অনির্বাণ সেনগুপ্ত
কলকাতা থেকে কুয়াশার টানে
রাত দশটা। জানলার বাইরে গরমে হাঁপিয়ে ওঠা শহর, আর আমার মাথায় কেবল একটাই ভাবনা—এই গরমে আর থাকা যাচ্ছে না। পাখার হাওয়াও যেন গায়ে লাগছে না ঠিকঠাক। তখনই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে দেখা গেল রাত্রির নাম।
“শুন, তোকে একটা পাগলামির কথা বলি?” ওর গলার স্বরেই বুঝলাম, আবার কোনও হঠাৎ প্ল্যান।
“বলো,” আমি নিঃসাড়ে বললাম।
“চলো না সিকিম। এই বর্ষাকালটা একেবারে ম্যাজিক হয়ে উঠবে। মানুষ থাকবে কম, সবুজ থাকবে বেশি। বর্ষার সিকিম একেবারে অন্য রকম।”
আমি একটু থামলাম। অফিসে কাজের চাপ এখন কম, বাড়িতে কেউ নেই। হঠাৎ কোথাও চলে যাওয়ার মতো সময় অনেকদিন পাইনি। কেমন একটা টান অনুভব করলাম।
“আচ্ছা, কবে ভাবছো?”
“পরশু রাতের ট্রেন ধরব, নিউ জলপাইগুড়ি। সেখান থেকে গ্যাংটক। হোটেল আমি বুক করে ফেলছি। তোকে শুধু ব্যাগ গোছাতে হবে।”
রাত্রি এমনই। হুট করে ঝড় তোলে, আবার তার মাঝেই এক আশ্চর্য শান্তি এনে দেয়।
আমি একটু হেসে বললাম, “ঠিক আছে। চলি।”
পরশু রাতে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেন ধরলাম। রাতভর চলার পর সকালে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছালাম। সেখান থেকে প্রি-বুক করা শেয়ার গাড়ি—আমাদের যাত্রা শুরু হল সিকিমের দিকে। আকাশে তখন হালকা মেঘ, রোদ আর মেঘের লুকোচুরি চলছে। দূরে পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা কুয়াশা দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে যাচ্ছে, বুঝতেই পারলাম না।
আমাদের গাড়ির চালক ছিলেন লাকপা ভাই—একজন হাসিখুশি স্থানীয় মানুষ, সিকিমের প্রকৃতি আর ইতিহাস নিয়ে বলতে ভালোবাসেন।
“এই বর্ষাকালেই পাহাড় সবচেয়ে সুন্দর হয়। কিন্তু শহরের মানুষ ভয় পায়, বলে ধস হবে, রাস্তা বন্ধ থাকবে। তাই আসে না। কিন্তু প্রকৃতিকে দেখতে হলে ভয় পেতে নেই, বুঝলেন?”
আমি জানালার ধারে বসে বাইরের দৃশ্য গিলছিলাম চোখে চোখে। রাস্তার পাশে ভিজে মাটি, ছোট ছোট জলধারা, আর মাঝে মাঝে চা বাগানের সবুজ ছোপ।
দুপুর নাগাদ গ্যাংটকে পৌঁছালাম। শহরটা তখন ঘুমচ্ছে যেন। ট্র্যাফিক নেই বললেই চলে, রাস্তায় মানুষের ভিড়ও কম। হোটেলটা ছোট, কিন্তু দারুণ সাজানো। ঘরের জানালা থেকে দেখা যায় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা এক চিলতে পথ।
হোটেল ম্যানেজার বললেন, “বর্ষাকাল বলে অনেক বুকিং ক্যানসেল হয়েছে। আপনাদের মতো গুটি কয়েক মানুষই আসে এই সময়।”
ঘরে ব্যাগ রাখতেই প্রথম বৃষ্টি শুরু হল। জানালার কাঁচে বিন্দু বিন্দু জলের ধারা। হালকা ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতর। আর তার সঙ্গে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ—পাহাড়ি মাটি ভেজার গন্ধ।
চা নিয়ে জানালার পাশে বসলাম আমি আর রাত্রি। একটুও কথা বলছিলাম না কেউ। শুধু বাইরে তাকিয়ে থাকছিলাম। মনে হচ্ছিল, শহরের সমস্ত কোলাহল থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছি।
“তুই জানিস তো, এই জিনিসটা কেন দরকার হয়?” রাত্রি হঠাৎ বলে উঠল।
“কোনটা?”
“এইভাবে কোথাও চলে আসা। জানিস, শহরে থাকতে থাকতে আমরা নিজের সত্তাকে যেন ভুলে যাই। এখানে এসে সেই চুপচাপ, নিজের সঙ্গে নিজের আলাপটা আবার শুরু হয়।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ। এই চুপচাপটাও একরকম কথা বলা।”
রাত্রি হেসে চা-র কাপটা সামনে এগিয়ে ধরল।
সেই রাতে জানালার বাইরে অঝোর বৃষ্টি পড়ছিল। হোটেলের লনে জমে থাকা জলে আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সময় যেন থেমে গেছে। না, বরং সময় এখানে হাঁটে ধীরে, গানের ছন্দে।
এমজি মার্গের মেঘলা সন্ধে
বিকেলটা একটু থেমে থাকা বৃষ্টির সুযোগে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য—গ্যাংটকের প্রাণকেন্দ্র এমজি মার্গ। হোটেল থেকে পাঁচ মিনিটের রাস্তা, কিন্তু তাতে সময় লাগল প্রায় পঁচিশ মিনিট। কারণ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে থামছিলাম বারবার—একবার একটা নাম না জানা ফুলের গন্ধ পেয়ে, আরেকবার এক দোকানের রঙিন চাদর দেখে।
রাস্তার দুই ধারে ঝকঝকে দোকান, পাথরের পাকা ফুটপাথ, মাঝে মাঝে বসার জন্য কাঠের বেঞ্চ। এই রাস্তায় কোনো গাড়ি চলে না, ফলে হাঁটার একটা স্বস্তি আছে। মাথার উপর তখন হালকা কুয়াশা নামছে, আর দোকানগুলোর আলোগুলো কেমন মায়া তৈরি করছে রাস্তাজুড়ে।
“এটা অনেকটা ইউরোপিয়ান স্টাইল,” বলল রাত্রি। “কিন্তু এই কুয়াশা আর গন্ধটা একেবারে পাহাড়ি।”
আমি মাথা নাড়লাম। এমজি মার্গ যেন একটাই শহরের দু’টো রূপ—আধুনিক আর ঐতিহ্যবাহী। একদিকে মোমোর দোকান, অন্যদিকে হাতে বানানো উলের পোশাকের দোকান। তিব্বতি কারুকার্যে ভরা ছোট স্টলগুলো যেন বৃষ্টির মধ্যেও প্রাণবন্ত।
আমরা ঢুকলাম এক ছোট দোকানে, যেখানে মাটির কাপ-এ গরম লেমন টি পাওয়া যায়। দোকানদার বুড়ো ভদ্রলোকটি গম্ভীর মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজকে তো ভিড় নেই, বর্ষাকাল বলে কেউ আসে না। কিন্তু এই সময়ই সিকিম সবচেয়ে বেশি সুন্দর।”
রাত্রি একটু হাসল, “ঠিক সেই কারণেই তো আমরা এসেছি।”
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম বাইরের ভেজা রাস্তাটা। কয়েকটা ছোট ছেলে পাহাড়ি গান গাইছে, পাশে রাখা ছোট ড্রামে তালে তালে হাত চালাচ্ছে। তাদের গলায় রেইনজ্যাকেট, পায়ে স্যান্ডেল। তবু আনন্দে তারা থামছে না।
“তুই জানিস, এই শহরের বৃষ্টিও যেন গান গায়?” রাত্রি ফিসফিস করে বলল।
“হ্যাঁ। এই বৃষ্টির মধ্যেও যেন একটা তাল আছে। শহরের নয়, পাহাড়ের তাল।”
আমরা বেরিয়ে আবার হাঁটতে লাগলাম। এবার একটা তিব্বতি খাবারের দোকানে গিয়ে ঢুকলাম। ভিতরে গরম গরম ভেজিটেবল মোমো আর থুকপা। গরম ধোঁয়ায় ভরে গেল চারপাশ। বাইরের ঠান্ডা আর ভিতরের উষ্ণতার এই বিরোধ যেন নিজেই একরকম আরাম দেয়।
মোমো মুখে দিয়েই রাত্রি বলল, “এই স্বাদটা শহরে কোথাও পাওয়া যায় না।”
আমি হেসে বললাম, “এই যে তুই বলেছিলি, বর্ষায় পাহাড় ম্যাজিক হয়ে যায়—তা বুঝছি।”
হঠাৎ দোকানের দরজা খুলে বাইরে থেকে প্রবল হাওয়া ঢুকল। ঠান্ডা, সজীব, কুয়াশার গন্ধ মেশানো হাওয়া। আমরা একসাথে তাকালাম দরজার বাইরে—পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা কুয়াশা যেন ডেকে নিচ্ছে।
সন্ধ্যা নামতে নামতে শহরের আলো আর বৃষ্টির ফোঁটা মিলে একরকম রোমান্টিক ঘোর তৈরি করল। এমজি মার্গ তখন অনেকটাই ফাঁকা, আমরা ধীরে ধীরে হাঁটছি, হাতে করে কিনেছি একেকটা রঙিন কাঠের চাবির রিং, যার গায়ে লেখা “Made in Sikkim”।
রাত্রি হঠাৎ থেমে বলল, “জানিস, পাহাড়ে এসে মনে হয় যেন জীবন একটু থেমে গেছে। শহরে তো সবকিছু দৌড়াচ্ছে।”
আমি এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম, “হয়তো থেমে নয়, বরং ঠিক ছন্দে চলছে—যেটা শহরে হারিয়ে যায়।”
সেদিন রাতের বৃষ্টিটা একটু বেশি জোরে পড়েছিল। হোটেলে ফিরে এসে জানালা খুলেই দেখি মেঘ কুয়াশা সব মিলেমিশে পাহাড় ঢেকে ফেলেছে। দূরের আলোগুলো ঘোলাটে হয়ে গেছে। এমন পরিবেশে বসে শুধু চুপ করে থাকা যায়।
রাত্রি বলল, “কাল চল, রুমটেক মনাস্টেরি ঘুরে আসি।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “চল, বর্ষায় বুদ্ধের ঘরে কেমন প্রার্থনা বাজে, সেটা শুনে আসি।”
রুমটেকের পথে
সকালে উঠে প্রথম যে শব্দটা কানে এলো, সেটা বৃষ্টির নয়—ছিল পাখির ডাক। জানালার কাচ তখনো সেঁতসেঁতে, বাইরের পাহাড়টা ঘুম থেকে উঠছে ধীরে ধীরে, মেঘের চাদর খুলে। রাত্রি তখন চা বানাচ্ছিল, মুখে হালকা হাসি।
“আজ বৃষ্টি কম। রওনা দিই, রুমটেক ডাকে।”
রুমটেক মনাস্টেরি—গ্যাংটক থেকে প্রায় ২৩ কিমি দূরে, এক ঘন সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে তৈরি এই বৌদ্ধ মঠ। অনেকেই শীতকালে যায়, কারণ তখন আকাশ পরিষ্কার থাকে। কিন্তু আমাদের যাত্রা বর্ষায়—কুয়াশা আর নরম বৃষ্টির আচ্ছাদনে।
হোটেল থেকে বেরিয়েই বুঝলাম, গাড়ির জানালায় ধারা ধারা জল। লাকপা ভাই আবার আমাদের সঙ্গী হলেন। পাহাড়ি রাস্তা ধীরে ধীরে উঠছে, আর বাইরের দৃশ্য কুয়াশার আড়াল-আবডালে হারিয়ে যাচ্ছে।
“এই রাস্তা কিন্তু অনেক পুরনো,” লাকপা ভাই বলতে শুরু করলেন। “এই পথেই অনেক আগে তিব্বত থেকে লামারা হেঁটে এসেছিলেন। আপনি এখন যে মনাস্টেরি দেখতে যাচ্ছেন, সেটাই সিকিমের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।”
গাড়ির জানালা খুলতেই ঠান্ডা হাওয়া গায়ে এসে লাগল। সোঁদা মাটির গন্ধ, ভেজা গাছের পাতা, আর মাঝে মাঝে দূরের কোনও ঘণ্টার মৃদু শব্দ যেন আমাদের পথ দেখাচ্ছে।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর পৌঁছালাম রুমটেক। গেট পেরিয়ে ওপরে উঠতে হয় কয়েকটা ঢালু সিঁড়ি ধরে। আমরা ধীরে ধীরে উঠছিলাম, মাথার উপর তখনও ছিটেফোঁটা বৃষ্টি।
মনাস্টেরির মূল প্রাঙ্গনে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল সেই বিশাল কাঠের দরজার দিকে, যার গায়ে আঁকা তিব্বতি রঙের প্রতীকচিহ্ন। ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা। যেন এখানে শব্দও শিষ্টাচার মেনে চলে।
ভেতরে ঢুকেই দেখি, লাল পোশাক পরা কয়েকজন লামা প্রার্থনায় বসে আছেন। মন্ত্রপাঠের একটানা সুর বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে মিলে যেন এক অদ্ভুত তাল তৈরি করেছে।
রাত্রি ফিসফিস করে বলল, “এই জায়গাটায় দাঁড়ালে একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়। কেমন যেন নিজেকে খুব ছোট মনে হয়, অথচ খুব পূর্ণ।”
আমি মাথা নেড়ে চুপ করে থাকলাম। চারদিকে প্রার্থনার সুর, বাতাসে ধূপের গন্ধ, আর দূরে পাহাড়ের কোলে মেঘের ঢেউ।
এক কোণে দেখি, এক লামা বসে একজন শিশুকে কিছু শেখাচ্ছেন—তিব্বতি ভাষায় কিছু লিখিয়ে নিচ্ছেন খাতায়। শিশুটি মাথা নিচু করে ধ্যানের মতো মন দিয়ে লিখছে। সেই দৃশ্যটা কিছুক্ষণের জন্য আমার চোখ আটকে রাখল।
“চল, পিছন দিকের চত্বরে যাই,” বলল রাত্রি।
পিছনের দিকে ছোট একটা জলাশয়, যার ধারে বসার জন্য পাথরের বেঞ্চ। আমরা সেখানে গিয়ে বসলাম। দূরের পাহাড় কুয়াশায় ঢাকা, মাঝে মাঝে সেই কুয়াশা সরে গিয়ে বেরিয়ে আসে এক চিলতে সবুজ।
“জানিস,” রাত্রি বলল, “তুই যতই প্ল্যান কর, পাহাড় সবকিছু পালটে দেয়। এখানে এসে সব হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়। তবে একরকম শান্তিও আসে।”
আমি বললাম, “তাই তো এমন জায়গায় এলেই নিজের মধ্যে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।”
একটা ছোট বাচ্চা মঠের আঙিনায় খেলছে। ওর হাতে ঘুরছে এক চকচকে প্রার্থনা চাকা। ওর মুখে সেই বিশেষ শান্তি যা আমরা বড় হয়ে হারিয়ে ফেলি।
আমরা অনেকক্ষণ বসে রইলাম সেখানে। তারপর ধীরে ধীরে ফেরার পথে নামলাম। পাহাড়ি পথ তখনও স্যাঁতসেঁতে, কিন্তু হাঁটতে কোনো কষ্ট লাগছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এই পাহাড়ের স্তব্ধতাই যেন একরকম গান হয়ে বাজছে ভেতরে।
তাশি ভিউ পয়েন্ট আর রাত্রির অভিমান
পরদিন সকালটা একটু পরিষ্কার ছিল। আকাশ একেবারে নীল নয়, কিন্তু কালো মেঘের দলও নেই। হোটেল ম্যানেজার বললেন, “আজ তাশি ভিউ পয়েন্টে গেলে দেখা মিলতে পারে কাঞ্চনজঙ্ঘার।”
এই আশায় ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। পথের দুপাশে কুয়াশা একটু কম, চা বাগান আর পাহাড়ি গাছের ভেজা সবুজ ছোঁয়া ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। গাড়িতে বসেই রাত্রি জানালার কাচ খুলে বলল, “এই রকম সকাল শহরে কোথাও হয় না, হয়তো এই কারণেই আমি বারবার পাহাড়ে ফিরে আসি।”
তাশি ভিউ পয়েন্ট পৌঁছাতে সময় লাগল না। জায়গাটা একটা ঢালের উপর—সেখানে দাঁড়িয়ে একদিকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার শৃঙ্গ, আর অন্যদিকে গভীর উপত্যকা। কিন্তু আমরা পৌঁছাতেই দেখি, আবার হালকা কুয়াশা নামতে শুরু করেছে।
“আজও হয়তো দেখা যাবে না,” আমি হতাশ হয়ে বললাম।
“সব দেখা তো চোখ দিয়ে হয় না,” রাত্রি হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলল। “কিছু দেখা হয় শুধু অনুভব দিয়ে।”
আমি তাকিয়ে রইলাম ওর মুখের দিকে। ঠোঁটে একটুও হাসি নেই, চোখে কিছু জমে আছে—যেটা হঠাৎ যেন আমাকেও ছুঁয়ে গেল।
“তুই ঠিক আছিস তো?” আমি আস্তে করে জিজ্ঞাসা করলাম।
ও মাথা নিচু করে বলল, “জানিস, অনেক কিছুই না-বলা থেকে যায়। পাহাড়ে এলে সেগুলো আবার মনে পড়ে।”
আমি চুপ করে গেলাম। হাওয়ার সঙ্গে একটা নিরবতা আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এক সময় রাত্রি বলল, “একসময় ভাবতাম, জীবন অনেক পরিষ্কার হবে। কিন্তু এখন বুঝি, কুয়াশার মতো সবকিছু ধোঁয়াটে হয়, আর তাতেই হয়তো সে সুন্দর।”
আমরা ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলাম। পয়েন্টের নিচে একটি ছোট পাহাড়ি মেলা বসেছে—দু-তিনটি স্টল, সেখানে স্থানীয় কারুশিল্প, গৃহসজ্জার জিনিস, আর একপাশে গানের দল।
এক বৃদ্ধা হাতে বানানো পশমের পুতুল বেচছেন। তিনি বললেন, “এই সময় কম লোক আসে, কিন্তু যারা আসে, তারা প্রকৃতিকে ভালোবাসে। আপনারা সেই ভালোবাসার লোক।”
আমরা পুতুল কিনে নিলাম। পুতুলটির মুখে ছিল একরকম হাসি, যা মনে হয় কোনো ভেতরের কথার প্রকাশ।
রাত্রি এবার একটু হেসে বলল, “এই মেলার চেয়ে বড় মেলা তো আমাদের মনেই বসে আছে। শুধু সেটা কেউ দেখতে পায় না।”
আমি বললাম, “হয়তো আমরা নিজেরাই দেখতে ভয় পাই।”
সেদিন বিকেলে ফেরার সময় রাত্রি আর আগের মতো হাসছিল না। গাড়িতে বসে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটা হাত ওর হাতে রাখলাম। ও চোখ বন্ধ করে রইল কিছুক্ষণ, তারপর আস্তে বলল, “তুই জানিস না, কিছু অনুভব এমন হয়, যেগুলো বলে ফেলা যায় না। শুধুই বয়ে বেড়াতে হয়।”
আমাদের গাড়ি তখন আবার গ্যাংটকের দিকে ফিরছে। জানালার বাইরে মেঘ নামছে আবার, পাহাড় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সাদা কুয়াশার চাদরে।
নাথুলার পথে জমে থাকা কথা
সকালের ঘুমটা যেন একটু ভারী ছিল। বাইরে তাকিয়ে দেখি, পাহাড় জেগে উঠেছে আবারও মেঘে ঢাকা চাদর মুড়ি দিয়ে। ঘরে রাত্রি নেই। দরজা খুলেই দেখি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফির কাপ হাতে কুয়াশার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি কিছু না বলে পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ও বলল না কিছু, আমি বললাম না কিছু। কিন্তু জানি, দু’জনের মধ্যে একটা জমাট অনুভব থরথর করে কাঁপছে।
আজকের গন্তব্য—নাথুলা পাস। প্রায় ১৪,০০০ ফুট উচ্চতার এক সীমান্তপথ, ভারত-চীন সংযোগস্থল। সেখানে পৌঁছাতে হলে আগে অনুমতি নিতে হয়, হালকা অক্সিজেনের অভাব থাকে, কিন্তু বর্ষাকালে গেলে রাস্তা বন্ধ হবার ভয়ও থাকে।
তবু রাত্রি জেদ ধরে বলেছিল, “চল, যাবই। শেষ দিনটা থেমে থেকে নয়, এগিয়ে চলেই কাটাবো।”
গাড়ি রওনা দিল। পথে ছোট ছোট ঝর্ণা, পাহাড়ি বন আর মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সেনা ঘাঁটি। গ্যাংটক থেকে বেরিয়ে যতই উপরের দিকে উঠতে লাগলাম, হাওয়া হয়ে উঠছে পাতলা, ঠান্ডা আর স্পর্শকাতর।
হঠাৎ রাত্রি বলল, “তুই কি জানিস, আমি তোকে এই ট্রিপে শুধু পাহাড় দেখানোর জন্য আনিনি?”
আমি একটু চমকে বললাম, “তাহলে?”
ও মাথা নিচু করে বলল, “তোর সঙ্গে অনেকদিনের একটা জমানো কথা ছিল। কিন্তু এই শহরে, এই কুয়াশায়, এই নির্জনে না এলে সেটা বলা যেত না।”
গাড়ি তখন থেমে গেল এক বিশ্রামপয়েন্টে। আমরা নামলাম। ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লেগে যাচ্ছিল সুতির জামা ভেদ করে। আমরা একপাশে দাঁড়ালাম, যেখানে দূরে পাহাড়, আর তার ওপারে শুধু মেঘ আর সীমান্ত।
রাত্রি বলল, “তুই জানিস, আমি তোকে শুধু বন্ধু হিসেবে কখনও দেখিনি।”
আমি স্তব্ধ। বুকের ভিতরে হালকা একটা কাঁপুনি।
“আমি ভয় পেয়েছিলাম সবকিছু বদলে যাবে যদি তোকে বলি। কিন্তু তুই এখন আমার সামনে। আমি আর চুপ থাকতে পারছি না।”
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তখনই পাশের পাহাড়ের ওপর থেকে কুয়াশা সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার এক অংশ দৃশ্যমান হয়ে উঠল—বুকের মধ্যে যেন কারও আলতো হাত পড়ল। সেই আলো, সেই ঠান্ডা আর সেই মুহূর্তে, আমার কণ্ঠ কেঁপে গেল।
“রাত্রি, আমি হয়তো অনেক কিছু বুঝিনি। হয়তো এড়িয়ে গেছি। কিন্তু আজ এই পাহাড়, এই বাতাস, তোর চোখ… আমায় পাল্টে দিচ্ছে।”
আমরা দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তখনই হালকা বৃষ্টি শুরু হল—ছোট ছোট কণাগুলো গাল বেয়ে নামছে।
“এই পাহাড়ের বৃষ্টি যেন মুছে দেয় সব দ্বিধা,” বলল রাত্রি।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। নাথুলা পাসে পৌঁছালাম প্রায় দুপুরে। চারপাশে সেনাবাহিনীর গাড়ি, পতাকা, আর পাহাড়ের বুক চিরে চলে যাওয়া রাস্তা।
ওখানে দাঁড়িয়ে, আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম দীর্ঘক্ষণ। পাহাড় তখন চুপ, কুয়াশা নেমে আসছে আবার। কিন্তু আমাদের চোখে, ঠোঁটে, মনে জমে থাকা কথাগুলো ধীরে ধীরে ভিজে যাচ্ছে।
পাহাড়ের বিদায়ে
সিকিমে শেষ রাত। হোটেলের ঘরে ব্যাগ গুছিয়ে রাখা, তবুও মনে হচ্ছিল কিছু ফেলে যাচ্ছি—কোনো অনুভব, কোনো অসমাপ্ত কথা, বা হয়তো পাহাড়ের কোনও চুপচাপ হাসি।
রাত্রি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরের অন্ধকারে হালকা বৃষ্টি, আর দূরের পাহাড়ে মেঘ নেমে এসে গায়ে মেখে আছে। ঘরের আলো নিভু নিভু, যেন বিদায়ের আগে মনও নিঃশব্দ হয়ে গেছে।
“তুই জানিস, এই জায়গাটা আমার কাছে একটা পালিয়ে যাওয়ার ঠিকানা ছিল,” বলল রাত্রি।
“আর এখন?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“এখন মনে হচ্ছে, এই পাহাড়ই আমায় বলে দিচ্ছে—ফিরে যা। সব বলেছিস, যা চেপে রেখেছিলি, তা মেঘের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিস। এবার আবার শহরে ফিরে গিয়েও সত্যি বাঁচতে হবে।”
আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে থাকলাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, গ্যাংটকের রাস্তা নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে কোনো গাড়ি আসছে, যাচ্ছে। শহরও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে পাহাড়ের কোলে।
সকালে উঠে দেখি, আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার। আজ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে—সাদা, স্থির, নীরব এক মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে।
রাত্রি বলল, “দেখ, শেষ দিনেও পাহাড় আমায় মুখ ফিরিয়ে দেয়নি।”
আমি ক্যামেরা তুললাম, কিন্তু ক্লিক করলাম না। বললাম, “এই দৃশ্য ক্যামেরায় না, মনে রাখতে চাই।”
আমরা হোটেল ছাড়লাম। গাড়ি আবার নিচের দিকে নামছে। পেছনে পাহাড়ের দৃশ্য ছোট হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর এক অদৃশ্য টানে জড়িয়ে রইল। পাহাড় যেমন কাউকে চিরকাল ধরে রাখে না, তেমনই কাউকে একেবারে ছেড়েও দেয় না।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের অপেক্ষা করছিলাম। রাত্রির চোখে জল ছিল না, কিন্তু গলার স্বর কিছুটা নরম।
“এই সফরটার জন্য তোকে ধন্যবাদ,” বলল ও।
আমি বললাম, “তুই যে আমায় ডাকলি, সেই জন্য তোকেই ধন্যবাদ। আমি যদি না আসতাম…”
রাত্রি হাত ধরে বলল, “তাহলে তুই হারিয়ে ফেলতি নিজেকে। পাহাড় তোকে ফিরিয়ে দিয়েছে।”
ট্রেন আসতে থাকল। শহরে ফেরার সময় হল। কিন্তু আমরা জানি, আমাদের ভেতরে একটা পাহাড় রয়ে গেল—যেখানে কুয়াশা নামে, বৃষ্টি পড়ে, আর ভিজে থাকে কিছু না-বলা ভালোবাসা।
শেষ




