তত্ত্বাবধানে একে একে প্রাচীন অক্ষরগুলো পড়ে শোনাচ্ছে, যা শুনে অয়নের মনে হচ্ছিল প্রতিটি শব্দ যেন সময়ের গহ্বর থেকে উঠে আসছে। লোকমন্ত্রটি এমনভাবে লেখা, যেখানে সুর আর শব্দ মিলে তৈরি করছে অদ্ভুত কম্পন; বলা হয়, এটি শোনালে আত্মা তার বাঁধন ছেড়ে দেয়, কিন্তু শর্ত একটাই—আত্মার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। মীরা চোখ তুলে বলল, “এই মন্ত্র শেষ না হওয়া পর্যন্ত পিছু হটলে চলবে না। নইলে… আমরা সবাই ওর শিকার হয়ে যাব।” অয়ন চুপ করে মাথা নাড়ল, তার হাতে তখন সাউন্ড রেকর্ডার, লাল ধানের শিকড় বাঁধা একটি কাপড়, আর কোমরে বাঁধা টর্চ। অরুণেশ নিজের হাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে বললেন, “আজ রাতই আমাদের শেষ সুযোগ।” বাইরের বাতাসে কুয়াশার গন্ধ ভারী হয়ে উঠছিল, যেন মৃত্যু নীরবে এগিয়ে আসছে।
পূর্ব আকাশের গাঢ় নীল রঙ যখন ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হচ্ছে, তখন তারা তিনজন দক্ষিণ প্রান্তের পথে রওনা দিল। ভোরের কুয়াশা তখন নেমে এসেছে, আর প্রতিটি গাছপালা, প্রতিটি ইট, এমনকি জমিদারবাড়ির ভগ্ন দেওয়ালও যেন সাদা পর্দার আড়ালে লুকিয়ে গেছে। মীরার কণ্ঠে প্রথম মন্ত্রের সুর ভেসে উঠল—নিম্নস্বরে, ধীর গতিতে, যেন প্রতিটি শব্দ বাতাসের ভেতর কেটে যাচ্ছে। তারা জমিদারবাড়ির অন্দরমহলের ধ্বংসপ্রাপ্ত ফটকের সামনে দাঁড়াতেই চারপাশের নীরবতা আরও ঘন হয়ে গেল; এমনকি নিজেদের শ্বাসের শব্দও বেশি জোরে শোনা যাচ্ছিল। ঠিক তখনই সেই পরিচিত, হাড় কাঁপানো হাসি শোনা গেল—দূর থেকে, ধীরে ধীরে কাছে আসছে। কুয়াশার ভেতর সাদা শাড়ির ছায়া ভেসে উঠল, চুলের আড়াল থেকে সেই শূন্য কালো চোখ। অয়নের হৃদস্পন্দন এত দ্রুত হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল বুক থেকে বেরিয়ে আসবে, কিন্তু সে মীরার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। প্রদীপের আলো কুয়াশা ভেদ করে নারীর মুখ স্পষ্ট করে তুলল, আর মীরার গলায় তখন দ্বিতীয় স্তবক—যেন ভয় আর সাহসের মাঝখানে দাঁড়ানো এক সেতু।
হাসিমুখী বউ এবার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো, ঠোঁটের কোণে আরও বিকৃত হাসি। কুয়াশার মধ্যে তার শাড়ির আঁচল উড়ছে, কিন্তু পা দেখা যাচ্ছে না—যেন সে মাটির ওপর ভেসে চলেছে। অরুণেশ প্রদীপ উঁচু করে ধরলেন, আর মীরা চূড়ান্ত স্তবক শুরু করল—এবার কণ্ঠে দৃঢ়তা, কিন্তু কপালে ঘাম। চারপাশের কুয়াশা ঘূর্ণি খেতে লাগল, আর নারীর চোখের কালো গর্তের ভেতর থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল। অয়ন সাউন্ড রেকর্ডার চালিয়ে মন্ত্র ধরে রাখল, যাতে এক সেকেন্ডও হারিয়ে না যায়। ঠিক মন্ত্রের শেষ শব্দটি উচ্চারিত হতেই এক ভয়ঙ্কর চিৎকারে চারপাশ কেঁপে উঠল—হাসিমুখী বউয়ের ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল, চোখের শূন্যতা ফাঁকা থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হলো। কুয়াশা যেন আচমকা হালকা হয়ে এল, প্রদীপের আলো অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু নীরবতা ফিরে এল না—আকাশে তখনও যেন অদৃশ্য এক সুর ভাসছে, যার অর্থ তারা কেউ জানে না।
১০
মন্ত্রের শেষ স্তবক শুরু হতেই হাসিমুখী বউয়ের রূপ ভয়ঙ্করভাবে বিকৃত হয়ে উঠল—ঠোঁটের হাসি আরও প্রশস্ত, এতটাই যে মনে হচ্ছিল মুখের কোণ কান ছুঁয়ে গেছে, দাঁতের সারি অস্বাভাবিক লম্বা ও ধারালো। তার চুল বাতাসে নয়, বরং অদৃশ্য কোনো স্রোতে উল্টোদিকে ভাসছিল, যেন চারপাশের আলো শুষে নিচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে কুয়াশা এমন ঘন হয়ে এল যে প্রদীপের আলোও এক হাত দূরে যেতে পারছিল না; সূর্যের প্রথম রশ্মি, যা কয়েক সেকেন্ড আগে দিগন্তে জ্বলে উঠতে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে গেল—যেন সকাল আর আসবেই না। মীরা কণ্ঠে মন্ত্র ধরে রাখতে লড়াই করছিল, কিন্তু ঠান্ডা হাওয়ায় তার গলা কাঁপছিল; অরুণেশ দুই হাতে প্রদীপ শক্ত করে ধরে পা গেড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আর অয়ন ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে ফ্রেমে ধরে রাখছিল প্রতিটি মুহূর্ত—তার চোখে ভয়, কিন্তু দৃঢ়তা আরও গভীর। কুয়াশার ভেতরে সেই নারী এগিয়ে এল, আর প্রতিটি পদক্ষেপে মাটি যেন ভেঙে পড়ছে, বাতাসে জমাট মৃত্যুর গন্ধ।
শেষ মুহূর্তে মীরার কণ্ঠে মন্ত্রের চূড়ান্ত শব্দ উঠতেই চারপাশে এক অসহনীয় চিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো, যা কোনো মানুষের নয়—শব্দটা যেন একই সঙ্গে দূর থেকে আর কানের ভেতর থেকে আসছে। হাসিমুখী বউয়ের শরীর কেঁপে উঠল, তার চোখের শূন্য গর্ত থেকে ধোঁয়ার মতো কালো কণাগুলো বেরিয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল। কুয়াশা তীব্রভাবে ঘুরপাক খেতে খেতে হঠাৎ ছিঁড়ে গেল, আর ভেতরে যেন শূন্য এক অন্ধকার গহ্বর দেখা দিল, যেখানে আলো পৌঁছায় না। মুহূর্তের মধ্যে নারীটি সেই গহ্বরে টেনে নেওয়া হলো—তার হাত দুটি শেষবারের মতো বাইরে ছুটে এলো, কিন্তু কারও নাগাল পেল না। হাসির শব্দটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, যেন বহু বছরের প্রতিধ্বনি একসঙ্গে থেমে গেল। প্রদীপের শিখা হালকা কাঁপল, তারপর স্থির হয়ে উঠল, আর হঠাৎই সূর্যের আলো ফিরে এল, ভোরের রঙ মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল।
তারা তিনজন—মীরা, অরুণেশ, আর অয়ন—একই সঙ্গে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল, কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হলো না। আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়তেই দেখা গেল, অয়ন কোথাও নেই। মীরার হাত থেকে পুঁথি মাটিতে পড়ে গেল, অরুণেশ অবিশ্বাসে চারপাশ তাকালেন। তারা দ্রুত দক্ষিণ প্রান্ত থেকে নদীর ধারের দিকে দৌড়ে গেল, কারণ সেখানেই শেষবার কুয়াশা সরে যেতে দেখা গিয়েছিল। নদীর ঘোলা জলে হালকা ঢেউ খেলছে, তীরে পড়ে আছে অয়নের ক্যামেরা—লেন্স ভাঙা, বডিতে জমে থাকা কুয়াশার ফোঁটাগুলো রোদে ঝিলমিল করছে। কিন্তু তার কোনো চিহ্ন নেই—না পদচিহ্ন, না পোশাক, না কোনো আওয়াজ। দূরে পাখির ডাক, কিন্তু বাতাসে এক অদ্ভুত নীরবতা, যেন চারপাশের জীবন থমকে আছে। মীরা নিঃশব্দে ক্যামেরাটি তুলে নিল, কিন্তু বোতাম চাপতেই স্ক্রিনে কেবল একটিই ছবি ফুটে উঠল—সাদা শাড়ি পরা এক নারী, মুখে বিকৃত হাসি, আর ঠিক তার পাশে দাঁড়ানো অয়ন, যার চোখ কুয়াশার মতো সাদা। নদীর ওপর আবার এক স্তর কুয়াশা ভেসে এল, আর অরুণেশের ঠোঁট থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো এক ফিসফিসানি—“শেষ ভোরও হয়তো চিরকালের কুয়াশার ভেতর হারিয়ে গেল।”
সমাপ্ত




