Bangla - তন্ত্র

তান্ত্রিকের রক্তচক্ষু

Spread the love

তুষার বন্দ্যোপাধ্যায়


ঝাড়গ্রামের একদম প্রান্তে, যেখানে লোকালয়ের আলো শেষ হয়ে গভীর অরণ্যের কালো ছায়া শুরু হয়, সেখানেই ছিল আগ্নিমালীর সাধনাস্থল—এক প্রাচীন পাথরের গুহা। গুহার ভেতরে বাতাস থমকে থাকত, যেন কালও সেখানে থেমে গেছে। অমাবস্যার সেই রাতটিতে আকাশে একটিও তারা ছিল না, মেঘ ঢাকা চাঁদের নিচে আগ্নিমালীর চোখদুটো যেন জ্বলছিল আগুনের মত। তাঁর চারপাশে ছড়ানো ছিটানো কঙ্কাল, পশুর রক্ত, লাল সিঁদুরে ঢাকা মাটির গন্ধে এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি হয়েছিল। আগ্নিমালী তন্ত্রের এমন এক স্তরে পৌঁছেছিলেন যেখানে জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান ক্ষীণ হয়ে যায়। বহু যুগ ধরে তাঁর একটাই লক্ষ্য—একটি এমন বস্তু সৃষ্টি করা যা ভবিষ্যতের মৃত্যু দেখাতে পারে, এমন এক পাথর যা সবার জন্য নয়, কেবলমাত্র তারাই দেখতে পাবে, যাদের তাকানোর সাহস আছে। আজ সেই সাধনার চূড়ান্ত রাত।

তিনি একের পর এক মন্ত্র জপ করছেন, তাঁর কণ্ঠস্বর গম্ভীর থেকে গা-ছমছমে হয়ে উঠছে, গুহার দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে। একটি লালচে পাথর, যা অন্ধকারের মধ্যেও নিজে থেকে আলো ছড়াচ্ছে, তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে এক জটিল মণ্ডল। আগ্নিমালীর রক্ত দিয়ে আঁকা চিহ্নগুলো হঠাৎ করে জ্বলে উঠল, এবং সেই মুহূর্তে যেন পুরো গুহা কেঁপে উঠল এক অদৃশ্য কম্পনে। হাওয়ার তোড় যেন বাইরের অরণ্যকে চিরে ভিতরে প্রবেশ করল, বাতাসের মধ্য দিয়ে ভেসে এল বহু আত্মার বিলাপ। আগ্নিমালীর মুখে তখন এক উন্মাদ হাসি, তাঁর চোখজোড়া লাল হয়ে উঠেছে, শরীর কাঁপছে, কিন্তু থামছেন না তিনি। চূড়ান্ত মুহূর্তে তাঁর কণ্ঠ থেকে বের হলো এক শেষ আর্তনাদ, আর সেই সঙ্গে একটি ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটল মণ্ডলের কেন্দ্রস্থলে—লাল পাথরটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল আগুনের মতো।

সেই রাতে আগ্নিমালী মারা যান, কিন্তু তাঁর দেহ গুহাতেই থেকে যায়, শুষ্ক, কাঠের মতো, পাথরটির পাশে। কেউ তাঁর দেহ স্পর্শ করতে সাহস পায়নি। শোনা যায়, যেই গুহায় ঢুকেছে, সে আর ফিরে আসেনি। স্থানীয় আদিবাসীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বাস করে এসেছে, গুহাটিকে এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ ওটা “অভিশপ্ত শ্মশান”—যেখানে আত্মার শ্বাস পড়ে আর জীবনের আলো নিভে যায়। কালের গর্ভে আগ্নিমালীর কাহিনি ধীরে ধীরে মিশে গেছে লোকগাথায়, তারপর লোকভূলে গেছে। কিন্তু পাথরটি থেকে গেছে, লালচে আভা-সহ, অরণ্যের নীরবতার মাঝে তার নিঃশব্দ হাহাকার পাঠাতে পাঠাতে। গুহার ভিতর তখনো টিকে আছে সেই মণ্ডল, সেই ছাই, সেই কাঁচরক্তের ছোপ এবং—সবচেয়ে ভয়ানক—সেই রক্তচক্ষু।

সময়ের চাকা অনেক এগিয়ে গিয়েছে। আধুনিক যুগে মানুষ যুক্তি আর বিজ্ঞানের নাম করে ভয়কে অস্বীকার করতে শিখেছে। কিন্তু এমন কিছু আছে যা যুক্তির চোখে পড়ে না—যা নাড়িয়ে দেয় মনোজগতের ভিতরের সীমানা। সেই অলীক আর বাস্তবের সীমান্তে দাঁড়িয়ে রক্তচক্ষু অপেক্ষা করছিল নতুন কাউকে, যিনি তাকাবেন তার চোখে, জানবেন নিজের মৃত্যু কেমন, এবং সেই জ্ঞান নিয়ে হঠাৎই পরিবর্তিত হয়ে উঠবেন এমন এক মানুষের, যিনি আর কখনো স্বাভাবিক থাকবেন না। রক্তচক্ষুর জাগরণ এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, আর সেই সময় আসবে খুব শিগগির—যখন ইতিহাস, অভিশাপ ও আধুনিক কৌতূহল এক বিন্দুতে এসে মিশবে। ঐ রাতের মতোই, আবারও অরণ্যে বাতাস কাঁপবে, আত্মা বিলাপ করবে, আর তন্ত্রের নিঃশেষ ধ্বনি ধ্বনিত হবে বাতাসে—আবারও শুরু হবে সেই রক্তের খেলা।

কলকাতার সাউথ সিটি ক্যাম্পাসের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে বসে অভিষেক বসু এক সাদাকালো স্ক্যান করা তাম্রলিপির প্রতিলিপির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। এই লিপিটি তাকে পাঠিয়েছিল তার গবেষণা-সহযোগী দীপঙ্কর, যিনি এই মুহূর্তে ঝাড়গ্রামে লোকগান সংগ্রহ করতে গিয়ে হঠাৎ একটি পুরাতন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষে এই তাম্রলিপি আবিষ্কার করেছিলেন। পাণ্ডুলিপিতে লেখা ভাষা ছিল প্রাচীন, মিশ্রিত পালি ও সংস্কৃতের এক দুর্লভ রূপ, যেটা সাধারণত তান্ত্রিক সাহিত্যে পাওয়া যায়। কিন্তু যা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল অভিষেককে তা হল একটি বারবার ফিরে আসা শব্দ—”রক্তচক্ষু”। চারটি পংক্তির একটিতে লেখা ছিল—”যে দেখিবে চক্ষু লাল, তার ভবিষ্যত অশুভ কাল। মৃত্যুর দিন, ক্ষণ, আর রূপ, জানিয়া সে হইবে অভিশপ্ত কূপ।” এই ধাঁধার মতন বাক্য তাকে রীতিমত শিহরিত করে তোলে।

অভিষেক যুক্তিবাদী, আধুনিক মনস্ক একজন গবেষক—কিন্তু ইতিহাসের অলৌকিক অংশ সবসময়ই তার গভীর আগ্রহের জায়গা। এই লিপিটি পড়ে সে বুঝতে পারে, ঝাড়গ্রামে কিছু একটা আছে, যেটা কেবল কিংবদন্তি নয়—বরং সত্যিকারের প্রাচীন কিছুর অস্তিত্ব বহন করে। কয়েক বছরের আগেই সে একটি সম্পর্ক ভেঙে বেরিয়ে এসেছে, আর সেই সম্পর্কের আরেক প্রান্ত ছিল—নন্দিনী রায়, একজন প্রতিবাদী ইনভেস্টিগেটিভ সাংবাদিক। নন্দিনীও, তার মতোই, বাস্তবের খোঁজে কিংবদন্তির পেছনে ছুটতে ভালোবাসে। হঠাৎ এক দিন অভিষেক জানতে পারে, নন্দিনীও ঝাড়গ্রাম যাচ্ছে—একটি প্রামাণ্যচিত্রের কাজ করতে যেখানে লোকগানে তান্ত্রিক প্রভাবের বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। দুই পুরনো পথ আবারও ক্রমশ কাছাকাছি আসছে, যদিও কেউই তা তখনো টের পায়নি।

ঝাড়গ্রামে পৌঁছে অভিষেক প্রথমে দীপঙ্করের সঙ্গে দেখা করে। দীপু তাকে সেই পরিত্যক্ত শ্মশানের কথা বলে যেখানে সে লিপিটি খুঁজে পেয়েছিল। সেখানেই ছিল কিছু অদ্ভুত প্রতীক, কিছু প্রাচীন চিহ্ন যা স্পষ্টভাবে কোনো তান্ত্রিক সাধনার সাক্ষ্য দেয়। অভিষেক স্থির করে, সে রাতেই সে সেখানে যাবে, নিজের চোখে সবকিছু দেখবে। ওই রাতেই কাকতালীয় ভাবে সেখানে পৌঁছায় নন্দিনী, তার ক্যামেরাম্যান সহ। শ্মশান ঘেরা অরণ্যে ঝিঝি পোকার আওয়াজের মধ্যে, তারা আচমকা মুখোমুখি হয়—দুজনেই অবাক, দুজনেই কিছুটা অস্বস্তিতে। কিন্তু অস্বস্তিকে পাশ কাটিয়ে, তারা দ্রুত বুঝে নেয় যে তারা একই রহস্যের অনুসন্ধানে এসেছে, এবং একে অপরের সাহায্য ছাড়া এগোনো সম্ভব নয়।

সেই রাতে তারা একসঙ্গে প্রবেশ করে সেই গুহার ভিতর, যেখানে শতাব্দীপ্রাচীন ছাই, কঙ্কাল, ছেঁড়া মণ্ডলের চিহ্ন আজও রয়েছে। বাতাস ভারী, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাদের চেপে ধরছে। মাটির একপাশে তখনো অর্ধেক ঢাকা এক পাথর—লালচে, ভেতর থেকে অদ্ভুত আলো ছড়াচ্ছে। পাথরটির দিকে তাকানোর মুহূর্তে অভিষেকের হৃদস্পন্দন থেমে যায়। তার মাথার ভিতর ভেসে ওঠে একটি দৃশ্য—তার নিজের মৃত্যু, ছিন্নভিন্ন দেহ, আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া। ঘামতে ঘামতে সে পিছিয়ে আসে, অথচ মুখে কিছু বলে না। নন্দিনী তখনো সেই পাথরের দিকে তাকিয়ে—কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। রাত আরও ঘনিয়ে আসে, অরণ্যের পাতা আর হাওয়ার মধ্যে ভেসে ওঠে এক বধির কান্না, আর তারা বুঝতে পারে—এই অনুসন্ধান শুধুই ইতিহাসের নয়, বরং মৃত্যুর ছায়ার সঙ্গেও এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছে তারা।

পরদিন ভোরবেলা অভিষেক এক অজানা আতঙ্ক নিয়ে জেগে ওঠে। রাতে যেটা দুঃস্বপ্ন ভেবেছিল, তা আসলে বাস্তব মনে হয়। পাথরের দিকে তাকিয়ে যা সে দেখেছিল—নিজের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে আগুনে ভস্ম হয়ে যাচ্ছে—সেই দৃশ্য তার চোখের পেছনে স্থায়ী হয়ে গেছে। সে কিছুতেই নিজের ভিতরের ভয়কে উপেক্ষা করতে পারছিল না, যদিও মুখে স্বীকার করছিল না। নন্দিনী তাকে বারবার জিজ্ঞেস করে, গুহার ভিতর সে কী দেখেছে, কিন্তু অভিষেক কেবল বলে, “হ্যালুসিনেশন… হয়তো বাতাসে কোনও বিষাক্ত উপাদান ছিল।” অথচ দীপু জানে, অভিষেক এমন কেউ নয় যে অলীক ভয় দেখে চুপ করে যায়। সে একরকম নিশ্চিত—কিছু একটা ঘটেছে, এবং সেটা অতি সাধারণ কিছু নয়। অভিষেক আর নন্দিনী ঠিক করে, আরও কিছু তথ্য জোগাড় করতে হবে—গাঁওবুড়ো, পুরনো লোকগান, শ্মশানের ইতিহাস—সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে হবে।

ঝাড়গ্রামের এক বৃদ্ধ লোকসঙ্গীত শিল্পী, যার নাম বারুন পাল, তার কাছে পাওয়া যায় কিছু আশ্চর্যজনক তথ্য। সে বলে, “এই পাথর নতুন নয়, বাবা। আমাদের ঠাকুর্দারও ঠাকুর্দা এই কাহিনি শুনেছে—এক তান্ত্রিক ছিল, আগ্নিমালী, সে মৃত্যুর ঠিক আগে রক্ত দিয়ে এক পাথর বানিয়েছিল, যেটা চোখে রাখলে দেখা যায় নিজের মৃত্যুর রূপ। কেউ যদি পাথরের দিকে তাকায়, তার ভাগ্য তখনই নির্ধারিত হয়ে যায়। তখন সে আর পালাতে পারে না।” বারুন বাবার কণ্ঠে ভয়, কাঁপুনি, আর সম্মান মিশে ছিল। সে আরও জানায়, অনেক বছর আগে গ্রামের তিনজন যুবক ওই গুহায় ঢুকেছিল, এবং পরের সপ্তাহেই তারা তিনজন তিনভাবে মারা যায়—একজন পুড়ে, একজন গলা কেটে, আরেকজন অজানা রোগে। কথাগুলো শোনার পর অভিষেকের মুখের রঙ পরিবর্তন হয়, তার মনে পড়ে যায় সেই আগুনের দৃশ্য, যেখানে সে নিজেকে পুড়ে যেতে দেখেছিল।

সন্ধের দিকে অভিষেক একা গিয়ে দাঁড়ায় সেই গুহার সামনে। নন্দিনী আর দীপু তাকে অনুসরণ করে না, কিন্তু দূর থেকে নজর রাখে। গুহার ভিতর হঠাৎ আবার সেই আলো—পাথর যেন আরও বেশি তেজময় হয়েছে, তার রঙ আরও গাঢ় লাল, যেন রক্তের চেয়েও গাঢ়। পাথরের উপর এক দমকা বাতাস এসে পড়ে, আর সেই সঙ্গে অভিষেকের চোখে আবার ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য—এইবার আগুনে ঘেরা শ্মশানে সে পাথরটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার চারপাশে দগ্ধ মানুষের ছায়া ঘুরছে। আচমকা তার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে, পাথরের আলো যেন সরাসরি তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। পাথর জেগে উঠেছে, এটা সে নিশ্চিত বুঝতে পারে। অভিষেক ছুটে বেরিয়ে আসে, আর ঠিক সেই সময় এক ছায়ামূর্তি দেখা যায় গুহার প্রবেশপথে—নারী অবয়ব, লম্বা চুল, দৃষ্টি ঘোলা, যেন সে রক্তচক্ষুর প্রহরী।

অভিষেক কাউকে কিছু বলে না, কিন্তু নন্দিনী আর দীপু তার মুখ দেখে সব বুঝে যায়। তারা ঠিক করে, শহরে ফিরে যাওয়া হবে না—এই পাথর, এই গুহা, এই ইতিহাসকে না জানলে তারা নিজেদের শান্ত করতে পারবে না। পরদিন সকালে যখন তারা আবার গুহার দিকে যায়, তখন সেখানে সেই ছায়ামূর্তির কোনও চিহ্ন নেই, কিন্তু পাথরটি আবার নিঃশব্দে জ্বলছে। দীপু বললো, “আমার মনে হচ্ছে কেউ আছে, কেউ পাহারা দিচ্ছে এই পাথরকে।” ঠিক সেই সময় দূরে একটা শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে আসে—“তোমরা ওর চোখে তাকিয়েছো, এখন আর ফিরে যাওয়া নেই।” গাঢ় ছায়ার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে সেই মেয়েটি—মাধবী। তার চোখে অভিশাপের গভীরতা, কণ্ঠে অনন্ত ক্লান্তি। সে জানায়, এই পাথরের শক্তি এখন জেগে উঠেছে, এবং যেই প্রথম তাকিয়েছে—তারই শেষ সময় শুরু হয়েছে। অভিষেক বোঝে, সে একটি সীমা পার করে এসেছে, যেখান থেকে আর ফিরে যাওয়া যায় না। রক্তচক্ষুর জাগরণ তার জীবনকে বদলে দেবে—চিরতরে।

ঝাড়গ্রামের সূর্য যেন সেই দিন অদ্ভুতভাবে লাল হয়ে উঠেছিল। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে ছিল কুয়াশার মতো হালকা ধোঁয়া, আর গাছের পাতায় পাতায় ছায়া যেন কিছু চেপে রাখতে চাইছিল। অভিষেক, নন্দিনী ও দীপু মাধবীর উপস্থিতি নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু তার চোখে অদ্ভুত এক নির্লিপ্তি আর জড়তা আছে—যেন সে বহুকাল ধরে অপেক্ষা করছিল এই তিনজন আগন্তুকের জন্য। সে গম্ভীর স্বরে বলে, “তোমরা যা দেখেছো, তা একমাত্র শুরু। রক্তচক্ষু এখন তার আসল শক্তির দিকে এগোচ্ছে। যত বেশি মানুষ তার দিকে তাকাবে, তত বেশি সে খেতে চাইবে—ভয়, মৃত্যু, রক্ত।” নন্দিনী প্রশ্ন তোলে, “তুমি কে? তুমি কীভাবে জানো এত কিছু?” তখনই মাধবী স্বীকার করে—সে আগ্নিমালীর একমাত্র জীবিত শিষ্যা ছিল। শতাব্দী আগে তন্ত্রসাধনায় আত্মনিয়োগ করার পর সে আর সাধারণ মানুষের মত রইল না। সে বেঁচে আছে, কিন্তু সময়ের বাইরে। তার একমাত্র কাজ, রক্তচক্ষুকে রক্ষা করা এবং অভিশপ্ত শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।

এইদিকে অন্য এক স্থানে, আরেকটি ভয়ংকর চরিত্র সেই পাথরের গন্ধ পেয়ে ওঠে। বাবা রুদ্রনাথ—আধুনিক কালের এক তথাকথিত তান্ত্রিক—যিনি কলকাতার শহরতলীতে তাঁর নাম, যশ ও ভক্ত তৈরি করেছেন চাতুর্য ও ভয় দিয়ে। তিনি বহুদিন ধরেই “মৃত্যুর চোখ”-এর খোঁজে ছিলেন। সে বিশ্বাস করে, এই পাথরের মাধ্যমে সে অমরত্ব পেতে পারে, কারণ মৃত্যুর পূর্বানুমান মানেই মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ। তার এক গুপ্তচর তাকে খবর দেয়, ঝাড়গ্রামের পরিত্যক্ত শ্মশানে পাথরটি জেগে উঠেছে, এবং কিছু শহুরে যুবক তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। রুদ্রনাথ রাগে উন্মত্ত হয়ে ওঠে—সে চায়, পাথর তার হাতে আসুক, যেকোনও মূল্যে। সে কলকাতা থেকে তার দুই ভয়ানক অনুচর পাঠায়—ভোলানাথ ও শম্ভু, যাদের দায়িত্ব শুধু একটাই—পাথর খুঁজে এনে দেওয়া, প্রয়োজনে কাউকে খুন করে হলেও।

সন্ধ্যেবেলা অভিষেক ও দীপু ফিরে আসে গেস্টহাউসে, যেখানে হঠাৎই বিদ্যুৎ চলে যায়। চারদিকে ঘন অন্ধকার, হাওয়ার গতি বাড়তে থাকে, আর পেছনে পেছনে ছায়া নড়তে দেখা যায়। ঠিক সেই সময় দীপু বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল খাবার আনতে, আর সেখানে তার উপর হামলা হয়। দুটি মুখ ঢাকা লোক—শম্ভু ও ভোলানাথ—তাকে মারধোর করে, পাথরের কথা জানতে চায়। দীপু কিছুতেই স্বীকার করে না, আর একসময় তারা তাকে অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়। অভিষেক ও নন্দিনী যখন খোঁজ করে তাকে গেস্টহাউসের পাশে খুঁজে পায়, তখন সে রক্তাক্ত, অজ্ঞান, আর তার শরীরে আঁচড়ের দাগ। এ ঘটনার পর অভিষেক বুঝে যায়—এটা শুধুই অতিপ্রাকৃতের খেলা নয়, কেউ এই শক্তিকে দখল করতে চাইছে, এবং তারা যেকোনও সীমা পার করতে পারে।

পরদিন সকালে মাধবী আবার তাদের সঙ্গে দেখা করে। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু সে এবার স্পষ্ট জানায়—”রুদ্রনাথ এই পাথরের পেছনে লেগেছে। সে শুধু অভিশপ্ত নয়, সে নিজেই আগ্নিমালীর মত হতে চায়। যদি সে পাথর পায়, তাহলে সে তার শরীরে আগ্নিমালীর আত্মাকে আহ্বান করবে। তখন কেউই আর বাঁচবে না।” নন্দিনী প্রশ্ন করে, “তুমি চাও না আমরা পাথরটা ধ্বংস করি?” মাধবী উত্তর দেয়—“পাথর ধ্বংসের পথ আছে, কিন্তু সেটি সহজ নয়। তা করতে হলে যজ্ঞ করতে হবে যেখানে রক্তচক্ষুর সৃষ্টির উল্টো প্রক্রিয়া চালু করা হবে।” অভিষেক তখন ভাবে—যদি সে নিজের মৃত্যু দেখে ফেলেই ফেলেছে, তবে হয়তো সেটাকেই নিয়তি মেনে শেষ লড়াইটা লড়াই। অন্ধকার, রক্ত ও প্রতিশোধের এই কাহিনিতে তারা যেন আর কেবল অনুসন্ধানকারী নয়, বরং এক অলঙ্ঘনীয় যজ্ঞের অংশ হয়ে উঠছে, যেখানে প্রত্যেকেই হয় বলি হবে, নয়তো রক্ষা করবে—ভবিষ্যৎকে।

অন্ধকারে ডুবে থাকা রাতটা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠছিল। নীলমণি পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট পাথুরে পথ ধরে এগোচ্ছিল রুদ্র আর মীনাক্ষী। চারপাশের নিরবতা মাঝে মাঝে ভাঙছিল পাখিদের ডাক আর ঝিঁঝিঁ পোকার কর্কশ সুরে। মীনাক্ষীর চোখে একটা অজানা ভয়, আর রুদ্রর চোখে এক অদ্ভুত ধরণের দৃঢ়তা। তারা যাচ্ছিল সেই পুরনো মন্দিরের দিকে, যেখানে বলা হয় তান্ত্রিক বীরেশ্বরের আত্মা এখনও ঘোরাফেরা করে। লোককথা অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে তান্ত্রিক তার সমস্ত শক্তি এক লাল পাথরের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করে যায়, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ দেখার এক অলৌকিক শক্তি। কিন্তু যেই সেই পাথরের দিকে তাকিয়েছে, সে নাকি নিজের মৃত্যুর দৃশ্য দেখতে পেয়েছে এবং কিছু দিনের মধ্যেই মারা গেছে—এই কথাটাই এখন রুদ্রর চরম কৌতূহলের কারণ।

তারা যখন পুরনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষে পৌঁছাল, তখন রাত প্রায় দ্বিপ্রহর ছুঁইছুঁই। ঘন কুয়াশার মধ্যে মন্দিরের ছায়া যেন ধীরে ধীরে কাঁপছিল, আর তার বুক ফেটে বেরোচ্ছিল কেমন একটা ঠান্ডা, চাপা শ্বাসের মতো আওয়াজ। মীনাক্ষীর শরীর কেঁপে উঠল—“রুদ্র, আমি ভয় পাচ্ছি।” রুদ্র তার হাত চেপে ধরে বলল, “ভয় পেও না, আমরা একসাথে আছি। এই পাথরটার রহস্য জানতে হলে আমাদের ভেতরে যেতেই হবে।” মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতেই তারা দেখতে পেল কেন্দ্রে রাখা আছে সেই লাল পাথর, যার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরনো রক্তের দাগ, পোড়া কাপড়, আর কাঠকয়লার ছাই। পাথরের গা থেকে লালচে আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল, যেন সেটা নিঃশব্দে ডেকে চলেছে কারও অজান্তে।

রুদ্র পাথরের দিকে এগিয়ে গেল। তার মস্তিষ্কে তখন ভেসে উঠছে নানা চিন্তা—এই পাথর কি সত্যিই ভবিষ্যৎ দেখাতে পারে? যদি পারে, তবে কেন সেটা সবার জন্য নয়? হঠাৎ করে সে অনুভব করল একটা অদ্ভুত শীতলতা, যেন কেউ বা কিছু তার ঘাড় বরাবর নিঃশ্বাস ফেলছে। পেছনে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেল না। মীনাক্ষী তখন পাথর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছিল না। তার চোখে তখন ছায়াপাত ঘটছে—একটা হাড়সাদা মূর্তি এগিয়ে আসছে তার দিকে, রক্তে ভেজা চোখ আর খোলা পেটের মধ্যে জ্বলছে আগুন। সেই দৃশ্য দেখে মীনাক্ষী চিৎকার করে উঠল, আর রুদ্র তার দিকে ছুটে গেল। কিন্তু তখনই, অদ্ভুতভাবে, মন্দিরের মেঝেতে একটা দাগ তৈরি হলো, যেন কেউ বা কিছু নিচ থেকে উঠে আসছে।

হঠাৎই চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল, যেন শতবর্ষের চাপা অভিশাপ আবার নতুন করে জেগে উঠছে। মন্দিরের ছাদ কেঁপে উঠল, আর সেই পাথরের ওপর উঁকি দিয়ে উঠল একটা ছায়ামূর্তি—চোখে লাল আগুনের শিখা, মাথায় চুলের জট, আর হাতে একটা করোটিমালা। সে সরাসরি তাকাল রুদ্র আর মীনাক্ষীর দিকে, আর তার গলা থেকে বেরোল কাঁপানো স্বর—“কারা আমার পাথরে চোখ রাখলে?” রুদ্র পেছনে মীনাক্ষীর হাত ধরে দৌড় দিল, কিন্তু তার পা পিছলে পড়ল মাটির রক্তাক্ত কাদায়। মীনাক্ষী তাকে তুলে ধরার আগেই সেই ছায়ামূর্তি চিৎকার করে উঠল—“যার চোখে পড়ে এই পাথরের শিখা, তার রক্ত দিয়েই হবে আমার পুনর্জন্ম!” আর সেই মুহূর্তে মন্দিরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্কের এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণ, যেন পৃথিবীর গভীর কোনো যন্ত্রণা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।

অরণ্যের নিঃসীম নিস্তব্ধতায় যেন আজ কোনও গূঢ় দংশন লুকিয়ে আছে। দূরের শাল গাছের ছায়া নেমে এসেছে রক্তাক্ত হয়ে—এক অচেনা ভয় ছড়িয়ে। চণ্ডীপাঠের কণ্ঠস্বর এখন শুধু রেকর্ডিংয়ে বন্দি; বাস্তবে নয়। সিদ্ধেশ্বর মঠের দিক থেকে হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে এলো তীব্র ধূপের গন্ধ, তার সঙ্গে মিলেমিশে এক পুরনো পচা কাঠের ঘ্রাণ। সৌম্য আর ইলা, যারা এতদিন ধরে অভিশপ্ত লালপাথরের রহস্য উদঘাটনে নেমেছিল, এবার ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল—এই পাথর শুধু একটি বস্তু নয়, বরং এক সত্তা, যেটি তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, ভাবছে, নিরীক্ষণ করছে। হঠাৎই মঠের মধ্য থেকে প্রচণ্ড শব্দে দরজা বন্ধ হয়ে যায়, যেন কোনও দৈত্যের গর্জন। আর সেই মুহূর্তে সৌম্যর চোখে এক মুহূর্তের জন্য ভেসে ওঠে তার নিজের মৃতদেহ—এক ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা।

সন্ধ্যে নামতেই আশেপাশের গ্রামগুলো অন্ধকারে ডুবে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় চারদিকটা যেন এক বিশাল ভূতের গ্রামে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের মুখে শোনা যায় এক ভীতিকর কিংবদন্তি—তান্ত্রিক রক্তনাথ, যিনি মৃত্যুর আগে শেষ পঞ্চতপা সাধনায় প্রবেশ করেছিলেন সেই মঠেই। তার ইচ্ছাশক্তিতে তৈরি হয়েছিল লালপাথর—যা নাকি মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করে। অথচ কেউ জানে না যে সেই ভবিষ্যদ্বাণী একদিকে যেমন সতর্কবার্তা, তেমনই অন্যদিকে এক প্ররোচনা। ইলার মনের মধ্যে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে রক্তনাথের নাম। সে জানে, এই অভিশপ্ত শক্তির পেছনে একটা পুরনো শোধ, একটি অসমাপ্ত ক্রোধ রয়ে গেছে। সেই রাগ, সেই প্রতিশোধ তাকে এখনো বেঁচে রেখেছে।

রাত্রি গভীর হতেই, সৌম্য মঠের ভেতরে আর একবার ঢোকার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে সে প্রবেশ করে সেই প্রাচীন উপাসনালয়ে। হঠাৎই তার শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে—পিছনে কারো নিঃশ্বাসের শব্দ। ফিরে তাকাতেই দেখা যায়, এক ভয়ানক আকৃতি—লাল কাপড়ে মোড়া, কপালে চন্দনের রেখা, চোখ জ্বলজ্বল করছে রক্তের মত। সে রক্তনাথ নয়, বরং তার অনুসারী—এক আধা-পাগল ব্রহ্মচারী, যার কাজ এই পাথরের শক্তি রক্ষা করা। সে বলে, “পাথরে তাকালে শুধু মৃত্যু দেখা যায় না, আত্মার ইতিহাসও জানা যায়।” সৌম্য বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে শোনে, এবং ব্রহ্মচারী তাকে নিয়ে যায় গোপন কুঠুরিতে, যেখানে রাখা আছে একটি পুরনো তালপট্টি—যাতে লেখা, লালপাথরের উৎপত্তি এবং তার ধ্বংসের উপায়।

ইলা তখন বাইরের জগতে দৌড়ে বেড়াচ্ছে সৌম্যকে খুঁজে। কিন্তু এই গভীর রাতে, মঠের চারপাশের বনের গাছ যেন তাদের পথ আটকে দিচ্ছে। হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়ায় এক বৃদ্ধা—চোখ অন্ধ, কিন্তু চেহারায় অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস। সে বলে, “যদি তোর সত্য জানতে হয়, তবে তোর ভিতরেও তাকাতে হবে।” ইলার মন যেন বিভ্রান্ত। বৃদ্ধা একটি নীল কপালচিহ্ন আঁকিয়ে দেয় ইলার কপালে, এবং বলে, “এই চিহ্নই তোকে রক্ষা করবে সেই যন্ত্রণাদায়ক দৃষ্টির কবল থেকে।” ইলা জানে না কী হচ্ছে, কেবল অনুভব করে—সে এক অদ্ভুত যাত্রার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আর এই যাত্রার শেষ কোথায়, সেটা ঠিক করে দিচ্ছে সেই অভিশপ্ত লালপাথর—যার চাহনির সামনে সময় থমকে দাঁড়ায়।

ঝড়ের পরের দিনটিতে গোটা গ্রাম যেন এক গভীর আতঙ্কে চুপসে গিয়েছিল। মাটির রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শুকনো পাতা আর ভেঙে পড়া ডালগুলোর মাঝে হাঁটছিল ঋষি, তার মনে চলছিল এক অদ্ভুত যুদ্ধ। বিগত রাতে কালীমন্দিরের গর্ভগৃহে সে যা দেখেছে, তা কোনও যুক্তিতে বাঁধা পড়ে না—না বৈজ্ঞানিক, না ধর্মীয়। লালপাথরটি কেবল একটি অভিশপ্ত বস্তু নয়, বরং এক প্রাচীন চেতনার বাহক। ঋষির মনে পড়ছিল পাথরের দিকে তাকানো মাত্র তার চোখের সামনে ভেসে ওঠা সেই নারকীয় দৃশ্যগুলো—মায়ের মৃত্যু, নিজের অচল শরীর, আর অন্ধকারে ডুবে থাকা এক ভবিষ্যৎ। সে বুঝতে পারছিল, পাথরটি যেন প্রতিটি মানুষকে তাদের সর্বনাশের ছবি দেখিয়ে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সুতপা এখনও সম্পূর্ণ ঠিকঠাক আছে, যেন তার ওপর পাথরের কোনও প্রভাবই নেই। তবে তা কি সত্যিই? না কি সে নিজেও ধীরে ধীরে গ্রাসিত হচ্ছে সেই অদৃশ্য কুয়াশার দ্বারা?

সন্ধেবেলা, সুতপা আবার গেল মন্দিরে, একা। গ্রামের কেউ তাকে আটকায়নি, কারণ তারা জানে, এই মেয়েটি এখন তান্ত্রিক মাধব ঠাকুরের ছায়াতেই রয়েছে। গর্ভগৃহের মেঝেতে বসে সুতপা চোখ বন্ধ করল, এবং তার চারপাশে শুরু হল কালীজপের ধ্বনি। অথচ কারও মুখ নড়ছিল না, জপের শব্দ যেন বাতাস থেকেই ভেসে আসছিল। হঠাৎ পাথরের লাল চোখ দুটি জ্বলে উঠল, সুতপার দেহের প্রতিটি অঙ্গ যেন অদ্ভুত এক কম্পনে কেঁপে উঠল। তার শিরা-উপশিরাগুলি যেন জ্বলন্ত হয়ে উঠেছিল, তার চেতনা ডুবে যাচ্ছিল এক গভীর শূন্যতায়। সে দেখতে পেল একটি বিশাল যুদ্ধক্ষেত্র—তান্ত্রিকদের দলে ভাগ হয়ে যাওয়া দুই প্রবাহ, যারা একে অপরকে ধ্বংস করতে চায়, আর মাঝখানে সেই পাথর, যা কিনা একমাত্র বেঁচে থাকার পথ। আর ঠিক তখনই সে দেখল এক ছায়ামূর্তি—চন্দন। মৃত? না, জীবিত, কিন্তু বন্দি। কোথায়? কে জানে, হয়তো ওই পাথরের মধ্যেই।

ঋষি তখন ছুটে গিয়েছিল গোবিন্দপুরের প্রাচীন পুঁথির পণ্ডিত রঘুনাথ ঘোষালের কাছে। বৃদ্ধ, এক চোখ অন্ধ, কিন্তু মস্তিষ্কে অদ্ভুত পাণ্ডিত্য। ঋষি তাকে বলল লালপাথরের কথা, অভিশাপের কথা, চন্দনের কথা। রঘুনাথ চুপচাপ শুনে বলল, “এই পাথর আসলে এক পুরাকথিত ‘ত্রিনেত্র মণি’। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের মিলিত শক্তি এক তান্ত্রিক ব্যবহার করেছিল অনন্তকাল আগে, কিন্তু তার অহংকারে দেবতারা সেই পাথরকে অভিশাপ দিয়ে নিক্ষেপ করেন মৃতলোকের মাঝখানে। তারপর যুগে যুগে কিছু মানুষ সেই পাথরকে আবার তুলে আনে—কখনও রাজা, কখনও সাধু, কখনও খুনি। শেষবার এই পাথর এসেছিল ১৮৭২ সালে, রক্তে ভেসে গিয়েছিল উত্তরবঙ্গের তিনটি গ্রাম।” ঋষির গায়ে কাঁটা দিল। সে বুঝতে পারল, এবারও ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে, আর চাবিকাঠি হাতে রয়েছে এক মেয়ের—সুতপার।

রাত্রি নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল গ্রামের গোপন এক ডাকে সাড়া দেওয়া। গ্রামের শাসকগোষ্ঠীর চারজন প্রবীণ—বৃদ্ধ প্রধান সুরেশ পাল, ওঝা গণেশ দত্ত, স্কুলশিক্ষক রতন বাবু আর হরিশংকর সেন—একত্র হলেন মন্দিরের পাশের শ্মশানে। তারা জানে, আজ রাতেই কেউ না কেউ আত্মবলি দিতে চলেছে। আর যদি তারা কিছু না করে, তবে পরের জন হবে তারা নিজেরা। আলো-আঁধারিতে সুতপা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল, তার পেছনে ছায়ার মতো এক বিশালাকৃতি মূর্তি—মাধব ঠাকুর? নাকি সেই তন্ত্রচেতনার রূপ? কেউ নিশ্চিত নয়। তারা শুধু দেখল, সুতপা তার কপালে আঁকল একটি রক্তবিন্দু, আর বলল, “আমি দেখেছি শেষটা। কিন্তু আমিই ঠিক করব, কে শেষ হবে।” তখনই বাতাসে ভেসে উঠল অসংখ্য মৃত মানুষের কান্নার ধ্বনি। শ্মশান কেঁপে উঠল। রাত তখন নিজের শরীরকে বিসর্জন দিচ্ছে, পাথর নিজের রক্ত আহ্বান করছে।

ভোরের প্রথম আলো যখন রুদ্রপুরের নীলবন ছুঁয়ে আসছিল, তখন কপিলেশ্বরী মন্দিরের ধ্বংসাবশেষে শুরু হয়েছিল চূড়ান্ত সংঘর্ষ। মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে তখন দাঁড়িয়ে ছিল সেই অভিশপ্ত লালপাথর, চারপাশে জড়ো হয়েছে কৃপা, অরিন্দম, পুরাতত্ত্ববিদ দীপঙ্কর সেন এবং রাজকুমার সিংয়ের লোকজন। অন্ধকারে মোড়া মন্দির হঠাৎ করে কেঁপে উঠল, আর সেই সাথে পাথরটিও যেন জীবন্ত হয়ে উঠল—তার লাল আভা ক্রমশ ঘন হয়ে উঠতে লাগল, যেন রক্তমাখা অগ্নিশিখা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। রাজকুমার সিং, যে পাথরটিকে হাতিয়ে নিয়ে ভবিষ্যৎ জানার শক্তিকে দখলে আনতে চেয়েছিল, হঠাৎই পাথরের দিকে এগিয়ে গেল অস্ত্র হাতে। কিন্তু কৃপা চিৎকার করে থামাতে চাইল, “যেও না! ওটা চোখ দিয়ে নয়, আত্মা দিয়ে খায়!” রাজকুমার হেসে বলল, “ভবিষ্যৎ জানার জন্য প্রাণ দিতে রাজি আমি।”

হঠাৎ এক ভয়ানক গর্জন শোনা গেল—মন্দিরের ছায়ার ভেতর থেকে উঠে এল তান্ত্রিক রত্নকেশর আত্মা, যার শরীর এখন শুধুই এক অন্ধকার ধোঁয়ার তৈরি, কিন্তু চোখ দুটি যেন আগুনে জ্বলছে। “পাথরের চোখে যারা তাকাবে, তাদের চোখে আমি হবো রক্ত!” — চিৎকার করে উঠল সে। দীপঙ্কর সেন তাঁর আত্মরক্ষার জন্য প্রাচীন মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করলেন, আর অরিন্দম এক হাতে তুলে নিল একটি প্রাচীন রুপোর ত্রিশূল, যা তিনি আগেই আবিষ্কার করেছিলেন মন্দিরের গর্ভগৃহে। সেই অস্ত্র নাকি তৈরি হয়েছিল রত্নকেশরকে শায়িত রাখার জন্যই। লড়াই শুরু হল—পাথরের লাল আলো এখন নীল হয়ে উঠেছে, আর সেই নীল আলোয় চারপাশের বাতাস এতটাই গরম হয়ে উঠল যে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। রাজকুমার তার বন্দুক তুলে গুলি চালাল রত্নকেশরকে, কিন্তু গুলি শুধুই ধোঁয়া ভেদ করে চলে গেল। রত্নকেশর হেসে উঠল, “মানুষের অস্ত্র কি আত্মাকে মারে?”

ঠিক সেই মুহূর্তে অরিন্দম ত্রিশূল ছুঁড়ে দিল রত্নকেশরের বুক লক্ষ্য করে। নীল আলোতে সেটা যেন বজ্র হয়ে ছুটে গেল, আর রত্নকেশরের শরীরটা ফেটে গেল মধ্য দিয়ে, ধোঁয়াটা চিৎকার করে আকাশে মিলিয়ে গেল। কিন্তু তার আগেই রত্নকেশর বলে গেল, “আমার চোখ আবার ফিরে আসবে… আর যেদিন ফিরে আসবে, এই দেশ অন্ধকারে ডুবে যাবে।” পাথরটি হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল, আর এক মুহূর্তে আগুনে ফেটে গেল, ছড়িয়ে পড়ল শত শত ছোট ছোট লাল পাথরের টুকরো চারপাশে। চারজনই ছিটকে পড়ল মাটিতে। চোখ খোলার পর দেখলেন, মন্দিরের একাংশ পুরোপুরি ধসে পড়েছে, কিন্তু পাথর আর নেই—টুকরোগুলো যেন গলে মাটিতে মিশে গেছে।

দিনটা কেটে গেল উদ্ধার কাজে, পুলিশ, সাংবাদিক, স্থানীয় মানুষ সবাই জড়ো হয়ে গিয়েছিল। কৃপা নিজের ডায়েরিতে লিখে রাখলেন, “আমরা রক্ষা পেলাম, কিন্তু কতদিনের জন্য? রত্নকেশর গেছে, কিন্তু তার ‘রক্তচক্ষু’ তো এখন শত টুকরোয় ছড়িয়ে গেছে। হয়তো কেউ আবার একত্র করতে চাইবে। হয়তো একদিন সেই পাথরের চোখে আবার কেউ ভবিষ্যৎ দেখতে চাইবে।” দীপঙ্কর সেন পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করছেন, যাতে ভবিষ্যৎ গবেষকেরা জানে এই ঘটনার পেছনের রহস্য। অরিন্দম একটি অনাথ আশ্রমে ফিরে গিয়ে বাচ্চাদের গল্প বলতে শুরু করল এক তান্ত্রিকের, যে নিজের চোখ দিয়ে মৃত্যুকে দেখতে পারত। আর কৃপা—সে আবার পাহাড়ে ফিরে গেল, একটা চুপচাপ জীবন বেছে নিল, কিন্তু মাঝরাতে মাঝে মাঝে সে ঘুম ভেঙে ওঠে—তখন বাতাসে ভেসে আসে একটা গলা, “তুমি তো আমার চোখে তাকিয়েছিলে… তোমার সময় আমি দেখেছি।”

এইভাবেই শেষ হল ‘তান্ত্রিকের রক্তচক্ষু’র যাত্রা, কিন্তু সেই অভিশপ্ত পাথরের ছায়া যেন এখনো গাঢ় হয়ে আছে এই সমাজেরই কোনো অন্ধকার কোণায়। হয়তো একদিন সেই টুকরোগুলো আবার জোড়া লাগবে, আবার কোনো এক তান্ত্রিক তার চোখ দিয়ে মানুষের ভবিষ্যৎ দেখতে চাইবে। আর তখন আবার শুরু হবে রক্তের খেলা, চোখের ভেতরে মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি। যতদিন মানুষ অন্ধকারের প্রতি আকর্ষিত হবে, ততদিন রত্নকেশরের অভিশাপও রয়ে যাবে জীবন্ত। শেষ নয়—এ শুধুই এক নতুন শুরু।

***

1000045336.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *