রিমা ঘোষ
আগমন
যখন নিঃশব্দে সন্ধ্যায় ঢলে পড়ে, তখন সেই নিঃশব্দতাকে যেন আরও ঘন করে আনে পাহাড় থেকে নেমে আসা কুয়াশা। হেমন্তের ঠান্ডা হাওয়া গায়ে এসে লাগে ধারালো সুতোয় বাঁধা ছুরি’র মতো। সেই কুয়াশার ভিতর দিয়েই ধীরে ধীরে উঠতে থাকে একটি জিপ। ভেতরে বসে আছে তানিশা সেন—কলকাতা থেকে আসা এক তরুণী লেখিকা, যার ঝুলিতে আছে কিছু কবিতা, কিছু হতাশা আর একটা অসমাপ্ত উপন্যাস।
তানিশা এসেছে একা। বলেছে বন্ধুবান্ধবকে—”একটু লিখতে হবে। পাহাড়ে শান্তি পাব, মন খুলে লিখতে পারব।” কিন্তু তার এই একাকী যাত্রার পেছনে আরও কিছু আছে—একটা হারিয়ে যাওয়া অনুভব, একটা অদৃশ্য টান, যেটা সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারে না।
ল্যান্ডোর বাজারের এক পাশে, ঝোপঝাড়ে ঢাকা পুরনো এক কাঠের বাংলো। নাম নেই, ঠিকানার চেয়ে বেশি আছে গুজব। পাহাড়ি লোকজন বলে, সে ঘরে এক সময় এক ইংরেজ মেমসাহেব থাকত। কেউ কেউ আবার বলে, ঘরটা এখনো “অতিথি” রাখে।
তানিশা যখন পৌঁছয়, তখন অন্ধকার প্রায় গিলে ফেলেছে চারপাশ। কেয়ারটেকার, এক বুড়ো পাহাড়ি লোক, নাম ভানু দা, ফিসফিস করে বলে,
— “দিদি, সন্ধের পর বাইরে যাবেন না। এই বাংলো সহজ নয়। কুয়াশার ভিতর কিছু হাটে। শুনেছি, কিন্তু চোখে দেখিনি। আর দেখা গেলেই আর ফেরা হয় না।”
তানিশা হেসে ফেলে, “এগুলো তো গল্প, তাই তো? আমিও লিখি গল্প।”
ভানু দা তাকায় গম্ভীর চোখে, “গল্প যেটা কালো হয়, সেটা সত্যি হয়ে ওঠে পাহাড়ে।”
রাতটা নেমে আসে ভারী কম্বলের মতো। তানিশা জানালার পাশে বসে, চা খায়, লিখতে চেষ্টা করে। কিন্তু বারবার তার চোখ চলে যায় ঘরের এক কোণে—দেয়ালের গায়ে ঝোলানো একটা পুরনো আয়নায়। আয়নাটা যেন শুধু ছবি ফেরায় না, মনও ফেরায়। যেন কেউ তাকিয়ে আছে, তাকিয়েই আছে ভিতর থেকে।
সে চোখ ফিরিয়ে নেয়, হাসে নিজের উপর।
“এতই যদি ভয় পাই, তাহলে এসেছি কেন?”
কিন্তু ঘড়ির কাঁটা যখন রাত দুই পেরিয়ে তিন ছুঁতে চায়, তখন জানালার কাঁচে ঠকঠক শব্দ হয়।
তানিশা উঠে দাঁড়ায়। বাইরে কিছুই দেখা যায় না, শুধু ধোঁয়াটে সাদা পর্দা।
আবার শব্দ হয়—এইবার দরজার দিক থেকে।
আর তখনই…
আয়নার ভিতর এক ঝলক দেখা যায় এক নারী মুখ—কালো চোখ, ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি।
তানিশা চমকে উঠে ফিরে তাকায়।
আয়না ফাঁকা।
তবে আয়নার কাঁচটা হিমে ঢাকা।
আর তার ঠিক মাঝে—আঙুল দিয়ে আঁকা এক শব্দ:
“ফিরে এসো”
আয়নার ছায়া
তানিশা ঘুম ভাঙে হঠাৎ এক অজানা অস্বস্তিতে। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ২টা ৩৭। ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা এত গাঢ় যে, তার নিজের নিঃশ্বাসের আওয়াজও কেমন কাঁপা-কাঁপা মনে হয়।
ছাদে বাতাসে চিমনি কাঁপছে হালকা শব্দে, আর দূরে পাহাড়ে যেন শোনা যায় কুকুরের কান্নার মতো একটা দীর্ঘ আর্তি—অপরিচিত, বুনো, অস্পষ্ট।
হঠাৎ, দৃষ্টিতে পড়ে যায় ঘরের কোণে সেই পুরনো আয়নাটা। কাঠের ভারী ফ্রেম, ধূসর হয়ে যাওয়া কাচের উপর পাতলা হিমের পরত।
তবে সে হিমের আবরণ ভেদ করে, সে কি কিছু দেখতে পেল না?
তানিশা উঠে দাঁড়ায় ধীরে ধীরে। পায়ের শব্দ যেন কাঠের মেঝেতে নরম ছাপ রেখে যায়। সে কাছে গিয়ে দাঁড়ায় আয়নার সামনে।
নিজের প্রতিবিম্ব দেখে একটু থমকে যায়। কিছু যেন ঠিকঠাক নয়। নিজের চোখে এমন শূন্যতা, এমন গাঢ় গভীরতা আগে সে কখনো দেখেনি।
ঠিক তখনই…
আয়নার ভিতর কিছু একটা নড়ে ওঠে।
প্রথমে মনে হয় কুয়াশা। কিন্তু না—একটি মুখ।
একজন নারী।
চুল খোলা, চোখজোড়া ঘন কালো। ঠোঁটে সরে আসা এক অদ্ভুত, অশুভ হাসি।
সে যেন বলছে কিছু, কিন্তু শব্দহীন। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কান কিছু শুনতে পায় না।
তানিশা তাকিয়ে থাকে হতবাক হয়ে।
তার গলা শুকিয়ে গেছে। দৃষ্টি আটকে গেছে সেই ছায়ার চোখে—যেখানে আছে ঘন অন্ধকার, যেখানে আছে অপূর্ণ ইচ্ছা।
হঠাৎ, পেছনের জানালার কাঁচে ঠকঠক শব্দ।
সে ঘুরে তাকায়।
বাইরে কিছুই নেই। কুয়াশা পুরো জানালাটা ঢেকে রেখেছে।
আবার ফিরে তাকায় আয়নার দিকে।
এবার আয়নাতে আর কোনও মুখ নেই।
শুধু হিমে জমে থাকা কাচের উপর আঁকা আছে পাঁচটি আঙুলের দাগ।
সেই পাঁচ আঙুল যেন ভেতর থেকে চাপ দিয়েছে আয়নার গায়ে।
তানিশার মনে পড়ে ভানু দার কথা—”কিছু কিছু আয়না শুধু ছবি ধরে না, আত্মাও ধরে রাখে।”
সে পেছনে সরে আসে। হালকা কাঁপছে তার হাত। তবু চোখ সরাতে পারে না।
তার মনে হতে থাকে, এই আয়না হয়তো শুধু বস্তু নয়—এ এক জানালা, বা হয়তো এক ফাঁদ। ঘুম আর আসে না সারা রাত। কেবল মাঝে মাঝে আয়নার দিকে চোখ যায়, আর মনে হয়… সেখানে কেউ এখনো তাকিয়ে আছে।
পাথরের বৃত্ত
সকালটা তুলনায় শান্ত। অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হয়।
তানিশা অনেকটা রাত না ঘুমিয়ে শেষমেশ ভোররাতে চোখ বন্ধ করেছিল। কিন্তু ঘুম এসে আবার অস্থির স্বপ্নে জড়িয়ে ধরে ফেলেছিল তাকে—সেই আয়নার মুখ, সেই ঠান্ডা আঙুলের স্পর্শ, আর পাহাড়জোড়া এক গর্জনের মতো নিঃশব্দ ডাক।
চা বানাতে বানাতে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। কুয়াশা সরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা ছায়াগুলোও যেন আজ একটু বেশি গাঢ়।
ভানু দা সকালে এসে বলে গেল—
“আজ রোদ উঠবে। আপনি পাহাড়ের পশ্চিম দিকে হাঁটতে পারেন। জঙ্গলের পাশ দিয়ে একটা ট্রেইল আছে—খুব সুন্দর। তবে বিকেল ৪টার মধ্যে ফিরে আসবেন, দিদি। জায়গাটা… সবসময় নিরাপদ নয়।”
তানিশা ব্যাগে ডায়েরি, ফোন, আর একটা ওয়াটার বটল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ট্রেইলটা সরু, দুপাশে ঝোপঝাড়, আর মাঝে মাঝে পাথর জেগে আছে মাটির উপরে।
চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই সে একটা খোলা জায়গায় এসে পড়ে। জায়গাটা প্রায় গোল। জঙ্গলের ভিতর এইরকম খোলামেলা জায়গা সে আশা করেনি।
তবে যে জিনিসটা তার চোখে পড়ে, তাতে তার বুক হঠাৎ ধক করে ওঠে।
মাঠটার মাঝখানে একটা বৃত্ত।
পাথরের তৈরি। বড়ো নয়—চারফুট ব্যাস হবে হয়তো।
পাথরগুলো কালো, অদ্ভুতভাবে গাঁথা।
বৃত্তের ভিতরে ছড়িয়ে আছে কিছু হাড়গোড়। ছোট ছোট, বাঁকানো।
তানিশা বুঝতে পারে—এগুলো পশুর হাড়। সম্ভবত ছাগলের।
আর মাঝখানে আছে কিছু পোড়া ধূপকাঠি, যেগুলো এখন নিভে আছে, কিন্তু সেই পোড়া গন্ধ যেন আজও বাতাসে টিকে আছে।
সে এগিয়ে যায় এক পা। বাতাস যেন হঠাৎ ভারি হয়ে আসে। পাখির ডাক থেমে গেছে। চারপাশ এক অস্বস্তিকর নীরবতায় মোড়া।
পেছন থেকে আসে হালকা পায়ের আওয়াজ। শুকনো পাতার উপর পায়ের চাপে যে মচমচ শব্দ হয়, সেটা।
তানিশা থমকে দাঁড়ায়। শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসে। ধীরে ধীরে পেছনে তাকায়।
কেউ নেই।
তবুও, যেন মনে হয় কেউ তাকিয়ে আছে। গা ছমছম করা অনুভূতি।
সে আবার সামনে তাকায়।
পাথরের বৃত্তটার মাঝখানে কিছু একটা চকচক করছে।
সে এগিয়ে গিয়ে দেখে—একটা প্রাচীন ব্রোঞ্জের চিহ্ন আঁকা তাবিজ, মাটিতে আধা গাঁথা।
তানিশা যখন সেটা তুলতে যায়, হঠাৎই বাতাসের ভিতর একটা ফিসফিস শব্দ ওঠে।
না, সেটা বাতাস নয়। সেটা যেন কোনও ভাষা।
অচেনা।
পুরনো।
জ্বালাময়।
তার কানে আসে—
“তুমি ফিরে এসেছ। সময় শুরু হল।”
তানিশা পিছিয়ে আসে। বুক ঢিপঢিপ করছে। পাথরের বৃত্ত থেকে সরে আসে সে। তাবিজটা সঙ্গে করে নেয়নি, কিন্তু মনে হচ্ছে সেটাই তার মনে ঢুকে গেছে।
হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসে বাংলোর দিকে। পেছনে ফেলে যায় সেই জায়গা।
কিন্তু মনে হয়, জায়গাটা তাকে ছাড়েনি।
সন্ধে নামে।
তানিশা আয়নার দিকে তাকাতে সাহস পায় না।
কিন্তু রাতে, যখন বাতি নিভিয়ে শুতে যায়, জানালার বাইরে শোনা যায় সেই একই কুকুরের কান্নার মতো ডাক।
আর আয়নার সামনে দিয়ে একটা ছায়া হেঁটে যায়—চুপচাপ, ধীরে, ঠিক যেন… পুরনো কোনও আচার-অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে।
মালিনীর ডায়েরি
তানিশা ঘুমোতে পারেনি গতরাতেও।
পাথরের বৃত্ত থেকে ফেরার পর থেকেই তার শরীরে একটা ভার লেগে আছে, যেন কেউ এক অদৃশ্য হাত দিয়ে তার বুকের উপর চেপে বসে আছে।
আয়নার সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছায়াটা কি সত্যিই ছিল? না কি ক্লান্তির ভ্রম?
সে নিজেই নিশ্চিত নয়।
পরদিন সকালবেলা, ভানু দা একটা পুরনো কাঠের বাক্স এনে দেয়। মুখে কিছু না বলে সে বাক্সটা রেখে বেরিয়ে যায়, কিন্তু যাওয়ার আগে বলে—
“দিদি, এই ঘর একসময় এক বাঙালি মহিলার ছিল। নাম ছিল মালিনী রায়। উনি একা থাকতেন এখানে, সেই ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে। ডায়েরিটা তার। আপনি পড়ুন। হয়তো আপনার সব প্রশ্নের উত্তর ওখানেই আছে।”
তানিশার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
বাক্সটা খোলার সময় মনে হচ্ছিল, সে যেন শুধু একটা বস্তু নয়, একটা ইতিহাসের কফিন খুলছে। ডায়েরিটা পাটার মোড়ানো কাপড়ে রাখা।
পাতাগুলো হলদে, কিছু জায়গায় কালির দাগ ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু ভাষা স্পষ্ট—দগদগে, আবেগে ভরা, যেন লেখিকার আত্মা এখনো সেই শব্দগুলোতে বাস করে।
তানিশা পড়ে—
“১৭ই অক্টোবর, ১৯৩২
আজ চার দিন হল, আমি সেই বৃত্তে দাঁড়িয়েছিলাম। ভোরের আলো ফোটার আগেই। ছাগল বলি দিয়েছি, আমার নিজের হাতে। শিখেছি একজন পাহাড়ি মেয়ের কাছ থেকে। সে বলেছে, ‘যাকে ভালোবাসো, তার আত্মা ফিরিয়ে আনার একটাই উপায়—আঁধারের নিয়ম মেনে চলা।’
আমি নিয়ম ভেঙেছি। তাই পেছন ফিরলেই ছায়া দেখি। আয়নায় মুখ দেখি না—অন্য কারো মুখ দেখি।
আমি তাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম। আমার দেবরাজ। তাকে নিয়েই আমার সংসার হবার কথা ছিল। কিন্তু সে ফিরল না। ফিরে এলো অন্য কেউ। অন্য আত্মা। সেই আত্মা এখন আমার ভেতরে বাস করে।
আমি জানি, আমি ধ্বংস করছি নিজেকে। কিন্তু আমি থামতে পারি না। রোজ রাতে একটা কণ্ঠ বলে, ‘ফিরে এসো। ফিরে এসো।’
এটা আমার না, এই কণ্ঠ আমার নয়।”
তানিশা থেমে যায়। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
সে আবার পড়ে—
“২২শে অক্টোবর, ১৯৩২
আজ আমার আয়নার গায়ে কেউ লিখে দিয়েছে—‘সময় ফুরোচ্ছে।’
আমি জানি, আমি যা শুরু করেছি তা আর থামবে না। এই বাড়ি আর পাহাড়ের বুকে একটা পথ খুলে গেছে—যেটা শুধু একপাশ থেকে খোলে না, ওপার থেকেও কেউ চলে আসে।
আমার যদি কেউ এই লেখা পড়ে, কেউ যদি বুঝতে পারে
দয়া করে, ওই আয়নাটা ভেঙে দিও।
পাথরের বৃত্তে আর কেউ পা দিও না।
আমার মতো আর কেউ যেন পথ হারিয়ে না ফেলে।”
তানিশার গায়ে ঠান্ডা ঘাম জমে।
সে জানে, এই বাংলো শুধু তার একাকীত্বের আশ্রয় নয়—এখানে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা চলছে। কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছিল বহু বছর ধরে। হয়তো সেই অপেক্ষার মেয়াদ এবার শেষ হয়েছে।
ডায়েরির একদম শেষে একটা পাতায় কাঁপা হাতে লেখা এক লাইন:
“সে ফিরে আসবে। আমার গলায় মালা পরিয়ে যাবে। এবার আমি তাকে বরণ করব না, সিঁদুরে নয়, ছায়ায়।”
আয়নার ওপারে
রাত তখন ন’টা পেরিয়েছে।
বাইরে গাঢ় কুয়াশা। ঘরের ভিতর নিস্তব্ধতা এমন, যেন শব্দও সেখানে ঢুকতে ভয় পায়। তানিশা মালিনীর ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠাটা আবার পড়ছিল। বারবার।
“সে ফিরে আসবে। আমার গলায় মালা পরিয়ে যাবে। এবার আমি তাকে বরণ করব না, সিঁদুরে নয়, ছায়ায়।”
তানিশার মনে হচ্ছিল—এই চিঠিটা তার জন্য লেখা হয়নি, কিন্তু তবুও যেন ঠিক তাকেই লক্ষ্য করে কেউ অনেক দূর থেকে এই বাক্যগুলো পাঠিয়ে দিয়েছে।
ঘরের এক কোণে রাখা আয়নাটার দিকে তাকাতে সাহস হয় না তার।
ডায়েরির মধ্যে একটা পাতায় ছিল একটা আঁকা চিহ্ন—একটা ত্রিকোণ, মাঝখানে একটা চোখ। ঠিক যেন কোনও গোপন গোষ্ঠীর প্রতীক। আর নিচে লেখা—“এই চিহ্ন থাকলে আয়না শুধু প্রতিফলন দেখায়, দরজা খুলে না।”
কিন্তু সেই চিহ্নটা এই আয়নায় নেই।
রাত বাড়ে। বাতি নিভিয়ে ঘুমোতে চেষ্টা করে সে।
ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে চলে, আর জানালার বাইরে শোনা যায় এক অচেনা হাঁটার আওয়াজ—শুকনো পাতার উপর ভেজা পায়ের চাপ।
তানিশা উঠে পড়ে। গায়ে চাদর জড়িয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়।
নিজেকে দেখতে পায়। কিন্তু কি আশ্চর্য, প্রতিফলন একটু যেন পিছিয়ে আছে সময় থেকে। তানিশা ডান হাত তোলে, আর আয়নার তানিশা বাঁ হাত তোলে।
না, আয়নার খেলা নয় এটা। এটা কিছু অন্য।
হঠাৎই আয়নার কাচে একটা কুয়াশার রেখা ওঠে—একটা আঙুল দিয়ে লেখা হচ্ছে কিছু।
“তুই কে?”
তানিশা চমকে ওঠে। পেছনে তাকায়—কেউ নেই।
আবার আয়নার দিকে তাকায়—কাচে লেখা হয়েছে আরেক লাইন।
“তুই আমার ঘর দখল করেছিস।”
তারপর হঠাৎ করেই আয়না কেঁপে ওঠে। কাচের ভিতর থেকে বাতাস বেরোয়। ঠান্ডা, কাঁচের গায়ে ধাক্কা খাওয়া বাতাস। তানিশা দু’পা পিছিয়ে যায়। কিন্তু এক অনিবার্য আকর্ষণ যেন তাকে টেনে নেয় আয়নার দিকে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
আয়নার কাচ গলে যায় জলের মতো। এবং ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে একটা চেহারা।
না, একে মানুষ বলা যায় না। তার চোখ দুটো ঘন ছায়ায় ঢাকা, ঠোঁট রক্তে রাঙা, আর সারা শরীরজুড়ে আঁকা সেই ত্রিকোণ চিহ্ন।
সে এগিয়ে আসে, ঠান্ডা স্বরে বলে—
“তুই মালিনী না, কিন্তু তোর মধ্যে তার ছায়া আছে। এখন দরজাটা আমি খুলে ফেলেছি। সময়ের ফাঁদ ভেঙেছে। আমাদের দেখা হবে আবার।”
তানিশা চিৎকার করতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না।
সে ছিটকে পড়ে যায় আয়নার সামনে। ঘরটা কাঁপতে থাকে। ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরতে থাকে।
আলো নিভে যায়।
সব মিলিয়ে যায় এক গাঢ় অন্ধকারে।
পরদিন সকাল।
ভানু দা দরজায় কড়া নাড়ে। ভিতর থেকে কেউ সাড়া দেয় না।
দরজা খোলাই থাকে, কিন্তু ঘরে কেউ নেই।
আয়নার সামনে পড়ে আছে ডায়েরিটা—তানিশার হাতের লেখা জুড়ে গেছে মালিনীর লেখার সঙ্গে।
আর আয়নার ভিতর?
সেখানে এখন একটা মেয়ের প্রতিচ্ছবি আছে। মুখে ভয়, চোখে দুঃখ। কিন্তু সে যে তানিশা, তা বোঝা যায় না স্পষ্ট করে।
আয়নার নিচে লেখা—
“আমরা যারা আয়নার ওপারে থাকি, তারা কখনো হারিয়ে যাই না। সময়ের বাঁকে বাঁকে আমরা ফিরে আসি। আবার।”
প্রতিধ্বনি
তানিশা আর নেই। অন্তত এই জগতে নয়।
তার বন্ধু সুহানী, যে কলকাতায় ছিল, ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে পুলিশের সাহায্য নিয়ে মোসৌরির সেই বাংলোয় আসে।
ভানু দা বলে—“দিদি ঘরে ছিলেন, তারপর হঠাৎ উধাও। আয়নার দিকে তাকিয়েছিলেন অনেকক্ষণ। তারপর আর…”
ঘরের ভেতর এখন সবই স্বাভাবিক, অথচ একটা অদ্ভুত শূন্যতা ছেয়ে আছে বাতাসে। যেন কেউ নিরন্তর তাকিয়ে আছে ওপাশ থেকে।
সুহানী দেয়ালের পাশে রাখা আয়নাটার সামনে দাঁড়ায়। আয়নার ভিতর সে দেখতে পায় নিজেকে—কিন্তু কেবলমাত্র বাইরের প্রতিফলন নয়, ভিতর থেকে যেন কেউ আরেকটা জীবন নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তখনই দরজায় কড়া নাড়ে এক অপরিচিত পুরুষ।
নিজেকে পরিচয় দেয়—ড. আকাশ রায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব ও চেতনাবিদ্যার অধ্যাপক।
তিনি জানান—
“তানিশা একসময় আমার গবেষণায় অংশগ্রহণ করত। আমরা ‘consciousness mirror theory’ নিয়ে কাজ করছিলাম। আয়না নাকি কেবল বাহ্যিক প্রতিফলন নয়, এটি একধরনের ‘resonance chamber’—যার মধ্যে দিয়ে সময়, স্মৃতি, ও বিকৃত চেতনার প্রতিধ্বনি ধরা যায়।”
সুহানী বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। আকাশ ব্যাগ খুলে বের করেন একটি ছোট ডিভাইস—একধরনের স্পেকট্রাল স্ক্যানার।
“আমাদের থিওরিতে, আয়নার পাশে কেউ দীর্ঘ সময় কাটালে যদি তার চেতনা কোনও এক তীব্র আবেগের সঙ্গে বাঁধা পড়ে, তাহলে আয়নার ভিতর তৈরি হয় এক ‘echo self’—একটা ছায়া স্বত্বা, যা আর সময়ের নিয়ম মানে না।”
তারা আয়নার স্ক্যান করেন। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি অস্পষ্ট সিগন্যাল।
সুহানী তখন মালিনীর ডায়েরি বের করে দেয়। ড. আকাশ সেটি পড়েন, নোট নেন। তারপর বলেন—
“দেখুন, এই আয়নাটা শুধু একটা জানালা নয়, এটা একটা দরজা। এবং দরজা যখন একবার খোলে, তখন তার দুই পাশেই কেউ না কেউ অপেক্ষা করে। মালিনী সেই প্রথম দরজা খুলেছিলেন। তানিশা হয়তো দ্বিতীয়।”
হঠাৎ ডিভাইসটা বিকট আওয়াজ করে ওঠে।
আয়নার ভিতরে হালকা ধোঁয়ার মতো কিছু নড়ে ওঠে।
ড. আকাশ ধীরে ধীরে কাছে যান। আয়নার দিকে তাকিয়ে বলেন—
“তানিশা? তুমি কি শুনতে পাচ্ছ?”
আয়নার কাচে ধীরে ধীরে লেখা হয়—
“আমি ঠিক আছি। সময় এখানে ঘূর্ণিপাকে চলে। আমি ফিরে যেতে চাই, কিন্তু দরজা একবারেই খোলে।”
সুহানীর চোখে জল চলে আসে। সে কাঁপা গলায় বলে—
“তুই ফিরে আয়, তানিশা। প্লিজ।”
কিন্তু তখনই আয়নায় নতুন লাইন ভেসে ওঠে—
“আমি একা নেই। মালিনীও এখানেই আছে। আমরা এখন শব্দের, ছায়ার, এবং প্রতিধ্বনির বাসিন্দা।”
ড. আকাশ ফিসফিস করে বলেন—
“একটা নতুন পৃথিবীর সীমান্ত আমরা ছুঁয়ে ফেলেছি, সুহানী। প্রশ্ন হলো, এই আয়নাটা কি ভাঙব? নাকি রেখে দেব ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে?”
সুহানী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে—
“তানিশা যদি ওখানেই শান্তিতে থাকে, তাহলে হয়তো এটাই তার মুক্তি।”
অবশেষে, বাংলো তালা দিয়ে তাঁরা ফিরে যান।
কিন্তু ঘরের ভিতরে আয়নাটা আজও আছে।
আর আয়নার গায়ে মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে নতুন লাইন—“সব গল্প ফুরোয় না। কেউ কেউ থেকে যায়। শুধু ভাষা বদলায়, ছায়া বদলায়। পাহাড়ে তাদের পদধ্বনি শোনা যায় আজও।”
শেষ।




