অরিজিৎ দে
পর্ব ১: কুসুমবাড়ির ডাইনি
পাহাড়ের কিনারে ছুঁয়ে বইছে জলঢাকা নদী। নদীর পাড়ে একটা গ্রাম—ছোট্ট, চুপচাপ, নাম তার কুসুমবাড়ি। দিনের বেলা গাছেদের ছায়ায় এখানে শিশুরা খেলে, বুড়োরা বিড়ি টানে আর মহিলারা কলতলায় গান ধরে। কিন্তু রাত নামলে? রাত নামলে কুসুমবাড়ি নিঃশব্দ হয়ে যায়। যেন কেউ বা কিছু পুরো গ্রামটাকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়।
এই কুসুমবাড়িতেই এসেছেন কমলিনি বসু। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি লোককাহিনি নিয়ে গবেষণা করছেন। তার বিষয়—“উত্তরবঙ্গের নারী-কেন্দ্রিক অপ্রাকৃত লোককাহিনির সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।” বলতে গেলে, ভূতের গল্প নিয়ে গবেষণা। কিন্তু তিনি বলেন, “আমি গল্প খুঁজি, ভূত না। গল্পের পেছনে লুকিয়ে থাকা সমাজকে দেখাই আমার কাজ।”
গ্রামে পৌঁছে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো একটি পুরনো টালির ঘরে। বাইরের বারান্দায় ধূলিধূসরিত একটা কাঠের টেবিল, পাশে একটা কদমগাছ। সেই কদমগাছের নীচে দাঁড়িয়ে গ্রামের এক প্রবীণ লোক তাঁকে বলল, “এই বাড়িটাই নিরাপদ। বাকি সবখানে রাত হলে… ছায়া পড়ে না।”
“ছায়া পড়ে না?” কমলিনি কপালে ভাঁজ ফেললেন।
“হ্যাঁ দিদিমণি,” ছেলেটা নাম রিঙ্কু, বলে উঠল, “ডাইনিটার পায়ে নাকি তামার নূপুর। আর তার ছায়া মাটিতে পড়ে না। লোক বলত, ওর চোখে তাকালেই মানুষ পাথর হয়ে যায়।”
“আর আপনি সেটা বিশ্বাস করেন?” কমলিনি একটু ব্যঙ্গ করেই বললেন।
রিঙ্কু কিছু বলল না। মাথা নিচু করে বলল, “আপনার জানলার নিচে তামার শব্দ পেলে ডাকবেন না, দিদিমণি। ও ফিরে এসেছে।”
রাতটা প্রথমে স্বাভাবিকই কেটেছিল। কমলিনি তাঁর রেকর্ডার, ল্যাপটপ, আর নোটবুক খুলে সাজিয়ে গবেষণার প্ল্যান করছিলেন। জানলা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিল, দূরের পাহাড় থেকে ঝিঁঝিঁর ডাক আসছিল। কিন্তু হঠাৎ—একটা ঝমঝম আওয়াজ। যেন ধাতব কিছু মাটি ছুঁয়ে হেঁটে চলেছে।
তিনি জানলার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলেন। প্রথমে কিছুই বোঝা গেল না। তারপর অন্ধকারে ধীরে ধীরে একটা ছায়া এগিয়ে এলো। একটা নারী অবয়ব—গায়ে সাদা কিছু একটা, লম্বা চুল, পা ন্যাংটো নয়, তাতে ঝমঝমে কিছু—তামার নূপুর? সে ধীরে ধীরে পাশের কদমগাছের তলায় দাঁড়াল।
হাতের টর্চটা জ্বালিয়ে বাইরে ফেলতেই সে ছায়া হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। কোনো চিহ্ন নেই, শুধু বাতাসে একটা গন্ধ—পুরনো ধূপ আর ভেজা মাটির গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করল।
সকালে গ্রামের প্রবীণ লোকটির সঙ্গে কথা বলতেই সে বলল, “তুমি যে জানলা দিয়ে তাকিয়েছিলে, সেটা ভালো করো নি। সেই জানলা দিয়ে একসময় রানীমা ঝাঁপ দিয়েছিলেন। লোক বলে, সেই রানীমাই নাকি ডাইনি হয়েছেন।”
“রানীমা কে?” কমলিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“এই কুসুমবাড়ির জমিদারবাড়ির বউ ছিলেন। নাম ছিল—তৃষা। স্বামী তাঁকে পাগল বলে বন্দি করে রেখেছিলেন। আর একরাতে, ঝড়ের মধ্যে, রানীমা সেই কদমগাছের তলা দিয়ে হেঁটে… নদীতে ঝাঁপ দেন। তারপর থেকে, যাদের চোখে চোখ পড়ে তার, তারা…”
লোকটা থেমে গেল। একটা পাথর মুঠোয় চেপে ধরল।
“তবে কি, এই কুসুমবাড়ি সত্যি অভিশপ্ত?” কমলিনি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পান না।
তবে এক জিনিস নিশ্চিত—এই গবেষণার নাম হতে চলেছে তামার পায়ের ছায়া। আর তার প্রথম পাতাতেই লেখা থাকবে,
“এই ছায়া পড়ে না। কারণ এর উৎস—অন্ধকার।”
পর্ব ২: কদমগাছের নিচে ছায়া
সকালের রোদ গায়ে মেখে কমলিনি বসে ছিলেন সেই কদমগাছের নিচে। একহাতে ডায়েরি, অন্যহাতে কলম। কিন্তু মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে রাতের সেই ছায়া। যে চোখে চোখ পড়তেই যেন হাওয়ায় গন্ধ বদলে যায়, হাড়ের মধ্যে কাঁপুনি নামে, এবং যার পায়ে বাজে সেই তামার নূপুর—কিন্তু যার ছায়া পড়ে না।
“আপনি ঘুমাতে পারেননি, তাই না?”—পেছন থেকে প্রশ্নটা এল রিঙ্কুর। ওর চোখের নিচে কালি, মুখ থমথমে। এক হাত চুলে আঁচড় দিতে দিতে পাশে এসে বসল।
“তুমি কি জানো সেই নারী কে? যে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল?” কমলিনি ডায়েরি বন্ধ করলেন।
রিঙ্কু ধীরে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, অনেক কিছু শুনেছি। আমার ঠাকুরদা জমিদারবাড়ির মালী ছিলেন। উনি বলতেন, রানীমা তৃষা ছিল অন্যরকম। চুপচাপ। কথা বলতেন গাছের সঙ্গে। ফুলগাছ ছুঁয়ে থাকতেন সারাদিন। লোকজন বলত, ওর মধ্যে বোধহয় কিছু ঢুকে গেছে।”
“ঢুকে গেছে? মানে?” কমলিনির কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।
“গ্রামের লোকজন বলে, পাহাড়ি দেবতা নাকি ওকে বশ করে নিয়েছিল। মাঝেমাঝে রাতে সে উঠে যেত অরণ্যে। আর ফিরে এসে বলত—‘ও বলেছে, জল চাই।’ জমিদারবাবু প্রথমে পাত্তা দেননি। পরে যখন রানীমা রাজবাড়ির পুরনো গোপন সিঁড়ির নিচে একটা পাথরের মূর্তির সামনে ধূপ জ্বালাতে শুরু করেন, তখন উনি ওঁকে পাগল বলে তালাবন্দি করেন।”
কমলিনি গভীর মনোযোগে শুনছিলেন। পাথরের মূর্তি? গোপন সিঁড়ি? এই কুসুমবাড়িতে সত্যিই তো ইতিহাস চাপা পড়ে আছে।
“তুমি কি আমাকে রাজবাড়িটা দেখাতে পারবে?” তিনি হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন।
রিঙ্কু একটু ইতস্তত করল। “সন্ধে না হলে যাই। এখন গেলে… কিছু দেখা যায় না। গাছগুলো খপ করে ধরে রাখে। আর রাত নামলে—”
“আমি যুক্তিবাদী, রিঙ্কু। ভূতের গল্প শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু বিশ্বাস করি না।”
“তাহলে রাত্রে ওকে কেন দেখলেন?”
রিঙ্কুর প্রশ্নে একটু চুপ মেরে গেলেন কমলিনি।
সন্ধে নাগাদ রিঙ্কু আর কমলিনি হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালেন পুরনো রাজবাড়ির সামনে। এখন তা এক ধ্বংসস্তূপ। জঙ্গলে ঢাকা, ছাদ ভেঙে পড়েছে, জানালার কাঁচ গলে গিয়েছে। অথচ প্রবেশপথে দু’দিকে দুই পাথরের সিংহ—যেন এখনো প্রহরী।
ভেতরে ঢুকতেই একটা সোঁদা গন্ধ। জলে ভেজা পুরনো ইট আর কাঠের গন্ধ। ঘরগুলোর দেয়ালে ফাটল, ছাদের কিছু অংশে বাদুড় ঝুলছে।
“ওই যে, ওইটা রানীমার ঘর,” রিঙ্কু একটা ভাঙা দরজার দিকে ইঙ্গিত করল।
কমলিনি এগিয়ে গিয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলেন। ভেতরে একটা কাঠের খাট, ছেঁড়া মশারি, আর দেয়ালে একটা ছোট আয়না। আয়নার কাচে হালকা একটা হাতের ছাপ।
“এই আয়নায় কি রানীমা শেষবার নিজেকে দেখেছিলেন?” নিজের মনে প্রশ্ন করলেন তিনি।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা ঠাণ্ডা বাতাস বইল। জানলার কাঁচ কেঁপে উঠল। আর সেই সাথে আবার সেই শব্দ—ঝম ঝম ঝম…
কমলিনি থমকে দাঁড়ালেন। শব্দটা ভেতরেই কোথাও। আর সঙ্গে একটা গলা—মিহি, নারীকণ্ঠ।
“জল… জল দাও…”
কমলিনি পিছিয়ে এসে রিঙ্কুর দিকে তাকালেন। রিঙ্কু তখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে, মুখ সাদা।
“রিঙ্কু… তুমি এটা শোনো না?”
রিঙ্কু কাঁপা গলায় বলল, “আজ চাঁদের রাত, দিদিমণি। রানীমা চাঁদের আলোয় ফিরে আসেন।”
কমলিনির চোখ পড়ল দরজার পাশের দেয়ালে—সেখানে একটা শব্দ খোদাই করা—
“অগ্নি ভয় করে না, আমি জল চাই।”
তিনি গিলে ফেললেন নিজের প্রশ্ন। এই রাজবাড়ি শুধু একটা অতীত নয়, এটা একটা উন্মাদনা। আর সেই উন্মাদনার কেন্দ্রে ছিল রানীমা তৃষা। যার তামার পায়ে নূপুর ছিল, কিন্তু ছায়া পড়ত না।
পর্ব ৩: জল চাই
কমলিনির হাতে তখনও ডায়েরি ধরা, কিন্তু কলম থেমে গেছে। কেবল শব্দটা তার কানে ঘুরছে—“জল দাও…”
এই ডাক কি সত্যিই কারও? নাকি কুসুমবাড়ির বাতাসই এমন বুকে ছুরি চালায়?
রিঙ্কু বলল, “চলুন দিদিমণি, বেশি সময় এখানে থাকা উচিত না।”
“না রিঙ্কু, আজ না। আজ ফিরছি না,” গলা শান্ত রাখার চেষ্টা করলেন কমলিনি। “আমি এখানেই থাকব কিছুক্ষণ। তুমি চাইলে ফিরে যেতে পারো।”
রিঙ্কু কিছু বলল না। মুখ নামিয়ে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
কমলিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন ঘরের মধ্যে, সেই আয়নার সামনে। আয়নাটা মেঝে ছুঁয়ে ঝুলে আছে। কাচে হালকা ধুলো, কিন্তু তার ফাঁক গলে যেন একটা চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে। তিনি আঙুল দিয়ে মুছে দিলেন আয়নার ওপর জমে থাকা ধুলো। হঠাৎ তার চোখ স্থির হয়ে গেল। আয়নাতে নিজের প্রতিবিম্বের পাশে আরও একটা অবয়ব—একটা নারীচরিত্র, পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে, লম্বা চুল, মাথা নিচু করা।
তিনি ঘুরে তাকালেন। পেছনে কেউ নেই।
হঠাৎ জানলার বাইরে কিছু একটা নড়ল। কমলিনি এগিয়ে গেলেন। দূরে নদীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন—একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে জলঢাকার কিনারায়। ধবধবে সাদা কাপড়, চুল পিঠ ছুঁইছুঁই, পায়ের গড়নে একটা ভার—কিছু যেন ওকে নিচের দিকে টেনে রাখে। আর হাতটা—দু’হাত তুলে সে কিছু একটা বলছে। গলার আওয়াজ নেই, কিন্তু ঠোঁট স্পষ্ট বলছে—“জল দাও… জল দাও…”
হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় জানলার পাল্লা ধাক্কা খেয়ে বন্ধ হয়ে গেল।
কমলিনি পিছিয়ে এলেন। বুক ধুকপুক করছে। মাথা কাজ করছে না ঠিকমতো। তিনি দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। রিঙ্কু তখনও দাঁড়িয়ে।
“তুমি দেখলে?” কমলিনি জোরে জিজ্ঞেস করলেন।
“কি?”
“ওই মহিলাকে নদীর কাছে? সাদা কাপড়, চুল খোলা—”
রিঙ্কু স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, “আজ তৃষাদেবীর তিরোধান দিবস। প্রতি বছর এই রাতে কেউ না কেউ ওঁকে দেখে। কেউ নদীর ধারে, কেউ রাজবাড়ির সিঁড়িতে।”
“তোমরা কিছু করো না? ওকে শান্ত করার চেষ্টা?”
কমলিনির গলায় বিরক্তি ছিল না, ছিল কৌতূহল।
“আমরা চুপ করে যাই। জল দিলে সে থামে না। বরং টানে। নদীতে ডাকে। যারা ওর গলা শুনে কাছে গেছে, তারা ফেরেনি।”
রিঙ্কুর চোখে ভয় ছিল না, ছিল ক্লান্তি।
তখনই গ্রামের এক বৃদ্ধা এসে হাজির হলেন। তাঁর মাথা ঢেকে সাদা ওড়না, হাতে কাঠি দিয়ে ভর দিয়েছেন।
“আপনি কি তৃষার কথা শুনেছেন?” কমলিনি প্রশ্ন করলেন।
বৃদ্ধা বললেন, “শুধু শুনিনি, দেখেছি। আমি তখন ছোট। বাবার হাত ধরে রানীমার গান শুনতে যেতাম। তিনি খুব ভালো বাউল গাইতেন। আর একটা মাটির পুতুলের মতো মুখ ছিল ওঁর। তারপর একদিন, যখন সে নদীতে ঝাঁপ দেয়, সকালের আলোয় কেবল একটা শব্দ কানে এসেছিল—‘জল…’”
“কিন্তু কেন জল?” কমলিনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না।
বৃদ্ধা বললেন, “কারণ রাজবাড়ির নীচে এক পুরনো পূজো হত। দেবতা ছিল ‘অগ্নিমূর্ত’। তাকে শান্ত করতে রানীমা জল দিতেন। জমিদারবাবু সেটা মানতেন না। একরাতে সেই পাথরের মূর্তি ভেঙে দেন। আর তারপর থেকেই শুরু হয় ছায়া পড়া বন্ধ হওয়ার গল্প।”
কমলিনি বললেন, “আমি কি সেই মূর্তিটা দেখতে পারি?”
বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন। “রাজবাড়ির নিচে একটা গোপন ঘর আছে। সিঁড়িটা বুজে ফেলা হয়েছে। তবে যদি রানীমা চায় আপনি দেখুন, দেখবেন।”
সেই রাতে কমলিনি ঘুমোতে পারলেন না। খোলা খাতায় তিনি শুধু একটা লাইন লিখে গেলেন—
“তৃষা এখনও জল চায়। কিন্তু আমরা কেবল ভয় পেয়ে জানলা বন্ধ করে দিই।”
পর্ব ৪: গোপন ঘরের সন্ধান
সকালবেলা উঠেই কমলিনি আবার গিয়েছিলেন রাজবাড়ির সামনে। কুয়াশা তখনও ভাসছে। কদমগাছের গায়ে শিশিরে ভেজা পাতা ঝরছে ধীরে ধীরে। রিঙ্কু তখনও ঘুমোচ্ছে। আর বৃদ্ধা মায়া, যিনি কাল রাতে রানীমার কথা বলেছিলেন, হাঁটতে হাঁটতে এলেন হাতে একটা পুরনো খাপবন্দি কাঠের ছাঁচ নিয়ে।
“এইটা তোমার কাজে লাগবে,” তিনি বললেন।
কমলিনি হাতে নিয়ে দেখলেন—কোনো প্রাচীন গেট খুলবার কাঠের ছাঁচ। তাতে শোভা করছে অদ্ভুত চিহ্ন, যেন আগুনের শিখার মতো কারুকাজ।
“এটা কোথা থেকে পেলেন?” কমলিনি কৌতূহল নিয়ে বললেন।
“এই ছিল রানীমার ঘরের বিছানার নিচে। আমার বাবা জমিদারবাড়িতে কাজ করতেন, তারই হাতে এসেছিল। আমিও রেখেছি। এখন মনে হয়, সময় হয়েছে এটা ফেরত দেওয়ার।”
বৃদ্ধা হেঁটে চলে গেলেন। কমলিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন, হাতে সেই ছাঁচ। গেট? গোপন ঘর? হঠাৎ মনে পড়ে গেল, কাল রাতে যে আয়নার ঘরে গিয়েছিলেন, সেই ঘরের এক কোণে ছিল একটা ভাঙা আলমারি। তার পেছনে দেয়ালটা কিছুটা অন্যরকম—দাগ পড়া, কিন্তু ইটের গাঁথুনিটা অস্বাভাবিক মসৃণ।
তিনি ফিরে গেলেন রাজবাড়ির ভিতরে। রিঙ্কু তখন এসে পড়েছে, দৌড়ে।
“আপনি একা?”
“চলো,” কমলিনি বললেন, “আজ আমাদের ভিতরে যেতে হবে।”
ওই ঘরের ভেতর ঢুকে সেই আলমারিটা একপাশে সরাতেই সত্যিই দেখা গেল একটা ছোট দরজা। ধুলোর আবরণে ঢাকা। দরজার ওপরে আগুনের শিখার মতো ছাঁচের ছাপ। আর সেই ছাঁচ ঠিক মিলে গেল মায়ার দেওয়া কাঠের টুকরোর সঙ্গে।
টুকরোটা চেপে ধরতেই কিচ কিচ শব্দ করে দরজাটা সামান্য খুলে গেল। এক ভেজা, অন্ধকার, সরু সিঁড়ি নিচের দিকে নামছে।
“এটা কি ঠিক হচ্ছে?” রিঙ্কু ফিসফিস করে বলল।
কমলিনি একটুও থামলেন না। “এটাই গবেষণা। ভয় পেলে জানবো না কিছুই।”
তারা নামতে লাগল নিচে। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে আলো ফেলতেই দেখা গেল—দেওয়ালের গায়ে পাথরের খোদাই। কিছু কিছু গায়ে আগুন, কিছু কিছুতে নদী। কিছু এক অদ্ভুত দেবতাকে পূজার দৃশ্য। সেই মূর্তির চোখ নেই, কিন্তু মুখে বিকট হাসি।
“এইটাই কি অগ্নিমূর্তি?” কমলিনি কাঁপা গলায় বললেন।
রিঙ্কু বলল, “এই মূর্তিটাই নাকি রানীমা পূজো করতেন। জমিদার সেটা ভেঙে দিয়েছিল। তারপর থেকে রাজবাড়িতে মৃত্যু, পাগল হওয়া আর আগুন লাগা—সব শুরু হয়।”
তারা যখন সিঁড়ি নামতে নামতে একদম নিচে পৌঁছল, তখন দেখা গেল—একটা ছোট পাথরের ঘর। এককোণে পাথরের তক্তা, তার উপর একটা ভাঙা ঘটি আর পাশে আধপোড়া কাঁথা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ঘরের মাঝখানে একটা কুয়া—জলভর্তি। অথচ ওপরে কোনো আলো পড়ে না। জলটা নীলচে-সবুজ, অদ্ভুত ঝিলমিল করছে।
কমলিনি এগিয়ে গেলেন। তখনই হঠাৎ সেই আওয়াজ—আবার সেই মিহি গলা—
“জল দাও…”
এইবার শব্দটা স্পষ্ট কুয়ার ভেতর থেকে উঠছে।
“জল দাও… আমি পুড়ছি… জল…”
রিঙ্কু কেঁপে উঠল। “চলুন দিদিমণি! এই কুয়া নরক! এইখানে জমিদারবাবু রানীমাকে ফেলে দিয়েছিল! লোক বলত, ও মরে নি, পুড়েছে! এই কুয়ায় ওর ছায়া আছে এখনও!”
কমলিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখে জল আসছে কেন? কারণ তার মন বলছে—এই নারীর গল্প শুধু একটা কাহিনি নয়, এক নির্মম অবিচার। একজন নারীকে পাগল বলেছিল সমাজ, কারণ সে ভিন্ন ছিল।
তাঁর খাতায় তিনি লিখলেন—
“এই কুয়া শুধুই জলধারা নয়, এ এক নারী-কান্নার উৎস। আর সেই কান্নার শব্দ শোনে শুধু যারা হৃদয়ে ভয় পায় না।”
রিঙ্কু বলল, “এখন উপরে চলুন, দিদিমণি। আপনি ওর গল্প জানেন। ওর ছায়া এবার আপনাকে পছন্দ করে ফেলেছে।”
কমলিনি বললেন, “না রিঙ্কু, ওর ছায়া আমাকে পছন্দ করে নি—ও আমার ছায়ার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে।”
পর্ব ৪: গোপন ঘরের সন্ধান
সকালবেলা উঠেই কমলিনি আবার গিয়েছিলেন রাজবাড়ির সামনে। কুয়াশা তখনও ভাসছে। কদমগাছের গায়ে শিশিরে ভেজা পাতা ঝরছে ধীরে ধীরে। রিঙ্কু তখনও ঘুমোচ্ছে। আর বৃদ্ধা মায়া, যিনি কাল রাতে রানীমার কথা বলেছিলেন, হাঁটতে হাঁটতে এলেন হাতে একটা পুরনো খাপবন্দি কাঠের ছাঁচ নিয়ে।
“এইটা তোমার কাজে লাগবে,” তিনি বললেন।
কমলিনি হাতে নিয়ে দেখলেন—কোনো প্রাচীন গেট খুলবার কাঠের ছাঁচ। তাতে শোভা করছে অদ্ভুত চিহ্ন, যেন আগুনের শিখার মতো কারুকাজ।
“এটা কোথা থেকে পেলেন?” কমলিনি কৌতূহল নিয়ে বললেন।
“এই ছিল রানীমার ঘরের বিছানার নিচে। আমার বাবা জমিদারবাড়িতে কাজ করতেন, তারই হাতে এসেছিল। আমিও রেখেছি। এখন মনে হয়, সময় হয়েছে এটা ফেরত দেওয়ার।”
বৃদ্ধা হেঁটে চলে গেলেন। কমলিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন, হাতে সেই ছাঁচ। গেট? গোপন ঘর? হঠাৎ মনে পড়ে গেল, কাল রাতে যে আয়নার ঘরে গিয়েছিলেন, সেই ঘরের এক কোণে ছিল একটা ভাঙা আলমারি। তার পেছনে দেয়ালটা কিছুটা অন্যরকম—দাগ পড়া, কিন্তু ইটের গাঁথুনিটা অস্বাভাবিক মসৃণ।
তিনি ফিরে গেলেন রাজবাড়ির ভিতরে। রিঙ্কু তখন এসে পড়েছে, দৌড়ে।
“আপনি একা?”
“চলো,” কমলিনি বললেন, “আজ আমাদের ভিতরে যেতে হবে।”
ওই ঘরের ভেতর ঢুকে সেই আলমারিটা একপাশে সরাতেই সত্যিই দেখা গেল একটা ছোট দরজা। ধুলোর আবরণে ঢাকা। দরজার ওপরে আগুনের শিখার মতো ছাঁচের ছাপ। আর সেই ছাঁচ ঠিক মিলে গেল মায়ার দেওয়া কাঠের টুকরোর সঙ্গে।
টুকরোটা চেপে ধরতেই কিচ কিচ শব্দ করে দরজাটা সামান্য খুলে গেল। এক ভেজা, অন্ধকার, সরু সিঁড়ি নিচের দিকে নামছে।
“এটা কি ঠিক হচ্ছে?” রিঙ্কু ফিসফিস করে বলল।
কমলিনি একটুও থামলেন না। “এটাই গবেষণা। ভয় পেলে জানবো না কিছুই।”
তারা নামতে লাগল নিচে। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে আলো ফেলতেই দেখা গেল—দেওয়ালের গায়ে পাথরের খোদাই। কিছু কিছু গায়ে আগুন, কিছু কিছুতে নদী। কিছু এক অদ্ভুত দেবতাকে পূজার দৃশ্য। সেই মূর্তির চোখ নেই, কিন্তু মুখে বিকট হাসি।
“এইটাই কি অগ্নিমূর্তি?” কমলিনি কাঁপা গলায় বললেন।
রিঙ্কু বলল, “এই মূর্তিটাই নাকি রানীমা পূজো করতেন। জমিদার সেটা ভেঙে দিয়েছিল। তারপর থেকে রাজবাড়িতে মৃত্যু, পাগল হওয়া আর আগুন লাগা—সব শুরু হয়।”
তারা যখন সিঁড়ি নামতে নামতে একদম নিচে পৌঁছল, তখন দেখা গেল—একটা ছোট পাথরের ঘর। এককোণে পাথরের তক্তা, তার উপর একটা ভাঙা ঘটি আর পাশে আধপোড়া কাঁথা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ঘরের মাঝখানে একটা কুয়া—জলভর্তি। অথচ ওপরে কোনো আলো পড়ে না। জলটা নীলচে-সবুজ, অদ্ভুত ঝিলমিল করছে।
কমলিনি এগিয়ে গেলেন। তখনই হঠাৎ সেই আওয়াজ—আবার সেই মিহি গলা—
“জল দাও…”
এইবার শব্দটা স্পষ্ট কুয়ার ভেতর থেকে উঠছে।
“জল দাও… আমি পুড়ছি… জল…”
রিঙ্কু কেঁপে উঠল। “চলুন দিদিমণি! এই কুয়া নরক! এইখানে জমিদারবাবু রানীমাকে ফেলে দিয়েছিল! লোক বলত, ও মরে নি, পুড়েছে! এই কুয়ায় ওর ছায়া আছে এখনও!”
কমলিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখে জল আসছে কেন? কারণ তার মন বলছে—এই নারীর গল্প শুধু একটা কাহিনি নয়, এক নির্মম অবিচার। একজন নারীকে পাগল বলেছিল সমাজ, কারণ সে ভিন্ন ছিল।
তাঁর খাতায় তিনি লিখলেন—
“এই কুয়া শুধুই জলধারা নয়, এ এক নারী-কান্নার উৎস। আর সেই কান্নার শব্দ শোনে শুধু যারা হৃদয়ে ভয় পায় না।”
রিঙ্কু বলল, “এখন উপরে চলুন, দিদিমণি। আপনি ওর গল্প জানেন। ওর ছায়া এবার আপনাকে পছন্দ করে ফেলেছে।”
কমলিনি বললেন, “না রিঙ্কু, ওর ছায়া আমাকে পছন্দ করে নি—ও আমার ছায়ার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে।”
পর্ব ৫: আগুনের হাসি
উপরে উঠে আসার পরও কমলিনির মনে হচ্ছিল, কুয়োর সেই মিহি গলাটা যেন এখনো কানে বাজছে। “জল দাও… আমি পুড়ছি…”—এই আর্জির মধ্যে শুধু বাঁচার আর্তি নয়, ছিল একটা প্রতিশোধের দগ্ধতা। যেন কেউ জ্যান্ত পুড়ে গিয়ে, ছায়া হয়ে ফিরে এসে বলছে—এই পৃথিবী তাকে ভুল বুঝেছে।
রিঙ্কু চুপচাপ পাশে হাঁটছিল। গ্রামের দিকে ফিরে আসার পথে আর কোনো শব্দ হয়নি। কিন্তু কমলিনির মনে হচ্ছিল, কার যেন পায়ের নুপুরের ঝমঝম শব্দ বারবার তাঁর ছায়ার ঠিক পিছনে বাজছে।
গ্রামে ফিরে দেখলেন, চারপাশ থমথম করছে। লোকজন মুখ নামিয়ে হাঁটছে। চা দোকানে কেউ নেই। যেন কেউ চুপ করে অপেক্ষা করছে—কোনো অজানা কিছুর জন্য।
তখনই মায়া এলেন, সেই বৃদ্ধা।
“আপনি দেখেছেন, তাই তো?” তিনি সরাসরি প্রশ্ন করলেন।
কমলিনি বললেন, “হ্যাঁ। রানীমার কুয়ো। তাঁর পূজার স্থান। তাঁর কান্না। সব দেখেছি। শুনেছি। বুঝেছি।”
মায়া বললেন, “আজ চাঁদের তিথি মিলেছে। আজ যেদিন রানীমাকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। জমিদারবাবু বলেছিলেন, রানীমা ‘অশুচি’ হয়ে গিয়েছিলেন, তাই তাঁকে শুদ্ধ করা হবে আগুনে। রাজবাড়ির ভিতরেই সেই আগুন জ্বালানো হয়েছিল।”
কমলিনি থমকে গেলেন। “কিন্তু লোক তো বলে, উনি নিজেই নদীতে ঝাঁপ দেন?”
মায়া হেসে উঠলেন। কিন্তু সেই হাসিতে মাধুর্য ছিল না, ছিল করুণ বিষাদ। “লোক যা দেখে না, তা শুনে নেয়। আর যা শুনে নেয়, তা বিশ্বাস করে। সত্যি কি জানতে চান?”
“জানাতে পারেন?” কমলিনি দৃষ্টি সরালেন না।
“চলুন,” বৃদ্ধা বললেন, “আজ রাত বারোটার সময় রাজবাড়ির ভিতরে আসুন। একা। রানীমা যদি চান, আপনাকে দেখাবেন।”
রিঙ্কু প্রতিবাদ করল, “না! দিদিমণি, ওখানে কেউ যায় না! বিশেষ করে চাঁদের রাতে!”
কমলিনি শান্ত গলায় বললেন, “যদি আমি রানীমার গল্প না শুনি, তাহলে কীসের গবেষণা?”
রাত্রি নামল। কুসুমবাড়ি যেন নিঃশ্বাস ফেলছে না। গাছেরা হেলে পড়েছে নদীর দিকে। চারদিকে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। রাত ঠিক বারোটা বাজতেই, কমলিনি ঢুকলেন সেই ধ্বংসপ্রায় রাজবাড়ির ভিতরে। হাতে একটা টর্চ, ব্যাগে নোটবুক আর কলম। পায়ের শব্দ ছাড়া কিছুই নেই।
ভেতরে ঢুকতেই একটা ঘ্রাণ—পোড়া কাঠ আর গন্ধরাজ ফুলের মিশ্র গন্ধ। হঠাৎ, সামনের ঘরটা যেন নিজে থেকেই আলোকিত হল—তাঁর টর্চ বন্ধ করেও দেখতে পেলেন, একটা আগুন জ্বলছে ঘরের এক কোণে।
আর সেই আগুনের সামনে বসে আছেন এক নারী—পেছন ফিরে, সাদা কাপড় গায়ে, চুল খোলা। মাথা নিচু করা।
কমলিনি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তিনি জানেন, এটি দৃশ্য নয়—এ এক স্মৃতি। এক বেঁচে থাকা স্মৃতি।
নারীটা হঠাৎ ঘুরে তাকালেন। তার মুখ যেন আগুনের মধ্যে গঠিত, কিন্তু চোখ দুটো কালো। অতল। তাঁর ঠোঁটে হালকা হাসি।
“তুমি লিখছো আমার কথা?”—একটা গলা, যেন বাতাসে ভেসে এলো।
কমলিনি কিছু বলতে পারলেন না। শুধু মাথা নাড়লেন।
“তবে আমার মৃত্যুর আগের সত্যিটাও লিখো… ওরা বলেছিল, আমি পাগল। কারণ আমি আগুনের দেবতাকে জল দিতাম। আমি বলেছিলাম, ‘অগ্নি ভয় করে না, আমি জল চাই।’ তারা বুঝল না।”
নারীটা আগুনের দিকে এগিয়ে গেলেন।
কমলিনি বললেন, “তুমি কেন ফিরে এসেছো?”
“কারণ আগুন আমার সব কিছু ছিনিয়ে নিয়েছে, শুধু ছায়াটা ছাড়েনি। আমি তাই ছায়া হয়েই রয়ে গেছি।”
হঠাৎ নারীটা ঝুঁকে পড়ে সেই আগুনে মুখ রেখে দিলেন—কিন্তু পুড়লেন না। বরং আগুনটা নিভে গেল। পুরো ঘর অন্ধকার।
কমলিনি হঠাৎ বুঝলেন, কাঁধে যেন কারো হাত। পেছনে তাকালেন—কেউ নেই।
শুধু জানলার কাঁচে লেখা একটা অদৃশ্য আঙুলের দাগে উঠে এল চারটে শব্দ—
“জল দাও, সত্য দাও।”
পর্ব ৬: ছায়ার পেছনে সত্য
রাতটা যেন কাটল না। কমলিনি বারান্দায় বসে থাকলেন অনেকক্ষণ, খাতা খুলেও কিছু লিখলেন না। কেবল একবার পেছনে তাকিয়ে দেখেছিলেন—আয়নার ফাঁকে সেই নারীর প্রতিবিম্ব যেন রয়ে গেছে। আগুনের মতো চুল, কিন্তু চোখে ছিল জল। প্রশ্ন অনেক, উত্তর নেই। শুধু একটা বাক্য—“জল দাও, সত্য দাও।”
সকালে রিঙ্কু এসে তাঁকে বলল, “আপনার মুখটা দেখেছেন? খুব ক্লান্ত লাগছে।”
কমলিনি বললেন, “আমি রানীমাকে দেখেছি। আগুনে, হাসতে হাসতে… অথচ চোখে তার কান্না ছিল। তুমি কি জানো, সত্যি কী ঘটেছিল ওর সঙ্গে?”
রিঙ্কু একটুখানি চুপ করে থেকে বলল, “কেউ ঠিক জানে না। তবে একটা পুরনো কাগজ আমার দাদু রেখে গিয়েছিলেন। বলে গিয়েছিলেন, ‘যদি কেউ একদিন সত্যি জানতে চায়, তাকে এটা দিও।’ আমি ভাবিনি আপনাকে দেব।”
সে ভিতর থেকে একটা পুরনো খামে ভরা পাণ্ডুলিপি এনে দিল। মলিন কাগজে লেখা—
> “রানীমা পাগল ছিলেন না। তিনি গর্ভবতী ছিলেন। কিন্তু জমিদার সন্দেহ করেছিলেন, এই সন্তান তাঁর নয়। রানীমাকে ‘অশুচি’ আখ্যা দিয়ে গোপনে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দেন। এবং সেই ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হয়। রাজবাড়ির পুরোহিত চুপ ছিলেন, কারণ তাঁর চোখের সামনে পাথরের দেবতা ছিল, কিন্তু মূর্তি পুড়িয়ে তামার মুখোশ বানিয়ে রাখা হয় রানীমার স্মৃতির প্রতীক।”
কমলিনির হাত কাঁপছিল। পাণ্ডুলিপির নিচে একটা সিগনেচার—জয়ন্ত রায়, রাজবাড়ির প্রাক্তন কাগজলেখক।
কমলিনি ফিসফিস করে বললেন, “রানীমা শুধু ডাইনি ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক নির্যাতিতা নারী, এক নির্মম মিথ্যার শিকার। তাঁর গর্ভে সত্যি ছিল। এবং সেই সত্য দগ্ধ হয়েছিল আগুনে।”
রিঙ্কু বলল, “তবে কি আপনি… আপনি লিখবেন এসব?”
কমলিনি বললেন, “তাই তো এসেছি এখানে। আমি ভূতের গল্প খুঁজতে আসিনি, এসেছি ভূতের নামে চাপা পড়ে থাকা এক নারীর কণ্ঠ উদ্ধার করতে।”
সন্ধের দিকে তিনি গেলেন গ্রামের পুরনো রেকর্ড অফিসে। মায়া তাঁকে বলেছিলেন, “পুরনো দলিলপত্র ঘাঁটলে হয়তো কিছু পাবে।”
সেখানে ধূলোমাখা আলমারির মধ্যে পঞ্চাশ বছর আগের এক দলিলের পাতায় পাওয়া গেল একটা মামলা—“রাজবাড়ির রানীমার অস্বাভাবিক মৃত্যু, তদন্ত বন্ধ”। তাতে লেখা:
“গৃহস্থালি অশান্তির জন্য আত্মহত্যা বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে পঞ্চায়েত। দাহ সম্পন্ন, শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন।”
কিন্তু একই ফাইলের এক কোণে ঠাসা ছিল এক বাদী পত্র, তাতে লেখা—
“যদি কেউ রাত্রে আগুনের সামনে দাঁড়ায়, সে জানবে সত্য। কারণ ছায়া কখনো মিথ্যে বলে না।”
কমলিনি জানলেন, তাঁকে আবার যেতে হবে সেই ঘরে। সেই কুয়োর সামনে, সেই আগুনের সামনে। কারণ রানীমা অপেক্ষা করছেন।
সে রাতে, তিনি ফিরে গেলেন সেই গোপন সিঁড়ি বেয়ে। নিচের ঘরে তখন নিস্তব্ধতা। কুয়োর জল নিঃশব্দ, কিন্তু চারপাশে যেন কাঁপুনি।
তিনি পাণ্ডুলিপিটা সামনে রেখে বললেন, “তৃষা রানী, আমি তোমার কথা লিখব। তুমি আর এক ডাইনি নও—তুমি এক নারী, যাকে সমাজ পোড়াতে চেয়েছিল, কারণ সে ভালোবাসত, নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল।”
হঠাৎ বাতাসে এক ঘূর্ণি উঠল। কুয়োর জল যেন ঘুরতে লাগল। তারপর ধীরে ধীরে জলের উপর ভেসে উঠল এক মুখ—অর্ধেক পুড়ে যাওয়া, কিন্তু চোখ দুটি অক্ষত।
সে কেবল বলল—“তুমি আমাকে নাম দিলে, আমি এখন গল্প হব।”
পর্ব ৭: নামের বদলে আগুন
পাহাড়ের নীচে, কুয়োর জলে সেই মুখটা ভেসে ছিল বহুক্ষণ। কমলিনি বসে ছিলেন নিঃশব্দে, যেন কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। তৃষা রানী, যিনি কখনো ডাইনি ছিলেন না—ছিলেন এক নারী, এক সম্ভ্রমের নাম, যাঁকে ইতিহাস পুড়িয়ে দিয়েছে।
তৃষা বললেন, “তারা আমার নাম কেড়ে নিয়ে আগুন দিয়েছিল। আমি তাই ছায়া হয়ে ফিরেছি। আমি এখনো নাম চাই।”
কমলিনি বললেন, “তোমার নাম তো আমরা জানি।”
“না,” তৃষা বললেন, “তুমি জানো আমার অপবাদ, আমার কান্না, কিন্তু জানো না আমার পরিচয়। আমি সেই তৃষা, যে গর্ভে ধারণ করেছিলো সৃষ্টিকে। আর তারা বলেছিলো, আমি নষ্টা।”
কুয়োর জলের ঢেউয়ে যেন আগুনের প্রতিবিম্ব ফুটে উঠল।
“তুমি কি চাইলে আগুন ছেড়ে যেতে পারো না?” কমলিনি ধীরে জিজ্ঞেস করলেন।
তৃষার কণ্ঠ এল—“যেদিন আমি নিজের নাম ফিরে পাব, সেদিন আগুন আমায় ছেড়ে দেবে।”
সেই রাতেই, কমলিনি তাঁর নোটবুকে নতুন একটা অধ্যায় শুরু করলেন।
শিরোনাম: ‘তৃষা: নামের বদলে আগুন’
পরদিন ভোরে, কুসুমবাড়ি গ্রামের মাঠে পঞ্চায়েতের বিশেষ সভা ডাকলেন তিনি। রিঙ্কু, মায়া, গ্রামের পুরোনো মানুষজন সবাই এসে জড়ো হলো। কারো চোখে সন্দেহ, কারো চোখে সংশয়। আর কিছু চোখে এক টুকরো আতঙ্ক।
কমলিনি সেই পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনালেন—জয়ন্ত রায়ের লেখা, মামলার সত্য, রানীমার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থার কথা, রাজবাড়ির নিষ্ঠুরতার বিবরণ।
এক বৃদ্ধ কৃষক উঠে দাঁড়ালেন, “আমার ঠাকুরদা বলতেন, রানীমা ভালো মানুষ ছিলেন। উনি যে পুজো করতেন, তাতে কেউ ক্ষতি পায়নি। কিন্তু জমিদারবাবুর রোষে সব চাপা পড়ে গেছে। আমাদের ভুল হয়েছে।”
মায়া বললেন, “আমরা ভুল করেছি। আমরা ভয় পেয়েছি। একটা মেয়েকে ‘ডাইনি’ বলেছি। অথচ সে চাইত কেবল একটু জল।”
কমলিনি বললেন, “আমরা যদি আজ তার নাম স্বীকার করি, তাকে তার সত্য ফিরিয়ে দিই, তাহলে হয়তো তৃষা আগুন ছেড়ে শান্ত হবে। আর কুসুমবাড়ি—এই ভূতুড়ে পরিচয় থেকে মুক্তি পাবে।”
পঞ্চায়েত প্রধান একটু থেমে বললেন, “তোমার প্রমাণ যথেষ্ট। আজ থেকেই এই গ্রামের ইতিহাসে ‘ডাইনি’ শব্দ থাকছে না। এই রাজবাড়ির নাম রাখা হচ্ছে ‘তৃষাদেবী স্মৃতি ভবন।’”
গ্রামজুড়ে একটা নিঃশব্দ ঢেউ বয়ে গেল।
সেই রাতে, কমলিনি আবার গেলেন সেই কুয়োর ঘরে।
আজ জল শান্ত, শীতল। আলো নেই। কুয়োর কিনারে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “তোমার নাম ফিরিয়ে দিয়েছি, তৃষা। তুমি এখন ইতিহাসে থাকবে, অপবাদে নয়।”
জলের মধ্যে থেকে আর কোনো মুখ উঠে এল না। কোনো কণ্ঠ নয়। কেবল কুয়োর জলে একটা তামার নূপুর ভেসে উঠল—চকমকে, নিঃশব্দে।
কমলিনি সেটি হাতে তুলে নিলেন। আর দেখতে পেলেন—তার ছায়া পড়েছে, কিন্তু সেই ছায়ার পাশে আর একটি ছায়া নেই।
পর্ব ৮: ছায়ার শেষ চিঠি
কমলিনি কুয়োর ধারে বসে আছেন, হাতে তামার সেই নূপুর। একসময় যা ছিল আতঙ্কের প্রতীক, আজ তা শান্তির নিশান। রাত নিঃশব্দ, যেন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছু একটা মুছে দিয়েছে কুসুমবাড়ি।
রিঙ্কু এসে পাশে বসল। “দিদিমণি, আপনি কি ফিরবেন এখন কলকাতায়?”
“না, এখনই নয়,” কমলিনি বললেন, “আমার কাজ শেষ হয়নি। রানীমা তাঁর ছায়া ফিরিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর গল্পটা লেখার বাকি। পুরোটা, নিঃশর্তভাবে।”
পরদিন সকালে, রাজবাড়ির ঘরে আবার গেলেন তিনি। সেই ঘর, যেখানে তৃষা বসে ছিলেন আগুনের সামনে। কুয়োর ঘরের পাথরের পাশে একটা কাগজ পড়ে ছিল—মাঝে মাঝেই দেখা যেত না, কিন্তু আজ তা একেবারে স্পষ্ট।
চিরকুট। তামার রঙে লেখা, অদ্ভুত হরফে। কিন্তু পড়া যাচ্ছে।
“আমি তৃষা। আমি যাকে ভালবাসতাম, সে বিশ্বাস করেনি আমাকে। আমার শরীরে আগুন লেগেছিল, কিন্তু হৃদয়ে বাসা ছিল স্নেহ। আমাকে ডাইনি বলা হয়েছে, কারণ আমি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—কারোর চরণে না থেকে নিজের মতো চলব। আজ কেউ যদি আমার গল্প লিখে, তাহলে আমি তাকে আর ছায়া দিয়ে ছুঁব না—আমি আশীর্বাদ করব।
আমি আর জেগে উঠব না। আমি শান্ত।
— তৃষা”
চিঠির নিচে একটা তামার পাতায় খোদাই করা ছিল—“জল নয়, এখন আমি আলো চাই।”
কমলিনি হঠাৎ বুঝলেন, এই গল্প শুধু একটা প্রেতাত্মার নয়, এটা একজন নারীর স্বর ফিরে পাওয়ার গল্প। একটা কুয়ো, একটা রাজবাড়ি, একটা পোড়া মূর্তি—সব মিলিয়ে যে ইতিহাস, তা আগুন পুড়িয়ে দিতে পারেনি।
সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামের মেয়েরা মন্দিরের পাশে বসে নতুন গান ধরল—
“ডাইনি নয়, তৃষা নাম
আগুন ছুঁয়েও রইল প্রাণ
ছায়া হারিয়ে সত্যি হল
এখন কুসুমবাড়ি গায় গান।”
কমলিনি সেই গান শুনে চোখ বন্ধ করলেন। রানীমা আর ছায়া হয়ে হাঁটেন না এখন—তিনি হাঁটেন মানুষদের মনে।
পর্ব ৯: পাহাড়ে ফিরে দেখা
তিন সপ্তাহ পর।
কুসুমবাড়ি তখন একটু একটু করে বদলাচ্ছে। রাজবাড়ির সামনে একটা নতুন ফলক বসানো হয়েছে—“তৃষা স্মৃতি ভবন”। গ্রামের মেয়েরা সেখানে এখন পাট চালানার কাজ শেখে, ছেলেরা নাটক করে তৃষার কাহিনি নিয়ে।
আর কমলিনি বসে আছেন সেই কদমগাছের নিচে, হাতে তাঁর লেখা বইয়ের প্রুফ—“তামার পায়ের ছায়া”।
রিঙ্কু এল, মিষ্টির হাঁড়ি হাতে। “আপনার বই ছাপা হচ্ছে শুনেই আজ মায়া মাসি মিষ্টি পাঠিয়েছেন!”
কমলিনি হেসে বললেন, “তোমরা সবাই না থাকলে এটা সম্ভব হতো না।”
রিঙ্কু একটুখানি চুপ করে থেকে বলল, “আপনি চলে গেলে কেমন ফাঁকা লাগবে।”
“আমি আবার আসব,” কমলিনি বললেন। “এই জায়গাটা এখন শুধু গবেষণার বিষয় নয়, এটা আমার নিজের গল্প হয়ে গেছে।”
সেই সন্ধ্যায় তিনি একা একা হাঁটলেন সেই পাহাড়ি পথ ধরে, যেখানে প্রথমবার কুয়োর ঘর খুঁজে পেয়েছিলেন।
চাঁদের আলো ছুঁয়ে ছিল পাথর। অদ্ভুত শান্তি। বাতাসে ধূপ নয়, এবার ছিল গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ।
তখনই সামনে দেখতে পেলেন—একটি মেয়ে। বয়স কম, চোখে জ্যোতি, পরনে সাধারণ সাদা শাড়ি, হাতে জলভরা ঘট।
“কে তুমি?” কমলিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।
মেয়েটি হেসে বলল, “আমার নাম তৃষা নয়। আমি নতুন। আমি কুসুমবাড়ির। আমি সেই মেয়েটা, যে এখন ভয় পায় না ডাইনি বলে ঠকাতে। আমি জল নিয়ে এসেছি, দেবীর পায়ে দিতে। কারণ এখন আমরা জানি—জল দাবী নয়, অধিকার।”
কমলিনি হাসলেন। মাথায় হাত রাখলেন মেয়েটার। যেন একটি যুগের শেষ আর একটি যুগের শুরু।
পেছনে পাহাড় ছুঁয়ে নামছে আলো। সেই আলোর মাঝে যেন কেউ দাঁড়িয়ে—তাঁর চোখ দুটো আগুন নয়, শান্ত জল।
তৃষা। তৃষা আর ছায়া হয়ে ঘোরেন না।
তিনি এখন পাহাড়ের আলোয়, ইতিহাসের পাতায়, আর—কমলিনির কলমে।
পর্ব ১০: শেষ নূপুর
সকালবেলা, কুসুমবাড়ির বাতাসে যেন আলাদা একটা ঘ্রাণ। গন্ধরাজ ফুলের সঙ্গে মিশেছে পুরোনো কাগজের গন্ধ—কমলিনির বই এসে পৌঁছেছে গ্রামের লাইব্রেরিতে।
“তামার পায়ের ছায়া”—লেখক: কমলিনি বসু।
মলাটে জলঢাকার কুয়ো, পাশে একটা তামার নূপুর রাখা। ওপরে ছোট করে লেখা—
“ছায়া পড়ে না, কারণ তার উৎস অন্ধকার নয়—সত্য।”
গ্রামের মানুষরা আজ সবাই হাজির হয়েছে পাঠাগারে। রিঙ্কু, মায়া, পঞ্চায়েত প্রধান, গ্রামের মেয়েরা—সবাই। আর তাঁদের মাঝে দাঁড়িয়ে কমলিনি, হাতে প্রথম কপি।
তিনি বললেন, “এই বই শুধু একটা ভূতের গল্প নয়। এটি একজন নারীর নাম ফেরত পাওয়ার গল্প। তৃষা দেবী শুধু কুসুমবাড়ির ইতিহাস নন, তিনি এই গ্রামের আত্মা। আমরা তাঁকে ভয় না পেয়ে সম্মান করেছি। আর এটাই সত্যের জয়।”
বই বিতরণ চলছিল। গ্রামের ছোট্ট এক মেয়ে, নাম তৃষা, এসে বলল, “আমি এখন ভয় পাই না, দিদিমণি। আমি নিজের নাম নিয়ে গর্ব করি।”
কমলিনি মাথায় হাত রাখলেন তার, আর ভাবলেন—তৃষা রানী যেন ফিরে এসেছেন এই শিশুর মুখে, চোখে, কণ্ঠে।
সন্ধ্যায়, একা একা হাঁটলেন সেই রাজবাড়ির পথে। আজ আর গা ছমছম করে না। কুয়োর ঘর এখন প্রদীপে আলোকিত। পাথরের মূর্তির সামনে ছোট্ট ফুলদানি।
আর ঠিক কুয়োর পাশে রাখা—একটি তামার নূপুর।
কমলিনি জানতেন, এটা সেই নূপুর নয়, যা ভয় জাগাত। এটা সেই শেষ চিহ্ন, যা ছায়া হয়ে ছিল, এখন আলোতে পরিণত হয়েছে।
তিনি সেই নূপুর হাতে নিয়ে বললেন, “তোমার গল্প লেখা হয়েছে, তৃষা। এখন তুমি ঘুমোও। শান্তিতে।”
হাওয়ায় মৃদু আওয়াজ—ঝমঝম… ঝম…
কিন্তু এবার কোনো ভয় নেই, কোনো ছায়া নেই। শুধু স্মৃতি। ইতিহাস। আর এক নারীর নীরব প্রতিবাদ, যা আগুন পুড়িয়ে ফেলতে পারেনি।
কমলিনি ফিরে এলেন শহরে। কিন্তু তাঁর ডেস্কে, প্রতিদিনের লেখার পাশে রাখা থাকে সেই তামার নূপুর।
আর যখন কোনো গল্প থমকে যায়, তিনি সেটার দিকে তাকিয়ে বলেন—
“তোমরা গল্প লেখো, নয়তো গল্প তোমাদের লেখে।”
***




