Bangla - ভূতের গল্প

বিবর্ণ পটচিত্র

Spread the love

প্রশান্ত ভৌমিক


এক

ডঃ অনির্বাণ দত্ত ট্রেন থেকে নামলেন বোলপুর স্টেশনে, অগস্টের একটি অলস দুপুরে। তাঁর কাঁধে ক্যাম্ব্রিক কাপড়ের ব্যাগ, ভেতরে নোটবুক, একটি পুরনো ক্যামেরা, আর কিছু প্রয়োজনীয় গবেষণা-সামগ্রী। শান্তিনিকেতনের এই আশপাশের অঞ্চলে তিনি বারবার এসেছেন, কিন্তু এবারের উদ্দেশ্য কিছুটা ব্যতিক্রম। পূর্ব ভারতের লোকজ শিল্পের উপর একটি দীর্ঘ গবেষণাপত্রের কাজ করছেন তিনি, যার জন্য বিশেষ করে বীরভূম জেলার হারিয়ে যাওয়া পটচিত্রের খোঁজে এসেছেন। তিনি শুনেছিলেন, বোলপুর থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে এক গ্রামে এমন একটি পটচিত্র আছে, যা কেবল শিল্পগুণের জন্য নয়, তার অদ্ভুত, অলৌকিক ইতিহাসের জন্যও লোকের মুখে মুখে ফেরে। এই গল্প প্রথম তিনি শুনেছিলেন তাঁর গুরু প্রণবেশ মিত্রর কাছ থেকে—যিনি বলেছিলেন, “ওই পটচিত্রটা দেখতে গেলে চোখে মায়া পড়ে যায়… আর তারপর মানুষ হারিয়ে যায় চিরতরে।” অনির্বাণ এই কথাকে লোককথা ভেবেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু যখন পরপর কয়েকজন স্থানীয় পটশিল্পীও একই কথা বলতে শুরু করেন, তখন তাঁর মধ্যে গবেষকের কৌতূহল তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি ঠিক করলেন, সেই পটচিত্রটা দেখতেই হবে। স্টেশন থেকে বেরিয়েই একটি টোটো নিয়ে পৌঁছালেন পঞ্চাননপুর নামক এক ক্ষীণ পরিচিত গ্রামে। গ্রামের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধ—মাটির উপর পাটি পেতে তেল দিয়ে পাখা বানাচ্ছিলেন। অনির্বাণ গ্রামটার নাম বলতেই বৃদ্ধ তাঁর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “ওই দিকে যাবেন না বাবু, সন্ধ্যা নামার আগে ফিরেও আসবেন।” সেই চোখে কোনও ছলনা ছিল না, ছিল সতর্কতার চাপা আতঙ্ক।

গ্রামটি যেন সময়ের গর্ভে লুকিয়ে থাকা এক ধূলিময় ক্যানভাস। ছেঁড়া চাল, কাঁচা রাস্তা, মাটির ঘর—আর সেই ঘরের দেওয়ালে পটচিত্রের বিবর্ণ চিহ্ন। অনির্বাণ ঘুরতে ঘুরতে এক সময় পৌঁছালেন একটি জীর্ণ কুটিরে, যেখানে কালী ঠাকুরের দেওয়ালের নিচে টাঙানো ছিল এক অদ্ভুত চিত্র: এক রাজসিক পুরুষ, হাতে ধনুক, চারপাশে নারী-পুরুষের ভীত মুখ—পটচিত্রটি আধেক মলিন, কিন্তু চোখদুটো যেন এখনও চেয়ে আছে কারো দিকে। তিনি পটচিত্রটিকে নিরীক্ষণ করতে করতে বাড়ির বৃদ্ধা মালিকানির সাথে আলাপ করলেন। তিনি ছিলেন মাধবী পাত্র, প্রায় পঁয়ষট্টি ছুঁইছুঁই বয়সের, একদা নামী পটশিল্পী পরিবারের শেষ জীবিত সদস্য। তাঁর কথায় ধরা পড়ল, এই পটচিত্র তাদেরই পূর্বপুরুষ আঁকতেন, কিন্তু সেই পট একদিন এমন কিছু ঘটনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে যা থেকে তারা আজও মুক্ত হতে পারেনি। “এই পট বাবু, শুধু আঁকা নয়… এটা শ্বাস নেয়,” বলেই মাধবী একটা মাটির পাত্রে জল ঢেলে দরজার পাশে রেখে দিলেন। পাত্রের জল যেন মুহূর্তে জমে উঠল ঘন নীল ছায়ায়। অনির্বাণ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। ভেতরে ভেতরে তিনি অনুভব করলেন, এই পটচিত্র কেবলমাত্র একটি শিল্পকর্ম নয়, এটি যেন নিজস্ব সত্তা নিয়ে বেঁচে আছে, এবং সেই জীবন্ত অস্তিত্ব তাঁকে চুপিসারে ডাকছে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে গ্রামে ছায়া নেমে এল—প্রকৃতির ছায়া নয়, যেন অন্য এক অদৃশ্য সত্তার ছায়া। বাতাস ভারী হয়ে উঠল, কুকুরেরা ডেকে উঠল কোনো অজানা ভয় পেয়ে। অনির্বাণ মাধবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গ্রামের বাইরে একটি আশ্রমে আশ্রয় নিলেন, কিন্তু তাঁর মনে পটচিত্রটি যেন স্থায়ী হয়ে রয়ে গেল। সেই পটের চোখ, সেই চরিত্রদের স্পষ্ট রেখাগুলি তাঁর মস্তিষ্কে গেঁথে বসে রইল। রাতে ঘুমোতে গিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখলেন—এক দীর্ঘ পথ, যার দুই ধারে পটচিত্রের মতো রঙিন চিত্র, আর সেই পথ ধরে এগিয়ে আসছে এক ছায়ামূর্তি—হাতে ধনুক, চোখ লাল। “ফিরে আয় পটপুরীতে…”—একটি স্তব্ধ কণ্ঠস্বর বলে উঠল। অনির্বাণ জেগে উঠলেন ঘামে ভেজা অবস্থায়। তিনি জানতেন, তিনি এই পটচিত্রকে বিশ্লেষণ করতে এসেছিলেন গবেষক হিসেবে, কিন্তু এখন এই পটচিত্র যেন তাঁকে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছে। ঘর অন্ধকার, কিন্তু জানালার ওপার থেকে পেঁচার আওয়াজ কানে এলো—আর জানালার কাচে ধরা পড়ল, পটচিত্রের সেই রাজসিক মুখটি যেন অন্ধকারে ফুটে উঠেছে, তাকিয়ে আছে তাঁর দিকেই।

দুই

পরদিন সকালে আলো ফুটতেই অনির্বাণ আবার ফিরে গেলেন মাধবী পাত্রর কুটিরে। আগের দিনের স্বপ্ন এবং সেই পটচিত্রের পিছুটান তাকে যেন অস্থির করে তুলেছে। কুটিরের সামনে বসে থাকা বৃদ্ধাটি তার আগমনে প্রথমে কিছুটা অনাগ্রহ দেখালেন, কিন্তু অনির্বাণ যখন তার ব্যাগ থেকে বের করে একটি পুরনো বই দেখালেন—যেখানে মাধবীর স্বামী বিমল পাত্রের আঁকা পটচিত্রের রেফারেন্স ছিল—তখন যেন এক অদ্ভুত কিছু ঘটল তাঁর চোখে। “তোমার বইতে ওর নাম আছে?”—এই প্রশ্নের কাঁপা কণ্ঠে ছিল বিস্ময়, কষ্ট আর একটুখানি আশা। বিমল পাত্র ছিলেন একজন প্রতিভাবান পটশিল্পী, যিনি হঠাৎই একদিন নিখোঁজ হয়ে যান—তারপর থেকে গ্রামে চারপাশে ছড়াতে থাকে গুজব, কেউ বলে পটচিত্রে ঢুকে গেছে, কেউ বলে পটনাথের অভিশাপ লেগেছে তার গায়ে। মাধবী পাত্র, যদিও এই গল্পগুলো বহুদিন ধরে এড়িয়ে চলতেন, কিন্তু আজ যেন তিনি নিজেই মুখ খুলতে চান। তিনি উঠোনে বসে, একটি লাল কাপড়ে মোড়ানো কৌটো থেকে তিনটি পুরনো পটচিত্র বের করলেন—সবকটিই বিমলের হাতে আঁকা। “এই তিনটে ছবি শেষ তিন রাতের স্বপ্নে এসেছিল আমার সামনে,” বলেই তিনি মাথা নিচু করলেন। চিত্রগুলির মধ্যে একটিতে দেখা গেল এক পটনৃত্যরত মহিলা, যার চোখ ছিল শূন্য—মাধবী বললেন, “ওর নাম ছিল নুনুকালী… আমাদের পরিবারেরই কন্যা, কিন্তু ওকে নিয়ে যা ঘটেছিল, তা কেউ বিশ্বাস করবে না।”

মাধবীর কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, এই পটচিত্র শুধুমাত্র এক অলংকরণের মাধ্যম ছিল না—এ ছিল এক জীবন্ত ইতিহাস, একটি পট-গাথা যা বহন করত একসঙ্গে শিল্প, অভিশাপ ও আত্মত্যাগ। তিনি বললেন, “আমার শ্বশুরমশাই বলতেন, কিছু পট এমন হয়, যেগুলোর মধ্যে ‘বন্দি’ হয়ে থাকে মুখ… মনের মুখ, স্মৃতির মুখ। বিমল প্রথমে বিশ্বাস করত না, কিন্তু যখন সে রোজ রাতে একই পট আঁকতে লাগল, আর প্রত্যেক পটে একই মুখ ফিরেও এল, তখন তার ভয় হতে শুরু করল।” মাধবী দেখালেন সেই পটচিত্র—এক রাজসিক পুরুষ, যার নাম ছিল পটনাথ, এবং যাকে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলতেন ‘পটপুরীর রক্ষক’। মাধবী জানালেন, তার স্বামী একদিন বলেছিল—“এই লোকটা শুধু ছবি নয়, এটা কারা যেন আমাকে ‘শোনায়’।” তার পরের দিন থেকে বিমল বদলে যেতে থাকে—চুপচাপ হয়ে যায়, খাবার খায় না, আর রাতে উঠে পটের সামনে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। একদিন সকালে মাধবী উঠে দেখেন, ঘরের দরজাটা খোলা, আর সেই পটচিত্রের মাঝখানে বিমলের মুখ আঁকা হয়ে আছে—যেন পটের মধ্যে ঢুকে পড়েছে সে নিজে। মাধবী প্রথমে ভয় পেয়েছিলেন, কিন্তু তারপরে সে বুঝেছিলেন—পট শুধু আঁকা নয়, পট হলো এক প্রাচীন দরজা। যে কেউ বেশি গভীরভাবে দেখে, তাকে সে টেনে নেয় ভেতরে।

অনির্বাণ সব শুনে গভীরভাবে ভাবলেন—এই ইতিহাস লোককথার মত শোনালেও তাতে এতটা বিস্তারিত অনুভব, স্মৃতির জটিলতা আর চরিত্রের ঘনত্ব ছিল যে এগুলো কেবল গল্প হতে পারে না। তিনি নিজে মনে মনে ভাবলেন, হয়ত পটনাথ বা নুনুকালী নামগুলি প্রতীক—মানসিক অসুস্থতা, শোক কিংবা শিল্পীর অবসাদের। কিন্তু পরমুহূর্তেই তাঁর নিজের দেখা সেই স্বপ্ন, জানালায় সেই অদ্ভুত ছায়া—সব যেন তাঁর যুক্তিকে ধোঁয়াশায় ডুবিয়ে দিল। “আপনি কি কখনও পটচিত্র ছিঁড়তে চেষ্টা করেছেন?”—এই প্রশ্নে মাধবীর চোখ ঠাণ্ডা হয়ে গেল। “না, বাবা। ওই পট কেউ ছিঁড়তে পারে না। যতই কাটো, তা আবার জুড়ে যায়… আমি দেখেছি।” অনির্বাণ এবার স্পষ্ট বুঝলেন, তিনি একটি সাধারণ গবেষণার মধ্যে আর নেই। এই শিল্পকর্ম, এই চরিত্র, এবং এই বাড়ির প্রতিটি ছায়া যেন তাঁর চারপাশ ঘিরে আসছে ধীরে ধীরে। ফেরার সময় তিনি মাধবী পাত্রকে অনুরোধ করলেন, “আপনার স্বামীর শেষ আঁকা পটটা আমি কিছুদিনের জন্য নিতে চাই। শুধুই গবেষণার জন্য।” মাধবী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “তুমি সাহসী হলে নিতে পারো। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—পটের ভেতরে যা আছে, সে দেখে কে তাকাল আর কে ফিরল না।” অনির্বাণ পটচিত্র হাতে বাড়ি ফিরে এলেন। সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়ছে, আর সেই আলোয় পটচিত্রে পটনাথের চোখ যেন মৃদু ভাবে জ্বলে উঠছে।

তিন

পটচিত্রটি হাতে পাওয়ার পরদিন সকালে অনির্বাণ হাঁটতে বেরিয়েছিলেন গ্রামটিকে একটু ভালো করে চেনার জন্য। বাতাসে হালকা বুনো ফুলের গন্ধ, কাঁচা রাস্তার দু’ধারে ধানক্ষেতের উঁকি দেওয়া সবুজ আর কিছু দুর্বল কুয়াশার রেখা। তিনি ভাবছিলেন পটচিত্রটি নিয়ে শহরে ফিরে গবেষণা শুরু করবেন, কিন্তু মনের গভীরে একটা অস্থিরতা থেমে থেমে উঁকি দিচ্ছিল। হাঁটতে হাঁটতে তিনি পৌঁছালেন গ্রামের প্রান্তে, যেখানে একটি পুরনো বটগাছের নিচে বসে ছিল এক বালিকা। বয়স হবে নয় কি দশ, উঁচু কপাল, কাঁধ অবধি এলোমেলো চুল, গায়ে মলিন নীল জামা। সে পায়ের পাতায় মাটি দিয়ে ছবি আঁকছিল আর আপনমনে এক অদ্ভুত সুরে গান গাইছিল—অচেনা ভাষায়, অদ্ভুত তাল-ছন্দে। অনির্বাণ থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর পায়ের আওয়াজে মেয়েটি থেমে তাকাল, কিন্তু তাতে ভয় বা লজ্জার কোনো চিহ্ন ছিল না—বরং ছিল এমন এক দৃষ্টি, যেন সে অনির্বাণকে আগেই চিনে রেখেছে। “আপনি ওই ছবিটা নিয়ে এসেছেন, তাই না?” মেয়েটির প্রশ্ন শুনে কেঁপে উঠলেন তিনি। “তুমি কোন ছবি বলছো?”—অনির্বাণ জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটি বলল, “যেটায় পটনাথ থাকে… যার চোখ রাতে খুলে যায়।”

গ্রামের নামধারী পাগলী কিংবা অতিসমবেদনশীল শিশু ভেবে অনির্বাণ প্রথমে পাত্তা দিতে চাননি, কিন্তু মেয়েটির কথায় এমন কিছু শব্দ ছিল যা শুধু মাধবী পাত্র বা তাঁর মতো কেউ বলতে পারে। সে বলল, “আমার দাদু ওই ছবির গান শুনে গিয়েছিল… আর ফিরল না।” অনির্বাণ বসে পড়লেন মেয়েটির পাশে। “তোমার নাম কী?”—জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, “চিনু।” ছোট নাম, কিন্তু উচ্চারণে যেন কোথাও একটি স্পষ্টতা ছিল। চিনু জানাল, সে এই গ্রামে থাকলেও তার মা-বাবা কেউ নেই, আর গ্রামের মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে। সে নাকি “অলৌকিক কথা” বলে, যার কারণে পাড়া-প্রতিবেশীরা ভয় পায়। “আপনি জানেন, রাতে ওই পটচিত্রটা কথা বলে?”—চিনু বলল। “সে শুধু চোখ খোলে না, গানও গায়।” অনির্বাণ অবাক হয়ে তাকালেন মেয়েটির দিকে। “তুমি শুনেছো সেই গান?”—চিনু মাথা নাড়ল, তারপর হঠাৎ চোখ বুজে গাইতে শুরু করল—সেই একই অচেনা সুরে, যেটা সে আগে গাইছিল। সুরটা যেন ধীরে ধীরে অনির্বাণের চেতনায় ঢুকে পড়ছিল। প্রতিটি শব্দ ছিল আচ্ছন্ন করা, যেন পুরোনো কোনো মন্ত্র, অথবা এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের কণ্ঠস্বর। গান থেমে গেলে চিনু নিঃশব্দে বসে রইল, আর অনির্বাণ বুঝলেন—এই শিশু শুধুমাত্র পটচিত্র জানে না, সে নিজেই হয়তো পটপুরীর সাথে কোনওভাবে যুক্ত।

চিনু বলল, “পটনাথ বলে—স্মৃতি দাও, আমি স্বর তৈরি করব। পটের ভিতরে যে থাকে, সে গান হয়ে যায়। আমার দাদু এখন একটা বাউল সুর।” অনির্বাণের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছিল, এই শিশু সাধারণ নয়, তার শরীরের মধ্যে দিয়ে যেন অন্য এক কণ্ঠস্বর কাজ করে, অন্য এক ইতিহাস। চিনু আরও জানাল, পটচিত্রের চারপাশে যদি নির্দিষ্ট ভাবে পাঁচটি শব্দ তিনবার বলা হয়, তাহলে পটনাথ জেগে ওঠে। অনির্বাণ তাকে জিজ্ঞেস করলেন সেই শব্দগুলি কী—কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু বলল, “আপনি চাইলে পট খুলে যেতে পারে, কিন্তু আপনি ফিরতে পারবেন না।” অনির্বাণ তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন, চিনুকে এড়িয়ে যাবেন না। সে কেবল একজন শিশুই নয়, সে হয়তো তাঁর গবেষণার একমাত্র জীবন্ত সূত্র। তাঁর মনে হলো, যদি কেউ এই রহস্যের সূত্র জানে, তা এই বালিকা—যে সময়ের সীমানা মুছে দিয়ে একটা অন্য অস্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছে। তিনি চিনুকে বললেন, “তুমি আমার সঙ্গে আবার আসবে সেই পটের কাছে?” চিনু একটু হেসে বলল, “ওই পট তো আমার সঙ্গেই আছে… আপনি শুধু দেখেননি।” এই কথার মধ্যে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে গেল। অনির্বাণ জানতেন না—এই পথে তিনি আর ফিরে আসবেন কিনা, কিন্তু একবার পা রাখা হয়ে গেছে, এবার শুধুই এগোনোর পালা।

চার

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করল। মাটির ঘ্রাণে ভরে উঠল পুরো বাতাস, আর তার মাঝেই ডঃ অনির্বাণ দত্ত বসেছিলেন শিবুর কাকিমার রান্নাঘরের পাশে, একখণ্ড পুরনো হ্যাজাকের আলোয়। কাকিমা তাকে দুধ আর মুড়ি খেতে দিলেন, মুখে একরকম বিষণ্নতা। “আপনি বলেছিলেন ওই ছবির মধ্যে কিছু নড়ে উঠেছিল? আমি ছেলেবেলা থেকে জানি, ওই পট কেউ ছুঁয়ো না। ও পট এলেই কিছু না কিছু হয়।” অনির্বাণ চুপ করে শুনছিলেন। রাত বাড়তেই কাকিমা নিজের ঘরে চলে গেলেন, কিন্তু তার আগেই জানালেন, “আজ রাতেও যদি কিছু শোনেন, ভয় পাবেন না। গাইছে ওরা। যেমন প্রতি অমাবস্যায় গায়।” কথাটা শুনে একটা শীতলতা বয়ে গেল অনির্বাণের শরীর জুড়ে। তিনি জানতেন না ঠিক কী গানের কথা বলছে কাকিমা, কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেমন একটা অস্বস্তিকর ভার এসে চেপে বসতে লাগল তাঁর কাঁধে।

বৃষ্টি থেমে গেছে, জানলার ধারে বসে ছিলেন অনির্বাণ। ঘরের মধ্যে ছায়ার মত কিছু নড়াচড়া করছে যেন, অথচ নিশ্চিত হতে পারছেন না। হঠাৎ করেই দূর থেকে ভেসে এল এক সুরেলা নারী কণ্ঠ—উচ্চারণে ছিল ষোড়শ শতকের বাংলার গন্ধ, কেমন যেন পুঁথির ভাষা। কিন্তু শব্দগুলো স্পষ্ট ছিল না। মনে হল, যেন কেউ গাইছে কোনও দুঃখের কাহিনি, আর সেই গান বাতাসে জড়িয়ে ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা মারছে। অনির্বাণ চমকে উঠে জানলার দিকে এগিয়ে গেলেন, বাইরে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পটচিত্রটা তখন টেবিলের উপরেই রাখা, আর সেই সুর যেন ঠিক সেখান থেকেই আসছে! হঠাৎ করেই পটচিত্রের মধ্যেকার একটি নারীচরিত্রের ঠোঁট খানিকটা নড়ে উঠল—কিছু বলার চেষ্টা করছে যেন! ঘামতে শুরু করলেন অনির্বাণ, কিন্তু চোখ সরাতে পারলেন না। তারপর একটি গা ছমছমে দৃশ্য—পটের মধ্যে যেন কারও ছায়া ঢুকে গেল, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

সেই রাতের পর থেকে প্রতিরাতেই সেই গান শোনা যেতে লাগল, কিন্তু কেবল অনির্বাণই শুনতে পাচ্ছিলেন। গ্রামের আর কেউ কিছু টের পাচ্ছিল না। তিনি নিজেই সন্দেহ করতে লাগলেন নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। কিন্তু প্রতিবার পটের সামনে বসলেই সেই সুর যেন তাকে টেনে নিয়ে যায়। গানের অর্থ খুঁজে পেতে পটচিত্রের প্রতিটি রেখা বিশ্লেষণ করলেন তিনি। এই নারী চরিত্রটি, যাকে তিনি এখন “আভা” বলে ডাকেন, সেই যেন মূল কেন্দ্র। সে যেন কোনও কালের গভীর অভিশাপে বন্দি হয়ে রয়েছে সেই পটচিত্রের মধ্যে, এবং প্রতি অমাবস্যায় তার কণ্ঠস্বর পটের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব জগতে প্রবেশ করে। অনির্বাণ বুঝতে পারলেন, এই কাহিনি কেবল একটা অভিশপ্ত শিল্পকর্মের নয়—এটি আসলে ইতিহাস, মৃত্যু আর আকাঙ্ক্ষার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ, যার গানে বাঁধা রয়েছে এক নারীর মুক্তির আর্তি।

পাঁচ

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা যখন নামতে শুরু করল, তখন অনির্বাণ একা বসে ছিল সেই পাটুলি গ্রামের প্রাচীন পটচিত্র ঘরের সামনে। ঘন অন্ধকার ধীরে ধীরে ছায়ার মত গড়িয়ে আসছিল চতুর্দিকে, যেন পটচিত্রের ছায়াগুলিই ধীরে ধীরে বাস্তবতাকে ঢেকে দিতে চাইছে। গ্রামের মানুষজন দিনের আলো নিভে যেতেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়, যেন তারা জানে রাতের পর্দার আড়ালে কিছু আছে, যা দিনে লুকিয়ে থাকে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে অনির্বাণ আবারও চোখ রাখল সেই পটে—যার চরিত্রগুলো দিনভর নিশ্চল থাকলেও, রাত্রি নামলেই যেন প্রাণ পায়। তার চোখে ঘুম নেই, হৃদয়ে তীব্র একটা টান—পটে লুকিয়ে থাকা সেই রহস্য জানতেই হবে। সে জানত, গত রাতের স্বপ্ন নয়—আসলে সে বাস্তবেই পটচিত্রের ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল, কিন্তু কীভাবে? পটে আঁকা এক বাউলের মুখে তখন সে স্পষ্ট শুনেছিল—”ফিরবি না রে, যে একবার ঢোকে, সে খুঁজে পায় নিজের অতীত…” সেই কথা তার কানে এখনো গুঞ্জন তোলে। তাই আজ সে প্রস্তুত, নিজের ক্যামেরা, রেকর্ডার আর টর্চ নিয়ে সে আবারও সেই ঘরের ভিতরে ঢুকল, যেখানে পটচিত্র রাখা আছে কাঠের আলমারিতে, লাল কাপড়ে মোড়া অবস্থায়। চুপচাপ কাপড় সরিয়ে পট বের করল অনির্বাণ—একবারে সেই জায়গাটাতে চোখ রাখল, যেখানে আগের রাতে আলো জ্বলে উঠেছিল। ঘর নিস্তব্ধ, শুধু তার নিঃশ্বাস আর হৃদয়ের শব্দ।

এক ঝলকে বাতাস যেন হু হু করে ঘরে ঢুকে পড়ল জানলা ফাঁক দিয়ে। আলোর স্পর্শহীন সেই ঘরে, টর্চের কাঁপতে থাকা আলোয় সে দেখল—পটের একটা চরিত্র, যেটা দিনের বেলায় মাথা নিচু করে বসে থাকত, এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাচ্ছে অনির্বাণের দিকে। তার চোখে শূন্যতা, কিন্তু তাতেই যেন ভীষণ গভীর টান। টর্চের আলো নিভে গেল হঠাৎ, ঘরে নিঃশব্দ ঘোর অন্ধকার। অনির্বাণ টের পেল, চারপাশে শব্দ হচ্ছে—জুতো টেনে চলার মত, সুতোর ঘর্ষণের মত, পটচিত্রের কণ্ঠে বাউলগান গেয়ে ওঠার মত এক বিচিত্র অনুভূতি! হঠাৎ সে বুঝতে পারল—সে আর ঘরের মধ্যে নেই, কোথাও অন্য এক জায়গায় চলে এসেছে। চারপাশে কাঁচা রাস্তা, ধূলি আর আলোর কুয়াশা, দূরে বাউল গানের সুর ভেসে আসছে, আর সে যেন একটা জ্যান্ত পটচিত্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে—চারপাশে সব চরিত্রগুলো হাঁটছে, হাসছে, কান্না করছে, আর কিছু চরিত্র তার দিকে এগিয়ে আসছে। “তুমি ফিরেছ,” বলল একজন নারীর কণ্ঠ, যার পরনে সাদা-লাল পাড়ের শাড়ি, মুখে ঘোমটা। অনির্বাণ ভয়ে নয়, আশ্চর্যে তাকিয়ে রইল—এই মুখ তার পরিচিত, ঠিক যেন তার স্বপ্নে দেখা পুরনো প্রেমিকা শ্রেয়ার মত! কিন্তু এই তো অসম্ভব! পটচিত্রে এমন কাউকে আঁকা থাকার কথা নয়। নারীটি আবার বলল, “তুমি যখন পটের দিকে তাকাও, পট তখন তোমার ভিতরেও তাকায়। আমরা তো কেবল রঙ, তুমিই আমাদের গল্পের সূত্রধর!” অনির্বাণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল, আর এক মুহূর্তে চারপাশটা আবার নিঃশেষ আলোয় ঝলমল করে উঠল।

হঠাৎ সেই আলো ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে এল, আর অনির্বাণ আবার চোখ খুলে দেখল—সে কাঠের মেঝেতে পড়ে আছে, ঠিক সেই ঘরের মধ্যেই, যেখানে পট রাখা ছিল। দরজা খোলা, ভোরের আলো ঢুকছে ভিতরে। বাইরে গ্রামের লোকজন কৌতূহলে তাকিয়ে আছে—তারা জানত কেউ সারারাত ঘরের মধ্যে ছিল, কিন্তু কেউ ভয়েও ঢোকার সাহস করেনি। গ্রামপ্রধান হরিপদর কথা মনে পড়ল অনির্বাণের—”ওটা শুধু ছবি নয় বাবু, ওটা পট নয়—ওটা একটা দোর। কার জন্য খোলে, সেটা পটই ঠিক করে নেয়।” উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে পটটা আবার লাল কাপড়ে জড়াল অনির্বাণ। কিন্তু এবার তার চোখে ভয় নয়—একটা অন্যরকম নিষ্পত্তির ছাপ। সে জানে, এই পটচিত্র শুধু অতীতকে নয়, তার নিজের ভিতরের ভুলে যাওয়া, না বলা, চাপা পড়ে থাকা গল্পগুলোকেও টেনে এনেছে। এই অতিপ্রাকৃত যাত্রা এখনো শেষ হয়নি, বরং শুরু মাত্র—কারণ সে জানে, এখনও পুরো পট সে দেখেনি। এখনো অনেক চরিত্র কথা বলেনি, অনেক রহস্য খোলা বাকি।

ছয়

অবশেষে সেই রাতে ডঃ অনির্বাণ দত্ত নির্ঘুম থেকে অপেক্ষা করছিলেন, পটচিত্রের দিকে চেয়ে। বাইরের ঝিঁঝিঁর ডাক আর গা ছমছমে নিস্তব্ধতা মিলে সময়কে ঘন করে তুলছিল। টেবিলের ওপর পাতা পটচিত্রটি নিঃসন্দেহে পুরনো, কিন্তু তার রং, রেখা, আর চরিত্রগুলির অস্বাভাবিক গভীরতা যেন ধাপে ধাপে এক অন্য জগতের দিকে আহ্বান জানাচ্ছিল। হঠাৎ মাঝরাতের কাছাকাছি, একটি অদ্ভুত শব্দ অনির্বাণের কানে এল—মনে হল যেন পাতার ভেতর থেকে কারো নিঃশ্বাস পড়ছে। ঘর জুড়ে আলো নিভে এলো, জ্বলে উঠল কেবল পটের মাঝখানে আঁকা এক বৃদ্ধের চোখ। অনির্বাণ হতভম্ব হয়ে গেল, কারণ সে চোখ যেন তাকিয়ে আছে সরাসরি তার দিকে। একটা অদ্ভুত ঘূর্ণিপাকের অনুভূতি হতে থাকল তার মাথার ভেতরে, আর সেই পটচিত্র তাকে টেনে নিতে লাগল—না, বাস্তব নয়, হয়তো কল্পনা—কিন্তু হঠাৎ সে নিজেকে খুঁজে পেল এক অন্ধকার, ধুলো জমা ঘরের মধ্যে, চারদিক পটচিত্রে ঢাকা। পেছনে ফিরে দেখল, তার ঘরের দরজাটা আর নেই। তার জায়গায় রয়েছে শুধু এক দীর্ঘ, আঁকাবাঁকা পটশিল্পে ভরা করিডর।

করিডরের দেয়ালজুড়ে পটচিত্রের চরিত্রগুলি যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে—একজন নাচছে, একজন কাঁদছে, কেউ বা শিকল টেনে এক পশু বশে রাখছে। কিন্তু এগুলি কোনো উৎসবের দৃশ্য নয়—এ যেন যন্ত্রণার, ভয় আর অতৃপ্ত আত্মার অভিশপ্ত বন্দিত্ব। প্রতিটি চরিত্রের চোখে একরকম আর্তি, যেন মুক্তির জন্য চিৎকার করছে। হঠাৎ করেই অনির্বাণ অনুভব করলেন, তিনি একা নন। পিছন থেকে আসা পায়ের ধ্বনি তাকে দমবন্ধ করে তুলল। ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলেন, তাঁর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃদ্ধ—যে পটচিত্রে আগে থেকেই আঁকা ছিল। কিন্তু এখন সে জীবন্ত, অথচ তার মুখে কোনো রক্তমাংস নেই—শুধু ছাইরঙা এক গহ্বর, যেখান থেকে গলা বেরোয় না, শুধু বাতাস কাঁপে। বৃদ্ধের হাতের বাঁশি সে বাজানো শুরু করল—তার সুরে ঘরের দেয়ালে আঁকা চরিত্রগুলি একে একে নড়েচড়ে উঠল, আর করিডরের ভেতর থেকে জেগে উঠল পুরনো, অভিশপ্ত কণ্ঠস্বর: “পটের ভিতর যারা আসে, তারা আর ফেরে না।”

ভয়ে জমে যাওয়া অনির্বাণ পালাতে চাইলেন, কিন্তু করিডরের শেষ মাথায় পৌঁছে দেখলেন, দেয়ালে আঁকা ছিল এক দরজা—এবং সেই দরজা এবার সত্যিই খোলা। দরজার ওপারে ছিল অন্ধকার আর দূরে ঝাপসা এক আলো। সেই আলো যেন ডেকেই চলেছে। কিন্তু সেই আলোয় পৌঁছোনোর আগে তাকে পেরোতে হবে আরও তিনটি পটঘর—তিনটি অলংকৃত দৃশ্য: একটি চিত্রে মানুষের বলি দেওয়া হচ্ছে, আরেকটিতে কোনো পুতুলের মতো জড়িয়ে রয়েছে মৃত মানুষের শরীর, এবং তৃতীয়টিতে একটি ছায়ামূর্তি বসে আছে, যেটা তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে অনির্বাণের দিকে। প্রত্যেকটি ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে নিঃশব্দ কান্না আর বাঁশির তীক্ষ্ণ সুর। অনির্বাণ বুঝতে পারলেন, এটি কেবলমাত্র শিল্প নয়—এ একটি অলৌকিক ফাঁদ, যেখানে সময় থেমে যায়, মানুষ রঙ হয়ে যায়, আর বাস্তব মিশে যায় রেখায়। ভয়, জিজ্ঞাসা আর কৌতূহলের ভেতর দিয়ে তিনি পা ফেললেন সেই দরজার দিকে, unaware যে এই দরজার ওপারে তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক পটনগর, যেখানে সে হয়তো থাকবে চিরকাল, শিল্পের রঙে বন্দী হয়ে, আর কেউ খুঁজে পাবে কেবল তার আঁকা প্রতিচ্ছবি।

সাত

রাত্রি গভীরতর হচ্ছিল। আশেপাশের বনজঙ্গল, পল্লি ঘেরা নিস্তব্ধতা আর মাঝে মাঝে পেঁচা ডেকে উঠলে যে ভয়টা জমে উঠছিল, তা আর কেবল অনুভব নয়, যেন কারও নিঃশ্বাস পড়ছিল কানের পাশে। ডঃ অনির্বাণ দত্ত সেই পটচিত্র নিয়ে বসে ছিলেন—যেটি শুধুমাত্র সন্ধ্যার পর আলো ফেলে পর্যবেক্ষণ করলে অন্যরকম হয়ে উঠত। আজ রাতেও তিনি একই কাজ করছিলেন, কিন্তু আজ একটি আলাদা ইচ্ছা কাজ করছিল তাঁর মধ্যে—পটের ভেতরে প্রবেশের। গত কয়েকদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, বারবার ঘরের জিনিসপত্রের নিজে নিজে নড়াচড়া করা, আয়নায় প্রতিবিম্বে কারও উপস্থিতি, সবকিছু যেন এক অলৌকিক সত্যের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। অবশেষে, সেই মুহূর্তে পটচিত্রে চোখ রাখতেই তিনি দেখলেন—তাঁর নিজের চেহারার মতো একটি অবয়ব ধীরে ধীরে আঁকা চরিত্রদের মধ্যে হাঁটছে, যেন তাঁরই ছায়া, অথবা ভবিষ্যৎ। এক অপার্থিব আলো চোখে পড়তেই, তিনি আর বুঝতে পারলেন না কখন চোখ বুঁজে এল।

চোখ খুলতেই তাঁর আশেপাশে ছিল না কোনও ঘর, না ছিল চেনা পৃথিবী। বরং, তিনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন সেই পটচিত্রের অন্দরে, এক ধরনের ক্যানভাস বাস্তবতার মাঝে। গা ছমছমে গ্রাম, মাটির রাস্তা, আঁকা পশুপাখি যেগুলো হঠাৎ হঠাৎ নড়ে উঠছে, আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি—একজন মানুষ, বাস্তব জগতের প্রতিনিধি হয়ে। প্রথমে তাঁর শরীর কেমন কাঠ হয়ে যাচ্ছিল, চলাফেরায় বাধা আসছিল, যেন তিনি নিজেও রঙে মিশে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে। কিন্তু সেই একই সঙ্গে, ভেতরে চলছিল প্রবল প্রশ্ন—তাহলে কি সত্যিই এই পটচিত্র একটা গেটওয়ে? যদি কেউ একবার ঢুকে পড়ে, তবে কি আর ফিরে আসা সম্ভব না? সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করতেই তিনি দেখতে পেলেন একটা পট-গ্রাম, যেখানে সব কিছুই রহস্যময়—মানুষগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ কথা বলছে না, আর আকাশে সূর্য বলে কিছু নেই, আছে শুধু একটা ধূসর আলো। হঠাৎ করে কোথা থেকে একটা কিশোর এসে তার পাশে দাঁড়াল। মুখে যেন অনেক দিনের চেনা বিষাদ—সে বলল, “আমরা কেউই ফিরতে পারিনি, আপনি পারবেন?”

অনির্বাণ হতবাক হয়ে গেলেন। ছেলেটির নাম অরূপ, বছর তেরো হবে। সে বলল, “আমি কয়েক বছর আগে আমার দাদার সঙ্গে এসেছিলাম—একজন গবেষক ছিলেন তিনি। তিনি পটচিত্র সংগ্রহ করতে এসেছিলেন, আর আমিও সঙ্গ দিয়েছিলাম। একটা রাতে তিনিও ঠিক আপনার মতোই এঁকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পটের ভেতর ঢুকে পড়েন, আমিও পেছন পেছন চলে আসি। আর তখন থেকে আমরা এখানে—এই চিত্রপটের এক বন্দি বাস্তবতায়।” অনির্বাণ অনুভব করলেন, চারপাশের রঙ এখন আরও বিবর্ণ, আর নিজেকেও কেমন রঙের মাঝে গুলিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। এই বন্দিত্বের কোনও মুক্তি আছে কি? অরূপ বলল, “কিছুদিন আগে এক বৃদ্ধ এসেছিলেন—উনি বলেছিলেন, পটচিত্রের অন্তিম রেখার বাইরে নাকি একটা গোপন দরজা আছে, যেটি শুধু পূর্ণিমার রাতে খোলে। আজ রাতই সে রাত। কিন্তু এই দরজায় পৌঁছাতে হলে পটচিত্রের ভয়ংকর অংশ, ‘ছায়া পট্ট’-র ভেতর দিয়ে যেতে হবে, যেখানে বাস করে রেখাচিত্রের ভৌতিক প্রহরীরা। যারা একবার চিহ্নিত করে নেয়, তারা আর কাউকে বেরোতে দেয় না।” অনির্বাণ স্নায়ুর প্রতিটি কণায় ভয় অনুভব করলেও জানতেন, আজ না হলে কখনো না। আর ফিরে যেতে না পারলে, তিনিও এই ‘বিবর্ণ পটচিত্র’-র অচল রঙ হয়ে যাবেন—অপ্রকাশ্য, নির্বাক, চিরকালীন।

আট

অন্ধকার রাতের নিস্তব্ধতায় বীরভূমের সেই পুরনো কুঠির যেন আরও বেশি অলৌকিক হয়ে উঠেছিল। কুঠির ভেতরে পটচিত্রটা এবার আর দেওয়ালে স্থির ছিল না—অনির্বাণ দেখল, যেন তার গায়ে আঁকা চিত্রগুলো একে একে জেগে উঠছে। কৃষ্ণের বাঁশি বাজানোর দৃশ্য, কালীমূর্তির রুদ্র রূপ, কিংবা রাধার নৃত্য—সব যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে তার চোখের সামনে। অনির্বাণ পেছনে সরে যেতে গিয়ে হোঁচট খেলেন একখানা পুরনো কলসির সঙ্গে। গলা শুকিয়ে এল, ঠোঁট ফাটতে লাগল ভয়ে, অথচ চক্ষু সরাতে পারলেন না সেই পটচিত্র থেকে। হঠাৎ একটি মেয়েলি কণ্ঠ—নরম, কিন্তু গভীর—জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি দেখতে পাচ্ছো আমাদের?” অনির্বাণ চারপাশে তাকালেন, কেউ নেই, কিন্তু কণ্ঠস্বর আবার এল—“চোখ খুলো, অনির্বাণ, আর কাছে এসো।” ভয়ে তটস্থ হলেও, এক আশ্চর্য টানে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন পটচিত্রটির দিকে। হঠাৎ পটের মধ্যিখান থেকে এক উজ্জ্বল আলো নিঃসৃত হয়ে এল এবং পরমুহূর্তে অনির্বাণ হারিয়ে গেলেন সেই আলোর ভেতরে।

তিনি যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন, নিজেকে আবিষ্কার করলেন এক রঙিন অথচ অবাস্তব জগতে—যেখানে সবকিছু জলরঙে আঁকা দৃশ্যের মতো অস্পষ্ট এবং প্রবাহিত। চারপাশে পটচিত্রের চরিত্ররা ঘুরে বেড়াচ্ছে—তাদের গায়ে রঙের দাগ, রেখার আভাস, এবং চোখে এক নিস্তব্ধ বিষণ্নতা। অনির্বাণ বুঝতে পারলেন, তিনিও এখন সেই পটচিত্রেরই একজন অংশ। তিনি কথা বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু স্বর হল না। এক বৃদ্ধ পটশিল্পী—যার রংমাখা আঙুল আর কুঁজো হয়ে যাওয়া পিঠ দেখে মনে হল শতাব্দীপ্রাচীন—তাঁর সামনে এসে বললেন, “যারা সত্য দেখে, তারা এখানেই আটকে যায়, বাবু। এখন তুমি ফিরে যেতে পারবে না।” অনির্বাণ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। “তাহলে আমি কি এখানেই থাকব চিরকাল?” তিনি ভাবলেন। সেই বৃদ্ধ বললেন, “সব পটের একটা অন্তিম রেখা থাকে—তুমি যদি সেটা খুঁজে পেতে পারো, তবে হয়তো মুক্তি সম্ভব।” এই কথা বলেই তিনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলেন রঙের কুয়াশার মধ্যে।

অনির্বাণ পেছনে তাকালেন, কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে আরও কিছু মুখ—চোখে এক অনুচ্চারিত আতঙ্ক, যেন তারাও কোনো এক সময় বাইরে থেকে এসেছিল এবং আর ফিরে যেতে পারেনি। তাঁদের মধ্যে একজন ছিল সেই দম্পতির স্ত্রী, যার স্বামী মাসখানেক আগে নিখোঁজ হয়েছিল। সে অনির্বাণকে চুপিসারে বলল, “তুমি যদি সেই প্রাচীন রংধনু দাগ খুঁজে পাও, যেখান থেকে আঁকা শুরু হয়েছিল, তাহলে পথ খুলে যাবে।” এরপর অনির্বাণ ছুটতে লাগলেন সেই দাগের খোঁজে, কাঁটা, রঙ, এবং কল্পনার ভেতর দিয়ে—একে একে পেরিয়ে গেলেন কৃষ্ণের বৃন্দাবন, শিবের প্রলয়তাণ্ডব, দুর্গার দশহারা—সব চরিত্র যেন তাঁর মুক্তির পথ রচনা করছে, আবার আটকে দিচ্ছে। অনির্বাণ জানেন না, তিনি ফিরে যেতে পারবেন কি না, কিন্তু এবার তাঁর কাছে এটা শুধু নিজের মুক্তির প্রশ্ন নয়—পটের ভেতরে আটকে থাকা অন্যদেরও মুক্ত করার দায়িত্ব যেন তাঁর ওপরই এসে পড়েছে।

নয়

ভোর হতে তখনও খানিক দেরি। অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে পটচিত্রটি যেন আরও বেশি ছায়াময়, আরও বেশি জীবন্ত। অনির্বাণ চোখ খুলেই বুঝতে পারলেন, তিনি আর নিজের হোমস্টের ঘরে নেই। চারপাশে ছায়া, নরম মাটি, এবং এক অদ্ভুত সোঁদা গন্ধে ভরা বাতাস। চারদিক শুনশান, শুধু দূরে কোথাও কাঁসার ঘন্টার মতো শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনি একা নন—সাথেই ছিল মল্লিকা, যার চোখ বিস্ময়ে উন্মুক্ত, ঠোঁট কাঁপছে। পটচিত্রের ভিতর ঢোকার মুহূর্ত তাদের কেউ মনে করতে পারছে না, কিন্তু তারা বুঝে গেছে—এটাই সেই জগৎ, যা এতদিন ধরে লোকগাথা ও পটচিত্রে বন্দি ছিল। এই জগতের সময় চলাফেরা করে অন্যরকম নিয়মে, এই জগতের মানুষরা কেবল ‘চোখ’ নয়, ‘চেতনা’ দিয়েও সব দেখে।

পটচিত্রের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা পৌঁছল এক নির্জন গ্রামের মতো জায়গায়। এখানে লোকজনের চেহারায় ছিল রহস্যময় শান্তি, তাদের কথা যেন ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে, কিন্তু ঠোঁট নড়ে না। একজন বৃদ্ধা—যাকে মনে হল পটের শিবানী ঠাকুরমা—তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, “তোমরা যারা বাইরে থেকে এসেছ, ফিরে যাও। কারণ একবার যদি তোমার ছায়া এই মাটিতে মিশে যায়, তাহলে তোমার নাম আর কাগজে থাকবে না, শুধু রঙে আর কাহিনিতে থাকবে।” মল্লিকা প্রশ্ন করে বসে, “কিন্তু আপনি যদি ছবি হন, তাহলে বলছেন কীভাবে?” উত্তর আসে, “এই জগতে ভাষা রঙের মতো। চোখে দেখে শোনা যায়, মনের ভিতর বোঝা যায়।” অনির্বাণ এ সব কথা বিশ্বাস না করলেও, এক আশ্চর্য টান অনুভব করছেন। যেন এই ছবি, এই কাহিনি তার নিজের ভেতরেরই এক দীর্ঘ ঘুমন্ত অংশকে জাগিয়ে তুলেছে। সে বুঝতে পারছে—এই পটচিত্র শুধুই অভিশপ্ত নয়, বরং একটি চলমান আত্মজীবনী, যেটি প্রতিনিয়ত নতুন চরিত্র গ্রহণ করে, নতুন গল্প বানায়, এবং পুরনো চরিত্রদের আটকে রাখে।

এমনই এক সন্ধ্যায়, তারা পৌঁছল একটি বিরাট তালগাছের নিচে আঁকা মন্দিরের মতো স্থানে। সেখানে এক অদ্ভুত দরজা ছিল—আঁকা, কিন্তু সেই ছবির ভেতর দিয়ে তাকালে দেখা যায় অন্য এক দৃশ্য। শোনা যায় হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কান্না, দেখা যায় পরিচিত মুখ—যেমন অনির্বাণ দেখল তার প্রয়াত বাবার মুখ, আর মল্লিকা দেখল তার ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া ভাইকে। তাদের মন কেঁপে উঠল। দরজার দুপাশে লেখা ছিল এক পঙ্‌ক্তি: “যারা ফিরে যেতে চাও, তারা ভুলে যাও, কিন্তু যারা জানতে চাও, তাদের থেকে আলো কেড়ে নেওয়া হবে।” সেই মুহূর্তে অনির্বাণ বুঝল, এই জগৎ আসলে মানুষের অজানা আকাঙ্ক্ষার ছবি, এক চিরন্তন রহস্যের ফ্রেম। এই পটচিত্র কোনো অভিশাপ নয়—এ এক পরীক্ষাগার, যেখানে সাহসী মন ও দৃষ্টির জোরে তৈরি হয় গল্প, তৈরি হয় নতুন চিত্র। কিন্তু সব গল্পে ফেরা হয় না, আর সব চরিত্র মুক্তি পায় না।

দশ

অন্ধকারে ঢাকা শালবনের গভীরে একটা মৃদু আলো ঠিকরে পড়ছিল এক গাছের গুঁড়ির পাশে রাখা মাটির প্রদীপ থেকে, যেখানে অনির্বাণ আর রোহিণী পা রেখেছিল সেই “অভিশপ্ত পটচিত্র”-এর উৎসস্থলের শেষ সীমানায়। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু শোনা যাচ্ছিল ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা আওয়াজ আর দূরে কোথাও শিয়ালের হুঁক্কার। রোহিণীর চোখে ভয়, কিন্তু অনির্বাণ ছিল আশ্চর্যরকম শান্ত। তার হাতে ধরা ছিল পটচিত্রটির এক পুরনো ভাঁজ করা খণ্ড, যেটা সে খুলতেই আবার শুরু হয়েছিল সেই রহস্যময় গানের সুর—“পটের রং যেমনি বিবর্ণ, তেমনই করো মন নির্জন…”। কিন্তু এবার শব্দটা যেন কোথাও বাইরের জগৎ থেকে নয়, তাদের মাঝখান থেকেই আসছিল। হঠাৎ করেই গাছের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলো তিনটি মুখ—চোখহীন, পটচিত্রের আঁকা সেই চরিত্রগুলো। তারা যেন ধোঁয়ার মত ফুঁসে উঠে বলল, “চিত্রের সীমা ভেঙেছে, এবার চিত্রই বাস্তব হবে।” সেই মুহূর্তে রোহিণীর শরীর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল এক কুয়াশার রেখা, যা গিয়ে মিশে গেল পটচিত্রের ভাঁজে। অনির্বাণ চিৎকার করতে গেলেও গলার শব্দ গিলে ফেলল এক অদৃশ্য বল।

পরদিন সকালে গ্রামের মানুষজন জঙ্গলের ধারে একটি পুরনো থাম দেখা গেল যেখানে আঁকা ছিল এক পটচিত্র—তাতে ছিল অনির্বাণ আর রোহিণীর মুখ। তারা দু’জনেই হাত ধরাধরি করে পটের ভেতরে হাঁটছে, আর পেছনে তাদের চোখহীন সেই তিন চরিত্র দাঁড়িয়ে। কেউ বলতে পারল না তারা কবে পটচিত্রে ঢুকে গেল, কিংবা আদৌ ঢুকল কিনা। গ্রামবাসীরা ভাবল হয়তো শহরের লোকগুলো আর পথ খুঁজে পায়নি, বনে হারিয়ে গেছে। কিন্তু সন্ধ্যাবেলায়, সেই প্রদীপের জায়গায় আবার জ্বলল আগুন আর শোনা গেল সেই সুর—“পটের রং যেমনি বিবর্ণ…”। লোকজন এখন আর ঐ বনপথ মাড়ায় না, এবং পটচিত্রটি আবার তার পুরনো আসনে ফিরে গিয়েছে, তবে এবার কিছুটা আরও বিবর্ণ, আর সেই নতুন দুই মুখ আঁকা হয়েছে অনেক সূক্ষ্মভাবে। ডঃ অনির্বাণ দত্ত, যিনি একসময় শিল্পের মধ্যে অতিপ্রাকৃত খুঁজতেন, এবার সত্যিই শিল্পের মধ্যে বিলীন হলেন।

গল্পটি এখানেই শেষ নয়। কিছু বছর পরে, এক নতুন শিল্প গবেষক এসে হাজির হন বীরভূমে—ডঃ মায়ূখ সেন। তার হাতে ছিল অনির্বাণের শেষ লেখা একটি নোটবুক, যেখানে উল্লেখ ছিল, “পটচিত্র একটি চলমান দিগন্ত, এর রং বিবর্ণ হলেও তার গভীরতা অসীম।” মায়ূখ ঠিক করল, সে পটচিত্রটির উৎস খুঁজবেই, তার ভেতরে কী আছে জানতেই হবে। প্রথম দিন সন্ধ্যায় সে যখন সেই জঙ্গলপথে প্রবেশ করল, বাতাসে ভেসে এল সেই চিরপরিচিত সুর… এবং এবার আর কেউ ফিরে আসেনি।

সমাপ্ত

1000048984.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *