Bangla - প্রেমের গল্প

রং নাম্বার প্রেম

Spread the love

সুদীপ্তা পাল


কলকাতার জুন মাসের সন্ধ্যাবেলা যেন সব সময় একটু বেশি ক্লান্ত লাগে। সায়ন্তনী দত্ত অফিস থেকে ফিরেই মোজা খুলে বিছানার কোণে ছুঁড়ে ফেলে দিল, আবার চোখ রাখল ফোনে — স্ক্রিনে লেখা, “Missed call from unknown number.” এভাবে হুটহাট কল আসে প্রায়ই, বেশিরভাগই ক্রেডিট কার্ড অফার বা ওয়ারেন্টি বাড়ানোর ফাঁদ। কিন্তু আজ অফিসে বসে একটা ফোন করেছিল সে, তড়িঘড়ি করে, সেলস টার্গেটের তাড়নায়—কাস্টমার কেয়ার ভেবে একটা নাম্বার ডায়াল করেছিল, তারপর যেই না ওপার থেকে একজন ঠান্ডা, গম্ভীর কণ্ঠে “হ্যালো?” বলল, তখনি সে বুঝে গেছিল নাম্বারটা ভুল। সে “সরি, wrong number” বলে ফোন কেটে দিলেও কণ্ঠটা কেমন যেন থেকে গেল মাথার ভেতর। দিনশেষে যখন গরমের তাপে বালিশটা উলটে ফেলছে, তখনই হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল — সেই ভুল নাম্বার থেকেই। এইবার একটা টেক্সট, “Hi, আমি বুঝি না আপনি কারে খুঁজছিলেন, কিন্তু আপনার ভয়েসটা বেশ সুন্দর।” সায়ন্তনী প্রথমে বিরক্ত হয়েছিল, এরপর খানিকটা কৌতূহলী। প্রতিদিনের বোরিং কাজের মাঝে এই একরাশ অচেনা কিছু যেন উত্তেজনা তৈরি করেছিল তার ভেতর। সে কেবল ছোট করে রিপ্লাই করল, “Thanks. Sorry for disturbing you.” আর তখনই সেই অপরিচিত মানুষটির দ্বিতীয় বার্তা — “Disturb নয়, distraction বলি। চলবে তো?”

এরপর গল্পটা থেমে থাকেনি। সেই অপরিচিত মানুষটি নিজেকে পরিচয় দিল ‘নির্বাণ চট্টোপাধ্যায়’ নামে — নামের মধ্যে কী যেন একটা ভার, একটা ছায়া। সে জানাল, সে একটি স্টার্টআপ চালায়, কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের জন্য টেক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। কথাবার্তায় কোথাও কোনো চাপ ছিল না, কোনো ভণিতা ছিল না, বরং একটা ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস। সায়ন্তনী প্রথমবারের মতো অনুভব করল, কোনো পুরুষ তার সঙ্গে শুধুই হাই-হ্যালোর বাইরে গিয়ে গভীর কথা বলতে আগ্রহী—তাও ভার্চুয়ালি, ছবি ছাড়া, মুখ না দেখে। নির্বাণ কখনো সেলফি চায়নি, কখনো কল করতে জোর দেয়নি, শুধু মেসেজ করেছে নিয়ম করে — “আজ তোমার দিন কেমন গেল?”, “তুমি বেশি চাপ নিও না”, “এই গানটা শুনেছো?” একটা সম্পর্ক যেটা শুধু স্ক্রিন আর শব্দের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে, তা আদৌ কি সত্যি হতে পারে? প্রতিদিন সকাল অফিস যাওয়ার আগে তার একটা বার্তা থাকত, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটা গান রিকমেন্ডেশন। সায়ন্তনীর জীবনটা যেন একটা মোবাইল স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ হয়ে উঠছিল, কিন্তু সে খুশি ছিল। কারণ সে জানত—অন্তত একজন আছে যে তাকে মন দিয়ে শুনছে।

দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল হোয়াটসঅ্যাপের ডাবল টিক, ভয়েস নোট, আর ইনস্টাগ্রাম স্টোরির জবাবে। সায়ন্তনী যখন বাসে বসে ক্লান্ত চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত, তখন একটা মেসেজ ভেসে উঠত—“তুমি আজ খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছো মনে হয়, নিজেকে একটু সময় দিও।” নির্বাণ কিছুই জানতে চাইত না, শুধু সঙ্গ চাইত। সায়ন্তনীর কাছেও ভালো লাগছিল এই দূরত্বে গড়ে ওঠা সম্পর্ক—যেখানে কোনো দায় নেই, কোনো প্রশ্ন নেই, কেবল অনুভূতির জায়গাটা উন্মুক্ত। তবে সে একবারও দেখে ওঠেনি নির্বাণের মুখ, শোনেনি তার লাইভ কণ্ঠ। শুধু শব্দ, শুধু লেখা, আর কিছু অচেনা সময় ভাগ করে নেওয়ার মুহূর্ত। কিন্তু সে জানত না—এই নির্ভরতা আস্তে আস্তে অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে, অভ্যাস থেকে আসক্তিতে। আর এই মোহের ভেতরেই যে লুকিয়ে আছে এক ভয়ানক শূন্যতা—যেটা সে টের পাবে যখন একদিন হঠাৎ সব বন্ধ হয়ে যাবে। আপাতত সে জানত শুধু এটুকু: “ভুল নাম্বারটা, বোধহয় তার জীবনের সবচেয়ে সঠিক মুহূর্ত নিয়ে এসেছিল।”

কলকাতার গ্রীষ্মকালের এক ঘামভেজা দুপুরে সায়ন্তনী ট্রামে উঠেছিল শুধু এক কাপ ঠান্ডা ডাব খাওয়ার আশায়। অফিসের কাজ ছিল শ্যামবাজার সাইডে, কিন্তু সে ইচ্ছে করেই ট্রামের গতি মেনে ধীরে চলতে চেয়েছিল। কানে হেডফোন, হাতে ফোন—আর মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই নাম: নির্বাণ। এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে তাদের আলাপের, অথচ একবারও দেখা হয়নি, ভিডিও কল হয়নি, এমনকি কোনো ছবি আদানপ্রদানও হয়নি। কিন্তু সায়ন্তনীর অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল যেন সে নির্বাণকে চেনে—তার মেসেজের লাইনগুলোতে, GIF-গুলোর মধ্যেও একটা নির্জনতা থাকে, আর ভয়েস নোটগুলো এমনভাবে কথা বলে, যেন কেউ খুব সাবধানে তার ভেতরের দেয়ালগুলো ভাঙতে চাইছে। “তোমার কণ্ঠে যেন একটু আকাশের মতো শূন্যতা আছে,” নির্বাণ একদিন বলেছিল। সায়ন্তনী হেসেছিল, কিন্তু মুখ ফিরিয়ে। ফোনের স্ক্রিনে তখনও তার ভেসে উঠছিল সেই ছোট্ট ডিপি—কোনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে তোলা, এক নিঃসঙ্গ সন্ধ্যার ছবি।

সেদিন সন্ধ্যেবেলা সে প্রথমবার ইনস্টাগ্রামে নির্বাণকে খুঁজল। সেই নামেই ছিল একটি প্রাইভেট অ্যাকাউন্ট—ফলোয়ার কম, পোস্টে কবিতা, নৈশ দৃশ্য, আর পুরনো বইয়ের পাতা। ছবির ক্যাপশনগুলো যেন নিঃশব্দে বলে দিচ্ছিল, “আমি কাছে যেতে পারি না, কিন্তু হারিয়ে যেতে জানি।” সায়ন্তনী রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল, কিছুক্ষণ পরই একসেপ্ট এল। তারপর শুরু হল ইনস্টাগ্রাম স্টোরির আদানপ্রদান, রিল শেয়ার করা, মাঝেমধ্যে late-night reels-এ কমেন্ট করা। সায়ন্তনীর বুকের ভেতর যেন অদ্ভুত কিছু নড়ছিল—এই ছেলেটা কি সত্যিই আস্তে আস্তে তার সবটুকু জেনে ফেলছে? নাকি সে নিজেই সব কিছু অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফাঁস করে দিচ্ছে, একটা স্ক্রিনের ওপারে থাকা এক অচেনা মানুষকে? এক রাতে, যখন সে একা বারান্দায় বসে শহরের বাতাস গুনছিল, তখন নির্বাণ লিখেছিল: “তুমি কি কখনও কাউকে না দেখেই ভালোবেসেছো?” প্রশ্নটা এসে গেঁথে গেল তার চোখের কোণে। সায়ন্তনী রিপ্লাই দিল না। শুধু স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল, যেন উত্তরটা চ্যাটবক্সে নয়, তার হৃদয়ের নীরব কোণে ছাপ পড়ে গেছে।

নির্বাণ ধীরে ধীরে সায়ন্তনীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। সকালবেলা স্নান করে সে মেসেজ চেক করত—“ঘুম থেকে উঠেছো?”, আর রাতে ক্লান্ত চোখে বলত, “আজ তোমার গলাটা ক্লান্ত শোনাচ্ছে।” অফিসের মিটিংয়ে বসে থেকেও সে চ্যাটের রিপ্লাই দিত, কনফারেন্সের মাঝে টাইপ করত, “তুমি এখন কী করছো?” কিছু একটা ছিল নির্বাণের কথায়—না কোনো প্রেমের ছল, না কোনো তাড়াহুড়ো—শুধু এমন এক ধীর অথচ গভীর টান, যা সায়ন্তনীকে তার চারপাশের বাস্তবতা থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতিও ফিকে হয়ে যাচ্ছিল এই অনলাইন সংযোগের কাছে। অথচ, এই অস্পষ্ট সম্পর্কের মধ্যেই একটা অসম্পূর্ণতা বোধ করছিল সে—যা ক্রমশ জমে উঠছিল তার প্রশ্নে, “আমরা কখনও দেখা করব না?” কিন্তু সেই প্রশ্ন সে নিজেও করেনি এখনও। কারণ তার ভেতর একটা ভয়—এই স্বপ্নময় স্ক্রিনের প্রেম যদি একদিন বাস্তব আলোতে ফিকে হয়ে যায়? নির্বাণ হয়তো ঠিক এই কারণেই দূরেই থাকছে—অদৃশ্য, অথচ উপস্থিত। আর সায়ন্তনী এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই এক নতুন বিশ্বাস গড়ে তুলছে, এক অদেখা মানুষকে ঘিরে।

রাত তখন ৩টা ৩৫, চারপাশ নিস্তব্ধ, কেবল জানালার বাইরে রাস্তার আলো আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসা গাড়ির শব্দ। সায়ন্তনী ঘুমোতে পারছিল না—বিছানায় শুয়ে শুয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে ছিল। চ্যাটবক্সে ওপরে লেখা: “নির্বাণ চট্টোপাধ্যায় – online”. তারা গত প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে কথোপকথনে মগ্ন, এবং এটাই কোনও বিশেষ রাত নয়—এটাই তাদের নতুন স্বাভাবিক। “তুমি জানো, আমি সকালে উঠে প্রথমে তোমার মেসেজটা খুঁজি,” নির্বাণ টাইপ করল, সঙ্গে একটা কালো চায়ের ইমোজি। সায়ন্তনী একটু হাসল—এই টেক্সটটায় সে প্রতিদিনই একটা নতুন অনুভব খুঁজে পায়। সে লিখল, “আমার মনে হয়, আমরা আগেও কোথাও দেখা করেছি। হয়তো অন্য কোনো জন্মে।” নির্বাণ লিখে পাঠাল, “অথবা হয়তো অন্য কোনো ভার্চুয়াল লাইফে।” এইসব কথায় কোনো কৃত্রিমতা ছিল না—না কোনো প্রেমের ঘোষণা, না কোনো বাণিজ্যিক চাতুর্য। একান্ত বাস্তব এবং একান্ত হৃদয়ের থেকে বলা, যা কেবল আধো-ঘুমে চোখ বন্ধ করে অনুভব করা যায়।

এই প্রতিরাতের চ্যাটের মাঝে কিছুটা সময় কেবল সায়ন্তনীর, যখন সে অফিসের রাজনীতির ক্লান্তি, মায়ের চিকিৎসার খরচের টেনশন, কিংবা নিজের নিঃসঙ্গতা সব ভুলে যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা একদিন না একদিন উঠবেই—“আমরা কি কখনও দেখা করবো?” সে প্রশ্নটা বহুবার মন থেকে মুছে ফেলেছে, কারণ সে ভয় পায়—এই ভার্চুয়াল স্বপ্ন যদি বাস্তবে গিয়ে ছিঁড়ে যায়? বাস্তবে নির্বাণ হয়তো তাকে পছন্দ করবে না, অথবা নিজেই এতটাই গুটিয়ে থাকা মানুষ যে মুখোমুখি কোনো সম্পর্কের মুখোমুখি হতে চায় না। সায়ন্তনী বোঝে, নির্বাণ কৌশলে সবসময় বাস্তবতা এড়িয়ে চলে—ভিডিও কলের অনুরোধ অস্বীকার করে, তার ছবি দেখতে চায় না, এমনকি নিজেরও ছবি দেয় না। অথচ সে অসাধারণভাবে উপলব্ধি করে ফেলে সায়ন্তনীর মুড, তার অনুভব, তার ক্লান্তি। সেটা সম্ভব শুধু তখনই, যখন কেউ মন দিয়ে দেখছে, পড়ছে, এবং সংযোগ গড়ছে নিঃশব্দে। তবুও সায়ন্তনীর বুকের ভিতরে একটা অনুচ্চারিত দুঃখ জমা হতে থাকে—এ সম্পর্ক যদি একতরফা হয়ে পড়ে?

ভোর হতে না হতেই নির্বাণ লিখল, “তুমি ঘুমাওনি এখনো?” সায়ন্তনী উত্তর দিল, “তুমি তো ছিলে। ঘুমাতে ইচ্ছে হয়নি।” একটা ছোট্ট পজের পর নির্বাণ একটা ভয়েস নোট পাঠাল—গলা একটু রুক্ষ, কিন্তু গম্ভীর ও মায়াময়। “আমি সত্যি বলছি সায়ন্তনী, আমি চাই না তুমি আমার মতো হও। আমি যেভাবে বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়াই, সেই দৃষ্টিতে যেন তুমি নিজেকে না খুঁজে পাও।” এই প্রথম সে নিজের মতো করে কিছু স্বীকার করল, যা এতদিন ধরে নীরবে চাপা ছিল। সায়ন্তনী বোকার মতো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, নোটটা বারবার শুনল। তার চোখে জল এসেছিল কিনা, সে জানে না, কিন্তু তার মন বলছিল—এই সম্পর্কটা কিছু একটা হচ্ছে, যা কেবল একটা ইমোজি বা ব্লু-টিকের মধ্য দিয়ে বোঝানো যায় না। সে শুধু একটা লাইন টাইপ করল—“তুমি আছো বলেই হয়তো আমি এখনও নিজেকে হারাইনি।” আর ওই মুহূর্তে ভোরের আলো যখন জানালার কাচে এসে পড়ছে, তখন সায়ন্তনী ঠিক করল—আজ নয়, কিন্তু খুব শিগগিরই সে নির্বাণকে বলবে, “আমরা একদিন দেখা করবো, বাস্তবে। তোমার ভয়কে আমিও ভাগ করে নেব।”

সায়ন্তনী ঠিক মনে করতে পারছে না, শেষ কবে নির্বাণ “Good morning” পাঠিয়েছিল। আগের মতো আর মেসেজ আসে না, এমনকি রাতে “আজ কেমন গেল দিনটা?”—এই সাদামাটা কথাটাও নয়। অথচ সে অনলাইনে থাকে—সায়ন্তনী দেখে: “Last seen today at 2:14 AM”. তবুও তার মেসেজগুলোর নিচে সেই অভিশপ্ত ব্লু টিক জোড়া। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। প্রথমে ভাবছিল—বোধহয় ব্যস্ত, হয়তো কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা। কিন্তু তিন দিন হয়ে গেল, নির্বাণ কোনো শব্দ উচ্চারণ করছে না। মেসেজ পাঠিয়ে সায়ন্তনী প্রথমে “What happened?”, পরে “Are you okay?”, তারপর “I’m worried…”—অথচ সবই স্রেফ সিন। একরাশ শব্দ জমে আছে সায়ন্তনীর বুকের ভেতরে, যা সে আর মুছতে পারছে না। তার ফোনে যে নোটিফিকেশন আসে, তার থেকে বেশি আসে না। মেসেজের রিপ্লাই না পাওয়ার বেদনাটা ধীরে ধীরে একটা বিষণ্ণ অসহায়তায় রূপ নিচ্ছে। একটা মানুষ যার সঙ্গে সে জীবনের সবটুকু ভাগ করে নিয়েছে—তার এই নিঃশব্দ হয়ে যাওয়া যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়।

তাকে আজকাল কাজের মাঝে মন বসে না। সেলস মিটিংয়ে বসে থেকেও চট করে ফোনের স্ক্রিন দেখে—নতুন কোনো মেসেজ এল কি? গ্যালারির ছবিগুলো খুলে নির্বাণের পাঠানো মেমে, গানের রিকমেন্ডেশন, আর সেই শেষ ভয়েস নোটটা বারবার শুনে। “আমি চাই না তুমি আমার মতো হও…” —এই কথাগুলো আজ বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে তার দিকেই। কী এমন হল হঠাৎ? এমন তো নয়, ঝগড়া হয়েছিল, না কোনো দাবিদাওয়া উঠেছিল। একটা ভার্চুয়াল সম্পর্ক—যার শরীর নেই, চোখ নেই, কিন্তু মেরুদণ্ড ছিল প্রতিদিনকার অনুভব, সেটাই ভেঙে পড়ছে এখন একতরফা নীরবতায়। বন্ধুরা যখন বলে, “তুমি ওকে কখনো দেখোনি, এইসব একতরফা ভালোবাসা হয় না,” সায়ন্তনী তখন চুপ থাকে। সে জানে, নির্বাণ শুধু একটা প্রোফাইল নয়, একটা অনুভূতির ঘর তৈরি করেছিল, যেখানে সে আশ্রয় পেয়েছিল। সেই ঘর এখন তালাবন্ধ। কিন্তু চাবি ফেলে দিয়ে গেছে নির্বাণ নিজেই।

একদিন হঠাৎ, অনেকটা কষ্টে সে একটি সাহসী মেসেজ পাঠায়:
“তুমি যদি চলে যেতে চাও, অন্তত একটা শব্দ বলে যাও। আমার মনটা যেন জানে, সে হারিয়েছে—একা হয়ে পড়েছে—কিন্তু অবজ্ঞায় নয়।”
ঘণ্টাখানেক পরে মেসেজটা সিন হয়, কিন্তু নির্বাণ কিছু লেখে না। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, না একটাও ডট, না কোনো ইমোজি। শুধু ওই ব্লু টিক। সায়ন্তনী বুঝে যায়—একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি কখনো চিৎকারে নয়, বরং চুপচাপ ব্লু টিক হয়ে ফিরে আসে। সেদিন রাতে সে জানালার ধারে বসে ফোনটা মুখ নিচু করে রাখে। এক অদৃশ্য সম্পর্কের মৃত্যুশোক বইতে বইতে সে ভাবতে থাকে—এই মানুষটা কি কোনোদিন তার ছিল? নাকি সবটাই ছিল এক অস্থায়ী স্পর্শ, যার উৎস ছিল ভুলে ডায়াল করা একটা রং নাম্বার?

সায়ন্তনী কয়েক দিন ধরে নির্বাণের গায়েব হয়ে যাওয়ার কারণ খুঁজতে, অথবা অন্তত তার সঙ্গে একবার কথা বলার জন্য আক্ষেপ নিয়ে কেবল ডিভাইসের স্ক্রিনে চোখ রেখেছিল। প্রথমদিকে সে অপেক্ষা করছিল—মাঝে মধ্যে নিজের মনে ভাবছিল, হয়তো কিছু সময়ের জন্য, বা কোনো ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে সে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। কিন্তু দিন যতই গড়াতে লাগল, তার মনে সন্দেহ বাড়তে লাগল। তার মনে হতে লাগল, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে—এটা শুধুই একটানা নীরবতা নয়। তাছাড়া, নির্বাণ যেমন তাকে প্রতিদিন জানাতো—যতটুকু ভালো লাগছে, কতটা চাপ অনুভব করছে—সেগুলো সব যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। এমনকি ইনস্টাগ্রামেও সে কোনো পোস্ট করছিল না। এবার সায়ন্তনী ঠিক করল, নিজে কিছু করবে। সে একদিন নিজের ফোনে নির্বাণের নাম দিয়ে গুগলে সার্চ করতে শুরু করল। বেশ কিছু পেজ পেল, কিন্তু কিছুতেই কোনো সঠিক কনট্যাক্ট নম্বর বা ঠিকানা বের করতে পারল না। সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। তবে গুগল ম্যাপে পাওয়া গেল এক পুরনো পোস্ট—একটি ব্যবসায়িক সম্পর্কের নোটিশ। সেখানেই একটা নাম, “অরিজিৎ ঘোষ”। নির্বাণের পরিচিত লোক ছিল কি না, সেটা নিশ্চিত না হলেও সায়ন্তনী নিশ্চিত হয়েছিল যে এখানে কোনো সাড়া মিলতে পারে। সে সরাসরি অরিজীৎকে একটি ইমেল পাঠায়। সন্দেহ, রহস্য, আর শূন্যতার ভেতর তখন সে দাঁড়িয়ে—এমন একজন মানুষকে খুঁজছে, যাকে সে প্রায় ভালোবেসে ফেলেছে, অথচ জানে না সে কোথায়, কীভাবে, কিভাবে।

সারাদিন ধরে মেসেজগুলি আসেনি, কিন্তু রাত ১১টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি উত্তর এল, যা সায়ন্তনীর মনে ঝড় তুলে দিল। “হ্যাঁ, আমি অরিজিৎ ঘোষ। তুমি নির্বাণের পরিচিত—তাহলে, তুমি তাকে খুঁজছো। আমি জানি, কিন্তু আমি বলতে চাই না।” সায়ন্তনী একটু থেমে গিয়েছিল। ইমেল থেকে একপাশে ফিরিয়ে ফোন স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল—এই গল্পের একটি অন্ধ দিক ছিল। অরিজিৎ জানাল, নির্বাণ তার প্রাক্তন পার্টনার ছিল। এক সময়ে তারা একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেছিল, কিন্তু এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি এবং পরবর্তীতে ব্যর্থতা তার সমস্ত কিছু উলটপালট করে দেয়। সে এমন এক ব্যক্তি, যে কেউ তার কাছ থেকে বিশ্বাস হারানোর পর আর কাউকে কাছে যেতে দেয় না। সায়ন্তনী বিস্মিত হলেও, সে জানত যে নির্বাণ এখনও কিছু টুকরা রেখে গেছে—তার বন্ধ দরজার পেছনে একটা আঘাতের কাহিনি ছিল, যার কারণ তাকে তছনছ করে ফেলেছিল। সায়ন্তনী চুপচাপ ফোনটা রেখে দিল, একবারও ভাবল না, নির্বাণের উদ্দেশ্য কী ছিল—এখন তার শুধু একটাই প্রশ্ন ছিল: “যতটা কাছাকাছি আসতে চেয়েছিলাম, কেন সে কখনো তা স্বীকার করেনি?”

পরদিন সায়ন্তনী আবার নির্বাণের দিকে একটি মেসেজ পাঠায়—তবে এবার পুরনো রুটিন ছেড়ে, একটি সোজাসাপ্টা প্রশ্ন: “আমি জানি, তুমি কি খুঁজে পাওনি নিজের ভেতর—কিন্তু আমি যদি বলি, আমার সঙ্গে কথা বলো, তোমার জীবনটা নতুন করে শুরু করতে তুমি প্রস্তুত?” মেসেজ পাঠানোর পরে, সায়ন্তনী মনেপ্রাণে আশা করছিল, সেরা উত্তর আসবে, অথবা না আসলে অন্তত একটা সমাপ্তি। তবে আজ সায়ন্তনী বুঝতে পারল, অনুভূতির শূন্যতা ও যোগাযোগের দূরত্বের মধ্যে কোনো এক অজানা জায়গায়, সে নির্বাণের কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে তার শূন্যতা আর পূর্ণতা চেয়েছিল, কিন্তু কখনোই কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। আর এখন, সে জানে, নির্বাণ তাকে কখনোই দেখবে না—তবে এটা তার জীবনকে পাল্টে দেওয়ার চেষ্টার শেষ ধাপ।

সায়ন্তনী অরিজিৎ ঘোষের সঙ্গে আরেকবার ফোনে কথা বলার সময় প্রথমবার শুনল নির্বাণের জীবনের সেই অধ্যায়ের কথা, যা কখনো হোয়াটসঅ্যাপের ভয়েস নোটে ধরা পড়েনি। “তুমি জানো,” অরিজিৎ বলেছিল, “সে একসময় খুব স্বপ্ন দেখত—স্টার্টআপটা নিয়ে, তার পার্টনারকে নিয়ে, এমনকি প্রেম নিয়েও। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা মানুষকে শুধু চুপ করায় না, তাকে ভেতর থেকে শূন্য করে দেয়।” নির্বাণের জীবনে এমন একজন ছিল, যাকে সে ব্যবসায়িক অংশীদার ও প্রেমিকা—দুই রূপেই বিশ্বাস করেছিল। তারা মিলে শিক্ষামূলক অ্যাপ তৈরির কাজ শুরু করেছিল, ফান্ডিং পেয়েছিল, এমনকি কলকাতার মিডিয়াতেও ওদের নাম উঠেছিল। কিন্তু এরপর হঠাৎই সেই মেয়ে ব্যবসার টাকা আত্মসাৎ করে হংকং চলে যায়—ফেসবুকে নতুন প্রোফাইল, নতুন প্রেম, আর নির্বাণের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সেই সময় নির্বাণ একরকম মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তার ওপর অ্যাপের ব্যর্থতা, দেনা-পাওনা, আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্নতা তাকে পুরোপুরি গুটিয়ে দেয়। একরকম আত্মগোপনের মধ্যে ঢুকে যায় নির্বাণ, যেখানে নতুন কাউকে বিশ্বাস করার থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখাটা অনেক সহজ মনে হয়। এই জগতেরই একটা কোণে, বহুদিন পরে, হঠাৎ সায়ন্তনীর সঙ্গে ভুল করে সংযোগ তৈরি হয়ে যায়—যা তার নিঃশব্দ দুঃখের মধ্যে আলোড়ন তোলে।

সায়ন্তনী সব শুনে চুপ করে ছিল। তার হৃদয়ে মায়া জন্মাচ্ছিল, কিন্তু পাশাপাশি একটা ক্ষোভও—তুমি নিজের পুরনো আঘাতের জন্য আমাকে দোষী করো কেন? সে বুঝতে পারছিল, নির্বাণ হয়তো তাকে ঠকায়নি, কিন্তু তার ভেতরের ভয়, অসম্পূর্ণতা, অবিশ্বাস—সব কিছু যেন এক অসম্পূর্ণ ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে আজ নিজেকে প্রশ্ন করছিল, ভালোবাসা কি কেবল নির্ভরতাই নয়, সহমর্মিতাও? সে কি শুধুই প্রতিদান চেয়েছিল নির্বাণের কাছ থেকে, না সে সত্যিই তাকে বুঝতে চেয়েছিল? তার ডায়েরির পাতায় একটা লাইন লেখা ছিল সেদিন রাতে—“একজন মানুষকে বুঝতে গেলে তার অতীতটাও আলাদা করে ভালোবাসতে হয়।” সেদিন রাতে জানালার কাছে বসে সে মোবাইলটা হাতে নিয়ে বারবার সেই পুরনো ভয়েস নোটগুলো শুনছিল, নির্বাণের পাঠানো গানগুলোর লিরিক খুঁজছিল, আর তার পাঠানো এক অদ্ভুত স্টিকারটা দেখে অঝোরে কাঁদছিল—“A heart doesn’t break like glass, it disappears like mist.” সে জানত না—তার কান্না নির্বাণের নিঃশব্দতাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে কি না, কিন্তু সে এটুকু বুঝে গিয়েছিল: সম্পর্ক মানে কেবল কথা নয়, সম্পর্ক মানে কখনও কখনও অপেক্ষারও ভাষা।

তবে এবার সে আর অপেক্ষা করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিল। নিজের আত্মমর্যাদা নিয়ে সে জানত, যদি নির্বাণ তাকে ভালোবেসেই থাকে, তবে একদিন না একদিন সে ফিরে আসবে—তার নিজের ইচ্ছেতেই। সায়ন্তনী তার জীবনের গতি পরিবর্তন করল। সে ক্যাফেতে গিটার শেখা শুরু করল, ইভনিং ক্লাসে জয়েন করল সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের কোর্সে, মায়ের সঙ্গে ছাদে হাঁটতে বেরোল, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করল। একদিন সে হোয়াটসঅ্যাপে নির্বাণকে শেষবারের মতো একটি মেসেজ পাঠাল:
“তোমার হারিয়ে যাওয়া আমার দুঃখ নয়, কারণ আমি জানি, তুমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলে অনেক আগে। যদি কোনোদিন খুঁজে পাও, আমি হয়তো তখনও তোমার অপেক্ষায় থাকব না, কিন্তু তোমার গল্পটা তখনও আমার মনে থাকবে।”
মেসেজটি সেন্ড হয়ে গেল, সিনও হল না। কিন্তু এবার আর তার মনে হাহাকার ছিল না—এটা ছিল এক স্বীকারোক্তি, এক সমাপ্তি নয়। সায়ন্তনী জানত, কোনো গল্পের শেষ পাতা অনেক সময়েই অদেখা থেকে যায়—ঠিক যেমন নির্বাণের ডায়েরির পাতা, ভাঙা হলেও যাকে সে ভালোবেসেছিল।

গ্রীষ্মের দুপুরে হঠাৎ এক ঘণ্টার ফাঁকে সায়ন্তনী হ্যাশট্যাগ খুঁজতে গিয়ে নিজের ইনস্টাগ্রাম খুলল। স্ক্রোল করতে করতেই হঠাৎ চোখ আটকে গেল ইনবক্সে এক নতুন রিকোয়েস্টেড মেসেজে। প্রোফাইল নেই, প্রোফাইল পিকচার শূন্য, বায়ো-তে শুধু লেখা—“রাত ৩:৩৫”, আর ইউজারনেম: @mist.in.room. সে একটু থেমে দেখে, মেসেজ: “তুমি কি এখনও অপেক্ষা করো?” এই একটি লাইন যেন শত শব্দের চেয়েও ভারী। হাত অবশ হয়ে আসে সায়ন্তনীর, হৃদস্পন্দন চঞ্চল হয়ে ওঠে। সে জানে না এটা কে, কিন্তু ভেতরে কোথাও স্পষ্টভাবে বোঝে—এই ছায়া, এই শব্দচিহ্ন, এই সময়—সব কিছু মিলিয়ে একটিই মানুষ হতে পারে—নির্বাণ। হঠাৎ যেন পুরনো স্মৃতি সব একসঙ্গে ঢেউয়ের মতো উঠে আসে: সেই ভুল কল, সেই ব্লু টিক, সেই অসম্পূর্ণ ভয়েস নোট। প্রোফাইলে কোনো পোস্ট নেই, কোনও ফলোয়ার নেই, কিন্তু সায়ন্তনীর মাথায় যেন শব্দগুলোর মধ্যে আবার এক চেনা ঘ্রাণ ফিরে আসে—চেনা যন্ত্রণার, চেনা বিশ্বাসের।

সে মেসেজের রিপ্লাই দেয় না, শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনের দিকে। পরক্ষণেই নতুন নোটিফিকেশন—“@mist.in.room sent a voice message.” তীব্র কৌতূহল আর অদ্ভুত ভয় মিশিয়ে সায়ন্তনী ক্লিক করে। ভয়েসটা পুরনো, অনেকটা চিনে ফেলা, অনেকটা নতুন। নির্বাণের কণ্ঠ—কিন্তু ভেঙে পড়া, স্তব্ধতাময়, তবুও পরিস্কার। সে বলছে, “আমি জানি না, তুমি শুনবে কিনা, কিন্তু আমি আজ এতদিন পর আবার তোমার মেসেজগুলো পড়ছি। আমি ভয় পেয়েছিলাম, ভুল বুঝেছিলাম, ভাবতাম, ভালোবাসা মানেই আঘাত। তুমি আমাকে কিছু চাইলে না, অথচ আমি সবকিছু থেকে পালিয়ে গেছিলাম। আমি জানি না, তুমি কি এখনো আমায় মনে রাখো, বা চাইবে আবার শুনতে আমার কথা… কিন্তু আমি চেয়েছিলাম তোমায় বলতে—তুমি আমার সেই গল্প, যা আমি কোনোদিন লিখিনি।” সায়ন্তনী ফোনটা কানে চেপে ধরে চুপ করে থাকে। চোখের কোণ ভিজে যায়, কিন্তু এবার সে কাঁদে না। সে যেন বোঝে, এটা একরকম প্রার্থনা—ক্ষমা চাওয়ার, অথবা অন্তত সেই চুপ থাকা সময়টার মধ্যে একটা শব্দ রাখার।

সায়ন্তনী ধীরে ধীরে ফোন নামিয়ে টাইপ করে—না, কোনো আবেগভরা কবিতা নয়, কোনো অভিযোগ নয়, কেবল একটি কথোপকথনের দরজা খোলা রাখার মতো লাইন:
“Let’s talk. For real this time.”
পাঠিয়ে দেয়, স্ক্রিনে দেখায় ‘Delivered’, এবং এইবার সায়ন্তনী আর তার রিপ্লাইয়ের জন্য অপেক্ষা করে না। সে জানে, সম্পর্কের আসল জাদু শুধু জবাবে নেই—তার ভিতরের সাহসে। দীর্ঘদিন পর মনে হয়, যেন ভার্চুয়াল কথোপকথনের ভেতরকার অন্ধকার থেকে তারা দুজনেই একটু আলোতে পা রাখছে। ফোনটা রেখে সে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়, বাইরের আকাশে সূর্য একটু একটু করে নামছে, আর তার মনে হচ্ছে—এই সম্পর্কটা একটা নতুন প্রস্তাবনা নিতে চলেছে। হয়তো দেখা হবে, হয়তো না। কিন্তু এখন আর কেবল ব্লু টিকের একতরফা যন্ত্রণা নয়, এবার কথার শুরু হোক মুখোমুখি।

দেখা হবে—এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পরেও সায়ন্তনীর বুকের ভেতর যেন একটা ঝড় বইছিল। তারা ঠিক করেছিল সাউথ কলকাতার এক ছোট ক্যাফেতে দেখা করবে, রবিবার বিকেলে, ভিড় কম থাকে, আলো ভালো নামে এমন একটা জায়গা। প্রথমবার বাস্তবে দেখা করার অনুভূতি এমন, যা শব্দে ধরা যায় না—তার বুকের মধ্যে কেবল প্রতিধ্বনি হচ্ছিল সেই ভয়েস নোটের শেষ লাইন: “তুমি আমার সেই গল্প, যা আমি কোনোদিন লিখিনি।” পরনে ছিল হালকা হলুদ কুর্তি, চোখে হালকা কাজল, কিন্তু ঠোঁটে কোনো লিপস্টিক ছিল না—সায়ন্তনী চাইছিল নির্বাণ যেন তাকে দেখে ঠিক তেমনভাবেই, যেভাবে সে পাঠিয়েছিল তার প্রতিটি ভয়েস, প্রতিটি চুপচাপ বার্তা। ক্যাফের কোণে একটা জানালার পাশের টেবিলে বসে সায়ন্তনী অপেক্ষা করছিল, কফির কাপ ঠান্ডা হয়ে আসছিল, আর মাথার মধ্যে চলে যাচ্ছিল হাজারটা চিন্তা: যদি নির্বাণ চেনা না হয়? যদি সে এলে মুখ ফিরিয়ে নেয়? যদি সে নিজের মুখ না দেখায়, আবার চুপ করে থাকে?

ঠিক তখনই দরজার ঘণ্টা বাজল, কেউ ঢুকল, আর ক্যাফের হালকা সুরভির মধ্যে দিয়ে আস্তে করে একজন এগিয়ে এল টেবিলের দিকে। কোনো রঙিন জামা নয়, কোনো ঝাঁ-চকচকে ব্যক্তিত্ব নয়—একটা ধূসর শার্ট, চোখে ক্লান্তি, মুখে একরাশ অপরাধবোধ। নির্বাণ। সে হাসল না, শুধু তাকাল। সায়ন্তনী কিছু বলল না, তাকিয়ে রইল। এই সেই চোখ, যেগুলোর পাশে সে হাজার ইমোজি কল্পনা করেছিল, সেই গলা যার প্রতিটি ভাঙা সুর সে রাত্রির নিঃশব্দতায় শুনেছিল। নির্বাণ বলল, “তুমি এসেছো… আমি জানতাম না তুমি সত্যিই আসবে।” সায়ন্তনী উত্তর দিল, “তুমি এসেছো, আমি তাতেই অবাক।” কয়েক মুহূর্ত নীরবতা—যেখানে মোবাইল স্ক্রিন ছিল না, নেটওয়ার্কের গোলমাল ছিল না, কেবল দু’জন মানুষের বাস্তব উপস্থিতি। এই নীরবতা কাঁটার মতো নয়, বরং আরামের মতো—যেখানে কেউ কাউকে প্রমাণ করতে চাইছে না, কেবল বুঝতে চাইছে।

তারা সেই সন্ধ্যায় অনেক কথা বলেছিল—ব্যর্থতা, একাকীত্ব, বিশ্বাসভঙ্গ, নতুন করে বাঁচা—আর গল্পের মতো হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া ভুল নম্বরের প্রেম। নির্বাণ স্বীকার করেছিল, সে জানত না একটা ভুল কল এতটা গভীর সংযোগ তৈরি করে ফেলবে। সায়ন্তনী বলেছিল, “তুমি পালিয়ে গিয়েছিলে, কিন্তু আমি হারিয়ে ফেলিনি। তুমি নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলে, কিন্তু আমি তো তোমাকে পড়তে শিখেছিলাম।” সেই সন্ধ্যায় তারা হেঁটেছিল গঙ্গার ধারে, পায়ে পায়ে যেন স্মার্টফোনের আড়াল থেকে বেরিয়ে বাস্তব হয়ে উঠছিলো তাদের প্রতিটি অনুভব। বিদায়ের সময় নির্বাণ বলেছিল, “তুমি কি এখনো বিশ্বাস করো, আমাদের দেখা হওয়ার কথা ছিল?” সায়ন্তনী হেসে বলেছিল, “না। আমি এখন বিশ্বাস করি, আমাদের দেখা হওয়ার প্রয়োজন ছিল।” দু’জন দুদিকে হাঁটা ধরল, কিন্তু এবার আর কোনো স্ক্রিন ছিল না, শুধু একটাই ঠিকানা—বাস্তব, ধরা ছোঁয়ার মত।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, সায়ন্তনীর মোবাইলে ভেসে উঠল একটি পুরনো ভয়েস নোট, যা সে ভুলে গিয়েছিল—“তুমি রং নাম্বারে এসেছিলে, কিন্তু মন ঠিক বুঝেছিল, তুমি আমার কনট্যাক্ট লিস্টে থাকার কথা।”

শেষ

1000033933.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *