Bangla

লাল ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে

Spread the love

তিয়াষ মৈত্র


কলকাতার শ্রাবণ মাস। আকাশে তখনো রোদ-ছায়ার খেলা। মেঘ জমে আবার হঠাৎ একফোঁটা করে নামে বৃষ্টি, যেন মন চাইলে কাঁদে আকাশ। শহর ধুয়ে যায় সেই বৃষ্টির ছোঁয়ায়, আর আমার মতো কিছু মানুষ ভিজে ভিজে খুঁজে ফেরে হারানো কোনো গল্পের পাতা।

আমি সৌরভ, বয়স তিরিশ পেরিয়ে একত্রিশে পা রেখেছি কিছুদিন হলো। একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করি, বাড়ি ঢাকুরিয়া। সকালে অফিসে যাওয়ার পথে প্রায়শই বাগবাজার ঘাট দিয়ে যাই—বিশেষ করে বর্ষাকালে, যখন গঙ্গা এক অদ্ভুত নীলচে-সবুজ রঙে বয়ে চলে, আর তার বুকের উপর কুয়াশা খেলে যায়। এই নদীর কাছে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় কিছুক্ষণ থেমে থাকে।

এই গল্পটা শুরু হয় এক বৃষ্টিভেজা সোমবারে। সেদিনও সকালে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়েছিলাম। বৃষ্টির জন্যই হয়তো। বাগবাজার ঘাটে নেমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার একটা অভ্যেস আমার আছে। গঙ্গার জলে চোখ রাখলে মনটা একটু শান্ত হয়। আর তখনই প্রথম তাকিয়েছিলাম ওর দিকে—লাল ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে এক মেয়ে।

মেয়েটার মুখটা প্রথমদিন স্পষ্ট দেখা যায়নি। ছাতার ছায়ায় মুখ ঢাকা ছিল, তবুও মনে হয়েছিল চোখের দৃষ্টি যেন গভীর। সে দাঁড়িয়ে ছিল ঘাটের তৃতীয় সিঁড়ির ধারে। গঙ্গার দিকে তাকিয়ে—একদৃষ্টে। আমি তখন ভেবেছিলাম, হয়তো কারো জন্য অপেক্ষা করছে। কিংবা হয়তো শুধু প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে এসেছে। দু’একবার তাকিয়ে আবার চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু সারাদিন মেয়েটার ভাবনাটা মাথায় ঘুরতে থাকল।

পরের দিন আবার এলাম ঘাটে। ভেতরে কোথাও যেন একটা কৌতূহল—ও কি আজও আসবে? আর হ্যাঁ, এল। আবারও ঠিক সেই সিঁড়িতে, লাল ছাতার নিচে, নিরব দাঁড়িয়ে। মেয়েটার পরনে ছিল হালকা হলুদ রঙের কুর্তি, গলায় সাদা স্কার্ফ, চোখে ভারি কাজল। আজ তার মুখটা একটু ভালোভাবে দেখা গেল—অদ্ভুত মায়া আছে মুখে। চোখে এক ধরনের বেদনা লুকিয়ে আছে, যেন অনেক কিছু হারিয়েছে সে।

আমার কৌতূহল বাড়তে থাকল। এরপর দিন গড়িয়ে গেল। প্রতি সকালে আমি অফিসে যাওয়ার আগে ঘাটে যেতাম, আর দেখতাম মেয়েটা ঠিক সময়ে এসে দাঁড়ায়, গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকে, আর তারপর চলে যায়। একদিন সাহস করে মেয়েটার একেবারে কিছুটা পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভিজতে ভিজতে অপেক্ষা করছিলাম, কিছু বলার সুযোগের আশায়।

হঠাৎ মেয়েটা বলে উঠল, “ভিজছেন কেন? ছাতা নেই?”

আমি চমকে উঠলাম। এমনভাবে বলল যেন আমাকে চিনে। অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, “আপনার ছাতা তো লাল, ওটার নিচে দাঁড়াতে ইচ্ছে করল।”

মেয়েটা হেসে বলল, “আপনার নামটা তো জানা হল না।”

“সৌরভ। আর আপনি?”

“মেঘলা।”

মেঘলা। নামটা শোনার পর মনে হলো, সত্যিই যেন সে বর্ষারই অংশ। এই শ্রাবণের মতোই রহস্যময়, স্নিগ্ধ।

পরদিন থেকে আমাদের কথা বাড়তে লাগল। প্রথমে কয়েকটি ভদ্রতাসূচক বাক্য, পরে সময়ের সঙ্গে একটু একটু করে তার জীবনের গল্প খুলে গেল।

মেঘলা বলল, “এই ঘাটটা আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে। পাঁচ বছর আগে ঠিক এই জায়গায় একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। একেবারে অচেনা, হঠাৎ করে পরিচয়, তারপর কয়েকদিন একসঙ্গে কাটানো। আর তারপর… একদিন সে আর এল না।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি ওকে খুঁজেছিলেন?”

“খুঁজেছিলাম। বহুবার। কিন্তু কোনো খোঁজ পাইনি। ও বলেছিল, যদি কোনোদিন আবার ঠিক এই জায়গায় দেখা হয়—তাহলেই বুঝব, আমাদের সম্পর্কটা প্রকৃত। তারপর আমি প্রতিদিন আসি, এক ঘণ্টা। নয়টা থেকে দশটা। ভাবি, যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়…”

আমি চুপ করে গেলাম। কথাগুলো শুনে গলা শুকিয়ে এল। এই মেয়েটা কি সত্যিই পাঁচ বছর ধরে প্রতিদিন আসে? এতটা বিশ্বাস, এতটা অপেক্ষা—এ তো শুধুই সিনেমায় হয়। কিন্তু এখন সে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে, সত্যিকার অর্থেই।

আমি প্রতিদিন অপেক্ষা করতাম মেঘলার সঙ্গে দেখা হওয়ার জন্য। আমার অফিস শুরু হতো সাড়ে দশটায়, তার আগে আমরা এক ঘণ্টা একসঙ্গে থাকতাম। মাঝে মাঝে ও চা নিয়ে আসত—টেরাকোটার কাপের গরম চা, আর ভেজা বৃষ্টিতে ধোঁয়া ওঠা গন্ধ। আমরা গল্প করতাম—জীবনের, মেঘের, নদীর, স্মৃতির।

একদিন মেঘলা বলল, “তুমি তো রোজই আসো, যদি… সে ফিরে আসে?”

আমি তাকালাম তার চোখে। বললাম, “না, আমি তো আসি… তোমার জন্য।”

এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর মেঘলার চোখে জল এলো। কিন্তু সে কিছু বলল না।

হঠাৎ একদিন মেঘলা আর এল না। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো অসুস্থ, কিংবা কোনো জরুরি কাজে আটকে গেছে। কিন্তু পরদিনও এল না। তারও পরদিন না। আমি খোঁজ নিতে শুরু করলাম। কাছাকাছি দোকানদারদের জিজ্ঞেস করলাম, কেউ কি চেনে ওকে? একজন মাঝি বলল, “হ্যাঁ, মেয়েটা তো বছরের পর বছর আসে, লাল ছাতা নিয়ে। চুপচাপ থাকে। আগে একজন ছেলেও আসত মাঝেমধ্যে, পাঁচ-ছয় বছর আগে, তারপর বন্ধ হয়ে যায়।”

আমি শহরের নানা জায়গায় খোঁজ করলাম—কিন্তু কিছুই পেলাম না। তৃতীয় দিন, যখন ঘাটে গেলাম, দেখি সেই জায়গায় একটা লাল ছাতা পড়ে আছে। ভেজা পাথরে যেন তার ছায়া লেগে আছে। মনে হলো, মেঘলা যেন নিজেই মিশে গেছে এই শহরের বৃষ্টিতে।

তিনদিন পরে এক চিঠি এল আমার অফিসে। মোড়কে ছিল কোনো ঠিকানা নেই, শুধু লেখা—“সৌরভের জন্য”। খুলে দেখি, মেঘলার হাতের লেখা:

“সৌরভ,

আমি জানি, তুমি ঘাটে যাবে। কিন্তু আমাকে আর পাবে না। আমি চলে যাচ্ছি। অনেকদিন তোমার পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি, নিজের অপেক্ষাকে ভুলে যেতে চেয়েছি। তুমি যা করেছ, তার জন্য কৃতজ্ঞ আমি। কিন্তু আমি জানি, আমার মনে এখনো কেউ রয়ে গেছে—সে না এলে আমি কখনো মুক্ত হব না। তাই চলে যাচ্ছি। যদি কোনোদিন ফিরি—তাহলে লাল ছাতার নিচে তোমায় খুঁজব।

— মেঘলা।”

চোখের কোনা ভিজে উঠেছিল। বুঝলাম, কেউ যদি চিরকাল কারো জন্য অপেক্ষা করতে পারে, তবে তার চেয়ে বড় ভালোবাসা আর হয় না।

এখন আমি প্রতি সকাল নয়টায় যাই বাগবাজার ঘাটে। গঙ্গার স্রোতের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, হাতে লাল ছাতা। কারণ আমি জানি, যদি কোনোদিন মেঘলা ফিরে আসে, তবে ও বুঝবে—আমি ওর জন্য অপেক্ষা করেছি। ঠিক যেমন করে ও করেছিল… লাল ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে।

 

1000022452.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *