Bangla

মুখোশের নবাব

Spread the love

অখিল চৌধুরী


১৮৫৭ সাল—ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বৃহৎ সশস্ত্র বিদ্রোহ। দিল্লি, কানপুর, ঝাঁসি, মীরাট থেকে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে। আর এই সময়েই, কলকাতার মতো শহর, ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক হৃদয়, বাইরে থেকে যতটা স্থির, ভিতরে ততটাই অস্থির।

ঠিক এই সময় কলকাতার অলিগলিতে দেখা যেতে লাগল এক রহস্যময় চরিত্র—একজন মুখোশপরা নবাব, যিনি প্রতিরাতে বারোটার সময় বেরিয়ে পড়েন, কারও গায়ে হাত না তুলেও ছড়িয়ে দেন ভয়ের শীতল ছায়া।

কিন্তু তিনি কে?

তিনি কি ইংরেজদের গুপ্তচর, না এক ভারতীয় বিপ্লবী? আর তার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে কী?

১৮৫৭, জুলাই মাস, কলকাতা। শোভাবাজার রাজবাড়ির পাশে ছোট একটা চায়ের দোকানে সন্ধ্যা থেকে জমে ওঠে আড্ডা। সেদিনও বসে ছিলেন পাড়ার কয়েকজন বয়স্ক লোক—দর্জি শ্রীযুক্ত হরিনাথ, মোহর ঘাটের ঘাটকর্মী গাফ্‌ফার মিঞা, আর কালীমন্দিরের পুরোহিত ভোলানাথ।

“কাল রাতে আবার দেখা গেছে নাকি?” – হরিনাথ গম্ভীর মুখে বললেন।

গাফ্‌ফার মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ হুজুর, এই চোখে দেখেছি। লাল জমকালো জামা, চোখদুটি ঠিক যেন আগুন… ঠিক যেন নবাবদের মতো চলাফেরা। হাতে ছিল একটা সোনালি ছড়ি।”

ভোলানাথ একটু হেসে বললেন, “ওটা মানুষের রূপে ভূত। নইলে মাঝরাতে চিৎপুর বাগানে সাহেবদের ঘোড়ার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কোন মানুষ পারে?”

কিন্তু গাফ্‌ফারের চোখ ছিল চিন্তায় ভরা। “সে মানুষ। কিন্তু সাধারণ নয়। শুনেছি পলাশির যুদ্ধের পর এক নবাব আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। হয়তো সেই বংশের কেউ… ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিচ্ছেন!”

হেমচন্দ্র দত্ত কলকাতার বঙ্গদীপ পত্রিকার একজন নবীন সাংবাদিক। মাত্র ২৩ বছর বয়স, কিন্তু কলমে আগুন। তিনি এই মুখোশের নবাবের খবর পেয়ে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। সেই সময় কলকাতায় সেনাবাহিনী সতর্ক ছিল, প্রেস সেন্সরশিপ চলছিল, তবু হেমচন্দ্র সাহস করে সম্পাদককে বললেন— “স্যার, আমি নিজে রাতের শহরে ঘুরে এই ‘নবাব’-এর খোঁজ আনব।”

সম্পাদক প্রভাতচন্দ্র মুখার্জী এএকটু ভ্রু কুঁচকে বললেন, “এটা বিপজ্জনক, হেম। ইংরেজরা এখন খুব সতর্ক। কিন্তু তুমি যদি পারো, ‘বঙ্গদীপ’ প্রথম সংবাদ ছাপাবে।”

হেমচন্দ্র সেই রাতেই বেরিয়ে পড়লেন। কাঁধে একটা ছোট নোটবুক, মোমবাতি, আর কালি-কলম। চৌরঙ্গী থেকে শুরু করে হ্যারিসন রোড হয়ে চিৎপুর গলির দিকে হাঁটলেন।

সেই সময় ছিল রাত ১১টা ৫৫। চিৎপুর গলির এক অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে হেমচন্দ্র দেখলেন, দূরে একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে। গায়ে লাল শেরওয়ানি, গলায় রত্নজড়িত মালা, মুখ ঢাকা রূপোর মুখোশে। হাঁটছে ধীর গতিতে, যেন ঠিক জানে সে কোথায় যাচ্ছে। হেমচন্দ্র সাহস করে গলির পাশে লুকিয়ে পড়লেন। নবাব ঠিক তার পাশ দিয়ে গেলেন। এক মুহূর্তে তাঁর চোখ হেমচন্দ্রের চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টি—ঠান্ডা, কিন্তু গভীর। তারপর নবাব হঠাৎ থেমে গেলেন। ঘুরলেন, সামনে এসে দাঁড়ালেন।

“তুমি সাংবাদিক,”—কণ্ঠস্বর ছিল নরম, কিন্তু দৃঢ়। “যা লিখবে, সত্য লিখো।”

হেমচন্দ্র হতবাক। “আপনি… আপনি কে?”

“আমি মুখোশ পরে আছি, কারণ মুখ খুললে তুমি আর আমাকে বিশ্বাস করবে না,”—নবাব বললেন। তারপর একটা ছোট চিঠি হেমচন্দ্রের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

চিঠিতে লেখা ছিল:

“আমার নাম আমিনউল্লাহ খান। আমার পূর্বপুরুষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার দরবারে ছিলেন। পলাশির বিশ্বাসঘাতকতায় আমাদের পরিবার ভেঙে পড়ে। আমি শিক্ষিত, লন্ডন থেকেও পড়াশোনা করেছি। কিন্তু এদেশে ফিরে বুঝলাম—আমরা কেবল পুতুল, আর ব্রিটিশরা ডোর টানে। আমি এই মুখোশ পরে বের হই, কারণ আমি একা নই। আমরা অনেক। আমরা মুখোশের নবাব।”

হেমচন্দ্র স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এই প্রথমবার বুঝলেন, মুখোশের নবাব কেবল একজন মানুষ নন—একটা ভাবনা, একটা প্রতিরোধ, একটা প্রতীক।

হেমচন্দ্র পরের সপ্তাহে আরও অনুসন্ধান করে জানলেন—আসলে এই নবাব তিনজন।

১. নবাব আমিনউল্লাহ খান – যিনি বিপ্লবের অর্থ ও কৌশল দেন।

২. সৌরভ মুখোপাধ্যায় – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, দিনে সমাজ সংস্কারক, রাতে আন্দোলনকারী।

3. রোশনারা বেগম – নারী শিক্ষিকা, যিনি বিপ্লবী দলের গোপন বার্তা বহন করেন। সাহস ও বুদ্ধির অনন্য নিদর্শন।

তারা তিনজন একসঙ্গে কাজ করে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে সাহেবদের ত্রাস সৃষ্টি করতেন—তবে কখনও কাউকে হত্যা না করে, শুধু ভয় দেখিয়ে ও প্রশাসনের গোপন ফাঁস করে।ইংরেজ প্রশাসন বুঝতে পারল, এই নবাব একটি চেতনাকে উস্কে দিচ্ছেন। লর্ড ক্যানিং নির্দেশ দিলেন: “ধরো, শাস্তি দাও, ছায়াকেও নিভিয়ে দাও।”

১৮৫৭ সালের আগস্টে একটি সভা চলাকালে সৌরভ মুখার্জিকে গ্রেফতার করা হয়। প্রমাণ খুব কম, কিন্তু ইংরেজরা তাকে কোলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং-এর কারাগারে আটকে রাখে। খবর ছড়িয়ে পড়ে শহরে। প্রতিবাদ শুরু হয়।

হেমচন্দ্র বঙ্গদীপে লেখেন: “আপনি যদি মুখোশে থাকেন, আপনি ভয় দেখাতে পারেন। কিন্তু যদি মুখোশ খুলে দেন, আপনি অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন।”

সৌরভের ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল ২০ আগস্ট, ১৮৫৭। সেই দিন সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে যখন ব্রিটিশ অফিসাররা তাকে ফাঁসির মঞ্চে আনলেন, তখন শহরের কেন্দ্রস্থলে দেখা গেল একটি বড় মুখোশ ঝুলছে এক টেলিগ্রাফ খুঁটির মাথায়।

তার নিচে লেখা:

“তুমি একজন নবাবকে মেরেছ, কিন্তু আরেকজন জন্ম নেবে আজ রাতেই।”

বিকেলে ব্রিটিশরা সংবাদ পায়—লর্ড ক্লাইভ স্ট্রিটে সাহেবদের ক্লাবে আগুন লেগেছে। কেউ দেখেনি কে দিল, শুধু একটি ছায়া ছুটে চলে গেছে রাজারহাটের দিকে।

১৮৬২ সাল। হেমচন্দ্র এক পুরনো রেলস্টেশনে এক মহিলাকে দেখেন, বেগুনি রঙের শাল পরে। চেনা চেহারা। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আমি রোশনারা। আমিনউল্লাহ এখন বেনারসে। আমরা এখনও বেঁচে আছি। মুখোশটিও।”

“কিন্তু কেন মুখোশ?”—জিজ্ঞেস করলেন হেমচন্দ্র।

তিনি বললেন, “কারণ এই দেশটা এখনও প্রস্তুত নয় মুখোমুখি হওয়ার জন্য। মুখোশ পরে থাকলে সবাই চুপ থাকে। মুখ খুললে সবাই ভয় পায়।”


“মুখোশের নবাব” কোনো একক মানুষের নাম নয়। এটি এক প্রতীক—এক প্রতিরোধের, সাহসের, স্বপ্নের।

আজও যদি রাতে আপনি কলকাতার পুরনো অলিগলিতে যান—চিৎপুর, মেটিয়াবুরুজ, বা শোভাবাজার—কোনও একটা হালকা বাতাসে যদি হঠাৎ মনে হয় পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, সাবধান হোন। মুখোশের নবাব এখনও রাস্তায়।

 

1000022615.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *