Posted in

রক্তচিহ্ন

Spread the love

প্রিয়াংশু অধিকারী


দার্জিলিঙের পাহাড়ি হাওয়া সেই সকালে একটু বেশিই কাঁপুনি ধরাচ্ছিল। সূর্য উঠলেও তার আলো ছিল ফিকে, যেন কোনো অজানা অন্ধকারের আঁচ লেগে আছে আলোতেও। ম্যাল রোডের একদম শেষপ্রান্তে ‘হোটেল শেরপা ভিউ’। নামটা শোনার পর মনে হয়, জানালা খুললেই দেখা যাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা। আর দেখা যেতও। কিন্তু আজ, হোটেলের ঘর নম্বর ২০৭-এর জানালায় চুপি চুপি নেমে এসেছে পুলিশি টেপ। সেখানে বিছানার চাদরে ছড়িয়ে আছে তাজা রক্ত। মৃত এক পুরুষ। মুখ থুবড়ে পড়া, চোখ দুটো খোলা, আর হাতে এক ফোঁটা কালি লেগে আছে।

দীপেন রায়। বয়স পঞ্চান্ন। কলকাতার এক নামকরা পরিবহণ ব্যবসায়ী। প্রতিবছর এই সময়টা সে দার্জিলিঙে আসতেন একা, “চা আর ছুটির জন্য” – বলতেন হোটেলের পুরনো ম্যানেজার দাশু। কিন্তু এ বছর তাঁর সফর শেষ হল মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে।

সকাল ৭টা। হোটেলের রুম সার্ভিস বয় সুভাষ যখন ব্রেকফাস্ট পৌঁছে দেয়, তখনই আবিষ্কার হয় লাশ। দরজা খোলা ছিল। ঘরে কোনো ওলট-পালট নয়, কিন্তু এক ভৌতিক নীরবতা।

ঋজু সেন, সেই সময় বসে ছিল দার্জিলিঙের এক পুরনো বইয়ের দোকানে – “পাহাড়ি পাতা”। তার আসার কারণ ছিল এক শতাব্দী পুরনো বাংলা গোয়েন্দা উপন্যাসের খোঁজ। কলকাতার দক্ষিণে সে এক ছোট লাইব্রেরি চালায়।
কিন্তু বইয়ের বাইরেও তার এক গোপন নেশা আছে – অপরাধ ও বিশ্লেষণ।

হোটেল শেরপা ভিউয়ের খুনের খবর পাওয়ার পর সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। তার কলকাতার পুলিশবন্ধু ইনস্পেক্টর নীলায়ণ দত্ত এখন দার্জিলিঙের পোস্টিংয়ে।
“ঋজু! এই হোটেলটা কিন্তু বেশ রহস্যময় হয়ে উঠছে, তোকে দরকার।”
নীলায়ণের ফোন পেয়েই ঋজু চলে এল ঘটনাস্থলে।

সামনের লনে দাঁড়িয়ে থাকা হোটেল অতিথিরা ফিসফিস করে বলছিল, “আত্মহত্যা না খুন?”
কিন্তু ঘরের দৃশ্য ঋজুর চোখে অন্য ছবি আঁকে।

ঘরের ভিতরে গিয়ে সে ধীরে ধীরে সব খুঁটিয়ে দেখে—
বিছানা, জানালার পাশের চা-কাপ, ছেঁড়া প্যাডের পাতায় অর্ধেক লেখা –
“মাফ করিস না…”
আর একটা মোবাইল, যার স্ক্রিনে শেষ ডায়াল নম্বর মাঝরাত ১:১২তে।

“দেখিস ঋজু, আত্মহত্যার মতোই লাগছে, কেউ জোর করে কিছু করেনি,” বলল নীলায়ণ।

“একটা লোক যার পরিচিতি, টাকা, আর ভালো রকম শত্রুও আছে, হঠাৎ করে এমন ‘নিয়মিত ছুটি’-তে এসে মরতে যাবে? আর এই হাতে কালি কেন? আর জানালাটা খোলা কেন?” – ঋজুর প্রশ্ন ছুঁড়ে যায় বাতাসে।

সে জানালার পাশ গিয়ে তাকায় – চা বাগানের দিকে মুখ করে থাকা হোটেলের এক প্রান্ত। সেখানে রাত ১২টা ৩০ মিনিট নাগাদ কোনো একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেছে বলে জানায় রিসেপশনে থাকা ছেলেটি।
সিসিটিভি ফুটেজে ঝাপসা এক ছবি—
একটা হুডি পরা লোক সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, আর তার পরেই ফুটেজ কেটে গেছে।

“ঘটনাটা শুধু খুন নয় নীল, এটা নিখুঁতভাবে সাজানো কিছু। যার উদ্দেশ্য হলো… কাউকে চিরতরে থামানো।”

ঋজু ঘরের কোণে পাওয়া নোটপ্যাড নিয়ে বসে। কলমের চাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে পেছনের পাতায়। সে তার পকেট থেকে ছোট আলো বের করে সেই চাপান লেখা খুঁটে দেখতে থাকে।

ধীরে ধীরে দেখা যায়—

“তোর জন্য আমি সব হারিয়েছি। মাফ করিস না নিজেকেও।”

একটা ইঙ্গিত।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক?
প্রেমঘটিত কোনো অজানা অধ্যায়?

এই সময়ে ম্যানেজার দাশু এসে বলে, “স্যার, আগের রাতে দীপেনবাবু এক মহিলার সঙ্গে জোরে জোরে কথা বলছিলেন ফোনে। তারপর ওনার শরীরটা খারাপ লাগছিল। বললেন, রাতটা শুধু ঘুমোতে দিন।”

ঋজু মাথা নেড়ে বলে, “তোমরা ওই মহিলার নাম জানো?”

“না স্যার, কিন্তু উনি নিজেই বলছিলেন ফোনে—‘তুই এলে আমি সব বলব ঈশানীকে।’ মনে হয় ওনার মেয়ের নাম।”

ঋজুর মাথার ভেতর একটা নাম ভেসে ওঠে—ঈশানী রায়।

সন্ধ্যেবেলা, শহরের অন্যপ্রান্তে একটি কাফেতে বসে ঋজু দেখে এক তরুণী, চোখে কালো চশমা, গলায় জ্যাকেট, পাশে ছোট্ট ব্যাগ। পরিচয় দেয়—

“আমি ঈশানী। বাবার কথা জানলাম। আমি জানি, এটা আত্মহত্যা নয়।”

ঋজু তাকায় তার চোখে— সেখানে ভয়, কান্না আর কেমন এক হিংস্র সন্দেহ।

“কেন বলছ আত্মহত্যা নয়?”

ঈশানী বলে, “বাবা গত সপ্তাহে আমায় বলেছিলেন, কেউ ওঁকে ফলো করছে। ও বলেছিল দার্জিলিঙে এলে সব বলবে, আর কিছু ছবি দেখাবে।”

“কী ধরনের ছবি?”

“ব্যবসার প্রতারণা, কাগজপত্র, আর… একটা চিঠি। বলেছিল, একটা নাম ও দেখাবে, যে বাবার শেষ বিশ্বাসঘাতক।”

ঋজু চুপ করে।
তার মাথার ভিতর এক গুঁইগুঁই করা অন্ধকার রাস্তায় ঢুকে পড়ে এক জিজ্ঞাসা –
এই খুন শুধুই ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় কোনো ষড়যন্ত্র।

আর সে জানে,
সে এখানে এসেছে বই খুঁজতে, কিন্তু তার হাতে চলে এসেছে এক খুনের পাণ্ডুলিপি।

ঈশানীর চোখে ছিল ঝাপসা জল। কাফের কোণার টেবিলে বসে সে যখন বাবার শেষ কথাগুলো বলছিল, তখন ঋজু সেই কথার আড়ালে খুঁজছিল চক্রান্তের ছায়া।

“তোমার বাবা বলেছিলেন, কেউ ওঁকে ফলো করছে? কী ধরনের লোক?”

ঈশানী বলল, “বাবা শুধু বলেছিলেন, ‘যাদের সঙ্গে এত বছর ব্যবসা করেছি, তারাই এখন ছুরি চালাচ্ছে।’ আমার আন্দাজ, এটা শুধু টাকা-পয়সার ব্যাপার নয়। ওর কাছে কিছু নথি ছিল, যা হয়তো কাউকে ফাঁস করতে পারত।”

ঋজুর মাথায় তখন ঘুরছিল দুটো শব্দ— ব্যবসা আর বিশ্বাসঘাতকতা।

তিনি জানতে চাইলেন, “তোমার বাবার পার্টনার কে ছিল?”

“দুজন। অজিত সাহা আর রণজয় ব্যানার্জি। কলকাতায় পরিবহণ ব্যবসার বড় দুটো শাখা তাদের নিয়ন্ত্রণে। আমি জানি, বাবা অজিত সাহাকে নিয়ে ইদানীং চিন্তিত ছিলেন।”

ঋজু ফোন করে ইনস্পেক্টর নীলায়ণকে। “আমার একটা দরকার। দীপেন রায়ের ব্যবসায়িক পার্টনার অজিত সাহা আর রণজয় ব্যানার্জির ব্যাকগ্রাউন্ড একটু খোঁজ নিও। আর হোটেল ঘরটা আবার ঘেঁটে দেখো, কোনো লুকানো ড্রয়ার, চেকবই বা ব্যক্তিগত ডায়েরি পাওয়া যায় কি না।”

পরদিন সকাল।
ঋজু আবার ফিরে আসে হোটেল শেরপা ভিউ-তে। ঘর ২০৭ তখনো সিলড।
ম্যানেজার দাশু তাকে ডেকে নিয়ে যায়।

“স্যার, আপনি বলেছিলেন কোনো লুকনো কাগজ খুঁজতে। ঘরের সাইড টেবিলের নীচে একটা খাপ পাওয়া গেছে। সেখানে গুঁজে রাখা ছিল একটা খাম।”

ঋজু খাম খুলে দেখে— তিনটি কাগজ, একটি পেন-ড্রাইভ, আর একটি ছোট্ট চিরকুট।
চিরকুটে লেখা—
“এই প্রমাণগুলো যদি আমার কিছু হয়, ঈশানীকে দিও। রণজয় সৎ, কিন্তু অজিতকে আর বিশ্বাস করিনি।”

ঋজুর মনের ভেতর যেন একটা ঘড়ি টিকটিক করে উঠল।

সে পেন-ড্রাইভ পরীক্ষা করতে স্থানীয় সাইবার ক্যাফেতে যায়।
ড্রাইভে পাওয়া যায় কয়েকটি স্ক্যানড ডকুমেন্ট—
– জাল ইনভয়েস
– কালো টাকার ট্রান্সফার
– একটি চুক্তিপত্র যেখানে অজিত সাহা গোপনে কোম্পানির সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রির পরিকল্পনা করেছে, দীপেন রায়ের অজান্তে।

সবচেয়ে রহস্যজনক ছিল একটি ছবি—
এক পার্টি, যেখানে দীপেন রায়, অজিত সাহা, এবং একটি অচেনা যুবককে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। যুবকের চোখে সানগ্লাস, মুখে অদ্ভুত এক অস্বস্তি।

ঋজু ছবিটা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
এই যুবকটাই কি সেই রাতের সিসিটিভির ছায়ামূর্তি?

কলকাতা থেকে ফোন আসে। ইনস্পেক্টর নীলায়ণ জানায়—
“অজিত সাহার বিরুদ্ধে আগে একবার আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ উঠেছিল, যদিও প্রমাণের অভাবে ছাড় পেয়ে যায়। আর রণজয় ব্যানার্জি বেশ সৎ লোক, ব্যবসায়ীর তুলনায় সাংস্কৃতিক ঝোঁক বেশি।”

ঋজু ভাবে— তাহলে দীপেন রায় নিজের মৃত্যুর আগেই সব বোঝেন। অজিতের চক্রান্ত তাকে বোকা বানিয়েছে এতদিন।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়— অজিত নিজে খুন করেছে, না সে কাউকে পাঠিয়েছে?
আর সেই অচেনা যুবক কে?

ঋজু ঈশানীকে ডাকে।
“তোমার বাবার শেষ ফটোতে যে তৃতীয় ব্যক্তি আছে, তুমি চিনতে পারো?”

ঈশানী ছবি দেখে চমকে ওঠে।
“এ তো অভিষেক! অজিত সাহার ড্রাইভার cum পিএ। তবে বাবা ওকে নিয়ে কখনো সন্দেহ করেননি। খুবই ভদ্র ও শান্ত ছেলে।”

ঋজু তখনই সিদ্ধান্ত নেয়— অভিষেককে খুঁজে বের করতে হবে।

দুপুরের দিকে খবর আসে— অভিষেক শহরে নেই। হোটেল চেক-ইনের আগের দিন থেকে সে নিখোঁজ।
কলকাতায় তার মোবাইল লোকেশন শেষ পাওয়া গেছে শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে।

ঋজু বোঝে, এই নাটকের কুশীলবরা এখন দার্জিলিঙ নয়, কলকাতার গলিতেই ছড়িয়ে।
সে নীলায়ণকে জানায়— “আমি কাল কলকাতা ফিরছি। আমাকে অভিষেক, অজিত সাহা এবং রণজয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সব কিছুর সূত্র হয়তো সেখানেই।”

ঋজুর চোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি।
একটা খুন যে শুধু ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়, বরং একটি সংগঠিত ষড়যন্ত্র, সেটাই এখন তার অনুসন্ধানের কেন্দ্র।
আর এই যাত্রায়, সে একা নয়। সঙ্গে আছে ঈশানী— যে এখন আর শুধু মৃতের কন্যা নয়, বরং নিজের বাবার ন্যায় বিচারের পথে এক সত্যান্বেষীও।

শিয়ালদহ স্টেশন থেকে মাত্র পঁচিশ মিনিট হেঁটে গেলেই পৌঁছনো যায় কাঁকরগাছিতে—একটা চওড়া রাস্তা, গলির পর গলি, যেখানে দিনের আলোয় যেমন ব্যস্ততা, রাতে তেমনি নির্জনতার ছায়া।

ঋজু চক্রবর্তী, এখন কলকাতার বুকেই খুঁজছে দীপেন রায়ের হত্যার সূত্র।
সঙ্গে ঈশানী, যার চোখে এখন আগুনের মতো স্পষ্ট একটাই লক্ষ্য—বাবার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করা।

স্টেশন এলাকার মোবাইল লোকেশন ধরে অভিষেকের শেষ অবস্থান ছিল কাঁকরগাছির একটি ছোট গেস্ট হাউস—”নীলাঞ্জনা রেস্ট ইন”।
ঋজু আর ঈশানী, ছদ্মবেশে এক দম্পতির অভিনয় করে সেখানে চেক-ইন করে।

গেস্ট হাউসের ম্যানেজার এক ঝাঁকড়া চুলের উদাস যুবক।
“দাদা, ওমরা তো দু’দিন আগে একটা ছেলেকে নিয়েছিলাম। নাম লেখানো ছিল ‘অভিষেক পাল’। তবে কাল হঠাৎই তড়িঘড়ি করে চেক-আউট করে চলে গেল। এক টাকাও বেশি রাখেনি। এমনকি ব্রেকফাস্টও খেল না।”

ঋজু জানতে চায়, “কিছু বলেছিল? কোথায় যাচ্ছে?”

“শুধু বলল, ‘চলে যাচ্ছি একটু সময়ের জন্য, আবার দেখা হবে।’ ওর মুখটা কেমন জানেন? যেন ভয় আর দুঃখে ভাঙা। একটা ফোন কল পেয়েই যেন পালিয়ে গেল।”

ঈশানী ফিসফিস করে বলে, “ও যদি দোষী না হয়, তাহলে কেন পালাল?”

ঋজু চিন্তিত মুখে বলল, “যদি ভয় পেয়ে পালায়, তবে সে ভুক্তভোগী। যদি নিজেকে লুকোয়, তবে সে অপরাধী। দুই অবস্থায়ই, খুঁজে বের করতেই হবে।”

সন্ধ্যাবেলা, ইনস্পেক্টর নীলায়ণ সাহায্য করে একটা নম্বর ট্র্যাক করতে—অভিষেক পাল যে ফোন কল পেয়েছিল, সেটি এসেছে একটি প্রাইভেট নম্বর থেকে, যা রেজিস্টার্ড অজিত সাহার কোম্পানির কর্পোরেট হেড অফিসে।

ঋজু এখন পুরোপুরি নিশ্চিত—অজিত সাহা এই খুনের মূল কুশীলবদের একজন।

ঈশানী বলে, “বাবা যে কাগজগুলো রেখে গিয়েছিলেন, তাতে লেখা ছিল ‘প্রপার্টি চুক্তি বিক্রি’ আর ‘ফ্রড ইনভয়েস’। বাবা এসব পেনড্রাইভে রেখেছিলেন, কারণ উনি জানতেন, কাগজের ওপর বিশ্বাস করা যায় না।”

ঋজু বলে, “তোমার বাবা খুব হিসেবি মানুষ ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি সব রেখে গেছেন, শুধু খুনির নামটাই লিখে যাননি। সেটা আমাদেরই বার করতে হবে।”

পরদিন সকালে তারা যায় অজিত সাহার কোম্পানির অফিসে—“AS Transworld Pvt. Ltd.”
স্মার্ট ফর্মাল পোশাকে বসে থাকা এক নিরাপত্তারক্ষী প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “আপনাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?”

ঋজু মুচকি হেসে বলে, “আমরা ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিংয়ের কাজ করি। সাহা সাহেবের সঙ্গে পুরনো ব্যবসায়িক পার্টনার দীপেন রায়ের একটি আর্থিক বিষয় নিয়ে কথা আছে। হয় উনি আমাদের কথা শুনবেন, নয়তো কাগজে ছাপা হবে।”

এই চাপেই অজিত সাহা দেখা করতে রাজি হন।
এক পাকা চুল, ঠান্ডা চোখের মানুষ। শুরুতে মুখে আলগা হাসি ছিল, কিন্তু কথার ভেতরে ছিল কাঁপুনির রেশ।

ঋজু প্রশ্ন করে, “আপনার কোম্পানির এক কর্মচারী অভিষেক পাল কোথায়? তার মোবাইল লোকেশন, শেষ কল ও আপনার অফিসের নম্বর—সব মিলে যাচ্ছে।”

অজিত সাহা চোখ নামিয়ে বলে, “ও তো কয়েকদিন অফিসেই আসেনি। আর আমি কোনো ফোন করিনি।”

ঈশানী এবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “তবে কি আপনি জানেন না, বাবা আপনার বিরুদ্ধে কিছু নথি জোগাড় করেছিলেন?”

অজিত উত্তরে বলে, “দেখুন, দীপেন আর আমি বহু বছরের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলাম। কিন্তু ওর আচরণ ইদানীং খুবই অদ্ভুত হয়ে উঠেছিল। সে মনে করত, সবাই তাকে ঠকাতে চায়। আমি ওকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে আমার ওপরে সন্দেহ করতে শুরু করে।”

ঋজু বলে, “আপনার সঙ্গে থাকা ফটোতে এক যুবক আছে। ওর নাম অভিষেক। সে এখন নিখোঁজ। আর আপনি তার শেষ কলার। এ বিষয়ে কী বলবেন?”

সাহার ঠোঁট তখন শক্ত, চোখ সরু।
“আমি জানি না ও কোথায়। ওর কাছে যদি কোনো তথ্য থাকে, সেটা আমার অজানা।”

ঋজু আর ঈশানী ফিরে আসে, কিন্তু বুঝতে পারে—সত্য লুকোনো আছে আরও গভীরে।

সন্ধ্যায় ফোন আসে রণজয় ব্যানার্জির কাছ থেকে।
তিনি বলেন, “ঈশানী, আমি শুনেছি তুমি খোঁজ করছ। দীপেন আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। আমি এই খুনের বিষয়ে কিছু বলতে পারি—সশরীরে দেখা করো।”

রণজয়-এর বাড়ি দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়াহাটে। একসময় যিনি শিল্পকলায় আগ্রহী ছিলেন, এখনো গিটার, বই আর কফির গন্ধে ভরা তাঁর বাড়ি।

ঈশানীকে দেখে তিনি বলেন, “তোমার বাবা অনেকদিন ধরেই অজিতের ওপরে বিশ্বাস হারিয়েছিলেন। কিন্তু সে প্রমাণ ছাড়া কিছু করতে চাইছিল না।”

ঋজু বলে, “আপনি কি জানেন অভিষেক পাল কে?”

রণজয় মাথা নেড়ে বলেন, “অজিতের খুব কাছের লোক। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, অভিষেক খুনী নয়। বরং সে হয়তো সত্য জানে, এবং এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে।”

ঋজু মনে মনে ভাবে—তাহলে অভিষেকের খোঁজ পেলেই, খুনের গোটাপত্তন খুলে যাবে।
এটাই হবে পরের ধাপ—অভিষেককে খুঁজে বার করা, যেকোনোভাবে।

রাত ১১টা।
ঈশানীর ফোনে আসে এক হঠাৎ কল—অচেনা নম্বর থেকে।

ধীরে ধীরে কাঁপা গলায় কেউ বলে—
“আমি অভিষেক। আমায় মারবে ওরা। আমি সব বলব, কিন্তু নিরাপদ জায়গায়। কাল ভোরে বউবাজারের ‘ভগ্ন কালী মন্দির’—ওখানে আসুন একা। আমি আর পালাতে পারছি না।”

ঈশানীর চোখ বড় হয়ে ওঠে।
ঋজু এবার জানে—এই খেলায় শেষ পালা শুরু হচ্ছে।

ভোর পাঁচটা।
বউবাজারের গলি এখনো নিঃশব্দ। বাতাসে কাঁচা কাদার গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসছে চায়ের উনুনে কাঠ জ্বলার আওয়াজ। কিন্তু এই ঘুমভাঙা কলকাতার বুকেই আজ একটা সত্য উন্মোচিত হতে চলেছে।

ঋজু আর ঈশানী নির্ধারিত জায়গায় আসে—ভগ্ন কালী মন্দির।
একটা ভাঙা মন্দির, যেটার অর্ধেক ছাউনি উঠে গেছে, আর গায়ে গায়ে লেখা চুনে লাল ‘ওম নামঃ শিবায়’।

হঠাৎ পাশের একটা ছোট দরজা খুলে মুখ বাড়ায় এক অন্ধকার চোখ—অভিষেক পাল।

সে যেন ছায়া হয়ে গেছে। চোয়ালে দাড়ির রেখা, চোখে ভয়ের ছাপ, আর হাতের থলিতে কী যেন আঁকড়ে আছে সে।

ঈশানী বলে, “তুমি কোথায় ছিলে এতদিন? তুমি জানো বাবা—”

অভিষেক ফিসফিস করে থামিয়ে দেয়, “জানি। আমি দেখেছি সব। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি খুন করিনি। আমিও পালাচ্ছি, কারণ ওরা আমাকেও শেষ করে দেবে।”

ঋজু বলে, “সবটা বলো, ধীরে ধীরে। সত্য জানতেই এসেছি আমরা।”

অভিষেক বলতে শুরু করে—
“দীপেন স্যার ছিলেন সত্যিকারের মানুষ। উনি অজিত সাহার টাকার হেরফের ধরেছিলেন। আমি ওনার কাজ করতাম, ওনার হিসেব রাখতাম। একদিন উনি ডেকে একটা পেনড্রাইভ হাতে দিয়ে বলেন, ‘অভিষেক, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি কিছু হয়, এইটা রণজয়কে দেবে।’ আমি ভয় পেয়ে যাই। বললাম, ‘আপনি এসব কেন বলছেন?’ উনি শুধু বললেন—‘অজিত আমাকে শেষ করতে চাইছে।’”

ঈশানীর চোখ জলে ভরে যায়।

অভিষেক আবার বলে, “সেই রাতেই হঠাৎ স্যারের ফোন আসে। আমি তখন বাইরে। উনি বলেন, ‘দ্রুত দার্জিলিং এসো, আমি এখানে এসে একটু সময় নিচ্ছি, কিন্তু টের পাচ্ছি কেউ আমার পিছু নিয়েছে।’ আমি গিয়েছিলাম। কিন্তু দেরি হয়ে গেছিল। স্যার তখন মৃত।”

ঋজু চুপ করে শুনছে। সে জানে, সত্য গড়ে উঠছে আস্তে আস্তে।

“পুলিশ এলে আমি পালাই। পেনড্রাইভটা তখনও আমার কাছে। আমি জানতাম, যদি ধরা পড়ি, আমাকেও ফাঁসাবে। অজিতের লোকজন খুঁজছিল আমাকে। ওই গেস্ট হাউসেও একদিন এক অচেনা লোক এসে জিজ্ঞাসা করে—‘অভিষেক পাল এখানে আছে কি?’ আমি তখনই বুঝি, সময় ফুরিয়ে আসছে।”

ঋজু বলে, “তুমি পেনড্রাইভটা এনেছো?”

অভিষেক থলিটা খুলে একটা কালো ছোট পেনড্রাইভ এগিয়ে দেয়। “এটাই।”

ঋজু পেনড্রাইভটা নিজের ল্যাপটপে লাগায়। খুলে যায় কয়েকটি ফোল্ডার—

Invoice_Mismatch

Property_Agreements

Audio_Recordings

ঈশানী হাত তুলে থামে। “অডিওটা চালাও।”

স্পিকারে ভেসে আসে দীপেন রায়ের কণ্ঠ—

“অজিত, আমি সব জানি। পেপার বানিয়ে শেয়ার বেচেছো, মাল সরিয়ে ইনভয়েস জাল করেছো। আমি চুপ করব না।”

অজিত সাহার গলা শোনা যায়—“তুমি জানো না কার সঙ্গে খেলা খেলছো, দীপেন। সত্য অনেক সময় জলে ভেসে থাকে না। ডুবেও যায়।”

ঋজু বলে, “এইটা যথেষ্ট। এখন তোমাকে নিয়ে যেতে হবে নিরাপদ জায়গায়। তারপর আমরা যাব পুলিশের কাছে।”

অভিষেককে নিয়ে তারা পৌঁছায় ইনস্পেক্টর নীলায়ণের কাছে। সমস্ত কথা ও তথ্য জমা পড়ে।

নীলায়ণ প্রথমে সন্দেহ প্রকাশ করলেও, অডিও ক্লিপ ও ইনভয়েস মিলিয়ে দেখে—এ এক ভয়ঙ্কর চক্রান্ত। শুধু খুন নয়, লাখ লাখ টাকার দুর্নীতির ছাপ আছে।

“এবার আমরা ওয়ারেন্ট বের করব অজিত সাহার নামে,” বলে নীলায়ণ। “তবে সতর্ক থাকতে হবে। লোকটা প্রভাবশালী।”

ঋজু বলে, “আমরা প্রস্তুত। শুধু আরও একটা কাজ বাকি।”

ঋজু রণজয়ের বাড়িতে ফিরে আসে। বলে, “আপনিই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য মানুষ, যিনি দীপেনবাবুর উত্তরাধিকার সামলাতে পারেন। পেনড্রাইভটা আপনার কাছে রাখা উচিত। আমরাও আপনাকে সাপোর্ট করব।”

রণজয় চোখ মুছেন। “দীপেনের ন্যায়বোধ যেন মারা না যায়, এটাই চাই।”

ঈশানী বলে, “আমিও এবার বাবার পথেই হাঁটব। আপনি পাশে থাকুন।”

রণজয় মাথা নত করে বলেন, “আমরা সবাই দীপেনকে হারালাম। কিন্তু তার সত্য এখনও বাঁচে, কারণ তোমরা লড়েছো।”

সে রাতে, টিভি স্ক্রলে খবর ভাসে—

> “AS Transworld-এর ডিরেক্টর অজিত সাহা গ্রেপ্তার। দুর্নীতি, খুন ও প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত। তদন্তে উঠে আসছে বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য।”

ঋজু আর ঈশানী ছাদে বসে চুপ করে থাকে।

ঋজু বলে, “খুনির মুখোশ খুলে গেল। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—এই চক্রের পেছনে আর কারা আছে? অজিত কি একা খেলোয়াড় ছিল?”

ঈশানী বলে, “বাবা হয়তো এটা জানতেন, কিন্তু বলার সুযোগ পাননি। এখন আমাদের খুঁজে বার করতে হবে।”

ঋজুর চোখে আলোর ঝিলিক—
“তাহলে আমরা এখানেই থামছি না। সত্যকে খুঁড়েই তুলতে হবে। যত অন্ধকারই থাকুক।”

দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি বিকেলটা আজ একটু বেশিই কুয়াশাময়। পাইনগাছের মাথায় ঝুলে আছে সাদা মেঘের টুকরো। ক্যান্টনমেন্ট এলাকাজুড়ে কিছু অচেনা নীরবতা।

ঋজু আজ একা এসেছে, রণজয়ের ডাকে।
রণজয় ফোনে বলেছিলেন —

“ঋজু, একটা জিনিস আছে যা আমি এতদিন বলিনি। দীপেনের মৃত্যুর পেছনে আরও গভীর কিছু আছে। আমি আজ সব বলব।”

ঋজু জানে, এখনো খেলা শেষ হয়নি।

রণজয়ের পুরনো বাংলো বাড়িতে ঢুকে দেখে, লোকটা এক কাপ চায়ে চুমুক দিচ্ছে, চোখে চিন্তার রেখা।

“তুমি জানো, দীপেন আর আমি শুধু ব্যবসার সঙ্গী ছিলাম না,” শুরু করেন রণজয়। “আমরা কলেজ জীবন থেকেই বন্ধু। ওর মতো মানুষ আমি দেখিনি। ঠিক বলেছি তো?”

ঋজু মাথা নাড়ে।

“কিন্তু আমি তখন ভেঙে পড়েছিলাম, যখন ও আমাকে বলেছিল — সে কোম্পানি ছেড়ে দেবে। অজিতের দুর্নীতির ফাঁদে পড়ে সে চুপ থাকতে পারেনি। কিন্তু আমি তখন… আমি তখন একটা চুক্তির ফাঁদে আটকে গিয়েছিলাম।”

ঋজুর ভুরু কুঁচকে ওঠে। “চুক্তি?”

রণজয় ধীরে বলেন, “অজিত শুধু ব্যবসায়ী নয়, ব্ল্যাকমেইল করতেও ওস্তাদ। আমার একটা ব্যক্তিগত দুর্বলতা ছিল… যার প্রমাণ ওর কাছে ছিল। তাই দীপেন যখন পেনড্রাইভের কথা বলল, আমি তাকে বোঝাতে চাইলাম, চুপ থাক। কিন্তু সে রাজি হয়নি।”

“আপনি কি… আপনি খুনের সঙ্গে যুক্ত?”
ঋজুর কণ্ঠে ক্ষীণ থরথরানি।

রণজয় মুখ নামিয়ে নেয়। “আমি খুন করিনি। কিন্তু যেদিন দীপেন দার্জিলিংয়ে এল, আমি জানতাম ওকে কেউ ফলো করছে। আমি চুপ থেকেছিলাম। সেটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ। আমি বন্ধুকে বাঁচাতে পারিনি।”

ঋজু ধীরে উঠে দাঁড়ায়। “আপনার সত্যিগুলো পুলিশের কাছে বলতেই হবে।”

রণজয় বলেন, “আমি প্রস্তুত। আমি জানি, এই সত্য বলার পর আমার সম্মান যাবে, কিন্তু দীপেন অন্তত শান্তি পাবে।”

সেই সন্ধ্যাবেলায় প্রেস কনফারেন্স হয়।

ইনস্পেক্টর নীলায়ণ সাংবাদিকদের জানান—

“AS Transworld-এর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং দীপেন রায়ের খুনের কেসে মূল অভিযুক্ত অজিত সাহা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। এছাড়া কোম্পানির আরও দু’জন ডিরেক্টর রণজয় চৌধুরী ও সুরজিৎ ঘোষ দোষ স্বীকার করেছেন এবং তদন্তে সহযোগিতা করছেন। তদন্তে উঠে এসেছে অর্থ জালিয়াতি, প্রভাব বিস্তার এবং খুনের ষড়যন্ত্র।”

ঈশানী পাশে দাঁড়িয়ে। চোখে জল, কিন্তু মুখে তৃপ্তির ছায়া।

ঋজু পাশে দাঁড়িয়ে বলে, “তোমার বাবার লড়াই বৃথা যায়নি।”

ঈশানী বলে, “আমরা শুধু বিচার চাইনি, একটা ভয়ভাঙানো সত্য ফেরত চেয়েছি। আজ সেটা সম্ভব হয়েছে।”

দার্জিলিংয়ের সেই হোটেল — “মাউন্টভিউ রিট্রিট”।

ঋজু ফিরে এসেছে সেই ঘরে, যেখানে প্রথম খুন হয়েছিল। সেখানে এখন শূন্যতা। হোটেল কর্মীরা চুপ করে তাকিয়ে থাকে, এই সেই মানুষ, যিনি অন্ধকার কুয়ো থেকে আলো এনে দিয়েছেন।

ঋজু শেষবার জানালার ধারে দাঁড়ায়।

নিচে তাকিয়ে দেখে, সূর্যাস্তের শেষ আলো পড়ে আছে পাহাড়ের গায়ে। শহর ধীরে ধীরে আবার রঙিন হতে শুরু করেছে।

সে নিজের খাতায় শেষ পৃষ্ঠাটা লেখে—

কেস নং: ০১
নাম: রক্তচিহ্ন
অবস্থাঃ সমাপ্ত
কিন্তু শহরের সব রহস্য কি শেষ হয়? না। অনেক কিছু শুরু হয় এখান থেকেই।

শেষমেশ…

কলকাতা ফিরে ঋজু তার নতুন অফিস তৈরি করছে —
“ঋজু বোস ইনভেস্টিগেশন সার্ভিসেস”

দরজায় টাঙানো বোর্ডে লেখা —
Truth Seeker | Story Breaker | Justice Finder

ঈশানী তার সহকারী হয়ে কাজ শুরু করেছে। অভিষেক এখন সংরক্ষিত সাক্ষী হিসেবে আদালতে স্বীকারোক্তি দিচ্ছে।

নতুন এক রহস্যময় চিঠি আসে। পাঠিয়েছেন এক বৃদ্ধা —

“আমার ভাই হঠাৎই উধাও হয়ে গেছেন বর্ধমানের বাড়ি থেকে। গ্রামের লোকেরা বলছে ভূতের ছায়া! আপনি কি তদন্ত করতে পারবেন?”

 

ঋজু হেসে বলে,
“তাহলে শুরু হোক পরবর্তী অভিযান…”

———

 

1000023512.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *