Bangla

শেষ ট্রেন

Spread the love

গৌরকিশোর মণ্ডল


কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে সোনারপুর স্টেশন। রাত তখন প্রায় ১:৩০। স্টেশন প্রায় ফাঁকা, শুধু হাতে গোনা কয়েকজন যাত্রী শেষ লোকাল ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। চারদিক নিস্তব্ধ। হালকা কুয়াশা মিশে রয়েছে বাতাসে, প্ল্যাটফর্মের আলোগুলো যেন তার মধ্য দিয়ে মৃদুভাবে ঝিমিয়ে পড়েছে।

শরৎ মল্লিক, একটি প্রাইভেট কোম্পানির ক্লার্ক, প্রত্যেকদিন রাতের শেষ ট্রেনেই বাড়ি ফেরেন। ওর বাড়ি ক্যানিং রোডে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে আজ শরতের মনে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। যেন কিছু একটা অচেনা অপেক্ষা করছে।

একটু দূরে বসে আছে এক বৃদ্ধা, গায়ে পুরোনো শাল, মুখ ঘোমটা দিয়ে ঢাকা। তিনি মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে চারপাশটা দেখেন, কিন্তু কারো চোখে চোখ রাখেন না।

প্ল্যাটফর্মে আরও তিনজন— এক প্রেমিক যুগল, এক ছাপোষা মাঝবয়সি লোক (সম্ভবত রেলওয়ের কন্ট্রাক্টর), আর এক যুবক যার কানে ইয়ারফোন, মুখে এক চিলতে ব্যঙ্গ হাসি।

ঘড়ির কাঁটা যখন ১:৪৪ ছুঁল, হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজে স্টেশন কেঁপে উঠল। ট্রেন ঢুকছে— তবে আজকের ট্রেনটা যেন একটু ভিন্ন। ইঞ্জিনটা অনেক পুরোনো ধাঁচের, গায়ে ধুলো-মাখা রং, জানালাগুলো ছোট, অনেকটা ব্রিটিশ আমলের মত।

শরৎ একটু চমকে গেল। “এই ট্রেনটা আগেও দেখেছি? না তো!”

কিন্তু তবুও সবাই উঠে পড়ল। ট্রেন থামতেই দরজা খুলল। ভিতরে অদ্ভুত নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলছে না। বাতি জ্বলছে ঠিকই, তবে একধরনের ফিকে আলো।

ট্রেন ছেড়ে দিল। রুট সাধারণত সোনারপুর-জয়নগর-ক্যানিং এই লাইনে চলে। কিন্তু আজ প্রথম স্টেশনই পাল্টে গেল— নাম লেখা নেই, শুধু অদ্ভুত প্রতীক আঁকা একটা বোর্ড। যেন কোনো প্রাচীন ভাষার চিহ্ন।

শরৎ জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল— দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। বাড়িঘর, ল্যাম্পপোস্ট সব অদ্ভুত রকমের। একটা ধূসর, নির্জন পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলছে ট্রেনটাকে। কেউ কিছু বলছে না, শুধু ট্রেনের চাকায় একটা অদ্ভুত ঘষাঘষির শব্দ।প্রেমিক যুগল কানে কানে কথা বলছিল, হঠাৎ মেয়েটি চিৎকার করে উঠল— “এটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের?” তার সঙ্গী কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটা আলো ঝলসে উঠল, আর তাদের দুজনকে একসাথে গিলে ফেলল অন্ধকার। শরৎ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। বাকিরা স্তব্ধ।

ট্রেন থামল এক জায়গায়— স্টেশনটার নাম বোর্ডে লেখা আছে “ভূলোকপারের গেট”। ঘন কুয়াশা আর অদ্ভুত গন্ধে ভরে আছে স্টেশন। শরৎ সাহস করে নামল। বাকিদের মধ্যে কেবল বৃদ্ধা নামলেন তার সঙ্গে।

— “আপনি জানেন, এটা কোথায়?” শরৎ জিজ্ঞেস করল।

— “অনেক দিন আগেও এমন হয়েছিল। শেষ ট্রেন মাঝে মাঝে ভুল পথে চলে যায়। এই পথ থেকে ফিরে আসা যায় না, শরৎ বাবু,” বৃদ্ধা হঠাৎ নাম ধরে বললেন।

— “আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?”

বৃদ্ধা হালকা হাসলেন। বললেন, “কারা ফিরে আসবে, কে হারিয়ে যাবে— সেটাই এখন ঠিক হবে।”

ট্রেন আবার চলতে লাগল। এবার জানালার বাইরে একটা শহর দেখা গেল, তবে সেটার মানুষ নেই। শুধু ছায়ারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছায়াগুলো চেয়ে আছে ট্রেনের দিকে। কেউ কেউ হাত তুলছে, কেউ হাঁটছে ট্রেনের পাশে সমান্তরাল ভাবে। হঠাৎ ট্রেন থেমে গেল। দরজা খুলল না। একটা ছায়া ঘেঁষে এল জানালায়। শরতের চোখের সামনে এসে দাঁড়াল। ছায়াটি মুখ খুলল, কিন্তু শব্দ হল না। ঠোঁট নড়ল, একটা কথাই বলল— “তুমি শেষ ট্রেনের যাত্রী, ফিরে যাবার সময় পেরিয়ে গেছে।”

ট্রেনের ভিতর হঠাৎ একটা আলো জ্বলে উঠল। একটি দরজা খুলল, যেটা আগে ছিল না— যেন কুয়াশার মধ্যে থেকে হঠাৎ উদ্ভাসিত হল। দরজার গায়ে লেখা, “শেষ সুযোগ”।

বৃদ্ধা শান্ত কণ্ঠে বললেন, “এই দরজা দিয়ে গেলে একমাত্র তুমি ফিরতে পারো। বাকিদের সময় শেষ। কিন্তু একটা শর্ত আছে— ফিরে গেলে, এই রাতটার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, এমনকি নিজেকেও বিশ্বাস করানো কঠিন হবে।”

শরৎ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে ছায়ারা ডাকছে। ভিতরে ট্রেন কাঁপছে। তার বুকের ভিতরটা ধকধক করতে লাগল। দরজার ওপারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না— শুধু একরাশ কুয়াশা। বৃদ্ধা আবার বললেন, “যদি এখন ঢোকো, তবে হয়তো বেঁচে ফিরবে। নইলে তুমি চিরদিন এই ট্রেনেই থাকবে— যারা আর নেই, তাদের পাশে বসে।”

শরৎ হঠাৎ পেছনে তাকাল। ইয়ারফোন কানে থাকা যুবকটা এবার নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, চোখদুটি নিঃজীব। মাঝবয়সি লোকটা এক কোণে পড়ে আছে, নিথর। কেবল বৃদ্ধা— তিনি যেন কালের সাক্ষী। শরৎ চোখ বন্ধ করল, মনের ভেতর কেবল মা’র মুখটা ঘুরতে লাগল। “আমি ফিরে যাব,” সে নিজেকে বলল।

শেষে, শরৎ দৌড়ে ঢুকে পড়ল দরজার ভিতর দিয়ে। দরজাটা সাথে সাথে ঝনঝন শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল। তারপর নীরবতা।

সকাল ৫টা। শরৎ চোখ খুলল সোনারপুর প্ল্যাটফর্মে। স্টেশন গায়ে হেলান দিয়ে সে ঘুমিয়ে ছিল, পুলিশ তাকে ডেকে তুলেছে।

— “এই যে বাবু, এখানে ঘুমাচ্ছেন কেন? শেষ ট্রেন তো গতরাতে ক্যান্সেল হয়েছিল।”

— “ক্যান্সেল?” শরৎ চমকে উঠল। “কিন্তু আমি তো উঠেছিলাম…!”

পুলিশ কৌতূহলভরে তাকিয়ে রইল, “আপনি ঠিক আছেন তো?”

শরৎ কিছু বলল না। উঠে দাঁড়াল ধীরে ধীরে। চারদিকের চেনা দৃশ্যগুলো দেখে তার মাথা ঘুরতে লাগল। প্ল্যাটফর্মে আলো আছে, লোকজন আসতে শুরু করেছে, কিন্তু কিছু যেন অনুপস্থিত। যেন এক অপার্থিব নীরবতা এখনও লেগে আছে। স্টেশনের চা-ওয়ালার কাছে গিয়ে সে একটা চা নিল। কাপটা হাতে নিয়ে ঠোঁটে তুলতেই তার চোখ পড়ল পাশের পিলারে— একটা ছোট স্টিকার, পুরোনো আর বিবর্ণ। লেখা আছে— “ভূলোকপারের গেট”।

তার ঠোঁট থেকে কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে চুপচাপ হাঁটতে লাগল স্টেশনের বাইরে। রোদের আলো পড়েছে রাস্তায়, কিন্তু মনে হচ্ছে চারপাশটা এখনও কুয়াশায় ঢাকা। তার মোবাইলটা খুলে দেখে— রাত ১:৪৫-এ কোনও কল, মেসেজ, কিছুই নেই। হোয়াটসঅ্যাপে বন্ধুরা জেগে ছিল, অথচ কেউ ওর কোনও উত্তর দেয়নি।

নিজের বাড়ির দিকে যেতে যেতে শরৎ মনে মনে ভাবতে লাগল— “আমি কি স্বপ্ন দেখেছি? না কি আমি সত্যিই ভুল রুটে গিয়েছিলাম?” কান্না পায়নি, ভয় পায়নি, শুধু একটা অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করছিল। ঘন নীরবতার মতো, যেন তার মধ্যে সেই ট্রেন এখনও চলেছে, আর একটা দরজা— “শেষ সুযোগ”— আর কখনও খুলবে না।

1000022457.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *