Bangla - নারীবিষয়ক গল্প

অ্যালবামবন্দী আকাশ

Spread the love

শর্মিষ্ঠা বসু


পর্ব ১: ধুলোভরা পাতা

ঘরটা অনেকদিন খোলা হয়নি। জানালার পাশে কাঠের পুরনো আলমারিটা ঝুপসা আলোয় দাঁড়িয়ে ছিল, যেন তার গায়ে জমে থাকা ধুলোর পরতে পরতে সময় জমে আছে। অনুরাধা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে হাত রাখল হাতলে। একটা মৃদু কঁকিয়ে ওঠা শব্দে দরজাটা খুলে গেল। ভেতরটা থমথমে, প্রায় শ্বাসরুদ্ধ করা। ঠিক যেন কেউ খুব সন্তর্পণে এখানে কিছু লুকিয়ে রেখেছিল—কোনও কথা, কোনও চিঠি, কিংবা হয়তো কোনও স্মৃতি।

অ্যালবামটা মিলল নিচের তাকে, কয়েকটা পুরনো বইয়ের মাঝে স্যান্ডউইচ হয়ে। ধূসর কাপড়ে মোড়া। তার প্রান্তে সেলাই ছেঁড়া, কিছু জায়গায় সাদা দাগ, কীসের যেন পুরনো দাগ লেগে আছে—জল? চোখের জল?

অনুরাধা ধীরে ধীরে খুলল সেটি।

প্রথম পাতায় একটিমাত্র ছবি—সাদাকালো, একটু দাগ পড়া, কিনারায় ফাটল। ছবিতে রয়েছে তিনজন মানুষ—একজন বয়স্ক পুরুষ, তার পাশে এক মহিলা, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক মেয়ে। মেয়েটা পেছনদিকে তাকিয়ে আছে, যেন ক্যামেরার দিকে চাইতে চাইতেও থেমে গেছে।

ঠিক তখনই শুনল সে। খুব হালকা, কিন্তু স্পষ্ট।

“আমায় মনে আছে?”

চোখ পিটপিট করে তাকাল চারপাশে। কেউ নেই। ঘরটা নিঃসঙ্গ, নিস্তব্ধ। কিন্তু শব্দটা আবার এল। এবার একটু যেন কাছে।

“অনু… আমাকে চিনতে পারছ না?”

গলার স্বরটা চেনা। কোথায় যেন শুনেছে, অনেক অনেক আগে। কিন্তু সময়ের ধুলোয় তা ঢাকা পড়ে গেছে। সে আবার ছবিটার দিকে তাকাল। মেয়েটার মুখে স্পষ্ট ছিল না কিছু, কিন্তু চোখের চাহনি যেন লুকিয়ে কিছু বলতে চাইছে। পেছনের সেই নীল আকাশ—ছবির মধ্যে অদ্ভুতভাবে উজ্জ্বল, যেন বাস্তবের থেকেও বেশি জীবন্ত।

এই আকাশটা… কোথায় যেন দেখেছে।
হ্যাঁ, একবার—ছোটবেলায়, মা যখন তাকে ঘুম পাড়াতো—একটা গান গাইত, “নীল আকাশে ভাসে যে মেঘ, মনে রেখো সেই ছায়া…”
এই ছবির আকাশ ঠিক সেইরকম।

স্মৃতি যেন নক করে উঠল মনে।
তখন ক্লাস ফোরে পড়ে অনুরাধা। এক বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখে মা দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে। বাবা কোথায় গিয়েছে, কেউ জানে না। পুলিশের কাছে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনও খবর পাওয়া যায়নি। শুধু এই ছবিটা, সেই দিন রাতেই, মায়ের হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল মেঝেতে।

তারপর থেকে ছবিটা আর চোখে পড়েনি।

আজ প্রায় পঁচিশ বছর পর আবার সেই ছবি, সেই আকাশ, আর সেই চাহনি।

কিন্তু এই ফিসফিসানি?

সে অ্যালবামের পাতাগুলো উলটে দেখতে লাগল। প্রতিটা পাতায় একটা করে ছবি, কিন্তু সবাই যেন অচেনা। কেউ হেসে আছে, কেউ হাত নেড়ে বিদায় দিচ্ছে, কেউবা ছাদের কিনারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে। তাদের মধ্যে একটা ছবিতে হঠাৎই চোখ আটকে গেল অনুরাধার।

ছবির ডানদিকে এক ছেলেটি দাঁড়িয়ে, চোখে চশমা, গায়ে স্কুল ড্রেস। ছেলেটি তার দিকে তাকিয়ে নেই, কিন্তু এক অদ্ভুত অনুভূতি হল—ও যেন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার ভেতর দিয়ে

আরও একটা কণ্ঠস্বর এল এবার—ভিন্ন, পুরুষ কণ্ঠ।

“আমরা একসঙ্গে ছিলাম, অনু। তুমি মনে রাখনি, কিন্তু আমি ভুলিনি।”

আচমকা ঘরটা যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। জানালার পর্দা নড়ল না, ঘড়ির কাঁটা চলল না, এমনকি তার নিজের নিঃশ্বাসও থেমে গেছে কি না, বোঝা গেল না।

সে ধীরে ধীরে ছবিটার নিচে লেখা নামের দিকে তাকাল। হাতের লেখা ঝাপসা, কিন্তু পড়া যায়—

আকাশ, ১৯৯৮”

আকাশ? কে আকাশ?

অনুরাধা যেন দাঁড়িয়ে গেল এক অসমাপ্ত সময়ের মোহনায়, যেখানে অতীত এখনকার চেয়ে বেশি জীবন্ত।

আর ছবির আকাশে জমে উঠতে লাগল ঘন নীল মেঘ—ঠিক যেন কিছু বলতে চায়।

পর্ব ২: ফিসফিসানি

ঘরের বাতাসটা যেন একটু ভারী হয়ে উঠেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোতেও একটা গাঢ় ছায়া মিশে আছে। অনুরাধা ধীরে ধীরে ছবিটার কিনারা ছুঁয়ে দেখে—”আকাশ, ১৯৯৮”। মনে হয় যেন নামটা ছুঁলেই ছেলেটির নিঃশ্বাস তার কানের পাশে এসে জমা হচ্ছে।

সে আবার শোনে—
“আমরা একসঙ্গে ছিলাম, অনু… তুই ভুলে গেছিস?”
অন্য কারও গলা হলে ভয় পেতে পারত অনুরাধা। কিন্তু এটা যেন তার চেনা, পুরনো, খুব নিজের একটা গলা।

সে তখন ক্লাস ফোরে পড়ে, দোতলার কোয়ার্টারে থাকত বাবা-মায়ের সঙ্গে। পাশের ফ্ল্যাটে থাকত এক দাদা—দুই বছরের বড়, নাম ছিল আকাশ। বড্ড চুপচাপ ছিল সে, মুখে যেন সবসময় একটা বিষণ্ন হাসি। তারা একসঙ্গে স্কুলে যেত, খেলত ছাদে, দড়ি লাফাত, স্টিকার বিনিময় করত। একদিন হঠাৎ করেই আকাশ আর তাদের স্কুলে আসেনি। পরে জানতে পেরেছিল তার পরিবার চলে গেছে অন্য শহরে।

কিন্তু কিশোরীর মন তো সব ভুলে যায় না।

অ্যালবামের পাতায় চোখ ফেরাতেই দেখা গেল ঠিক তার পাশের ছবিটা—আকাশ আর সে, ছাদে দাঁড়িয়ে। তার চোখে একটা ছোট্ট গোল সানগ্লাস, আর আকাশের হাতে একটা রঙিন ঘুড়ি। ছবির ডানদিকে নীচু হরফে লেখা “ছাদ, গ্রীষ্মকাল, ১৯৯৭”।

অনুরাধা ফিসফিস করে বলে, “আকাশ, তুই… তুই কি এই অ্যালবামে আছিস?”

“তুই পাতাগুলো উলটে যা, অনু। আমি তোকে সব দেখাব।” — এবার গলাটা যেন মাথার ঠিক পেছন থেকে এল। সে ঘুরে তাকাল। কেউ নেই। শুধু সিলিং ফ্যানে জং ধরা শব্দ, আর ঘরের নিস্তব্ধতা।

হাত কাঁপছিল তার, কিন্তু কৌতূহল ভয়কে হার মানাল। পরের পাতায় একটা পুরনো স্কুলের দলগত ছবি। অনুরাধা চিনতে পারল তাকে—সে তখন দ্বিতীয় শ্রেণির। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আকাশ। আশ্চর্য, এতদিন এই ছবিটা সে দেখেনি! অথচ এত স্পষ্ট, এত জীবন্ত!

হঠাৎই ছবির পেছন থেকে একটা কাগজ পড়ে যায়—ভাঁজ করা, হলদেটে, একপাশে ছেঁড়া। তাতে লেখা—
যদি এই অ্যালবাম খুলিস, মনে রাখিস, কিছু কথা ফিরে আসে, কিছু মানুষও…”

সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়। দরজার দিকে এগোয়, দরজাটা খুলে বাইরে যেতে যাবে—ঠিক তখনই হঠাৎ ঘরের লাইট বন্ধ হয়ে যায়। চারপাশে অন্ধকার। তার বুকের ধুকপুকানি সে নিজেই শুনতে পায়।

তখনই দেয়ালের আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখা যায়—কিন্তু আয়নায় সে একা না। ঠিক তার পাশে এক কিশোর দাঁড়িয়ে, সাদা শার্ট, চোখে চশমা।

অনুরাধা চিৎকার করে ঘুরে তাকায়—কেউ নেই।

আয়নার দিকে ফিরে চায় আবার। এবার সে একা।

সে দম নিতেও ভুলে যায়। দেয়ালে হাত রেখে বসে পড়ে মেঝেতে। নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরা কান্না আটকে রাখে।

তারপর নিচু স্বরে বলে, “তুই কি মরেছিস, আকাশ?”

নিস্তব্ধতা।

তবে সেই মুহূর্তেই বাতাসে একটা ঘ্রাণ আসে—ঘুড়ির আঠার গন্ধ, যেটা সে তখন চিনত, এখন ভুলে গিয়েছিল।

“না, আমি মরি না, অনু,” এবার গলার স্বর যেন জানালার পাশ থেকে। “আমাকে শুধু আটকে রাখা হয়েছে।”

“কে আটকে রেখেছে?”

“যে এই অ্যালবামটা বন্ধ করেছিল…”

অ্যালবামের শেষ পৃষ্ঠার দিকে তাকিয়ে সে দেখে একটা কাটা পাতা—যার প্রান্তে কালি লেগে আছে, ছবি তুলে ফেলা হয়েছে। শুধু কাঁচি দিয়ে কাটা একটি মুখের অবয়ব টিকে আছে—ছোট্ট, তারই মুখ!

“তুই তো ছিলি,” সে নিজেই ফিসফিস করে। “তুই তো ছিলি আমার পাশেই…”

তখনই সেই গলা বলল,
“তুই যদি চাইস, আমি ফিরতে পারি।
তুই যদি খোলস সব পাতা…
শেষ পাতাটাও।”

ঘরের বাতাস এবার আরও ভারী। ঘড়ির কাঁটা চলা বন্ধ। জানালা বন্ধ, অথচ পর্দা নড়ছে।

আর সেই ফিসফিসানি—
“তুই আমায় ডাকিস, আমি ফিরে আসব। তুই আমায় মনে করিস, আমি তোর হব। তুই যদি ভুলে যাস… আমি থেমে থাকব এই ছবির আকাশে, তোরই অ্যালবামে বন্দী।”

পর্ব ৩: নীল রঙের মেয়েটি

আলো কমে আসছে জানালার কাঁচে, সন্ধ্যা নামতে চাইছে, অথচ অনুরাধার মাথার ভিতরটা ঝাপসা হয়ে আছে, যেন শব্দহীন একটা জলের তলায় দাঁড়িয়ে সে, আর আশেপাশে ভাসছে পুরনো ফোটোর চৌকো কাঁচের টুকরো। “শেষ পাতাটাও,” সেই গলা বলেছিল। কিন্তু শেষ পাতায় কিছুই নেই, শুধু কাঁচি দিয়ে কাটা একটা মুখ, আর তারই চোখের এক ঝাপসা প্রতিচ্ছবি। সেটা দেখে কী যেন টনটন করে ওঠে মনে—না, ওটা শুধু তার মুখ নয়, কারও আরেকজনের সঙ্গে মিলে যাওয়া একটা ছায়া। পরের দুদিন অনুরাধা অফিস যায়নি। ঘরেই ছিল। বারবার অ্যালবাম খুলে দেখেছে, প্রত্যেকটা ছবির পেছনে হাত বুলিয়েছে, কোনো লেখা আছে কি না, খুঁজেছে। একসময় সে বুঝল, ছবিগুলো শুধু ছবি নয়—ওরা একেকটা দরজা। একটা বিকেলে, যখন বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল, সে দেখতে পেল, অ্যালবামের মধ্যে এক ছবির নিচে ছোট্ট একটা আঁচড়ের মতো দাগ। নখ দিয়ে ঘষতেই দেখা গেল পাতলা করে লেখা—নীল রঙের মেয়েটি”। ছবিটা তেমন কিছু নয়—একটা মাঠ, শিশির ধরা ঘাস, দূরে এক মন্দিরের মাথা, আর মাঝখানে একটা বাচ্চা মেয়ে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মেয়েটার জামার রঙটা অদ্ভুত—কেমন একটা গভীর নীল, যেন চোখের পাতার নিচে লুকানো কোনও স্বপ্নের রঙ।

সেদিন রাতে ঘুম এল না। তার মনে হচ্ছিল, সেই মেয়েটি তাকে ডাকছে। যেন মুখ নেই, কিন্তু তার চোখ আছে, আর সেই চোখ অনুরাধার স্বপ্নে ঢুকে বলছে—“তুই তো জানিস, আমি কে।” ঘুমের মধ্যে সে চমকে উঠে বসে পড়ে। পাশের ঘড়িতে তখন ৩:৩৩। কাক ডাকে না, কুকুরও না, পুরো পাড়াটা যেন ঘুমিয়ে গিয়েছে কোনও অতীতের মধ্যে। সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। চলে যায় অ্যালবামের কাছে। আবার সেই পাতায় যায়—নীল রঙের মেয়েটি। এবার মেয়েটার শরীরের ভেতরটা কেমন যেন নড়েচড়ে উঠছে মনে হল—হালকা একটা হিলহিলে আলোয় সে যেন হেঁটে যাচ্ছে সামনে। অনুরাধা ছবিতে আঙুল রাখে, আর ঠিক তখনই তার মনে পড়ে যায় এক ঘটনার কথা।

একবার স্কুল থেকে ফেরার পথে তার হাতে ছিল একটা ছোট্ট তুলি আর রঙের বাক্স। খুব খুশি হয়ে আকাশকে দেখাতে গিয়েছিল। আকাশ বলেছিল, “চল, একটা মেয়ে আঁকি, যে শুধু নীল রঙের জামা পরে।” ওরা একসঙ্গে সেই ছবিটা এঁকেছিল ছাদে, ইঁটের দেওয়ালে। তার নাম রাখা হয়েছিল—“নীল রঙের মেয়েটি”।

কিন্তু তার পরের দিন সেই ছবিটা মুছে ফেলা হয়েছিল, দেওয়াল ধুয়ে দিয়েছিল কেউ। মা বলেছিলেন, “ওসব বাজে খেলা বন্ধ কর।” তারপর থেকেই আকাশ কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল।

অনুরাধা এবার বোঝে, এই ছবিটা সেই মুছে ফেলা ছবিরই রূপান্তর, কোনওভাবে সেই স্মৃতি তার অ্যালবামের পাতায় ঢুকে পড়েছে। হঠাৎ একটা শব্দ হয়—ঘরের কোণ থেকে খসে পড়ে একটা বই। সেই বইয়ের নিচে থেকে বেরিয়ে আসে একটা পুরনো খাম। ভাঁজ খোলা মাত্র বেরোয় একটা চিঠি—কাঁপা হাতে লেখা, অক্ষর ঝাপসা—

“অনু, আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু ওই মেয়েটা থেকে যাবে। সে আমাকে ছাড়বে না। তুমি যদি কখনও আমার কথা মনে রাখো, জানবে, আমার মধ্যে একটা ছায়া ঢুকে পড়েছিল। সে আমাকে আঁকিয়ে নিয়েছিল। আমি পালাতে পারিনি। আকাশ।”

চিঠিটা পড়ে হঠাৎ অনুরাধার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তার মনে পড়ে, আকাশ মাঝে মাঝেই বলত—“তুই জানিস না, আমার ভিতর কেউ থাকে। সে আমাকে দিয়ে জিনিস আঁকায়। আমি চাই না, কিন্তু আঁকি।”

সে ভাবত, ও শুধু গল্প করে। কিন্তু এখন… হয়তো নয়।

এবার সে দাঁড়িয়ে যায় আয়নার সামনে। নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “নীল মেয়েটা কে?”

কিন্তু আয়নাটা কেমন যেন ফিকে হয়ে আসে, আর তারপর একসময় সেখানে প্রতিফলিত হয় সেই মাঠের ছবি, সেই মেয়েটা। এবার সে ধীরে ধীরে মুখ ঘোরায়—আর অনুরাধা দেখে, সে আর কেউ নয়। ও নিজেই।

অ্যালবাম থেকে একটা গন্ধ আসে—ছেঁড়া কাগজ আর পুরনো কাপড়ের গন্ধ, আর একধরনের রোদে পোড়া শালপাতার গন্ধ, যা সে শেষবার পেয়েছিল আকাশের ঘরের জানালার পাশে।

ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসে, জানালার কাঁচে জমে জলবিন্দু। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। অনুরাধা পেছন ফিরে দেখে, অ্যালবামের পাতাগুলো নড়ছে হাওয়ায়—কিন্তু জানালা বন্ধ।

তখনই সেই গলা—
“অনু… আমি এখানেই আছি। আমি হারাইনি। তুই হারিয়ে গেছিস।”

আর সেই মেয়েটি, যার মুখ তার নিজের সঙ্গে মিলে যায়, হেঁটে আসে ছবির মাঠ থেকে… ধীরে ধীরে তার দিকে।

 

পর্ব ৪: চিঠি যার ঠিকানা নেই

চিঠিটা এখন অনুরাধার টেবিলে পড়ে আছে। অক্ষরগুলো স্পষ্ট নয়, কিন্তু বারবার পড়তে পড়তে সে গলার ছায়া টের পাচ্ছে — যেন আকাশ সত্যিই লিখেছে ওকে উদ্দেশ করে। “আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু ওই মেয়েটা থেকে যাবে…” এই কথাটা মনে গেঁথে আছে। কে এই মেয়ে? নীল রঙের জামা পরা সেই অদ্ভুত কিশোরী? সে কি আঁকা চরিত্র, না কি কোনো আত্মার প্রতিরূপ? উত্তর নেই, কেবল প্রশ্ন আছে — আর আছে সেই ছবির মাঠ, যার ঘাসে পা রাখলে মনে হয়, সময় থেমে যায়।

চিঠির নিচে প্রেরকের জায়গা ফাঁকা। ঠিকানার জায়গায় শুধু একটা চিহ্ন — অ্যালবামের মতো একটা আয়তাকার ফ্রেমের চিহ্ন, যেন কোনো ঘরছাড়া পৃথিবী থেকে পাঠানো বার্তা। অনুরাধা চোখ বন্ধ করে ভাবে, ঠিক কখন থেকে সে এই ফাঁদে পা দিয়েছে। প্রথম দিন অ্যালবাম খুলেছিল কৌতূহলে, এখন মনে হচ্ছে ওই ছবিগুলোই ওকে খুলছে, পাতায় পাতায় তার স্মৃতিকে ফাঁসছে।

চিঠির পাশে রাখা ছবিটায় আবার চোখ যায়। এবার মেয়েটি আরও কাছে দাঁড়িয়ে, যেন আগের ছবির তুলনায় কয়েক পা এগিয়ে এসেছে। আর তার মুখটা যেন আরও স্পষ্ট — চোখ, ঠোঁট, এমনকি ভ্রু পর্যন্ত ঠিক যেন তার নিজের মুখের ছায়া। কিন্তু মেয়েটির চোখে সেই চাহনি — যেন কাঁদছে না, অথচ কান্নার ধারা চেপে রাখা, একটা দীর্ঘ অপেক্ষা, যা ভাষাহীন।

ঘরের বাতাসে এবার একটা গন্ধ আসে — পুরনো দাওয়ায় শুকনো ফুলের গন্ধ, আর একধরনের তীব্র লবঙ্গের মতো কিছু, যেটা সে বহুদিন ভুলে গিয়েছিল। ছোটবেলায় ঠাকুমা মারা গেলে সেই গন্ধ লেগে ছিল শোকঘরে। সেই গন্ধ যেন এখন আবার ঢুকে পড়ছে ঘরে।

ঠিক তখনই দরজায় ধাক্কা — তিনটে টোকা। একবার, দুইবার, তিনবার।

অনুরাধা থমকে যায়। কে আসবে এই সন্ধ্যেবেলা? সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। দরজার ছিদ্র দিয়ে বাইরে দেখে — কেউ নেই। কিন্তু মেঝেতে একটা খাম পড়ে আছে।

উঠিয়ে দেখে — ঠিক আগের চিঠির মতোই হলদেটে খাম। খোলার পর দেখতে পায়, ভেতরে কেবল একটা লাইন লেখা:
তুই যদি খুঁজিস, আমি পথ দেখাব। শুধু ভুলিস না, আমি ছিলাম তোর পাশে।”

চিঠির নিচে কালি ছড়ানো একটা গোল দাগ — যেন চোখের জল পড়েছে। এই চিঠির অক্ষর আলাদা — আগেরটার চেয়ে নরম, কোণাগুলো কাঁপা, যেন এক কিশোরীর হাতের লেখা।

সে এবার আর দেরি করে না। অ্যালবামের পাশে বসে পড়ে, সব ছবি এক এক করে উল্টাতে থাকে। হঠাৎ একটা পাতায় হাত আটকে যায় — পাতাটা জুড়ে শুধু একটা আকাশ, বিশাল নীল আকাশ, আর তার মাঝখানে লেখা একটিমাত্র শব্দ — ফিরে আয়”

অনুরাধা সেই পাতার দিকে তাকিয়ে বলে, “আকাশ, তুই কোথায়? আমি তো খুঁজছি তোকে।”

একটা ফিসফিসানি ফেরে — এবার যেন সেই মেয়েটির গলা, যেটা আকাশের সঙ্গে মিশে আছে।

“চিঠিগুলো ঠিকানাহীন, কারণ তুই নিজেই জানিস না কোথায় দাঁড়িয়ে আছিস। কিন্তু আমি তোর পাশেই ছিলাম, আছি।”

আচমকা অ্যালবামের পাতাগুলো যেন একসঙ্গে উলটে যেতে থাকে বাতাসে, পাতার পর পাতা উড়ে যায় মেঝেতে, বিছানায়, জানালার ধারে। প্রতিটি পাতায় টুকরো টুকরো মুখ, হঠাৎ দেখা চোখ, চেনা চেহারার ছায়া। আর তারপর একটা পাতা থেমে যায় — তাতে শুধু একটা বন্ধ জানালার ছবি, আর তার নিচে লেখা—

এই ছবিটার ওপারে আমি আছি।”

অনুরাধা তাকিয়ে থাকে সেই জানালার দিকে — মনে হয়, সেটা তারই ঘরের পূর্বদিকের জানালা। সে উঠে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দেয় — জানালার বাইরে শুধু অন্ধকার। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, সেই ফাঁকা আকাশে একটা বিদ্যুৎ চমকায় — আর সে স্পষ্ট দেখে একটা মুখ, তার নিজেরই মুখ, কিন্তু চোখে সেই মেয়ে, সেই ছায়া।

তখনই তার মনে হয় — এই অ্যালবামটা শুধু আকাশের স্মৃতি নয়, ওর নিজের হারানো অংশও। এবং এই চিঠিগুলো, যেগুলোর কোনও ঠিকানা নেই — সেগুলো যেন সেইসব অনুভূতির চিঠি, যা সে কোনোদিন কাউকে বলেনি। এখন সেই চিঠি ফিরে আসছে।

ঘরে হঠাৎ আলো ফিরে আসে। ঘড়ির কাঁটা চলতে শুরু করে। বাইরে হাওয়া বইছে।

কিন্তু অনুরাধার ভিতরে যেন এক দরজা খুলেছে — এক অতল আঁধারের দরজা, যেখানে আকাশ, নীল জামার মেয়ে, আর সে—তিনজনেই একসঙ্গে অপেক্ষা করছে, সময়ের ওপারে একটা শেষ কথার জন্য।

পর্ব ৫: ছবির আড়ালে দাঁড়িয়ে

ছবির পাতাটা যেন কাঁপছিল তার হাতে। জানালার ফ্রেমের মধ্যে যে মুখ সে দেখেছিল, সেটা শুধু তার প্রতিবিম্ব নয়—সেই চেহারায় এমন কিছু ছিল, যা অনুরাধার খুব চেনা, অথচ স্বীকার করা কঠিন। এ যেন নিজের ছায়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন পর মুখোমুখি হওয়া, যাকে এড়িয়ে গেছে বছরের পর বছর। অ্যালবামের পাতাগুলো এখন এলোমেলো বিছানায় ছড়িয়ে, জানালার ওপারে ঝোড়ো হাওয়া, আর ঘরের ভেতরে এক অদৃশ্য অস্তিত্ব। ঠিক যেন কেউ আড়াল থেকে দেখছে, কারও নিঃশ্বাস পড়ছে ঘাড়ে।

সে আবার হাত রাখে সেই পাতায়—যেখানে লেখা ছিল, “এই ছবিটার ওপারে আমি আছি।” এবার সে ছবির মধ্যে ঢুকতে চায়, জানতে চায়, কে এই “আমি”? আকাশ? নাকি সেই মেয়েটি?

ছবিটা আবার তুলে ধরে চোখের সামনে। ছবি নয়, যেন একটা দরজা। হঠাৎ কাঁচের জানালায় শব্দ হয়—টিপটিপ করে জল পড়ার শব্দ, অথচ বাইরে বৃষ্টি নেই। কাচটা ঘোলাটে হয়ে আসে। অনুরাধা ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে কাচ—আঙুলে ঠাণ্ডা জলের ছোঁয়া। আর ঠিক তখনই সে দেখে কাচের ওপারে, ছবির ভেতরে—এক ছায়ামূর্তি। খুবই ধোঁয়াটে, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে—চুপ করে তাকিয়ে।

“তুই কি আকাশ?” অনুরাধা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।

কোনও জবাব নেই। কেবল সেই মুখটা একটু এগিয়ে আসে—এবার চোখ দেখা যায়। দুটো গভীর চোখ, যেগুলো যেন তার ভেতরের গোপন কিছু জেনে গেছে। এই চাহনি সে একবারই দেখেছিল—যেদিন আকাশ বলেছিল, “তুই যখন কথা বলিস না, তখনও তোর চোখ কথা বলে।”

ছোটবেলার সেই মুহূর্ত হঠাৎ ফিরে আসে—ছাদের কিনারায় বসে সে, রোদে শুকনো জামার গন্ধ, পাশে আকাশ বলছে, “আমরা যদি হারিয়ে যাই, তখন কে খুঁজবে আমাদের?”
সে বলেছিল, “ছবি তুলে রাখব। ছবি তো হারায় না।”
আকাশ মুচকি হেসে বলেছিল, “ছবি সব মনে রাখে?”

আজ তার মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, ছবি সব মনে রাখে—কেবল মানুষ ভুলে যায়।

সে আবার অ্যালবামের দিকে তাকায়। এবার পাতার পেছনে একটা কাগজ আটকে থাকতে দেখে। টেনে বের করে দেখে—সাদা কাগজ, কিন্তু আলোতে একটা জলছাপ দেখা যায়—ছোট হাতে আঁকা একটা স্কেচ, দুটো মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, আকাশের নিচে। নিচে লেখা—“আমরা থাকব, যদি কেউ মনে রাখে।”

আবার সেই গলা—এবার আরও কাছাকাছি, যেন বাঁ পাশে কেউ দাঁড়িয়ে।
“তুই অ্যালবামটা খুলেছিলি, মানে তুই চাইছিস আমাকে ফিরে পেতে। কিন্তু আমি ফিরতে পারব যদি তুই আমাকে দেখতে পারিস।”

“আমি তো দেখছি তোকে,” অনুরাধা কাঁপা গলায় বলে।

“না,” গলার স্বরটা আরও কোমল হয়ে আসে, “তুই আমাকে দেখছিস না। তুই দেখছিস আমার ছায়া। আমি লুকিয়ে আছি ছবির আড়ালে।”

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আসে। আয়নার কাঁচে জমে জল, বইয়ের পাতা নড়ে উঠে পড়ে যায়, ঘড়ির কাঁটা আবার থেমে যায়।

অনুরাধা ধীরে ধীরে অ্যালবামটা বন্ধ করে দেয়। তারপর আবার খোলে—এইবার সোজা গিয়ে দাঁড়ায় সেই পাতায়, যেখানে আকাশের একমাত্র ক্লোজ-আপ ছবি আছে। সাদাকালো, চোখে রোদচশমা, ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি।

সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলে, “তুই যদি এখনো আছিস, তাহলে তুই একবার হাত বাড়া।”

ছবির কিনারায় তার আঙুল রাখতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া ওঠে, আর তখনই ছবির ডানদিকে একটা ছায়া নড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে, প্রায় অদৃশ্য ভাবে, একটা আঙুল দেখা যায়—ছবির আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা কারও আঙুল, যেন চুপচাপ অপেক্ষা করছিল কারও ছোঁয়ার।

“আমার চোখের আড়ালেই ছিলি,” অনুরাধা ফিসফিস করে বলে।

ছবিটা এবার হালকা নীল আলোয় ঝলসে ওঠে—ছবির আকাশে উড়তে থাকে ছেঁড়া কাগজের মতো মেঘ, আর তাদের মাঝখান দিয়ে ফুটে ওঠে সেই নীল জামার মেয়েটি। তার মুখ এখন পুরোপুরি পরিষ্কার—এটা অনুরাধার ছোটবেলার চেহারা। সে যেন ছবি থেকে তাকিয়ে বলছে, “তুই নিজেকেই ভুলে গেছিস, অনু।”

ঘরের বাতাস হঠাৎ থেমে যায়। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে সে, আর তার মনে হয়—এই অ্যালবামটা শুধু আকাশকে ধরে রাখেনি, এটাতে তার নিজেরই একটা অংশ আটকে আছে।

ছবির আড়াল থেকে এবার সেই কণ্ঠ আবার আসে—“তুই যদি সব মনে করিস, আমি তোর সামনে আসব। তুই যদি ভুলে যাস, আমি আড়ালেই থেকে যাব, অনু।”

পর্ব ৬: ভেসে থাকা স্মৃতি

ঘরের বাতাসে অদ্ভুত এক স্থিরতা। যেন শব্দেরা গা ঢাকা দিয়েছে, ঘড়ির কাঁটা পেছনের দিকে হাঁটছে। অনুরাধা ধীরে ধীরে বসে পড়ে অ্যালবামের সামনে, মনে হয় সময় থেমে আছে, কেবল পাতাগুলো নড়ছে নিজের ইচ্ছায়। প্রতিটি পাতায় গাঢ় হয়ে উঠছে রং, স্পষ্ট হচ্ছে মুখ, আর কানে কানে বাজছে সেই চেনা গলা—“ভুলে যাস না, অনু, আমরা একসাথে ছিলাম।”

তার সামনে খোলা পাতায় এখন যে ছবিটা, সেটা একটা ঘরের ভিতরের দৃশ্য—আলোকচিত্রে গৃহস্থালি জিনিস, খাটের পাশে বইয়ের স্তূপ, দেয়ালে এক ঝাঁক শিশুর আঁকা ছবি, আর এক কোণে রাখা একটা টেবিল ফ্যান। কিন্তু এই ছবিটার মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে এক অনুভব—মনে হয় এখানে কোনও কিছু ঘটে গেছে, কোনও কথা থেমে গেছে, যা বলা হয়নি।

ছবির ডানদিকে এক কোণে খুদে হরফে লেখা—আগস্ট ২০০০, বর্ষা”

বর্ষা মানেই তখন অনুরাধার মনে পড়ত—ভেজা জামাকাপড়, স্কুল ছুটি, আর ছাদে গিয়ে আকাশের সঙ্গে ঘুড়ি উড়ানোর দিন। আর সেই বর্ষার এক বিকেলে আকাশ হঠাৎ করেই বলেছিল, “আমি হারিয়ে যাব, অনু। যদি কখনও কেউ জিজ্ঞেস করে আমি কোথায়, বলিস—আমি আছি ছবির ভেতরে, যেখানে বৃষ্টির গন্ধ লুকিয়ে থাকে।”

সে সময় হাসি পেয়েছিল অনুরাধার। আকাশ সবসময় এ রকম কথা বলত। কিন্তু আজ, এত বছর পর, সে বুঝছে—সেই কথাগুলো শুধু খেলা ছিল না, ছিল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।

অ্যালবামের পাতার নিচে একটা হলুদ কাগজ ঠেকল তার হাতে। ভাঁজ খুলতেই দেখা গেল, এটা একটা ডায়েরির পৃষ্ঠা—লেখা কিশোরসুলভ কাঁচা হাতে—
আজ আকাশ বলল, যদি আমরা বড় হয়ে একে অপরকে ভুলে যাই, তাহলে এক অ্যালবাম বানাবো—যেখানে শুধুই আমাদের স্মৃতি থাকবে। ওইটাই আমাদের ঠিকানা হবে।”

লিখেছে সম্ভবত অনুরাধা নিজেই। কিন্তু তার তো এমন কোনও স্পষ্ট স্মৃতি নেই! কবে লিখেছিল, কোথায় রেখেছিল, কেন হারিয়ে গিয়েছিল—কিছুই মনে নেই।

সে এখন অনুভব করছে, তার অতীত ভেসে উঠছে এক একটা স্তরে। এই অ্যালবাম যেন একটা নদী, যেখানে সময় নয়, স্মৃতি ভাসে। আর সেই স্মৃতির জলে আকাশের ছায়া কখনও পরিস্কার, কখনও ঝাপসা।

ঠিক সেই সময় টেবিলের উপর রাখা পেনস্ট্যান্ড নড়ে ওঠে। ভেতরের কলমগুলো পড়ে যায়। টুপটাপ শব্দ—আর তারপর জানালার পর্দা নিজে থেকেই সরে যায়। সেই জানালার ওপাশে, দূরে, যেন কেউ দাঁড়িয়ে—ছায়া ছাড়া আর কিছুই বোঝা যায় না, কিন্তু তার অস্তিত্ব যেন অনুরাধার হৃদয়জুড়ে গাঁথা।

সে ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে জানালার কাছে আসে। এবার ছায়াটা স্পষ্ট—এক কিশোরের অবয়ব, মাথা নিচু, যেন তার উপস্থিতির জন্য দুঃখিত। হাওয়ায় কাঁপে তার শার্টের কলার, আর সে ফিসফিস করে—“আমায় একবার শুধু মনে কর, আমি ফিরব।”

অনুরাধা জানে এটা তার মনের ভুল নয়। কিছু একটা সত্যিই আছে, যা কেবল স্মৃতির মধ্যে নয়, ছবির গভীরেও বাস করছে। সে আবার ফিরে যায় অ্যালবামের কাছে। এক এক করে ছুঁয়ে দেখে প্রতিটি ছবি, আর অনুভব করে—এইসব ছবির পেছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য কথা, যা কেউ কোনদিন বলেনি। প্রতিটি মুখ যেন ফিসফিস করে, “আমরা ছিলাম, অনু, তুই ভুলে গেছিস।”

তখনই হঠাৎ চোখ পড়ে এক ছবিতে—একটা কাঠের দোলনায় বসে এক মেয়ে, তার মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু পায়ের নিচে ভিজে মাটি, আর পেছনের আকাশ পুরোপুরি কালচে। ছবিটার নাম নেই, তারিখ নেই, কিছুই লেখা নেই।

কিন্তু এই ছবি দেখে অনুরাধার মনে হয়—এটাই সেই শেষদিনের ছবি। যেদিন আকাশ হঠাৎ চলে যায়, আর কেউ তাকে খুঁজে পায় না। এই ছবির সময়ই সে আঁচ করতে পেরেছিল, আকাশের মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে—সে আর আগের মতো ছিল না।

এবার ছবিটার ভেতর থেকে একটা শব্দ আসে—দুলুনি দুলুনি দুলুনি…

মনে হয়, মেয়েটা দোলনায় বসে দুলছে, ধীরে ধীরে, সময়ের বাঁকে হারিয়ে যেতে যেতে।

অনুরাধার চোখ দিয়ে নেমে আসে জল। সে ফিসফিস করে বলে—“তুই কোথায় আকাশ? আমি খুঁজছি তোকে। আমার সব ভুলে যাওয়াকে পার করে আমি তোকে মনে রাখছি। তুই ফিরবি?”

বাতাস থমকে থাকে। ঘরের মধ্যে কেবল একটিই শব্দ—অ্যালবামের পাতাগুলোর আস্তে আস্তে উলটে যাওয়ার শব্দ, যেন কেউ পেছনে দাঁড়িয়ে পাতাগুলো ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

আর সেই পাতার ফাঁকে ফাঁকে ভেসে আসে গলা—
“তুই আমাকে যত মনে রাখবি, আমি ততই আসবো সামনে। আমি তো হারাইনি, অনু। আমি আটকে আছি, তোর ফেলে রাখা স্মৃতির জলে। তুই শুধু ডুব দে।”

পর্ব ৭: আকাশের মুখটা কেমন ছিল?

ঘরটা নিঃস্তব্ধ, ঠিক যেমনটা হয় কোনও পুরনো গ্রন্থাগারের গভীর ভেতরে, যেখানে পৃষ্ঠার শব্দই একমাত্র জীবন্ত সঙ্গী। অনুরাধা ধীরে ধীরে আবার অ্যালবামের কাছে ফিরে আসে, যেন ছবিগুলোর সঙ্গে আরেকবার বোঝাপড়া করে নিতে চায়। এতদিন ধরে সে আকাশের ছায়া খুঁজেছে—তার গলার ফিসফিস, তার চিঠি, তার ছায়ামূর্তি—সবই পেয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস এখনও ঝাপসা—তার মুখ।

আকাশের মুখটা ঠিক কেমন ছিল?

ছবিগুলোর ভেতরে থাকা ছেলেটি বারবার দেখা দিয়েছে নানা রূপে—পেছন ফিরে, মুখ আড়াল করে, চোখে চশমা পরে, ছায়া হয়ে। কিন্তু একটা ছবিতেও তার মুখটা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। যতই দেখার চেষ্টা করে, ততই যেন মুখটা মুছে যেতে থাকে।

অনুরাধা নিজেকে জিজ্ঞেস করে—সত্যিই কি সে ভুলে গেছে সেই মুখটা? নাকি ছবিগুলিই তার স্মৃতিকে আড়াল করে রেখেছে?

সে ভাবে, ছোটবেলায় তাদের যে খেলাটা ছিল, তাতে কেউ একজন চোখ বন্ধ করে দাঁড়াত, আর অন্যজন পেছন থেকে ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করত, “বলতো আমি কে?” আকাশ কখনও ভুল করত না, অথচ অনুরাধা প্রায়ই মিস করত। সে হাসত, বলত, “তুই আমার চোখে না, স্পর্শে ধরা দিস।”

এখন মনে হচ্ছে, সেই স্পর্শটাই হারিয়েছে।

সে আবার খোঁজে—একটার পর একটা ছবি। পেছনের লেখা, ডায়েরির পাতাগুলো, ছেঁড়া কাগজ। তারপর হঠাৎ দেখতে পায় একটা সাদা পাতায় কাঁচা পেনসিলে আঁকা একটা মুখ—একটা ছেলের মুখ, চোখ দুটো বড়, চুল এলোমেলো, ঠোঁটে টুকটাক রেখা। নিচে লেখা—আমি এভাবেই তোকে দেখি”

তাকে কাঁপিয়ে দেয় এই লাইনটা। কে লিখেছিল? আকাশ? নাকি সে নিজে?

ছবিটার পাশে ছোট করে লেখা তারিখ—“১২ আগস্ট, ২০০১”।

সেই তারিখটা মনে পড়ে। সেদিন বিকেলে সে তার ডায়েরিতে লিখেছিল—“আজ আকাশ খুব কাঁদছিল। বলল, কেউ তার মুখ মনে রাখবে না। আমি বললাম, আমি আঁকব তোর মুখ, যতবারই ভুলে যাব, ততবারই আবার আঁকব।”

তবে কি এই স্কেচটা তারই আঁকা?

সে নিজের অজান্তেই সেই পাতায় হাত বুলিয়ে চলে যায়। মনে হয়, ছেলেটার চোখের ভেতর ঢুকে যেতে পারে—যেখানে জমে আছে অভিমান, অপেক্ষা, না বলা কথা।

ঠিক তখনই জানালার বাইরে থেকে একটা শব্দ আসে—টিক…টিক…টিক…

বৃষ্টির ধারা? না, কারও পায়ের ছাপ?

সে জানে না। সে শুধু জানে, আজ রাতে কোনও একটা মুখ তাকে দেখতে চাইছে। কোনও একটা নাম চায় ফিরে পেতে।

সে বিছানায় বসে পড়ে, হাতের কাছে নিয়ে নেয় অ্যালবাম, ডায়েরি, স্কেচ, চিঠি। চোখ বুঁজে একটা ছবি তোলে, এরপর আরও একটা, তারপর আরও। প্রতিটি মুখ এখন এক একটা প্রতিফলন—ছোটবেলার বন্ধু, খেলার সঙ্গী, গানের পিঠে লেখা নাম, চিঠিতে থাকা চোখের জল।

কিন্তু আকাশ?

তার মুখ কেবল আঁকা কল্পনায়। বাস্তবের ছবিগুলো যেন কুয়াশার পর্দা টেনে রেখেছে।

“তুই কি চাস না আমি তোকে দেখি?” সে ফিসফিস করে।

পেছন থেকে বাতাস আসে, কানে বাজে সেই গলা—
“তুই যদি মুখ দেখিস, তুই আমায় হারাবি। আমি মুখ নয়, আমি স্মৃতি।”

এই উত্তরে চমকে যায় সে।

“তুই চাইছিস আমি তোকে ভুলে না যাই, আবার তুই নিজেই মুখ লুকিয়ে রাখছিস?”

“কারণ মুখের স্মৃতি ফিকে হয়ে যায়, কিন্তু অনুভব থেকে যায়। তুই অনুভব কর, অনু, দেখবি আমি আছি।”

অনুরাধার মনে পড়ে, আকাশ কখনওই বেশি কথা বলত না। তার সঙ্গে সময় কাটানো মানে ছিল—একসঙ্গে বসে থাকা, একসঙ্গে হাওয়া গোনা, অথবা শুধু চুপ করে থেকে কিছুর অপেক্ষা।

আজ সেই চুপ করে থাকা সময়েরই মুখ খুঁজছে অনুরাধা।

সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, নিজেকে দেখে। চোখের নীচে ক্লান্তি, কপালে চিন্তা, আর ঠোঁটে একটুকরো কাঁপুনি। কিন্তু চোখের গভীরে?

সেখানে এক ছায়া, ঠিক যেন কারও চেনা মুখ তার চোখে লুকিয়ে আছে।

তখন সে বুঝে যায়—আকাশের মুখটা সে মনে রাখতে পারেনি, কারণ আকাশ নিজেই চেয়েছিল তাকে যেন অনুভবে ধরা যায়, ছবিতে নয়।

অ্যালবামের একটি পাতায় সে এবার নিজে লেখে—
তোর মুখ মনে নেই, তুই কি রাগ করবি? কিন্তু তোর ছোঁয়া, তোর গলা, তোর সেই নীল জামার মেয়ে, সব আজও আমার সঙ্গেই আছে।”

ঠিক তখন বাতাস থেমে যায়, জানালার পর্দা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, আর অ্যালবামের পাতাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে।

শেষ পাতায় এসে লেখা ফুটে ওঠে—
তুই যতবার আমাকে অনুভব করবি, ততবার আমি ফিরে আসব—মুখ ছাড়া, স্মৃতি হয়ে, আকাশ হয়ে।”

পর্ব ৮: ছেঁড়া দিনের সেলাই

রাতে ঘুম ভেঙে যায় অনুরাধার। ঘড়ির কাঁটা বলে, এখন ৪:১২। ঘরের বাতাস থেমে আছে, অথচ জানালার বাইরে হাওয়ার একটানা ফিসফিসানি শোনা যায়। যেন সেই ফিসফিসানি ছবির পাতা থেকে বেরিয়ে এসে তার কানে বলে—“ঘুমাবি না, আজ রাতটা স্মৃতি সেলাই করার।”

সে উঠে বসে পড়ে, লাইট জ্বালায় না। শুধু খোলা জানালার আলোয় বিছানায় ছড়িয়ে থাকা ছবি, চিঠি আর সেই স্কেচটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, এই সবকিছুকে জোড়া লাগাতে পারলেই হয়তো সেই মুখটা, সেই সময়টা, আর সেই হারিয়ে যাওয়া আকাশটা ফিরে আসবে।

তার মনে পড়ে, একবার আকাশ বলেছিল—“যদি কোনও দিন আমাদের সময় ছিঁড়ে যায়, তুই কি সেলাই করে নিতে পারবি?”
তখন সে হাসছিল, বলে, “সেলাই মানে?”
আকাশ বলেছিল, “মানে, টুকরো টুকরো মুহূর্ত জোড়া লাগানো। যেমন ছবি, গান, চিঠি, কিংবা এমনকি গন্ধ—যা দিয়ে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে আবার জোড়া লাগানো যায়।”

আজ, বহু বছর পর, সেই কথার মানে বোঝে অনুরাধা।

সে ডায়েরি খুলে লিখতে শুরু করে—
একটা দিন ছিল, যেদিন তুই আমার পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে হাওয়ায় হাত নাড়ছিলি। কিছু বলিসনি, তাও বুঝেছিলাম তোর মন খারাপ। আজ সেই দিনের একটা ছবি আমার মনে আছে, তাতে আলো ছিল কম, কিন্তু তোর পাশে আমি ছিলাম। এখন আবার সেই ছবি খুঁজে পাচ্ছি।”

তারপর সে ঘরের এক কোণে রাখা পুরনো ট্রাঙ্ক খুলে—যেখানে বহু পুরনো স্কুলের স্মারক, পুরনো জামা, আর কিছু রঙিন কাগজ রাখা। সেখান থেকে এক পুরনো ডায়েরি বের হয়, পাতায় পাতায় ছোট ছোট নোট—আর হঠাৎ এক পৃষ্ঠায় সে খুঁজে পায় কিছু লাইন—
আজ আমি আকাশের সঙ্গে একটা প্যাক্ট করলাম। যদি আমি ভুলে যাই ওকে, তবে আমার জন্য একটা অ্যালবাম বানাবে। আর যদি ভুলে যায়, আমি করব। এইভাবেই আমরা হারাব না।”

হাত কাঁপে।

তবে কি এই অ্যালবাম সে নিজেই বানিয়েছিল, নাকি আকাশ?

নাকি দুজনেই?

এবার সে সব ছবি একে একে বিছানায় সাজাতে শুরু করে—তারিখ অনুসারে, ঘটনাক্রমে। ছোটবেলার ছাদে বসা, স্কুলের ইউনিফর্ম, দোলনা, ঘুড়ি, রঙের বাক্স—সব। তারপর পাশে রাখে চিঠিগুলো, যেখানে লেখা আছে কথা না বলা কথাগুলো।

এ যেন এক কোলাজ তৈরি হচ্ছে—ছেঁড়া দিনগুলোর জোড়া।

হঠাৎ করেই আলো নেমে আসে ঘরে। জানালার কাঁচে গা ছমছমে একটা প্রতিফলন—কেউ দাঁড়িয়ে। এবার আর ছায়া নয়, এবার মুখ স্পষ্ট। চশমা ছাড়া, চুল এলোমেলো, কিন্তু চাহনি সেই আগের মতোই—ধীরে, গভীর, অনুরাধার ভেতরটা ছুঁয়ে যায়।

সে দাঁড়িয়ে পড়ে। বুকের মধ্যে ঢেউ উঠছে। মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোয় না।

ছেলেটি বলে না কিছু, কেবল চোখে এক ধরনের কৃতজ্ঞতা আর আশ্বাস—যেন বলছে, “তুই সেলাই করে ফেলেছিস, অনু। এবার আমি ফিরতে পারি।”

ছবিগুলো হঠাৎ নড়তে শুরু করে। একটার পর একটা ছবি যেন অ্যালবামের দিকে ফিরে যেতে চাইছে। পাতাগুলো নিজের মতো করে উলটে পড়ে, আর প্রতিটি ছবির নিচে লেখা হয়ে যাচ্ছে একেকটি লাইন—
আমি আছি। তুই যদি ভাবিস, আমি থামব না। তুই যদি ভুলে যাস, আমি এই অ্যালবামে থেকে যাব।”

অনুরাধা এবার হাসে। দীর্ঘদিন পর এমন এক হাসি, যা তার চোখের কোণে জল এনে দেয়। সে জানে—সবটা সে ফেরত পাবে না। আকাশ, তার ছোটবেলা, সেই বিশেষ একটা বিকেল—সবকিছু নয়। কিন্তু সে এতটুকু জানে—ছেঁড়া দিনগুলোকে সে সেলাই করে নিতে পেরেছে।

আর এখন, অ্যালবামের মাঝে বসে থাকা সেই মুখ—যাকে সে খুঁজছিল এতদিন—সে আর মুখ নয়, সে এক অনুভব, এক গন্ধ, এক অপেক্ষা।

সেই মুখ তার ভেতরে।

পর্ব ৯: অ্যালবামের শেষ ছবি

ঘরের আলো এখন নিঃশব্দ। অ্যালবাম খোলা আছে বিছানায়, পাতাগুলো থেমে গেছে। সমস্ত ছবি যেন তাদের জায়গায় ফিরে এসেছে—কিন্তু একটা পাতা এখনও ফাঁকা। শেষ পৃষ্ঠা। একেবারে শেষ। সেখানে কোনও ছবি নেই, কোনও লেখা নেই, কেবল হালকা হলদে হয়ে যাওয়া এক পাতার মাঝখানে সাদা দাগ। যেন কেউ ছবি কেটে তুলে নিয়ে গেছে, বা কোনও ছবি রাখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু রাখা হয়নি।

অনুরাধা বহুক্ষণ সেই পাতাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাথার মধ্যে অনেক কিছু ঘুরছে—আকাশের মুখ, সেই ফিসফিস গলা, ছেঁড়া সময়ের টুকরো, আর নিজের ভেতরের গোপন দাগগুলো। এই ফাঁকা পাতাটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই জায়গাটায় সে এখনও পৌঁছায়নি। এই পাতাটা হতে পারে স্মৃতি আর বর্তমানের মাঝের এক শেষ সেতু।

সে চোখ বুজে ফেলে। ভাবতে চায়—সেই দিনটা, যেদিন আকাশ হঠাৎ চলে যায়, সেদিন সে কী করেছিল? কী দেখেছিল?

ভেসে ওঠে এক বিকেলের ছবি। চারপাশে বৃষ্টি পড়ছে, ছাদের এক কোনে দাঁড়িয়ে আকাশ, এক হাতে রঙিন ঘুড়ি। সে কিছু বলছে না। ঠোঁট নড়ে, কিন্তু শব্দ নেই। অনুরাধা দূর থেকে তাকিয়ে আছে, ভয় পাচ্ছে কাছে যেতে। কারণ আগের দিন আকাশ বলেছিল—“যদি আমি আর না থাকি, তুই কী করবি?”

সে রেগে গিয়ে বলেছিল, “এমন কথা বলিস না।”
আকাশ মুচকি হেসে বলেছিল, “তোর রাগটাই আমার সবচেয়ে আপন।”

তারপর যেন অনেক কিছু দ্রুত ঘটেছিল—পরদিন সকালে শুনেছিল আকাশ নেই। বাড়িটা ফাঁকা, দরজায় তালা, কেউ কিছু জানে না।

কিন্তু সেই দিনটার কোনও ছবি নেই তার কাছে। আর হয়তো তাই এই পৃষ্ঠা ফাঁকা।

অনুরাধা এবার উঠে পড়ে। একটা সাদা কাগজ আনে, একটা পুরনো স্কেচপেন। তারপর নিজের মতো করে আঁকতে শুরু করে—একটা বিকেলের আকাশ, তাতে ঝাপসা মেঘ, একটা ঘুড়ি উড়ছে, আর এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা—পেছন ফিরে আছে, কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে আরেকটা অবয়ব—ছায়ার মতো, হালকা, যেন বাতাসের গায়ে আঁকা।

তারপর সেই ছবিটার নিচে সে লেখে—
এই ছবিটা তোর জন্য, আকাশ। আমি তোকে হারাইনি, শুধু ঠিক করে দেখিনি।”

ছবিটা সে সযত্নে অ্যালবামের শেষ পাতায় আঠা দিয়ে সেঁটে দেয়। পৃষ্ঠাটা একটু ভারী হয়ে যায়, যেন সে নিজেই তার অতীতের সঙ্গে একটা প্রতিশ্রুতি বেঁধে দিল।

হঠাৎ সেই ফাঁকা পৃষ্ঠার নিচে আলতো করে একটা শব্দ হয়—চিকচিক শব্দ, যেন পাতার নীচে কিছু লুকিয়ে ছিল। সে হাতে চাপ দিলে একটা পাতলা কাগজ বেরিয়ে আসে। হলুদ রঙা, ঝাপসা অক্ষরে লেখা—

তুই যদি কখনও অ্যালবামের শেষ পাতায় আমার একটা ছবি আঁকিস, জানবি আমি ফিরে আসতে পেরেছি। আমি তোকে ছেড়ে যাইনি, অনু, তুই আমায় ফিরিয়ে এনেছিস।”

চোখে জল আসে অনুরাধার। ঘর নিস্তব্ধ, কিন্তু মনে হয় যেন দূর থেকে কেউ হাঁটছে তার দিকে—পায়ের শব্দ নেই, কিন্তু উপস্থিতির ভার আছে।

সে জানালার দিকে তাকায়, হাওয়ার পর্দা নড়ে ওঠে না আজ। বাতাস থেমে, শব্দ থেমে, কিন্তু তার ভেতরে একটা শান্তি—যা কেবল সেই চেনা কারও ফিরে আসায় হয়।

অ্যালবামের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত সে ঘুরে দেখে। এবার আর কোনও ছায়া নেই, কোনও ফাঁকাও নেই। প্রতিটি ছবি যেন তার সত্যিকার জায়গায়।

শেষ পৃষ্ঠার ছবিটার দিকে সে আবার তাকায়—ছেলেটা পেছন ফিরে থাকলেও এখন মনে হয়, তার মুখটা সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। মনে হয়, আকাশ আজ কোনও ছবি থেকে নয়, তার ভেতর থেকে ফিরে এসেছে।

সে চুপ করে বলে—“এই ছবিটা তোর, আকাশ। আর এই অ্যালবামটা—আমাদের।”

ঠিক তখনই অ্যালবামের মলাট হালকা করে নিজে থেকে বন্ধ হয়ে যায়।

পর্ব ১০: তোমার নাম আকাশ ছিল না?

অ্যালবামটা আজ তার বুকশেলফে, প্রথম সারির মাঝখানে রাখা। মলাটটা একটু ভারী লাগছে, যেন তাতে শুধু ছবি নয়, স্মৃতির ওজনও জমে আছে। অনুরাধা মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকে তার দিকে, ছোঁয় না, কিন্তু জানে—ভেতরে যা আছে, তা আর শুধু কল্পনা নয়।

তবু কোথায় যেন এক ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কোনও এক প্রশ্ন যেন অ্যালবামের মলাটের বাইরে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছে।

সে একদিন সকালবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল। মনে হল, আকাশ তার ভেতরে ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু আকাশ কি শুধুই একটা মানুষ ছিল? নাকি সেইসব মুহূর্তের নাম, যেগুলো সে নিজেই ফেলে এসেছিল পেছনে?

তখন তার মনে এল সেই প্রশ্ন—তোমার নাম আকাশ ছিল না?

কার উদ্দেশে প্রশ্নটা? সেই ছেলেটির, যে একদিন ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে হারিয়ে গিয়েছিল? নাকি সেই স্মৃতিটার, যেটা তার ভেতরে জন্ম নিয়েছিল মুখহীন এক অবয়ব হয়ে?

সে আবার একদিন অ্যালবামটা খোলে। এবার সরাসরি যায় শেষ পাতায়। ছবিটার নিচে হালকা করে দেখা যায়—কালচে হয়ে আসা অক্ষর ফুটে উঠেছে, যেটা সে আগে দেখেনি। লেখাটা তার নিজের হাতের লেখা নয়—

আমার নাম আকাশ নয়, অনু। আমি সেই নীল জামার মেয়েটি। যে তোর ভেতরে থাকত। তুই যে আমাকে এত বছর ভুলে গিয়েছিলি, আমি তারই ছায়া। আমি ছিলাম তোর নির্জনতা, তোর ফেলে রাখা গান, তোর আঁকা কিন্তু না শেষ হওয়া ছবি। আকাশ আমার নাম ছিল না। কিন্তু তুই আমায় নাম দিয়েছিলি, কারণ তুই একা ছিলি। এবার যদি আমাকে চিনে থাকিস, আমি হারিয়ে যাব। কারণ আমি তোকে মনে করাতে এসেছিলাম—তুই কে ছিলি।”

অনুরাধা চুপচাপ বসে পড়ে।

হয়তো এতদিন ধরে সে যাকে আকাশ ভেবে এসেছে, সে কোনও এক ছেলেবেলার বন্ধু নয়—বরং তার নিজেরই ভেতরের একটা টুকরো, যেটা সে ফেলে রেখে এসেছিল বড় হয়ে যাওয়ার তাড়ায়।

হয়তো সেই নীল জামার মেয়েটিই আকাশ হয়ে তার পাশে থেকেছে—কখনও একা একা গল্পে, কখনও আঁকায়, কখনও নিঃসঙ্গ চিঠির পাতায়।

আকাশ যদি তার দেওয়া নাম হয়, তাহলে আসল নাম কি ছিল?

সে হয়তো কোনও নামই ছিল না—শুধু একটা অনুভব, একটা আত্মার অংশ, যা সময়ের ধুলোয় চাপা পড়েছিল।

অনুরাধা এবার জানে, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। কিছু উত্তর শুধু অনুভবের মধ্যে থাকে, কিছু উত্তর দিতে হয় চোখ বন্ধ করে।

সে অ্যালবামটা বন্ধ করে রাখে, তারপর আলমারির ওপরে একটা ছোট্ট কাঠের বাক্সে তুলে দেয়। সেটা আর প্রতিদিন ছুঁয়ে দেখতে হবে না, কারণ এখন সে জানে—অ্যালবাম তার বাইরে নয়, তার ভেতরে।

রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশে তারা নেই, শুধু গভীর নীল। একটা সময় ছিল, যখন সে এই রঙকে ভয় পেত—এখন সেই রঙ তাকে শান্ত করে।

চোখ বুজে সে ফিসফিস করে বলে—“তোর নাম যদি আকাশ না-ও হয়, তবু আমি জানি, তুই ছিলি। তুই আছিস।”

আর আকাশের ভিতর থেকে যেন ভেসে আসে এক গলা—
তুই যখন ভুলিস না, তখন আমি হারাই না, অনু। আমি তোর ভিতরের সেই চুপ থাকা আকাশ, যা সব বলে—শব্দ ছাড়াই।”

সমাপ্ত

WhatsApp-Image-2025-06-23-at-5.25.49-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *