Bangla - ভ্রমণ

সুন্দরবনের নীলরেখা

Spread the love

সোমশুভ্র লাহিড়ী


পর্ব ১: জলের নীল স্পর্শ

ট্রেনটা যখন ক্যানিং স্টেশনে থামে, তখন সকাল বেলা ঠিক ভালোভাবে জেগে উঠেছে। প্ল্যাটফর্মে ভীড় নেই, কেবল কিছু লোকাল চা-ওয়ালা, এক-দুজন মাছের কাঁধে ঝোলা নিয়ে নেমে পড়েছে। আমার ব্যাগ হালকা—তিন দিনের নৌকা-বিহারের জন্য যা লাগে, তাই সঙ্গে এনেছি। এই সফরটা একরকম পালানোর মতো। শহরের কোলাহল, ক্লান্তি আর নিয়ত বদলাতে থাকা সময়ের চাকা থেকে বেরিয়ে এসে কিছু নিঃশব্দের খোঁজে বেরিয়েছি।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা ছোটো গাড়ি আমাকে নিয়ে যায় গোসাবার দিকে। রাস্তা পেরিয়ে যখন শেষ গ্রামটার ধারে পৌঁছলাম, তখন চারপাশে কেবল জল আর গাছের ছায়া। ছোট্ট একটা খেয়া নৌকা আমাকে পৌঁছে দিল জেটিতে, যেখানে আমার অপেক্ষায় ছিল একটা কাঠের ইঞ্জিনচালিত নৌকা—চওড়া পেট, বাঁশের ছাউনি, আর পেছনে একটা পুরনো ইঞ্জিন যেটা মাঝে মাঝে থেমে গিয়ে আবার নিজের ইচ্ছায় চলতে শুরু করে।

নৌকার নাম ‘সন্ধ্যা বরণ’। মাঝি বিনোদদা, বছর পঞ্চান্ন, কিন্তু চেহারায় দুরন্তরকম ফুরফুরে প্রাণ। গায়ে ফতুয়া, হাতে মোটা দড়ির গাঁট, আর চোখে একরাশ নদীর ইতিহাস।

“আপনার জন্য রাঁধুনি আর সহকারী আছে। এই নৌকা আপনার জন্য একেবারে আলাদা করা হয়েছে,” বিনোদদা বললেন।

আমি মাথা নাড়লাম। কোনো জবাবের দরকার পড়ল না।

নৌকা নদীতে ভাসতে শুরু করল—গভীর একটা শব্দ তুলে জল কেটে সামনে এগোতে লাগল। প্রথম ধাক্কায় মনে হল এই কোলাহলহীনতায় নিজের দেহটাই যেন হালকা হয়ে যাচ্ছে। কানে আসে শুধু জলের ঘর্ষণ, নৌকার কাঠের কাঁপুনি, আর দূরে দূরে কোথাও শিঙাড়া বিক্রেতার ভাঙা রেডিওর সুর—যেটা শহরের বাইরে এসেও যেন এক শেষ চিহ্ন টেনে দিতে চায়।

আমি ছাউনির নিচে বসে জলের দিকে তাকিয়ে থাকি। সুন্দরবনের জল কেবল নদী নয়—এ এক চলমান আয়না, যেখানে আকাশের রঙ প্রতিফলিত হয়। আকাশ নীল থাকলে জলও নীল, মেঘলা হলে সে ধূসর হয়ে যায়। এই জল কখনো শান্ত, কখনো হঠাৎ জেগে ওঠা ঢেউয়ে চঞ্চল। তবু তার মধ্যে একটা ধৈর্য আছে, যা কোনো শহুরে জীবন জানে না।

নৌকা যখন ধীরে ধীরে সনখালি খালের ভেতর ঢোকে, তখন চারপাশের দৃশ্য বদলে যেতে থাকে। গাছের ডালপালা জলের ওপরে ছায়া ফেলে। কোথাও কোথাও কাঁকড়া দল বেঁধে হেঁটে যাচ্ছে, জলকাদায় তারা যেন আঁকছে এক অদ্ভুত নকশা।

আমি মনে মনে ভাবি—এই যে কাঁকড়ার নকশা, গাছের ছায়া, জলের ঢেউ, সব কিছু মিলিয়ে জীবনের একটা দ্বিতীয় ভাষা তৈরি হয়। যা শব্দ ছাড়াই বলে ফেলে গল্প।

রাঁধুনি বাপন একটা মাটির কাপে চা নিয়ে আসে। সে খুব কথা বলে না, কিন্তু কাপে একটা পাতলা আদা-গোলমরিচের সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে জানিয়ে দেয়, নৌকার জীবনে প্রতিটি ছোট মুহূর্তই স্পর্শে তৈরি।

বিনোদদা এসে বসেন পাশে।

“আপনি শহরের লোক, দেখেই বুঝি। কিন্তু নদী একবার যার শরীরে ঢোকে, সে আর শহরে থাকতে পারে না,” তিনি বলেন।

আমি হেসে বলি, “এই নদী কি আপনাকে পাল্টে দিয়েছে?”

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, “নদী বদলে দেয় না বাবু, সে শুধু আসল মানুষটাকে বার করে আনে।”

আমি জানি, প্রথম দিনের এই আলো, জল আর নির্জনতা হয়তো বাঘ দেখাবে না। কিন্তু যে নীল রেখা আকাশে আছে, সেটা আজ জলে নেমে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। শহরের থেকে পালিয়ে এসে যেন নিজের মধ্যেই ঢুকে পড়ছি—জলের ভেতর, নৌকার মৃদু দুলুনিতে, আর প্রকৃতির এক অদ্ভুত আহ্বানে।

এখনও সামনে অনেক পথ, অনেক বাঁক।
এই তো শুরু।

পর্ব ২: নৌকার মৃদু ছন্দ

সন্ধ্যা বরণ ধীরে ধীরে নদীর বুক কেটে এগোচ্ছে। নৌকার দুলুনি একেবারে হালকা, যেন এক শিশু দোলনায় দুলছে, আর তার চারপাশে গাছের পাতারা হালকা বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে গান গাইছে। গলার স্বরে নয়—এই গান হল কাঁকড়ার খোঁড়ার আওয়াজ, ঢেউয়ের গায়ে বকের পায়ের ছাপ, আর নৌকার কাঠে কাঠে নদীর নরম আঘাত।

চা খেয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। সামনে ডেকে দাঁড়িয়ে আছে বাপন, পিঠে একটি মোটা তোয়ালে ঝোলানো, গালভর্তি হালকা দাড়ি। সে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নোড করল, কিছু বলল না। এই না-বলা ভাবটাই যেন এখানে স্বাভাবিক।

আমি চারপাশে তাকাই—নদী এখান থেকে আর সোজা চলে না। বাঁকে বাঁকে মোচড় খেতে খেতে তার শরীর ঘুরে যায়। একেকটা বাঁকে নদীর চরিত্র বদলে যায়—কখনো খরস্রোতা, কখনো শান্ত, কখনো ধূসর, আবার কখনো একেবারে হালকা নীল। প্রতিটি বাঁক যেন কোনো না কোনো গল্প বলে। কোনো নদীর ডালে দেখা গেল একটা ছোটো বাওয়ালি নৌকা দাঁড়িয়ে, দু’জন লোক হাঁটু পানিতে নেমে গাছের গোড়ায় কাঁকড়া খুঁজছে।

“ওরা কাঁকড়া ধরে। বিকেলবেলা হলে ফেরে, আর সেই সময় নদীর স্রোত তীব্র হয়ে ওঠে,” বিনোদদা বললেন, হাল ধরে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ওদের কাজ কি বিপজ্জনক?”

তিনি হেসে বললেন, “বাঘের চেয়ে বড় ভয় জলের নিচে লুকিয়ে থাকা স্রোত। কিন্তু তাও মানুষ যায়, কারণ ঘরে চাল চাই।”

নৌকার পেছনে একটা পুরনো বেতের চেয়ারে বসে আমি খাতাটা খুললাম। কিছু একটা লিখতে চেয়েছিলাম এই সফরের সময়, কিন্তু শব্দ আসে না। শহরে থাকলে শব্দদের এত জোর থাকে, কিন্তু এখানে তারা যেন লজ্জায় হারিয়ে যায়।

তবু, খাতার পাতায় কয়েকটা শব্দ ফুটে উঠল—

“জল নড়ে উঠল হালকা,
যেন কেউ ডেকে বলল—
‘এইখানেই থাকো কিছুক্ষণ।’”

বাপন দুপুরে সরল এক থালা খাবার নিয়ে এল—চালভাত, ডাল আর কুচো চিংড়ি ভাজা। গন্ধে মনে হল রান্নাটা যেন ধূপের মতো ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। খাবার খাওয়ার সময় কোনো শব্দ হয় না। নদী দেখে খাওয়া হয়, খাওয়ার মধ্যে দিয়েই নদীর জীবন ছুঁয়ে যাওয়া যায়।

দুপুরটা এল ঝিম ধরা আলো নিয়ে। চারপাশে নীরবতা। পাখিরাও যেন তন্দ্রায়। শুধু মাঝেমধ্যে দূরে জল ছিটকে ওঠে, হয়তো কোনো মাছ লাফ দিয়েছে। সেই জলের শব্দ নদীর মুখে একফোঁটা হাসির মত।

আমি চোখ বুজি। মনে হয়, সময় নেই—শুধু ছন্দ।
নৌকার, বাতাসের, জলের, আর নিঃশব্দ প্রাণের ছন্দ।

এই ছন্দে ভেসে চলেছে আমার ভেতরের ক্লান্তি, ধীরে ধীরে, এক অদ্ভুত সান্ত্বনার দিকে।

পর্ব ৩: সুবর্ণ জলরাশির ছায়া

বিকেলটা যখন নেমে আসে, তখন নদীর জল একেবারে সোনালি রঙ ধারণ করে। আকাশের রঙে মিশে সেই জলরাশির ওপর পড়ে যায় একপ্রকার ঝিলমিলে ধাঁধা—যা কেবল চোখে দেখা যায় না, হৃদয়ের ভেতরেও নেমে আসে।

সন্ধ্যা বরণ তখন এক বাঁকে এসে দাঁড়ায়। সামনে একটা চওড়া জলভাগ, দুই পাশে গরান গাছের গভীর জঙ্গল। পাতাগুলো যেন নরম আলোয় ধুয়ে নিয়েছে নিজেকে। জলের গায়ে ছায়া পড়ে যেন একেবারে ত্রিমাত্রিক ছবির মতো—আকাশ, গাছ, জল, আর মাঝে মাঝখানে কিছু দাগ—সেই দাগগুলো বকের পা, কাঁকড়ার চিহ্ন, বা একটা হঠাৎ ফেলে দেওয়া জাল।

আমি ডেকে দাঁড়িয়ে থাকি। চোখের সামনে এতটা নিঃস্তব্ধতা আগে কখনও দেখিনি। এই সৌন্দর্যে ভয়ও আছে—কারণ এখানে কিছুই বলা নেই, সবই শুধু উপস্থিত।

হঠাৎ একদল হাঁস ডানায় ঝাপটা দিয়ে উড়ে যায়। তাদের ডানার আওয়াজ বাতাস কেটে এসে আমার বুক ছুঁয়ে যায়। তাদের পেছনে পড়ে থাকে একটু জল, আর সেই জলে আরও গভীর করে পড়ে থাকে সুবর্ণ ছায়া।

বিনোদদা পাশে এসে দাঁড়ান।
“আপনি কি কখনও নদীর মুখ দেখেছেন?”

আমি বলি, “মানে?”

“নদীরও মুখ আছে। সে দেখে, বোঝে, রেগে যায়, হাসেও। এই যে এখন দাঁড়িয়ে আছেন, নদী আপনাকে দেখছে।”

তার কথায় আমি চমকে উঠি না, বরং এক ধরনের আস্থা জন্ম নেয়—হয়তো সত্যিই নদী দেখে। না হলে এমন করে ছায়া ফেলে কেন? এমন নিখুঁত রঙের খেলা তো শুধু প্রকৃতি নয়, কিছু চেতনার কাজ।

আমাদের নৌকা আবার এগোতে শুরু করে। সূর্য একটু একটু করে নামছে, আর সঙ্গে সঙ্গে আকাশের রঙ বদলাচ্ছে কমলা থেকে তামাটে লাল, তারপর একটু ধূসর। আর সেইসব রঙ ছায়ার মতো জলরাশির ওপর ঝরে পড়ছে।

বাপন তখন চুপচাপ নৌকার পেছনে পিঁড়িতে বসে সুতলি ছিঁড়ছে। তার কাজও যেন এই সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—ধীর, পরিমিত, প্রায় নিঃশব্দ।

“এই সময়টা আমার সবচেয়ে প্রিয়,” বাপন হঠাৎ বলল।
“কেন?” আমি জানতে চাই।
“জলের মধ্যে তখন কিছু থাকে না, শুধু ছায়া থাকে। যেমন মানুষ খালি হলে, তখনই নিজের ছায়াটা দেখতে পায়।”

কথাটা আমার বুকের ভিতর কাঁপে। আমি বুঝতে পারি, এই সফর শুধুই দৃশ্য নয়, এটা একটা মন্থর আত্মসমীক্ষা।

নৌকা সামনে এগোয়, সূর্য নেমে যায়। জলের গায়ে পড়া ছায়াগুলো লম্বা হয়, আর সেই ছায়ার মধ্যে হঠাৎ একটা গাছের গুড়ির পাশে দেখা যায় দুটো জ্বলন্ত চোখ। আমি চমকে উঠি।

“ও শেয়াল। ভয় পাবেন না। ওদেরও তো নদী ভালোবাসে,” বিনোদদা হেসে বলে।

আলো কমে আসে, বাতাসে হালকা ঠান্ডা।
আমি জানি, রাতে নেমে আসবে আরও গভীর নীরবতা।
কিন্তু এই সন্ধ্যার সুবর্ণ ছায়া আজ আমার মনে দাগ কেটে রইল।

পর্ব ৪: কাঁকড়ার নাচ

রাত হয়ে গেছে। আকাশে জ্যোৎস্না উঠেছে, কিন্তু তা সেভাবে দেখা যায় না, কারণ গাছের ডালপালা জুড়ে রয়েছে এক অভ্রান্ত অন্ধকার। মাঝেমধ্যে পাতার ফাঁকে সাদা আলো ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ে জলের উপর, আবার মিলিয়ে যায়।

নৌকা এখন এক চওড়া খালের পাশে বাঁধা। নদী এখানে প্রায় স্থির। শুধু হালকা ঢেউ আর মাঝেমধ্যে বাতাসের ধাক্কায় কেঁপে ওঠা ছাউনির কঞ্চিগুলো। জলের ধারে বসে আছি আমি, হাতে একটা গ্লাস—বিনোদদা নিজে বানানো চাল-গুড়ের হালকা মদ, নাম দিয়েছেন ‘বাউল রস’। খাঁটি, অপ্রস্তুত আর মাটির ঘ্রাণে ভরা।

হঠাৎ সামনে কাদার মধ্যে নড়াচড়া দেখা গেল। টর্চ ফেলতেই দেখা গেল—এক গোত্র কাঁকড়া, একেবারে কাঠামোগত ঢঙে হাঁটছে। তারা সোজা না চলে পাশ কাটিয়ে এগোয়, যেন দুনিয়ার নিয়ম তাদের পছন্দ নয়।

আমি কৌতূহলী হয়ে দেখি—একটা বড় কাঁকড়া, তার পেছনে পাঁচ-ছয়টা ছোটো কাঁকড়া। তারা কখনও থেমে যায়, কখনও যেন ধীর ছন্দে কাদার উপর দিয়ে চলে যায়। পুরো ব্যাপারটা যেন একটা ছোট্ট মঞ্চনাট্য।

“ওরা এখন জোয়ারের জন্য হাঁটে,” বাপন বলে।
“জোয়ার?”
“হ্যাঁ। জল উঠলেই এরা জালের ধারে চলে যায়। তখন মাছেদের সঙ্গে এদের পালা হয়।”

আমি ভাবি—একেকটা ছোট্ট প্রাণী, তাদেরও আছে ছন্দ, পরিকল্পনা, সময়জ্ঞান। আর আমরা মানুষ, একটানা ছুটে চলি, অথচ কখনও নদীর মত সময়কে বুঝতে শিখি না।

কাঁকড়ারা থেমে গিয়েছে। কিছুটা সময় তারা একদম নিঃস্পন্দ, তারপর হঠাৎ আবার দৌড় দেয়। তাদের এই আচরণ অদ্ভুত রকমের শিল্পময়। আমি দেখি, কাঁদার মধ্যে তারা এমনভাবে দাগ রেখে চলে যাচ্ছে, যেন কেউ কলম দিয়ে এঁকে রেখেছে গোপন কোনও সংকেত।

বিনোদদা এসে দাঁড়ায়।
“এই কাঁকড়ার গর্তেই অনেক সময় থাকে অদ্ভুত মাছ। নদীর নিচের গল্প আমরা জানি না।”

আমি মাথা নাড়ি।
“এই নাচ, এই হাঁটা, এই সময়—সব কিছুতেই এক অন্তর্নিহিত ছন্দ আছে।”

বিনোদদা হেসে বলে,
“এই জন্যই তো আপনাদের মতো শহুরে মানুষ নৌকায় এসে বোঝেন—জীবনের মূল গানটা মাটির কাছেই বাজে, নদীর ধারে, কাঁকড়ার নাচে।”

আমি তখন বুঝতে পারি—এই সফর কোনও পর্যটন নয়, এটা শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক নিরব প্রতিজ্ঞা। কাঁকড়ার হাঁটার সেই ঘুরপথ আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি—সোজা নয়, ধীরে, পাশ কাটিয়ে, কিন্তু নিরন্তর।

সেই রাতে, আমি অনেকক্ষণ বসে থাকি জলের ধারে। কাঁকড়ার হাঁটা দেখে আমার মনে হয়, পৃথিবী আসলে এখনও নাচে—আমরা শুধু তাকিয়ে দেখি না।

পর্ব ৫: সুনসান নৌকাবাস

রাতটা অদ্ভুত রকমের গভীর। যেন আকাশ নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছে। দূরে কোথাও হালকা কুয়াশা গড়াচ্ছে জলের ওপর দিয়ে, আর নৌকার চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে এক গাঢ় সুনসান। সেই নীরবতার মাঝে নিজেকে একটুও ছোটো মনে হয় না—বরং যেন বিশাল, শিকড়ে গাঁথা কিছু একটা হয়ে ওঠার অনুভব।

বাপন কাঠের খুপরির মত এক কোণায় রান্না করছে। গন্ধে বুঝলাম—গরম ভাত আর সর্ষে ইলিশ। মাছটা দুপুরে স্থানীয় এক জেলে দিয়ে গিয়েছে, বিনিময়ে তারা নৌকা থেকে দুটো পুরনো জাল নিয়ে গেছে।

আমি নৌকার পেছনে, ছাউনির ঠিক বাইরের কাঠের মাচায় শুয়ে পড়ি। পিঠের নিচে বোনা চটের বিছানা, মাথার নিচে গোঁজার চৌকো বালিশ। ঠিক সেই সময় একটা আওয়াজ শুনি—চিপ চিপ শব্দ, যেন কাঠে কারও নখ পড়ছে। চোখ ঘুরিয়ে দেখি—একটা ছোট্ট টিকটিকি নৌকার খুঁটির গায়ে বসে, জিভ বের করে জলের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখেও যেন এই জল একটা রহস্য।

বিনোদদা এসে পাশে বসে।

“ঘুম পাচ্ছে?”
আমি মাথা নাড়ি, “না… শুনতে ভালো লাগছে।”

“কী?”

“এই চুপচাপ শব্দগুলো।”

তিনি চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলেন—
“এই নৌকা যখন চলে না, তখনও সে কথা বলে। কাঠের গায়ে বাতাস লাগে, জলে তার পেট ছোঁয়, বাঁশের ছাউনি কাঁপে। এই সব মিলে একটা কথোপকথন তৈরি হয়। আমরা শুনি না বলেই মনে হয় কিছুই নেই।”

নৌকার মৃদু দুলুনিতে মাথা একটু ঝিমিয়ে আসে। আমি চোখ বন্ধ করি। না, একে ঘুম বলা যাবে না। এটা একটা অন্য রকম সচেতনতা—একটা সজাগ স্বপ্নের মতো।

জলের ওপর চাঁদের ছায়া টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে। নৌকা যেন সেগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে তার বুকে। হঠাৎ দূরে একটা শব্দ—কোনো বন্যপ্রাণীর ডাক হতে পারে, অথবা বাতাসে হঠাৎ পাতার খসখসানি। কিন্তু সেটা ভয় দেয় না। বরং মনে হয়, এই জঙ্গলের মধ্যেও একটা ছন্দ আছে, একটা অন্তর্নিহিত নিরাপত্তা।

রাত বাড়ে। বাতাস ঠান্ডা হয়। জলে পড়া ছায়া একটু একটু করে সরে যায়, নৌকার ছাউনির গায়ে এসে পড়ে।

আমি নিঃশব্দে ভাবি—এই নৌকাবাস, এই সুনসান, এই নির্জনতা—সবই কি নিঃসঙ্গতা? নাকি এটাই তো জীবনের একান্ত আশ্রয়?

বিনোদদা আবার বলেন, “আপনি যখন ফিরে যাবেন, এই শব্দগুলো মিস করবেন। তখন শহরের হর্নের ভেতরেও আপনি হয়তো খুঁজবেন এই চুপচাপ সুর।”

আমি জানি, উনি ঠিকই বলছেন।

সেই রাতে ঘুমটা আসে ধীরে, জল আর নৌকার মৃদু ছন্দে বাঁধা এক ঘোরের ভিতর দিয়ে।

পর্ব ৬: স্বরলিপি নদীর

সকালটা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধ আলোয় ভরা। আকাশের ছায়া নদীতে পড়ে নরম হয়ে এসেছে, যেন জলে তুলির আঁচড়। আমি চোখ খুলতেই দেখি, নৌকা তখনও সেই জায়গাতেই বাঁধা, কিন্তু মনে হয়, পুরো জগতটা যেন কোথাও সরে গেছে।

বাপন চুপচাপ বসে আছে নৌকার পেছনে, একটা বাঁশের কাঠিতে হালকা কাগজের পাতলা পাখা নাড়ছে। তার মুখে সেই একই নির্বিকার, নির্ভর মুখভঙ্গি।

আমি উঠে বসি, কাঁধে চাদর জড়িয়ে ডেকে এসে দাঁড়াই। সামনে নদীটা একটু বিস্তৃত, যেন একটা ছোট্ট হ্রদের মতো মনে হয়। পাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখি—একটা খেঁকশিয়াল দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের দিকে না তাকিয়ে সে ঝোঁপের ভেতর কি যেন শোঁকে।

“এই নদীর শব্দটা আলাদা,” আমি বলি।
বিনোদদা হাল ধরে বসে, হেসে বলেন, “হ্যাঁ। এটা হেরেখালি খাল। এখানে জল একটু অন্যরকম বাজে।”

আমি কৌতূহলী হয়ে আরও ভালো করে কান পাতি।

জল কেমন যেন ছন্দে ছন্দে কাঁপছে। একটা ছোট্ট ঢেউ উঠছে, তারপর নিজে থেকেই মিলিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে একটা পাতা ভেসে যাচ্ছে সেই ঢেউয়ের তালে তালে, আর মনে হচ্ছে, তারাও যেন সঙ্গীতের একটা অংশ।

“এই যে ঢেউ, এই যে গাছের কাঁপন, বাতাসের শোঁ শোঁ, জলের ফিসফাস—সব মিলেই তো একটা স্বরলিপি,” আমি আস্তে বলি।

বিনোদদা মাথা নাড়েন।
“এই জন্যই তো অনেকে এই নদীকে মা বলে। মা যেমন একসঙ্গে গান, গল্প, চোখের জল আর ঘুম দেয়।”

আমার মনে পড়ে যায় ছোটোবেলার ঘুমপাড়ানি গান। সে গান শহরে থাকত না, সে গান থাকত ঠাকুমার গলায়, কিম্বা বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে থাকা বিকেলগুলোয়। আজ এই নদীর ঢেউ সেই পুরোনো দিনের সুর যেন ফিরিয়ে দিচ্ছে।

নৌকা আবার ছাড়ে। এবার তার গতি মন্থর। পেছনে ফেলে আসা জলরেখা যেন একটা লেখা হয়ে যাচ্ছে—জীবনের, স্মৃতির, আর নতুন উপলব্ধির।

আমার খাতায় হঠাৎ শব্দেরা ভিড় করে আসে।

“জল কিছু বলে না,
তবু তার স্পর্শে গান জেগে ওঠে।
গাছের ছায়া, ঢেউয়ের ছন্দ—
এ এক নদীর স্বরলিপি।”

বাপন তখন একটা রেডিও চালু করে। পুরোনো বাংলা গান বাজে, যার সুর নদীর শব্দের সঙ্গে এমন মিশে যায় যেন আলাদা করে ধরা যায় না। গানটা বলে—”এই পথ যদি না শেষ হয়…”

আমি চোখ বুজি।
হ্যাঁ, এই নদীপথ, এই নৌকাবিহার, যদি কখনও শেষ না হয়… তবে কেমন হতো?

পর্ব ৭: জীবনের সুরেলা বাঁশি

দুপুরটা গড়িয়ে যাচ্ছে নীরব বাতাসে। সূর্যটা এখন মাথার অনেক ওপরে, কিন্তু তীব্রতা নেই। জলের রঙ বদলেছে—এবার সে হালকা নীল-সবুজের মতো, যেন নিজেকেই মিশিয়ে ফেলেছে আকাশ আর জঙ্গলের সঙ্গে। নৌকা ভাসছে মাঝখানে, আর চারপাশে যেন সময় দাঁড়িয়ে আছে।

আমি ছাউনির নিচে বসে আছি, হাতে একটা বাঁশের পাতলা ফ্লুট। এটা আমি সঙ্গে করে এনেছিলাম—ভেবেছিলাম বাজাব, যদিও সেভাবে পারি না। শহরে এটা হয়তো খেলনা, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটাই আমার সঙ্গে প্রকৃতির যোগাযোগের একমাত্র যন্ত্র।

বাঁশির মাথায় ঠোঁট রাখি, নিঃশ্বাস ছাড়ি। সুর ঠিকমতো ওঠে না। হালকা ফুঁ দিলে একটা কর্কশ আওয়াজ হয়, তারপর থেমে যায়। একটু বিরক্ত লাগে। কিন্তু আশপাশে কেউ হেসে উঠছে না, কেউ ভুল ধরছে না। শুধু বাতাসটা একটু থেমে শুনছে যেন।

বিনোদদা এসে বসে।
“বাঁশির সুর সবসময় ঠিক লাগে না। কিন্তু আপনি ফুঁ দিলে যে শব্দ বেরোয়, তা হলেও সে তো আপনার ভিতরের আওয়াজ। প্রকৃতি সেটা শুনতে চায়।”

তার কথা শুনে আমি আবার চেষ্টা করি। এবার একটু ধীরে, একটা সরল সুর। শব্দ ওঠে, অল্প সময়ের জন্য স্থির থাকে, তারপর জলে গিয়ে গলে যায়। কিন্তু সেই মুহূর্তটা যেন একটা দরজা খুলে দেয়।

নৌকার অন্য প্রান্ত থেকে বাপন আস্তে গুনগুন করতে শুরু করে। তার গলার সুর বাঁশির সঙ্গে মিলিয়ে যায়। শব্দরা নদীর বুকে গড়িয়ে পড়ে, আর জঙ্গলের পাখিরা যেন সাময়িক থেমে সেটা শুনতে চায়।

এক অদ্ভুত সুরেলা মুহূর্ত তৈরি হয়। যেখানে আমার অপটু বাঁশি, বাপনের গলা, জলের ঢেউ, পাতার কাঁপন—সব মিলেমিশে এক জীবনের সুর হয়ে ওঠে।

“আপনি যখন শহরে ফিরে যাবেন, মনে রাখবেন—শরীরে যদি নদীর একটা সুর থেকে যায়, তবে আপনি আর পুরোপুরি শহরের হতে পারবেন না,” বিনোদদা বলেন।

আমি বুঝি, এই বাঁশির মতোই আমার জীবনও এখন একটা অল্প অল্প তোলা সুর। না পারা, না শেখা, কিন্তু গভীর এক স্পর্শবোধে ভরা। এই সুর হয়তো কেউ শুনবে না, কিন্তু নদী শুনে ফেলেছে।

সেই দুপুরে আমরা তিনজন একসাথে একটা গান তৈরি করি—যার কোনো নাম নেই, কোনো কথা নেই, কোনো ধরন নেই। শুধু অনুভব আছে।

নৌকা তখন আর এক যাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জীবনের প্রতিটি বাঁক এইভাবে নতুন সুর আনবে, যদি কান খোলা থাকে।

পর্ব ৮: বাঘের নীরব গানে

সন্ধ্যার আভা ছড়িয়ে পড়ছে গাছের গায়ে, জলে, আর আমাদের মুখে। একরকম অস্থির রঙ লেগে যাচ্ছে সব কিছুর উপর, যেন প্রকৃতি জানে—রাত নামার আগে আরেকবার সমস্ত কিছু রাঙিয়ে নিতে হবে।

নৌকা তখন ঢুকছে এক সরু খালের ভিতর। জলের রঙ এখানে গাঢ়, গভীর সবুজ। গাছের ডালপালা একে অপরের দিকে ঝুঁকে পড়েছে এমনভাবে যে আকাশটা প্রায় অদৃশ্য। শুধু পাতার ফাঁকে ফাঁকে একটু করে লাল-কমলা আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে জলের গায়ে।

“এইখানে বাঘ আসে,” বিনোদদা ফিসফিস করে বলে।
আমার শরীরটা হঠাৎ থেমে যায়।
“বাঘ?”
“হ্যাঁ। এই চরের ওপারে যে কাদা দেখা যাচ্ছে, সেখানে পায়ের ছাপ আমরা আগেও দেখেছি। কিন্তু চিন্তা নেই, দিনের আলো থাকতে ওরা আসে না।”

কথাটা বলার পর আশপাশটা আরও নিঃশব্দ হয়ে যায়। সেই নিঃশব্দতায় একটা রহস্য, একটা অদ্ভুত সম্মানবোধ কাজ করে। যেন এই বনের, এই নদীর এক প্রাচীন অধিপতি আছে, যার উপস্থিতি দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।

আমি দাঁড়িয়ে পড়ি নৌকার ডেকে। কাদার উপরে হালকা দাগ দেখা যাচ্ছে, সম্ভবত পায়ের ছাপ। বড়, গোলাকার ছাপ, একটু হেলে রাখা। বাঁধা বাঁশের গোঁজায় কিছু দাগ, যেন কেউ গিয়ে গা ঘষে এসেছে।

আমি কিছু বলি না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা কাঁপুনি কাজ করে। ভয় না, বরং বিস্ময়। এই সুন্দর নিঃশব্দতা ভেদ করে কোনো প্রাণী এখানে আসে, দেখে, তারপর আবার জঙ্গলের গহীনে মিলিয়ে যায়।

বাপন আস্তে আস্তে একটা পুরনো গান গুনগুন করে—

“বনে যদি রে সিংহ গায়,
চুপ করে শুনিস রে ভাই,
জোরের মধ্যে তুই যা দেখিস,
নীরবতায় তার ঠিক নাই…”

এই গানটা যে ঠিক বাঘের জন্য লেখা, তা নয়, কিন্তু মুহূর্তটায় সেটা যেন নিখুঁতভাবে মানিয়ে যায়।

বিনোদদা হেসে বলে, “ওরা গান গায় না, কিন্তু ওদের নীরবতায় একটা ভয় আর সৌন্দর্য মিশে থাকে। এটাই সুন্দরবনের বাঘ।”

আমি বুঝি, এই সফরে বাঘ দেখা না হলেও, আমি তার উপস্থিতি ঠিক টের পাচ্ছি—এই নিঃশব্দ সুরে, অন্ধকার গন্ধে, নদীর শ্বাস-প্রশ্বাসে। কখনও দেখা না দিয়েও কেউ কত গভীরে পৌঁছে যেতে পারে, সেটা বুঝতে হলে সুন্দরবনের এই রাত দেখতে হয়।

সেই রাতে, আমি কিছুতেই ঘুমোতে পারি না। নৌকার কাঠে কাঠে হালকা শব্দ, দূরে কোন বুনো পাখির কান্নার মতো ডাক, আর সেই কাদামাটিতে পড়া একজোড়া অদৃশ্য চোখের দৃষ্টি—সব মিলিয়ে মনে হয়, বনের মধ্যেই কেউ যেন একটা গান গাইছে, যেটা কেবল সাহসী শ্রোতারাই শুনতে পারে।

পর্ব ৯: অরণ্যের কোলাহলহীনতা

সকালবেলা ঘুম ভাঙল হালকা কুয়াশার ভিতর দিয়ে। ছাউনির নিচ থেকে বেরিয়ে দেখি, পুরো নদীটা যেন একটা ধূসর স্বপ্নে ঢেকে গেছে। দূরে কিছুই দেখা যায় না—না গাছ, না জলপথ, না পাখি। শুধু হালকা শব্দ—জলের ফোঁটা পড়ছে কোথাও, কোথাও পাতা পড়ে একটানা মিহি আওয়াজ তুলে মিলিয়ে যাচ্ছে।

এই কুয়াশার মধ্যে এক ধরনের গভীরতা আছে, যেটা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না। মনে হয়, জঙ্গল নিজেই নিঃশব্দে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সব কিছু দাঁড়িয়ে গেছে, শুধু সময়টা এগিয়ে চলেছে এক নরম ঘূর্ণির মতো।

বিনোদদা বললেন, “আজ আমরা ঢুকব চোরামারী খালে। এটা একটু বিচ্ছিন্ন, একেবারে নির্জন অঞ্চল। বাঘ, কুমির, বানর—সবই থাকে, কিন্তু দেখা যায় না সহজে।”

নৌকা চলতে থাকে ধীরে ধীরে, আর কুয়াশার চাদর আস্তে আস্তে সরে গিয়ে জঙ্গলের ছায়া দেখা যায়। গাছের ফাঁকে সূর্যের নরম আলো ঢুকছে—হলুদ, সোনালি, সাদা—তিনটে রঙে নদীটা যেন নতুন করে নিজেকে আঁকছে।

এখানে শব্দ নেই, কোলাহল নেই। কিন্তু এই কোলাহলহীনতা নিজেই এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। শহরে আমরা এত শব্দে ডুবে থাকি, যে নীরবতার একটা পরতও টান তৈরি করে। কিন্তু এখানে সে টান নেই। বরং এই নীরবতা নিজেই কথা বলে, স্মৃতি তোলে, বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো আলগা করে।

আমি বসে থাকি ডেকে। চোখের সামনে দিয়ে পাখির পাল উড়ে যায়—বড় একটা বক, তার পেছনে একটা জলমুরগি। তারা ডাকেও না। যেন এই অরণ্যের নিয়ম—এখানে কেউ কথা বলে না, কেবল উপস্থিত থাকে।

বাপন একটা মুঠো চাল হাতে নিয়ে বসে। সে চালগুলো জলে ছুঁড়ে দেয়, ধীরে ধীরে। তার চোখে ক্লান্তি নেই, বরং এক অভ্যস্ত শান্তি। আমি জিজ্ঞেস করি, “এইভাবে বসে থাকো কেন?”

সে বলে, “অনেক সময় নদী থেকে উত্তর পাওয়া যায় না। কিন্তু বসে থাকলে সে নিজের মতন একটা গল্প শোনায়।”

আমার মনে হয়, আমিও এই গল্পের এক অংশ। এই নৌকা, এই অরণ্য, এই জলপথ—সব একসঙ্গে একটা বড় জীবনের শ্বাস নিচ্ছে। আর আমি তার হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছি।

চোরামারী খালের মাঝপথে এসে নৌকা থামে। গাছের গায়ে বেঁধে রাখা হয় দড়ি। চারপাশে কিছুই নেই, শুধু বন, জল, আর নীরবতা। এই শূন্যতা কিছু বলে না, কিছু চায় না, শুধু জায়গা দেয়—নিজেকে বুঝে নেওয়ার, জীবনের অন্যতর সুর শোনার।

আমি বসে থাকি অনেকক্ষণ। কাগজ-কলম নেই, শব্দ নেই, শুধু নিজেকে শোনার চেষ্টা। আর তখনই মনে হয়—এই অরণ্য আমার ভিতরের কোলাহলটাও শুষে নিচ্ছে, এক এক করে।

এই চুপ থাকা সময়ে আমি বুঝতে পারি—এই ভ্রমণ শুধু সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে নয়, এটা আমার নিজের ভিতর দিয়ে যাওয়া এক জার্নি। অরণ্যের নীরবতা সেই পথ দেখাচ্ছে, ধীরে, ধাপে ধাপে।

পর্ব ১০: নীল আকাশের কথা

শেষ সকাল। নৌকা ফিরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে সেই পথে, যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম। কিন্তু নদীটা যেন আর আগের মতো নয়। জল বদলায়নি, গাছের রং একই, কাঁকড়া এখনও হাঁটে চুপচাপ। তবে আমার চোখের ভেতরে কিছু পাল্টে গেছে।

আকাশ আজ একেবারে স্বচ্ছ নীল। এমন নীল যা শহরের জানালায় দেখা যায় না। এমন নীল যা নিখুঁত নয়, কিন্তু গভীর—যেখানে মনে হয় আকাশ নিজেই নিচু হয়ে এসে মাথার পাশে দাঁড়িয়েছে।

বিনোদদা হাল ধরে বসে, চুপচাপ। বাপন পেছনে গুছিয়ে ফেলছে জিনিসপত্র। আমি দাঁড়িয়ে আছি ডেকে, একেবারে সামনে, চোখের সামনে পুরো জলরেখা। সেই জল, সেই গাছ, সেই বাতাস—সব যেন বিদায় জানাতে এসেছে।

“আপনার মনে থাকবে তো?” হঠাৎ বিনোদদা জিজ্ঞেস করলেন।

আমি হাসলাম, বললাম, “শুধু মনে থাকবে না। এই সফর আমার ভিতরের একটা নদী খুলে দিয়েছে।”

তিনি হেসে মাথা নাড়লেন, “তাহলে ভালো। শহরে গিয়ে ভুলে যাবেন না যেন। এই আকাশ, এই নীরবতা, এই চলমানতা—সবই আমাদের শরীরে মিশে থাকে। শুধু সময় হলে আবার ফিরে আসা দরকার।”

আমি জানি, ঠিক বলেছেন। এই সফর কোনো ক্যামেরা ধরে রাখতে পারে না, কোনো ডায়েরির পাতায় ফিট হয় না। এটা এক ধরনের অনুভূতির নকশা, যা নদী, জল, আকাশ আর অরণ্যের নীরব ভাষায় লেখা।

নৌকা যখন চরের ধারে এসে দাঁড়ায়, তখন আমি শেষবারের মতো চারপাশটা দেখি। নীল আকাশ ঠিক মাথার ওপরে, এমনভাবে যেন বলছে—

তুই যা দেখলি, সেটা আমি প্রতিদিন দেখি। কিন্তু আজ তোর চোখ খুলেছিল বলেই তুই বুঝলি—জীবন শুধু শহরের ছুটে চলা নয়। জীবনের আসল গতি হয়তো জলের মতোই—ধীরে, গভীরে, আর নীল।”

আমি মাথা নিচু করি।
সন্ধ্যা বরণে ওঠা সেই প্রথম মুহূর্ত, বাঁশির অপটু সুর, বাঘের নিঃশব্দ উপস্থিতি, কাঁকড়ার নাচ, নৌকার দুলুনি, অরণ্যের স্তব্ধতা—সব মিলিয়ে এখন আমি একটু নরম, একটু কৃতজ্ঞ।

এই সফর শেষ হল ঠিকই,
কিন্তু নীল আকাশের এই কথা চিরকাল রয়ে গেল আমার ভিতরে,
একটা নদীর মতো… বয়ে চলা।

সমাপ্ত।

WhatsApp-Image-2025-06-23-at-9.00.28-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *