সৌভিক দাস
বৃষ্টিভেজা এক সন্ধ্যা। কলকাতার উত্তর প্রান্তে পুরনো গলির একটায় দাঁড়িয়ে অনিরুদ্ধ ক্যামেরা হাতে ঘোরাঘুরি করছিল। পুরোনো বাড়ি, ভাঙা বারান্দা, জানালার কার্নিশে জমে থাকা শ্যাওলা—সবকিছুই যেন সময়ের স্তব্ধ দলিল হয়ে উঠেছে তার লেন্সে। কাকভেজা চুপচাপ শহরের মধ্যে সে খুঁজে বেড়াচ্ছিল একরাশ অতীত, যেটা তার ছবিগুলোর মাধ্যমে অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান হবে।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল এক বাড়ি। অন্য সব বাড়ির চেয়ে আলাদা। একধরনের অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য যেন চেপে বসে আছে তার ওপর। সাদা রঙের বড় দোতলা বাড়ি, কিন্তু বহুদিন ধুয়ে-মুছে না রাখার চিহ্ন স্পষ্ট। জানালাগুলো সব বন্ধ, কেবল একটায় হালকা হলুদ আলো জ্বলছিল। সেই জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল এক নারী।
অনিরুদ্ধ থমকে গেল।
নারীর পরনে ছিল নীল রঙের শাড়ি, চুল খোলা, চোখে একরকম অপার্থিব চাহনি। সে তাকিয়ে ছিল সোজা অনিরুদ্ধের দিকে। না, তাকানো বললে ঠিক বোঝানো হয় না—সে যেন চেনা কারো খোঁজ করছিল বহু বছর ধরে। অনিরুদ্ধর বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠল। শীতল একটা বাতাস যেন গলা বরাবর বেয়ে নামল পিঠের দিকে।
তখনই হঠাৎ এক টিপ বৃষ্টি ঝরে পড়ল। অনিরুদ্ধ চমকে উঠে ক্যামেরাটা বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আবার যখন তাকায় সেই জানালার দিকে—নারীটি আর নেই।
পরদিন সকালেই অনিরুদ্ধ আবার সেই বাড়ির সামনে হাজির হয়। এবার সোজা দরজার সামনে গিয়ে কড়া নাড়ে। কেউ সাড়া দেয় না। বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরনো পান-সিগারেটের দোকানে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “এই বাড়িতে কেউ থাকে?”
দোকানদার থুতু ফেলে বলল, “ওইটা? ওই বাড়ি তো ফাঁকা বহুদিন। আগের মালিক চলে গেছে মাস ছয়েক হলো। শোনা যাচ্ছে বাড়ি বিক্রি হয়ে যাবে।”
“কিন্তু গতকাল সন্ধ্যায় আমি এক মহিলাকে দেখেছি ওখানে… জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নীল শাড়ি পরে ছিলেন।”
দোকানদার থেমে গেল। চোখে কেমন অদ্ভুত ভঙ্গি। “আপনি কি ঠিক দেখেছেন? ওই রকম বৃষ্টি হলে অনেক কিছু চোখে ধাঁধা দেয়… কিন্তু যদি সত্যি দেখেন, তাহলে আপনি বুঝতে পারেননি আপনি কাকে দেখেছেন।”
“মানে?”
“মানে… আপনি নীলপদ্মকে দেখেছেন।”
“কে উনি?”
দোকানদার আর কিছু বলল না। শুধু একটা ধূসর চাহনি ফেলে চোখ সরিয়ে নিল।
অনিরুদ্ধর ভিতরটা হিম হয়ে গেল। নীলপদ্ম? সে কি কেউ ছিল, না এখনও আছে এই বাড়ির ছায়ার মতো?
জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই চাহনি কি সত্যিই তার দিকে তাকানো ছিল, নাকি তার ভেতরের কোনো অজানা অতীতের প্রতিফলন?
সে জানত, এবার তাকে ফিরতে হবে। কিন্তু ফিরবে কোথায়? তার মন পড়ে রইল সেই জানালায়, আর সেই রহস্যময় চোখদুটোর গভীরে।
পরদিন দুপুরবেলা অনিরুদ্ধ ফিরে এল সেই বাড়িতে। কলকাতার কুয়াশা-ধোঁয়া বিকেলে বাড়িটার চেহারা আরও রহস্যময় লাগছিল। গলির অন্য প্রান্তে লোকজন চলাফেরা করছে, কিন্তু এই বাড়িটা যেন একা, ছিন্ন, আর অন্য কোনো সময়ে আটকে আছে।
বাড়ির লোহার দরজাটা সজোরে ঠেলে খুলল সে। শব্দ হলো একটা থেমে থাকা ঘড়ির মত—ধীরে, কর্কশ। পা বাড়াল ভিতরে।
মেঝেতে ধুলো জমেছে, কোথাও কোথাও ইঁদুরের পায়রার ছাপ। দেয়ালের রং খসে পড়েছে, এক কোণে কিছু পুরোনো চিত্রকর্মের কাঠের ফ্রেম। তবে আশ্চর্যভাবে, ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি চেয়ার টেবিল পরিষ্কার। যেন কেউ প্রতিদিনই ওখানে বসে।
টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটা পুরোনো কাপড় বাঁধা ডায়েরি।
কৌতূহল দমাতে না পেরে অনিরুদ্ধ সেটি খুলল। প্রথম পাতায় লেখা:
“এই বাড়ির নাম ছিল ‘নীলপদ্ম নিবাস’। আর আমি—পদ্মাবতী।
সবাই ভাবে আমি আত্মহত্যা করেছি। আসলে আমি হারিয়ে গেছি সময়ের ভেতরে।
কেউ যদি এই ডায়েরি পড়ে, জেনে নিও—আমি এখানেই আছি। এই জানালার ধারে, ঠিক যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে আছো এখন।”
অনিরুদ্ধর হাত কেঁপে উঠল। সে পেছনে তাকাল, যেন বুঝতে চাইল কেউ আছে কিনা। কিছুই নেই, শুধু নিঃশব্দতা।
সে ডায়েরির পাতা উল্টাতে লাগল। অনেক পুরোনো লেখার ভেতর হঠাৎ চোখ আটকে গেল তার নিজের নামের ওপর:
“অনিরুদ্ধ, তুমি আমার ছবি তুলেছো। তুমি জানো না, কত বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি এমন কারো জন্য—
যে দেখতে পাবে, শুনতে পাবে, আর আমার কথা বিশ্বাস করবে।
আমি ছায়া হয়ে গেছি, কিন্তু আমার গল্প এখনো লেখা হয়নি। সেটা তুমিই শেষ করবে।”
গলার ভেতরটা শুকিয়ে এল। কে এই পদ্মাবতী? আর কীভাবে তার নাম জানে?
সে আবার তাকাল সেই জানালার দিকে। দুপুরের ম্লান আলোয় জানালার কাঁচে কিছু একটা প্রতিফলিত হচ্ছিল। একজন নারী—একই নীল শাড়ি, খোলা চুল, গভীর চোখ।
এইবার সে একটুও ভয় পেল না। বরং আশ্চর্য এক মায়ায় ভরে গেল মন। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল জানালার দিকে, আর তখনই এক হালকা বাতাস বয়ে গেল তার কানের পাশ দিয়ে। একটা নিঃশব্দ ফিসফিসানি—
“তুমি এসেছো, অনেক দেরিতে হলেও।”
অনিরুদ্ধ জানে, এই বাড়ি আর সে—এখন শুধু ভৌত নয়, অন্য এক স্তরের সংযোগে জড়িত। পদ্মাবতীর কণ্ঠস্বর, ডায়েরির ছোঁয়া, আর সেই জানালার আলো—সব কিছু তাকে টেনে নিচ্ছে আরও গভীরে। বের হওয়ার দরজা সে নিজেই ভুলে গেল।
অনিরুদ্ধ যেন আর বাস্তব জগতে নেই। পদ্মাবতীর ডায়েরি আর জানালার ছায়া তাকে নিয়ে গেছে এক অদৃশ্য কুয়াশার ভিতর।
বাড়িটা ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। দেয়ালের ফাটল মিলিয়ে গেল, ধুলোভরা কার্পেট আবার রঙিন হলো, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল পারিজাত ফুলের গন্ধ। সবকিছু যেন সময়কে উল্টো করে ফেলে দিয়েছে।
সে দেখল—ঘরের এক কোণে বসে আছে সেই নারী, যাকে সে জানালার ধারে দেখেছিল। চুল বাঁধা, পরনে একরঙা নীল শাড়ি, ঠোঁটে এক ম্লান হাসি।
“তুমি পদ্মাবতী?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করল ধীরে।
নারীটি মাথা নাড়ল, “ছিলাম পদ্মাবতী। এখন আমি নীলপদ্ম। আমার দেহ নেই, কেবল গল্পটাই রয়ে গেছে।”
“তুমি এখানে আটকে আছো?”
“না। আমি এখানে থেকেছি নিজের ইচ্ছেতে। অনেক বছর আগে, আমার প্রেমিক এই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। আমি প্রতীক্ষা করতাম, দিনরাত জানালার ধারে দাঁড়িয়ে। একদিন বুঝলাম, সে আর ফিরবে না। আমি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলাম… এই দেয়ালের ফাঁকে, এই জানালার ছায়ায়।”
“তুমি কেন আমার নাম জানো? কেন আমি?”
পদ্মাবতী হেসে বলল, “কারণ তুমি দেখেছো। শুনেছো। অনুভব করেছো। অনেকেই আসে এই বাড়িতে ছবি তুলতে, কিন্তু কেউ জানালার আলোয় আমার চোখ দেখে না। তুমি দেখেছো, কারণ তুমিও হারিয়েছো কাউকে। তাই আমাদের যন্ত্রণাগুলো মিশে গেছে।”
অনিরুদ্ধ চুপ। সেই স্মৃতিটা মনে পড়ে—যে মেয়েটাকে সে ভালোবাসত, হঠাৎ করে একদিন চলে গিয়েছিল। কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই। সেই শূন্যতা আজও তার ক্যামেরার লেন্সে জমে থাকে।
পদ্মাবতী ধীরে উঠে দাঁড়াল। “তুমি চাও তো আমি চলে যাই?”
অনিরুদ্ধ বলল, “তুমি কোথায় যাবে?”
“তোমার ছবির ভেতর। আমার গল্পটা শেষ করো। আমাকে লেখো। তবেই আমি ছুটতে পারব এই ছায়ার খাঁচা থেকে।”
সে ডায়েরিটা বাড়িয়ে দিল অনিরুদ্ধের হাতে।
“এই আমার শেষ অনুরোধ। আমায় লেখো। সত্যি করে। যেন আমি আর কেউ নয়—একজন রক্ত-মাংসের নারী, যে ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে হারিয়ে গিয়েছিল।”
অনিরুদ্ধ কাঁপা হাতে ডায়েরি নেয়। চোখে জল।
এক ঝলক আলো বাড়ির ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। পদ্মাবতী ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। জানালার পাশে কেবল থেকে যায় এক টুকরো নীল কাপড়, আর একফোঁটা আতর।
অনিরুদ্ধ বাড়ি ফিরে ডায়েরি খুলে বসে। শব্দেরা যেন নিজেরা বেরিয়ে আসে, ঘুরে ঘুরে বসে কাগজে। গল্পের নাম রাখে—“নীলপদ্ম”।
বছরখানেক পরে, বইটি প্রকাশ পায়। প্রথম পাতায় লেখা—“যারা সত্যিকারের চোখ দিয়ে দেখেন, তাদের জন্য এই গল্প।”
আর এক রাতে, কোনো এক পাঠক যখন সেই গল্পের প্রথম পাতা খুলে পড়ে, জানালার ধারে এক নারী আবার দাঁড়িয়ে থাকে—
এক চিরকালীন প্রতীক্ষার ছায়া হয়ে।
(সমাপ্ত)




