সায়ন্তন চক্রবর্তী
১
আকাশ ছিল ধূসর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল পেরিয়ে এসেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু সূর্য যেন সকালেই হেরে গিয়েছে মেঘের জোরে। শান্তিনিকেতনের মাঠ তখন প্রায় ফাঁকা, হেমন্তের শুষ্ক হাওয়া ঝরে পড়া পাতাগুলোকে ঘূর্ণির মতো ঘুরিয়ে নিচ্ছে। অনির্বাণ নিজের হোস্টেলের ঘরের জানালার পাশে বসে শেষ পৃষ্ঠা পড়ছিল একটি পুরোনো কাগজের কাটিং—যেখানে অর্ধশতক আগে ছাপা হয়েছিল এক আশ্চর্য সংবাদ: “পাথরঘাটার গোপন ঘরে তান্ত্রিকের ছায়া—ভয়ের আতঙ্কে গ্রাম ছেড়েছে বাসিন্দারা।” খবরটা ছিল ভাসা-ভাসা, তেমন নির্ভরযোগ্য না, কিন্তু গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গত তিন বছর ধরে অনির্বাণ কাজ করছে বাংলার লোকবিশ্বাস ও তান্ত্রিক সাধনার উপর। শান্তিনিকেতনের বিশ্ববিদ্যালয়ে তার গবেষণার বিষয় ছিল, “পূর্বভারতের লুপ্তপ্রায় তন্ত্রশিক্ষা ও জনচর্চা: বাস্তবতা বনাম কল্পকাহিনি।” প্রথমদিকে শুধু পত্রপত্রিকায় আর লোকমুখে পাওয়া কথা নিয়েই এগিয়েছিল সে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার মধ্যে এক ধরনের টান জন্মেছিল এই ভৌতিক ইতিহাসগুলোর সত্যতা যাচাই করার।
দুই সপ্তাহ আগেই শান্তিনিকেতনের হাটে এক লোক তাকে বলেছিল,
“আপনি যদি সত্যিই সাহসী হন, তবে পাথরঘাটার ‘তান্ত্রিকের পালঙ্ক’ দেখতে যান। অনেকে গেছেন, ফেরেননি। যারা ফিরেছেন, তারা তো মানুষ হিসেবেই আর ফিরে আসেনি।”
অনির্বাণ হেসে বলেছিল, “আমি গবেষক। আমার কাছে গল্প নয়, দরকার প্রমাণ।”
লোকটা হঠাৎ খুব গম্ভীর হয়ে বলেছিল, “তবে প্রমাণের লোভেই মরবেন।”
সেই কথাটা এখনও কানে বাজছে।
অনির্বাণ ঠিক করেছিল, এবার সরেজমিনে যাওয়া দরকার। পাথরঘাটা—বীরভূম জেলার প্রান্তবর্তী এক গ্রাম। মূল রাস্তা থেকে তিন কিলোমিটার ভিতরে, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক যায় না, বিদ্যুৎ আসে না, আর রাত নামলেই গ্রামের লোকজন ঘরবন্দি হয়ে পড়ে।
হোস্টেলের ব্যাগ গোছাতে গোছাতে সে আবার ভেবে নিল তার প্ল্যান—আগামীকাল সকালে শান্তিনিকেতন থেকে বাসে করে দু’ঘণ্টার পথ বোলপুর, সেখান থেকে রিকশা বা ভ্যান নিয়ে পৌঁছাবে সোনাঝুড়ি, আর সেখান থেকে হাঁটা পথ। সঙ্গে রাখছে তার নোটবই, ক্যামেরা, ভয়েস রেকর্ডার, কিছু শুকনো খাবার, এক বোতল জল, আর একটা ছোট্ট তামার তাবিজ—যেটা দাদু একসময় দিয়েছিলেন “সুরক্ষার জন্য”।
সন্ধে গড়িয়ে রাত নামল। হোস্টেলের করিডরে হাঁটার শব্দ, রাতের খাওয়া শেষে চায়ের কাপ হাতে বসে থাকা ছাত্রদের গল্প—এসব ছাপিয়েও অনির্বাণ যেন এক অদৃশ্য কিছুর উপস্থিতি অনুভব করছিল। তার ঘরের আয়নাটায় হঠাৎ চোখ পড়ে গেল। নিজের মুখটাই যেন কেমন অচেনা লাগল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আয়নায় সে নেই, কেউ অন্য কেউ তাকিয়ে আছে।
ঘাড়টা ঘুরিয়ে নেয় অনির্বাণ। তারপর আবার জানালার পাশে বসে পড়া শুরু করল, কিন্তু একরকম অস্থিরতা এসে জমে গেছে বুকের মধ্যে।
পরদিন সকালবেলা বোলপুরে নামার পর ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল। স্থানীয় এক দোকানি যখন শুনল সে পাথরঘাটায় যাচ্ছে, তখন বলল,
“আপনি লেখাপড়ার লোক, ওইসব জায়গায় যাওয়া ঠিক হবে না। সেখানে রাত কাটানো তো দূরের কথা!”
“আমি গবেষক,” অনির্বাণ আবার বলল।
“গবেষক হন বা রাজা হন, ওই ঘরে গেলে মানুষ আর আগের মানুষ থাকে না।”
“ঘরটা এখনও আছে?”
“আছে। কিন্তু কেউ সেখানে যায় না। আপনি যদি যান, দেখে আসুন। তবে একটা কথা মনে রাখবেন—আয়নাটায় চোখ দিয়েন না।”
অদ্ভুত ভাবে, এই কথাটা সে আগেও শুনেছে। পাথরঘাটার তান্ত্রিক ঘরের মধ্যকার আয়না—যেটা নাকি বহু বছর আগে কালাপাহাড় পর্বতের এক শিষ্য এনে দিয়েছিল সেই তান্ত্রিককে, আর সেটাই তার সমস্ত শক্তির কেন্দ্রবিন্দু।
রওনা দিল অনির্বাণ। শেষ পঁচিশ মিনিট পায়ে হাঁটা রাস্তা, বনের ভেতর দিয়ে। কাঁটা গাছ, শুকনো পাতা আর স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ।
পথের মাঝে হঠাৎ এক বুড়ো লোক দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমি যদি সত্যিই যেতে চাও, তবে নিয়ে যাও এটা।”
সে একটি কাঠের তাবিজ এগিয়ে দিল।
“এইটুকু রাখো গলায়। আর কিছু না হোক, সময় হলে সেটা নিজেই সাড়া দেবে।”
“আপনি কে?”
“আমি একসময় ওই ঘরে থেকেছিলাম… থাকতাম…”
বলে সে অদৃশ্য হয়ে গেল বনের ভেতর।
অনির্বাণ যেন স্বপ্নের মধ্যে হাঁটছিল। মাথার মধ্যে একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছিল—তান্ত্রিক কে ছিলেন? কেন তাঁর পালঙ্ক আজও এত ভয় জাগায়? আয়নাটাই বা এমন ভয়ংকর কেন?
গ্রামে ঢোকার মুখে কেউ নেই। গাছের ছায়া পড়েছে পথের ওপর, যেন সূর্যও চায় না এখানে আলো ফেলতে। দূরে এক পুরনো বাড়ি, আধা-ভাঙা মাটির দেয়াল, ছাদে আগাছা। বাড়ির দরজাটা খোলা, জানালাগুলো বন্ধ। সামনে একটা পালঙ্ক দেখা যাচ্ছে দরজার ফাঁক দিয়ে—তার পায়ের দিকে খোদাই করা দুই সাপ মুখ খুলে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার দিকটা ঘেরা, ওখানেই নাকি সেই আয়না।
“আমি এসেছি,” নিজের মনে বলল অনির্বাণ।
এক পা, দু’পা করে বাড়ির মধ্যে ঢুকল সে। ঘরের বাতাস যেন হিমেল আর ভারি। কোনও জানালা খোলা নয়, কিন্তু বাতাসে ধূপের গন্ধ—না, ধূপ নয়, বরং পচা ধূপের মতো কিছু!
সে ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে ঢুকে বসে পড়ল পালঙ্কের এক কোণে। ছোঁয়াও দিল কাঠে—ঠান্ডা, কিন্তু কেমন যেন একটা সাড়া পাওয়া যায়। যেন একটা প্রাণ আছে।
ক্যামেরা সেট করে রাখল, ভয়েস রেকর্ডার চালু করল, নিজের নাম, সময়, জায়গা বলল। রাতটা এখানেই কাটাবে সে।
দরজাটা ঠেলে বন্ধ করল। একটা কুয়াশার মতো অনুভূতি ঢুকে পড়ল শরীরে।
হঠাৎ করেই মনে হলো, পালঙ্কটা যেন হালকা করে কেঁপে উঠল। বাইরে কোনও ঝড় নেই, কিন্তু ঘরের ভেতর বাতাস সাঁই সাঁই করে চলেছে।
ঘড়িতে রাত ন’টা। সে লেখালেখি শুরু করল, গবেষণার নোট তৈরি করছিল। কিন্তু একসময় চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ঘড়ি তখন ঠিক দশটা ছুঁইছুঁই করছে। হঠাৎ আয়নার মধ্যে ঝিলমিল আলো।
চোখ ফেরাল সে।
আর সেখানেই…
সে যা দেখল, তা কোনও মানুষ নিজের চোখে দেখার কথা কল্পনাও করতে পারে না।
নিজের প্রতিবিম্ব নয়, বরং এক কালো কুয়াশায় মোড়া চেহারা তাকিয়ে আছে তার দিকে। আগুনের মতো লাল চোখ, রুদ্রাক্ষের মালা গলায়, এক হাতে ত্রিশূল।
তান্ত্রিক।
সে উঠে দাঁড়িয়ে গেল।
ঘরের ভিতরে সেই সময় শুরু হল মৃদু কাঁপুনি। দেওয়ালের ছায়া নড়ে উঠল। বইয়ের পাতা খুলে উড়ে গেল, অথচ কোনও হাওয়া নেই!
এক ভয়ানক গর্জন ভেসে এল আয়নার দিক থেকে।
“তুই… এসেছিস… তোর আত্মা আমার চাই…”
অনির্বাণ চিৎকার করল, “কে তুমি? আমি গবেষক! আমি খুঁজতে এসেছি সত্য! ভয় দেখিয়ে থামাতে পারবে না আমাকে!”
কিন্তু সেই তান্ত্রিকের ছায়া তখন আয়নার গা বেয়ে এগিয়ে আসছে।
হ্যাঁ, আয়নার ভিতর থেকে নয়—ঠিক আয়নার গা বেয়ে, যেন কোনও তরল ছায়া, যা মিশে যেতে চায় বাস্তবে।
পালঙ্ক কাঁপছে। অনির্বাণ তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল, ব্যাগ থেকে তামার তাবিজটা বার করে গলায় পরল। সঙ্গে সঙ্গে একটা আলো ফুটল ঘরে, যেন পালঙ্ক কিছুটা শান্ত হলো। কিন্তু আয়নায় সেই ছায়া এখনও রয়েছে।
ঘড়িতে তখন ঠিক রাত বারোটা।
পথের বাঁকে একটা কুকুর ডাকল। দূর থেকে বনের গা ছুঁয়ে আসা রাত যেন আরও গাঢ় হয়ে এল।
আর অনির্বাণ? সে জানে—এই রাত, এই পালঙ্ক, এই আয়না—সব কিছুর শুরু এখনই। আর এই যাত্রা কোনও গল্পের নয়, বরং এক জীবন্ত অভিশাপের, যা তাকে টেনে নিয়ে যাবে ইতিহাসের এক অন্ধকার গহ্বরে।
২
বাতাস থেমে গেছে। ঘড়ির কাঁটা তখন গভীর রাত একটায় পৌঁছেছে। ঘরটা এক নিঃসাড় শূন্যতায় ভরা—যেখানে শব্দ বলে কিছু নেই, কেবল মাঝে মাঝে কাঠের ছেঁড়া শব্দ, যেন বহুদিন পর কেউ তার ঘুম ভাঙিয়েছে। অনির্বাণ খাটের এক পাশে বসে, ব্যাগ থেকে ছোট্ট টর্চটা জ্বালিয়ে খাতা বের করল, যদিও তার হাত কাঁপছিল।
কিন্তু এই ভয় তাকে থামাতে পারবে না। সে জানে, ইতিহাস লিখতে গেলে কেবল কাগজে কলম চললেই হয় না—চোখে চোখ রাখতে হয় অতীতের সঙ্গে।
তার নোটে লেখা:
> “ঘরটি নিঃসন্দেহে কিছুর আধার। তান্ত্রিক সাধনার শক্তি এখানে এখনও ঘনীভূত। আয়নাটি… এটি একটি প্রবেশদ্বার। সাধারণ আয়না নয়। তান্ত্রিক দিক থেকে এর ব্যবহার ‘সাধনমাধ্যম’ হিসেবে করা হতো, যা জগতের এক অজানা স্তরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। আমার অনুমান, এই পালঙ্ক এক গভীর মন্ত্রচক্রে বাঁধা, যার মূল কেন্দ্র আয়নাটিই। এখন জানতে হবে, কে ছিলেন এই তান্ত্রিক?”
সেই মুহূর্তে যেন সময়ই থেমে গেল। এক ঝলক আলো খেলল আয়নায়, তারপর ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যেকার বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আয়নার মধ্যে ভেসে উঠল এক দৃশ্য—মেঘলা আকাশ, কুয়াশাচ্ছন্ন মন্দিরের চূড়া, আর তার সামনে বসে আছে একজন।
তাঁর পরনে ছিল গাঢ় গেরুয়া বসন, গলায় রুদ্রাক্ষ, কপালে রক্তের টিপ, চোখ বন্ধ করে জপ করছেন।
“ভগবতী কালিকে… ছায়াময়ী… অভিষিক্ত করো তোমার দাসকে… আমি দেহ চাই না, আত্মা চাই না, চাই শক্তি… এমন শক্তি, যা অনন্তকাল বেঁচে থাকবে…”
এই মানুষটি—তান্ত্রিক অর্জুনানন্দ।
১৭৯৪ সালের এক শীতকাল। বাংলার পশ্চিম প্রান্তে, বৃটিশ প্রভাব থেকে দূরে, পাথরঘাটায় বসবাস করতেন তিনি। কেউ জানত না, তিনি কোথা থেকে এসেছেন। তাঁর কথা ছড়িয়ে পড়েছিল ধীরে ধীরে—তিনি নাকি মৃত আত্মার সঙ্গে কথা বলতে পারেন, আগুন ছুঁয়ে নিজের শরীরে দাগ ফেলতে পারেন, এমনকি কোনও মহিলার গর্ভে থাকা শিশুর ভবিষ্যৎও বলতে পারেন।
গ্রামের লোকেরা ভয় পেতে শুরু করল। কেউ বলত তিনি শিবের অবতার, কেউ বলত—তিনি রাক্ষস।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর গল্পটি ছিল তাঁর সাধনঘর নিয়ে—এই ঘর, এই পালঙ্ক, এই আয়না।
লোককথায় আছে, অর্জুনানন্দ এক রাতে “কালতন্ত্র” নামক এক গোপন সাধনার মাধ্যমে আয়নাটিকে জীবন্ত করে তোলেন। সে আয়নার ভেতর দিয়ে তিনি দেখতে পেতেন অন্য জগৎ, যেখানে আত্মা ঘুরে বেড়ায়, যেখানে সময় নামে কিছু নেই। তিনি সে জগতের সঙ্গে কথা বলতেন, এমনকি আদানপ্রদান করতেন শক্তির।
তখনকার রাজা, রামকৃষ্ণ নারায়ণ সিংহ, একবার তাঁকে বলেছিলেন, “এই সাধনা বন্ধ করুন, পাথরঘাটা ভীতির গ্রাম হয়ে যাচ্ছে।”
তান্ত্রিক হেসেছিলেন, “ভয় সত্যি। ভয় থেকে জন্ম নেয় শক্তি। আর শক্তি চাইলে ভয় বানাতে হয় অস্ত্র।”
এরপর হঠাৎ করেই একদিন—তিনি উধাও হয়ে যান। ঘরটি সিল করে দেওয়া হয়। বলা হয়, তিনি সাধনার সময় নিজেই আয়নার মধ্যে ঢুকে পড়েছেন।
“তখনই শুরু হয় অভিশাপ,” পুরনো দলিল ঘেঁটে অনির্বাণ এই তথ্য পেয়েছিল আগেই।
সেই অভিশাপের ফলেই নাকি—পরবর্তী শত বছর ধরে, যে-ই ঘরটিতে একা রাত কাটিয়েছে, সে-ই বা তো পাগল হয়ে গেছে, নয়তো হারিয়ে গেছে।
সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা ১৯৩৬ সালের। শান্তিপুর কলেজের অধ্যাপক রামচন্দ্র নন্দী গবেষণার জন্য পাথরঘাটায় এসে এই ঘরে এক রাত কাটাতে চেয়েছিলেন। পরদিন সকালে তাঁকে পাওয়া গিয়েছিল খাটের নীচে গুটিয়ে থাকা অবস্থায়, চোখ ফেটে বেরিয়ে এসেছে রক্ত, আর মাটিতে লিখে গেছেন—“আয়নার ও-পাশে কেউ আছে…”
এই ঘটনার পরে ঘরটি বন্ধ হয়ে যায় প্রায় চল্লিশ বছর।
অথচ ১৯৭৯ সালে স্থানীয় এক যুবক, যার নাম ছিল কার্তিক, সাহস করে ঘরে ঢুকে এক রাত কাটিয়েছিল। সকালে সে সুস্থ অবস্থায় বের হয়েছিল। তার কথায়, “আমি কিছুই দেখিনি। শুধু আয়নার মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে দেখেছিলাম—তখনই বুঝেছিলাম আমি আর আমি নেই।”
তারপর থেকে গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, ঘরটি ‘বেছে নেয়’—কে তার ভিতরে থাকবে, কে হারিয়ে যাবে।
অনির্বাণ জানত, এসব শুধু কথার কথা নয়। কারণ, এই সব ঘটনার বেশির ভাগই দলিলপত্রে লিপিবদ্ধ আছে—থানায় ডায়েরি, ডাক্তারি রিপোর্ট, এমনকি কয়েকটা অদ্ভুত কবিতার বইতেও উল্লেখ আছে সেই তান্ত্রিকের।
সে উঠে দাঁড়াল, খাটের পাশের সেই জায়গাটার দিকে গেল, যেখানে শোনা যায়—এক গোপন কুঠুরি আছে, যেখান থেকে তান্ত্রিক শক্তির এক অশরীরী প্রবাহ আসে।
হাত দিয়ে টোকা দিতেই মাটির তলার কাঠটা একটু নড়ল। নিচে একটা ছোট্ট গর্ত।
সে ব্যাগ থেকে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে নিচে তাকাল। এক অদ্ভুত গন্ধ ভেসে এল। তেলের গন্ধ, পচা বীজ, আর সিঁদুরের মতো কিছু।
হাত দিয়ে ধীরে ধীরে তুলতেই এক পুরনো কাগজ পাওয়া গেল।
চটচটে, ছেঁড়া, আর তার মধ্যে লেখা:
> “কালরাত্রির চৌরঙ্গীতে বসেছে তিনি—
মুখহীন আত্মা যিনি পালঙ্কে বসে—
আয়নার মাঝে তাঁর হাত, চোখ জ্বলছে আগুনে—
যার ডাক শুনলে, তোমার আত্মা আর তোমার থাকে না…”
অনির্বাণ স্তব্ধ হয়ে গেল। কীসের কবিতা এটা? এর মানে কী?
সে তখনই বুঝল—এই ঘটনা, এই পালঙ্ক, এই আয়না—সবকিছু শুধুমাত্র তান্ত্রিক সাধনার একটা পরিণতি নয়। এর মধ্যে রয়েছে এক ভয়ানক অভিশাপ, যা সময়কে উপেক্ষা করে এখনও বেঁচে আছে।
আর সবচেয়ে বড় বিষয়… এই আয়নার মধ্য দিয়ে কেউ এখনো তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তার চোখে ভেসে উঠল এক দৃশ্য—আকাশ কালো, আগুন জ্বলছে, পালঙ্ক দুলছে। আর আয়নার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে একজন—যার চোখে আগুন, যার হাসিতে শোনা যায় হাজার বছরের শূন্যতা।
এই অধ্যায় শেষ করতে করতে অনির্বাণ জানে, সে যা খুঁজছিল, তা পেয়ে গেছে—কিন্তু সেই প্রাচীন অভিশাপ এখন ধীরে ধীরে তাকেও গ্রাস করতে শুরু করেছে।
৩
রাত তখন প্রায় শেষের পথে। আকাশে আলোর আভা ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে যেন আঁধারের দাপট বেড়েছে। অনির্বাণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার কাঁধে ব্যাগ, একহাতে টর্চ, অন্য হাতে সেই পুরনো কাগজটা—যার অদ্ভুত কবিতা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে তার।
অথচ আয়নার প্রতিচ্ছবিতে কিছু একটা যেন অস্বাভাবিক।
সে দেখছে আয়নাতে নিজের ছায়া—কিন্তু একটু দেরি করে নড়ে। যেন সেটি আয়না নয়, বরং কোন এক পর্দার ওপারে বসে থাকা অনির্বাণ নামক এক ছায়ামানব।
সেই মুহূর্তে সে অনুভব করল—ঘরটা নিঃসাড় হলেও, আসলে সে একা নয়।
❝আমি কে?❞
একটা স্বর ভেসে এলো। যেন আয়নার গভীরতা থেকে, যেন কাচের নিচে চেপে থাকা কোনো আত্মা ফিসফিস করে বলল।
অনির্বাণ ঘেমে উঠল। কিন্তু সে সাহস হারাল না।
সে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি কে? অর্জুনানন্দ? নাকি তুমি—আর কেউ?”
আয়নার ভিতরে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। সে আলোয় ভেসে উঠল এক মুখ—নয়, মুখ বলা যায় না, যেন এক ছায়া, যার শুধু দুটো আগুনের মতো জ্বলন্ত চোখ। আর সেই চোখ থেকে বেরিয়ে এলো তীক্ষ্ণ স্বর—
❝আমি তুমিই… যে সময় তুমি ভুলে গিয়েছ। আমি সেই ভয়, যে তুই লুকিয়ে রাখিস লেখার পেছনে। আমি সেই স্মৃতি, যেটা তোর স্বপ্নেও ফিরে আসে। আমি আয়নার চোখ।❞
অনির্বাণ চমকে উঠল। কী বলছে এই অস্তিত্ব? সে নিজে? কীভাবে?
তার মনে পড়ল ছোটবেলার একটা ঘটনা—তার দাদুর মৃত্যু হয়েছিল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। সবাই বলত, “তিনি নিজেকে দেখেই কেঁপে উঠেছিলেন।” আর তখন থেকে আয়না নিয়ে তার ভেতরে একটা অব্যক্ত ভয় রয়ে গেছে।
আয়না তখন ঝলসে উঠল।
❝তুই আবার আসবি। তুই ছাড়া কেউ পারবে না আমাকে মুক্তি দিতে। তোর মধ্যে সেই চিহ্ন আছে। তুই পালিয়ে যা, কিন্তু ফিরে আসতেই হবে।❞
তক্ষুনি আয়নার কাচে দেখা গেল এক মুহূর্তের জন্য…
এক প্রাচীন ঘর—রক্তমাখা কাপড়, তান্ত্রিকের হাসি, কালো ধোঁয়া, আর একটি শিশুর কান্না। শিশুটি তার বুকের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে—আর তার বুকের মাঝখানে আঁকা এক লাল রুদ্রাক্ষ।
অনির্বাণ হঠাৎ খেয়াল করল—তার বুকেও ঠিক সেই রকম এক কালি আঁকা রুদ্রাক্ষচিহ্ন আছে, যা সে বহু বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছে, কারণ তার মা বলতেন, “এটা তোমার জন্মচিহ্ন, আমাদের বংশের আশীর্বাদ।”
কিন্তু আজ প্রথমবার সে বুঝল—এটা আশীর্বাদ নয়, এটা চিহ্ন। পাথরঘাটার তান্ত্রিক বংশের উত্তরসূরি সে নিজেই।
তখন সে উঠে দাঁড়াল। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ। আয়নায় কেবল নিজের ক্লান্ত, বিভ্রান্ত মুখ।
সে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার যদি মুক্তি দরকার হয়, তাহলে আমাকেও জানতে হবে—তুমি কেন বন্দি? কে তোমায় এখানে রেখে গেছে?”
সেই মুহূর্তে আয়নার পেছনের দেওয়াল যেন একটু সরে গেল। সেখানে একটি ছোট বৃত্তচিহ্ন—যেটি পুরনো তান্ত্রিক মন্ত্রে ‘ত্রিবিন্দু বেদি’ নামে পরিচিত। এই চিহ্ন ধরা পড়ে শুধুই তাদের কাছে, যাদের চোখে ‘তান্ত্রিক দৃষ্টি’ আছে।
অনির্বাণ নিজের হাতটা তুলে দিল সেই চিহ্নের উপর। হঠাৎ তার আঙুলে কেটে রক্ত পড়ল।
আর রক্ত পড়তেই আয়নার ভিতরে গর্জে উঠল একটা শব্দ—একটি দরজার খুলে যাওয়ার শব্দ।
সে পিছিয়ে আসতে না আসতেই, আয়নার মধ্যে খুলে গেল এক প্রবেশদ্বার। সে দেখতে পেল এক অন্ধকার সিঁড়ি, যা নেমে যাচ্ছে অনেক নিচে।
মাটির নিচে—আলোর বাইরে—যেখানে হয়তো সময়ও চলে গেছে অন্য গতিতে।
আর সেই গুহার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল সেই চেহারা—তান্ত্রিক অর্জুনানন্দ নিজে?
নাকি তারই আরেক ছায়া?
আর সে বলল,
❝তুই এসেছিস, যেমন আশা ছিল। এবার শুরু হবে প্রকৃত পরীক্ষা। আয়নার চোখ আজ খোলা, পালঙ্ক আজ জেগে উঠবে।❞
অনির্বাণ আর দাঁড়িয়ে থাকল না। সেদিন রাতেই সে পাথরঘাটা ছেড়ে চলে যায় কলকাতায়, তবে শরীর থেকে যেন সেই আলো, সেই ঘরের গন্ধ আর সেই চোখের আতঙ্ক কিছুতেই দূর হচ্ছিল না।
কিন্তু সে জানত, পালিয়ে রক্ষা নেই। এখন শুরু হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়। আয়নার চোখ তাকে দেখে ফেলেছে। এখন সে আর শুধু একজন অনুসন্ধানকারী নয়, বরং সেই গল্পেরই একজন চরিত্র।
আর আগামী দিনে যা কিছু ঘটবে, তার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই, বরং—আয়নাটির।
৪
কলকাতা — সকাল আটটা। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, দক্ষিণ শহরতলির এক নির্জন পাড়ায় দাঁড়িয়ে আছে ‘শ্রীভাসান লাইব্রেরি’। শতাব্দীপ্রাচীন এই পাঠাগার এখন প্রায় উপেক্ষিত, শুধু কিছু গবেষক আর বইপাগল মানুষই এর গন্ধ জানে। লাইব্রেরির এক কোনায় ধুলোমাখা পুরনো বইয়ের তাক, কাঠের সিঁড়ি, আর তার উপরে বিশাল রঙচটা বোর্ডে লেখা — “প্রাচীন ধর্মতাত্ত্বিক শাখা”।
অনির্বাণ এই লাইব্রেরিতে এসেছে এক সন্ধানের খোঁজে—এক অদ্ভুত নাম তার মাথায় ঘুরছে গত রাত থেকে, আয়নার চোখে যেটা ঝলক দিয়েছিল—“কোশিকান্ত”।
সে জানে না এটা একটা বই, নাকি মন্ত্র, নাকি কারো নাম। কিন্তু এটুকু জানে—এটাই তার পরবর্তী চাবিকাঠি।
লাইব্রেরির পুরনো কর্মী নিরঞ্জনবাবু তাকে দেখে চমকে উঠলেন।
— “এই সময় কেউ আসে না বাবা, কী খুঁজছো?”
— “কোশিকান্ত নামে কিছু কি আছে এখানে?”
— “আরে! এই নাম কোথা থেকে পেলে?” নিরঞ্জনবাবুর চোখে অবাক।
অনির্বাণ বুঝল, সঠিক পথে সে চলেছে।
নিরঞ্জনবাবু ধীরে ধীরে একটা ধুলোমাখা রেজিস্টার বের করলেন। উল্টে দিলেন পাতাগুলো।
— “আছে… একটা রেকর্ড আছে। ১৯১১ সালে এই নামে একটা পাণ্ডুলিপি এসেছিল—কিন্তু কেউ খোলেনি। কারণ ওটা ছিল ‘রক্ততন্ত্র’-এর উপর লেখা।”
— “রক্ততন্ত্র?” অনির্বাণের কণ্ঠে কৌতূহল।
— “হ্যাঁ,” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “রক্ততন্ত্র হল সেই তন্ত্রশাস্ত্র, যেখানে জীবনের শক্তিকে আহ্বান করা হয় রক্তের বিনিময়ে। এটা বেদ বা পুরাণে নেই—এটা মুখে মুখে চলত, প্রধানত শ্মশানঘাট ও সীমান্ত অঞ্চলের তান্ত্রিকদের মধ্যে। আর ‘কোশিকান্ত’ হল সেইসব নিয়মের পুথি, যা লিখেছিল এক মহাতান্ত্রিক—শোনা যায়, তিনিই ছিলেন অর্জুনানন্দ।”
এই তথ্য অনির্বাণের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে দিল।
তাহলে সে বইটা আজও এখানে আছে?
— “দেখো বাবা,” নিরঞ্জনবাবু একদম নিচের তাক থেকে একটা প্যাকেট বের করলেন। কাপড়ে মোড়া, সিল করে রাখা। ওপরে কালি দিয়ে লেখা ‘শুধু অনুমতিপ্রাপ্ত পাঠকের জন্য’।
— “তুমি পড়তে চাও?”
— “হ্যাঁ, আমি অনুমতিপ্রাপ্ত।” অনির্বাণের গলায় কাঁপা।
প্যাকেট খুলতেই একটা গন্ধ ভেসে এলো—পুরনো তেল, চন্দনের ধোঁয়া, আর কোথাও যেন রক্তের গন্ধ।
ভেতরে ছিল তালপাতায় লেখা এক পুথি। লেখা শাঁখ লিপিতে, অসম্ভব সূক্ষ্ম আর প্যাঁচালো। কিন্তু অনির্বাণ কিছু কিছু বুঝতে পারছিল, কারণ তার দাদুর কাছে সে শিখেছিল এই লিপির প্রাথমিক পাঠ।
প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
“এই গ্রন্থ শুধু তারাই খুলতে পারবে, যাদের শরীরে বহমান প্রাচীন রক্তচিহ্ন—
যাদের বংশে আছে ‘চতুর্বিন্দু’।
যারা আয়নার চোখে নিজেদের অতীত দেখে ফেলেছে।
তাদের হাত ধরেই মুক্তি পাবে পালঙ্ক ও আয়নার অভিশাপ।”
চতুর্বিন্দু? অনির্বাণ ভাবল—এ কি সেই রুদ্রাক্ষ চিহ্ন, যা তার বুকে আছে?
পরের পাতায় একটি মন্ত্র:
“রক্তবিন্দুর দীক্ষা—
যা দিয়ে আয়নার প্রবেশপথ খোলে।
কেবল যখন রক্ত মিলবে প্রতিচ্ছবির সঙ্গে,
তখনই খুলবে আয়নার গুহা।”
অর্থাৎ, আয়নার ভেতরের জগত আসলে একটি তান্ত্রিক স্তর, যেখানে প্রবেশ করতে গেলে প্রয়োজন হবে রক্ত। তবে স্রেফ যেকোনো রক্ত নয়—বংশগত চিহ্ন থাকা রক্ত।
পাঠ চলতে থাকল। অনির্বাণ আবিষ্কার করল, পালঙ্কটি ছিল এক তান্ত্রিক স্থিতি আসন, যার নিচে এক ‘জীব-মন্ত্রচক্র’ লুকানো ছিল। এই চক্র প্রতি শতকে একবার জেগে ওঠে, আর ডাকে সেই আত্মাকে, যে একদিন তাকে বন্দি করেছিল।
আরও ভয়ঙ্কর তথ্য বেরোল—এই পালঙ্কের মাধ্যমে অর্জুনানন্দ এক ‘জীব-প্রতিষ্ঠা’ করেছিলেন। তার আত্মার একটি অংশ—তার ‘চক্ষু’—রয়ে গেছে আয়নার মধ্যে, আর বাকিটা আছে পালঙ্কের কাঠে।
এখনো সে আত্মা সম্পূর্ণ ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু যেই কেউ তাকে ডাকে—সে পুনরায় জীবিত হয়ে ওঠে।
এখন প্রশ্ন—কেন অনির্বাণ?
তখন সে পাণ্ডুলিপির এক জায়গায় পেল একটা শ্লোক:
“সপ্তম পুরুষে আসবে এক যুবক,
যার জন্মচিহ্নে চার বিন্দু লুকানো—
সে জানবে না, সে-ই তন্ত্রের উত্তরসূরি,
কিন্তু তার হাতেই লেখা আছে মুক্তির পথ।”
অনির্বাণের চোখে জল এসে গেল। তার দাদু ছিলেন সপ্তম পুরুষ। তাহলে সে—অষ্টম? নাকি—তন্ত্র তাকে নিজের মত করে গড়েছে?
ঠিক সেই সময় পাণ্ডুলিপির শেষে সে পেল একটি মানচিত্র—পাথরঘাটার বাড়ির নিচের এক গোপন কুঠুরির দিকনির্দেশ।
আর সেই কুঠুরিতে আছে তান্ত্রিকের মূল ‘রক্তপাত্র’, যেখানে আছে তার আত্মার শেষ অস্তিত্ব—আর তাতেই নিহিত আছে আয়না ও পালঙ্কের ক্ষমতা।
কিন্তু মানচিত্রের নিচে লেখা ছিল এক ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা:
“যদি তুমি প্রবেশ করো সেই কুঠুরিতে—
আর নিজেকে চিনে না আসো—
তাহলে নিজেই হয়ে উঠবে পালঙ্কের পরবর্তী তান্ত্রিক,
আর মুক্তি নয়, বাঁধা হয়ে যাবে চিরজীবনের জন্য।”
অনির্বাণ জানে, এ পথ আর থামার নয়।
সে চোখ বন্ধ করে বলল, “আমি তৈরি। এবার আমায় ফিরে যেতে হবে পাথরঘাটায়। সেই কুঠুরি, সেই পালঙ্ক—আর আয়নার অন্ধকারের দিকে।”
লাইব্রেরি তখন নিঃসাড়। বাইরে রোদ উঠেছে, পাখিরা ডাকছে, শহর স্বাভাবিক।
কিন্তু অনির্বাণের চারপাশে যেন সবই নিঃশব্দ, কারণ তার ভিতরে শুরু হয়ে গেছে এক অদৃশ্য যাত্রা—যা আর থামবে না।
৫
দুই দিন পর, রাত সাড়ে এগারোটা। অনির্বাণ দাঁড়িয়ে আছে আবার সেই পুরোনো বাড়ির সামনে—পাথরঘাটা। বাইরে নিস্তব্ধতা, কুয়াশায় ঢাকা গলির মুখে সান্ধ্য আলো জ্বলছে মৃদু কম্পনে, ঠিক যেন কেউ নিঃশব্দে নিঃশ্বাস ফেলছে।
সে জানে আজকের রাত আর পাঁচটা রাতের মতো নয়। আজ কিছুর শেষ হবে না—বরং শুরু।
তার মনে পড়ল লাইব্রেরির সেই মানচিত্রের পাতায় আঁকা দিকনির্দেশ—“দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের ঘরের নিচে মাটি খুঁড়লেই মিলবে একটি লাল ইঁটের চৌকাঠ। তার মাঝেই আছে কুঠুরির দ্বার।”
ঘরটা খুঁজে পেতে কষ্ট হল না। সেই ঘর—যেখানে একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের প্রতিচ্ছবির অস্বাভাবিকতা দেখেছিল। এবার সে নিয়ে এসেছে ছোট একটা শাবল, টর্চ, আর এক বোতল গঙ্গাজল—সতর্কতা হিসেবে।
ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, খাটের নিচের মাটি এক সময় পাকা ছিল, কিন্তু এখন খানিকটা আলগা। সে ধীরে ধীরে খুঁড়তে শুরু করল।
প্রথমে ধুলো, তারপর কাদা, আর তারপর—ঠন করে উঠল ধাতুর মতো কিছু একটা।
সে আরও একটু খুঁড়ে দেখল, লাল ইঁটের মাঝখানে একটা আয়তকার কাঠের দরজা—মাঝখানে ছোট একটি কপার রিং। পাশে খোদাই করা এক অদ্ভুত চিহ্ন—চক্রের মধ্যে চারটি বিন্দু।
তার বুকের নিচে থাকা রুদ্রাক্ষ চিহ্ন হঠাৎ যেন গরম হয়ে উঠল।
সে রিংয়ে হাত দিল।
হঠাৎ চারপাশ কেঁপে উঠল। দরজাটা যেন নিঃশব্দে ‘নিঃশ্বাস’ ফেলল—কোনো শব্দ নেই, কিন্তু স্পষ্ট অনুভব।
একটা কাঁপা আলোয় সে দরজা খুলে নিচে নামতে শুরু করল।
কুঠুরি। দেয়ালজোড়া শালগাছের কাঠে মোড়ানো সিঁড়ি, যেন বহু বছর ধরে কেউ পা রাখেনি। টর্চের আলোয় চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে ধুলো—আর ধোঁয়ার মতো কিছু, যার উৎস বোঝা যাচ্ছে না।
সিঁড়ি শেষে সে পৌঁছালো এক গোল ঘরে।
ঘরের মাঝখানে এক পাথরের চৌকি, চারদিকে মোমবাতির চিহ্ন, এবং মাঝখানে একটা বড় রক্তলাল ‘আলতা’ দিয়ে আঁকা চক্র—যেটার মাঝখানে বসানো একটা কালো পাথরের পাত্র, যার নাম রক্তপাত্র।
আর চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে কিছু পুরনো মূর্তি—ভয়ঙ্কর মুখ, হাতজোড়া করে বসে থাকা মানবদেহ, ছিন্নমস্তার একাধিক প্রতিরূপ।
ঘরের এক প্রান্তে একটা পুরনো বাক্স। অনির্বাণ ধীরে ধীরে খুলল সেটা।
ভেতরে এক পুরনো কাপড়, যার ভাঁজে ভাঁজে লুকানো ছিল একটি ডায়রি। প্রথম পাতায় লেখা:
“অর্জুনানন্দ তান্ত্রিক, ১৮৯৯”
ডায়রির ভাষা জটিল, তবু কিছু অংশ পরিষ্কার—
“যখন আত্মা আর দেহ একে অপরকে অস্বীকার করে, তখন একমাত্র পালঙ্কই হয়ে ওঠে মধ্যস্থ স্তর। আমি একদা নিজের প্রাণ সঁপে দিয়েছি তান্ত্রিক চক্রে, কিন্তু আমার আত্মার অংশ বন্দি থেকে গেছে—এই কুঠুরিতে। তাকে মুক্তি দিতে চাই না, চাই পরবর্তী উত্তরসূরি আসুক, যিনি নতুন করে শুরু করবেন—রক্ত দিয়ে, আত্মা দিয়ে।”
হঠাৎ, ঘরের বাতাস ঘন হয়ে এল। চারপাশে শুরু হল অদ্ভুত গুঞ্জন।
চোখ ফেরাতেই সে দেখল—ঘরের দেয়ালে একে একে ফুটে উঠছে চিত্র—প্রথমে অর্জুনানন্দের রক্তাক্ত মুখ, তারপর এক নবজাতককে কোলে নিয়ে এক নারী পালঙ্কে শোয়াচ্ছেন, তারপর সেই নবজাতকের গায়ে আঁকা হচ্ছে রুদ্রাক্ষ চিহ্ন। অনির্বাণ চমকে উঠল।
সেই নবজাতক… সে নিজে?
এক পলকে সব যেন পরিষ্কার হল। সে ছিল পালঙ্কের ভবিষ্যত বাহক। তার জন্মের আগেই নির্বাচিত হয়েছে। হয়তো তার মা জানতেন—আর সেজন্যই এতদিন তাকে এড়িয়ে গেছেন, ভয় পেয়েছেন।
সে হাত রাখল রক্তপাত্রের উপর। আর তখনই শুরু হল এক অদ্ভুত কম্পন। ঘরের চারদিক যেন চকিতে ঝলসে উঠল—চিত্র ভেঙে গেল, অন্ধকারে ঘর কাঁপতে লাগল।
আর ঠিক তখনই এক ভয়ানক কান্নার শব্দ—শিশুর কান্না? নাকি আত্মার হাহাকার?
রক্তপাত্র থেকে ছিটকে উঠল এক বিন্দু লাল আলো, যা ঘরের মাঝে গিয়ে একটা ছায়া তৈরি করল।
সেই ছায়া স্পষ্টতই বলল—
❝শুরু হয়েছে।
কুঠুরির দ্বার আজ খুলেছে,
পালঙ্ক আজ জেগে উঠবে।
তুমি ফিরবে আবার সেই আয়নার কাছে।❞
অনির্বাণ তখনই বুঝে গেল—এ শুধু আত্মার ঘর নয়, এ এক তান্ত্রিক চক্র, যা অপেক্ষা করছে পূর্ণ হওয়ার। আর সে এই চক্রের কেন্দ্রবিন্দু।
৬
অনির্বাণ সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে এল। তার হাতে এখনো গায়ে রক্তের ছোপ লেগে থাকা ছোট্ট পাথরের পাত্র—রক্তপাত্র। এই পাত্রটা স্পন্দিত হচ্ছিল, যেন তাতে জীবনের ভেতরের কোনো পলস কাজ করছে।
ঘরের ছাদে ছোট একটা লণ্ঠন বাঁধা ছিল, সেটা অন্ধকারে দুলছিল হালকা বাতাসে। চারপাশে সব কিছু আগের মতই, কিন্তু একটাই পার্থক্য—বাতাস এখন ভারী, যেন অদৃশ্য কিছু তার চারপাশে ঘুরছে।
সে জানত, সময় এসেছে সেই পালঙ্কের মুখোমুখি হওয়ার। আগেও তো বসেছিল, আয়নার দিকে তাকিয়ে থেকেছিল। কিন্তু এবার আর শুধু দেখা নয়—এবার তাকে ‘চোখে দেখা’র বাইরে গিয়ে ‘চোখ খুলে দেখতে’ হবে।
সে ধীরে ধীরে ঘরের কেন্দ্রস্থল, সেই পালঙ্কটার সামনে গিয়ে বসল।
পালঙ্কের কাঠের ওপর আজ সন্ধ্যায় একটা নতুন দাগ দেখা যাচ্ছে—চক্রের মত, রক্তরঙা। অনির্বাণ নিজেই তৈরি করেনি ওটা, কিন্তু মানচিত্রের কুঠুরিতে যাওয়ার পর থেকেই এই দাগ ফুটে উঠেছে।
সে ডানহাত দিয়ে রক্তপাত্র ছুঁয়ে নিল। তারপর সে নিজের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে সামান্য আঁচড় কাটল।
রক্ত।
রক্তপাত্রে ছুঁইয়ে সে সেই দাগটার উপর রক্তের বিন্দু রাখল।
ঠিক তখনই পালঙ্কটা কেঁপে উঠল। না, গুঞ্জন নয়—মাটির গভীর থেকে কিছু যেন নাড়িয়ে উঠল।
ঘরের কোণায় রাখা আয়নার কাঁচে ভেসে উঠল সেই মুখ—আগের মতো বিকৃত নয়, এবার নিখুঁত স্পষ্ট—এক অবিকৃত পুরুষের মুখ, গম্ভীর চোখ, সাদা গালভরা দাড়ি, কপালে রক্তচিহ্ন। অর্জুনানন্দ। তার কণ্ঠ শোনা গেল না, কিন্তু অনির্বাণ যেন শুনতে পেল—
❝তুমি এসেছো। সময় এসে গেছে।
আমার পালঙ্ক আবার শ্বাস নিতে চায়।❞
আয়নার পেছন থেকে যেন ভেসে এলো একটা ধাতব গুঞ্জন। ঠিক যেন ঢাক বেজে উঠছে দূরে কোথাও, আর ছায়া আসছে গড়িয়ে।
অনির্বাণ আর নিজেকে থামাতে পারল না। সে পালঙ্কে বসতেই রুমাল গুটিয়ে উঠল—সারা ঘর ঘোরার মতো শুরু করল, শুধু আয়না রইল স্থির।
তার শরীর থেকে হালকা আলো উঠছিল। সে একেবারে অচল হয়ে গেল, যেন কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে শরীর নিজেই।
হঠাৎ আয়নার গায়ে সে দেখল—সেই চক্রটা যার কথা পাণ্ডুলিপিতে লেখা ছিল, রক্তচক্র—ভেসে উঠছে। চক্র ঘুরছে… ঘুরছে… এবং তার মাঝখানে ফুটে উঠছে এক দরজা।
হ্যাঁ, দরজা। আয়নার ভিতর একটা দরজা খুলছে।
সেই দরজার ওপাশে—তিমির, আর গভীর এক অন্ধ গুহা।
এমন অনুভূতি হল, যেন আয়নার ভিতর দিয়ে তাকে টেনে নেওয়া হচ্ছে—সে আর পালঙ্কে নেই, সে এখন আয়নার ভেতরের জগতে।
চারপাশে কিছুই নেই। এক বিশাল শূন্যতা, মাঝে মাঝে ছায়া দৌড়াচ্ছে।
তার সামনেই দাঁড়িয়ে অর্জুনানন্দ। এবার সে কথা বলল।
— “তুই কে?”
অনির্বাণ থমকে গেল।
— “আমি অনির্বাণ। আমি তোমার উত্তরসূরি।”
অর্জুনানন্দ হেসে উঠল।
— “উত্তরসূরি? তাই তো! কিন্তু উত্তরসূরি মানেই কি উত্তর জানে? তোকে এখনো অনেক জানতে হবে। আয়, আমায় অনুসরণ কর।”
ওরা এগোতে লাগল। পথ জুড়ে ভাসমান মুখ, চোখের বলয়, আর কিছু বিকৃত শরীর—যা আসলে ছিল অর্ধ-জাগ্রত আত্মা।
— “এরা?”
— “আমার ভুল। যাদের আমি পালঙ্কে বসিয়ে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা নিজেকে চিনল না। ফলে তারা আটকে গেল চক্রে।” অর্জুনানন্দের গলা হালকা ভারী।
এক জায়গায় গিয়ে থামল ওরা। সেখানে একটা অন্য রকম পালঙ্ক রাখা—সাদা, চকচকে, আর তার ওপরে ঘোরানো দাগ।
— “এই পালঙ্ক তোর। তুই যদি চক্রে ঢোকাস, তোর আত্মা দুই ভাগ হবে—একটা ফিরে যাবে, একটা থেকে যাবে এখানে। আর এই থেকে যাওয়াই অভিশাপ। কারণ সেটা শুধু শরীর নয়, আত্মাও টেনে নেবে। এইভাবেই আমি আটকে আছি।”
— “তাহলে মুক্তি?” অনির্বাণ প্রশ্ন করল।
অর্জুনানন্দ বলল:
— “মুক্তি শুধুমাত্র তখনই, যখন আয়না আর পালঙ্ক—দু’টোই একসঙ্গে ভেঙে যাবে। আর সেটার চাবি তোর রক্ত, তোর ইচ্ছা, তোর আত্মচেতন। তুই যদি ভয় না পাইস, যদি ভুল না করিস, তবেই চক্র বন্ধ হবে।”
অনির্বাণ জানে, এ শুধু আত্মশক্তির খেলা নয়—এ এমন এক যুদ্ধ, যা নিজের ভেতরের দানবের সঙ্গে।
হঠাৎ সব ঘুরে গেল। চারপাশ অন্ধকারে ভরে গেল, ছায়ারা চিৎকার করে ছুটে এল অনির্বাণের দিকে, তাদের মুখ নেই, চোখ নেই—শুধু একটা চাহনি—
“তুই ব্যর্থ হ।”
কিন্তু অনির্বাণ চোখ বন্ধ করল।
সে মনে মনে বলল—“আমি ফিরে যাব। আমি পালঙ্ক ভাঙব। আমি আয়নার চক্র থেকে বেরোব।”
ভেতরে যেন আগুনের ঝলক উঠল, তার বুকের চিহ্ন জ্বলজ্বল করে উঠল, সে এক তীব্র আলোয় চারপাশ ছাপিয়ে উঠল।
সব অন্ধকার পেছনে চলে গেল।
সে চোখ খুলল। নিজেকে ফিরে পেল—পালঙ্কে বসে।
আয়নার সামনে একটা চির ধরেছে, ফাঁটা যেন মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
পালঙ্কটা নিঃশব্দে কাঁপছে।
তার হাতে তখনো পাথরের পাত্র।
সে জানে—আজ শুধু প্রথম ধাপ সম্পন্ন হল। চক্র এখনো খুলে আছে, কিন্তু সে ভিতরে গিয়ে ফিরে এসেছে।
অর্জুনানন্দের গলায় সে শুনেছিল শেষ কথা:
❝দ্বার খুলে গেছে। এবার তোকে দেখতে হবে, কে কে তোকে থামাতে আসছে…❞
আর তখনই, ঘরের বাইরে ভেসে এল একটা আওয়াজ—
টোক টোক… টোক টোক…
কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় হাত দিচ্ছে।
ঘড়ির কাঁটা বলছে—রাত ১:৪৫।
এমন সময় কেউ দরজায়?
সে জানে—এবার খেলা শুরু।
৭
দরজার গায়ে যেন কারো অস্থির হাতের শব্দ। তিনবার ধীর, তারপর দুইবার দ্রুত। ঘড়ির কাঁটা স্পষ্টভাবে ১:৪৫-এ এসে থেমে গেছে, যেন সময় নিজেই দাঁড়িয়ে গেছে এই মুহূর্তটার জন্য।
অনির্বাণ থমকে দাঁড়াল। ভিতরটা ভারী হয়ে এল।
তার হাতে রক্তপাত্র, বুকের রুদ্রাক্ষ চিহ্ন তখনো আলতো জ্বলছে।
সে ধীরে ধীরে এগোল দরজার দিকে।
ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল—
— “কে?”
কোনো উত্তর নেই।
শুধু নিঃশব্দ।
সে ছিটকিনি খোলার জন্য হাত বাড়াতেই আচমকা একটা ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল।
দরজাটা আপনাআপনি খুলে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা লম্বা মানুষ। মাথায় সাদা ধুতি বাঁধা, গায়ে একটা জ্যাফা চাদর। গালভর্তি দাঁড়ি, চোখদুটো এত গভীর যে মনে হয় শূন্যতার অতল থেকে তাকিয়ে আছে।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তার গলায় একটা পুরনো রুদ্রাক্ষের মালা, একদম অনির্বাণেরটার মতো, এবং তার কপালে একই চক্র চিহ্ন।
সে একবারে সরাসরি বলল—
— “তুই ভিতরে গিয়েছিলি?”
অনির্বাণ শব্দ খুঁজে পেল না।
অপরিচিত লোকটা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে গেল। তার পা থেকে মাটিতে কোনো ছায়া পড়ছে না।
— “আমি কেবল তোর রক্তের গন্ধ পেয়ে এসেছি। তুই তো চক্রে ঢুকেছিস। এখন তোকে সাবধান করতেই হবে।”
— “কে তুমি?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল।
লোকটা তাকাল আয়নার দিকে।
— “আমি ছিলাম শেষ বাহক। আমার নাম ছিল ভানুপ্রতাপ। ১৯৪৮ সালে আমি পালঙ্কে বসেছিলাম, আর ফিরে আসিনি। তোর মতই, আমিও ডায়েরি পেয়েছিলাম, আমিও সেই কুঠুরিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি… ফিরে আসিনি সম্পূর্ণ। শুধু আত্মার অর্ধেকটা আছে।”
— “তুমি তাহলে মৃত?” কণ্ঠ কেঁপে উঠল অনির্বাণের।
— “মৃত? না। আমি বন্দী। এবং তোকে জানাতে এসেছি—তোকে একটা সময়ের মধ্যেই পালঙ্ক ধ্বংস করতে হবে। না হলে… পালঙ্ক তোকে খেয়ে ফেলবে। আয়নার ফাঁটল বাড়ছে, সেটা লক্ষ করেছিস তো?”
অনির্বাণ আয়নার দিকে তাকাল। সত্যিই ফাঁটলটা এখন অনেক বড়। ঠিক যেন ভেতরের কোনো অন্ধকার বেরিয়ে আসতে চাইছে।
ভানুপ্রতাপ এগিয়ে এসে তার হাতে একটা ছোট পুঁটলি ধরিয়ে দিল।
— “এটা আয়নার ভেতরের আগুন। খুব সাবধানে রাখতে হবে। যখন পালঙ্কে আবার বসবি, এটাকে একেবারে চক্রের মাঝে রাখবি। আগুনই রক্ষা করবে তোকে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবি—পালঙ্কের আশেপাশে যদি কেউ ভয়ের বশে চক্রের বাইরে চলে যায়, সে আর এই দুনিয়ায় ফিরতে পারবে না।”
— “তবে আমি কাকে বিশ্বাস করব?” অনির্বাণ বলল।
— “নিজেকে। আর পালঙ্ক তোর বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করবে। এটা একটা আয়নার মতো—তোর মনটাই একমাত্র পাসওয়ার্ড।”
ভানুপ্রতাপ হঠাৎ থেমে গেল।
— “আর হ্যাঁ… কেউ একজন তোকে অনুসরণ করছে। সে চায় পালঙ্কটা তার হোক। তার নাম—বীরেশ্বর ঠাকুর। সাবধানে থেকিস।”
এই নামটা যেন একটা বাজ হয়ে পড়ল ঘরে।
অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল, “সে কে?”
ভানুপ্রতাপ ধীরে ধীরে পেছনের ছায়ায় মিশে যেতে যেতে বলল—
— “সে সেই মানুষ, যে একমাত্র ‘চক্রবিপর্যয়’ ঘটাতে পারে। তুই যদি তাকে পালঙ্কে বসতে দিস… তখন এই জগৎ ভেঙে যাবে।”
ভানুপ্রতাপ চলে যাওয়ার পর ঘর যেন আরও অস্থির হয়ে উঠল। আয়না বিকট শব্দে কেঁপে উঠল। পালঙ্ক নিজেই নড়তে লাগল। ঠিক যেন কোনো প্রাণী ঘুম ভেঙে উঠে বসছে।
অনির্বাণ জানে, সময় খুব কম।
সে জানে, বীরেশ্বর ঠাকুর—এই নামটা সে কোথায় যেন শুনেছে।
সে দ্রুত নিজের স্মৃতির পাতায় ফিরে যেতে চাইল।
আর তখনই—একটা পুরনো পারিবারিক ছবি মনে পড়ল।
একজন লোক—মায়ের বিয়ের আগের বাড়ির একটা উৎসবে, যাকে সবাই ডাকে “ঠাকুরদা” বলে, কিন্তু সে ছিল ঠাকুর পদবি-ধারী এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়, যিনি কালীসাধক ছিলেন।
সে প্রায় দশ বছর বয়সে একদিন এসে বলেছিল,
— “এই ছেলেটার কপালে আগুন লেখা আছে। একদিন না একদিন ও আমার দরকার হবে।”
অনির্বাণের মা সেই ঘটনার পর তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। আর কখনো তার নামও নেয়নি।
বীরেশ্বর ঠাকুর—সে-ই!
তারই জন্যে অনির্বাণকে প্রস্তুত হতে হবে।
পরদিন সন্ধ্যে। পাথরঘাটার বাড়িতে সে একা। চুপচাপ বসে রক্তপাত্র আর আগুনের পুঁটলিটার দিকে তাকিয়ে।
ঠিক তখন দরজায় পুনরায় টোকা।
কিন্তু এবার কোনো শব্দ নেই। শুধু বাতাসের দুলুনিতে দরজা খুলে গেল নিজে থেকেই।
সামনে দাঁড়িয়ে একজন অচেনা মধ্যবয়স্ক লোক, পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতে ত্রিশূলের মত একটা লাঠি, আর কপালে বড় করে আঁকা চক্রচিহ্ন।
লোকটা বলল—
— “আমার নামই তো শুনেছিস—বীরেশ্বর। এখন দরকার একটুখানি জায়গা। একটা জায়গা যেখানে পালঙ্কটা আছে…”
অনির্বাণ এবার থামল না। সে জানে, এই লোক তার সবচেয়ে বড় শত্রু।
সে বলল—
— “তুমি আমার বাড়িতে আসার আগে একটা কথা শুনে যাও। পালঙ্ক এখন জেগে আছে। সে কাউকে ছেড়ে দেয় না। তোমাকেও দেবে না।”
বীরেশ্বর মুচকি হাসল।
— “আমার রক্তেই তো সেই চক্র। আমার দেহেই তো সেই সৃষ্টির সূত্র। পালঙ্ক আমাকে চেনে, কারণ আমি একে জন্ম দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা পারিনি। কারণ তখন… তোর মা বাধা হয়েছিল।”
অনির্বাণ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল।
— “তুই জানিস না, তোর মা আমারই এক ছাত্রীর মেয়ে। সে পালঙ্ক ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু পালঙ্ক তো ধ্বংস হয় না, পালঙ্ক কার্যকর হয়। তুই এসেছিস, কারণ সময় এসেছে। তোকে চাই—আমার চক্র পূর্ণ করতে।”
অনির্বাণ পেছিয়ে এল। সে জানে, এই মানুষটা অন্য কিছু চায়। শুধু শক্তি নয়, কিছু গভীরতর—জগতের দখল।
বীরেশ্বর হঠাৎ সামনে এল, আর বলল—
— “আজ রাত তিনটেয় আমি ফিরে আসব। তখন পালঙ্কে বসার শেষ সুযোগ। নয়তো চক্র ভাঙব আমি নিজেই—আর তুই শুধু একটা ছায়া হয়ে থাকবি।”
ঘড়ির কাঁটা তখন ২:১৫। সময় শেষ হয়ে আসছে।
অনির্বাণ জানে, রাত তিনটেয় যদি সে পালঙ্কে না বসে, তাহলে বীরেশ্বর বসবে। আর তা হলে কুঠুরি, চক্র, পালঙ্ক—সব নরক হয়ে উঠবে।
সে ধীরে ধীরে আগুনের পুঁটলি খুলল।
সামনে পালঙ্ক। আয়নার ফাঁটল এবার পুরোপুরি চিড় হয়ে গেছে।
সে নিজেকে প্রস্তুত করল।
মনে মনে বলল—
“আমি আজ শেষবার বসব। আর আজ আমি পালঙ্ককে বলব—আমিই এখন তার আয়না।”
সে ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
রক্তপাত্র মাঝখানে। আগুন চারদিকে ছড়িয়ে দিল সে। ছায়া ঘুরছে তার চারদিকে।
আর তখনই—এক বিকট শব্দ। বীরেশ্বর ফিরে এসেছে।
৮
রাত ২:৫৯। অনির্বাণ ধীরে ধীরে পালঙ্কের গায়ে হাত রাখল। পালঙ্ক যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। একটা স্পন্দন, একটা জ্যান্ত স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ছে কাঠের গভীরে। আগুনের পুঁটলিটা সে খুলে মাঝখানে রাখল, রক্তপাত্রের পাশে। তার চারপাশে আগুনের রেখা টেনে তৈরি করল একটি নতুন চক্র—অগ্নিচক্র।
ঘরজুড়ে কুয়াশার মত হালকা ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছে। জানলার কাঁচে জল জমেছে। ঘড়ির কাঁটা কাঁপছে—আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
বীরেশ্বর আসবে। কিন্তু এইবার অনির্বাণ তৈরি। এবার সে পালঙ্কে বসবে শেষবারের মতো—এই চক্র বন্ধ করতে, এই নরক থেকে মুক্তি দিতে, আর নিজের অস্তিত্বটাকে স্থির করতে।
রাত ৩:০০। দরজা খুলল না, কিন্তু ঘরের ভিতর প্রবেশ করল এক ছায়া। অন্ধকারে ভেসে এল এক উচ্চতা—লম্বা, শীর্ণ, চোখদুটি অদ্ভুত কুয়াশার মত আলোয় উদ্ভাসিত। বীরেশ্বর ঠাকুর!
সে হাসল—ধীর, শান্ত, আত্মবিশ্বাসী। তার পেছনে যেন সময় থেমে গেছে।
— “তুই আগুন জ্বালিয়েছিস, ভালো। কিন্তু আগুন শুধু পোড়াতে জানে, বাঁচাতে নয়।”
— “আগুন আলো দেয়,” অনির্বাণ কাঁপা গলায় বলল। “এটাই তোর ভয়।”
বীরেশ্বর সামনে এগিয়ে এল। হাতে ত্রিশূলের মত একটা ধাতব যন্ত্র। বলল—
— “পালঙ্কটা তো আমারই চক্র। আমি একে জন্ম দিয়েছি—তোরা সবাই ছিলি কেবল বাহক। আমি চাই, পালঙ্কের মধ্য দিয়ে নতুন দিগন্ত খুলতে। মরণের ওপারে এক প্রবেশপথ তৈরি করতে।”
অনির্বাণ ধীরে ধীরে পালঙ্কে বসল। অগ্নিচক্র চারপাশে ঘুরতে লাগল। আগুন এখন লাল নয়—নীলাভ। আর পেছনে আয়নাটা নিজে নিজে ঘূর্ণি খেতে খেতে খুলে ফেলল এক আলাদা দরজা।
পালঙ্কের ওপর বীরেশ্বর এক ঝাঁপ দিল। কিন্তু আগুনের রেখা তাকে আটকাল। তার চোখ রক্তবর্ণ। সে চিৎকার করে উঠল—
— “আমি এই চক্র ভাঙব!”
অনির্বাণ ধ্যানস্থ। সে চোখ বন্ধ করে চক্রমন্ত্র জপছে—একটি অদৃশ্য ভাষা, যা অর্জুনানন্দ তাকে আয়নার ভিতর শিখিয়েছিল।
আগুনের গোলক বড় হতে লাগল। ছায়া ছুটে এলো। বীরেশ্বর ঠাকুর তার হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে আগুন কেটে ঢোকার চেষ্টা করল, কিন্তু আগুন যেন তাকে গিলে খেতে চাইছে। তার গা ছারখার হয়ে উঠছে।
হঠাৎ বীরেশ্বর এক অন্য মন্ত্র উচ্চারণ করল—তার চারপাশে কালো ধোঁয়া ঘন হতে লাগল। সে বলল—
— “আমি যদি মরিও, তোকেও নিয়ে মরব!”
পালঙ্ক এখন কম্পিত। অগ্নিচক্র ধীরে ধীরে ফেটে পড়ছে। আয়নার গহ্বর থেকে একটা আলো বেরিয়ে আসছে—তেজোময়, সোনালি।
অর্জুনানন্দের কণ্ঠ ভেসে এল—
— “তোর মধ্যে যেই সত্য, সেটাই চক্রের প্রকৃত চাবি। নিজের ভিতরে তাকাতে শিখ।”
অনির্বাণের চোখ খুলল। সে নিজের শরীরের প্রতিটি কোষে আগুন অনুভব করল। সে একটা শব্দ বলল—
— “প্রজ্ঞা।”
এই মন্ত্রেই ফেটে গেল আগুনের গোলক, ছিটকে গেল বীরেশ্বর। সে চিৎকার করে বলল—
— “না! আমি অসমাপ্ত!”
তার দেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। পালঙ্ক ধীরে ধীরে শান্ত হল।
ঘরের কুয়াশা কেটে গেল। আয়নার ফাঁটল মিলিয়ে গেল। আগুন নিভে গেল এক নিঃশব্দ আলোয়।
অনির্বাণ উঠে দাঁড়াল। পালঙ্ক এখন নিথর। আর শুধু একটা শব্দ ভেসে এল—
— “তুই পারলি। এবার চক্র বন্ধ।”
সে জানে, এখন সে মুক্ত। কিন্তু এই মুক্তি শুধু তার নয়—যারা চক্রে আটকে ছিল, তাদেরও। পালঙ্ক একটা দিকচিহ্ন ছিল, একটা পরিক্রমা। এখন সেটা শেষ।
৯
রাত গভীর। চারপাশে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে গেছে। পালঙ্কের আগুন নিভে গেলেও হৃদয়ে জ্বলছে নতুন এক আলোর স্পন্দন। অনির্বাণ বুঝতে পারল, এই মুক্তি শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, আটকা পড়া সকলের জন্য।
তবে নিস্তারের পথ সহজ নয়। পালঙ্কের ছায়া থেকে মুক্তি পেতে হবে চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাস এবং নিজের অন্তরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। এককালে যত বাধা আসুক, এখন অনির্বাণের সাহস তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
সে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ভাবতে শুরু করল—কীভাবে পালঙ্কের বাঁধন ভেঙে মুক্তি পাবে? আগুনের মতো শক্তি আর ছায়ার মতো অন্ধকারের সংঘর্ষের মাঝেই অজানা এক সেতু থাকে, যার নাম ‘প্রজ্ঞা’। সেই প্রজ্ঞা ছাড়া কেউ মুক্তি পায় না।
অন্ধকার ঘরে হালকা আলো জ্বালিয়ে সে মনোযোগ দিল তার নিজের মনের গভীরে। নিজেকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আসলে কে? কী চাও?” সেই প্রশ্নের জবাবে ভেতর থেকে উঠে এল এক অচেনা শব্দ, এক ঝিলমিল করে উঠা অনুভূতি। সেটা ছিল মুক্তির প্রথম সোপান।
বীরেশ্বরের ছায়া এখনো দূরে, তবে তার ভয়াবহতা যেন বাতাসে মিশে আছে। কিন্তু অনির্বাণ জানে, তার সত্যিকারের শক্তি এখনো তার নিজের ভেতরে লুকিয়ে আছে।
ঘুমের মধ্যে প্রবেশ করল সে। স্বপ্ন নয়, বরং এক ধরনের ভ্রমণ—যেখানে নিজেকে খুঁজে পেতে হবে।
স্বপ্নের জগতে, সে দেখতে পেল এক দীপ্তিমান আলো, যা তাকে ডাকছিল। সেই আলোয় মিশে ছিল তার পুরনো স্মৃতি, প্রিয়জনের মুখ, তার আশা এবং তার সমস্ত ভয়। এক এক করে সেসব তাকে স্বীকার করতে বাধ্য করল।
হঠাৎ, সেই আলো থেকে বেরিয়ে এল একটি পুরনো আত্মা—অর্জুনানন্দ। সে ধীরে ধীরে বলল, “মুক্তি শুধু বাইরের থেকে আসে না, অনির্বাণ। মুক্তি আসে নিজের ভেতর থেকে, নিজের চক্রের স্বীকৃতি থেকে। তুই চক্রের বাহক, কিন্তু তোর ভিতরে সেই চক্রের গতি ধরতে পারলেই তুই মুক্ত।”
অনির্বাণ সেই কথাগুলো মনের গভীরে ঢুকে গেল। সে বুঝতে পারল, পালঙ্ক আর চক্র শুধুমাত্র বাহ্যিক জিনিস নয়, বরং নিজের ভেতরের ভাবনার প্রতিফলন।
স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে সে জানালার দিকে গেল। চারদিকে রাতের নীরবতা। আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ, তার আলো যেন আশার বাতি।
সে বুঝল, এখন থেকে তার যুদ্ধ অন্য এক স্তরে প্রবেশ করবে—নিজের মনের সঙ্গে।
সকাল হলে সে খুঁজে নিল এক পুরনো লিপিবদ্ধ পুঁজি, যেখানে লেখা ছিল ‘চক্রের অন্তিম সাধনা’। সে ধীরে ধীরে সেই সাধনার পথে হাঁটতে লাগল।
সাহসী, স্থিরচেতা ও বিশ্বাসী হয়ে সে পালঙ্কের চক্রকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনল।
বীরেশ্বর ঠাকুর আর পালঙ্কের ছায়া ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।
অনির্বাণ অবশেষে পেল মুক্তির আলো।
১০
রাতের নিস্তব্ধতায় ভেসে আসছিল এক অজানা গানের সুর। ধীরে ধীরে শহর নিদ্রাহীন হয়ে উঠছিল। অনির্বাণ জানত, তার যুদ্ধ শেষ নয়, বরং আসল যাত্রা এখন শুরু। পালঙ্কের আগুন নিভে গেলেও তার হৃদয়ে জ্বলছিল নতুন আশা আর সংকল্প। মুক্তির পথ ছিল কঠিন, কিন্তু সে অটল।
গত কয়েক দিনের কঠোর সাধনা তাকে শিখিয়েছিল জীবনের প্রকৃত অর্থ—নিজেকে খুঁজে পাওয়া, নিজের ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করা। এদিন ভোরে, সে উঠে গেল শহরের বাইরে ছোট এক পল্লীতে, যেখানে প্রকৃতির মাঝে মিশে আছে শান্তি।
সেখানে সে দেখা করল এক বৃদ্ধ সাধুর সঙ্গে, যিনি অনেকদিন ধরে তন্ত্র সাধনা করছিলেন। বৃদ্ধের চোখে ছিল এক গভীর জ্ঞানের ঝিলিক, এবং কথা বলার ভঙ্গিতে অনুভূত হত জীবনের রহস্য।
বৃদ্ধ বললেন, “যে মুক্তি চায়, তাকে আগে নিজের ভেতর একত্রিত হতে হবে। তুই চক্রের বাহক, তুই চক্রের নিয়ামক, কিন্তু সব থেকে বড় কথা, তুই নিজের জীবনের অধিকারী। পালঙ্ক থেকে মুক্তি মানে নতুন এক জীবনের সূচনা।”
অনির্বাণ গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “আমি প্রস্তুত। আমি আমার অন্তরের সমস্ত বাঁধন ভাঙতে চাই।”
বৃদ্ধ হাসলেন, “ভালো। তবে মনে রাখিস, নতুন সূচনা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও আত্মিক। তুই যে পথে হাঁটছিস, তাতে অনেক বাধা আসবে। কিন্তু তুই যদি স্থিরচেতা থাকিস, তোর লক্ষ্য হবে সত্য এবং প্রজ্ঞা, তবে তুই সফল হবি।”
অনির্বাণ সেই দিন থেকে সাধনার নতুন অধ্যায় শুরু করল। পালঙ্কের অতীত থেকে মুক্ত হয়ে সে নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করল নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে। জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে উপলব্ধি করতে লাগল নতুন চোখে।
তার ঘরের কোণে রাখা পুরনো পুঁটলি আর রক্তপাত্র এখন ছিল শুধু অতীতের স্মৃতি। সে জানত, জীবন আরেকবার শুরু হতে যাচ্ছে — নতুন আলো নিয়ে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে।
এভাবেই অনির্বাণের জীবন নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করল, যেখানে চক্রের আগুন আর ছায়ার বেদনাকে পেছনে ফেলে সে গড়ে তুলল নিজের নতুন অস্তিত্ব।
দিনের আলো নেমে এসেছে। পল্লীর ছোট্ট এক মন্দিরের গায়ে অনির্বাণ দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে শান্তি, পাখির ডাক, এবং দূর থেকে একঝলক নদীর জলধারা। এই সবকিছু যেন তার মনের অস্থিরতাকে প্রশমিত করছে।
বৃদ্ধ সাধুর পরামর্শ মাথায় রেখে, সে ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে খুঁজে নিতে শুরু করল জীবনের গভীর অর্থ। এখন আর পালঙ্কের দাস নয়, সে নিজের জীবনের প্রভু। তার মন ও আত্মা নতুন দিশা পেল।
তন্ত্র সাধনার অনেক স্তর আছে। প্রত্যেক স্তরেই নিজেকে হারিয়ে, আবার খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতা। অনির্বাণ জানল, তন্ত্র শুধু বাইরের মন্ত্রপাঠ নয়, এটি আত্মসাৎ করা এক জীবন্ত শক্তি।
সে শুরু করল প্রতিদিনের সাধনা। শুদ্ধতার সাথে, ধৈর্যের সাথে। নিজের অন্তরের ভেতর যেসব অন্ধকার, সন্দেহ, হতাশা ছিল সেগুলোকে সে মেনে নিল, গ্রহণ করল।
একদিন, রাতে, ঘুমের ভেতর সে অনুভব করল এক অসীম আলোর ঢেউ এসে স্পর্শ করল তার হৃদয়। সেই আলোর শক্তিতে পালঙ্কের বীরেশ্বরের কালো ছায়া দূর হতে লাগল।
অনির্বাণ জেগে উঠে বুঝল, এটি ছিল তার চূড়ান্ত প্রজ্ঞার উন্মেষ। সে জানল, মুক্তি পেয়েছে শুধু শরীরেই নয়, আত্মায়ও। তার জীবনে নতুন সূচনা হলো। নতুন আশায়, নতুন শক্তিতে।
***




