Bangla - তন্ত্র

তপোবনের কাল

Spread the love

বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


হিমালয়ের বুক চিরে উঠে যাওয়া সেই সরু আঁকাবাঁকা পথটায় যখন চারজন অভিযাত্রী প্রথম পা রাখল, তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। আকাশের রঙ ধূসর, তবে মেঘের আড়ালে সূর্য মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যেন সতর্ক করে দিচ্ছে—এই পথে চলা সহজ হবে না। অভিজিৎ সেনগুপ্ত, অভিযানের দলনেতা, একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে বহু দুর্গম পাহাড়, পরিত্যক্ত গুহা ও ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজপ্রাসাদ চষে বেড়িয়েছেন, কিন্তু আজকের গন্তব্য নিয়ে তাঁর মনে সন্দেহ কাজ করছিল। এই ‘তপোবন’ সম্পর্কে যা কিছু জানা গেছে, তার সবটাই টুকরো টুকরো, বিপজ্জনকভাবে অস্পষ্ট। ঋদ্ধিমা ধর, তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং নৃবিজ্ঞানী, এক প্রাচীন পোড়াদেওয়ালের গায়ে পাওয়া খোদাই দেখে এই তপোবনের সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর ধারণা, এই স্থানে কোনও এককালে তান্ত্রিক সাধনা হত—সময় নিয়ন্ত্রণের সাধনা। অভিজিৎ প্রথমে এই তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু একবার নথিগুলো ভালো করে পর্যালোচনা করে যখন দেখলেন, হিমালয়ের কিছু ঘন জঙ্গলে অদ্ভুত সময়-বিকৃতি বা Time Distortion-এর কথা স্থানীয়রা গুজবের মতো বলছে—তখন তিনি পিছিয়ে আসতে পারলেন না। সঙ্গে ছিলেন বিক্রমজিত রায়—‘বিকু’, এক ইউটিউব ব্লগার ও অ্যাডভেঞ্চার ভিডিও নির্মাতা, যার হাসিখুশি চেহারার আড়ালে ছিল অন্বেষণের ভয়াবহ নেশা। আর শেষ ব্যক্তি ছিলেন অনুরাগ মিত্র, সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে পাঠানো একজন কর্মকর্তা, যিনি বেশি কথা বলতেন না। তিনি কেবল বলেছিলেন, “এই অঞ্চল অনেক পুরনো… এবং অনেক কিছু এখনও অজানা।”

তারা পাহাড়ি পথ ধরে এগোতে এগোতে বুঝতে পারল, এই অঞ্চল সাধারণ হিমালয় নয়। বাতাস ভারী, গাছগুলো অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ, যেন চারপাশের শব্দ গিলে নিচ্ছে। কেউ কেউ বলেছিল এই অঞ্চলে পাখিরা ডাকে না—এবং সত্যিই, তারা কোনও পাখির আওয়াজ পায়নি। বিকু অবশ্য বারবার ফোন বের করে দৃশ্য ধারণ করতে লাগল, গাছের গুঁড়িতে খোদাই করা প্রতীক, গুহার মুখে অর্ধেক গলা পাথরের মূর্তি—সবকিছু। কিন্তু একটি মুহূর্তে সে থেমে গেল। “দেখেছো?” সে বলল, “এই গাছটার ছায়া নেই…” বাকিরা ভেবেছিল ওর চোখের ভুল, কিন্তু কাছ গিয়ে সবাই থমকে গেল। দুপুরের রোদ সরাসরি গাছের উপর পড়ছে, অথচ নীচে কোনও ছায়া নেই। অভিজিৎ বলল, “হয়তো পাহাড়ি প্রতিফলনের কারণে…” কিন্তু বলার সময়ই তার নিজের গলার স্বর নিশ্চুপ হয়ে গেল। তারা তখনও জানত না—তারা এক এমন পরিসরে প্রবেশ করেছে, যেখানে সময় ও বাস্তবতার নিয়ম পুরোপুরি অন্যরকম। তারা রাতে পৌঁছল এক প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে, যেটি তপোবনের বাইরের অংশ বলে মনে হল। পাথরের খণ্ড, কাঠের খুঁটি, ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির, আর মাঝখানে এক পুরনো অগ্নিকুণ্ড। চারপাশে কিছু ছায়াময় গাছ, আর অদ্ভুত গন্ধ—পুরোনো ধূপের, পোড়া কাঠের, অথবা হয়তো কিছু মৃতের।

রাতের তাঁবু খাটানোর সময় ঋদ্ধিমা খেয়াল করল, তার ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে ঠিক ৩:১৭ AM-এ। সে ব্যাটারি বদলে দিল, ঘড়ি ফের চলতে শুরু করল, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার থেমে গেল সেই একই সময়। বিকু তখন ভিডিও ফুটেজ দেখতে গিয়ে চমকে উঠল—তাদের মধ্যে কেউ একজন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তখন সে সামনে ছিল না। সে বারবার পিছিয়ে দেখল ফুটেজটা—একজন দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাকে, মুখ ঘোমটা ঢাকা, ঠিক সেই গাছের পাশে যার ছায়া ছিল না। অনুরাগ শুধু বলল, “শুরু হয়ে গেছে।” তার গলায় কোনও বিস্ময় ছিল না, যেন এইসব সে আগেই দেখেছে, বা হয়তো অনুভব করেছে। অভিজিৎ তাঁবুর বাইরে এসে হেডল্যাম্প জ্বালিয়ে চারদিকে তাকাল। আকাশে তখন পূর্ণিমার চাঁদ, কিন্তু চাঁদের আলোয় চারপাশ কিছুটা ঘোলাটে দেখাচ্ছিল। হঠাৎ সে শুনতে পেল গাছের ফাঁকে ফাঁকে হালকা মন্ত্রোচ্চারণের মতো শব্দ—অতীতের কোনো এক সময়ের, কোনো এক তান্ত্রিক কণ্ঠে। তার সারা শরীর কেঁপে উঠল। তারা জানত না—এই ‘তপোবন’ জায়গাটি কোনও স্থানে নয়, এটি এক অভিশপ্ত সময়চক্রে বন্দি, যার ভিতরে প্রবেশ করলে আত্মা আর কখনও নিজের কালের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। বাইরে তখন নিস্তব্ধতা, কিন্তু সময়ের গহ্বর তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

পরদিন সকালের আলোয় যখন তাঁবুর দরজা খুলে সবাই বাইরে এল, তখন তারা যেন এক সম্পূর্ণ আলাদা জগতে পা রাখল। ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো ছড়ালেও তা কিছুতেই উষ্ণতা দিচ্ছিল না। আশপাশের গাছগাছালি আর পাহাড়ের ঢাল যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেও একেকবার ভিন্ন রকম দেখাচ্ছিল—যেন স্থানও আর স্থির নয়। বিকু সবকিছু রেকর্ড করতে ব্যস্ত ছিল, কিন্তু তার চোখে ছিল অস্বস্তি। সে বলল, “গতরাতের ওই ছায়ামূর্তিটার ফুটেজ আজ সকালে দেখতে গিয়ে গায়েব হয়ে গেছে। শুধু একটাই ফ্রেম রয়ে গেছে—একটা থমকে যাওয়া ছবি, যেটায় আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু আমাদের চোখ খালি, শূন্য।” অভিজিৎ ক্যামেরা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল, এবং তার নিজের চোখের ওপর বিশ্বাস হল না। তারা ওই মুহূর্তে ঠিক ওই স্থানে না থেকেও, সেই ছবি তুলেছে—যেটা এক অসম্ভব মুহূর্ত। ঋদ্ধিমা তখন সেই পুরনো অগ্নিকুণ্ডের পাশে হাঁটছিল। পাথরে খোদাই করা প্রতীকগুলোর দিকে তাকিয়ে সে চমকে গেল—এগুলোর অনেকগুলো একইরকম যেন সে কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে দেখেছে, কিন্তু সেগুলো ৯০০ বছরের পুরনো নিদর্শনের অংশ! তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, সে ফিসফিসিয়ে বলল, “এই জায়গাটা যেন নিজের সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।”

তারা আরও ভিতরে প্রবেশ করল—প্রাচীন তপোবনের কেন্দ্রে। গাছের পাতা এত ঘন, এত ছায়াময় যে মাঝদুপুরেও চারদিক যেন গোধূলির সময় মনে হয়। পথের দুইপাশে শুরু হল মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে থাকা পাথরের হাতের মতো গঠনের চিহ্ন, যেন কেউ বা কিছু জমিন থেকে উঠে আসার চেষ্টা করেছিল—অথবা আটকে পড়েছিল। অনুরাগ, যে এতক্ষণ নিঃশব্দে হাঁটছিল, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। সে বলল, “আমি এই জায়গাটা চিনি।” বাকিরা থমকে তাকাল। “আমি এগারো বছর আগে সরকারি গবেষণার কাজে এসেছিলাম এখানে। কিন্তু আমার মনে নেই আমি কখন ফিরে এসেছিলাম, বা কিভাবে…” তার চোখে তখন একধরনের শূন্যতা। বিকু তখন নিজের মোবাইল টর্চ জ্বালিয়ে একটা বড় গাছের গুঁড়ির দিকে দেখাল, সেখানে লেখা—”অঞ্জন, ১৯৮২”। কেউ হয়তো এখানে এসেছিল, অনেক আগেই, কিন্তু কেউ কোনও তথ্য রাখেনি। ততক্ষণে তারা বুঝতে পারছিল—এই তপোবনে বহু অভিযাত্রী এসেছিল, কিন্তু কেউ হয়তো সত্যিকারের অর্থে ফিরে যায়নি। চারপাশের বাতাসে এমন কিছু ছিল যা নিঃশব্দে তাদের ভেতরের সময়বোধকে চিবিয়ে ফেলছিল।

তারা পৌঁছাল এক বিশালাকৃতির কাঠের দরজার সামনে। এই দরজা এমনভাবে দাঁড়িয়ে, যেন এক মন্দির বা সাধনাগৃহের প্রবেশপথ ছিল কোনও এক কালে। দরজার উপর খোদাই করা ছিল বিশাল একটি সময়চক্র, তার চারপাশে শিবের মুখ ও শবদেহ, এবং নিচে খুদে অক্ষরে সংস্কৃত মন্ত্র—“কালং জয়তি তান্ত্রং”। ঋদ্ধিমা অনুবাদ করে বলল, “যে তান্ত্রিক কালকে জয় করে, সে জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে উঠে যায়।” হঠাৎ অভিজিৎ বুঝতে পারল—দরজার ওপাশ থেকে আসছে ধূপের গন্ধ। নতুন জ্বালানো ধূপ। এই দুর্গম, পরিত্যক্ত জায়গায় কেউ এখনও আছে? বিকু দরজার ফাঁকে ক্যামেরা ঢুকিয়ে একটি ফুটেজ রেকর্ড করল। যখন তারা তা দেখে, দেখা গেল—ভিতরে বসে আছেন একজন সন্ন্যাসী, তার চোখ বন্ধ, চারপাশে আগুনের আলো, আর সে মন্ত্রপাঠ করছে এমন এক ভাষায়, যা শোনা মাত্র গায়ে কাঁটা দিয়ে দেয়। সেই মুহূর্তে, তাদের পেছনের বাতাস কেঁপে উঠল, যেন সময়ের এক অদৃশ্য প্রবাহ তাদের ছুঁয়ে চলে গেল। চারজনের মধ্যেই হঠাৎ একসঙ্গে গা ছমছমে অনুভূতি জাগল, কেউ বলল না কিছু, কিন্তু সবাই বুঝে গেল—এই যাত্রা শুধু একটি অভিযান নয়, এটা তাদের অস্তিত্বের গভীরে ঢুকে পড়ার শুরু। তারা এখন শুধু তপোবনে প্রবেশ করেনি, তারা হয়তো সময়ের বাইরে পা রেখেছে।

দরজাটি আর অটল থাকল না। তাদের কেউ স্পর্শ না করলেও, কাঠের দরজার দুটি পাল্লা ধীরে ধীরে খোলা শুরু করল, যেন দীর্ঘশ্বাসের মতো ধীর গতিতে। শব্দ ছিল না, শুধু বাতাসের কাঁপুনি। ভিতরে প্রবেশ করতেই সময়ের ভার যেন ঘাড়ে চাপল। জায়গাটি একটা তান্ত্রিক সাধনাগৃহ—আধা অন্ধকার, কুয়াশার মতো ধোঁয়ায় ভরা, পাথরের মেঝেতে অগণিত ত্রিকোণ মণ্ডল আঁকা, কিছুটা রক্তমাখা মনে হয়, কিছুটা যেন পুরনো কাঠকয়লার ছাই। ঘরের এক কোণে বসে থাকা এক বৃদ্ধের দিকে আলো পড়ছিল না, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি অনুভব করা যাচ্ছিল প্রতিটি নিঃশ্বাসে। মাথা মুন্ডিত, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, চোখ বন্ধ, শরীরে শ্মশানের ছাই। যেন তিনি জীবিত নন—কিন্তু মৃতও নন। অভিজিৎ, ঋদ্ধিমা, বিকু ও অনুরাগ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, কে আগে কথা বলবে—তা কেউ ঠিক করতে পারছিল না। হঠাৎই বৃদ্ধ চোখ মেলে তাকাল, ধূসর চোখজোড়া যেন শূন্যের গভীরতা পেরিয়ে তাদের ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল। তিনি বললেন, “তোমরা এসেছ ঠিক সময়ে, কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময় বহু আগে পেরিয়ে গেছে।” স্বর শান্ত, অথচ তার শব্দে এক অমোঘ স্থিরতা।

ঋদ্ধিমা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে? এই তপোবনে আপনি থাকেন কিভাবে?” বৃদ্ধ হেসে বললেন, “আমি ছিলাম, আছি, এবং… হয়তো আর থাকব না। আমাকে ত্রিলোকানন্দ নামে কেউ ডাকে। তবে আমার প্রকৃত নাম হারিয়ে গেছে সেই কালের স্রোতে।” তাঁর চোখ স্থির, কিন্তু সেগুলো যেন অতীত ও ভবিষ্যৎ একসঙ্গে দেখতে পায়। তিনি বলেন, “এই তপোবন, এই মণ্ডল, এই শ্মশানবাতাস… সবই কালচক্রে বাঁধা। কেউ এখানে আসে নিজ ইচ্ছায়, কিন্তু ফিরে যায় সময়ের করুণায়।” তিনি জানান—এই স্থান একসময় ছিল একটি উচ্চতর তান্ত্রিক সাধনার কেন্দ্র, যেখানে সময়কে জয় করার প্রয়াস চলত। তিনি নিজেও ছিলেন একজন তান্ত্রিক, যিনি নিজ সাধনায় নিজের শরীরের বাইরেও অস্তিত্ব অনুভব করতেন। “কিন্তু,” তিনি থেমে বলেন, “একদিন ভুল হয়েছিল, সময়কে ধরতে গিয়ে আমি নিজেই আটকে গেছি। এখন আমার শরীর হয়তো এখানেই, কিন্তু আমার আত্মা ছড়িয়ে আছে শত শত বছরজুড়ে।” এই কথায় সবাই স্তব্ধ। বিকু ফিসফিস করে বলল, “আপনি কি আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন?” কিন্তু ত্রিলোকানন্দের উত্তর ছিল, “ভয় যদি ভবিষ্যতের ভেতর থেকে আসে, তবে সেটাকে দেখানো লাগে না, সে নিজেই আবির্ভূত হয়।”

বিকেলের আলো কমে আসছে, কিন্তু ঘরের ভিতরকার আলোর তারতম্য কিছুতেই বুঝে ওঠা যাচ্ছে না—যেন সূর্য এখানে কখনও ঠিকমতো ওঠে না, আবার নামে না। ত্রিলোকানন্দ তাঁদের হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাদের শরীর সময়ের সঙ্গে আছে, কিন্তু আত্মা? আত্মা এখন হাঁটছে সেই পথে, যেখানে মৃত্যু অনেকবার ঘটে, কিন্তু মনে থাকে না।” অনুরাগ তখন বসে পড়ে, কাঁপতে কাঁপতে বলে, “আমার মনে পড়ছে… আমি এখানে মরেছিলাম একবার…” বাকিরা চমকে তাকায়, অনুরাগের মুখ অন্ধকার, গলায় ঘাম জমেছে। ত্রিলোকানন্দ বলেন, “স্মৃতি ফিরে আসবে। যত গভীরে যাবে, তত স্পষ্ট হবে। তত ভয়ংকর হবে।” তখন একটি অদ্ভুত শব্দ হয় ঘরের ভিতর—একটা ঘণ্টার আওয়াজ, কিন্তু সেটা যেন সময়কে কেটে ফেলার মতো তীব্র। সবাই একসঙ্গে চমকে ওঠে। ত্রিলোকানন্দ উঠে দাঁড়ান, তাঁর চলন ধীর, কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হয় যেন তাঁর পা মাটিতে নেই, সময়ের স্তরের উপর হাঁটছেন। তিনি বলেন, “তোমরা থাকো, জাগো, দেখো—কিভাবে সময় তোমাদের গিলে নেয়, আর মুক্তির নাম করে ছিন্ন করে আত্মাকে। কালচক্র শুরু হয়েছে।” এই বলে তিনি অগ্নিকুণ্ডের সামনে বসে আবার মন্ত্রপাঠ শুরু করেন, এবং চারপাশের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে—প্রাচীন, পচা ধূপ, পোড়া শরীর আর ছায়ার গন্ধে। বাইরে তখন হিমালয় নিশ্চুপ, কিন্তু সময়ের নিচে তাদের পায়ের নিচের জমিন নড়ে ওঠে—তারা কেউই টের পায় না, কখন দিন শেষ হয়ে যায়, আর সময় এক অদৃশ্য পাতার মতো উলটে যায়।

রাত গভীর হতেই তপোবনের চারপাশ যেন আরেক স্তরে চলে গেল। পূর্ণিমার আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ে কেমন বিকৃত দেখাচ্ছিল—চাঁদের আলো যেন কখনও সাদা, কখনও নীল, আবার কখনও অন্ধকারের মতো কালো হয়ে আসছিল। বিকু রাতের ডকুমেন্টারি রেকর্ড করতে বের হয়, তার হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরা আর ইনফ্রারেড লাইট অন করা। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে হঠাৎ ফিরে আসে, মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। ক্যামেরা খুলে দেখায়—তাতে তারা নিজেদেরকেই দেখতে পায়, কিন্তু এক অদ্ভুত রূপে। বিকু ক্যামেরায় বলে উঠছে, “এই মুহূর্তে আমরা তপোবনের ভেতরে আছি, ২০২৫ সালের ১২ই অক্টোবর,” কিন্তু ভিডিওতে তার কণ্ঠ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না—বরং তার ঠোঁট নাড়ছে, কিন্তু কণ্ঠ বের হচ্ছে সংস্কৃত মন্ত্রের মতো শব্দে। এমনকি তার পোশাকটাও আলাদা—সে পরনে ধুতি আর কাঁধে চাদর, মুখে ছাই, চোখ লাল। অভিজিৎ ভিডিও দেখে বলে, “এটা তো বিকু নয়… এটা যেন ওর পুরনো জন্ম।” তারা স্তব্ধ হয়ে যায়, যখন ভিডিওতে এক জায়গায় দেখা যায়—ঋদ্ধিমা অগ্নিকুণ্ডে দাঁড়িয়ে হাত তুলে বলছে, “কালং জয়তি”—আর তার চারপাশে ছায়ার মতো দেহরা মাটিতে পড়ে আছে। কেউ কিছু বোঝার আগেই ভিডিও থেমে যায়, ক্যামেরার স্ক্রিন জ্বলে ওঠে, আর তারপর নিভে যায়। বিকু হাত কাঁপিয়ে বলে, “আমি তো ওইসব বলিনি… আমি তো জানিই না ওসব কবে বলেছি।”

ঘটনার পর সবাই যেন বোবা হয়ে যায়। বাইরে হিম বাতাস বাড়ছে, কিন্তু কারও গায়ে ঠান্ডা লাগছে না—বরং মনে হচ্ছে শরীরের ভিতরে গরম হয়ে যাচ্ছে, যেন রক্ত ছুটে বেড়াচ্ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। ঋদ্ধিমা তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার চমকে ওঠে—ঘড়ি আবার ৩:১৭ AM-এ আটকে। সে ঘড়ির কাঁচ খুলে ব্যাটারি খুলে আবার লাগায়, কিন্তু ঘড়ি সেই সময়েই স্থির থাকে। “সময় কি এখানে ঘোরপাক খাচ্ছে?” অভিজিৎ নিজেকেই প্রশ্ন করে, উত্তর কারও কাছে নেই। অনুরাগ তখন নিঃশব্দে তপোবনের বাইরে চলে যায়, আর ফিরে এসে বলে—“পাহাড়টা একইরকম দেখাচ্ছে, কিন্তু পথটা আর সেই পথে নেই। আমি চল্লিশ মিনিট হাঁটলাম, আবার এই একই জায়গায় এসে পড়লাম।” তার মানে তারা ঘুরে ফিরে এক অদৃশ্য বৃত্তে আটকে গেছে। চারদিকে যেন এক অভিশপ্ত চৌম্বক বলয় কাজ করছে, যা তাদের স্থান আর সময়—দুটোরই ভারসাম্য বিগড়িয়ে দিচ্ছে। সেই মুহূর্তে, মন্দিরের পাশের এক বড় পাথরের উপর হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে—কারও ছোঁয়া ছাড়াই। আগুনটা কয়েক সেকেন্ড জ্বলেই নিভে যায়, কিন্তু চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে পোড়া দেহের গন্ধ। ত্রিলোকানন্দ ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে বলেন, “তোমাদের আত্মা এখন শরীরের চেয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। এখন যা কিছু দেখছ, তা হয়তো ঘটেছে… হয়তো ঘটবে। সময় এখানে একরৈখিক নয়, এটা বৃত্তাকার। এবং সেই বৃত্তের কেন্দ্রেই তোমরা দাঁড়িয়ে আছ।”

ঋদ্ধিমা তখন বলে ওঠে, “আমার মনে পড়ছে… যেন আমি এখানেই আগে দাঁড়িয়েছিলাম… এই একই পোশাকে, এই একই জায়গায়…” অভিজিৎ তাকিয়ে দেখে, তার মুখে সত্যিই বিস্ময় নয়। সেই পুরনো অনুভূতি, যা হয়তো একাধিক জন্মে অনুভূত হয়েছে। বিকু দৌড়ে গিয়ে মন্দিরের দেয়ালে হাত রাখে—সেখানে তার নিজের নাম খোদাই করা: “বিক্রম, ১১১৪ খ্রিস্টাব্দ।” তার মুখ থমকে যায়, ঠোঁট শুকিয়ে আসে। “এটা কিভাবে সম্ভব?” সে ফিসফিস করে বলে। তখন ত্রিলোকানন্দ বলে ওঠেন, “সম্ভব—যদি তুমি আগে এসেছিলে। আবার এসেছ। সময় তোমায় ছেড়ে দেয় না যদি তুমি তাকে প্রশ্ন করো। এখন তোমরা চারজন চারটি সময়ের পথিক। আর এই তপোবন? এটা শুধু স্থান নয়—এটা এক সময়ের ফাঁদ। যেখানে কেউ এসেছিল, সে বারবার ফিরে আসে—অজান্তেই, জন্মান্তরে। এটাই কালচক্র।” সেই মুহূর্তে পাহাড় কেঁপে ওঠে হালকা, যেন সময় নিজেই নিশ্বাস নিচ্ছে। চারপাশে পাতার ফাঁক দিয়ে অদ্ভুত সব ছায়া দেখা যায়—কেউ বা কিছু গাছের মধ্যে থেকে তাকিয়ে আছে। কেউ কথা বলেনি, কিন্তু সকলেই বুঝে গিয়েছিল—তারা আর সময়ের ওপর নেই, সময় এখন তাদের ওপর হাঁটছে।

তুষারাবৃত সেই উপত্যকার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল প্রাচীন প্রস্তরখণ্ডটির ঠিক পেছনে এক অদ্ভুত শব্দে ঘুম ভাঙল সায়ন্তনের। ঘুম নয়, বলা চলে এক রকমের মোহ বা ঘোর থেকে সরে এল তার চেতনা। চুল পর্যন্ত ঠান্ডায় জমে গেছে, অথচ শরীর ঘামে ভিজে আছে। শুভ্ররাও জেগে উঠেছে, চোখেমুখে আতঙ্ক আর বিস্ময়। অর্ক মুখ চেপে ধরে আছে, যেন নিজেকে থামিয়ে রাখতে চাইছে কিছু বলতে। তাদের সামনে, সেই তপোবনের জঙ্গলের এক নির্জন খাদে, এক কুয়াশাচ্ছন্ন জায়গায় হঠাৎই যেন দেখা দিল এক প্রবেশপথ—কোনও মন্দিরের দরজা নয়, আবার গুহার মুখও নয়। যেন কোনও শক্তিশালী বৃত্তাকার বলয়, যার মধ্যে সময় আটকে পড়ে আছে। বলয়ের মাঝখানে মৃদু নীলাভ আলোর ঝিলিক, তাতে তারা দেখতে পেল এক কুয়াশার স্তম্ভ, যা কুন্ডলীর মতো পাক খেয়ে ঘুরছে। কেউ কিছু না বললেও, তারা সবাই টের পেল—এই দ্বার কোনও সাধারণ পথ নয়, বরং এক অদৃশ্য টানেল, যেটি হয়তো নিয়ে যেতে পারে অন্য কালের গভীরে। ঠিক সেই সময় দূর থেকে আবারও ভেসে এলো মন্ত্রোচ্চারণের আওয়াজ—ঘন, ভারি, যেন শত শত বছর ধরে কোনও এক তপস্বী বলে যাচ্ছে একই মন্ত্র।

এই শব্দে অর্ক নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না। সে এক পা এগিয়ে গেল সেই বলয়ের দিকে, যেন কিছু তাকে টানছে, ডাকছে। শুভ্র চিৎকার করে উঠল, “না অর্ক! থাম!” কিন্তু ততক্ষণে অর্ক বলয়ের ঠিক ধারে পৌঁছে গেছে। হঠাৎই তার পায়ের নিচে মাটি কেঁপে উঠল, ঝপ করে সে পড়ে গেল, আর বলয়ের ভিতর থেকে এক মেঘের মতো ধোঁয়া উঠে তার গায়ে এসে বসতে লাগল। অর্কের চোখ উলটে যেতে লাগল, সে কাঁপতে কাঁপতে চেঁচিয়ে উঠল, “আমি… আমি দুইটা সময় একসাথে দেখছি! আমি এখানেই আছি, আবার থাকিও না!” সায়ন্তন ও শুভ্র ছুটে গিয়ে তাকে টেনে বের করার চেষ্টা করল, কিন্তু যতটা টানছে, ততই অর্ক যেন আরও ভেতরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তে চারদিকের বাতাস হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল, আর কুয়াশার মধ্য থেকে ভেসে এল এক জীর্ণস্বরে উচ্চারণ—“যারা অতীতে পা রাখে, তারা ভবিষ্যৎ ভুলে যায়…” সেই সঙ্গে এক ধাক্কায় অর্ক যেন অদৃশ্য হয়ে গেল বলয়ের ভেতরে, আর দরজাটি এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল প্রকৃতির সঙ্গে, যেন কখনও ছিলই না।

নিস্তব্ধতার ভিতর দাঁড়িয়ে সায়ন্তন আর শুভ্রর মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল। তারা কেউ কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না। অর্ক উধাও। এমনভাবে হারিয়ে গেল, যেন তার অস্তিত্বটাই ছিল কল্পনার মতো। সায়ন্তনের মাথায় ঘুরতে থাকল একটাই কথা—এই তপোবন শুধুমাত্র কোনও সাধনার স্থান নয়, এটি এক টাইম-স্নেয়ার, এক কালের ফাঁদ। শুভ্র আচমকা উঠে দাঁড়াল, চোখেমুখে প্রবল সিদ্ধান্তের ছাপ। “অর্ককে ফিরে পেতেই হবে,” সে বলল, “আমাদের ভিতরে ঢুকতেই হবে।” কিন্তু কীভাবে? সেই অদৃশ্য দ্বার তো এখন নেই। ঠিক তখনই পেছন থেকে হঠাৎ একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “যারা সন্ধান করতে চায় সময়ের, তাদের প্রস্তুত থাকতে হয় নিজের আত্মা হারানোর জন্য।” পেছনে ঘুরে তারা দেখল—এক বুড়ো পাহাড়ি সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে, চোখদুটো আগুনের মতো লাল। মুখে ভয়ের ছাপ নেই, কিন্তু অভিজ্ঞতা যেন জমে আছে কুঁচকে যাওয়া চামড়ার প্রতিটি রেখায়। সন্ন্যাসী আবার বলল, “তোমরা ‘কালচক্র’ স্পর্শ করেছো… এবার শুধুই তোমাদের নয়, সময়ই বেছে নেবে কার বেঁচে থাকা প্রয়োজন, আর কে হারিয়ে যাবে অতীতের ফাঁদে।” তার কথা শেষ হতে না হতেই ঝড়ো বাতাস শুরু হল, আর আকাশ থেকে তুষারপাত নামল আরও ঘন হয়ে—যেন সেই দ্বার আবার খুলতে চলেছে, আবারও কিছু কেড়ে নিতে চলেছে সময়।

গহন অরণ্যের কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠেছে। আকাশে সূর্য আছে কি নেই, বোঝা যায় না—শুধু এক অদ্ভুত লালচে আভা চারিদিকে মাখা। শীর্ষ, অবনী, ঋদ্ধি ও তীর্থ যেন সময়চক্রের এক অদৃশ্য ধাঁধায় আটকে গেছে। কেউ কারো দিকে তাকায় না, শুধু হাঁটে—মাটি নরম, পাতার ওপর পা ফেলার শব্দ একরকম দূর থেকে ভেসে আসছে যেন। আচমকাই সামনে একটা ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তূপ দেখা দিল—পাথরে খোদাই করা প্রতিচ্ছবি, যজ্ঞকুণ্ডের কালো ছোপ, আর রক্তের মতো লাল রঙের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে প্রাচীন সিঁড়ির গায়ে। তীর্থ থেমে বলল, “এটা কি… তপোবনের অন্তঃপুর?” শীর্ষ ইতস্তত করে এগিয়ে গিয়ে খেয়াল করল, প্রাচীন লিপিতে কিছু খোদাই রয়েছে—যেখানে সময়কে “জাগ্রত দেবতা” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছে সময়, কিন্তু শরীর যেন আটকে আছে সেই এক জায়গায়।

ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে ছিল একটি চক্রাকার মঞ্চ, যার চারপাশে আটটি পোড়ামাটির মূর্তি—প্রতিটিই একটি ভিন্ন অবস্থার প্রতীক, যেগুলি সম্ভবত জন্ম, মৃত্যু, বিভ্রম, এবং পুনর্জন্মের। ঋদ্ধি গুটি গুটি পায়ে কাছে গিয়ে দেখল, মূর্তিগুলোর চোখে যেন আস্ত পৃথিবীর ইতিহাস ধরা—কিন্তু সেই চোখ দেখে তার নিজেকেই চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। একটা বিকট শব্দ হঠাৎ করেই বাতাস ছিন্ন করে এল—একটা ফাটলের মতো কিছু খুলে গেল মাটিতে, আর ভিতর থেকে শোনা গেল ছায়াময় গলার স্তব। অবনী বলল, “কেউ মন্ত্র পড়ছে… সময়কে জাগাতে?”—আর ঠিক তখনই অদ্ভুতভাবে মঞ্চের মাঝখানে আগুন জ্বলে উঠল। আগুনের ভেতর ভেসে উঠল এক অপরিচিত মুখ—চোখদুটো অস্পষ্ট, কিন্তু পরিচিত। “অভিশপ্ত যুগচক্র আবার চালু হচ্ছে… তোমরা ফিরে যেতে পারবে না,” সেই কণ্ঠ ঘোষণা করল। চার বন্ধু বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের প্রত্যেকের সামনে তখন জীবনের নিজস্ব পাপ ও ব্যর্থতা মূর্ত হয়ে ধরা পড়ছে, যেন এই জায়গায় এসে সময় শুধু গতি হারায় না, আত্মাকেও বিশ্লেষণ করে।

চক্র থেকে বেরোনোর চেষ্টা করতেই তাদের শরীর ভারী হয়ে আসে। তীর্থ হঠাৎ ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করে ওঠে—“আমরা তো চলছিলাম সামনের দিকে, এখন কেন সব উল্টো মনে হচ্ছে?” শীর্ষ বুঝতে পারে, তারা সময়ের স্রোতে পিছিয়ে চলেছে—তাদের আত্মা হয়তো এখন হাজার বছর আগের তপোবনের সেই কালসন্ধিক্ষণে আটকে আছে, যেখানে এক ব্রহ্মতান্ত্রিক তপস্বী ‘কালাচার্য’ তাঁর অভিশপ্ত যজ্ঞ শুরু করেছিলেন। তারা যদি এই চক্র থেকে বেরোতে না পারে, তাহলে শুধু ভবিষ্যৎ নয়, তাদের অস্তিত্বই মুছে যাবে কালের প্রাচীন গর্ভে। সেই মঞ্চের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে চার বন্ধু বুঝে যায়—এখন আর শুধু রহস্য নয়, এক অদৃশ্য লড়াই শুরু হয়েছে সময় ও আত্মার ভিতরে।

তপোবনের অন্ধকারে সেই রাতে হিমালয়ের নিঃশব্দতাকে যেন ভেঙে দিল এক আশ্চর্য গুঞ্জন। গুহার ভেতর প্রবেশ করার কিছু আগেই দীপ্ত ও কৌশিক লক্ষ্য করল, পথঘাট যেন নিজেই বদলে যাচ্ছে—একটা মোড় যেখান দিয়ে এক ঘণ্টা আগে গেছে, এখন সেটি আর নেই; জায়গাটা ভরে গেছে কুয়াশা ও অদ্ভুত সব লতা-গুল্মে। রাহুল তখন কেবলমাত্র কপালে হাত দিয়ে বসে—তার চোখের তারা যেন গায়েব! আরিয়া, দলটির একমাত্র মেয়ে সদস্য, প্রথমবার অনুভব করল তাদের কেউ একজন যেন আর তাদের দলে নেই—তাঁর শরীর হয়তো আছে, কিন্তু আত্মা চলে গেছে কোথাও। অবশেষে তারা পৌঁছল সেই গুহার সামনে—যেখানে সময় নাকি থেমে আছে। প্রবেশদ্বারটি একটানা ঢালে, ভিতরে কালো অন্ধকার, এবং গায়ে অদ্ভুত সব প্রতীক খোদাই করা—যা দেখে কৌশিকের মনে পড়ে গেল পুরনো সংস্কৃত মন্ত্রপাঠের দৃশ্য। তারা প্রত্যেকেই একে একে ভিতরে ঢুকল, শুধু দীপ্ত পেছনে দাঁড়িয়ে রইল একটু, কারণ তার ঘাড়ের পেছনে এক অদ্ভুত শীতল নিঃশ্বাস যেন অনুভব করছিল।

গুহার ভিতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই সময় যেন এক ঘূর্ণিতে আটকে গেল। ভিতরের দেয়াল থেকে ধীরে ধীরে আলোর রেখা বেরিয়ে এল—প্রাচীন আগুন, যা যুগ যুগ ধরে জ্বলে চলেছে এক আত্মাহীন শক্তির নির্দেশে। দীপ্তের ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে, রাহুল মুখ খুলছে না, আরিয়ার চুল বাতাসে যেন নিজে থেকে নড়ছে। হঠাৎ তাদের সামনে উদ্ভাসিত হল একটি ছায়াচিত্র—এক তান্ত্রিক, যার চোখ দুটি লালাভ, আর চারপাশে মন্ত্রমুগ্ধ লতা যেন সময়কে ঘিরে রেখেছে। তান্ত্রিক বললেন না কিছুই, কিন্তু তাদের মনের ভেতরে শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকল: “তোমরা এখন আর বর্তমানের নও। তোমাদের আত্মা আটকে আছে সেই সময় যেখানে আমি শেষ সাধনা করেছিলাম। মুক্তি চাও? তবে আত্মাকে ফিরিয়ে আনতে হবে এমন কিছু সঙ্গে করে যা এককালে তোমাদের ছিল, কিন্তু এখন হারিয়ে গেছে।” কথাগুলো শুনে দীপ্ত এক অদ্ভুত ব্যথা অনুভব করল বুকের ভিতর—তার শৈশবের এক টুকরো স্মৃতি যেন ভেসে উঠল, যা সে ভুলেই গিয়েছিল।

গুহার গভীরে ঢুকতেই তারা একটি বিশাল হলঘরের সামনে পৌঁছল, যেখানে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীন সময়ের সামগ্রী, মৃতদেহ, এবং কিছু আধা-বেঁচে থাকা লোক—যারা কিছু বলতে পারছে না, চোখ দিয়ে শুধু সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। একটি ঘড়ির কাঁটা সেখানে থেমে আছে—ঠিক ১১:১১ এ। কৌশিক বুঝল, সেটাই হয়তো সেই মুহূর্ত যখন সময় এখানে বন্ধ হয়ে গেছে। আরিয়া তখন খেয়াল করল, তার হাতের চুড়ি, যা সে মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিল, তার দিকে আলো ছুটে আসছে—সে নিজেও জানত না, সেই চুড়িতে রয়েছে এক অতীতের প্রবাহ। হঠাৎ সমস্ত গুহা যেন কেঁপে উঠল, দেয়ালের খাঁজ থেকে বেরিয়ে এল এক অজানা প্রাণী—সময়ে আটকে থাকা এক আত্মার আকৃতি, যার কাজ শুধু ঘড়ির কাঁটা পাহারা দেওয়া। দলটি দৌঁড়াতে শুরু করল, কিন্তু জানে, এই সময়ের ফাঁদ থেকে মুক্তি পাওয়া এত সহজ নয়। সেই মুহূর্তে দীপ্ত থেমে দাঁড়িয়ে পড়ল, কারণ গুহার প্রাচীন দেয়ালে খোদাই করা প্রতিচ্ছবির মধ্যে একটি তার নিজের মুখের অবিকল ছায়া! বাস্তব ও অতীত যেন একসাথে মিশে যেতে চাইছে—এই গুহা কেবল একটি স্থান নয়, এটি একটি প্রাচীন স্মৃতি-চক্র, যেখানে সময় নিজেই ভুলে গেছে, কে ভবিষ্যৎ আর কে অতীত।

বরফ গলা স্রোতের শব্দ, পাতার ফাঁকে ফাঁকে ভেসে আসা পাখির কণ্ঠ, আর দূরে কোথাও অজানা কোনো জীবের গা ছমছমে ডাক—এই তিনেই গাঁথা ছিল সেই সকাল। সমীর গাছের গুঁড়ির পাশেই বসে, হাতের তালুতে সূর্যের আলো ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। জোছনা রাতে তাদের দলটি যে হিমঘূর্ণির মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল, তা যেন শুধু শরীর নয়, চেতনারও একটা স্তর বদলে দিয়েছে। শ্বেতাংশুর চোখে চোখ পড়তেই সমীর হালকা করে বলল, “কাল রাতটা ছিল অস্বাভাবিক…আমরা যেন সময়ের ভিতর দিয়ে হেঁটে এসেছি।” শ্বেতাংশু কিছু বলল না, কেবলমাত্র একবার ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিল—হ্যাঁ, তিনিও ঠিক এই কথাটাই ভেবেছেন। যেদিকে তাঁরা তাকিয়ে ছিলেন, সেদিকেই ছিল সেই রহস্যময় গুহা, যার দরজায় লেখা ছিল—“তৃতীয় চক্রের শুরু এখানেই।” বেদম ঠান্ডায় হাত কাঁপলেও মেঘলা এগিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলেছিল দরজার সামনে ঝোলানো পচা কাপড়ের পর্দা। ভিতরে ঢুকতেই প্রথম চোখে পড়ে এক বিশাল সময়চক্রের ঘূর্ণন—যেন পাথরের চাকা ঘুরছে নিজের ইচ্ছায়, কাঁটার মতন কিছু নেই, তবু শব্দে বোঝা যাচ্ছিল, সেটি সময়কেই পরিমাপ করছে।

চক্রের ঘূর্ণনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক পুরুষ, গায়ে কেবলমাত্র হরিণচর্ম, মাথায় পিঞ্জরার মতন গেঁথে থাকা কঙ্কাল। তাঁর চোখদুটো ছিল অসম্ভব শুষ্ক, তবু তাতে ছিল এক আশ্চর্য নরম বেদনার ছায়া। “আমি সময়ের তৃতীয় প্রহর রক্ষক—ভৃগু তপস্বী,” তাঁর গলা যেন অতীত থেকে ভেসে আসা কোনো প্রতিধ্বনি। তিনি বললেন, “তোমরা যাঁরা এখন এখানে, তোমাদের আত্মা একশো বছর আগের কর্দম ছায়ায় আটকে। শরীর বর্তমানে থাকলেও মন আটকে আছে পূর্বজন্মের কোনো বন্ধনে।” কেউ কথা বলতে পারছিল না। ভৃগু তপস্বী ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে তাদের প্রত্যেককে এক একবার ছুঁয়ে গেলেন। প্রত্যেক স্পর্শে যেন তাদের চেতনা কেঁপে উঠল—সমীর দেখল সে শিশুকালে হারিয়ে যাওয়া বাবার মুখ, মেঘলা দেখল নিজের ভবিষ্যতের করুণ পরিণতি, আর শ্বেতাংশু দেখল এক গ্রন্থের পাতা—যার নাম ছিল “কালতন্ত্র বিহারী: চতুর্থ যুগের সন্ধিক্ষণ।” হঠাৎই এক অদৃশ্য শক্তি ভৃগুর পেছন থেকে চিৎকার করে উঠল, “তোমরা এখানে থাকলে সময় থমকে যাবে! ফিরে যাও, অথবা চিরতরে হারিয়ে যাবে!”

ভৃগু তাঁদের বললেন, “তৃতীয় চক্র মানেই আত্মা ও সময়ের মেলবন্ধন। তোমরা এই চক্র অতিক্রম করলে, পরবর্তী দরজায় পৌঁছাবে—যেখানে আত্মা একক নয়, যুগের স্মৃতিকে ধারণ করে।” গুহার ভিতরে যেন আলো ও ছায়ার খেলা শুরু হয়েছিল। সমীর অনুভব করল, তার শরীরের ভিতরে অন্য কারও অস্তিত্ব আছে, যে কথা বলছে, হাঁটছে, এমনকি কান্না করছে। শ্বেতাংশু দুলে উঠল, তার বুকের মধ্যে শব্দ করছে সেই একই ঘূর্ণায়মান চক্র। মেঘলা নিজেকে আবিষ্কার করল এক ধ্বংসপ্রায় রাজ্যের মহারাণী রূপে, যে তার অস্তিত্ব ভুলে গেছে। “তোমাদের আত্মা এখন পরীক্ষার মধ্যে,” ভৃগুর কণ্ঠে ভয় ও করুণা মিশে বলছিল, “যদি পারো নিজেকে চিনতে, তবে সময় তোমাদের মাফ করবে।” চারিদিক থেকে উঠে আসছিল পাথরগলা আওয়াজ—যেন পর্বত নিজেই জেগে উঠে বলছে, “চতুর্থ চক্রের পথে যাও, কিন্তু স্মরণ রেখো, প্রত্যেক কালচক্রে আত্মা একবার করে মরে।” শব্দের ঘূর্ণিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ল অভিযাত্রী দল, আর শুরু হল সেই ভয়ঙ্কর উত্তরণের খেলা—যেখানে শুধু টিকে থাকার প্রশ্ন নয়, বরং সময়ের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করার দায়ও রয়েছে তাদের কাঁধে।

তপোবনের মাটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি শ্বাসে, প্রতিটি পা ফেলায় অনুভব হচ্ছিল সময়ের ঘূর্ণিবলয় তাদের চারপাশে দুলছে। অনির্বাণ, মীরা, অভীক, রিজওয়ান ও ললিতা এখন আর শুধু অভিযাত্রী ছিলেন না—তারা হয়ে উঠেছে সময়ের পরীক্ষার একেকটি অংশ। ভোররাতে মীরা হঠাৎ জেগে উঠে দেখে, চারদিকে ঘন কুয়াশা। হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাসে তার গায়ে কাঁপুনি ধরলেও সে বোঝে, এই কুয়াশা প্রকৃতির নয়—এ যেন কোনো প্রাচীন অভিশপ্ত নিঃশ্বাস। একটু দূরেই একটি ছায়া দেখা যায়—গায়ে চাদর মোড়া, দীর্ঘ কেশধারী এক বৃদ্ধ তান্ত্রিক। মীরা কাঁপা গলায় চিৎকার করতে চাইলেও মুখ দিয়ে শব্দ বেরোয় না। শুধু ঠোঁট কাঁপে—কিন্তু শরীর যেন পাথরের মতো স্থির। তান্ত্রিক ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে, চোখ দুটি যেন দুটো জ্বলন্ত প্রদীপ—যার ভিতর সময়ের অতল গভীরতা লুকিয়ে। “তুমি কে?” মীরার চোখে চোখ রেখে সে ফিসফিস করে বলে, “তুমি এখন নেই, তুমি তখনও ছিলে না… তপোবনের সময় তুমি গিলে ফেলেছ।”

সকালে অন্যরা যখন জেগে উঠে, দেখে মীরা যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশ বছর বুড়ি হয়ে গেছে। অভীক দৌড়ে এসে তার হাত ধরতেই বুঝতে পারে—তার শিরায় শিরায় অতীতের কোনো দুর্বোধ্য সময় সঞ্চারিত হয়েছে। রিজওয়ান বারবার বলছে, “এই অভিশাপ আমাদের কেউ খুলতে পারবে না।” ললিতা তার নোটবুকে একটা প্রাচীন মানচিত্রের নকশা বের করে দেখায়—যেখানে ‘কালগুহা’ নামে একটি স্থান চিহ্নিত আছে। অনির্বাণ তখনই সিদ্ধান্ত নেয়—তাদের শেষ গন্তব্য এই কালগুহা, যেখানে সময়ের উৎস গোপন। তারা বুঝতে পারে, এই গুহার প্রবেশপথ শুধু রাতের নির্দিষ্ট এক মুহূর্তেই খোলে, যখন সময়ের স্রোত স্থির হয়ে পড়ে। বিকেলের দিকে তপোবনের এক কোণে হঠাৎ দেখা মেলে শতবর্ষপ্রাচীন এক সন্ন্যাসীর, যিনি বলে দেন, “তোমরা যদি সত্যিই সময় থেকে মুক্তি চাও, তবে আত্মার ভার ত্যাগ করতে হবে—শরীর নয়।” এই কথা শোনার পর ললিতার মুখ রক্তশূন্য হয়ে পড়ে—সে কি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত?

রাত বাড়তেই আবার শুরু হয় অদ্ভুত সব শব্দ—পাহাড়ি বাতাসে ভেসে আসে অদৃশ্য মানুষের কান্না, হাসি, আর ধ্বংসের ধ্বনি। দলটি একসাথে যাত্রা শুরু করে ‘কালগুহা’র দিকে, যেখানে কুয়াশা এতটাই ঘন যে নিজেদের হাতও দেখা যায় না। পথের মধ্যে প্রতিটি সদস্য নিজের অতীত জীবনের কোনো না কোনো সময়ের মুখোমুখি হয়। রিজওয়ান দেখতে পায়, তার বাবা, যে বহু বছর আগে পাহাড়ে হারিয়ে গিয়েছিল, তার হাত ধরে বলছে—”ফিরে আয়, তোর সময় এখানেই থেমে আছে।” অনির্বাণ দেখে, তার মৃত ভাই তপোবনের কোনে দাঁড়িয়ে বলছে—”ভুল সময় বেছে নিয়েছিস দাদা, এই সময় তোমার নয়।” কিন্তু অভীক সবার সামনে এসে বলে, “এই গুহা হয়তো সময়ের শেষ নয়, বরং শুরু।” তখন সবাই একে একে কালগুহার মুখে এসে দাঁড়ায়—আর অন্ধকারের গভীরে নেমে যায়। আর ঠিক তখনই, সময় থমকে দাঁড়ায়।

তপোবনের সেই প্রাচীন প্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার পর, আকাশজুড়ে যেন অদ্ভুত এক অন্ধকার নেমে এসেছিল। সূর্যের আলো মিলিয়ে গিয়েছিল একেবারে। নীলা, ঈশান, গৌরব, রজত এবং সায়ন্তন—পাঁচজন অভিযাত্রী দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল প্রস্তরমণ্ডপের সামনে, যার ওপরে খোদাই করা ছিল অসংখ্য তান্ত্রিক চিহ্ন, যা স্বয়ং ঈশানও চিনতে পারল না। মন্দিরের গভীর গর্ভগৃহ থেকে ভেসে আসছিল শীতল বাতাসের মতো কাঁপন ধরানো এক মন্ত্রোচ্চারণ—সেই একই ধ্বনি যা তারা শুনেছিল প্রথম রাতে। কিন্তু এবার শব্দগুলো যেন আরও প্রবল, আরও জীবন্ত। তাদের চারপাশে বাতাস থমকে ছিল, গাছপালা কেঁপে উঠছিল মন্ত্রের ছন্দে, এবং এক অনির্বচনীয় ভয়ে সবার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আচমকা শোনা গেল সেই চেনা কণ্ঠস্বর—‘কাল নির্ধারণ হয়েছে, ফিরে যাওয়া নিষেধ।’ সবাই বুঝে গেল, এটি সেই তপস্বী, যিনি হাজার বছরের পুরনো তপস্যায় আজও বেঁচে রয়েছেন। কিন্তু তার অস্তিত্ব কি বাস্তব, না কি সময়ের বিকৃত ছায়া?

রজতের শরীর যেন হঠাৎই অবশ হয়ে এল। সে দৃষ্টিহীনভাবে এগিয়ে গেল মন্দিরের ভিতর দিকে। তার চোখজোড়া তখন নিস্তেজ, যেন অন্য কেউ তার ভেতর বাস করছে। ঈশান বুঝল, রজত ‘কাল-সঞ্চার’-এর আওতায় চলে গিয়েছে। নীলা চিৎকার করে তাকে ধরে রাখতে গেল, কিন্তু বাতাসের ধাক্কায় সে ছিটকে পড়ল পেছনে। গৌরব তখন নিজের হাতে থাকা পাণ্ডুলিপিটি খুলে পড়তে লাগল—সেই গ্রন্থ যা তারা পেয়েছিল এক পরিত্যক্ত গুহায়, যেখানে ‘কালতন্ত্র’ ও ‘অভিশপ্ত আত্মা’র বিবরণ ছিল। হঠাৎই গ্রন্থ থেকে বেরিয়ে এল এক দৃষ্টিনন্দন আলো, এবং সেই আলো রজতের শরীর ঘিরে ফেলে এক পর্দার মতো। রজতের মুখ থেকে তখন বেরোতে লাগল শত শত বছরের পুরোনো সংলাপ—তপস্বীর কণ্ঠে। সবাই স্থির হয়ে শুনল: ‘কাল বন্দী নয়, তবে কালকেই বন্দী করতে পারে যে, সে অমর।’ এই অদ্ভুত সময়ভ্রমণের মধ্যে, সায়ন্তন এক মুহূর্তের জন্য দেখতে পেল নিজেরই কিশোররূপ, যে দাঁড়িয়ে ছিল সেই মন্দিরের দোরগোড়ায়। সেই কিশোর তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, ‘আমরা সবাই ফিরে আসি, এক সময়ে, এক রূপে, এক গহ্বরে।’ অতীত ও বর্তমানের সীমানা যেন এক মুহূর্তে গলে গেল।

তাদের বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল তপস্বীর অভিশাপ রদ করা—যা তারা জানত শুধুমাত্র ‘তপোবনের মধ্য-সূর্য’-এর নিচে নির্ধারিত ঘন্টার মধ্যে সম্ভব। গৌরব, নীলা, এবং ঈশান ঝুঁকি নিয়ে তপোবনের কেন্দ্রে পৌঁছাল, যেখানে সূর্যরশ্মি ধরা দিচ্ছিল একমাত্র পাথরের লেন্সের মতো গঠিত স্তম্ভে। তারা সেখানে বসিয়ে দিল সেই পাণ্ডুলিপির ‘কালচক্র মুদ্রা’, এবং সঠিক সময়ে সেই মন্ত্র পাঠ শুরু করল। আশ্চর্য এক গর্জনে, তপোবনের আকাশ ফেটে গেল, রজতের শরীর কেঁপে উঠে মাটিতে পড়ে গেল নিস্তেজ। তপস্বীর ছায়া এক মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমান হয়ে মিলিয়ে গেল বাতাসে। ঘোর কাটার পর অভিযাত্রীরা আবিষ্কার করল, তারা একটি ফাঁকা মন্দিরে দাঁড়িয়ে—কোনও তান্ত্রিক নেই, নেই অতিপ্রাকৃত কিছু। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই জানত, তারা সময়ের এক গোপন দরজা খুলে ফেলেছে—যা এখন আবার কখনও খুলতে পারে। আর তাদের মধ্যে সায়ন্তন চুপ করে নিজের হাতের তালুতে খুঁজে পেল একটি চিহ্ন—তপস্বীর চিহ্ন। এক নতুন অভিশাপের শুরু কী তবে সেখান থেকেই হল?

সমাপ্ত

 

1000044248.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *