ঐন্দ্রিলা সরকার
অধ্যায় ১: “ঘরটি কিন্তু অনেকদিন ধরে খালি…”
কলকাতার উত্তর শহরের এক কোণে, পিচঢালা সরু গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল একটি দু’তলা পুরনো বাড়ি। একসময় হয়তো কারও ভালোবাসায় তৈরি এই বাড়ি আজ যেন শুধুই ইট-পাথরের কাঠামো। দোতলায় কালচে ধূসর রঙের জানালাগুলো দিনের আলোতেও অদ্ভুতভাবে বন্ধ থাকে, যেন ভেতরে কেউ শুয়ে আছে শতাব্দীর ঘুমে। অর্ঘ্য সেনগুপ্ত, সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া এক ছাত্র, এমন একটি ভাড়াবাড়ি খুঁজছিল যেটা সস্তা, নিরিবিলি এবং কলেজের কাছাকাছি হয়। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে এসেছিল আজ। নিচতলায় থাকেন বাড়ির মালিক রাধারমণ দাস, বয়স সত্তরের কাছাকাছি, কথা বলেন খুব কম। অর্ঘ্য যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন এক বৃদ্ধের চোখে-মুখে একটু যেন অবিশ্বাস দেখা যায়। দোতলার ঘরটা দেখিয়ে বললেন, “ঘরটা কিন্তু অনেকদিন খালি আছে, ছেলেটা… সাহস আছে তো?” অর্ঘ্য একটু হাসল, “ভূতে আমি বিশ্বাস করি না কাকু, রুমটা পছন্দ।” চুক্তিপত্রে সই হয়ে যায় সেদিনই। কিন্তু ঘরে ঢোকার সময় এক মুহূর্তের জন্য যেন অর্ঘ্যর গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে — ঘরের ভেতর থেকে যেন কেউ তাকিয়ে আছে, অদৃশ্য কোনও চোখ।
প্রথম দিন ছিল একরকম। বই গুছিয়ে রাখল, জানালা খুলল, একটা সস্তা টেবিল ল্যাম্প বসাল বিছানার পাশে। সন্ধেবেলা জানালা দিয়ে দেখা যায় সামনের গলির রিকশা-ভ্যান, ছেলেমেয়েদের দৌড়ঝাঁপ। মনে হচ্ছিল, পুরনো হলেও জায়গাটা মন্দ না। কিন্তু রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন পরিবেশ পাল্টাতে লাগল। বাইরের শব্দ নিস্তব্ধ হয়ে এলে, বারোটার সময় ঠিক যখন অর্ঘ্য কবিতার বই পড়ছিল, হঠাৎই ভেসে এল একটা কান্নার শব্দ—দুর্বল, চাপা, যেন অনেকটা সময় ধরে জমে থাকা কষ্টের উছলে ওঠা। সে থমকে গেল। ঘড়িতে তাকাল – ঠিক রাত ১২টা। শব্দটা এলো ঘরের উত্তরদিকের জানালার পাশ থেকে। অর্ঘ্য উঠে গেল দরজার কাছে, বাইরের দিকটা দেখতে – কিন্তু কিছুই নেই, কেবল নিঃস্তব্ধতা। সে জানালা বন্ধ করল, নিজেকে বোঝাতে লাগল – পুরনো বাড়ি, কাঠের শব্দ, নাহলে পাশের ফ্ল্যাটে কেউ কাঁদছে। কিন্তু প্রশ্নটা মাথায় রয়ে গেল – এই ঘর তো খালি ছিল অনেকদিন?
পরদিন সকালে অর্ঘ্য কলেজে গিয়ে ক্লাস সেরে, বিকেলে ফিরে এলো। নিচে বসে থাকা কেয়ারটেকার গণেশ কাকুকে জিজ্ঞেস করল, “কাকু, রাতে এই দিকটায় কেউ কাঁদছিল নাকি?” গণেশ কাকুর মুখ একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেল, চোখ সরিয়ে বলল, “বাড়িগুলো পুরনো বাবু, কাঠে অনেক শব্দ হয়।” কিন্তু অর্ঘ্যর মনে শান্তি এল না। পরের রাতে আবারও ঠিক একই সময়ে, আরও স্পষ্টভাবে সেই কান্না এল—আর এবার সঙ্গে মিশে ছিল একটি মেয়েলি কণ্ঠের ফিসফিসানি—“আমি কাউকে ভালোবেসেছিলাম… সে ফিরল না… তুমি কি ফিরবে?” অর্ঘ্য বিছানা থেকে উঠে জানালার দিকে গেল। জানালার কাচে জলীয় আস্তরণ জমে গিয়েছে, আর তাতে এক আবছা মুখের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়—চোখে বিস্ময়, বিরহ আর অপার ভালোবাসার ছায়া। তখন অর্ঘ্য কেবল একটাই কথা বলতে পারে নিজের মনে—”এই ঘরে কেউ আছে, যে এখনও অপেক্ষায়।”
অধ্যায় ২: “তুমি কি সত্যিই ফিরে আসবে?”
রাত আর দিনের মাঝখানের যে অলিখিত সময়, যেখানে স্বপ্ন আর বাস্তবতা মিলেমিশে এক হয়ে যায়—সেই সময়ে আবারও ঘুম ভেঙে যায় অর্ঘ্যর। চোখ খুলতেই দেখে, ঘরটা নিস্তব্ধ। বাইরের রাস্তার আলোর ক্ষীণ ছায়া জানালার ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকেছে, আর তাতে জানালার ধারে একটা আবছা চেহারা দাঁড়িয়ে আছে। অর্ঘ্য চমকে ওঠে, কিন্তু ভয় পায় না। সে এবার স্পষ্ট শুনতে পায়, সেই কণ্ঠস্বর—একটা খুব ধীর কণ্ঠ, যেটা একইসঙ্গে বিষণ্ণ আর কোমল—“তুমি কি ফিরে আসবে? আমি কাউকে ভালোবেসেছিলাম। সে বলেছিল ফিরে আসবে… কিন্তু আসেনি।” অর্ঘ্য নিঃশব্দে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কে?” ছায়ামূর্তি কোনও উত্তর দেয় না, বরং ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় জানালার কাচে। পরদিন সকালবেলা রোদ উঠতেই সব কিছু স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু মনে-মনে অর্ঘ্য বুঝতে পারে, সে কেবল একটা বাড়ি নয়, এক গভীর অপেক্ষার গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
কলেজে ক্লাস চলাকালীনও অর্ঘ্যর মন অস্থির। দুপুরে সে সাহস করে লাইব্রেরি থেকে পুরনো কলকাতার ইতিহাস আর পুরনো বাড়িগুলোর ওপর লেখা কিছু বই বের করে। একটাতে সে পায় সেই রাস্তার নাম—হরনাথ লেন, এবং এক প্রবন্ধে সে দেখে ১৯৮৭ সালে এই বাড়িতেই একটি রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছিল এক কলেজ পড়ুয়ার, নাম ছিল ঈরা ঘোষাল। ঈরা, নামটা শুনেই অর্ঘ্যর শরীরে কাঁপুনি দেয়। প্রবন্ধে লেখা, “ঈরা একসময় এক ছাত্রকে ভালোবাসত, কিন্তু সেই ছাত্র বিদেশ চলে যায়, আর সে আর ফিরে আসে না। ঈরা দিন-রাত চিঠির অপেক্ষায় বসে থাকত। এক রাতে ঈরার নিথর দেহ পাওয়া যায় দোতলার এই ঘরেই।” বইটা বন্ধ করে অর্ঘ্য নিঃশব্দে মাথা নিচু করে। সে ভাবে, “তবে কি ঈরা এখনো এখানেই আছে? তার অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি?” সেই রাতে আবারও ঠিক বারোটায় কান্না আসে, জানালার পর্দা নড়ে, বাতাস কেমন ঘন হয়ে ওঠে। অর্ঘ্য এবার আর ভয়ে পালায় না। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় জানালার দিকে, এবং ফিসফিস করে বলে—“আমি ফিরে আসব। আমি কথা দিচ্ছি।” জানালার কাচে আবারও ভেসে ওঠে ঈরার মুখ, এবার তার চোখে কিছুটা প্রশান্তি।
পরদিন সকালে নিচে নেমে আসে অর্ঘ্য। গণেশ কাকু চা খাচ্ছিলেন বারান্দায়। অর্ঘ্য চুপিচুপি প্রশ্ন করে, “আপনি জানেন তো ঈরা ঘোষাল কে ছিল?” কাকুর মুখ থমকে যায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, “সেই মেয়েটার চোখ ছিল খুব কথা বলা। আমি ছোট ছিলাম তখন। ওর মা-বাবা আগেই মারা গিয়েছিল, মামার বাড়িতে থেকে পড়ত। ছেলেটার নাম ছিল দীপ… ওরা দু’জনেই কলেজে পড়ত। ছেলেটা বিদেশ চলে যায়, আর ফিরে আসে না। ঈরা অপেক্ষা করতেই থাকে। তারপর এক রাতে সে…” কথা শেষ না করেই গণেশ কাকু চোখ নিচু করে ফেলেন। অর্ঘ্য বুঝতে পারে, এই বাড়ির ইট-সুরকির ফাঁকে লুকিয়ে আছে এক অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প। এবং তার নিজস্ব জীবনের ব্যর্থ প্রেমের ছায়াও যেন মিশে যাচ্ছে ঈরার ভালোবাসার প্রতিধ্বনির সঙ্গে। তার ভেতরে একটা অনুভব জেগে ওঠে—সে যদি পারে, ঈরার এই অপেক্ষাকে যেন কোনওভাবে পরিণতি দিতে চায়।
অধ্যায় ৩: “যদি চিঠিটা পৌঁছাত…”
পুরনো বাড়ির কাঠের মেঝেতে হাঁটার শব্দ যেন আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে এখন। যেন কেউ প্রতি রাতে হাঁটে… জানালার কাছে আসে… ফিরে যায় দরজার দিকে। অর্ঘ্য বিছানায় বসে একভাবে তাকিয়ে থাকে জানালার দিকে। সেই ছায়ামূর্তি আজ আবারও এসেছে। আজ তার কণ্ঠস্বর আরও মৃদু, যেন এক পুরনো দিনের চিঠির মতো। “আমি লিখেছিলাম… ওকে বলেছিলাম যেন ফিরে আসে… কিন্তু সে উত্তর দেয়নি।”
অর্ঘ্য ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করে, “তোমার নাম ঈরা, তাই তো?”
ছায়া একবার মাথা নাড়ে, তারপর বলে, “আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম, দীপকে। আমরা প্রতিদিন এই জানালার ধারে বসতাম। আমি ওর জন্যে কবিতা লিখতাম, আর সে বলত, ‘তুই পাগল মেয়ে, তোর কবিতা পড়ে আমি মরে যাব একদিন।’ সে আমার কপালে চুমু খেয়ে বলত, ‘আমি ফিরে আসব।’ কিন্তু সে কথা রাখেনি… তুমি কি কথা রাখবে?”
অর্ঘ্য বুঝতে পারে, শুধু এক অলৌকিক আত্মা নয়, ঈরা যেন তার অতীতের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। আমরাও হয়তো কাউকে হারিয়েছি, কেউ হয়তো আমাদের কথা রেখেনি। সেই অনুভবটা একেবারে গভীরে ঢুকে যায় তার।
পরদিন সকালে অর্ঘ্য যায় কলেজের লাইব্রেরিতে। সেকেন্ড ইয়ারের এক ছাত্রী অন্বেষা, যার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা হয়, তাকে নিয়ে গিয়ে প্রস্তাব দেয়—“তুই পুরনো কলেজ রেকর্ড ঘাঁটতে পারবি? আমি একটা মেয়ে সম্পর্কে জানতে চাই… অনেক বছর আগে এখানে পড়ত।”
অন্বেষা অবাক হয়, কিন্তু রাজি হয়। বেশ কিছু পুরনো রেজিস্টার, ম্যাগাজিন ঘাঁটতে ঘাঁটতে তারা পায় ১৯৮৬ সালের কলেজ বার্ষিকী, যেখানে ঈরা ঘোষালের লেখা একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। কবিতার নাম: “পথে থাকিস, আমি ফিরব”।
অর্ঘ্য কবিতাটি পড়ে, চোখে জল চলে আসে—
“যদি ফিরে আসিস একদিন সন্ধেয়,
দেখবি আমি জানালায় বসে আছি।
হয়তো শরতের আলোয় আমি ছায়া হব,
কিন্তু হৃদয়ে, আমি তো তোরই আশায় থাকব।”
এর নিচে লেখা: ঈরা ঘোষাল, দ্বিতীয় বর্ষ, ইংরেজি সাহিত্য।
আরও খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পারে—ঈরার বন্ধুরা বলত, দীপ নামের একটি ছেলে তাকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু দীপ স্কলারশিপ পেয়ে আমেরিকা চলে যায়। যাওয়ার আগে ঈরার জন্যে একটা চিঠি রেখে গিয়েছিল গণেশ কাকুর কাছে, কিন্তু… সেই চিঠি কখনো ঈরার হাতে পৌঁছায়নি।
অর্ঘ্য চমকে ওঠে। “চিঠিটা পৌঁছালে হয়তো সবটা বদলে যেত! ঈরা আর আত্মহত্যা করত না…”
সে ছুটে যায় গণেশ কাকুর কাছে। অনেক অনুরোধের পরে কাকু একটা পুরনো ড্রয়ার থেকে হলুদ হয়ে যাওয়া খাম বের করেন। সেই খামে লেখা—“To My Eira. I’ll return. Promise.”
অর্ঘ্যর হাত কাঁপতে থাকে, সে খামটা নিয়ে ধীরে ধীরে দোতলায় ওঠে।
সেই রাতে, প্রথমবার ঈরার আত্মা সম্পূর্ণ রূপে প্রকাশ পায়। সাদা শাড়ি পরা, কপালে লাল টিপ, চোখে দীর্ঘ অপেক্ষার কুয়াশা। অর্ঘ্য খুব ধীরে চিঠিটা বাড়িয়ে দেয়। “এটা তোমার জন্যে। দীপ রেখে গিয়েছিল। চিঠিটা তোমার হাতে পৌঁছায়নি… আমি নিয়ে এসেছি।”
ঈরার হাত কাঁপছে, চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু—কিন্তু সে এবার হাসে।
“সে ফিরবে না জেনেও… কেউ আমার জন্য ফিরেছে। আমি অপেক্ষা করেছি, আর তুমি সেই অপেক্ষার প্রতিফলন।”
ঘরটা এক অদ্ভুত আলোয় ভরে ওঠে। ঈরার শরীর যেন বাতাসের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে ধীরে ধীরে।
শেষ কথাটা ছিল, “তোমার চোখে আমি আবার ভালোবাসা দেখেছি। বিদায়।”
আর মুহূর্তের মধ্যে ঘর নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
অধ্যায় ৪: “যা থেকে যায়, তা কি শেষ হয়?”
ঈরার আত্মা বিদায় নেওয়ার পর যেন সেই ঘরটা হঠাৎ অন্যরকম হয়ে যায়। জানালার পর্দা আর অকারণে উড়ে না, রাত বারোটায় আর কান্নার শব্দ শোনা যায় না। ঘরের বাতাসটা যেন এক গোপন ভারমুক্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। কিন্তু অর্ঘ্যর মনে একটা শূন্যতা রয়ে গেছে—যা শব্দ হয়ে উঠত না, কিন্তু ঘুমের ভিতরে ছায়া হয়ে ঢুকে পড়ত। একদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবল—“আমি কী দেখলাম? আমি কী অনুভব করলাম? আমি কার জীবনের অসমাপ্ত গল্পের ভিতর দিয়ে নিজের জীবনকেও নতুন করে চিনলাম?” সেই রাতগুলোর কথা ভাবলে আজও তার গায়ে কাঁটা দেয়, কিন্তু সেই ভয়টা আর অন্ধকার নয়—এটা এক ধরনের শ্রদ্ধা, এক গভীর প্রেমের প্রতি যে সময় পেরিয়েও মুছে যায় না।
কলেজে ফিরে গিয়ে অর্ঘ্য আবার ক্লাসে মন দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে আগের মতো নেই। সাহিত্যের প্রতিটি কবিতা এখন তার কাছে বাস্তব। কোনও শব্দ শুধু শব্দ নয়, সব যেন কারও নিঃশ্বাস, অপেক্ষা, প্রতিজ্ঞার ছায়া। অন্বেষার সঙ্গে তার বন্ধুত্বটা আরও গভীর হয়। একদিন লাইব্রেরিতে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে অন্বেষা বলে, “তুই কি ঈরাকে এখনো অনুভব করিস?” অর্ঘ্য একটু চমকে উঠে বলে, “আশ্চর্য, তুই নামটা বললি কী করে?” অন্বেষা একটু হাসে, “আমারও তো তোর মতোই অনুভব হয়… হয়তো আমি নিজে কখনো ঈরাকে দেখিনি, কিন্তু তোকে দেখে আমি যেন তাকে চিনে গেছি।” সেই মুহূর্তে অর্ঘ্যর মনে হয়, ঈরা হয়তো তাকে শুধু নিজস্ব শান্তির খোঁজেই ডাকেনি—তার হাত ধরে একটা নতুন রাস্তায় চালিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছে। হয়তো প্রেম শুধু অতীতে আটকে থাকে না, সে ভবিষ্যতেরও পথ খোলে।
এরপরের দিনগুলোয় অর্ঘ্যর ঘরে কেউ আর দেখা দেয় না। তবে ঈরার কবিতার খাতা, পুরনো বইয়ের ভিতরে রাখা গোলাপের শুকনো পাঁপড়ি, আর সেই চিঠিটা সে যত্ন করে রেখে দেয় নিজের ডেস্কে। প্রতি রাতে শোওয়ার আগে একবার তাকায় সে চিঠির দিকে—যেটা যদি সময়মতো পৌঁছাত, তবে এক জীবন বদলে যেত। সেই ভুলটা যেন দ্বিতীয়বার না হয়—এটাই অর্ঘ্য ঠিক করে নেয়।
একদিন সন্ধ্যায়, অন্বেষাকে নিয়ে সেই পুরনো বাড়ির বারান্দায় বসে অর্ঘ্য বলে, “তুই জানিস, প্রেম শুধু মানুষকে বাঁধে না, সে সময়কেও ছুঁয়ে যায়।”
অন্বেষা চুপ করে, তারপর তার হাত ধরে বলে, “তুই যে ঈরার কাছে ফিরেছিলি… এবার যদি কেউ তোকে ডাকে, তুই কি আবার ফিরবি?”
অর্ঘ্য ধীরে মাথা নাড়ে। “হ্যাঁ, আমি এবার কথা দিয়ে যাচ্ছি, আমি ফিরব।”
চাঁদের আলোয় তখন বারান্দার ছায়া লম্বা হয়ে উঠছে। আর দূরে কোথাও যেন হাওয়ার মধ্যে এক মিষ্টি হাসির শব্দ শোনা যায়—হয়তো ঈরা, যিনি এখন আর ত্রস্ত আত্মা নন—বরং হয়ে উঠেছেন প্রেমের এক চিরন্তন প্রতীক।
অধ্যায় ৫: “ভালোবাসা কি বারবার জন্ম নেয়?”
সময়ের ফাঁকে ফাঁকে কখনো-কখনো কিছু সম্পর্ক ঠিক ভাষা খুঁজে পায় না—তারা নিঃশব্দে জন্ম নেয়, নিঃশব্দেই গভীর হয়। অর্ঘ্য আর অন্বেষার মধ্যে ঠিক এমনটাই ঘটছিল। ওরা কোনওদিন সরাসরি বলেনি, “ভালোবাসি”—তবে প্রতিটি চোখের চাহনি, ছোট ছোট কথায় লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য টান। ঈরার চলে যাওয়ার পর অর্ঘ্যর ভিতরে যেটুকু শূন্যতা জন্মেছিল, অন্বেষা ধীরে ধীরে তা ভরিয়ে তুলছিল। তবে এ সম্পর্কের ভিতরেও ছিল ভয়—ভালোবাসা যদি আবার একতরফা হয়ে যায়? যদি প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায় কিন্তু রাখা না যায়? সেই সব দ্বিধার মধ্যেও, এক বিকেলের আকাশের নিচে কলেজের পেছনের বটগাছের ছায়ায় বসে অর্ঘ্য হঠাৎ বলে ফেলে, “তুই থাকিস আমার সঙ্গে… কথা দে, তুই হারিয়ে যাবি না?”
অন্বেষা তখন থেমে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, “তুই যদি আমার অপেক্ষায় থাকতে পারিস… আমি কখনোই হারিয়ে যাব না।”
ওই এক মুহূর্তে অর্ঘ্য বুঝে যায়—ভালোবাসা বারবার জন্ম নেয়। কখনও কারও হয়ে শেষ হয়ে যায় না; বরং এক সম্পর্ক থেকে আরেক সম্পর্কে তার ছায়া গিয়ে পড়ে, আলো দিয়ে যায় নতুন পথ।
ঈরার ঘরটা এখন অর্ঘ্যর নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে। জানালার ধারে একটা ছোট্ট ডেস্কে সে এখন নিয়মিত লিখে—নিজের কবিতা, নিজস্ব অনুভব। ঈরার পুরনো খাতাটা সে তুলে রেখেছে আলমারির ভিতরে, যেন সময়ের এক সযত্ন স্মারক। মাঝে মাঝে অন্বেষা আসে ঘরে, জানালার পাশে বসে বই পড়ে, গান শোনে, আর জানে না—ঠিক এই জানালার ধারে একদিন ঈরা বসত, অপেক্ষা করত সেই প্রতিশ্রুত চিঠির জন্য। অর্ঘ্য একদিন তাকে বলেছিল, “এই জানালার কাচে একদিন ছায়া পড়ত, আজ তার বদলে তুই বসিস। কিন্তু জানিস, দুটোই সমান সত্য। কারণ ছায়া যেমন চলে যায়, তেমনই আলোও রেখে যায় কিছু গভীর চিহ্ন।”
অন্বেষা তখন হাসে, “আমি জানি, তুই অতীত ভোলিসনি। আর আমি চাই না তুই ভুলো। আমি শুধু চাই, তুই জানিস—ভালোবাসা আবারও আসতে পারে, নতুন রূপে।”
এক সন্ধ্যায় তারা দুইজনে হাঁটছিল উত্তর শহরের পুরনো গলি দিয়ে, যেখানে সময় থেমে আছে যেন। হঠাৎ বৃষ্টি নামে। দুজনে একটা পুরনো পোড়াদেওয়াল বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে পড়ে। অর্ঘ্য বলে, “জানিস, ঈরার শেষ কথাটা ছিল, ‘তোমার চোখে আমি আবার ভালোবাসা দেখেছি।’ তুই জানিস, আমি তোর চোখে সেটা দেখি এখন।”
অন্বেষা এবার প্রথমবার চোখের কোণে জল নিয়ে বলে, “তাহলে তোদের গল্পটা শেষ হয়নি, সে এখন আমাদের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকছে।”
অর্ঘ্য চমকে ওঠে। হ্যাঁ—এটাই তো সত্যি। প্রেম কখনো একজনে শেষ হয় না।
সে ঘর, সেই জানালা, সেই ছায়া—সব মিলিয়ে তারা এখন এক নতুন ভালোবাসার জায়গায় দাঁড়িয়ে।
আর হঠাৎ, একঝলক বাতাসে অর্ঘ্যর কানে ভেসে আসে এক মৃদু কণ্ঠস্বর—কিছুটা দূর থেকে, যেন হাওয়া হয়ে গেছে সে, তবুও তার কণ্ঠে প্রশান্তির ছায়া—
“ধন্যবাদ… তুমি ফিরেছিলে।”
অধ্যায় ৬: “ফের দেখা, ফের ছায়া”
জুলাই মাসের এক গভীর রাতে, হঠাৎ করেই অর্ঘ্যর ঘুম ভেঙে যায়। জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ করে। ঘরের ভেতর নিঃশব্দ, কিন্তু তার মনে হয়—কেউ খুব ধীরে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সে উঠে বসে, আলো জ্বালায় না—শুধু শোনে। দরজার ওধারে সত্যিই কি কেউ? না কি তার নিজের মনই এখন ভুল শব্দ তৈরি করে নিচ্ছে? কয়েক মুহূর্ত কিছু শোনা যায় না, তারপর খুব স্পষ্ট একটি শব্দ—চুড়ির টুংটাং। অর্ঘ্যর শরীর কাঁপে। বহুদিন সে এই শব্দ শোনেনি। ঈরার বিদায় নেওয়ার পর এমন শব্দ আর আসেনি কখনও। এবার কি তাহলে… ঈরা ফিরে এসেছে?
সে ধীরে দরজার কাছে যায়, হ্যান্ডেল ঘোরায়, খুলে দেখে বাইরে কেউ নেই। কিন্তু বারান্দায় ভিজে পড়ে আছে একটি সাদা ফুল—শুকনো নয়, সদ্য ছিঁড়ে আনা। অর্ঘ্য ফুলটা হাতে তুলে নেয়, আবার বিছানায় বসে। হঠাৎ মনে পড়ে যায় ঈরার কবিতার একটা লাইন—“যদি কখনো ফিরে আসি, চুড়ির শব্দে চিনিস আমাকে।”
তাহলে কি এ শুধুই কাকতালীয়? না কি ঈরা কিছু বলতে চাইছে আবার?
পরদিন সকালে সে নিচে গিয়ে গণেশ কাকুর সঙ্গে দেখা করে। কাকু চুপ করে শোনেন তার কথা, তারপর হঠাৎ বলেন, “বাবু, তুই যেদিন চিঠিটা দিলি ঈরার হাতে, আমি রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। ঈরা হাসছে, কিন্তু পেছনে ছায়া পড়ে আছে এক বালিকার… তার চোখেও অপেক্ষা। তুই জানিস, ঈরার ছোটবোন ছিল একসময়। সাত বছর বয়সে হারিয়ে যায় বাড়ির উঠোন থেকে। কেউ খুঁজে পায়নি।”
অর্ঘ্য হতবাক হয়। “কিন্তু ঈরা তো কখনও বলেনি…”
গণেশ কাকু মাথা নাড়ে, “সে কথাটা ভুলতে চেয়েছিল হয়তো। কিন্তু আত্মা তো মুছে যায় না। তোর ঘরে শুধু ঈরার অপেক্ষা ছিল না, আরও কারও—হয়তো তার বোনের, যার জন্য ঈরার আত্মা আজও বাঁধা পড়ে রয়েছে। হয়তো সেই আত্মা এখনও জানে না, তার দিদি চলে গেছে শান্তিতে। সে এখনও জানালার ধারে বসে থাকে।”
অর্ঘ্য এবার বুঝতে পারে—ঈরার প্রেমের গল্প শেষ হলেও, এই বাড়ির ইতিহাস এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। হয়তো নতুন রহস্য, নতুন ছায়া তার অপেক্ষায়।
সেই রাতেই অর্ঘ্য তার ডেস্কে বসে লিখতে থাকে—এক নতুন কবিতা, যার নাম দেয়: “ছায়ার বোন”।
ঠিক রাত বারোটায়, হঠাৎ জানালার কাঁচে শিশুর হাতের ছাপ দেখা যায়—ছোট্ট হাত, ভেজা কাচে ঘষা দিয়েছে।
আর তখনই বাতাসে এক শীতল অনুভব, আর কানে আসে একটি কণ্ঠস্বর—না তা ঈরার মতো বিষণ্ণ নয়, বরং জিজ্ঞাসা মেশানো কৌতূহলভরা—
“দিদি কোথায়?”
অর্ঘ্য থমকে যায়। ঘরের ভিতর আবার এক নতুন ছায়া এসেছে—এই গল্প এবার শুধুই প্রেমের নয়, এটা হয়ে উঠছে এক পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের অদৃশ্য সেতুবন্ধ। ঈরার প্রেম শেষ হয়েছে, কিন্তু তার অতীত এখনও নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করেছে।
অধ্যায় ৭: “যে কেউ ফিরে আসে না…”
জানালার কাঁচে সেই ছোট হাতের ছাপ এখনও রয়ে গেছে। অর্ঘ্য সারারাত ঘুমোতে পারেনি। সে চুপ করে বসে ছিল বিছানায়, মোমবাতির আলোয় শুধু তাকিয়ে ছিল জানালার দিকে। হঠাৎ মাঝরাতের বাতাসে এক শিশুর কান্নার হালকা আওয়াজ ভেসে আসে। সেটা স্পষ্ট নয়, যেন কেউ কাঁদতে কাঁদতে হারিয়ে যাচ্ছে দূরের কোথাও।
“দিদি কোথায়?”
এই প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে। এবার অর্ঘ্য উঠে দাঁড়ায়, ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় জানালার কাছে। কিন্তু জানালার কাঁচে কিছু নেই, শুধু বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। তারপর হঠাৎই তার চোখ পড়ে মেঝেতে রাখা ঈরার কবিতার খাতার পাশের একটি নতুন কাগজে—যেটা সে রাখেনি। তাতে শিশু হাতে লেখা একটা লাইন:
“আমি জলটায় পড়ে গেছিলাম। কেউ আমায় ডাকেনি।”
অর্ঘ্যর শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। কে লিখল এই কথা? ঈরার বোন কি জলাশয়ে পড়ে মারা গিয়েছিল? আর সেই মৃত্যুও কি রহস্যময়?
পরদিন সকালে গণেশ কাকুর মুখে শোনা যায় সেই পুরনো দিনের গল্প—
“ঈরার ছোটবোনের নাম ছিল কিয়ারী। খুব চুপচাপ, মাটির পুতুল নিয়ে খেলত সারাক্ষণ। একদিন বর্ষার দিনে বাড়ির পিছনের পুকুরে চলে গিয়েছিল… কেউ খেয়ালও করেনি। সন্ধ্যায় যখন খোঁজা শুরু হয়, তখন আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেদিন থেকেই ঈরা চুপ হয়ে যায়। কারও সঙ্গে আর কথাই বলত না। মা-বাবা তখন মৃত, মামা থাকত কলকাতার বাইরে… ঈরা একরকম কিয়ারীর দিদি-মা ছিল। আর সেদিনের পর ও যেন নিজেকে দোষী মনে করতে থাকে।”
অর্ঘ্য শুনে স্তব্ধ। ঈরার ভালোবাসার গল্পটা সে জানত, কিন্তু ঈরার অপরাধবোধের এই গভীর ছায়া সে কখনও আঁচ করতে পারেনি।
“তাহলে ঈরা শুধু দীপের জন্য অপেক্ষা করেনি,” সে ভাবে, “সে তো নিজের বোনেরও অপেক্ষায় ছিল। হয়তো মৃত্যুর পরও সে শান্তি পায়নি, কারণ কিয়ারীর আত্মা এখনও দিকভ্রান্ত।”
অর্ঘ্য সেই রাতে মেঝেতে বসে, সামনে রাখে দুটি জিনিস—ঈরার চিঠি, আর একটি ছোট পুতুল। সে জানে, ছায়া হয়তো আবার আসবে।
ঠিক রাত বারোটায় বাতাস আবার ভারী হয়ে ওঠে। এবার দরজার দিকে নয়, অঘোরে সে দেখতে পায়, বিছানার পাশে এক ক্ষীণ ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। সাদা ফ্রক, খালি পা, চুল এলোমেলো। মেয়েটি তাকিয়ে থাকে শুধু।
অর্ঘ্য ধীরে ধীরে বলে, “তোমার দিদি চলে গেছে শান্তিতে। সে চেয়েছিল তুমি যেন ভয় না পাও, তুমি যেন হারিয়ে না যাও আর। আমি আছি।”
ছায়াটা কাছে আসে, হাতটা বাড়ায়। তার চোখে জল নেই, শুধু এক দীর্ঘশ্বাস।
“তুমি কি আমার হাত ধরে রাখবে? এবার কি কেউ ডাকবে?”
অর্ঘ্য হাত বাড়িয়ে দেয়। আর মুহূর্তেই ছায়াটা মিলিয়ে যায়—তবে ভয় নয়, এবার যেন এক শান্তির আভা রেখে যায় ঘরে। জানালার কাচে সেই শিশুর হাতের ছাপ মুছে যায় নিজের থেকেই।
অধ্যায় ৮: “ছায়ারা ফেরে না, তারা থেকে যায়”
ঈরার জানালার ঘরটা এখন একেবারে শান্ত। আর কোনও কান্না, চুড়ির শব্দ, শিশুর ফিসফিসানি ভেসে আসে না। বাতাসও যেন হালকা হয়ে গেছে। অর্ঘ্য মাঝেমধ্যেই ভাবত—যারা সত্যিকারের ভালোবাসে, তারা কি কখনও পুরোপুরি চলে যেতে পারে? না কি তারা থেকে যায়, নিঃশব্দে—একটা জানালার পাশে, একটা কবিতার লাইনের ভেতরে, কিংবা কারও চোখে ভেসে ওঠা ছায়ার মতো?
একদিন বিকেলে, অর্ঘ্য সেই পুরনো ডেস্কে বসে তার কবিতার খাতা বন্ধ করে রাখল। এই ঘরটা তাকে দিয়েছে ভয়, কাঁপুনি, প্রেম, বন্ধন—সব। এখন সে যেন নিজেই একটি নতুন জীবন শুরু করতে প্রস্তুত। অন্বেষা জানালার ধারে বসে রোদ মেখে চুল শুকোচ্ছে।
অর্ঘ্য হঠাৎ বলে, “এই ঘরটা আমি ছাড়ছি। এবার নতুন জায়গায় থাকব।”
অন্বেষা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুই কি ভয় পাচিস?”
অর্ঘ্য মাথা নাড়ে, “না। ভয় নেই। বরং আমার মনে হচ্ছে, এখানে আমার ভূমিকা শেষ। এখন এই ঘরটাকে বিশ্রাম দেওয়া দরকার। যেন আর কেউ এখানে এসে অতীতকে না নাড়ে।”
অন্বেষা একটুও দ্বিধা না করে বলে, “তুই যেখানে যাবি, আমি সেখানেই থাকব।”
চলতি সপ্তাহে বাড়িতে নতুন ভাড়াটে খোঁজা হচ্ছে। রাধারমণ দাস কাকা আসছেন ঘর দেখাতে। এক দম্পতি এসেছে—সৌম্য আর তনুশ্রী। সদ্য বিয়ে হয়েছে, শহরে নতুন চাকরি নিয়ে এসেছে। তারা ঘর দেখে মুগ্ধ।
“বাহ, এত সুন্দর আলো আসে জানালায়! কত শান্ত একটা ঘর!”
তাদের কথা শুনে অর্ঘ্যর চোখে একবার ছায়া ভেসে ওঠে। কিন্তু সে কিছু বলে না। বিদায়ের আগে ঘরের মেঝেতে সে রেখে যায় একটি চিঠি।
চিঠির ভাষা সরল—
“যদি কোনোদিন কোনো ছায়া দেখো জানালার ধারে, ভয় পেও না। ওরা কেউ তোমার ক্ষতি করবে না। ওরা শুধু ভালোবেসেছিল। আর ভালোবাসা কখনও ভয়ংকর হয় না। এই ঘরটা একসময় কারও অপেক্ষার ঘর ছিল। আজ সেটা তোমার নতুন জীবনের শুরু।”
চিঠির নিচে সই নেই। কিন্তু জানালার পাশে রাখা থাকে একটি শুকনো গোলাপ আর একটি ছোট পুতুল।
শেষ বিকেলে, অর্ঘ্য আর অন্বেষা রিকশায় উঠে চলে যাচ্ছে। পেছনের দিকে তাকিয়ে অর্ঘ্য দেখতে পায় জানালার কাচে একবারের জন্য আবছা একটি ছায়া—মুখে শান্ত হাসি, চোখে আলোর ছটা। ঈরা। পাশে আরেকটি ক্ষীণ ছায়া—কিয়ারী। তারা কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে।
আর অর্ঘ্য জানে—তারা এখন শান্তিতে।
সমাপ্তি




