অরুণাভ বন্দ্যোপাধ্যায়
ভোটপেটি ভীতু বনে
দিন বদলেছে। বদলেছে শহর, বদলেছে গান, বদলেছে মানুষের মন। কিন্তু রুদ্র বাউল আর তরুণ ধ্বনি—এই দুই সুরের সাধকের জীবন যেন থেমে পড়েছে এক গোধূলি রেখায়। তাদের গলায় সুর আছে, বুকে সাহস আছে, কিন্তু মঞ্চ নেই, শ্রোতা নেই, আর নেই সেই সময়ের মরমি চাহিদা।
রুদ্র এখন থাকে গোপীবাগের একচালা বাড়ির ছাদে, যেখানে জানলার পাশে একটা হাওয়াকল ঘোরে ধীরে ধীরে। তরুণ থাকে তার নিচের ঘরে, যেখানে দোলনচাঁপার গন্ধ আর পুরোনো তবলার খোলস একসঙ্গে মিশে থাকে বাতাসে।
তারা এখন দিনে দিনে বাজারের পেছনের ফাঁকা মাঠে বসে গান গায়, কেউ খেয়ালে শোনে, কেউ হেসে পাশ কাটিয়ে যায়।
একদিন সকালে হঠাৎ খবর আসে—“রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জনসংযোগ সভা করছেন শহরে, সঙ্গে থাকছে ‘জনতার সাংস্কৃতিক উৎসব’। পুরোনো শিল্পীদেরও ডাকছে।”
রুদ্রের চোখে জ্বলে ওঠে সেই পুরোনো আগুন। তরুণ সন্দিহান, তবুও সঙ্গ ছাড়ে না।
মঞ্চে ওঠার আগের রাতে রুদ্র বলে, “এইবার আমাদের সুরেই বাজবে প্রশ্ন। আমাদের গানে থাকবে সেই কথা, যা ওরা শুনতে চায় না।”
তরুণের কণ্ঠ চাপা গম্ভীর, “তুই জানিস তো এর মানে কী হতে পারে?”
রুদ্র মাথা নাড়ে, “জানি। কিন্তু ভয় পেলে আর গান থাকে না, থাকে শুধু গুনগুন। আমি সেই সুরে থাকতে চাই না।”
সেদিন মঞ্চে রুদ্র-তরুণ গায়:
“ভোটের হাওয়ায় উড়ে যায় প্রতিশ্রুতি,
পেছনে পড়ে শুধু শূন্য থালা,
মঞ্চে বাজে ঢাক, গলার স্বর চড়া,
কিন্তু মাটির আওয়াজটা কই গো ভাই?”
প্রথমে দর্শক থমকে যায়, তারপর ধীরে ধীরে কানাঘুষো। মন্ত্রীমশাইয়ের পিএ দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন, “এই গান অনুমোদিত নয়! কে লিখেছে এসব? কারা ওদের এনেছে?”
কয়েক মিনিটের মধ্যে পুলিশ মঞ্চে উঠে আসে। মাইক্রোফোন বন্ধ। লাঠি ওঠে। রুদ্র-তরুণকে টেনে নামানো হয়, আর ভিড়ের ভেতরে কোথাও হাহাকার, কোথাও হাসি।
থানায় বসে রুদ্র বলে, “দেখেছিস? গান কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে।”
তরুণ তবলার খোলসের দিকে চেয়ে থাকে, “ভয়ঙ্কর নয়, গান এখন বিপ্লব।”
তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় পরদিন সকালে, মিডিয়াতে কোনো খবর নেই—সব চাপা। গেট পেরিয়ে রুদ্র বলে, “এইভাবে আর হবে না তরুণ। নতুন কিছু করতে হবে। শুধু গান গেয়ে নয়, আমাদের মঞ্চ বানাতে হবে নিজেরাই।”
“তুই কী ভাবছিস?” তরুণের গলায় স্পষ্ট কৌতূহল।
“নতুন দল, নতুন স্বপ্ন—‘গানতন্ত্র পার্টি’। যেখানে থাকবে না মিথ্যে আশ্বাস, থাকবে না ঘুষখোর রাজনীতি—থাকবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের গলা।”
তরুণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “পাগল তুই। কিন্তু আমি তোর সঙ্গে আছি।”
সেদিন সন্ধ্যায় তারা যায় শহরের রেলস্টেশন চত্বরে। পুরোনো গিটার, প্লাস্টিক বালতির তবলা, আর একখানা হ্যান্ডমাইক।
রুদ্র গান ধরেন:
“গান আমাদের অস্ত্র নয়, আমাদের প্রেম,
এই প্রেমেই জয় আসবে একদিন,
ভোট যদি চাও, হাসিও দাও,
গান দিয়েই বদল আনবো জীবন।”
লোকজন দাঁড়িয়ে পড়ে। কেউ মোবাইলে ভিডিও তোলে, কেউ ফেসবুকে লাইভ।
চাটুজ্জে মেসোমশাই পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলেন, “এই তো তোমাদের ফেরার সময় রে! এইরকম গানে যে আসল কথাগুলো লুকিয়ে থাকে!”
রুদ্র হেসে বলে, “এইবার শুধু সুরে নয়, সুর্যের আলোয় কথা বলব।”
তরুণ ফিসফিস করে বলে, “কিন্তু ভাই, এ তো রাজনীতির খেলায় নামা।”
রুদ্র কাঁধে হাত রেখে বলে, “তাই তো, এবার সুরেই হবে বিপ্লব।”
সেদিনের রাতটা ওরা কাটায় নতুন গান লেখার মধ্যে, নতুন ব্যানার আঁকার মধ্যে।
গানতন্ত্র পার্টি জন্ম নেয় কোনো দলীয় অফিসে নয়, জন্ম নেয় মানুষের মনের ভেতর।
পর্ব ২: সিন্ডিকেটের সুরে
রুদ্র আর তরুণের জীবনে সেই মুহূর্তটা যেন এক নতুন ভোর এনেছিল। তারা বুঝেছিল, গান যদি অস্ত্র হয়, তাহলে তাদের অস্তিত্বই হতে পারে প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু প্রতিটি বিপ্লবেরই থাকে বাস্তবের কাঁটা, আর সেই কাঁটার নাম—সিন্ডিকেট।
গানতন্ত্র পার্টির নাম শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল তাদের লাইভ পারফরম্যান্স, যুবকেরা হ্যাশট্যাগ দেয়: #গানেইগণতন্ত্র।
তবে সেই ভাইরাল হাওয়া পৌঁছে যায় যে-সব মানুষের ঘরে খবরের কাগজ ঢোকে শুধু মুনাফার আশায়—তাদের নাম স্থানীয় সিন্ডিকেট নেতারা।
একদিন রুদ্র আর তরুণ তেড়ে যায় মফস্বলের এক বাজারে গান গাইতে, হঠাৎ দুজন বাইকওয়ালা এসে বলে, “এই গান-টান বন্ধ করো। মেম্বারসাহেবের নির্দেশ আছে। মেলা বসবে এখানে, তোমাদের দরকার নেই।”
রুদ্র থামে না, বলে, “এই জায়গা মেলা বসানোর জন্য নয়, মনের কথা বলার জন্য। আমরা মেলায় নই, গলার মেলায় এসেছি।”
তরুণ তবলার বালতিতে তাল তোলে। গলা কাঁপে না তাদের, কিন্তু বাইকওয়ালারা এবার মোবাইলে কারো সঙ্গে কথা বলে। দশ মিনিটের মধ্যে আসে লোক, মুখে মাস্ক, চোখে রোদচশমা।
একটা চাপা গলায় হুমকি, “গান ভালো জিনিস। কিন্তু যখন সেটার ভেতর ভোটের গন্ধ আসে, তখন সেটা হয়ে যায় গোলমাল।”
রুদ্র বলে, “তোমরা গান বুঝো না, বুঝো শুধু চাঁদার রেট।”
তাদের সরিয়ে দেওয়া হয় সেদিন। তরুণ বলে, “এই যে, শুরু হয়ে গেছে।”
রুদ্র রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বলে, “শুরু তো আজ নয় রে ভাই। আসল খেলা এখন শুরু হবে।”
পরদিন তারা যায় কলেজের সামনে। ছাত্র-ছাত্রীরা উল্লসিত—“ওই যে গানতন্ত্র পার্টির রুদ্রদা আর তরুণদা এসেছে!”
তারা গানে গানে বলে:
“বুলেট নয়, ব্যালট চাই,
চাঁদা নয়, চেতনা চাই,
পেট ভরে না শুধু প্রতিশ্রুতিতে,
ভরবে গানে, ভালোবাসার ঐক্যে।”
আনন্দে মাতোয়ারা হয় তরুণেরা। এক ছাত্রী এগিয়ে এসে বলে, “আপনারা সত্যিই অন্যরকম। এবার আপনাদের চাই আমাদের ইউনিয়নেও!”
কিন্তু ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সে কথা শুনে বলে, “ওদের গান ভালো, কিন্তু রাজনীতি কি খেলনা?”
রুদ্র মাথা নিচু করে বলে, “না, রাজনীতি খেলনা নয়, কিন্তু এখনকার রাজনীতি তো তামাশা। আমরা সেটা ভেঙে নতুন খেলনাই বানাতে চাই—যাতে সবাই খেলতে পারে।”
সিন্ডিকেটরা এবার নতুন চাল চালল। বাজারে ছড়ানো হল—“রুদ্র-তরুণ আসলে বড় দলের ‘বি টিম’। এদের পিছনে বিদেশি ফান্ডিং। এরা দেশের সংস্কৃতিকে কালিমালিপ্ত করছে।”
তরুণ খবরের কাটিং নিয়ে এসে বলে, “দেখেছিস! আমরা এখন দেশদ্রোহী!”
রুদ্র হাসে, “দেশদ্রোহী বললেই দেশপ্রেমিক প্রমাণ হয়ে যায় রে ভাই!”
তবে তারা বুঝে, পাল্টা বার্তা না দিলে মানুষ বিভ্রান্ত হবে। তারা বানায় নতুন গান:
“আমরা তবলা, তারা তলোয়ার,
আমরা বাউল, তারা কারখানা,
তবু তো বাঁচে গানেই মানুষ,
ওদের গালি, আমাদের মানা।”
গান আবার ভাইরাল হয়।
সেদিন রাতে ফোন আসে এক অজানা নম্বর থেকে।
“আপনারা রুদ্র-তরুণ?”
“হ্যাঁ।”
“আমার নাম বলব না। কিন্তু মনে রাখবেন—ওরা যতই বড় হোক, গান যদি মন ছুঁতে পারে, তবে যতটা ওরা ভয় পায় বন্দুককে, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় বাঁশিকে।”
তারপর এক নিঃশব্দ বিৎ বোতামের শব্দ। ফোন কেটে যায়।
তরুণ বলে, “কে ছিল এটা?”
রুদ্র বলে, “একজন আশাবাদী। আমাদের মতোই।”
রাস্তাঘাটে স্লোগান উঠতে থাকে—“তলোয়ার নয়, তবলাই জবাব!”
রুদ্র-তরুণ হাঁটে জনতার সঙ্গে। পিছনে বাজে গান, সামনে উঠছে নতুন এক স্বপ্ন।
কিন্তু ঠিক তখনই অন্ধকারে বসে সিন্ডিকেট বসেরা বলে ওঠে, “এই পাগলদের থামাতে হবে, এর আগে তারা গান দিয়ে গড়ে তোলে এক নতুন রাজনীতি।”
পর্ব ৩: রাতের রাজার সফর
শহরের গলিঘুঁজি থেকে মফস্বলের মাঠে, গানতন্ত্র পার্টির নাম ছড়িয়ে পড়ছে। রুদ্র আর তরুণ হাঁটছেন, গাইছেন, বদলে দিচ্ছেন লোকের চোখের দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু দিন যত গড়াচ্ছে, রাত তত হয়ে উঠছে অদ্ভুত।
এক রাতের কথা। গোপীবাগের ছোট্ট এক অলিগলির ঘরে রুদ্র আর তরুণ বসে নতুন সুর নিয়ে আলোচনা করছিল। ছাদে তখনো পাখির ডাক, দূরে ট্রেনের শব্দ। হঠাৎ বাইরের রাস্তা কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হাওয়া থেমে গেল, যেন সময় থেমে আছে।
তারপরেই দেখা গেল, গলির মুখে ঢুকছে এক লম্বা কনভয়। কালো কাচ দেওয়া গাড়ি, মাথায় ছোট লালবাতি ঘোরে, কোনো নম্বরপ্লেট নেই। একটা গাড়ি এসে থামে তাদের বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নামেন এক দীর্ঘকায় পুরুষ, মাথায় সাদা টুপি, চোখে চশমা, গলায় জারদৌসি শাল।
“আপনারা কি রুদ্র বাউল আর তরুণ ধ্বনি?” তার কণ্ঠের মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত কম্পন।
রুদ্র দাঁড়িয়ে পড়ে, “হ্যাঁ। আপনি?”
“আমার নাম বলা যায় না। তবে সকলে আমাকে ডাকে ‘রাত্রিকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী’ নামে। আমি সেই মানুষ, যার অস্তিত্ব কাগজে নেই, কিন্তু ক্ষমতা আছে অনেক কিছুর। আমি স্বপ্নের সুর, রাষ্ট্রের ছায়া, অন্ধকারের মধ্যে নীতির পাণ্ডুলিপি।”
তরুণ অবাক হয়ে বলে, “আপনি এসেছেন আমাদের কাছে কেন?”
মন্ত্রী হেসে বলেন, “তোমাদের গান বদলে দিচ্ছে মানুষকে। তোমরা জানো না, তোমাদের সুরকে ভয় পায় অনেক বড় বড় লোক। তাই আমি এসেছি—না বাধা দিতে, বরং আশীর্বাদ দিতে।”
রুদ্র বলে, “আশীর্বাদ? আপনি সরকার না হয়ে আমাদের আশীর্বাদ দিতে এলেন?”
মন্ত্রী তার শাল মেলে ধরে বলেন, “তোমাদের এই রাজনৈতিক যাত্রায় তিনটি উপহার দিতে এসেছি।”
তিনটি প্যাকেট বের করে দেন।
“প্রথমটি—সত্যর বোল। যেই গান এই শব্দে গাও, মানুষের মনের গভীর সত্য প্রকাশ পাবে, তারা শুধু শুনবে না, অনুভব করবে।
দ্বিতীয়টি—স্বপ্নের সুর। তুমি যদি কোনো মানুষের ভবিষ্যৎ দেখতে চাও, এই সুর দিয়ে তাদের স্বপ্নের দরজা খুলে যাবে।
আর তৃতীয়টি—স্মার্টফোন সেন্স। এটা দিয়ে কোনো ফোন তোমার গান কাট করতে পারবে না, মুছে ফেলতে পারবে না। সোশ্যাল মিডিয়ার সেন্সর ব্যর্থ হবে, কারণ এটা সরাসরি মানুষের হৃদয়তন্ত্রীতে কাজ করে।”
তরুণ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে রুদ্রের দিকে তাকায়।
মন্ত্রী আবার বলেন, “তোমরা জানো, আজকের রাজনীতি শুধু মঞ্চে হয় না, হয় মাইক্রোফোনে, ফোনে, স্ক্রিনে, ডেটাতে। আমি তোমাদের সেই ক্ষমতা দিতে এসেছি—যাতে গান না শুধু শুনতে পাও, শুনিয়ে দিতেও পারো।”
রুদ্র বলে, “তাহলে আপনিও আমাদের দলে?”
মন্ত্রী হাসেন, “না, আমি কোনো দলে নেই। আমি শুধু জানি, যদি কেউ সত্যি গান দিয়ে জাগাতে পারে, তাহলে তাকে থামানো যায় না। আর আমি চাই—তোমরা থেমে না যাও।”
গাড়ির দরজা খুলে যায় আবার। মন্ত্রী উঠে পড়েন, “আমাদের দেখা হবে আবার, যখন সত্য বড্ড তিক্ত হয়ে যাবে। তখন আমি ফিরব, যেমন আজ এসেছি—অচেনা ছায়ার মতো।”
গাড়ি চলে যায় নিঃশব্দে। চারপাশে আবার হাওয়া ফিরে আসে, ট্রেনের শব্দ ফিরে আসে, গলির কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করে।
রুদ্র প্যাকেট তিনটি খুলে দেখে। একটি বেতার যন্ত্র, একটি সাদা সিল্কের স্কার্ফ, আর একটি ফোন-অ্যাডাপ্টার মতো কিছু।
তরুণ নিঃশ্বাস ফেলে, “এগুলো যদি সত্যি কাজ করে… তাহলে আমাদের সুর এবার শুধু মানুষের কানেই যাবে না, তাদের চেতনায় ঢুকবে।”
রুদ্র ধীরে ধীরে বলে, “তাহলে শুরু হোক নতুন গান, নতুন যন্ত্রে, নতুন আশীর্বাদে।”
সেই রাতেই তারা লেখে নতুন গান:
“সত্যর সুরে উঠুক জোয়ার,
ভয়ে নয়, প্রেমে হোক পরিবর্তন,
গান যদি ভাসায় হৃদয়ের তরী,
তবে থেমে যাবো না, যতই হোক প্রতিবন্ধকতা।”
তাদের কণ্ঠে সেই সুর গুঞ্জরিত হয়, আর দূর থেকে শোনা যায়—একটা শহর নিঃশব্দে দুলছে নতুন এক গানের অপেক্ষায়।
পর্ব ৪: ফেকনিউজের রাজ্যে
গানতন্ত্র পার্টির নামে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত উন্মাদনা। ছোট ছোট জায়গায় গানে গানে জমে উঠছে সভা, কিশোরেরা পোস্টার আঁকছে, বৃদ্ধেরা চায়ের আড্ডায় বলছে, “ওদের গানেই যেন পুরোনো দিনের প্রতিবাদের গন্ধ পাই রে।”
কিন্তু সেই সুবাস পৌঁছে গিয়েছে ক্ষমতার শ্বাসরোধী কক্ষেও। আর যেখানেই জনপ্রিয়তা ছোঁয়, সেখানেই ফাঁদ পাতা থাকে।
রুদ্র আর তরুণ এক দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে পারফর্ম করার ঠিক আগে খবর পান—তাদের নামে স্যোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে এক ভিডিও, যেখানে তারা নাকি বলেছে, “সংবিধান বদলে ফেলতে হবে”, “জাতীয় সংগীতের পরিবর্তে গানতন্ত্রের গান গাইবে সবাই”।
তরুণ আতঙ্কে বলে, “এগুলো তো আমরা বলিনি!”
রুদ্র ঠান্ডা স্বরে বলে, “আমরা বলিনি ঠিকই, কিন্তু আজকাল বলাটা বড় কথা নয়, ছড়ানোটা বড় কথা। কে কী বলেছে তা নয়, কে কী শুনতে চায়—সেটাই ভাইরাল।”
এক মিনিটের মধ্যেই ফোনে আসছে বার্তা—“আপনারা দেশদ্রোহী?”
“আপনারা কি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের পুতুল?”
একটি চ্যানেল তো বলেই দিল—“রুদ্র-তরুণ: গান দিয়ে গড়ে তুলছে নয়া বিচ্ছিন্নতাবাদ?”
তাদের পারফর্ম করার অনুমতি বাতিল হয়ে যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, “আপনাদের কথাগুলো আমাদের তদন্তে সন্দেহজনক।”
তরুণ দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “মুখে কালি, কানে তুলো, হাত বাঁধা—এই যে মডার্ন সেন্সরশিপ!”
রুদ্র চুপচাপ মোবাইল থেকে স্ক্রীন শেয়ার করে এক অজানা নম্বরে পাঠায় সবকিছু। তারপর বলে, “দেখিস, আজ রাতেই কেউ আসবে।”
ঠিক যেমনটা হয়, সেই রাতে ফের হাজির হন সেই রাত্রিকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী।
এবার গাড়ি নেই, শাল নেই। হাঁটতে হাঁটতে আসেন, একটা রিকশায় চড়ে।
“তোমাদের ভাবলাম সাহসী, কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে একটু কাঁচা।”
রুদ্র বলে, “ভুয়ো খবরের জাল টাঙানো হয়েছে আমাদের মুখে। কী করব আমরা?”
মন্ত্রী হাসে, “ভুয়ো খবর ভাঙা যায় না, পাল্টে দিতে হয়। যে যেটা বিশ্বাস করতে চায়, তাকেই চাই নতুন সুরে বিশ্বাস করাতে। এই নাও, দ্বিতীয় দান—স্বপ্নের সুর। এই সুরে গাও, যাতে মানুষ শুনতে পায় তাদের নিজের মনের কথা।”
“মানুষ নিজের স্বপ্নের ভেতর আমাদের গান শুনবে?”
“না, তারা ভাববে তারা নিজেরাই গাইছে। তখন আর তুমি দেশদ্রোহী নও, তখন তুমি তাদের প্রতিধ্বনি।”
মন্ত্রীর যাওয়া মাত্র রুদ্র-তরুণ নতুন গান লেখে:
“আমরা বলিনি কিছু, তোমরাই শুনেছো
আমরা দিইনি দিক, তবুও হাঁটছো—সেই পথে
আমরা শুধু বাজিয়েছি একটুখানি সুর,
বাকিটা তো তোমার ভিতরেরই গুঞ্জন।”
তারা এই গান ভিডিও করে পোস্ট করে। সুর এতটাই মায়াবী, এতটাই ভেতরের স্বরের মতো, যে বহু মানুষ কমেন্ট করে—“কী আশ্চর্য! যেন নিজের মনেই বলছিলাম।”
ভুয়ো খবরের হ্যাশট্যাগ হারিয়ে যায়, তার জায়গায় ট্রেন্ড করে—#মনগানের_সত্য।
তবু সরকারের পক্ষে থাকা মিডিয়া এবার চালাল আরও বড়ো খেলা। বানানো হল ডকুমেন্টারি, যেখানে দেখানো হল—রুদ্র ছোটবেলায় পাকিস্তানি পুতুল নিয়ে খেলত, আর তরুণ নাকি একসময় মাওবাদী এলাকার গান শিখতে গিয়েছিল।
তাদের নাম সার্চ করলেই উঠে আসে “দেশবিরোধী” শব্দটি।
তরুণ রাগে ফেটে পড়ে, “এরা আমাদের জীবনটাই বিক্রি করে দিচ্ছে মিথ্যার বাজারে!”
রুদ্র চোখ মুছে বলে, “আমরা তো গান বানাই। এবার গানকেই আমাদের মুখপত্র করতে হবে।”
তারা এবার গান করে একেবারে ডাটা জুড়ে:
“কোথায় ছিলে, কে ছিলে, কোন নামে বাঁচলে,
এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
আমরা এখন কে, এখন কী গাই,
সেটাই তো জানাবে কারা শোনে!”
এই গানে আসে এমন এক সফ্টওয়্যার বেসড টোন, যা কোনো মিডিয়া কাটতে পারে না—কারণ সেটা সিগনাল ব্লকের ভেতর থেকেও মানুষের ফোনে ঢুকে যায়।
এভাবেই গানতন্ত্র পার্টি ফেকনিউজের ধাক্কা সরিয়ে আবার দাঁড়ায়।
কিন্তু ছায়া থেকে কেউ ফিসফিস করে বলে, “এবার সময় হয়েছে ‘তথ্য’কে কন্ট্রোল করার। ওরা শুধু গান গায় না, ওরা সত্যের ভাষা জানে। এটা থামাতে হবে।”
পর্ব ৫: ভোটের গপ্পো
নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসছে। শহরের দেয়ালজুড়ে উঁকি দিচ্ছে রঙিন পোস্টার, ডিজিটাল হোর্ডিং, অটো রিকশা আর পিয়াজু-চা-তর্ক—সব কিছুতেই এখন একটাই কথা: “ভোট কাকে দেবেন?” আর এই প্রশ্নের মাঝখানেই মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে গানতন্ত্র পার্টি, সেই দুই “অ-রাজনৈতিক” মানুষ রুদ্র বাউল আর তরুণ ধ্বনির হাতে গড়া এক আশ্চর্য আন্দোলন।
তাদের মিছিল হয় ব্যানার ছাড়াই, গানেই চলে প্রচার। কেউ দিচ্ছে না চালের প্যাকেট, কেউ দিচ্ছে না টি-শার্ট। শুধু একটা মোবাইল স্পিকার, আর রুদ্র গাইছে:
“ভোটটা দাও ভালোবাসায়,
দেও না শুধু ভাতের আশায়।
চোখে যা দেখো, কানেই যা শুনো,
সেটাই যেন সত্যি হয়, মন যেন বাঁচে।”
তরুণ রাস্তায় তবলা বাজাচ্ছে বালতিতে, তার কাঁধে একটা সাদা কাপড়ে লেখা: “আমরা পার্টি, কিন্তু তোমার মতোই।”
একদিন এক মফস্বল শহরে তারা গাইতে গিয়েছিল, একটা বাচ্চা মেয়ে এসে বলে, “দাদু, তুমি কি হিরো?”
রুদ্র হেসে বলে, “আমি হিরো না রে, আমি তো গান গাই।”
মেয়েটা চোখ গোল করে বলল, “আমার বাবাও গায়, কিন্তু টিভিতে আসে না। তুমি তো টিভিতে এসেছো। তুমিই হিরো!”
এই কথাটা রুদ্রর মনে গেঁথে যায়। সে বুঝতে পারে, তারা আসলেই হিরো না, কিন্তু মানুষের আশা হিরো বানায়।
কিন্তু আশার পথে ফাঁদও পাতা থাকে।
নির্বাচনী কমিশনের তরফে হঠাৎ ঘোষণা হয়—“গানতন্ত্র পার্টির প্রচার পদ্ধতি অনুমোদিত নয়। সুরের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে, যা আচরণবিধির লঙ্ঘন।”
তরুণ হেসে বলে, “গান যদি আচরণবিধি ভাঙে, তবে হাসি কি রাষ্ট্রদ্রোহ?”
রুদ্র বলে, “ভয় নেই। ওরা গানকে যতই চাপা দেবে, সুর ততটাই ছড়াবে।”
তাদের বিরুদ্ধে কেস ফাইল হয়, কিন্তু শহরের মানুষ রাস্তায় নামে। ফেসবুকে ট্রেন্ড করে #গানচুপকরোনা। এমনকি বিদেশি মিডিয়াও বলে ওঠে—“India’s protest now sings.”
এই অবস্থায় তারা সিদ্ধান্ত নেয়, শেষ নির্বাচনী প্রচার করবে এক খোলা মাঠে—নির্বাচনের আগের রাত। সেদিন তারা এক বিশাল গানের কনসার্ট করে।
সেই গান ছিল—
“না তোমার জোর, না আমাদের গলা,
তবু শুনে দেখো একটুখানি কথা,
ভোটের চালে যদি বন্দুক বাজে,
আমরা ফিরিয়ে দেব সুরের গাজে।”
লোকজন এসে ভরে দেয় মাঠ। বুড়ো থেকে শিশু, মেকআপ আর্টিস্ট থেকে মাছওয়ালা—সবাই একসাথে বলে, “আমরা রুদ্র-তরুণের গান শুনেছি, এবার ওদের কথায় বিশ্বাস রাখতে চাই।”
কিন্তু সমস্যা অন্যখানে।
কমলা পার্টি, সবুজ পার্টি, ঘাসফুল পার্টি—তিন প্রধান দল এখন একত্রিত হয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। একজন বলে, “এই গান যদি ভোট কেটে ফেলে, তবে আমরা সবাই ডুবব।”
অন্যজন বলে, “ওদের ভোট হয়তো জিতবে না, কিন্তু আমাদের হারিয়ে দেবে।”
তৃতীয়জন বলে, “তাহলে তো প্ল্যান বি আনতেই হবে।”
প্ল্যান বি ছিল—ইভিএম।
ভোটের দিন শুরু হয় শান্তভাবে। রুদ্র আর তরুণ ভোট দেয় পাড়ার স্কুলে। বাইরে দাঁড়িয়ে তারা গান গায়:
“ব্যালট নয়, হৃদয়ের ছাপ,
এই হাতেই বাঁচবে অধিকার।
না দিও যদি সুরকে ভোট,
তবে কাকে দেবে? গালিকে আবার?”
লোকজন ভিড় করে, কেউ সেলফি তোলে, কেউ শুধু চোখ মুছে চুপ করে দাঁড়ায়।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। বুথফেরত সমীক্ষায় দেখা যায়—গানতন্ত্র পার্টি বেশ কিছু শহরে এগিয়ে।
রাত্রি নামতেই রুদ্র বলে, “আজ না হয় একটু উদযাপন হোক, তরুণ। যতই হই না কেন রাজনৈতিক, আমরা তো শিল্পী।”
তরুণ একখানা বাতাসা মুখে দিয়ে হেসে ফেলে, “এই শহরে আবার বাতাসাও রাজনীতির রঙে ভাগ হয়ে গেছে রে!”
তারা হাসে, আকাশের দিকে চায়।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, আর এক শহরের অন্ধকার কোণে এক বৃদ্ধ ইঞ্জিনিয়ার টাইপের মানুষ তার নখে কিছুর কোড টিপে বলে, “গান ভালো। কিন্তু ভোট? সেটা ঠিক করবে তথ্য।”
পর্ব ৬: ইভিএমের জাদু
ভোটের দিন শেষ। শহর জুড়ে কাগজে, কানে, চায়ের দোকানে একটাই কথা—গানতন্ত্র পার্টি এবার ইতিহাস লিখবে। বুথফেরত রিপোর্ট, বিশ্লেষক টকশো, টুইটার ট্রেন্ড—সবখানে রুদ্র-তরুণের নাম। কেউ বলছে “তাদের ভোট পড়েছে পঁচিশ শতাংশে”, কেউ বলছে “তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি”, আবার কেউবা বলছে “ওরা শুধু হাওয়া, জিতবে না, জাগাবে।”
রুদ্র তরুণ কিছুই বলে না। তারা শুধু শহরের গলিতে হেঁটে, মানুষের চোখে চেয়ে দেখে এক অদ্ভুত আলো। সেই আলোতে তারা নিজেরাই নিজেদের চিনতে পারে না—এতদিন যারা গান গেয়ে নেমেছিল পথে, আজ যেন তারা হয়ে উঠেছে এক রূপকথার চরিত্র।
কিন্তু নির্বাচনের দিন পেরনোর দু’দিন পর যখন ফল প্রকাশ শুরু হয়, তখন প্রথমেই ধাক্কা।
প্রথম ১০টা কেন্দ্রের ফল: সব হেরে গেছে গানতন্ত্র পার্টি। পরপর ত্রিশটা কেন্দ্র—একটাও জয় নয়, এমনকি কোথাও তো সেভাবে ভোটই পড়েনি। অথচ সেই কেন্দ্রেই তারা আগের রাতে কনসার্ট করেছিল, হর্ষধ্বনির ঢেউ উঠেছিল।
তরুণ সাদা হয়ে যায়। বলে, “এইটা সম্ভব কীভাবে?”
রুদ্র চুপ করে থাকে। ফোনে ডেটা চেক করে, চার্ট দেখে, ভোটার সংখ্যা দেখে, শেষে বলে, “এখানে কিছু একটা গোলমাল আছে। মাঠে যা দেখেছি, ফল তেমন নয়।”
এক সাংবাদিক বন্ধু ফোন করে জানায়, “বুথে বুথে ভোট গিয়ে কোথাও ‘নোটা’ বাড়ছে, কোথাও একটাই প্রতীকে ভোট পড়েছে হাজার হাজার। অথচ লাইভ রিপোর্টে তো গানতন্ত্র পার্টি এগোচ্ছিল।”
রুদ্র বলে, “আমরা বুথগুলো নিজের চোখে দেখতে চাই।”
তারা যায় এক পুরোনো ইভিএম স্টোরেজ সেন্টারে। সেখানে তালা, পাহারা, কিন্তু এক বুথের গেট খোলা দেখে তারা ঢুকে পড়ে। ভেতরে দেখি এক বুড়ো বসে—চোখে ভারী চশমা, হাতে সেলাইয়ের সুই, আর সামনে সারি সারি ইভিএম।
“আপনারা এখানে কেন?” তিনি প্রশ্ন করেন না। বরং বলেন, “তোমরাই কি সেই সুরের বংশধর?”
রুদ্র চমকে যায়। “আপনি কে?”
বৃদ্ধ বলেন, “আমি তথ্যের কারিগর। আমিই ঠিক করি কোন বোতাম টিপলে কার গান শোনা যাবে, আর কারটা হবে নিঃশব্দ।”
তরুণ বিস্ময়ে বলে, “আপনি কি… ডেটা ম্যানিপুলেটর?”
বৃদ্ধ হাসেন, “তথ্য তো জল, যার পাত্রে পড়ে, তার রঙে বদলে যায়। তোমরা ভেবেছিলে মানুষ ভোট দেয়? মানুষ স্বপ্ন দেখে। আর আমি ঠিক করি, সেই স্বপ্ন কোন চ্যানেলে যাবে।”
রুদ্র থেমে না থেকে বলে, “আপনারা যদি সিদ্ধান্তই নেন কে জিতবে, তাহলে ভোট কেন হয়?”
“ভোট হয় আশার অভিনয়। আমরা সে আশাকে প্যাকেটজাত করি। গান ভালো, আবেগ ভালো, কিন্তু ক্ষমতা—তা ডেটার।”
তরুণ ধাক্কা দিয়ে ইভিএমের বোতাম চেপে দেখে—সব বোতাম চাপলেও আলো জ্বলে একটাতেই।
“এ তো যাদু!”
“না,” বৃদ্ধ বলেন, “এটা তথ্য-নির্ভর গণতন্ত্র। এর নাম—ইভিএমের জাদু।”
সেই রাতে রুদ্র আর তরুণ গোপনে স্টোরেজ সেন্টার থেকে বেরিয়ে আসে। চুপচাপ। কাঁধে শুধু একটুখানি অন্ধকার আর বুকের ভেতর একখানা সুর—তাদের কণ্ঠে আসতে চাইছে, কিন্তু ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।
রুদ্র হঠাৎ বলে, “তুই জানিস তরুণ, আমরা হেরেছি ঠিকই, কিন্তু তারা ভয় পেয়েছে। না হলে এত সাজানো নাটক করত না।”
তরুণ বলে, “তবে এবার কী হবে?”
রুদ্র মুঠো পাকিয়ে বলে, “এবার দরকার একটা গান, যেটা শুধু কানে যাবে না, মগজেও ধাক্কা দেবে। এমন গান, যেটা শুনে মানুষ নিজেই প্রশ্ন করবে—ভোটটা কে দেয়, আর তার দামটা কে নেয়।”
পর্ব ৭: স্বপ্নে নন্দন নগর
রুদ্র আর তরুণ হেরে গিয়েছে ভোটে। তারা সেটা জানে। কিন্তু তারা হারেনি মানুষের মনে, মানুষের গলায়, ফেসবুক রিলসে, বাচ্চাদের আঁকা দেওয়ালে। হার হয়েছে কাগজে। কিন্তু রাস্তায় তাদের গান এখনও বাজে। আর সেই গান এক রাতে নিয়ে যায় রুদ্রকে এক আজব জায়গায়—নন্দন নগর।
রুদ্র দেখে সে একটা অপার্থিব শহরে ঢুকেছে—বাড়িগুলো বাঁশের কুঁড়েঘরের মতো কিন্তু উজ্জ্বল আলোয় মোড়া, চারদিকে মানুষের ভিড়, কিন্তু কেউ কথা বলছে না—শুধু গান। লোকজন কাজ করছে, পড়াশোনা করছে, প্রেম করছে—সবই গানের তালে।
সেই নগরের নাম নন্দন নগর।
এক জায়গায় সে দেখতে পায়—তরুণ ধ্বনি একটা উঁচু টাওয়ারের মাথায় বসে তবলা বাজাচ্ছে, আর সেই বাজনায় শহরের আলো কমছে, বাড়ছে। রুদ্র চিৎকার করে ডাকে, “তরুণ!”
তরুণ বলে, “স্বপ্নে এসেছিস রে। স্বপ্নে কথা বলা যায় না, শুধু গাওয়া যায়।”
হঠাৎ এক শিশু তার সামনে এসে বলে, “তুমি কি সেই গানওয়ালা?”
রুদ্র মাথা নাড়ে। বাচ্চাটা বলে, “তাহলে আমাকে একটা গান শেখাও, যা শুনলে আমি জানি আমার ভোটটা কোথায় গেছে।”
রুদ্র অবাক হয়। “তুই তো শিশু। ভোট দেয়ার বয়সই তো হয়নি তোর।”
শিশু বলে, “আমার স্বপ্নেও তো ভোট হয়। আমি কার পাশে দাঁড়াব, কার গান শুনব—সেটাই তো আমার ভোট।”
তারপর সারা নন্দন নগর জুড়ে শুরু হয় এক বিশাল রিহার্সাল। রুদ্র আর তরুণ মঞ্চে উঠে নতুন গান গাইছে:
“তথ্যের জাদুতে ঢেকে যায় সত্যি,
ভোটের বাক্সে খেলে মুখোশের নৃত্য,
তবু রয়ে যায় একখানি সুর—
যে সুরে জেগে ওঠে ঘুমন্ত দূর।”
গান শেষ হতেই হঠাৎ করে সব আলো নিভে যায়। চারদিক অন্ধকার। তারপর এক বৃদ্ধের গলা শোনা যায়—সেই তথ্যের কারিগর।
“ভেবেছিলে স্বপ্ন নিরাপদ? এখানেও আমি আছি। এখনকার মানুষ শুধু জাগ্রত নয়, স্বপ্নেও সংবেদনশীল। আর সেই স্বপ্নও আমি কন্ট্রোল করি।”
হঠাৎ করেই রুদ্র ঘুম ভেঙে ওঠে। ঘেমে গেছে, বুক ধুকধুক করছে।
তরুণ তখন চায়ের কাপ হাতে বসে জানালার পাশে। “ঘুম ভাঙলো?”
“তুই স্বপ্নে ছিলি… একটা শহরে… যেখানে সবাই গান গাইত, কথা বলত না…”
তরুণ হেসে বলে, “স্বপ্নটা আমাদের তৈরি, রে ভাই। তুই কেবল একটু এগিয়ে দেখেছিস। নন্দন নগর সেই জায়গা, যেখানে গানই গণতন্ত্র।”
রুদ্র চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “তবে এবার সেই স্বপ্নকে বাস্তব করতে হবে। যদি সত্যিই স্বপ্নেও ওরা ঢুকে পড়তে পারে, তাহলে আমাদের গান ঢুকবে হৃদয়, মস্তিষ্ক, আর তন্ত্রের ভেতরে।”
সেই রাতে তারা লেখে নতুন গান, এক হাইফ্রিকোয়েন্সি সুরে—যা সাধারণ কানে শোনা যায় না, কিন্তু ঘুমন্ত মানুষের অবচেতনে ঢুকে পড়ে।
নাম রাখে—“স্বপ্নতন্ত্র”।
সেই গান তারা পোস্ট করে। কেউ শুনতে পায় না, কিন্তু কেউ কেউ কমেন্ট করে—“গতরাতে একটা সুর শুনে ঘুম ভাঙলো।”
“একটা মেয়ে আমার স্বপ্নে এসে বলল—তোমার ভোট তুমি ফেরত নিয়ে নাও।”
“ঘুমের মধ্যে নিজেকে দেখেছি রাস্তায়, স্লোগান দিচ্ছি গান গেয়ে।”
তারা বুঝতে পারে—গানটাকে এখন শুধু রাজনীতি নয়, স্বপ্নতন্ত্রেও রপ্তানি করতে হয়েছে।
কিন্তু ঠিক তখনই এক গোপন এজেন্সি রিপোর্ট করে সরকারের কাছে—
“রুদ্র-তরুণ এখন শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখ নয়, তারা হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য স্বপ্নবিপ্লবের পুরোহিত। এদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরের প্রজন্ম হাতছাড়া হয়ে যাবে।”
সরকার বৈঠকে বসে। সিদ্ধান্ত হয়—“এইবার সরাসরি ব্যবস্থা নিতে হবে। গানকে ব্যান করতে হবে, গানতন্ত্রকে ঘোষণা করতে হবে অসাংবিধানিক।”
রাত্রির শেষে তরুণ বলে, “এই লড়াই এখন আর কেবল ভোটের নয়। এটা এখন মনস্তন্ত্রের বিরুদ্ধে গানতন্ত্র।”
রুদ্র মৃদু হাসে, “তবে যুদ্ধটা শুরু হোক ঘুম থেকে জেগেই। না ঘুমিয়ে নয়—ঘুমিয়ে জয় আনতে হবে।”
পর্ব ৮: নতুন গান, পুরনো সুর
সকালে ঘুম থেকে উঠেই রুদ্র জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল—শহর বদলে গেছে। মানুষ যেমন ছিল, তেমনই আছে, কিন্তু চোখের চাউনি যেন অচেনা। দোকানে দাঁড়ানো চা-ওয়ালার চোখে এক ধরনের শূন্যতা, রিকশাচালক নিজের ছায়া এড়িয়ে চলে, আর কলেজের প্রাচীর থেকে উঠে গেছে পোস্টার—সব গানতন্ত্রবিরোধী হুঁশিয়ারি।
পাশের বাসিন্দা এক কাকু বলে উঠলেন, “ওই ছেলেরা ঠিক ছিল কিনা জানি না, কিন্তু এখন তো সরকারের কথাও ঠিক মনে হচ্ছে না। কিচ্ছুই ঠিক না যেন।”
এই “কিচ্ছু ঠিক না”—এই সুরটাই ধরল রুদ্র আর তরুণ।
তরুণ বলে, “মানুষের মন এখন কাগজের মতো, চাইলেই ভাঁজ করা যায়, পোড়ানো যায়, আবার ভিজিয়ে দিলেও সব ছাপ মুছে যায় না।”
রুদ্র বলে, “তবে চল এবার লিখি এমন গান, যা পুরোনো, কিন্তু মনে পড়ে না। যেটা শোনার পর সবাই বলবে—‘এ তো আগে শুনেছি কোথাও, কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না কেন যেন।’”
তারা লিখল:
“এই সুরে কাঁদত এক মা,
এই সুরেই হেসেছিলো এক প্রেম,
এই সুরেই কেউ বলেছিল—চোর,
আবার এই সুরেই বলেছিল—ভালোবাসি।”
গানটা তারা গাইল না। বাজাল না। শুধু QR কোড করে পোস্টার ছেপে দিল শহরের দেয়ালে।
কোড স্ক্যান করলেই বাজে সেই সুর—নীরব, কিন্তু নাড়িয়ে দেয় বুকের ভিতর।
লোকজন শুনে বলে, “এটা কোথা থেকে এল? এটা তো আমরা কখনও শুনিনি—তবুও কেন জানি মনে হচ্ছে, এটা আমাদের গল্প!”
বাচ্চারা স্কুলে সেই সুর গুনগুন করে। কলেজে একজন ছাত্র বক্তৃতা ছেড়ে গেয়ে ওঠে সেই ছন্দে।
মাঝরাতে এক পুলিশ অফিসার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে বাসার জানালায় বসে শুনে ফেলে QR কোডের গান—মনে পড়ে যায় মায়ের মুখ।
তরুণ বলে, “এই গানকে কেউ থামাতে পারবে না। কারণ এর উৎস পুরোনো। ইতিহাসের ভাঁজ থেকে এসেছে এটা।”
রুদ্র বলে, “আমরা নতুন কিছু করিনি। পুরোনো কথা নতুন করে গেয়েছি। আর পুরোনো কথায় এমন এক মোহ আছে, যেটা মুছে ফেলা যায় না।”
কিন্তু সরকার এবার সরাসরি আক্রমণে নামে।
এক সরকারি মুখপাত্র বিবৃতি দেয়, “গানতন্ত্র পার্টির QR কোড আসলে সাইবার হ্যাকিংয়ের অস্ত্র। এর মাধ্যমে জনগণের ফোনে ঢুকে তাদের তথ্য চুরি করা হচ্ছে। এটাকে ‘সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস’ বলা যায়।”
এই বার্তায় বিভ্রান্তি ছড়ায়। লোকজন আবার সন্দেহে পড়ে। কেউ QR কোড ছিঁড়ে ফেলে, কেউ থানায় রিপোর্ট করে।
তবে কিছু মানুষ এবার আর চুপ করে না।
একজন প্রবীণ অধ্যাপক বলেন টিভিতে, “যদি গানকেই সন্ত্রাস বলা হয়, তাহলে কণ্ঠটাই তো অপরাধ হবে।”
একদিন রাতে শহরের এক পার্কে ছোট একটি ছেলেমেয়ে গিটার হাতে দাঁড়ায়, গাইতে থাকে সেই পুরোনো সুর।
লোক জড়ো হয়। কেউ বলে, “তোমরা কি রুদ্র-তরুণের লোক?”
তারা বলে, “না, আমরা তাদের মতো। তারাই তো আমাদের মতো হয়ে উঠেছিল।”
তরুণ সেই ভিডিও দেখে বলে, “দেখছিস? আমরা থাকি বা না থাকি, গান থেকে যাবে। গান আমাদের থেকেও পুরোনো, আমাদের থেকেও বেশি মানুষ।”
রুদ্র চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “তবে এবার যুদ্ধটা তাদের নয়—জনতার। আমরা শুধু সুর তুলে দিয়েছিলাম।”
সেই রাতে একসাথে শহরের পাঁচটি স্থানে QR কোড গানের প্রজেকশন চলতে থাকে। দেয়ালে দেয়ালে শুধু সেই লাইন—
“যদি ভুলে যাও, তাহলে ফিরে এসো গানে।”
পরদিন সকালে সরকার চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়—গানতন্ত্র পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হলো, তাদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’-এর মামলা রুজু হয়েছে। রুদ্র-তরুণের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি।
তারা দুজন লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু লুকিয়ে থেকেও তারা দেখে—শহর নিজেই গান গাইছে। আর সেই গান এখন শুধু শিল্প নয়, প্রতিবাদ নয়, সে হয়ে উঠেছে—একটা ভাষা।
পর্ব ৯: সত্যের তৃতীয় ইচ্ছা
রুদ্র আর তরুণ এখন আর শহরের মুখ নয়। তারা হয়ে উঠেছে ছায়া—যেখানে গান অদৃশ্য, কিন্তু উপস্থিত। তারা পালিয়ে বেড়ায় না, বরং শহরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে নিজেদের রেখে গেছে QR কোডে, মেট্রো স্টেশনের দেয়ালে, পুরোনো রেডিওর তরঙ্গে। তারা এখন শহরের গোপন পাসওয়ার্ড।
এক রাতে হঠাৎ একটা বুলেটিন—“রুদ্র-তরুণের বিরুদ্ধে বিশেষ বাহিনী গঠিত হয়েছে। অভিযানে থাকবে স্মার্ট ড্রোন, অডিও ফ্রিকোয়েন্সি স্ক্যানার, এবং ‘ডেটা ফোর্স’ নামে একটি সাইবার আর্মি।”
সেই ডেটা ফোর্সের নেতৃত্বে আছেন রাত্রিকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর ছেলে—নীরদ দত্ত। অতি বুদ্ধিমান, স্নায়বিক যন্ত্রপাতিতে পারদর্শী, কিন্তু গান বোঝে না। তার বিশ্বাস—“সুর একটা বাগ, গান একটা গ্লিচ, যা মানুষের সিদ্ধান্তকে বিকৃত করে।”
এই ঘোষণার পর থেকেই শহরের আকাশে ঘুরতে থাকে ড্রোন, রাস্তায় বসানো হয় শব্দ বিশ্লেষক, এমনকি QR কোড স্ক্যান করলে ফোন হ্যাক হয়ে যায়।
মানুষ আবার চুপ করে যায়। স্কুলে শিক্ষক বলেন, “এইসব গান এখন নিষিদ্ধ। এই গান মানেই জেল।”
রুদ্র এই খবর শুনে বলে, “তরুণ, ওরা এবার আমাদের কণ্ঠ নয়, শ্রোতাকেই শাস্তি দিচ্ছে।”
তরুণ বলে, “তাহলে এবার দরকার তৃতীয় ইচ্ছাটা।”
রাত তিনটেয়, এক অদ্ভুত পাথরের ঘরে হাজির হন সেই পুরোনো রাত্রিকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। মুখে ক্লান্তি, চোখে দুশ্চিন্তা।
রুদ্র প্রশ্ন করে, “আপনি আমাদের আশীর্বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন আপনার নিজের ছেলে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে।”
মন্ত্রী চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ, তারপর বলেন, “ডেটার রাজনীতি আমার পক্ষে বড়ো হয়ে গেছে। আমি কেবল ছায়া, এখনকার যুদ্ধ ডিভাইস বনাম অভিজ্ঞতার। আমার ছেলেও বিশ্বাস করে, সত্য বলে কিছু নেই—শুধু তথ্যের অভ্যন্তরীণ ভার্সন।”
তরুণ ধৈর্য হারিয়ে বলে, “তবে আপনি এসেছেন কেন?”
মন্ত্রী পকেট থেকে একটি ছোটো, ধাতব চিপ বের করেন।
“এটা সত্যের তৃতীয় ইচ্ছা। প্রথম ইচ্ছা ছিল কণ্ঠের শক্তি, দ্বিতীয় ছিল স্বপ্নের সুর। আর এই তৃতীয়টা—অন্যের অভিজ্ঞতা বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা। এই চিপ একবার কানেক্ট করলে, যে কেউ নিজের কথা না বলে, অন্যের সত্য গাইতে পারবে।”
রুদ্র ফিসফিস করে বলে, “তাহলে এটা… একধরনের সম্মিলিত স্মৃতি?”
“হ্যাঁ। এই চিপে সংরক্ষিত আছে সেইসব মানুষের অভিজ্ঞতা, যারা কখনো গলা পায়নি। এখন তোমরা তাদের কণ্ঠ।”
তরুণ বলে, “তবে এবার গান হবে শুধু আমাদের নয়—গোটা জনতার, হাজার কণ্ঠে এক সুর।”
সেই রাতেই রুদ্র-তরুণ এই নতুন প্রযুক্তিকে মিক্স করে তৈরি করে গান:
“আমার কণ্ঠে তোমার ব্যথা,
তোমার স্বপ্ন আমার ব্যঞ্জনা,
এই সুর আর আলাদা নয়,
এ সুর আমাদের সম্মিলিত জয়।”
এই গান ডেটার সঙ্গে লড়ে না, ডেটাকেই নিজের ভেতর শুষে নেয়। স্মার্টফোনে এই গান চালালে ফোন হ্যাং করে না—বরং মানুষের ব্যাক্তিগত অনুভব মিশে যায় গানে।
ফল?
শুনতে শুনতে মানুষ কাঁদে—নিজের কথা শুনে, যা সে কখনো বলেনি।
ডেটা ফোর্সের লিডার নীরদ এই গান শোনে একদিন। তার নিজের ফোন হ্যাক হয় না, বরং সে দেখে—গানে ভেসে আসছে তার মায়ের মুখ, তার ছোটবেলার ছবি, তার নিজের না বলা দুঃখ।
সে চিৎকার করে ওঠে, “এই সুর কীভাবে আমার ভেতরে ঢুকল?”
এক বিজ্ঞানী বলে, “কারণ এই গান কারো বিরুদ্ধে নয়। এটা সত্যের সুর, যা কারো না কারো গলায় ঠিক মিলে যায়।”
এদিকে শহরের মানুষ আবার গান গাইতে শুরু করে। দোকানদার, রিকশাওয়ালা, শিক্ষক, কবি, টুকটুক চালক—সবাই QR কোড ছাড়াই এখন গাইছে সেই গান, যে গান একদিন রুদ্র-তরুণের কণ্ঠে উঠেছিল।
রাস্তায় গ্লাস ভাঙা হয় না, পোস্টার ছিঁড়ে না, স্লোগান ওঠে না—শুধু গানে শহর ধীরে ধীরে আবার মানুষে ভরে ওঠে।
এবার সরকার বেকায়দায় পড়ে। একজন মন্ত্রী চিৎকার করে বলেন, “ওরা আর মানুষ নয়, ওরা আন্দোলন! কণ্ঠহীন বিপ্লব!”
নীরদ মাথা নিচু করে বলে, “আমরা ওদের থামাতে পারি না, কারণ ওরা কেউ একজন নয়—তারা অনেক, এবং তারা শুনছে, না গাইলেও।”
পর্ব ১০: গানতন্ত্রের বিজয়
শহর যেন এক অদৃশ্য সঙ্গীতপ্রবাহে ভাসছে। কেউ জানে না গানটা ঠিক কোথা থেকে আসছে—কারো মোবাইলে? কারো বুকের মধ্যে? না কি বাতাসের মধ্যেই মিশে গেছে সেই সুর? রুদ্র আর তরুণ এখন আর কোনো একক নেতৃত্বে নেই, তারা হয়ে উঠেছে গানের আভাস, এক আশ্চর্য চেতনার অনুবাদ।
নতুন করে নির্বাচন ঘোষিত হয়েছে—এইবার পুরোপুরি ম্যানুয়াল ব্যালটে। ইভিএম বিতর্ক, তথ্য কারচুপির অভিযোগে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে। এটা যেন একটা মরণ কামড়ের আগে প্রকৃত গণতন্ত্রের শেষ নিশ্বাস।
গানতন্ত্র পার্টি এবার কোনো সভা করে না, কোনো পোস্টার ছাপে না। তারা শুধু রাস্তায় হাঁটে, ট্রামের মধ্যে চুপচাপ বসে থাকে, লাইব্রেরিতে বইয়ের পাতার ভাঁজে রেখে আসে একটি সুরের নোটেশন।
তাদের ভোট প্রচার একটাই: “তোমার কণ্ঠতন্ত্র, আমাদের গানতন্ত্র—বেছে নাও নিজের মতো।”
রুদ্র বলে, “আমরা কাউকে বোঝাব না। শুধু বাজিয়ে যাব সেই সুর, যেটা কেউ হয়তো নিজের ভেতরেই হারিয়ে ফেলেছিল।”
ভোটের দিন। মানুষ নিজের হাতে ব্যালট চিহ্নিত করছে। ভাঙাচোরা বুথে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ বলে, “এই ব্যালট দেখলে মনে হয় আমি বেঁচে আছি।”
আর একজন গৃহবধূ বলেন, “আজকের ভোটটা আমি দিচ্ছি আমার মেয়ের গলায় গাওয়া সেই সুরের জন্য।”
তরুণ বুথের বাইরে বসে তবলা বাজায়। রুদ্র একটা পুরোনো রেডিও হাতে গান গায়:
“ভোটটা এবার দাও নিজের মনে,
না কাউকে দেখে, না কিছুর ভয়ে।
যদি সত্যি চাও গলা পেতে বলতে,
তবে এবার গাই—তোমার নিজের সুরে।”
ফল প্রকাশের দিন। কেউ উচ্চাশা করে না। কেউ স্টুডিওতে বসে গণনা দেখে না। সবাই কেবল অনুভব করে বাতাসের গতি।
দুপুরে ঘোষণা আসে—গানতন্ত্র পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে রুদ্র বাউল ও তরুণ ধ্বনি নতুন রাজ্যের মুখ্যস্বর এবং সঙ্গীতসচিব হিসেবে নির্বাচিত।
সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করে, “আপনারা কীভাবে শাসন চালাবেন?”
রুদ্র বলেন, “আমরা শাসন চালাব না। আমরা গান চালাব। প্রত্যেক সরকারি মিটিংয়ের আগে থাকবে দশ মিনিটের নির্দিষ্ট সুর—যাতে আলোচনার টোন ঠিক হয়, অহং কমে।”
তরুণ বলেন, “শিশুদের পাঠ্যবইতে থাকবে ছড়া, কিন্তু ছড়ার মধ্যে থাকবে সত্যের বীজ। আর পুরোনো জাতীয় সংগীত থাকবে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে থাকবে মানুষের নিজের রচিত গানও—কারণ দেশ মানে শুধু মাটি নয়, দেশ মানে মানুষ, আর মানুষ মানেই কণ্ঠ।”
শহরের স্কুলে বাচ্চারা গাইতে শুরু করে:
“আমার ভোট, আমার গান,
আমার মনেই আছে বানান।
ভয় নয়, বিভ্রান্তি নয়,
আমি শুধু শুনেছি আমার সুরের ডাক।”
প্রথম বসন্ত আসে গানতন্ত্রের অধীনে। মাঠে খেলা হয়, বুড়োরা ফের খোলা হাওয়ায় হাঁটে, পুলিশ অফিসাররা আর মোবাইল হ্যাক করে না—তারা এখন ডিউটি শুরু করার আগে বাজায় তানপুরা।
রাত্রিকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শেষবার দেখা দেন। মাথায় চুল নেই, মুখে শান্তি।
তিনি বলেন, “আমি রাষ্ট্রকে নিয়েছিলাম ভয়ে। তোমরা দিয়েছো সুরে। আমি ক্ষমতা পেয়েছিলাম তথ্য দিয়ে, তোমরা পেয়েছো সত্য দিয়ে। এখন থেকে আমি শোনার লোক, বলার নই।”
একদিন বিকেলে রুদ্র-তরুণ পাশাপাশি বসে থাকে হাওয়ার ধারে।
রুদ্র বলে, “আমরা কি ইতিহাস হয়েছি?”
তরুণ বলে, “না রে, আমরা তো গানে রয়েছি। ইতিহাস একবার পড়া হয়, ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু গান? সে তো মনের ভেতর বাজতেই থাকে—চুপচাপ।”
তারা আবার গাইতে শুরু করে। কেউ আর ভিডিও করে না। কেউ আর লাইভ যায় না।
কারণ এখন সেই গানটা প্রতিটি মানুষের গলায়, মনে, আর সেই বহুচর্চিত শব্দে—
“জনগণের কণ্ঠতন্ত্রেই গানতন্ত্রের জয়।”




