Bangla

রেডিওর ওপার থেকে

Spread the love

ঋদ্ধিমা বন্দ্যোপাধ্যায়


কলকাতা শহরের উত্তর প্রান্তে, শ্যামবাজারের এক পুরনো বাগানবাড়ি। বাড়িটা প্রায় শতবর্ষ পুরনো, লালচে ইটের গাঁথুনি, লোহার রেলিং আর কাঠের বারান্দা। ঘরগুলো যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে সময়কে দেখছে—দিন যায়, রাত আসে, মানুষ বদলায়, কিন্তু বাড়ির দেয়ালের ফিসফিসানি একই থাকে।

এই বাড়িতে সদ্য এসেছেন নীলয় সেন। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি, পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কিছুটা নিঃশব্দ জীবনের খোঁজে, ভাড়া নিয়েছেন এই পুরনো বাড়ির একতলার দুটো ঘর। বাড়িওয়ালা—নিমাই পাল, এক অদ্ভুত বৃদ্ধ, যার মুখে সবসময় এক রহস্যময় হাসি।

নীলয়ের জীবনে কিছুদিন আগে বড় ধাক্কা লেগেছে। মেঘলা, তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকা, হঠাৎই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কোনো কারণ না জানিয়েই, হঠাৎ, একরাতে, নীরবতা ছাড়া আর কিছু রেখে যায়নি। সেই ভাঙা হৃদয় নিয়েই নীলয় শহর ছেড়ে চলে আসে এই পুরনো বাড়িতে।

ঘর গোছানোর সময় এক কোণে একটা ধূলোমাখা রেডিও পায় সে। “ফিলিপস”, ১৯৭২ সালের তৈরি। কাঠের বডি, ভারী নকশা, গোল ডায়াল। নীলয় সেটা ঝেড়ে-মুছে, একটু মেরামতি করে চালু করে—অবিশ্বাস্যভাবে সেটি এখনো কাজ করে।

প্রথম দু’দিন রেডিওতে কিছু শোনা যায় না। তৃতীয় রাতে, যখন ঘড়িতে ঠিক বারোটা বাজে, হঠাৎ রেডিওর গর্জন থেমে গিয়ে একটা মিষ্টি, বিষণ্ণ মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসে— “তুমি কি এখনো শুনতে পাও?”

নীলয় থমকে যায়। শব্দটা কানে বাজে। পেছনে তাকায়, ঘর ফাঁকা। আবার রেডিওর দিকে চায়। কণ্ঠস্বরটা আবার বলে—

“আমি এখনো আছি… তুমি কি এখনো শুনতে পাও?”

নীলয়ের গায়ে কাঁটা দেয়। এই কি কোনো রেডিও প্রোগ্রাম? নাকি কেউ রেডিওর মাধ্যমে প্রাঙ্ক করছে?

কিন্তু পরদিন রাতেও ঠিক বারোটা একেই সুরে ভেসে আসে সেই কণ্ঠ— “তুমি কি এখনো শুনতে পাও?”

এভাবেই শুরু হয় এক অতিপ্রাকৃত যাত্রা। কে এই কণ্ঠের মালকিন? সে কি বেঁচে আছে? নাকি…

রাত বারোটা পাঁচ। রেডিও নিঃশব্দ হয়ে গেছে। কিন্তু নীলয়ের মাথার ভেতরে সেই কণ্ঠস্বরটা যেন এখনো গুমগুম করে বাজছে—

“তুমি কি এখনো শুনতে পাও?”

সে রেডিওর সামনে বসে, চুপচাপ। বাইরের রাস্তায় একটা কুকুর হাউহাউ করে উঠল। দূরের গলিতে একটা সাইকেল রিকশার ঝনঝন শব্দ কানে এলো, তারপর নিস্তব্ধতা। নীলয় তার মোবাইল বের করল, রেকর্ডার অন করল। পরের রাতে যদি আবার সেই আওয়াজ আসে, তাহলে সে রেকর্ড করে রাখবে।

পরদিন সকালটা ছিল অদ্ভুত শান্ত। পাখির ডাক, পাশের বাড়ির কাকিমার সিঁড়ি ধোয়ার শব্দ, আর নিমাই পালের হাঁক—

“বাবু, জলটা ছাড়ি?”

নীলয় তাড়াতাড়ি স্নান করে বারান্দায় গিয়ে বসল। সে ঠিক করল, আজ একটু নিমাই পালের সঙ্গে বসে গল্প করা দরকার।নিমাই কাগজ পড়ছিলেন। মুখে একরাশ গম্ভীরতা, কিন্তু চোখে সেই চেনা কৌতূহলী হাসি।

— “নিমাইদা, আপনি এই বাড়িতে কতদিন আছেন?”

— “আমি? উঁহুঁ… এই বাড়ি আমার দাদুর আমলের। মানে, ধরুন একশো বছর তো হবেই।”

— “রেডিওটা আপনার?”

নিমাই পালের মুখ থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর বললেন—

“ওটা? হ্যাঁ, মানে অনেক পুরনো। আমার কাকিমা শুনতেন।”

— “ওই রেডিও থেকে মাঝরাতে একজন মেয়ের আওয়াজ ভেসে আসে…”

এই কথা বলতেই নিমাইর মুখ শুকিয়ে গেল। গলা কাশলেন। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

— “ওসব ব্যাপার নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবেন না বাবু। পুরনো বাড়িতে অনেক সময় অনেক আওয়াজ আসে। বাতাসে… স্মৃতিতে…”

নীলয় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নিমাই চলে গেলেন বাগানে। কিন্তু তার চোখে একরকম অস্বস্তি, যেন সে কিছু লুকোচ্ছে।  সন্ধ্যেবেলা নীলয় বাজারে বেরোল। বাজার থেকে ফেরার পথে সুধীর দা’র চায়ের দোকানে একটু বসে চা খেল।

সুধীর দা বয়সে পঞ্চাশের ওপরে, এলাকার লোকেদের মুখস্ত রাখা রেডিও। তিনি কিছুটা জানেন এই বাড়ি সম্পর্কে।

নীলয় জিজ্ঞেস করল,

— “সুধীর দা, পালদের এই বাড়িটা… কেউ কি আগে এখানে আত্মহত্যা করেছিল?”

সুধীর দা চমকে উঠলেন।

— “আত্মহত্যা! আরে না রে বাবা… তবে একটা ঘটনা হয়েছিল বছর দশেক আগে…”

নীলয় একেবারে সামনে এসে বসে পড়ে— “কি ঘটনা?”

সুধীর দা গলায় সুর টেনে বললেন—

“এই বাড়িতে নিমাইর কাকিমা থাকতেন, নাম ছিল শোভনা। গানের গলা ছিল অপূর্ব। বিয়ের কিছুদিন আগে আচমকা বিয়ে ভেঙে যায়। তারপর অনেক রাত অবধি সে রেডিও চালিয়ে গান শোনত। একদিন ভোরবেলা তার ঝুলন্ত দেহ পাওয়া যায় বারান্দার ফ্যান থেকে…”

— “তারপর?”

— “তারপর কি! সবাই বলে, সেই রেডিওতে মাঝরাতে কার যেন গান শোনা যায়। কেউ বলে কান্না, কেউ বলে ফিসফিসে কথা।”

নীলয়ের মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। নীলয় রেডিওর সামনে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বসে আছে। পাশেই মোবাইলের রেকর্ডার অন করে রাখা। একটার পর একটা ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে।

১১:৫৫… ১১:৫৮… ১২:০০।

রেডিওর মধ্যে প্রথমে শোঁ শোঁ আওয়াজ। তারপর হঠাৎ স্পষ্ট কণ্ঠ— “তুমি কি এখনো শুনতে পাও?”

নীলয় গলা সাফ করে বলল— “তুমি কে?”

রেডিও থেকে আসা শব্দ থেমে গেল। নিঃস্তব্ধতা। তারপর আবার— “তুমি কি এখনো শুনতে পাও?… আমি হারিয়ে গেছি… আমাকে খুঁজে বের করো…”

নীলয় যেন ট্রান্সে চলে গেল। সেই কণ্ঠে একটা বেদনার সুর, যে যেন ভেসে আসে অনেক দূর থেকে। কে এই কণ্ঠ? শোভনা? নাকি অন্য কেউ? রেডিও নিঃশব্দ। রেকর্ডার বন্ধ।

তবে হঠাৎ জানালার বাইরে এক ছায়ামূর্তি দেখা গেল।

নীলয় চুপচাপ বসে। রেডিও বন্ধ হয়ে গেছে। মোবাইলের রেকর্ডার এখনো চলছে। জানালার বাইরে কিছু একটা নড়েছিল—সে নিশ্চিত। সে আস্তে করে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। পর্দা টেনে বাইরে তাকাল। এক মুহূর্তে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল— বারান্দার গেটের পাশে, গাছটার ছায়ার মধ্যে সত্যিই দাঁড়িয়ে ছিল একজন। একটা মেয়ের অবয়ব। সাদা ধবধবে শাড়ি, কাঁধে খোলা চুল, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। নীলয় চোখ ঘষে দেখল—ছায়াটা আর নেই। ফাঁকা। সে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বারান্দায় গেল, চারপাশে কেউ নেই। আশপাশে শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক, আর বাতাসে পেঁচানো এক অদ্ভুত গন্ধ— কোনো পুরনো আতর কিংবা পুরোনো আলমারির মতো। সে নিচে নেমে বাগানে গেল। কিছুই নেই। তবে এক কোণে মাটিতে পড়ে থাকা একটা ছোট লাল ফিতেয় বাঁধা কাঠের চিরুনি দেখে থমকে গেল। চিরুনিটার গায়ে খোদাই করা—S.R., তার মানে—Shovana Roy?

রাতের ঘটনার পর নীলয় সারারাত ঘুমোতে পারেনি। পরদিন সকালেই সে গেল স্থানীয় লাইব্রেরিতে। খোঁজ করতে লাগল পুরনো খবরের কাগজের রিপোর্ট, বিশেষ করে আত্মহত্যা বা অদ্ভুত মৃত্যু সংক্রান্ত। দু’ঘণ্টার চেষ্টার পর সে পায় ২০১৫ সালের আনন্দবাজার পত্রিকা-র একটা ক্লিপিংস: “অজানা কারণে আত্মঘাতী শোভনা রায়, বয়স ২৬”

স্থানীয়রা বলছেন, শোভনা মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। পরিবারের তরফ থেকে কিছু বলা হয়নি। মৃত্যুর রাতে ঘর থেকে রেডিওর আওয়াজ এবং অস্পষ্ট কথাবার্তার শব্দ পাওয়া গিয়েছিল। কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, জানালার পাশে কেউ দাঁড়িয়েছিল রাতভর। আরও একটা রিপোর্ট ছিল, যা হয়তো কেউ চোখেও দেখেনি— “রেডিওর কণ্ঠস্বর নিয়ে রহস্য, তদন্তে থানা”

কয়েকজন প্রতিবেশী দাবি করেন, মৃত্যুর পরও ওই ঘরের রেডিও থেকে মেয়েলি কণ্ঠস্বর শোনা গেছে বার বার। পুলিশ বিষয়টিকে ‘টেকনিক্যাল গ্লিচ’ বলে উড়িয়ে দেয়। নীলয়ের হাতে এবার প্রমাণ। এটা কেবল কাকতাল নয়। নীলয় এবার ঠিক করল নিমাই পালের মুখোমুখি হবে।

সে সোজা গিয়ে বলল,

— “নিমাইদা, আপনি সব জানেন, তাই না?”

— “আমি কিছু জানি না বাবু।”

— “আপনার কাকিমার আত্মহত্যা, রেডিওর আওয়াজ, জানালার ছায়া—সবকিছু!”

নিমাই চুপচাপ। তারপর ফিসফিস করে বললেন—

— “ও ছিল খুব ভালো মেয়ে। গান ভালোবাসত। কিন্তু যাকে ভালোবেসেছিল, সে তাকে বিয়ের দিন ফেলে চলে যায়। শোভনা ভেঙে পড়ে। আর সেই রাত্রেই…”

— “তারপর?”

— “তারপর মাঝে মাঝে ওর কণ্ঠ ফিরে আসে রেডিওতে। আমরা রেডিও ফেলে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু যতবার ফেলা হয়, সেটা আবার আপন জায়গায় ফিরে আসে। আমি জানি না কিভাবে। ও যেন বেঁচে আছে ওই রেডিওর ভেতরেই…”

নীলয়ের মাথা চক্কর দিতে লাগল। সে ফিসফিস করে বলল—

“সে আমাকে বলেছে—ও হারিয়ে গেছে, আমাকে খুঁজে বের করতে বলেছে…”

নিমাই তাকিয়ে রইলেন। দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—

“তুমি যদি সত্যিই খুঁজতে চাও, তাহলে যেতে হবে তার ঘরে—উপরে, যেখানে শোভনা থাকত…”

রাত ১১টা ৪৫। নীলয় ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে। অন্ধকার ঘর, বন্ধ জানালা, বাতাসে পুরনো ধুলোর গন্ধ। ঘরের কোণায় একটি পুরনো কফিন-বাক্সের মতো ট্রাঙ্ক। সে খুলে দেখে—

একটা গানের খাতা। পাতাগুলোর মাঝে শুকনো গাঁদা ফুল, মেহেদি দিয়ে আঁকা নাম—“শোভনা ♥ অর্জুন”। কে অর্জুন?সেই সময়ই ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছুঁয়েছে। নীচে রাখা রেডিও নিজে থেকেই বাজতে শুরু করেছে।

“তুমি কি এখনো শুনতে পাও?… আমি এখনো অপেক্ষা করছি… আমার গানগুলো পেয়েছ?”

নীলয় উত্তর দিল— “পেয়েছি। বলো, আমি কি করব?”

“তাকে খুঁজে বের করো… অর্জুন… সে এখনও বেঁচে আছে…”

রেডিওর আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে জানালায় আবার সেই ছায়ামূর্তি। নীলয় এবার ভয় পেল না। সে জানে, এই কাহিনি শেষ করতে হলে, তাকে অর্জুনকে খুঁজে বের করতেই হবে।

রাত কেটে সকাল। সকালে উঠে নীলয়ের প্রথম কাজ ছিল সেই নামটা লিখে নেওয়া—অর্জুন। কে এই অর্জুন?

শোভনার ডায়েরিতে বারবার এসেছে সেই নাম। “অর্জুন আমাকে ভালোবাসে”—“অর্জুন প্রতিদিন রেডিও শুনে আমার গান শোনে”—“অর্জুন বলেছে, আমরা চাঁদের আলোয় বিয়ে করব…”

কিন্তু ডায়েরির শেষ পাতা ছিল সবচেয়ে রহস্যময়: “আজ ওর ফোন এলো না। বাড়ির লোক বলল ও চলে গেছে কোথাও। আমি জানি, এটা মিথ্যে। ও পালায়নি। কেউ ওকে নিয়ে গেছে।”

নীলয়ের মনে হল—“কেউ ওকে নিয়ে গেছে?”

মানে কি? তাহলে কি অর্জুন নিখোঁজ? তাহলে সে কি শোভনার আত্মহত্যার পেছনে আছে? নীলয় ঠিক করল, একবার বিধাননগর থানায় যাওয়া দরকার। সেখানে হয়তো অর্জুন রায় নামে কেউ নিখোঁজ ছিল কিনা, সেটা জানা যাবে।থানায় গিয়ে পুরনো রেকর্ড ঘাঁটাঘাঁটি করে যা পাওয়া গেল, তা চমকে দেবার মতো:

“২০১৫ সালের জুন মাসে, অর্জুন রায় নামে এক যুবক নিখোঁজ হন। বয়স ২৯। শেষ দেখা গিয়েছিল বেলেঘাটা লেকে।”

কিন্তু তদন্ত বেশিদূর এগোয়নি। কারণ পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। আবার এক অদ্ভুত তথ্য—অর্জুনের বাবা ছিলেন এক সময়কার সরকারি অফিসার, এবং তাঁদের পরিবার পরবর্তী সময়ে শহর ছেড়ে দিল্লি চলে যায়।

নীলয়ের হাতে এখন তিনটে সূত্র:

১. শোভনার মৃত্যুর সময় অর্জুন গায়েব।

২. রেডিও বারবার অর্জুনের কথা বলছে।

৩. কেউ অর্জুনকে সরিয়ে দিয়েছিল বলে শোভনার সন্দেহ ছিল।

এখন সে বুঝতে পারছে, এই কাহিনি শুধু এক প্রেমিকাকে হারানোর বেদনার গল্প নয়, এটা কিছু বড় সত্যকে চাপা দেওয়ার ষড়যন্ত্র। নীলয় ফিরে এল বাড়িতে। রেডিও আজ চুপ। যেন অপেক্ষা করছে পরবর্তী পদক্ষেপের। সে আবার উঠল শোভনার ঘরে। এবার খুঁজতে লাগল আরও কিছু—যা হয়তো তাকে সত্যের আরও কাছে নিয়ে যাবে। টেবিলের একটা লকারের নিচে ছিল একটা পুরনো খাম।

তার মধ্যে একটা চিঠি, যেটার উপরে লেখা— “আমার চলে যাওয়া যদি রহস্য থেকে যায়, যদি আমি আর কখনো না ফিরি—তাহলে কেউ যদি ভালোবেসে খোঁজে, তাকে এই চিঠি পৌঁছাক।”

– অর্জুন

নীলয়ের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সে চিঠিটা খুলে পড়ল:

“শোভনা,

আমি জানি না আমি ঠিক কোথায় যাচ্ছি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কেউ আমার পেছনে লেগে আছে। তুমি বলেছিলে রেডিও চালিয়ে রাখবে, তাহলে হয়তো আমার আওয়াজ ফিরবে।

যদি আমি না ফিরি, যদি তোমার গলা কাঁপে, আর কেউ একজন যদি রাতের আঁধারে তোমাকে খোঁজে—তাকে বলো, আমি লেকের দিকে গিয়েছিলাম, কিন্তু ফিরিনি। একটা অদ্ভুত ছায়া আমাকে অনুসরণ করছিল, তার চোখ লাল, আর কণ্ঠে সে বলছিল—”তোমরা সত্য জানতে পারবে না।”

আমি সত্যি ভয় পাচ্ছি। যদি কখনো আমি ফিরে আসি, তবে আমরা আবার রেডিও চালাব। শুধু আমাদের জন্য।

– তোমার অর্জুন”

চিঠির শেষে একটা লাল কালি দিয়ে আঁকা শব্দ—“B.E.L.A.”

এটা কি কোনো সংগঠন? কোনো কোড? নীলয় বুঝতে পারছে, সে এখন আর শুধু রেডিও নয়, এক গভীর ষড়যন্ত্রের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

রাত ১২টা। রেডিও নিজে থেকেই বাজতে শুরু করল।

“তুমি কি এখনো শুনতে পাও?… অর্জুনকে খুঁজে পাওনি এখনো? BELA-র কাছে গিয়েছিলে?”

নীলয় জিজ্ঞেস করল, “BELA কী?”

রেডিও থেকে ফিসফিস আওয়াজ—

“BELA মানে—Bureau for Electro-Liminal Anomalies—ওরা আমাদের আলাদা করে দিয়েছিল। ওরাই আমাদের ভালোবাসার বিরুদ্ধে।”

নীলয়ের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। একটা গোপন সংস্থা? যারা রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে মানুষের ওপর গবেষণা চালায়?

রেডিও আবার বাজল— “তুমি যদি সত্যি জানো, তাহলে লেকের ঘাটে যাও। ওর স্মৃতি এখনো বেঁচে আছে…”

পরদিন সকাল ৬টা। নীলয় রিকশা ধরে গেল বেলেঘাটা লেক।ভোরের আলোয় হালকা কুয়াশা। পাখির ডাক, জল কেটে নৌকার শব্দ। ঘাটের এক কোণায় বসে ছিল এক বৃদ্ধ। হাতে ধরা ছিল একটা পুরনো ট্রান্সজিস্টার।

নীলয় কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

— “এখানে কি কেউ অর্জুন নামে আসত?”

বৃদ্ধ তাকিয়ে বলল,

— “তুই নীলয়?”

— “হ্যাঁ! আপনি চেনেন?”

— “আমি BELA-র প্রাক্তন কর্মী। অর্জুনকে তারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ও বলেছিল, কেউ একজন ভবিষ্যতে আসবে। আর আমি তাকে সব বলব…”

নীলয়ের বুকের মধ্যে বাজ পড়ল। ভোরের আলোয় বেলেঘাটা লেকের ধারে দাঁড়িয়ে নীলয় যেন ইতিহাসের এক ভাঙা পাতায় এসে পড়েছে। সামনে বসে থাকা বৃদ্ধ, যার চোখে দগদগে স্মৃতি আর ঠোঁটে বহুদিন না বলা কথা। নীলয় কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

— “আপনি কে?”

— “আমি ডাক্তার সমরেশ দত্ত। BELA-তে ছিলাম অনেক বছর। আমরা গবেষণা করতাম Electro-Liminal Interactions নিয়ে। যেখানে মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি, প্রেম—সব মিশে যায় রেডিও তরঙ্গে…”

নীলয় কিছুটা স্তম্ভিত।

— “তাহলে রেডিওটা… শোভনার কণ্ঠ…?”

— “হ্যাঁ,” সমরেশবাবু মাথা নাড়লেন, “শোভনার মতো মানুষেরা যারা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, যারা প্রেমকে বিশ্বাস করত, তাদের মন-প্রক্ষিপ্ত স্মৃতি রেডিও তরঙ্গে বন্দি হয়ে যায়। BELA এই শক্তিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।”

— “কিন্তু কেন অর্জুনকে সরানো হল?”

— “কারণ সে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে বুঝে গিয়েছিল—ওরা শোভনার উপর কিছু একটা পরীক্ষা চালাচ্ছে। ও চাইছিল ওকে বাঁচাতে। তাই BELA ওকে সরিয়ে দেয়। ধরে নিয়ে যায়…”

নীলয়ের মাথার ভেতর হঠাৎ এক ঝলক চিত্র ফুটে উঠল—রাত, রেডিও বাজছে, একটা অন্ধকার ঘর, মৃদু চিৎকার, কিছু বিজ্ঞানীরা এক নারীর মাথায় ইলেক্ট্রোড বসাচ্ছে—আর সে কাঁদছে।

সমরেশবাবু ব্যাগ থেকে বের করলেন এক পুরনো ফাইল, মাথায় লেখা—Confidential: Project Sonar-Echo

সেই নথিতে লেখা ছিল: “লক্ষ্য: মানুষের আবেগ ও স্মৃতি রেডিও তরঙ্গে পরিণত করে ভবিষ্যৎ যোগাযোগের একটি নতুন মাধ্যম তৈরি করা।

বিষয়: Subject: S.R. (Shovana Roy)

কার্যপ্রণালী: স্বপ্ন, প্রেম, বেদনা—সব মিলিয়ে টেস্ট সাবজেক্টের মস্তিষ্কে সংরক্ষিত অনুভূতি তরঙ্গে রূপান্তরিত হবে।

ফলাফল: Subject আত্মহননের পথে, কিন্তু তার মনোভাব তরঙ্গে রয়ে গেছে—রেডিওর মাধ্যমে বারবার ফিরে আসছে।”

নীলয়ের গলা শুকিয়ে গেল।

— “তাহলে শোভনার মৃত্যু একটা আত্মহত্যা নয়?”

— “না,” সমরেশবাবু বললেন, “ওর মৃত্যু ছিল এক রিসার্চ-এক্সপেরিমেন্টের ‘Side Effect’। ওর ভালোবাসা রেডিওর মধ্যে বেঁচে গেছে। আর অর্জুন? ওকে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। কারণ ও যদি ফিরে আসত, তাহলে গোটা পরিকল্পনা ধ্বংস হয়ে যেত।”

— “ও কোথায় আছে?”

— “BELA-র একটা পুরনো আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাব ছিল বালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো-র নিচে। ওখানে হয়তো…”

নীলয়ের গলা চেপে এল। সে বুঝে গেল, যা শোভনা চাইছিল—অর্জুনকে খুঁজে বের করা, তা আজই সম্ভব।

রাত ১১টা ৪৫। বালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো। পুরো এলাকা যেন ভূতের শহর। নীলয় লুকিয়ে একটা ভাঙা ট্রামের ফাঁক দিয়ে নিচে নামল। সিঁড়ির নিচে আধা-জীর্ণ দরজা, ধুলো জমা সুইচবোর্ড, এক কোণে রক্তাক্ত পোড়া কাগজ। হঠাৎই এক অস্পষ্ট আওয়াজ ভেসে এল—

“তুমি কি এখনো শুনতে পাও?”

রেডিও নেই এখানে। কিন্তু আওয়াজ স্পষ্ট। চারদিকে যেন সে গলা ঘুরে বেড়াচ্ছে। নীলয় দরজা খুলে ঢুকল। ভিতরে এক আলো-আঁধার ঘর। এক কোণে একটা বড় কাচের কন্টেইনার। ভিতরে ঘুমন্ত অবস্থায় কেউ…অর্জুন।

চোখে পট্টি, হাতে তারকাটা, বুকজুড়ে অজস্র ইলেকট্রোড। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু শ্বাস চলছে।

দেয়ালে লেখা—

“শুধু প্রেমই মৃত্যুর থেকেও শক্তিশালী।”

নীলয় কাছে গিয়ে হাত রাখল অর্জুনের গায়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে চারপাশ কেঁপে উঠল। এক ফিসফিস কণ্ঠে ভেসে এল শোভনার কণ্ঠ—

“তুমি তাকে খুঁজে পেয়েছো… এখন আমার সময় শেষ… বিদায় নাও…”

নীলয়ের চোখ ভিজে গেল।

— “না! তুমি যাবে না! আমি তোমাদের দুজনকে ফেরাতে চাই!”

কিন্তু রেডিও আর কিছু বলে না। ভোরে ডিপো থেকে উদ্ধার করে নীলয় অর্জুনকে নিয়ে আসে বাড়িতে। ডাক্তার এসে দেখে বলে—“শরীর অদ্ভুতরকমভাবে সুস্থ আছে, শুধু ঘুমের মধ্যে আটকে আছে।”

নীলয় জানে—এই ঘুম শোভনার কণ্ঠের শেষ প্রতিফলন। সে জানে, এবার সত্যি সব শেষ। সে শেষবার রেডিও চালায়।কিন্তু এবার কোনো আওয়াজ নেই। শুধু নিঃশব্দে ভেসে আসে শোভনার গান—

“একদিন ফিরে আসবি, রোদ্দুরের শেষ রেখায়…”

নীলয় জানে, ভালোবাসা হারায় না। তারা এবার মিলবে—স্বপ্নে হোক, তরঙ্গে হোক, অথবা অদৃশ্য কোনো অনুভবে।একটি প্রেম, একটি বিজ্ঞান-রহস্য, একটি কণ্ঠ—যা মৃত্যু পেরিয়েও ফিরে আসে। নীলয়ের জীবনে শোভনা আর অর্জুন থাকবেন না হয়ত শরীরে, কিন্তু তাদের কাহিনি থাকবে সেই পুরনো রেডিওর ভেতরে— যা মাঝরাতে কখনো আবার বলবে-

“তুমি কি এখনো শুনতে পাও?”

 

সমাপ্ত

1000022507.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *