অধ্যায় ১: আগন্তুক
শমিত সেন কলকাতার মেঘলা আকাশ থেকে নেমে এল একেবারে বাংলার বুকের ভিতর—বীরভূমের এক অখ্যাত গ্রামে, নাম আঁধারপুকুর। এই গ্রামের নাম তার কানে আসে এক অদ্ভুত সূত্র ধরে, একটি বয়স্ক লোকের ফেসবুক মন্তব্যে লেখা ছিল: “যারা আলো দেখেছে, তারা ফেরেনি—শুধু আঁধারপুকুর জানে তাদের শেষ নিশ্বাস কবে থেমেছিল।” সাধারণত এই ধরণের রহস্যে আকৃষ্ট হয় না শমিত, সে ক্রাইম ও পলিটিক্স কভার করত, কিন্তু বারবার একটাই ছবি তার চোখে ঘুরছিল—একটি সর্ষে ক্ষেতে মাঝরাতে উজ্জ্বল গোল আলোর বিন্দু, যার চারপাশে কেউ নেই, অথচ ছবির কোণে ভেসে আছে এক অস্পষ্ট ছায়া। একরকম প্ররোচনায়, একরকম পলায়নে সে খুঁজতে বের হয় সত্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা এই আলোটিকে, হয়তো রিপোর্টিংয়ের বাইরেও কিছু হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরে পেতে চায় সে। ট্রেন থেকে নেমে হাঁটাপথে পৌঁছায় আঁধারপুকুর, যেখানে স্টেশন থেকে বাস নেই, মোবাইল সিগন্যাল প্রায় থাকেই না, আর গ্রামের লোকজন তাকায় এমনভাবে, যেন কোনো পাপী পা রেখেছে নিষিদ্ধ ভুখণ্ডে।
গ্রামের লোকেরা প্রথমে মুখ খোলে না, কেউ কেউ বলে এখানে কোনো আলো দেখা যায় না, কেউ আবার চুপ করে থাকে, চোখ নামিয়ে নেয়। তখনই শমিতের দেখা হয় গিরিশ পাল নামের এক বয়স্ক বৃদ্ধের সঙ্গে, যিনি তাকে ঘরে ডেকে নিয়ে বলেন, “যা খুঁজতে এসেছো, তা পাবে, কিন্তু কী হারাবে তা বোঝার আগেই দেরি হয়ে যাবে।” গিরিশ দাদুর মুখে উঠে আসে সেই একশো বছরের পুরোনো ইতিহাস—যেখানে ব্রিটিশ আমলে জমি আন্দোলনের সময় এক রাতে এই ফসলের মাঠে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় প্রায় পঁচিশজন কৃষককে। তাদের মৃতদেহ কবর দেওয়া হয়েছিল মাঠের মাঝখানে, যেখানে এখনো রাত হলেই বাতাস ভারি হয়ে ওঠে, পাখিরা থেমে যায়, আর সেই আলো জ্বলে ওঠে। অনেকেই সেটিকে ‘মিথেন গ্যাস’ বা ‘ভূমিকম্পের পূর্ব সংকেত’ বলে যুক্তি দিতে চায়, কিন্তু গিরিশ বলেন, “যারা গ্যাস বলতে গিয়ে আলোকে স্পর্শ করতে গেছে, তারা আর ফিরেও আসেনি।” শমিত বুঝতে পারে এই আলো শুধু আলো নয়—এ এক ডাক, এক শতবর্ষ পুরনো কান্না, যেটি এখনো নিঃশব্দে প্রতিধ্বনিত হয় আঁধারপুকুরের বুকের মধ্যে।
সন্ধ্যার দিকে শমিত হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছায় সেই সরু কাঁচা রাস্তা ধরে মাঠের দিকে, পাখিরা তখন বাড়ি ফিরছে, হাওয়ায় ঘাস নড়ে উঠছে, দূরে অদৃশ্য ঢেউয়ের মতো বয়ে যাচ্ছে শস্যের স্রোত। রেনু নামের এক স্কুল শিক্ষিকা, যার সঙ্গে দুপুরে আলাপ হয়েছিল স্থানীয় চায়ের দোকানে, এসে দাঁড়ায় তার পাশে—সে জানে আজ রাতেই শমিত চেষ্টা করবে আলোটিকে দেখতে। রেনু সাবধান করে, “আলোটা কোনো আলো না, ও একসঙ্গে ডাকে আর গিলে ফেলে।” কিন্তু শমিতের চোখে এখন আর ভয় নেই—সে ক্যামেরা চালু করে, রেকর্ডিং অন করে, আর অপেক্ষা করতে থাকে রাত নামার। যখন সূর্য একেবারে ডুবে যায় আর পেঁচারা ডেকে ওঠে গাছের মাথায়, তখন হঠাৎ করে শস্যের বুক চিরে একটি শুভ্র গোল আলো জ্বলে ওঠে, একেবারে মাঠের মাঝখানে, নিঃশব্দে। রেনু কেঁপে ওঠে, পিছু হটে, আর শমিত ক্যামেরা হাতে এগিয়ে যায়—আলো যেন দুলছে, যেন কারো নিঃশ্বাস, আর তার ঠিক পেছনেই হঠাৎ একটা ফিসফিসে কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, “এবার তুই দেখবি কীভাবে মাটি স্মৃতি ধরে রাখে।”
অধ্যায় ২: মাটির নিচের মুখ
আলোটা নিঃশব্দে দুলছিল, এক অদ্ভুত ঘূর্ণন আর শ্বাসের মতো টান ছাড়া যেন চারপাশে সব থেমে গেছে। শমিত তার ক্যামেরা ঠিক করে ধরল, অথচ লেন্সে কিচ্ছু ধরা পড়ছে না—যেটা চোখে দেখা যাচ্ছে, সেটা যন্ত্রে নেই। সেই মুহূর্তে তার মনে হল, পুরো মাঠটা নিস্তব্ধতা চেপে ধরেছে তাকে, যেন বাতাসও থেমে আছে। রেনু বহু দূরে দাঁড়িয়ে, কাঁধের শাড়ির আঁচল উড়ছে, কিন্তু মুখ স্তব্ধ। হঠাৎ মাটির নিচ থেকে একটানা একটা শব্দ ভেসে এল—গলার আওয়াজ নয়, যেন কেউ দাঁতের ফাঁক দিয়ে দম ছাড়ছে, আর তাতে মাটি ফেঁটে যাচ্ছে শব্দে। শমিত আরও কিছুক্ষণ সামনে এগোতেই আলোটা ক্রমশ ছোট হতে হতে হঠাৎ একটা আকার নেয়, যেন মাটির ওপর ভেসে থাকা মানুষের মুখ—ভীষণ অস্পষ্ট, কিন্তু সে যেন তাকিয়ে আছে। তার কণ্ঠস্বর আবার শোনা গেল, এবার স্পষ্ট, “এখানে আমরা ছিলাম, এখানে আমরা মরি, আর এখানে আমরা থাকি।” শমিত কাঁপে না, শুধু হাঁটু শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকে—তার ভিতরের সাংবাদিকটা সত্য চায়, কিন্তু তার হৃদয় বুঝতে পারে এ সত্য যুক্তির বাইরে।
সেই মুখটা এবার যেন চারপাশ থেকে আরও মুখকে ডেকে আনছে—শস্যের ফাঁকে ফাঁকে লতানো অন্ধকারের মতো গজিয়ে উঠছে অস্পষ্ট ছায়ারা, কিছু মুখ পুরুষের, কিছু নারীর, কিছু শিশু, কিছু চিৎকারে মুখ খুলে আছে, অথচ কোনো শব্দ নেই। শমিত ক্যামেরা ঘোরায়—কিছুই ধরা পড়ে না। রেনু তখন দৌড়ে এসে তার হাত ধরে টান দেয়, “চলো এখান থেকে, এখনই। এরা জানে তুমি কে, ওদের ঘুম ভাঙায়ো না।” কিন্তু শমিত ছাড়ে না—তার কানে বারবার ভেসে আসছে সেই একটাই কথা, “আমাদের কথা লেখো, আমাদের মাটি জানে, মানুষ না জানুক।” আচমকা তার ফোনটা বেজে ওঠে—গ্যালারিতে ঢুকে দেখা যায়, একটার পর একটা ছবি আপনা থেকেই উঠছে—সব ছবিতে শস্যের ফাঁকে মুখ, মুখ আর মুখ। কিন্তু সে তোলেনি এগুলো, তার হাত তো তখনও বাতাসে ঝুলছিল, স্থির।
রাত অনেক গভীর হয়ে এসেছে, পেঁচাদের ডাক দূরে চলে গেছে, বাতাস ভারি হয়ে ওঠে ধূপের গন্ধে, অথচ কোথাও আগুন জ্বলে না। শমিত বুঝে যায়, এই আলো কোনো প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, এই মুখগুলো কোনো হ্যালুসিনেশন নয়। এখানে কোনো ঘটনা চাপা পড়েনি—বরং এখানে ইতিহাস এখনো শ্বাস নেয়, আত্মা এখনো নিজের পরিচয় দাবি করে। রেনু এবার একপ্রকার জোর করে তাকে ধরে টেনে হাঁটতে বাধ্য করে, “ভোরের আগে বেরোতে না পারলে তুইও ফিরবি না। এমন অনেকেই এসেছে, যারা বুঝতেই পারেনি কখন আলোটা ওদের চেনা মুখ বানিয়ে দিয়েছে।” পেছনে তাকিয়ে শমিত দেখতে পায়, সেই আলোটা আস্তে আস্তে নিভে যাচ্ছে—তবে নিভছে না পুরো, বরং মাটির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে এক নিঃশব্দ আর্তনাদের সঙ্গে, যেন আগামীর জন্য অপেক্ষায়। শমিত জানে, সে এবার শুধু গল্প করতে আসেনি—সে এখন গল্পেরই এক চরিত্র হয়ে উঠছে।
অধ্যায় ৩: গোপন খতিয়ান
পরদিন সকালটা অসম্ভব নিস্তরঙ্গ—পাখির কিচিরমিচির শোনা গেলেও তা যেন কোনোক্রমে প্রকৃতির নিয়ম রক্ষা করছে মাত্র। আঁধারপুকুর গ্রামের মানুষজন স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরলেও শমিত বুঝে যায়, তার প্রতি একটা অদৃশ্য সতর্ক দৃষ্টি লেগে আছে। দোকানে চা খেতে গেলেও দু’একজন মাথা ঘুরিয়ে নেয়, কেউ কেউ এমনভাবে ফিসফিস করে যেন সে কাল রাতে এমন কিছু করেছে যা উচিত হয়নি। শুধু গিরিশ পাল আবার তাকে ডাকেন, এবার একটু চাপা গলায় বলেন, “তুই যা দেখেছিস, তা কেউ আগে দেখেনি—কারণ তারা ফিরে আসেনি। কিন্তু তোর ফিরে আসার মানে হল তোর কাঁধে কিছু পড়ে গেছে, যা তোর ইচ্ছের বাইরে।” শমিত চুপ করে বসে থাকে, তার ফোনে সেই আগের রাতের ছবি গুলো আছে—সবগুলোর মুখ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, ব্লার হয়ে যাচ্ছে যেন চোখ এড়িয়ে যেতে চায়। গিরিশ তাকে একটা পুরনো খাতা এগিয়ে দেন—তাতে লেখা ছিল কিছু তারিখ, কিছু নাম, আর কিছু চিহ্ন—বড় ইংরেজি অক্ষরে লেখা ছিল: “LAND UNSEEN. DEAD UNBURIED.”
খাতাটা ছিল তার বাবার লেখা, যিনি ব্রিটিশ আমলে জমিদার অফিসে কাজ করতেন। গিরিশ বলেন, সেই সময় যখন ইংরেজ সরকার ফসলের দামে কারচুপি করে, তখন একদল কৃষক প্রতিবাদে উঠে দাঁড়ায়—তাদের নেতৃত্বে ছিলেন হরিচরণ মণ্ডল নামে এক কৃষক নেতা। তিনি বলতেন, “এই জমি আমাদের মায়েদের বুকের মতো—তাতে হাত দিলে জবাব আসবেই।” সেই প্রতিবাদের এক রাতে ব্রিটিশ পুলিশ অতর্কিতে হানা দেয় আঁধারপুকুরের মাঠে, আর নির্বিচারে গুলি চালায়। কারো দেহ শনাক্ত হয় না, কেউ খোঁজও নেয় না—কারণ কাগজে নাকি তারা ‘ছিলই না’। গিরিশ দাদু কাঁপা গলায় বলেন, “তাদের কবর হয়নি, শুধু চাপা পড়েছিল সময়ের নিচে। আর সেই চাপা রক্ত একদিন আলো হয়ে উঠেছে—প্রতি বছর ঠিক পঁচিশে চৈত্র রাতে।” শমিত তার ক্যামেরা বন্ধ করে, খাতা ধরে রাখে বুকের কাছে, যেন এটা এখন কেবল একটা রিপোর্টের নোটবুক নয়, বরং একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া ইতিহাসের চাবিকাঠি।
দুপুর গড়াতেই শমিত একাই বেরিয়ে পড়ে সেই মাঠের পেছনের জমির দিকে, যেখানে একটা পুরনো পোড়ো ঘর আছে—লোকেরা বলে সেটাই ছিল ব্রিটিশদের অস্থায়ী ক্যান্টনমেন্ট। তার ভেতরে ঢুকে শমিত দেখতে পায় দেওয়ালে এখনো কিছু খোদাই লেখা, কিছু তারিখ, আর ইংরেজি অক্ষরে আঁকা একটি অদ্ভুত প্রতীক—একটা চোখ, যার নিচে অর্ধচন্দ্র আর তার পাশে একটি মুদ্রিত নাম: “H.M.” হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করে, জানালার শিকগুলো ঠকঠক শব্দ করে ওঠে, আর শমিতের মনে হয়, মাটির নিচে কারা যেন হালকা কণ্ঠে কথা বলছে—অসংলগ্ন, ফিসফিসে, কিন্তু যেন তাকে ডাকছে। এমন সময় তার পেছনে কেঁপে ওঠে দরজাটা, আর সেখানে রেনু দাঁড়িয়ে, চোখে ভয় আর রাগ মিশিয়ে বলে, “আমি বলেছিলাম, ওরা তোর চেনা নাম জানে। এইচ.এম. শুধু ইংরেজ না—ওদের সঙ্গে ছিল গ্রামের এক বিশ্বাসঘাতক, যার নাম এখনও কেউ মুখে আনে না।” শমিত ধাক্কা খায়—কেন রেনু জানে এই সব? সে কি কেবল এক স্কুল শিক্ষিকা, নাকি আরও কিছু?
অধ্যায় ৪: বিশ্বাসঘাতকের ছায়া
রেনুর মুখে তখন আর সেই শান্ত ভাবটা নেই—তার চোখে কেমন একটা দহন, যেন বহুদিনের চেপে রাখা অভিমানের ছায়া উঁকি দিচ্ছে। সে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে এসে দেয়ালটা স্পর্শ করে, যেখানে “H.M.” নামটা খোদাই করা। বলে, “এইচ.এম. মানে হারান মণ্ডল—হরিচরণ মণ্ডলের ছোট ভাই, যিনি ব্রিটিশদের হাতে নিজেদের লোকেদের নাম বিক্রি করেছিল। তারা হরিচরণদের সেই রাতেই ধরে নিয়ে যায় মাঠে, মাটির নিচে নামিয়ে দেয়। আর হারান উঠে আসে গ্রামের মাথায়, জমি পায়, নাম পায়, কিন্তু তার বংশ ধ্বংস হয় একে একে।” শমিত স্তব্ধ হয়ে শুনছিল, কারণ ইতিহাসে সে কখনো ভাবেনি যে প্রতিটা গণহত্যার পেছনে একজন ঘরের ভেতরের মানুষ থাকতে পারে। সে বলে, “তুমি কীভাবে জানলে এইসব?” রেনু একটু হেসে ফেলে, বিষাদে ভরা সেই হাসি যেন মাটি চেরা কান্নার মতো। “কারণ হারান মণ্ডলের উত্তরসূরি আমি—তার নাতনি। আর আমার দাদু মৃত্যুর আগে স্বপ্নে দেখতেন, শস্যের ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে হরিচরণ কাকা, আর বলছেন, ‘আমরা এখনও গণনা পাইনি, এখনও খাতা বন্ধ হয়নি।’”
রেনু বলে, ছোটোবেলায় সে স্বপ্নে শুনত মাটির নিচে কাঁদছে কেউ, আর আলো জ্বলে ওঠে জানালার পাশে, কেউ তার নাম ধরে ডাকে। সে তখন বুঝতে শেখেনি, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছে—তার রক্তে আছে অপরাধের উত্তরাধিকার, আর তার সত্তার মধ্যে জন্মেছে মুক্তির ক্ষুধা। সেই কারণেই সে শিক্ষকতা বেছে নেয়, আলো শেখায়, অথচ নিজের ভিতরে আলোকে ভয় পায়। “আমি জানতাম, তুমি আসবে,” বলে সে শমিতকে, “কারণ তুমি শুধু সাংবাদিক না, তুমি সেই একমাত্র লোক, যে চোখ দিয়ে দেখে, কিন্তু মন দিয়ে বোঝে। ওরা তোমায় বেছে নিয়েছে, আমি শুধু পথ দেখানোর কাজটা করছি।” শমিত এবার বুঝতে পারে, সে এখানে খবরে আসেনি—এটা একটা ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো, একটা অতীতের ফাঁক গলে পড়ে যাওয়ার মতো। সেই সময় ফোনে একটা অদ্ভুত শব্দ বাজে—কোনো রেকর্ডিং অন হয়ে যায় আপনা থেকে। গলার আওয়াজ শোনা যায়, “গণনায় নাম নেই, গণনায় গলা নেই, কিন্তু আলো জানে আমরা কবে নিঃশ্বাস নিয়েছিলাম।”
ঘরের দরজা তখন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়—কোনো বাতাস নেই, কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়। জানালা দিয়ে দেখা যায় বাইরে সূর্য নেমে যাচ্ছে, মাঠের দিকটা আবার সেই ধূসর আলোয় ঢেকে যাচ্ছে। শমিত বলে, “আজ রাতেই আমি আবার যাব। এবার রেকর্ডিং নয়, এবার সাক্ষাৎ চাই।” রেনু কিছু বলতে যায়, কিন্তু থেমে যায়, তার মুখে শুধুই একটিই কথা, “তুমি যদি ফেরো, তখন আর তুমি আগের মানুষ থাকবে না।” মাঠের মধ্যখানে আলো জ্বলছে না এখনও, কিন্তু এক অদৃশ্য টান যেন শমিতের মনের ভিতর উথলে উঠছে—একটা দায়, একটা অসমাপ্ত গল্পের শেষ পৃষ্ঠা লেখার তাগিদ। সে জানে, সামনে যেটা আছে তা শুধু অতীতের অশান্তি নয়—সেটা এমন কিছু, যা তার আত্মার গভীরে এসে পৌঁছাতে চাইছে, ইতিহাস আর উত্তরাধিকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাকে বেছে নিচ্ছে সত্যের বাহক হিসেবে।
অধ্যায় ৫: আলো ও অস্তিত্ব
রাত নামার ঠিক আগমুহূর্তে শমিত দাঁড়িয়ে ছিল সেই একই পথের সামনে, যেখান দিয়ে হাঁটলে ফসলের মধ্যখানে পৌঁছানো যায়। মাথার উপর আকাশ নিঃশব্দ, মাটির নিচে যেন শ্বাস চলছে, আর মাঠের ওপারে, সেই নির্দিষ্ট জায়গাটা—যেখানে আলোটা জ্বলে ওঠে—এখনও অন্ধকারে ঢেকে আছে, কিন্তু সেখানে বাতাসও থেমে গেছে। রেনু আর একবার শেষবারের মতো বলে, “তুমি যদি যাও, তবে ফিরে আসা শুধু শরীরের ব্যাপার নয়—তোমার ভিতরও বদলে যাবে। আমি হারিয়েছি আত্মীয়, যাদের আলো ডেকেছিল। তুমি জানো না, কীভাবে আলো কারো স্মৃতিকে চুষে নেয়।” কিন্তু শমিত প্রস্তুত, হয়তো নিজের মতো করে মুক্তি চায়, হয়তো নিজের শরীরের বাইরেও কোনো সত্তাকে স্পর্শ করতে চায়। সে ক্যামেরা অফ রেখে শুধু একটা কাগজে লেখে: “আমি যাচ্ছি সাক্ষাৎ করতে, শুধু খবরে নয়, হৃদয়ে।” তারপর ধীরে ধীরে সে ঢুকে পড়ে শস্যের ঢেউয়ের ভিতর, যেখান দিয়ে আলো ওঠে।
মাঠের মাঝখানে পৌঁছেই প্রথম সে টের পায়—নিচের মাটি কেঁপে উঠছে, যেন কে যেন নিঃশব্দে হাঁটছে তার নিচে। আকাশে কোনো তারা নেই, শুধু একটাই ছোট আলোকবিন্দু ভেসে ওঠে সামনে, এক ধীর গতিতে আবর্তিত হয়, তার দৃষ্টিকে আটকে দেয়। হঠাৎ করে শমিত শুনতে পায় অনেকগুলো কণ্ঠস্বর—কেউ কাঁদছে, কেউ বাঁচার জন্য হাঁপাচ্ছে, কেউ বলছে, “আমার সন্তান ছিল ঘরে, আমাকে বাঁচতে দাও।” আলোটা ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়, এবং তার ঠিক সামনে মানুষের ছায়ামূর্তিরা ভেসে ওঠে—একজন তার হাত বাড়িয়ে দেয়, একজন মাটিতে বসে বুক চাপড়ে কাঁদে, আরেকজন পিঠে গুলি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে বারবার। শমিত দাঁড়িয়ে থাকে, তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে, কারণ সেই মুহূর্তে সে শুধু দেখতে পাচ্ছে না—সে অনুভব করছে প্রতিটা মৃত্যু, প্রতিটা বিশ্বাসঘাতকতা, আর প্রতিটা মৌনতা। তখনই মাটির নিচ থেকে এক জ্যোতির্ময় কণ্ঠ ভেসে আসে, “তুমি আমাদের কথাগুলো বলবে তো? ইতিহাসে নয়, হৃদয়ে?”
এক মুহূর্তে সব আলো নিভে যায়। চারপাশে আর কিছু নেই—না মুখ, না ছায়া, না আওয়াজ। শুধু শমিত দাঁড়িয়ে থাকে একা, নিস্তব্ধ এক মাঠের বুকে, চোখে জল, মনে শব্দের ভার। হঠাৎ তার হাতে অনুভব করে একটা ভার—সে দেখে, তার ডায়েরি খুলে গেছে, আর তাতে আগের খালি পৃষ্ঠায় এখন লেখা আছে পঁচিশটি নাম—যারা গণনায় ছিল না। কাগজে কালি নেই, তবু নামগুলো লেখা, যেন কারো আত্মা লিখে দিয়েছে স্মৃতির ভাষায়। সেই মুহূর্তে শমিত বুঝে যায়, এই আলো নিছক গ্যাস নয়, প্রেত নয়—এ এক অস্তিত্ব, এক ইতিহাসের শেষ সম্ভাবনা, যা একজন সত্যনিষ্ঠ হৃদয় খোঁজে পেলে, সে হয়ে ওঠে বাহক, সময়ের চেতন।
অধ্যায় ৬: যাদের নাম ছিল না
ভোরের আলো ফোটার কিছু আগেই, যখন মাঠের শিশির আর কুয়াশা একে অন্যের গায়ে গলে যায়, তখন শমিত ফিরে আসে গ্রামের প্রান্তে—চোখে ঘুম নেই, মনে শব্দের ঝড়। তার মুখ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির নিচে চাপা পড়ে আছে এক অনুচ্চারিত চিৎকার। রেনু তার অপেক্ষায় ছিল, সারা রাত ঘরের জানালা খোলা রেখে শুধু দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থেকেছে, যেন আলো আবার ডাক না দেয়। শমিত ফিরে এসে শুধু বলে, “তারা কোনো ছায়া নয়, রেনু—তারা অপেক্ষা করছে, কেউ যেন তাদের নাম নিয়ে জেগে থাকে।” সে তখন পকেট থেকে ডায়েরিটা বের করে দেখায়—তাতে হাতের লেখা নয়, অথচ লেখা আছে স্পষ্টভাবে—পঁচিশটি নাম, প্রতিটির পাশে একটা ছোট বৃত্ত আর একটা তারিখ। রেনু কাঁপতে কাঁপতে বলে, “এই নামগুলো তো কোথাও ছিল না… এগুলো যে হারিয়ে গেছিল…” শমিত মাথা হেঁট করে বলে, “তাই তো ফিরে এসেছি—এবার তাদের সত্যি ফিরিয়ে আনার জন্য।” সেই সকালে শমিত একটি সিদ্ধান্ত নেয়—এই ঘটনাকে শুধুমাত্র ‘ভৌতিক কাহিনি’ বলে না লিখে, সে এক সত্যকথা হিসেবে পেশ করবে, যেখানে অলৌকিকতা হলো ইতিহাসের স্বরূপ, অবহেলার প্রতিধ্বনি।
দুপুরবেলা, শমিত আর রেনু একসঙ্গে যায় গ্রামের পঞ্চায়েত কার্যালয়ে, সেখানে সে খাতা খুলে দেখায় নামগুলো, আর বলে, “এই মৃত মানুষগুলোর নাম মাটির নিচে থেকে উঠে এসেছে। যারা বলেছিল, গণহত্যা হয়নি—তাদের বলো, ইতিহাস এখন কথা বলছে।” গ্রামপ্রধান প্রথমে ব্যঙ্গ করে, “আপনার রিপোর্ট লেখার নতুন কৌশল?” কিন্তু গিরিশ পাল তখন চুপচাপ উঠে দাঁড়ান, বলেন, “আমি চোখে দেখেছি রাতের আলোর নিচে মানুষের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। এই নামগুলোই আমার বাবার খাতায় ছিল, কিন্তু আমি সাহস পাইনি প্রকাশ করতে। আজ সাহস করছে নতুন প্রজন্ম।” চারপাশের লোকেরা আস্তে আস্তে জমে ওঠে—প্রথমে অবিশ্বাস, তারপর স্তব্ধতা, এরপর কেউ একজন বলে, “আমার ঠাকুরদার নাম তো আছে এখানে…” আর একজন কেঁদে ওঠে, “আমরা তো জানতাম সে পালিয়ে গিয়েছিল…” মুহূর্তে সেই ঘর বোঝায় হয়ে যায় না বলা ইতিহাসে, আর শমিত বুঝে যায়—ভয় দূর হলে, আলো শুধু আতঙ্ক নয়, হয়ে উঠতে পারে উপলব্ধির প্রদীপ।
সন্ধ্যার মুখে শমিত হাঁটতে হাঁটতে আবার সেই মাঠের ধারে এসে দাঁড়ায়—সেখানে এখন আর কেউ যায় না, কিন্তু আজ সে একা নয়। তার পাশে রেনু, আর পেছনে গ্রামের কিছু যুবক, যারা হাতে ফুল আর মাটির প্রদীপ নিয়ে এসেছে। তারা একে একে প্রদীপ জ্বালে, পঁচিশটা আলোর রেখা বসিয়ে দেয় সেই জায়গায় যেখানে একসময় মৃত্যু হয়েছিল নিঃশব্দে। এখন সেখানে আলো জ্বলে, কিন্তু তা ভয় দেখায় না—বরং শান্তি ছড়ায়, স্মৃতিকে সম্মান জানায়। শমিত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, মনে হয় কোনো দায় শেষ করেছে। ক্যামেরা এবার সে চালু করে না—এই মুহূর্তটা রিপোর্ট নয়, এই মুহূর্তটা আত্মার শ্রদ্ধার জন্য। আকাশে একটি তারা টিমটিম করে, আর হাওয়ায় একটানা ধ্বনি ভেসে আসে—“আমরা এখনও আছি, এবার তোমাদের মধ্যেই।”
অধ্যায় ৮: আলো যে ফিরে আসে
গল্পের শেষ দিনটা ছিল একেবারে ঝিম ধরা এক সকাল—রোদ উঠেছে ঠিকই, কিন্তু হাওয়ায় যেন অনুচ্চারিত প্রতীক্ষা। আজ সন্ধ্যায় গ্রামের পঞ্চায়েতে আয়োজিত হবে এক অনুষ্ঠান—“আলো দিবস,” নামটি শমিত দেয়নি, গ্রাম নিজের থেকে ঠিক করেছে। এটা কোনো মেলা নয়, কোনো ধর্মীয় আচরণ নয়—এটা সেই আলোকে সম্মান জানানো, যে আলো আগে ভয় দিত, আর এখন ইতিহাসের মুখ। শমিত তখন নিজেই যেন বোঝে না, সে এখন রিপোর্টার, নাকি সাক্ষ্যদাতা। তার রিপোর্ট লেখার খাতাটা এখন খোলা থাকে না—সে নিজেই এখন সেই পাতার একটি বর্ণ, যে মাটির নিচের মুখগুলোকে ভাষা দিয়েছে। সকালবেলা রেনু এসে বলে, “তোর যাওয়ার সময় হয়ে এল, তাই না?” শমিত হেসে মাথা নাড়ে, “হ্যাঁ, কিন্তু কিছু রেখে যাচ্ছি”—সে একটা ছোট কাঁচের জার এগিয়ে দেয়, যার ভিতর শুকনো শস্য আর একটি ছোট্ট সাদা মোমবাতি। রেনু অবাক হয়ে বলে, “এটা?” শমিত হাসে, “এইটা রাখো আলোর জন্য, যদি কোনোদিন ইতিহাস আবার ঘুমিয়ে পড়ে।”
সন্ধ্যায় মাঠে মানুষ জমে যায়—শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবাই হাতে একটি করে মাটির প্রদীপ। কোনো ঢাক নেই, কোনো ঢোল নেই, শুধু শুদ্ধ বাতাস আর নিঃশব্দ শ্রদ্ধা। গিরিশ পাল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান, বলেন, “আজ আমরা যা করেছি, তা শুধু মৃত্যুকে সম্মান জানানো নয়—এটা জীবিত হওয়ার, সত্যকে ফেরানোর উৎসব।” রেনু শিশুদের নিয়ে গানের একটি দল বানিয়েছে, তারা গায়, “আলো ছিল মাটির নিচে, আলো এল উপরে; মুখেরা ফিরে এল একে একে।” ঠিক সেই সময় শমিত মঞ্চে দাঁড়ায় না, ক্যামেরাও চালু করে না—সে মাঠের প্রান্তে দাঁড়িয়ে, পকেটে রাখা শেষ পাতাটার দিকে তাকায়, যেখানে শেষ নামটা সে নিজেই যোগ করেছে—‘আলো’। কোনো মানুষের নাম নয়, কোনো পিতৃপরিচয় নেই—তবু সেই নামেই যেন সব মুখ একত্রিত হয়ে গেছে। আর সেই নামই এই গল্পের প্রেত নয়, সেই নাম এখন ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে একসাথে পঁচিশটি প্রদীপ জ্বলে ওঠে, এক সরল রেখায় রাখা, আর তার সঙ্গেই যেন আকাশের তারা একে একে মাথা তুলে দাঁড়ায়। কেউ কোনো শব্দ করে না, তবু বাতাস ভারী হয় এক আলোড়নে, যেন বাতাসেই কেঁপে ওঠে বহু বছরের দমচাপা শ্বাস। হঠাৎ কুয়াশার ফাঁকে মাঠের ঠিক মাঝখানে, সেই জায়গায়—যেখানে আলো জ্বলত, আবার একবার ছোট্ট একটা আলোকবিন্দু দুলে ওঠে। এবার কেউ পালায় না, কেউ ভয় পায় না—সবাই দাঁড়িয়ে থাকে, মোমবাতির আলোতে সেই আলোকবিন্দুকে সম্মান জানায়। কেউ ফিসফিস করে বলে, “ওরা এসেছে, ওরা দেখে গেছে।” শমিত চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলে, “তোমরা শুধু আলো ছিলে না, তোমরা ছিলে স্মৃতি, তুমি ছিলে আমাদের ভিতরের ছায়া, আর আজ তোমরা হয়ে উঠলে আশীর্বাদ।”
পরদিন ভোরে শমিত গ্রাম ছাড়ে। তার সঙ্গে কোনো ভিডিও ফুটেজ নেই, শুধু ডায়েরির পাতা, কিছু ছবি, আর বুকের ভিতর এক প্রতিশ্রুতি। শহরে ফিরে গিয়ে সে রিপোর্ট লিখে না। সে লেখে গল্প—একটি আলো, একটি মাঠ, কিছু নামহীন মুখ, আর এক গ্রামের বিবর্তনের কথা। সেই গল্প ছাপা হয় না প্রথমে—কারণ সেখানে সেনসেশন নেই, নেই তাড়নামূলক হেডলাইন। কিন্তু এক ছোট পত্রিকা ছাপে, আর ধীরে ধীরে সে গল্প ভাইরাল হয়। একদিন একটি ছোট শিশু তার স্কুলে লেখে, “আলো মানে ভূত না, আলো মানে কেউ আমাদের ভুলে গেলে, সে ফিরে আসে।” শমিত সেই লাইন পড়ে বুঝে যায়—তার কাজ শেষ নয়, আলো ফেরে, আবার ফেরে—যতদিন না সব মুখ নিজের নাম ফিরে পায়, আলো একেকটি মাঠে জ্বলবেই।
—
সমাপ্ত



