রাহুল দেব
কলকাতার এক অফিসে প্রতিদিন আটটা থেকে আটটা কাজ করার রুটিনে বন্দি হয়ে গেছিলাম আমি—ঋষি সেন, বয়স তেইশ, সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি। শহরের কোলাহল, ঘাম, ধুলো আর একঘেয়েমির মধ্যে হাঁসফাঁস করে কেবল একটা শব্দ মাথায় ঘুরছিল—‘পালিয়ে যাই।’
জুন মাসের এক রাতে, ঘরে বসে ইউটিউবে দেখে ফেললাম কেদারনাথ যাত্রার একটি ভিডিও। বরফে ঢাকা পাহাড়, মানুষের ভক্তি, আর এক অদ্ভুত একাকীত্ব—যা মনটাকে টানতে লাগল। পরদিনই অফিসে ছুটি নিয়ে ট্রেনের টিকিট কাটা হল—প্ল্যানটা সোজা— হাওড়া থেকে হরিদ্বার। সেখান থেকে রুদ্রপ্রয়াগ হয়ে গৌরীকুণ্ড, আর তারপর শুরু হবে সেই পৌরাণিক যাত্রা—পায়ে হেঁটে ১৬ কিমি।
দুন এক্সপ্রেস। রাত ১১টা ৫৫-এ হাওড়া ছাড়ল। জানালার পাশে বসে গরম চা হাতে আমি ভাবছিলাম—এবার সত্যিই পালিয়ে যাচ্ছি। এই শহর, অফিস, ট্রাফিক—সবকিছু পেছনে রেখে, নিজের মধ্যে ফিরে যাবার জন্য। ট্রেনের প্রতিটি স্টেশনে ঘুম ভাঙছিল, আবার চোখ জড়িয়ে আসছিল। পরদিন বিকেলে হরিদ্বার পৌঁছালাম। হরিদ্বার স্টেশন থেকে সোজা চলে গেলাম হর কি পৌড়ি। গঙ্গার জলে পা ডুবিয়ে মনে হল, এ তো শুধু জল নয়, যেন একটা আত্মিক ধারা—যা মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অন্য কোথাও। সন্ধ্যায় আরতি শুরু হল। হাজার হাজার প্রদীপের আলো গঙ্গার বুকে ভেসে চলেছে। আমার মনে হল—এই আলো আমাকে নিয়ে যাচ্ছে অজানার দিকে।
পরদিন সকালে বাস ধরলাম হরিদ্বার থেকে রুদ্রপ্রয়াগ, প্রায় ১৬০ কিমি। পাহাড়ি রাস্তা, ঘন জঙ্গল আর মাঝে মাঝে গঙ্গার সহোদরা অলকানন্দা নদীর দেখা মিলছিল পাশে পাশে। গাড়ি চলে যাচ্ছিল খাদের পাশ ঘেঁষে, নিচে হাজার ফুট গভীর নদীর ধারা, আর ওপরে চূড়ায় মেঘ ভাসছে। রুদ্রপ্রয়াগ পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল। এখানেই অলকানন্দা ও মন্দাকিনী নদীর সঙ্গম। হোটেলের বারান্দায় বসে সেই সন্ধ্যার জ্যোৎস্নায় আমি নিজেকে ছোট মনে করলাম—এই বিশাল প্রকৃতির মাঝে।
পরদিন সকাল ৭টায় ছোট গাড়ি ধরে রওনা দিলাম গৌরীকুণ্ডের পথে। পাহাড়ে উঠছে রাস্তা, আর ঠান্ডা হাওয়া ধীরে ধীরে কাঁধের চাদর জড়িয়ে ধরছে। পথে আগস্ত্যমুনি, গুপ্তকাশী, আর সোনপ্রয়াগ পড়ল। গৌরীকুণ্ড পৌঁছলাম দুপুর ১টা নাগাদ। এখান থেকেই শুরু হবে পায়ে হাঁটা। এখানে গরম জলের কুণ্ড আছে, যেখানে স্নান করে যাত্রীরা কেদার দর্শনের প্রস্তুতি নেন। আমি সেই জলে পা ডুবাতেই মনে হল, সব ক্লান্তি যেন গলে যাচ্ছে।
সকাল সাড়ে পাঁচটা। চারদিক কুয়াশায় ঢাকা, গৌরীকুণ্ডের ঠান্ডা বাতাস আমার গালে চুম্বন দিতে থাকে। আকাশে অচেনা এক নীলিমা মিশে আছে, এমন এক সময় যখন প্রকৃতির নিঃশ্বাস সবচেয়ে স্পষ্ট শোনা যায়। পায়ের নীচে ধূসর পাথর, ভেজা কুঁড়ে কুঁড়ে গাছের পাতা, আর মাঝে মাঝে এক টুকরো সাদা কোকিলের ডাক। আমার সঙ্গে ছিল অরুণাভ, দিল্লির এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, যিনি চাকরি ছেড়ে এই পথে পা রেখেছেন নিজের জীবনের অর্থ খোঁজার জন্য। আমরা দু’জনেই চুপচাপ, প্রত্যেকের মনে নিজের চিন্তার স্রোত।হালকা বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল মাঝে মাঝে, আর আমরা পথ ধরলাম। প্রথম ২ কিমি বেশ ভালো রাস্তা, পাথর বিছানো, মাঝে মাঝে ঝরনার সুর। সেই ঝরনার জল একদম শীতল, পায়ের তলে যেন সুর যেন বাজাচ্ছে। পথে একদম ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে ওঠা শুরু হল। বনের গন্ধ, আদ্রতার সুবাস, ছোট ছোট লতা-বেলায় ভরা পথ—সব মিলিয়ে যেন এক অবর্ণনীয় সুরঙ্গ। পথচারীদের মাঝে অনেকেই হাঁটছিলেন মৃদু ধীরগতি, কেউ কেউ একান্তেই প্রার্থনা করছিলেন।
রামবাড়া পৌঁছতে ৬ কিমি পথ। এই দূরত্ব যেন কত বড়। হাঁটার সময় হাতেই খোঁজ মিলল গ্রামের এক দোকানে, যেখানে আমরাও সামান্য বিশ্রাম নিলাম। দোকানের মালিক কৃষ্ণা দা, এক সহজ-সরল পাহাড়ি মানুষ, কুশল বিনিময়ে একটা গরম আদা চা বানিয়ে দিলেন।
রাস্তার ধারে এক জায়গায় দেখা গেল এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বসে আছেন, তার সামনে আগুন জ্বলছে, মাথায় সাদা টুপি। আমরা কথা বলার চেষ্টা করলাম। তিনি বললেন, “শিবের আশীর্বাদ নিয়ে আসছেন? এই পথ কঠিন, কিন্তু শেষেই শান্তি।”
এই কথা মনে করিয়ে দেয় পথের কঠোরতা, কিন্তু শেষের আনন্দের আশায় মন শক্ত থাকে। পাহাড়ি পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শরীরের ক্লান্তি বেড়ে গেল। একটু বিরতিতে আমরা গঙ্গার ছোট এক শাখার কাছে বসে পানি খেয়েছিলাম। ঠাণ্ডা পানি আর পাহাড়ের বাতাস মনকে নতুন করে প্রশান্ত করে দিল।
রামবাড়া থেকে লিঞ্চোলি যাওয়ার পথ শুরু হলো সকালে ছয়টা নাগাদ। এবার পথ আরও কঠিন, কারণ উচ্চতা বাড়ছে, আর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। রাস্তা হলো প্রায় খাড়া পাহাড়ের সিঁড়ির মতো। পাথরগুলো ছিল বড় বড়, অনেকগুলো স্থানে মাটি ধসে গেছে। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে ছোট ছোট ঝরনা থেকে পড়তে থাকা ঠাণ্ডা জল পড়ছে সোজা নদীর মাঝে। পথচারীরা এই ঝরনায় নিজেদের চেনাই ও পানি ভরে নেয়।পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যেতে যেতে একাধিকবার আমরা থেমে পড়লাম। কারণ শ্বাস ফেলা ভারী, এবং ঠাণ্ডা বাতাস খুবই তীব্র। এক পর্যায়ে আমার হাত কেঁপে উঠল, ঠাণ্ডায় গ্লাভস না থাকায় লম্ফড়ে পড়া। রাস্তায় আমাদের সাথে একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধ, নাম মোহনলাল, যিনি পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন কেদারনাথের উদ্দেশ্যে। তিনি বললেন, “এই পথটা শুধু পায়ে হাঁটা নয়, মন দিয়ে হাঁটা। হার মানলে শিব তো দূরে থাকবেনই না।”
এমন কথাগুলো শুনে আমাদের মনোবল আবার বাড়ল। লিঞ্চোলি পৌঁছতে বিকেল গড়িয়ে গেছে। এখানে একটা ছোট গাঁও আছে, যেখানে কয়েকটি ছোটা ঘর, কিছু দোকান। দোকানের মালিক দেবেন দা আমাদেরকে গরম চা দিলেন, আর গল্প শোনালেন—“আমাদের এই গাঁওয়ের অনেকেই প্রতিবছর কেদারে যান, আর সবাই ফিরেই নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে আসে।”
লিঞ্চোলিতে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা, কুয়াশায় ঘেরা। আমরা ছাদে বসে পাহাড়ের দূরত্ব দেখে চিন্তা করলাম—সকাল সকাল বের হয়ে আজ পর্যন্ত আমরা কতটা পথ পেরিয়েছি। রাতের বেলা পাহাড়ের নীচ থেকে শোনা যায় কুকুরের ভৌকন আর দূরের পাড়ার গরুর গর্জন। আবহাওয়া একেবারে নীরব, শান্ত, আর একাকীত্বে ডুবিয়ে দেওয়ার মতো।
ভোর ৫টা। আমরা দুই বন্ধু আবার রওনা দিলাম, এবার শেষ ৪ কিমি পথ পায়ে হেঁটে কেদারনাথ মন্দির পর্যন্ত। ঠান্ডা হাওয়া এত তীব্র যে মুখ ঢেকে রাখতে হয়েছিল গরম স্কার্ফ দিয়ে।পাথরগুলো বরফের মতো ঠাণ্ডা, পায়ের নিচে একটু স্লিপিং ফিল। তবে পাহাড়ের ওপর দিয়ে উড়ে আসা বাতাসে একটা অদ্ভুত তাজা ভাব। কাছাকাছি একটা ঝরনা থেকে পড়ছে পানি, যা আমাদের পথ চলার একমাত্র সঙ্গী। আমরা মাঝে মাঝেই থেমে বিশ্রাম নিতাম। হঠাৎ, প্রথম বার দেখা গেল মন্দিরের গম্বুজের ঢেউ। মনে হলো হাজার বছরের পুরনো পাথরের গন্ধ, ঐতিহ্যের স্পর্শ। পায়ের ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট যেন সব মিলিয়ে গেল। আমি মন্দিরের সামনেই বসে পড়লাম, চারপাশে ধোঁয়া উঠছে, ভক্তরা মন্ত্রপাঠ করছে। মন্দিরের প্রবেশদ্বার ছোট, পাথরের তৈরি, অনেক প্রাচীন। মন্দিরের ভিতরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত শান্তি। পুরোহিতরা মন্ত্র পড়ছেন, গঙ্গাজল ছিটাচ্ছেন। মনে হলো এই স্থানে সময় থেমে গেছে। আমার অন্তর থেকে বের হয়ে আসছে ‘ওঁ নমঃ শিবায়’—এই শব্দ যেন পুরো মন্দির ভরে দিল।
রাতের অন্ধকারের ছায়া কেদারনাথ মন্দিরের চারপাশে গভীর নীরবতা ছড়িয়ে দিয়েছে। বাইরের হিমশীতল বাতাস বায়ুর সাথে মিলেমিশে এক মায়াবী সুর বাজাচ্ছে, যেন পাহাড়ের আত্মার গুঞ্জন। চারদিকে বরফের সাদা চাদর, আর তুষারপাতের পরিমিত শব্দ যেন দূরের মেঘের ছোঁয়ায় হারিয়ে যায়। আমরা ধর্মশালায় গিয়ে শীতের করুণ ঠান্ডা থেকে একটু মুক্তি পেলাম। গরম চাদরে মোড়া বসে, ধীরে ধীরে শরীর ও মন উষ্ণ হল। পাশের কোনায় ছড়ানো কাদা-মাটি আর পাথর দেখে মনে হচ্ছিল, এই জায়গা কত কঠিন পথ পার হয়ে এসেছি আমরা। কিন্তু হৃদয়ে এক গভীর তৃপ্তি।
অরুণাভ ধীরে ধীরে বলল, “দেখছ? এখানকার শান্তি, এই অন্ধকারেও আলো খুঁজে পাওয়া যায়।”
আমাদের সামনে এক প্রাচীন পাথরের মন্দির দাঁড়িয়ে, যেখানে হাজার বছরের পুরনো নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। মন্দিরের গম্বুজ থেকে মৃদু আলো পড়ছে, আর ভেতর থেকে ভক্তদের গম্ভীর প্রার্থনা শোনা যাচ্ছে। বাইরে বরফ পড়ছে ধীরে ধীরে, সেই বরফের ফোঁটা যেন সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে। পুরোহিতরা মন্ত্রপাঠ করছেন, ধোঁয়া উঠছে আগুন থেকে। মন্ত্রের শব্দে চারপাশে এক পবিত্র আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের মন শান্ত, চোখ বন্ধ করে শুনছি সেই গম্ভীর সুর।
বৃদ্ধ পুরোহিত ধীরে ধীরে এসে বললেন, “এই মন্দির শুধু শিবের নয়, এখানে আসে প্রত্যেকের অন্তরের যাত্রা। যারা নিজেদের হারিয়েছে, তারা এখানে নিজেদের খুঁজে পায়। কেদারে এসে আত্মাকে শান্তি দেওয়া হয়।”
আমরা দু’জনেই মনে মনে একাকার হলাম সেই আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে, যেটা শুধুই চোখে দেখা যায় না, হৃদয়ে অনুভব করতে হয়। রাতের আকাশ যেন স্বপ্নের ময়দান। পাহাড়ের গায়ে ঝলমলে তারারা মেলে ধরে আকাশের ছবি। দূরে কোথাও একদল ভক্ত দাঁড়িয়ে আছেন, তারা গা জুড়ে মন্ত্রপাঠ করছেন, আর মন্দিরের গম্বুজ থেকে ভেসে আসছে ওঁ নমঃ শিবায় সুর।
একটি কবিতার লাইন মনে পড়ল আমার, যা এ মুহূর্তের জন্য একেবারেই সঠিক:
“রাত্রির নীচে আলো জ্বেলে,
অন্ধকারে খুঁজে নেওয়া পথ,
মনের মেলায় হারানো স্বপ্ন,
ফিরে আসে আলোর স্পর্শ।”
ঘন্টার পর ঘন্টা কাটল সেই শান্ত প্রার্থনার মধ্যে। আমরা ধীরে ধীরে বুঝলাম—কেদারনাথ শুধু এক ভৌগলিক গন্তব্য নয়, এটি এক আত্মিক যাত্রা।
ভোরের প্রথম আলো ভোরে সোনালী রঙে কেদারনাথের পাহাড়গুলোকে আলিঙ্গন করল। ঠাণ্ডা বাতাসের মাঝে একটা নতুন আশার জোয়ার বয়ে গেল। মন্দিরের শিখরে সূর্যের প্রথম রশ্মি পড়ে এক অপূর্ব দীপ্তি সৃষ্টি করল। আমরা বাইরে এসে দাঁড়ালাম। চারদিকে শীতল হিমশীতল বাতাস, কুয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে। দূরে গঙ্গার প্রবাহ মনে করিয়ে দিল জীবনের অবিরাম স্রোত।
অরুণাভ ধীরে ধীরে বলল, “এই আলো আমাদের জীবনে ঢোকে নতুন শক্তি নিয়ে। আমরা ফিরে যাব, কিন্তু এই যাত্রার স্মৃতি আমাদের ছেড়ে যাবে না।”
আমি মাথা নাড়লাম। মনে হচ্ছিল, কেদারনাথের এই যাত্রা শুধু শরীরের নয়, আত্মার একটি মহান প্রেরণা।
পুরোহিতের কথাগুলো এখনো কানে বাজছিল, “পাহাড়ের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি ঝরনা, প্রতিটি বাতাসের কণার মধ্যেই শিব বিরাজমান। যেখানে প্রেম, বিশ্বাস আর ধৈর্য মিলে মিলিত হয়, সেখানেই জীবনের প্রকৃত অর্থ।”
কেদারনাথের এই যাত্রায় আমরা শিখলাম—শুধু দেহ নয়, মনও শক্তিশালী করতে হয়। জীবনের কঠিন সময়ে, যখন আমরা হারিয়ে যাই, তখন নিজের ভিতরে ঢুকে শান্তির খোঁজ করতে হয়। পাহাড়ের পথ কঠিন হলেও প্রতিটি ধাপ আমাদের গড়ে তোলে, মনের ভেতর এক অটুট বিশ্বাসের ভিত্তি দেয়।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এক কেদারনাথ আছে—যেখানে আমরা হারিয়ে যাই, কিন্তু তারপর ফিরে আসি নিজেকে খুঁজে পেয়ে।
এই যাত্রার শেষে, আমি শুধু এটুকু বলতে চাই—“যাত্রা কখনোই শেষ হয় না। যখন তুমি নিজের অন্তরের মন্দিরে পৌঁছোয়, তখনই শুরু হয় জীবনের আসল গল্প।”
সমাপ্ত




