সৌরভ দাশগুপ্ত
১
রাত প্রায় দুটো। শহরের সমস্ত আলো নিভে গেছে, কেবল একফালি জ্যোৎস্না জানালার ফাঁক গলে বিছানার চাদরে পড়ে রয়েছে। দেবার্ঘ্য ঘুমিয়ে পড়েছে কিছুক্ষণের মধ্যেই, যেমন প্রতিদিন করে। তবে তার ঘুম কখনোই নিস্তরঙ্গ নয়, বরং এক অসমাপ্ত স্বপ্নের উপকূলে ভেসে চলে সে। আজ রাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দেবার্ঘ্য নিজেকে দেখল এক বিস্ময়কর ধূসর উপত্যকায় দাঁড়িয়ে—চারপাশে ঘন কুয়াশা, আকাশে মেঘ ভেসে যাচ্ছে চাঁদের আলো ঢেকে। এমন সময়ে কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল এক মেয়ে। তার সাদা পোশাকে যেন জ্যোৎস্না মিশে আছে, পায়ে নেই জুতো, আর সে হাঁটে এমনভাবে যেন বাতাসে ভাসছে। দেবার্ঘ্য দেখল তার চোখ, যার গভীরতা নদীর মত, আর গলায় যেন গোপন কোনো কবিতার ছন্দ লুকানো। মেয়েটি কথা বলে না, কিন্তু তার উপস্থিতি কবিতার মতোই—শব্দহীন অথচ উচ্চারিত, অচেনা অথচ আপন।
পরদিন সকালে দেবার্ঘ্য ঘুম থেকে উঠে কবিতার খাতা খুলে বসে। সে জানে, যা দেখেছে তা হয়তো কেবল এক স্বপ্ন, কিন্তু সেই স্বপ্ন তাকে এতটা টানে, এতটা গভীরে নিয়ে যায়, যেন বাস্তবের চেয়েও বেশি জীবন্ত। সে লিখে—”তুমি চাঁদের আলোয় হাঁটো, অথচ পা ছোঁয় না মাটি। তোমার কণ্ঠে কবিতা, অথচ শব্দ আমার কাছে পৌঁছায় না। তুমি কে?” প্রতিটি পঙক্তির ফাঁকে ফাঁকে তার চোখে ভেসে ওঠে সেই মেয়েটির মুখ। দুপুর নাগাদ দেবার্ঘ্য যখন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ক্লাস নিতে যায়, তখনো মাথায় ঘোরে স্বপ্নের দৃশ্য। ছাত্রছাত্রীদের অনেকে তার কবিতার ভক্ত—কিন্তু তারা কেউ জানে না, সেই কবিতাগুলো আসলে এক রহস্যময় স্বপ্নজগতের ছায়াপথ ধরে লেখা। ক্লাস শেষে অরিত্রা এসে পড়ে—তার বন্ধু ও মনোবিজ্ঞানী, যার কাছে দেবার্ঘ্য মাঝে মাঝে নিজের এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলে। আজ অরিত্রার মুখে চিন্তার ছায়া। সে বলল, “তুই আবার স্বপ্নে ওকে দেখলি?” দেবার্ঘ্য মাথা নাড়ল, কিন্তু চোখের ভিতরে তখনো জ্যোৎস্নার প্রতিচ্ছবি। অরিত্রা ভ্রু কুঁচকে বলে, “তুই জানিস না, অবচেতনে একই ফিগার বারবার আসা মানেই কিছু অতীত চাপা পড়ে আছে। হয়তো এই ঐশী নামটাই তোর মনের সৃষ্টি।” কিন্তু দেবার্ঘ্য জানে, সে নাম কখনো উচ্চারণ করেনি, তারপরও অরিত্রার মুখে সেই নাম শুনে সে চমকে ওঠে। ঐশী—তবে কি এ নাম আগে কোনোভাবে উচ্চারিত হয়েছিল?
রাত যত গভীর হয়, ততই দেবার্ঘ্যের মনে ছায়া নামে। সে জানে না কেন, কিন্তু সে মেয়েটিকে খুঁজে পেতে চায়। তার মুখ মনে পড়ে গেলে বুকের ভেতর কেমন হু হু করে ওঠে, যেমন কেউ একজন দূরে দাঁড়িয়ে ডাকে কিন্তু পৌঁছাতে দেয় না। সে আবার ঘুমায়, আবার ফিরে যায় সেই স্বপ্নে। এবার মেয়েটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে—“তুমি জানো না আমি কে, কিন্তু তুমি আমাকে খুঁজে পাবে। আমি আছি—তোমার শব্দে, তোমার নিঃশ্বাসে, তোমার কবিতার ফাঁকে।” দেবার্ঘ্য চমকে ওঠে, কারণ এই প্রথম সে তার কণ্ঠস্বর শুনল। জ্যোৎস্নার মত কোমল, তবু ভয়াবহ এক বিষণ্নতা মিশে আছে তার কণ্ঠে। সে বলে—“আমায় ভুলে যেয়ো না।” জেগে উঠে সে অনুভব করে বিছানায় যেন সত্যিই ঠান্ডা বাতাস লেগে আছে, জানালার কাঁচে ভিজে আছে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ—চাঁদের গন্ধ, যা আগে কোনোদিন পায়নি। সে জানে, কিছু একটা ঘটছে—এই স্বপ্নগুলো এখন আর কল্পনা নয়, বরং বাস্তবের মধ্যেই ঢুকে পড়ছে এক অলৌকিক পরত হয়ে।
পরদিন, দেবার্ঘ্য সিদ্ধান্ত নেয়—সে খুঁজবে মেয়েটিকে। বাস্তবে, জেগে উঠে, শহরের অলিগলি ঘুরে, পুরনো লাইব্রেরি ঘেটে, পুরনো কবিতার বই পড়তে পড়তে সে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, ঐশী কে? তার অস্তিত্ব কি একেবারেই কল্পনা, নাকি এই শহরের কোনো ভুলে যাওয়া ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা এক অসমাপ্ত প্রেমের প্রতিচ্ছবি? সেই সন্ধ্যায়, সে চলে যায় কলেজ স্ট্রিটের এক পুরনো বইয়ের দোকানে। সেখানে দেখা হয় শ্রীময়ী নামের এক লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে, যিনি পুরনো কবিদের পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষণা করেন। দেবার্ঘ্য তার কবিতার খাতা খুলে দেখায়, আর শ্রীময়ী চমকে ওঠে। “এই কবিতার ছন্দ… খুব চেনা লাগছে। জানো, একশো বছর আগে এমনই এক কবি ছিলেন, যিনি লিখতেন এক মেয়ের কথা—যার নাম ছিল ঐশী। তিনি লিখেছিলেন, ‘ঐশী চাঁদের আলোয় ভেসে আসে, আর আমি তার ছায়া ছুঁয়ে কবিতা লিখি।’” দেবার্ঘ্য অবাক হয়ে যায়। তাহলে কি ঐশী আগে থেকেই ছিল? তবে কি সে নতুন নয়—বরং এক পুরনো, পুনরাবৃত্ত চক্রের অংশ? স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের দূরত্ব ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে, আর দেবার্ঘ্য বুঝতে পারে—সে এক অদ্ভুত পথচলায় পা দিয়েছে, যেখান থেকে ফেরা হয়তো আর সম্ভব নয়।
২
দেবার্ঘ্য যতটা ভাবেনি, তার চেয়েও বেশি ছায়া ঘিরে ধরতে শুরু করল তাকে। শ্রীময়ীর দেওয়া সেই পুরনো কবির নাম ছিল হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর লেখা আজ আর ছাপা হয় না, যাঁর জীবনের শেষের দিনগুলো ঢাকা পড়েছিল ইতিহাসের ধুলোয়। কিন্তু তাঁর কবিতার খাতায় একটি নির্দিষ্ট চরিত্র বারবার ফিরে আসে—ঐশী। সেই নাম, সেই মেয়েটি, যার চেহারার বর্ণনা হুবহু মিলে যায় দেবার্ঘ্যের স্বপ্নে দেখা মেয়েটির সঙ্গে। দেবার্ঘ্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সে বইগুলো উল্টে-পাল্টে দেখে। পাতাগুলোর ঘ্রাণে যেন জ্যোৎস্নার গন্ধ মিশে আছে। আর তার ভিতর থেকে উঠে আসে পুরনো কাব্যছন্দ—“সে চাঁদের রেশম গায়ে মেখে আসে, তার চুলে রাতের শঙ্খ বাজে, আমি তাকে দেখি… কিন্তু ছুঁতে পারি না।” দেবার্ঘ্য শিউরে ওঠে। এতটা মিল কেবল কাকতালীয় হতে পারে না। তার কবিতা, তার স্বপ্ন, তার দেখা মেয়েটি—সব যেন কেউ আগে থেকেই লিখে রেখে গেছে, এবং সে আজ শুধু সেই লেখা খুঁজে ফিরছে, গুটিকয় পংক্তির ভেতর দিয়ে এক অতীতের জীবন স্পর্শ করছে।
ফিরে এসে সে চেষ্টা করে নিজের মনকে স্থির রাখতে, কিন্তু সম্ভব হয় না। সে হাঁটে শহরের ভিড়ের মধ্যে, ট্রামের ঝংকারে, চায়ের দোকানের কোলাহলে—তবু যেন কোথাও এক অদৃশ্য হাত তাকে টেনে নিচ্ছে। ঐশীর অস্তিত্ব যেন এক তীব্র সত্ত্বা হয়ে উঠেছে তার চারপাশে। দুপুরে সে একা চলে যায় দক্ষিণ শহরের এক প্রাচীন পোড়োবাড়ির দিকে, যেখানে নাকি একসময় হরিদাসবাবুর বাস ছিল। বাড়িটা এখন ধ্বংসপ্রায়, দেওয়ালে শ্যাওলা, জানালায় ধুলো। কিন্তু বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই দেবার্ঘ্যর মনে হয়—কেউ জানালার আড়ালে তাকিয়ে আছে। সে পাথরের বেদীতে বসে পড়ে, ছুঁয়ে দেখে সেই ঘরের ইট। হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসে এক মিষ্টি গন্ধ, যেন রাত্রির শিউলি আর কিছুটা… চাঁদের গন্ধ! পেছনে ফিরে দেখলে কাউকে দেখতে পায় না, কিন্তু কানে বাজে এক কান্নার মতো শ্বাস, যেন বাতাসে কেউ চাপা ব্যথায় ডুবছে। হঠাৎ করেই চারপাশ ঘোলা হয়ে আসে, আর বাড়ির মধ্যে থেকে যেন ভেসে আসে পায়ের শব্দ—নরম, ছন্দময়, আর সেই পরিচিত সাদা পোশাকের ঝলক।
তখনই ফোন বেজে ওঠে—অরিত্রা। সে বিরক্তভাবে বলে, “তুই আবার কোথায়? আমি তোকে নিয়ে চিন্তায় আছি, এসব বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।” দেবার্ঘ্য ধীরে বলে, “ও আছে, অরিত্রা। ঐশী আছে। আমি তার ছায়া দেখতে পাচ্ছি, তার গন্ধ আমি অনুভব করছি। আমি শুধু তাকে খুঁজে বের করতে চাই।” অরিত্রা বিরক্ত হলেও এবার একটু থেমে যায়। সে বোঝে, দেবার্ঘ্য এই অনুভব থেকে নিজেকে আর ছিন্ন করতে পারবে না। সে প্রস্তাব দেয়, “চল, আমি তোর সঙ্গে একবার দেখা করি। তোকে নিয়ে একজন চেনা গবেষকের সঙ্গে আলাপ করাব, সে পুরনো ইতিহাস আর লোকগাথা নিয়ে কাজ করে।” দেবার্ঘ্য রাজি হয়, কিন্তু তার চোখ এখনো বসে থাকা পোড়োবাড়িটার দিকে, যেন কিছু রেখে এল সেখানেই—এক কবিতা, অথবা এক হৃদয়।
সেদিন রাতে ঘুম আসে না। দেবার্ঘ্যর চোখে বারবার ভেসে আসে ঐশীর মুখ, তার নীরবতা, আর সেই অদ্ভুত আকুলতা। সে ভাবে, কেউ যদি সত্যিই বারবার ফিরে আসে—স্বপ্নের পথ ধরে, সময় অতিক্রম করে, কবিতার ছায়া হয়ে—তবে কি সে শুধু এক কল্পনা? নাকি এই জগতে এমন কিছু সত্য আছে, যাকে বিজ্ঞান এখনও ছুঁতে পারেনি? জানালার বাইরে জ্যোৎস্না পড়ে আছে নিঃশব্দে। হঠাৎ এক ফাঁকে সে জানালায় এক ঝলক সাদা আলোর মতো দেখতে পায়—এক চুলের ঢেউ, এক চোখের ছায়া, আর তারপর নিস্তব্ধতা। হয়তো কল্পনা, হয়তো না। কিন্তু তার মনে হয়, ঐশী এখন ঠিক পাশেই আছে—শুধু সে এখনো জানে না, কীভাবে ছুঁতে হয় চাঁদের গন্ধ।
৩
পরদিন সকালেই দেবার্ঘ্য অরিত্রার সঙ্গে দেখা করে। কলেজ স্ট্রিটের এক পুরনো কাঠের কফি হাউসে তারা বসে—এক কোণায়, যেখানে শব্দেরা ধীরে পড়ে, আর আলো আসে জানালার ফাঁক গলে। অরিত্রা এবার আগের চেয়ে অনেকটা শান্ত। দেবার্ঘ্যের চোখে যে গভীরতা, যে অস্থিরতা, তা উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। সে বলে, “তুই যাকে স্বপ্নে দেখছিস, হয়তো সে কোনো অদ্ভুত ট্রিগার পয়েন্ট, হয়তো অবচেতনের কোনো চাপা স্মৃতি।” দেবার্ঘ্য শুধু মাথা নাড়ে। “না, ও বাস্তব। আমার শব্দে, আমার ঘ্রাণে, আমার কবিতার ছায়ায় সে আছেই। আমি ওকে সত্যিই অনুভব করতে পারি।” অরিত্রা এবার একটু চুপ করে থাকে, তারপর বলে, “আমি তোর জন্য একজনকে চিনে রেখেছি—তরুণ মিত্র। সে লোকগাথা, প্রাচীন ইতিহাস আর অননুমোদিত নথি নিয়ে কাজ করে। হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সে আমার মুখে শোনার পরই কৌতূহলী হয়ে উঠেছে।” দেবার্ঘ্য সম্মতি দেয়, আর তারা ঠিক করে পরদিন সন্ধ্যায় তার সঙ্গে দেখা করবে।
তরুণ মিত্র থাকেন উত্তর কলকাতার এক পুরনো বাড়িতে, সাদা চুনে মোড়া, কাঠের বারান্দা আর ছাদের নিচে হ্যাজাক বাতি টাঙানো—যেখানে সময় যেন আটকে আছে। তিনি দীর্ঘদেহী, রুক্ষ গলা, আর চোখে ক্লান্ত বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি। দেবার্ঘ্য যখন হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা ও ঐশীর স্বপ্নের কথা বলে, তখন তরুণ চুপচাপ শোনেন, তারপরে এক পুরনো রেজিস্টার খুঁজে বের করেন। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলেন, “এই নামটা আমি পেয়েছিলাম কিছু মৌখিক ইতিহাসে—ঐশী বিশ্বাস। ১৮৯১ সালে জন্ম, ১৯১৭ সালে হঠাৎ উধাও। সে ছিল এক নবযৌবনা, যাকে হরিদাসবাবু নাকি কবিতা পড়াতেন—আর ভালোবেসে ফেলেছিলেন। কিন্তু ঐশী হঠাৎ একদিন চাঁদের রাতে নিখোঁজ হয়ে যায়। কেউ বলে আত্মহত্যা, কেউ বলে—সে চাঁদের আলোয় হারিয়ে গিয়েছিল, কোনো প্রেতলোক বা অন্য জগতে।” দেবার্ঘ্যের গলা শুকিয়ে আসে। “তারপর?” তরুণ বলেন, “হরিদাস লিখেছিলেন, ‘সে ফিরে আসবে, কোনো কবির স্বপ্নে, কোনো অচেনা পঙক্তিতে।’” অরিত্রা এবার মাথা ঘুরিয়ে চায়, আর দেবার্ঘ্য অনুভব করে, যেন সেই ভবিষ্যদ্বাণী তার মধ্যেই পূরণ হচ্ছে।
রাতের দিকে বাড়ি ফিরে দেবার্ঘ্য নিজের কবিতার খাতা খুলে বসে। একের পর এক পঙক্তি সে লিখে চলে, যেন কেউ ভিতর থেকে বলে দিচ্ছে তাকে। তার কলম চলতেই থাকে—“তুমি চাঁদের বুক থেকে হাঁটলে, আর আমি ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। তুমি চলে গেলে, কিন্তু তোমার গন্ধ থেকে গেলো আমার নিঃশ্বাসে।” হঠাৎ তার খেয়াল হয়, খাতার পাতায় জল পড়েছে। সে ভেবেছিল ঘামের ফোঁটা, কিন্তু তা নয়—পাতা সাদা, তবু সেখানে ভিজে দাগ। সে চোখ মেলে দেখে, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়ে। স্পষ্ট নয়, ঝাপসা আলোয় তার রূপরেখা তৈরি—সাদা পোশাক, চুল এলোমেলো, চোখে এক অপরূপ ব্যথা। আর এবার সে প্রথমবার বলে ওঠে—“আমার নাম ঐশী।” দেবার্ঘ্য স্তব্ধ। শব্দ হারিয়ে ফেলে। মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, আর তার ঠোঁট কাঁপে, “তুমি তো খুঁজছো আমায়। কিন্তু জানো কি, তুমি নিজেও এক কবিতা, যাকে আমি স্বপ্নে পড়ি?”
এক মুহূর্তের ভেতর সব বদলে যায়। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, যেন শব্দের ভারে। ঘরের ঘড়ি থেমে থাকে। আর দেবার্ঘ্য বুঝে যায়—সেই মেয়েটি, যাকে এতদিন ধরে সে খুঁজছিল, সে এসে গেছে। বাস্তবে। অথবা স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে। ঐশীর চোখে কুয়াশা, আর কণ্ঠে পঁচিশটি কবিতার অনুরণন। সে আসে, আবার হারিয়ে যায়। শুধু জানালায় থেকে যায় জ্যোৎস্নার আভা। আর দেবার্ঘ্যের কলম লিখে চলে—এক নামহীন কবিতা, যেটা এবার শুরু হয়েছে, কিন্তু শেষ কবে হবে—সে জানে না।
৪
পরদিন সকালটা যেন এক ধূসর বিস্ময়ের জাল। দেবার্ঘ্য ঘুম ভেঙে খেয়াল করে, কবিতার খাতাটা তার বুকে খোলা অবস্থায় পড়ে আছে, কিন্তু গতরাতের লেখা পঙক্তিগুলো মনে করতে পারছে না। শুধু একটাই বাক্য বারবার চোখে পড়ে—“তুমি ফিরে আসবে, প্রতিধ্বনির মতো।” সে জানে, ঐশী এসেছিল। আর প্রথমবার, সে বলেছে নিজের নাম। কিন্তু এ কি নিছকই স্বপ্ন? না কি সত্যিই সে তার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছিল? ঘরের জানালা খুলে দেবার্ঘ্য তাকায় বাইরে, কিন্তু চারপাশে শুধু সকালের নিস্তরঙ্গতা। একথা সে কাউকে বলতে পারে না, এমনকি অরিত্রাকেও না। কারণ এবার তার হৃদয়ের ভেতর এক আশ্চর্য প্রশান্তি গেঁথে গেছে—যা শুধু চাঁদের আলোয় আসা কারো স্পর্শেই সম্ভব।
তবে আর বসে থাকা যায় না। তরুণ মিত্রের দেওয়া সূত্র ধরে দেবার্ঘ্য এবার ছুটে যায় মহানগর লাইব্রেরির সেই পর্বতসম পাণ্ডুলিপির ভাণ্ডারে, যেখানে সময়ের ধুলোয় ঢাকা পড়ে থাকা অনেক নাম, অনেক গল্প, নিঃশব্দে ঘুমিয়ে থাকে। সেখানে সে খুঁজে পায় হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ—”ঐশীর অক্ষর”। পাতাগুলো হলদে, ভঙ্গুর, আর বহু কবিতা রয়ে গেছে অসমাপ্ত। কিন্তু প্রতিটি পঙক্তিতেই ঐশীর উপস্থিতি স্পষ্ট। “তুমি এসেছিলে জ্যোৎস্নার ঢেউয়ে ভেসে, আমি তোমার গন্ধ ছুঁয়ে লিখেছিলাম নিঃশ্বাসে।” দেবার্ঘ্য সেই কবিতাগুলোর মধ্যে যেন নিজেকে খুঁজে পায়। তার চোখ আটকে যায় এক বিশেষ কবিতায়, যেখানে লেখা—“যদি কখনো কবিতার মাঝে ঘুমিয়ে থাকা প্রেম জেগে ওঠে, সে তখন ফিরে আসবে অন্য নামে, অন্য কবির স্বপ্নে।” দেবার্ঘ্যর শরীর কাঁপে। হরিদাস কি ভবিষ্যদ্বাণী করেই গিয়েছিলেন ঐশীর ফিরে আসা? আর সে কবি কি তবে সে নিজেই?
লাইব্রেরিয়ান শ্রীময়ী লাহা, যিনি আগে হরিদাসের খাতা ধরিয়ে দিয়েছিলেন, এবার তাকে নিয়ে যান লাইব্রেরির সংরক্ষিত নথির ঘরে। সেখানে রয়েছে একটি ডায়েরি, যা নাকি হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ছিল। সেই ডায়েরিতে বিভিন্ন তারিখে লেখা অনুভূতির খণ্ডাংশ। তারই এক জায়গায় লেখা, “ঐশীর চোখে এমন একটা যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি আছে, যা সময় ছুঁতে পারে না। আমি জানি, আমি তাকে ছুঁতে পারব না, তবু সে আমার কবিতার অবধারিত লাইন হয়ে থাকবে।” দেবার্ঘ্য ডায়েরিটি বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে বসে পড়ে। এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। কী এক চক্র চলছে? কে এই ঐশী? প্রেম, আত্মা না কি কেবলই এক কবির অপ্রাপ্তির ছায়া?
বিকেলে দেবার্ঘ্য ফিরে আসে বাড়িতে। কিন্তু মন পড়ে থাকে সেই কবিতার খাতার পাতায়। সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না, ঐশীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কতটা বাস্তব, আর কতটা অলীক। তখনই হঠাৎ ফোন আসে অরিত্রার—গলায় ঘনত্ব। “দেবার্ঘ্য… আমি আজ এক অদ্ভুত ঘটনা দেখলাম। একটা ক্লায়েন্টের বাড়িতে গিয়েছিলাম—পুরনো এক মহিলা, তিনি নাকি রাতে স্বপ্নে একজন সাদা পোশাকের মেয়েকে দেখেন, যে বারবার বলে, ‘তুমি যদি কবিকে দেখো, বলো আমি তাকে ডাকি।’ ভাবতে পারিস?” দেবার্ঘ্যর রক্ত হিম হয়ে যায়। এ তো শুধু তার স্বপ্ন না—এ ছড়িয়ে পড়ছে অন্যদের মাঝেও। চাঁদের গন্ধ কি তাহলে শুধু এক কবির নিঃশ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়?
রাত বাড়ে, আর জানালার বাইরে জ্যোৎস্না নামতে শুরু করে। বিছানায় শুয়ে দেবার্ঘ্য হাত রাখে বুকের ওপর, ঠিক সেইখানে যেখানে ঐশীর নাম দগদগে হয়ে বাজে। ঘরের নিঃশব্দতায় ভেসে আসে এক অপার্থিব শব্দ—জ্যোৎস্নার ভিতর দিয়ে যেন কেউ বলছে, “আমি এসেছিলাম… আমি আবার আসব।” সে জানে, এই প্রেম বাস্তবের নিয়ম মানে না। এই প্রেম কেবল শব্দের শরীর নয়—এ এমন এক গন্ধ, যা ছোঁয়া যায় না, কিন্তু তবু অনিবার্য। আর সে গন্ধ—চাঁদের গন্ধ।
৫
দেবার্ঘ্যর মনে হচ্ছিল, শহরটা যেন ধীরে ধীরে তার সামনে থেকে সরতে চাইছে। যেন ধোঁয়ার পরতের মতো বাস্তবতা ভেঙে যাচ্ছে এক অজানা স্বপ্নজগতের ভেতরে। দোতলার জানালা দিয়ে চেয়ে থাকতে থাকতে তার চোখে যেন আবার সেই মেয়েটির মুখ ভেসে উঠল—এক অদ্ভুত শান্ত চোখ, যেখান থেকে যেন কবিতার শব্দ ঝরে পড়ে। সেই যে রাতের পর রাত সে মেয়েটিকে দেখেছে স্বপ্নে—সে যে চাঁদের আলোয় হাঁটে, তার কণ্ঠে কবিতার ছন্দ, তা কি আসলেই স্বপ্ন ছিল? নাকি দেবার্ঘ্য নিজেই ধীরে ধীরে সেই স্বপ্নের বাস্তবতায় ঢুকে পড়ছে? অফিসের কাঁচের ঘর, তার টেবিলের ডেস্কটপ, বন্ধুরা—সব যেন বাষ্প হয়ে গিয়েছে। এখন তার চারপাশে কেবল এক অনন্ত অনুসন্ধান—তাকে খুঁজে পাওয়ার, যার গন্ধে চাঁদের আলোকছায়া মিশে আছে।
সে বারবার ফিরে যাচ্ছিল সেই কবিতার খাতায়, যেটা কয়েকদিন আগে সে এক পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিনেছিল। বইয়ের নাম ছিল “স্বপ্নের ওপারে চাঁদ”—একজন বিস্মৃত কবির লেখা, যার নাম দেবার্ঘ্য আগে কখনো শুনেনি। সেই বইয়ের পৃষ্ঠাগুলোয় এমন কিছু লাইন ছিল, যেগুলো হুবহু তার স্বপ্নে দেখা মেয়েটির কণ্ঠে সে শুনেছে। সে আতঙ্কিত নয়, বরং এক অদ্ভুত উত্তেজনায় অধীর। সে এখন জানে, তার স্বপ্নের মেয়েটি কোন কাল্পনিক সৃষ্টি নয়। তাকে খুঁজে পাওয়ার সূত্র লুকিয়ে আছে এই কবিতার ভেতরে। এক দুপুরে, সে হঠাৎ খেয়াল করল, কবিতার এক পৃষ্ঠায় কালি ছড়িয়ে আছে কিছু জায়গায়। সে আলতো করে আঙুল চালিয়ে দেখল—না, এটা ছাপার ভুল নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু শব্দ আড়াল করা হয়েছে। একরকম রহস্যময় সংকেত, যেন তাকে নির্দিষ্ট পথে চালিত করতে চায়।
সেই রাতে, দেবার্ঘ্য আবার সেই স্বপ্নে ঢুকে পড়ল। এবার মেয়েটি বসে আছে এক রূপালি পুকুরপাড়ে। আশেপাশে নীরবতা, শুধু দূরে এক বাঁশির সুর ভেসে আসছে। মেয়েটি তাকে দেখেও যেন না দেখার ভান করল। দেবার্ঘ্য এগিয়ে গিয়ে শুধালো—”তুমি কে? আমি কি তোমায় খুঁজে পাই?” মেয়েটি ধীরে তাকাল, তারপর বলল, “তুমি তো জানো আমার নাম, শুধু বলতে ভয় পাও।” দেবার্ঘ্য বিস্মিত—সে কি সত্যিই জানে তার নাম? “তাহলে বলে দাও,” সে অনুনয় করল। মেয়েটি ধীরে উঠে দাঁড়াল, বলল, “আমাকে খুঁজে পেতে হলে কবিতার শেষ লাইন খুঁজে পেতে হবে। কিন্তু মনে রেখো, প্রতিটি শব্দের পেছনে লুকিয়ে আছে এক দরজা। ভুল শব্দ তোমায় ভুল পথে নিয়ে যাবে।” এই বলে সে হেঁটে গেল দূরের চাঁদের দিকে, ধীরে ধীরে মিশে গেল আলোয়।
ঘুম ভাঙার পর দেবার্ঘ্যর গা জুড়ে ঘাম, কিন্তু মন তার কাচের মতো স্বচ্ছ। সে এখন জানে, তাকে যেতে হবে সেই কবিতার ছায়া অনুসরণ করে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পঙক্তি যেন তার জন্য একটা মানচিত্র। সে শুরু করল বিশ্লেষণ—কোথায় কী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, কোন লাইনের পর কোন লাইন আসছে না, কোন পাতায় দাগ রয়েছে। সেই সন্ধ্যায়, হঠাৎ করেই একটা নাম তার মাথায় আসে—‘নৈঃশব্দ্য’। এই শব্দটাই মেয়েটির কণ্ঠে সে সর্বশেষ শুনেছিল। বইয়ের পাতার একটা জায়গায় সে শব্দটা একবার লেখা ছিল—কিন্তু সেখানে কালির দাগ ছড়িয়ে ছিল। সে বুঝল, প্রথম দরজাটা এখানেই। এই শব্দের সঙ্গেই লুকিয়ে আছে তার পরবর্তী ইঙ্গিত। সে ঠিক করল, পরদিন যাবে সেই পুরনো কবিতার দোকানে, খুঁজে দেখবে কবির সম্পর্কে আর কিছু পাওয়া যায় কি না। হয়তো, কবিই জানেন সেই মেয়েটির সত্যিকারের অস্তিত্ব। আর যদি না জানেন, তাহলে তিনিই এই স্বপ্নের গল্পের নির্মাতা। অথবা, হয়তো তিনিও… একসময় খুঁজেছেন সেই মেয়েটিকে।
৬
শীতের শেষ ভাগ, ফেব্রুয়ারির এক রাতে দেবার্ঘ্য আবারও সেই স্বপ্নে ঢোকে। তফাত শুধু এইবার সে নিজেই জানে যে সে স্বপ্ন দেখছে, এবং সেই উপলব্ধি তার সত্ত্বাকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে যায়। জ্যোৎস্নায় মোড়া পাহাড়ি উপত্যকার সেই অপরূপ স্থান, যেখানে আগেও বহুবার এসেছে সে—কিন্তু আজ যেন বাতাসের মধ্যে রয়েছে এক অন্যরকম ব্যাকুলতা। সামনে সেই মেয়ে, অরুণা, ধীরে ধীরে হাঁটছে। তার শাড়ির পাড়ে কুয়াশার মতো আলো, আর পায়ের তলায় গন্ধবর্ণ চাঁদের রশ্মি। সে একবার ফিরে তাকায় দেবার্ঘ্যের দিকে—তাকে আর তার অভ্যাগত হিসেবে দেখে না, যেন চেনে বহুদিন ধরে। “তুমি তো দেরি করে ফেললে,” বলে সে মৃদুস্বরে, যার প্রতিধ্বনি পাহাড়জোড়া। দেবার্ঘ্য চুপচাপ তার পেছন পেছন হাঁটে, একটাও প্রশ্ন না করে, শুধু শব্দগুলো বুকের ভিতরে গেঁথে নেয়। তার মধ্যে এক গভীর শূন্যতা ভরে যায় হঠাৎ, যেন অনেক বছর ধরে এই পথেই ছিল তার প্রণয়ের অভিপ্রায়।
ওই স্বপ্নের মধ্যেই দেবার্ঘ্য বুঝতে পারে কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন। সে চোখ বন্ধ করে যেইমাত্র ভাবতে চেষ্টা করে বাস্তবের কথা—কলেজ, বাড়ি, বন্ধু, এমনকি তার মা—ততই তার আশেপাশের স্বপ্নজগৎ কেঁপে ওঠে। অরুণা একবার থেমে বলে, “এখানে বাস্তবের কথা ভাবা চলে না। এটা এমন এক জায়গা, যেখানে শুধু অনুভব হয়, স্মৃতি নয়।” দেবার্ঘ্য ধীরে মাথা নাড়ে। তার মনে পড়ে সেই কবিতার খাতা, যে খাতার প্রতিটি পাতায় সে লিখেছিল অরুণাকে খোঁজার কবিতা—তখনো সে জানত না মেয়েটির নাম। স্বপ্নে দাঁড়িয়ে সে বুঝে যায়—এই কবিতাগুলোর উৎস সে নয়, বরং অরুণারই ফেলে যাওয়া শব্দ, যেগুলো সে অজান্তে কুড়িয়ে নিয়ে লিখেছে খাতায়। অরুণা তাকে বলে, “শব্দ বাঁচে, দেবার্ঘ্য। তুমি তাদের রক্ত দিয়েছো। এবার পালা তোমার নিজেকে খোঁজার।”
তাদের হাঁটা পৌঁছে যায় একটি সাদা-বসন্ত গাছে ঘেরা উপত্যকায়, যেখানে এক পুরনো শিবমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে। সেই মন্দিরে একটা পাথরের গায়ে অরুণার নাম খোদাই করা—’অরুণা, যাকে চাঁদের গন্ধ বলা হতো’। দেবার্ঘ্যের বুক ধক করে ওঠে। “তুমি তাহলে মরে গেছো?” জিজ্ঞাসা করে সে। অরুণা হেসে বলে, “স্বপ্নে কেউ মরে না। আমরা শুধু ফিরে যাই, অন্যরকম এক বাস্তবতায়। তুমি এখন দ্বারপ্রান্তে, দেবার্ঘ্য। যদি চাও, এই জগতে থেকে যেতে পারো। তবে ফিরে গেলে আমি মুছে যাবো তোমার মনে থেকে।” সিদ্ধান্ত নেবার মুহূর্তে চারদিকের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হতে থাকে। দেবার্ঘ্য বুঝতে পারে—এই জায়গাটা তার কল্পনার জন্মভূমি, কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে কোনো অতীত, যা সে এখনও পুরোপুরি জানে না।
দেবার্ঘ্য হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে—“আমি জানতে চাই! আমি জানবো তুমি কে!” ঠিক সেই মুহূর্তে স্বপ্নের জগত ফেটে চৌচির হয়ে যায়, আর দেবার্ঘ্য ঘুম থেকে জেগে ওঠে নিজের বিছানায়, বুক ধড়ফড় করছে। তার পাশেই সেই পুরনো কবিতার খাতা, যেখানে অরুণার নামটা নিজের হাতে লেখা। কিন্তু আজ এক নতুন জিনিস চোখে পড়ে—একটি পাতার কোণে ছোট করে লেখা আছে একটি নাম এবং তারিখ—”অরুণা মিত্র, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট, ধানমন্ডির উপত্যকায় নিখোঁজ”। বুকের ভিতর হিমেল এক স্রোত বয়ে যায়। এতদিন যার কথা সে শুধু স্বপ্নে দেখেছে, সে কি কোনো এক বাস্তব মানুষ ছিল? নাকি তার কল্পনার চূড়ান্তরূপ? এবং সেই চাঁদের গন্ধ—তা কি শুধুই আবেগ, নাকি সত্যিই কোথাও লুকিয়ে আছে উত্তর?
৭
চাঁদের আলোয় সেই রাতে দেবার্ঘ্য এক অদ্ভুত স্বপ্নে ঘুমিয়ে পড়ে। না, এবারে মেয়েটি কোনো নদীর পাড়ে ছিল না, ছিল না কোনো ফুলের বাগানে কিংবা ধোঁয়ার ভেতর। সে ছিল একটি পুরোনো লাইব্রেরির ভেতরে, মোমবাতির আলোয় বসে কবিতা লিখছে, চারপাশে পুরোনো চিঠির গন্ধ। মেয়েটি যখন মুখ তুলল, দেবার্ঘ্য চমকে উঠে বলল, “তুমি কে?” মেয়েটির মুখে হাসি ফুটে উঠল—ধীরে বলল, “তুমি যাকে খুঁজছো, সে তো নিজেরই এক প্রতিচ্ছবি, দেবার্ঘ্য।” সেই বাক্য ঘুমের গায়ে চুম্বন রেখে যেন ছায়ার মতো মিলিয়ে গেলো চারপাশ। ঘুম ভাঙতেই দেবার্ঘ্য ছুটে বেরিয়ে গেল নিজের বাড়ির পাশের পুরোনো গ্রন্থাগারটিতে, যে জায়গায় সে কোনোদিনও যায়নি। সবকিছু যেন নিখুঁতভাবে সাজানো ছিল, যেন কেউ অপেক্ষায় ছিল অনেক দিন ধরে। ধুলোমাখা তাকের এক কোণে সে খুঁজে পেলো এক খাম, তাতে দেবার্ঘ্যের নাম লেখা।
খামটি খুলে ভিতরে পেলো একটি হাতে লেখা চিঠি—কবিতার ছন্দে লেখা একটি দীর্ঘ স্বপ্নপত্র। “তুমি যেদিন প্রথম আমাকে দেখেছিলে, আমি জানতাম আমাদের দেখা হবে। চাঁদের গন্ধ কি তুমি কোনোদিন অনুভব করেছো? সে গন্ধ থাকে না ঘ্রাণে, থাকে মনখারাপের এক গভীর অলিন্দে। আমি সেই গন্ধ। আমি সেই ঘর, যেখান থেকে কবিতারা পালিয়ে যায়। যদি কখনো চাঁদের আলোয় একটা দরজা খোলা দেখো, বুঝবে আমি অপেক্ষা করছি।” চিঠির নিচে কোনো নাম ছিল না, কেবল একটা আঁকা চাঁদের প্রতিকৃতি। দেবার্ঘ্য কাঁপতে থাকা আঙুলে চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরে বুঝল—এটা নিছক কাকতালীয় নয়। সে এখন জানে—মেয়েটি কে, জানে না; কিন্তু মেয়েটি বাস্তব কিনা, তাতে আর সন্দেহ নেই। তার স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমারেখা আরও এক ধাপ পেরিয়ে এসে পড়েছে।
এরপরের দিনগুলোতে দেবার্ঘ্য ক্রমাগত খুঁজতে থাকে চিঠির লেখিকার সম্ভাব্য অস্তিত্ব। পুরোনো পত্রিকায়, সাহিত্যিকদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে, কবিতা সংকলনে খোঁজ করে সে মেয়েটির কবিতার ধরণ। সে বুঝতে পারে, এই লেখনভঙ্গি মিলছে সেই বিস্মৃত কবি ‘মীরা দাস’-এর কবিতার সঙ্গে—যার কবিতা হারিয়ে গিয়েছিল পঞ্চাশ বছর আগে। আশ্চর্যের বিষয়, সেই কবি নিখোঁজ হয়েছিল এক পূর্ণিমার রাতে, কোনো চিহ্ন না রেখে। গ্রন্থাগারে পাওয়া চিঠির কাগজ, কালি আর ভাষা—সবই যেন সেই সময়ের ছায়া বহন করে। তাহলে কি দেবার্ঘ্য স্বপ্নে একজন মৃত কবিকে দেখছে? না কি সময়ের সীমানা ভেঙে কে যেন ফিরে এসেছে? এই প্রশ্ন যখন তার ভেতরে নিঃশব্দ বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে, তখন একদিন হঠাৎ তার ঘরের জানালার পাশে রাখা মাটির টব থেকে বেরিয়ে আসে আরেকটি খাম—চাঁদের প্রতিকৃতিযুক্ত।
চিঠিতে লেখা—“আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। আগামী পূর্ণিমা যদি সাহস পাও, এসো বাগানবাড়ির পিছনের চন্দনের বনে। একটা দরজা খোলা থাকবে। আমি অপেক্ষা করব।” দেবার্ঘ্য নিশ্চিত জানে—এটা যদি স্বপ্ন হয়, তবে সে এমন স্বপ্নে থাকতে চায়; আর যদি বাস্তব হয়, তবে সে এই পৃথিবীর সমস্ত যুক্তি ভুলে যেতে প্রস্তুত। সেই রাত, সেই দরজা, সেই অপেক্ষা—সবই যেন চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাওয়া এক রহস্যগন্ধী কবিতার মতো, যার উত্তর নেই, কিন্তু প্রতিটি প্রশ্ন এক অনন্য আবেগের জন্ম দেয়। পরের অধ্যায়ে দেবার্ঘ্য সেই দরজার সামনে দাঁড়াবে—জানার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য।
৮
দেবার্ঘ্য যেন হেঁটে চলেছে এক অদ্ভুত আলো-ছায়ার রাজ্যে। স্বপ্নের মতই, কিন্তু এবার তার হাড়ের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তের ধ্বনি। সামনের পথটা যেন কুয়াশার ভিতর দিয়ে মোড়া এক স্ফটিক নদী—আর তার ওপর দিয়ে হাঁটছে সে। আকাশে কোনো চাঁদ নেই, অথচ চারপাশ জ্বলে উঠেছে চাঁদের গন্ধে। বাতাসে মৃদু এক গন্ধ—লেবেন্ডার, ধূপ আর শুকনো মধুর। আর তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। এবার সে ধরা দিয়েছে পুরোমাত্রায়, চোখে চোখ রেখে। তিলোত্তমা যেন এখন আর শুধু কবিতা নয়, সে এক পূর্ণ অবয়ব, রক্ত-মাংসের মতো জীবন্ত, অথচ অলৌকিক কোনো আভায় মোড়া। তার ঠোঁটে হাসি, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে এক গভীর ক্লান্তি। “তুমি শেষমেশ চলে এসেছ,” বলল মেয়েটি, যার কণ্ঠ যেন বহুযুগ পুরনো কোনো বাঁশির সুর। দেবার্ঘ্য কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো তার ঠোঁটেই জমে গেল। মেয়েটি হাত বাড়াল। “তুমি খুঁজছিলে আমাকে, কিন্তু জানো না আমি কে।” দেবার্ঘ্য মাথা নাড়ল, চোখ দুটো আরও বিস্মিত। “তুমি আমার স্বপ্নে এসেছ,” সে বলল ধীরে। “তুমি কি সত্যিই আছো?”
তিলোত্তমা এগিয়ে এল, তার পায়ের নিচে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ল ঝরে পড়া চাঁদের ধূলোর মতো। “আমি স্বপ্নের মেয়ে। কিন্তু স্বপ্ন মানেই কি মিথ্যে?” সে হাসল হালকা করে, যেন একটা কবিতার লাইন পড়ে ফেলল বাতাসে। “তুমি যখন আমাকে প্রথম দেখেছিলে, তখন আমি ছিলাম কেবল এক ছবি। পরে আমি হয়ে উঠি কল্পনার শরীর, তারপর কবিতার ছায়া। কিন্তু আসলে, আমি একসময় ছিলাম। আমি ছিলাম একজন কবি—তোমারই মত। আমার নাম ছিল কাশ্মীরী, জন্ম হয়েছিল এই শহরেরই এক প্রাচীন অলিতে। তারপর আমি হারিয়ে যাই এক বর্ষার রাতে, কোনো এক অজানা গন্তব্যে।” দেবার্ঘ্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হল এই মেয়ে আসলে কোনো এক কবিতার আত্মা, যে সময়ের গর্ভে চাপা পড়ে গেছে, কিন্তু কবিতার ভেতর দিয়ে সে ফিরেছে, তারই কাছে। “তুমি কি তবে মৃত?” দেবার্ঘ্য জিজ্ঞেস করল একেবারে নিঃশব্দে। তিলোত্তমা কিছু বলল না। তার চোখে জল, কিন্তু সেই জলে ছিল চাঁদের ঝিলিক।
“মৃত বলে কিছু নেই কবিতার জগতে,” মেয়েটি বলল শেষে। “যে অনুভব বেঁচে থাকে, সে কখনো মরে না। আমি বেঁচে আছি—তোমার প্রতিটি লাইনের মধ্যে, প্রতিটি ছন্দের ভাঁজে। তুমি যতদিন লিখবে, আমি বাঁচব।” দেবার্ঘ্য এক পা এগিয়ে গেল, তার হাত ছুঁয়ে ফেলল তিলোত্তমার আঙুল। একটা হিমেল বিদ্যুৎ তার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ল, মনে হল হাজার বছর ধরে সে এই ছোঁয়ার অপেক্ষা করছিল। “তবে কি তুমি চলে যাবে?” সে জিজ্ঞেস করল কাঁপা গলায়। তিলোত্তমা মাথা নাড়ল ধীরে। “না, এবার আমি থাকব। তবে অন্যভাবে। তুমি আর আমি—একসঙ্গে বাঁচব কবিতায়, স্বপ্নে, ছায়ায়। তুমি লিখবে আর আমি গন্ধ হয়ে উঠব, শব্দ হয়ে উঠব, চাঁদের আলো হয়ে উঠে বসব তোমার জানালার পাশে।” হঠাৎ চারপাশে কুয়াশা ঘনীভূত হতে থাকল, বাতাস ভারী হয়ে উঠল লীলার স্পর্শে। সময় থেমে গেল।
যখন দেবার্ঘ্য ঘুম ভাঙল, তখন সূর্য উঠেছে। বিছানার পাশে রাখা ডায়েরির পাতা উল্টে গেছে হাওয়ায়। সে চোখ খুলেই দেখল—পাশে রাখা টেবিলে একটা চিঠি। হাত কাঁপতে কাঁপতে সে চিঠিটা খুলল। ভিতরে লেখা মাত্র একটা লাইন: “আমি থাকব, চাঁদের গন্ধ হয়ে। লিখো, দেবার্ঘ্য।” তার চোখে জল চলে এল, কিন্তু সেই জলের মধ্যে এবার কোনো বিষণ্নতা ছিল না, ছিল এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি। সে জানে, আর যতদিন সে লিখবে, তিলোত্তমা থাকবে। হয়তো বাস্তবের জগতে নয়, কিন্তু অনুভবের সীমানায়, প্রতিটি ছন্দের গভীরে। আর সেই থেকে, প্রতিটি পূর্ণিমা রাতে দেবার্ঘ্য জানালায় বসে কবিতা লেখে, আর আকাশ ভরে ওঠে এক অচেনা, তীব্র অথচ শান্ত চাঁদের গন্ধে।
—
শেষ




