Bangla - রহস্য গল্প

হারানো শব্দ

Spread the love

আলোক গুপ্ত


ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি, আকাশের কোণে হালকা লাল আভা। গ্রাম বেলতলা প্রতিদিনের মতো ঘুম ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই গ্রাম এমনই, যেখানে প্রকৃতির নিজস্ব সুরে সকাল শুরু হয়—পূর্ব দিকের তালগাছের মাথায় দোয়েল গান গাইতে থাকে, ঘরের উঠোনে মুরগির ডাকে কৃষাণী ঘুম থেকে ওঠে, গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টা বাজে আর মন্দির থেকে শাঁখ আর ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসে। সকালের এমন হুল্লোড়ে বেলতলার প্রতিটি মানুষ নিজের কাজ শুরু করত। কিন্তু সেদিন সকালটা ছিল একেবারে আলাদা। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা যেন চারদিক জড়িয়ে ধরেছিল। গাছের ডালে পাখিরা উড়ছিল, ঠোঁট নড়ছিল—কিন্তু কোনো ডাক শোনা যাচ্ছিল না। উঠোনে মুরগিরা এদিক-ওদিক ছুটছিল, কিন্তু একটিও ডাক কানে আসছিল না। এমনকি নদীর ধারে স্রোত বইছিল, জলছাপ উঠছিল, অথচ কোনো ঝিরঝির শব্দ পৌঁছাচ্ছিল না কারো কানে। গ্রামের মানুষ প্রথমে ভেবেছিল হয়তো কানে সমস্যা হয়েছে, কিংবা ঘুমের জড়তায় শব্দ শুনতে পাচ্ছে না। কিন্তু একসাথে এতজনের কাছে একই অভিজ্ঞতা আসা সত্যিই অদ্ভুত ছিল।

কিছুক্ষণ পর যখন সত্যি বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। একজন চিৎকার করে প্রতিবেশীকে ডাকতে চেষ্টা করল, কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু বাতাস বেরোল—শব্দ যেন কারো অদৃশ্য হাতে আটকে গেল। আরেকজন দ্রুত মন্দিরের ঘণ্টা বাজাতে ছুটল। ঘণ্টার দোলন থেমে থাকল না, তবে বাজনার ধ্বনি কেউ শুনতে পেল না। শিশুরা কাঁদতে শুরু করল, কিন্তু তাদের কান্না শুধু ঠোঁট কাঁপানো দৃশ্য হয়ে রইল। গ্রামের বয়স্করা হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। কানে কিছু না আসার এই অভিজ্ঞতা যেন মানুষকে এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি করে ফেলল। ভয়, বিভ্রান্তি আর অসহায়তা মিলে গ্রামে এক ধরণের চাপা হাহাকার তৈরি করল, যদিও সেই হাহাকারও কারো কানে পৌঁছোল না। কৃষকরা মাঠে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে যোগাযোগ করতে লাগল, নারীরা চোখেমুখে আতঙ্ক নিয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। এমন দৃশ্য আগে কোনোদিন কেউ কল্পনাও করেনি—এক গ্রাম যেন হঠাৎ করেই মূক হয়ে গেছে, নিস্তব্ধতার মধ্যে গিলে গেছে সব শব্দ।

কিছুক্ষণ পর গ্রামবাসীরা একত্র হলো বিশাল বটগাছের তলায়। কেউ লিখে, কেউ ইশারায় বোঝাতে চেষ্টা করল কী ঘটছে। তারা বুঝতে পারল এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়—এ যেন এক অলৌকিক শক্তি তাদের ঘিরে ধরেছে। শিশুদের মুখে আতঙ্ক জমে আছে, গরু-ছাগল নিরবভাবে দাঁড়িয়ে আছে, এমনকি গ্রামের কুকুরগুলোও শুধু দৌড়াদৌড়ি করছে কিন্তু তাদের স্বভাবসিদ্ধ ঘেউ-ঘেউ নেই। যে গ্রামটা একসময় ভোরের সঙ্গে জেগে উঠত সুরে আর কোলাহলে, সেটা এখন যেন এক বিশাল শ্মশানের মতো নিরব। নিস্তব্ধতা এত গভীর যে মানুষ নিজের হৃদস্পন্দনও শুনতে পাচ্ছে না। গ্রামের মানুষরা একে অপরের চোখে তাকিয়েই প্রশ্ন করছে—কোথায় গেল শব্দ? কেন এমন হলো? কিন্তু কোনো উত্তর নেই, শুধু নীরবতা, অস্বস্তিকর আর ভীতিকর নীরবতা। এভাবেই শুরু হয় বেলতলার অজানা এক অভিশপ্ত সকাল, যেখানে শব্দ যেন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে অদৃশ্য কোনো শক্তির কবলে।

গ্রামের সবাই যখন ভয়ে-আতঙ্কে ছটফট করছে, তখন গোপাল মজুমদার শান্তভাবে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। বয়স ষাটের কোঠায় হলেও তার চোখে এখনো জ্ঞানের দীপ্তি। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন বেলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে। তিনি শুধু পড়াতেন না, গ্রামের ছেলেমেয়েদের মন বোঝার চেষ্টা করতেন, তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সেই মানুষটি সেদিন ভোর থেকে গভীরভাবে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। পাখিরা উড়ছে, গাছের ডালে বাতাস দুলছে, মানুষের ঠোঁট নড়ছে—সবই স্বাভাবিক, কিন্তু একেবারেই কোনো শব্দ নেই। তার মনে হলো, শুধু “শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে” বললে ভুল হবে। তিনি যেন টের পাচ্ছিলেন, শব্দগুলো কোথাও চলে যাচ্ছে, কোথাও এক অদৃশ্য ভাণ্ডারে জমা হচ্ছে। এই ধারণা আসার পর থেকেই তার কপালে ভাঁজ আরও গভীর হলো। মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরার সঙ্গে শব্দের অস্তিত্ব কতটা জরুরি, সেটা এক মুহূর্তেই তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন। শব্দ ছাড়া পৃথিবী শুধু দৃশ্যমান থাকবে, কিন্তু প্রাণহীন হয়ে পড়বে। তিনি চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, কেউ আতঙ্কে দৌড়াচ্ছে, কেউ কান্নার ভঙ্গি করছে, কেউ আবার নির্বাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে আছে—কিন্তু এই সবকিছু যেন কেবল এক নির্বাক নাটকের দৃশ্য।

এই সময়ে গোপাল সিদ্ধান্ত নিলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো মানে নেই। মানুষের ভেতর ভয় ছড়িয়ে দিলে নীরবতার চাপ আরও বেড়ে যাবে। তিনি ধীর পদক্ষেপে গ্রামপ্রাঙ্গণের দিকে হাঁটলেন, যেখানে সাধারণত স্কুল বসত। স্কুলঘরই ছিল গ্রামের সবচেয়ে বড় সমাবেশস্থল। তিনি ভেতরে ঢুকে গিয়ে পুরনো ব্ল্যাকবোর্ডটা টেনে আনলেন। তারপরে চক হাতে তুলে নিলেন, যদিও চকের ঘষা বোর্ডে শোনা যায়নি কোনো শব্দ। কিছু গ্রামবাসী তখন তার আশেপাশে ভিড় করেছিল, তাদের চোখে আতঙ্ক আর কৌতূহলের মিশ্র প্রতিচ্ছবি। গোপাল বোর্ডে ধীরে ধীরে লিখলেন—“আমরা একটা বিপদের মধ্যে আছি। শব্দ শুধু থেমে যায়নি, কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে।” সবাই স্তব্ধ দৃষ্টিতে লেখা পড়ল। তারপর তারা হাত ইশারায় নানা প্রশ্ন করতে শুরু করল—কোথায় যাচ্ছে শব্দ? কে নিয়ে যাচ্ছে? আমরা কি আবার শব্দ ফিরে পাবো? গোপাল হাত তুলে শান্ত হতে বললেন, তারপর আবার লিখলেন—“এটা সামান্য ঘটনা নয়। কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাদের গ্রামকে নীরব করে দিচ্ছে। ভয় পেলে চলবে না। আমাদের বুঝতে হবে কী ঘটছে।” এই কথাগুলো গ্রামবাসীর মনে এক অদ্ভুত শীতল স্রোত বয়ে দিল। ভয় কিছুটা কমলেও কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। গ্রামের সবাই এখন তার দিকেই তাকিয়ে রইল—যেন তিনি-ই একমাত্র পথপ্রদর্শক।

গোপাল মনের ভেতর একটা হিসেব কষছিলেন। তিনি জানতেন, প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনার পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে। কিন্তু এ যে নিছক প্রাকৃতিক নয়, সেটা তার অভিজ্ঞতা বলছিল। তিনি স্মরণ করলেন, ছোটবেলায় তার ঠাকুমা বলতেন—“শব্দও প্রাণের মতো, যদি তাকে কেউ বন্দি করে, তবে পৃথিবী থেমে যায়।” তখন তিনি এসবকে কুসংস্কার ভেবেছিলেন, কিন্তু আজ বাস্তবের সামনে দাঁড়িয়ে যেন ঠাকুমার সেই কথাগুলো হুবহু প্রতিধ্বনিত হলো। গোপাল আরেকটি বার্তা বোর্ডে লিখলেন—“আমরা নীরবতার ভেতরে বন্দি। শব্দকে কেউ কেড়ে নিচ্ছে। হয়তো আমাদের সাহস পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।” এই লেখার পর গ্রামের লোকজনের চোখে নতুন ধরণের ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল, কিন্তু তার ভেতরে একটুখানি দৃঢ়তাও জেগে উঠল। গোপালের শান্ত স্বভাব আর যুক্তিপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তাদের সাহস জোগাল। তারা বুঝতে পারল, শুধু ভয়ে কুঁকড়ে গেলে কোনো লাভ নেই। গোপালই হয়তো তাদের পথ দেখাবেন। এইভাবে গ্রামের শিক্ষক নিজের দায়িত্ব নিলেন—শব্দের এই রহস্যভেদ করার, আর গ্রামবাসীকে সাহসী করে তোলার। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্ম নিল—এই ঘটনা অদৃশ্য থেকে গেলেও, এর সমাধান কোথাও লুকিয়ে আছে। আর সেই সমাধান খুঁজে বের করতেই এখন তাকে এগোতে হবে।

মীরা ছিল বেলতলার গর্ব। অল্প বয়সেই তার গলার সুর গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রতিটি পূজো, প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠান, এমনকি নিছক সন্ধ্যা নামার পরও মানুষ তার গান শুনতে ভিড় করত। সে শুধু গান গাইত না, গান দিয়েই মানুষের মন শান্ত করত। মীরার বাবা ছোটবেলায়ই মারা গিয়েছিল, আর তার মা অনেক কষ্ট করে মেয়েটিকে বড় করেছিলেন। গানই ছিল মীরার জীবনের রঙ, তার স্বপ্ন, তার শ্বাসপ্রশ্বাস। তাই যখন গ্রামজুড়ে হঠাৎ করে সব শব্দ অদৃশ্য হয়ে গেল, তখন সবার থেকে বেশি আঘাতটা এল মীরার উপর। সে মনে মনে ভাবল, হয়তো সবাই ভুল করছে, হয়তো শব্দ থেমে গেছে কিছুক্ষণের জন্য। এই ভেবে সে বসলো নিজের উঠোনে, তালপাতার হাতপাখা দিয়ে মুখে বাতাস লাগিয়ে এক চিলতে হাসি নিয়ে বলল, “আমি যদি গান গাই, তবে তো আবার শব্দ ফিরবেই।” সে ধীরে ধীরে ঠোঁট খুলে ভোরের আলাপ শুরু করল—একটা পুরনো রাগ যা সে তার গুরুজির কাছ থেকে শিখেছিল। ঠোঁট নড়ছে, শ্বাস বেরোচ্ছে, কিন্তু চারপাশে একেবারে কোনো প্রতিধ্বনি নেই। এমনকি নিজের কানে নিজের কণ্ঠও পৌঁছালো না। এটা যেন তাকে বিদ্যুতের মতো আঘাত করল। তার গলার সুর যেন হঠাৎ কেটে গেল, অদৃশ্য এক শূন্যতা তাকে গ্রাস করল।

মীরার বুক ভার হয়ে গেল। সুরহীন পৃথিবী তার কাছে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হলো। সে ভাবতে লাগল—যদি আর কোনোদিন গান গাইতে না পারে? যদি সারা জীবন নিজের কণ্ঠ শুনতে না পায়? মানুষের চোখে গান তাকে খ্যাতি দিয়েছে, কিন্তু নিজের কাছে গানই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সেই গানই যদি হারিয়ে যায়, তবে সে আর বেঁচে থাকবে কীভাবে? হঠাৎ সেই অক্ষমতা, সেই শূন্যতা তার চোখে জল এনে দিল। সে আর থামতে পারল না। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কান্না শুরু করল, কিন্তু কান্নার শব্দও নেই—শুধু কাঁপতে থাকা শরীর, ঠোঁটের কাঁপুনি আর ঝরে পড়া অশ্রু। তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ল উঠোনের শুকনো মাটিতে। আর তখনই ঘটল অদ্ভুত এক ঘটনা—মাটিতে অশ্রুবিন্দু পড়ার সাথে সাথেই মাটি কেঁপে উঠল। খুব সামান্য হলেও স্পষ্টভাবে টের পাওয়া গেল মাটির ভেতরে এক কম্পন, যেন গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো কণ্ঠ সেই অশ্রুর আঘাতে নাড়া খেয়ে উঠেছে। মীরা বিস্ময়ে জমে গেল। তার মনে হলো, শব্দ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, কোথাও যেন জমা হয়ে আছে, নিঃশব্দ অন্ধকারের নিচে বন্দি হয়ে আছে। এই অনুভূতি তাকে একই সাথে ভয় আর আশার মধ্যে ফেলল।

মীরা ধীরে ধীরে কান্না থামিয়ে উঠোনের মাটি স্পর্শ করল। তার মনে হলো, চোখের জলে মাটিকে নাড়া দিয়ে সে কোনো অদৃশ্য ভাণ্ডারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। সে ভাবতে লাগল—হয়তো শব্দগুলো চলে যায়নি, বরং কেউ সেগুলো কুড়িয়ে নিয়েছে, জমা করে রেখেছে কোথাও। কিন্তু কেন? আর কার জন্য? তার মনের ভেতরে হাজার প্রশ্ন ঘুরতে লাগল। সে বুঝতে পারল, শব্দ যদি একেবারে মরে যেত তবে মাটির ভেতরে এই স্পন্দন পাওয়া যেত না। এর মানে, কোনো শক্তি শব্দগুলো ধরে রেখেছে, হয়তো শাস্তি দিতে, হয়তো কোনো রহস্যময় উদ্দেশ্যে। সে বুকের ভেতর হাত রাখল, নিজের হৃদস্পন্দন টের পেল—সেটাও যেন নীরব হয়ে আছে, কিন্তু তার শরীরের কম্পনই ছিল একমাত্র প্রমাণ যে জীবন এখনো বহমান। সেই মুহূর্তে মীরা এক দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিল। ভয় পেয়ে সে থেমে যাবে না। যেভাবেই হোক তাকে জানতে হবে, এই নিস্তব্ধতার অন্তরালে কী লুকিয়ে আছে। তার কান্না তাকে প্রথম সূত্র দিয়েছে, আর সেই সূত্রই সে আঁকড়ে ধরবে। গ্রামের মানুষ যেখানে আতঙ্কে ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে মীরা বুঝল—এই রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হয়তো তার নিজের হাতেই রয়েছে।

রাহুল ছিল গ্রামের অন্য সবার থেকে আলাদা। বয়স চৌদ্দ হলেও কৌতূহল আর দুঃসাহসের জন্য গ্রামের মানুষ তাকে নিয়ে প্রায়ই চিন্তায় পড়ত। সে সবসময় অদ্ভুত জিনিস খুঁজে বেড়াত—কোথাও অচেনা গাছ দেখলে ঘেঁটে দেখত, কোনো অজানা আওয়াজ শুনলে খুঁজে বের করার চেষ্টা করত সেটা কোথা থেকে আসছে। যখন বেলতলা গ্রাম হঠাৎ করে শব্দহীন হয়ে পড়ল, অন্যরা আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়লেও রাহুলের মনে জন্ম নিল প্রবল কৌতূহল। তার মনে হলো, এই নীরবতার রহস্য কেউ না কেউ ধরে ফেলতে পারবে, আর যদি কেউ পারে তবে সেটা সে নিজেই। সারা দিন গোপাল মাস্টারের ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা বার্তা দেখে আর গ্রামের মানুষের ভীত চোখগুলো লক্ষ্য করে সে ঠিক করল, রাতেই বেরোবে সত্যি জানার জন্য। চাঁদের আলোয় ভরা আকাশের নিচে গ্রাম ঘুমিয়ে পড়তেই রাহুল নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। তার হাতে ছিল একটা ছোট টর্চ, আর গলায় ঝোলানো একটা খাতা-কলম। সে ভেবেছিল, যদি শব্দ না থাকে তবে অন্তত সে দেখে যা বুঝবে তা লিখে রাখবে, পরে সবার সাথে ভাগ করবে। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে উঠোন পেরিয়ে সে মাঠের দিকে পা বাড়াল। নীরবতার মধ্যে তার পায়ের শব্দও যেন নেই, তাই ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না। তবু রাতের নিস্তব্ধতা তাকে কেমন যেন অদ্ভুত চাপা উত্তেজনায় ভরিয়ে দিল।

মাঠে পৌঁছতেই তার চোখে পড়ল এক অভাবনীয় দৃশ্য। চাঁদের আলোয় আলোকিত মাঠে ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটি অদ্ভুত ছায়ামানব। তারা মানুষের মতো দেখতে হলেও শরীর যেন পুরো ধোঁয়া বা কুয়াশায় তৈরি। তাদের কোনো মুখ নেই, কেবল দুই ফাঁকা চোখের জায়গা, যা থেকে হালকা নীলচে আলো বেরোচ্ছে। রাহুল প্রথমে ভয় পেয়ে গেল, কিন্তু তবু কৌতূহল তাকে আঁকড়ে ধরল। সে এক গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে দেখতে লাগল। প্রতিটি ছায়ামানবের হাতে ছিল ছোট ছোট কালো পাত্র, যা দেখতে মাটির মতো হলেও তাতে এক অদ্ভুত দীপ্তি ছিল। তারা একে একে গ্রামের দিক থেকে ভেসে আসছিল, আর পাত্রের ভেতরে জমাচ্ছিল কিছু অদৃশ্য জিনিস। রাহুল বিস্ময়ে দেখল—যখনই একটা ছায়ামানব পাত্রের ঢাকনা খুলছে, তখন এক ঝলক ঝিকিমিকি আলোর মতো কিছু ভেসে ঢুকছে তার মধ্যে। আর সেই সঙ্গে কানে ভেসে উঠছে খুব ক্ষীণ কিছু শব্দ—যেন দূরে কোথাও কুকুর ঘেউঘেউ করছে, পাখির ডাক দিচ্ছে, কিংবা মন্দিরের ঘণ্টা বাজছে। রাহুল তখনই বুঝল, এই ছায়ামানবরাই গ্রামের সব শব্দ সংগ্রহ করছে। তার চোখ কপালে উঠল যখন সে দেখল—এক পাত্রে কেবল কুকুরের ঘেউঘেউ জমা আছে, অন্যটাতে পাখির ডাক, আরেকটাতে মানুষের হাসির শব্দ। শব্দগুলোকে তারা আলাদা আলাদা করে ধরে রাখছে, যেন কোনো ভাণ্ডারের জন্য সাজিয়ে রাখছে।

রাহুলের শরীরে শিহরণ বয়ে গেল। এতদিন সে ভূতের গল্প শুনেছে, কিন্তু এরকম ঘটনা কখনো কল্পনাও করেনি। তবু ভয়কে সে জয় করল। সে বুঝল, যদি সে আজ রাতের এই দৃশ্য না দেখে তবে গ্রামবাসী কখনোই জানতে পারত না সত্যি কী ঘটছে। সে খাতায় দ্রুত লিখতে শুরু করল—“ছায়ামানবেরা শব্দ কুড়িয়ে নিচ্ছে। কালো পাত্রে আলাদা আলাদা শব্দ জমা করছে। কুকুরের ডাক, পাখির সুর, ঘণ্টার ধ্বনি—সবই ধরে রাখা হচ্ছে।” হাত কাঁপছিল, কিন্তু মন ছিল দৃঢ়। হঠাৎ তার চোখে পড়ল সবচেয়ে বড় ছায়ামানব, যে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ছিল বিশাল কালো পাত্র, আর তাতে ঢুকছিল মানুষের কথোপকথনের টুকরো টুকরো শব্দ। রাহুল তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ অনুভব করল যেন নিজের কণ্ঠস্বরও কোথাও অদৃশ্য হয়ে গিয়ে ওই পাত্রে মিশে গেল। তার বুক ধক করে উঠল, কিন্তু সে পিছু হটল না। বরং সে প্রতিজ্ঞা করল, এই রহস্যের শেষ পর্যন্ত সে খুঁজবে। ছায়ামানবদের ভাসমান দেহ চাঁদের আলোয় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল, কিন্তু তাদের পাত্রগুলো অদ্ভুত আলোর মতো জ্বলতে থাকল। রাহুল জানল, এখনো শব্দ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, বরং বন্দি হয়ে আছে এই ভয়ংকর শক্তির হাতে। এই আবিষ্কার তার মনে ভয় জাগাল, আবার একইসাথে আশাও দিল—যদি বন্দি করা যায়, তবে হয়তো কোনোদিন মুক্তিও করা যাবে। সে মাঠ থেকে ফিরে এল, কিন্তু তার চোখে তখনও ভাসছিল সেই কালো পাত্র আর তার ভেতরে বন্দি গ্রামটির প্রাণস্বরূপ হারানো শব্দ।

বেলতলার গ্রামে কমলা কাকিমা ছিলেন এক অদ্ভুত চরিত্র। বয়স পঞ্চাশের কোঠা, মাথাভরা সাদা চুল, মুখজুড়ে বয়সের ভাঁজ, আর চোখে সর্বদা এক ধরনের রহস্যময় দৃষ্টি। তিনি ছিলেন গ্রামের লোককথার ভাণ্ডার। প্রায় প্রতিটি সন্ধ্যায় গ্রামের মহিলারা, কখনো বা কৌতূহলী শিশুরা তার উঠোনে জড়ো হত, আর তিনি অদ্ভুত সব গল্প শোনাতেন—দেবদেবীর ক্রোধ, অভিশপ্ত বটগাছ, কিংবা নক্ষত্রের অদলবদল। অনেকেই তাকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভেবে উপহাস করত, আবার কেউ কেউ তাকে জ্ঞানী বলেও মানত। কিন্তু গ্রামে যখন একেবারে শব্দ হারিয়ে গেল, মানুষ যখন হতভম্ব হয়ে সমাধান খুঁজতে লাগল, তখনই হঠাৎ করে সবাই কমলা কাকিমার কথা মনে করল। তার কাছে নিশ্চয়ই কোনো ব্যাখ্যা আছে। সেই রাতে, যখন আতঙ্কে সবাই গোপাল মাস্টারের চারপাশে ভিড় করেছিল, তখনই কমলা কাকিমা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। হাতে কাঠের লাঠি, মুখে কঠিন অভিব্যক্তি। তিনি ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে গিয়ে গোপালের দিকে তাকিয়ে চকের ইশারা করলেন। গোপাল তাকে চক দিলেন, আর তিনি কাঁপা হাতে লিখলেন—“এটা অভিশাপ।”

শব্দহীনতার কারণে সবাই লেখা পড়ছিল চোখ বড় বড় করে। গ্রামবাসীরা তৎক্ষণাৎ ফিসফিস করে ইশারায় বোঝাতে লাগল—“অভিশাপ আবার কীসের?” কমলা কাকিমা পরের লাইন লিখলেন—“শব্দ-দেবী রুষ্ট হয়েছেন।” সবাই স্তব্ধ হয়ে পড়ল। এই প্রথমবার শব্দহীনতার মধ্যে কারও বক্তব্যে রহস্যময় এক ধরনের ওজন অনুভূত হলো। কমলা কাকিমা লিখতে লাগলেন—“তিনি চান, মানুষ নীরব হয়ে নিজেদের হৃদয়ের ভেতরের আওয়াজ শুনুক। এতদিন আমরা কেবল বাইরের কোলাহলে ডুবে থেকেছি। নিজেদের মন, নিজেদের অপরাধ, দুঃখ-কষ্ট শুনিনি। তাই দেবী সব শব্দ কেড়ে নিয়েছেন।” গ্রামের অর্ধেক মানুষ প্রথমে হেসে উঠল, যদিও সেই হাসি শুধু ঠোঁটের নড়াচড়া, শব্দহীন এক বিদ্রূপ। তাদের কাছে এটা নিছক গল্প ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু অন্য অর্ধেক মানুষ চুপ করে গেল। তারা ভাবতে লাগল—যদি সত্যিই এটা দেবীর অভিশাপ হয়? তারা আতঙ্কিত চোখে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। মীরার চোখে তখনো শুকায়নি কান্নার চিহ্ন, সে মাটিতে পাওয়া অদ্ভুত স্পন্দনের কথা মনে করে শিউরে উঠল। মনে হলো, কমলা কাকিমার গল্প পুরোপুরি মিথ্যা নয়।

কমলা কাকিমা সেদিন রাতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। সবাই যখন দ্বিধায় বিভক্ত, তিনি শেষবার বোর্ডে লিখলেন—“শব্দ ফেরাতে চাইলে আমাদের নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতে হবে, নিজেদের মনের আওয়াজ শুনতে হবে। নয়তো এই নীরবতা ভাঙবে না।” তার চোখে তখন অদ্ভুত দীপ্তি। চারপাশে শ্বাসরুদ্ধ নীরবতার মধ্যে তার লেখাগুলো যেন আগুনের মতো জ্বলে উঠল। গোপাল মাস্টার প্রথমে মনে করেছিলেন, কাকিমা শুধু ভয় ছড়াচ্ছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনিও ভাবছিলেন, হয়তো লোককথার আড়ালেই কোনো সত্যি লুকিয়ে আছে। ডাক্তার অরিন্দম অবশ্য মনের ভেতর অবিশ্বাসই ধরে রেখেছিলেন, কিন্তু তার নিজের কানে ভেসে আসা অদ্ভুত ফিসফিসের স্মৃতি তাকে দ্বিধায় ফেলে দিল। রাহুল তখন গোপনে মাঠে দেখা ছায়ামানব আর কালো পাত্রের কথা মনে করে বুঝল, কমলা কাকিমার অভিশাপ-তত্ত্ব পুরোপুরি কল্পকাহিনি হলেও হয়তো কোনোভাবে সত্যির সঙ্গেই জড়িত। আর মীরা ভেতরে ভেতরে বিশ্বাস করতে শুরু করল—শব্দ আসলেই কারও দ্বারা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, হয়তো দেবী, হয়তো অন্য কেউ, কিন্তু এর সমাধান খুঁজতে হলে নিজের হৃদয়ের গভীরতাকে স্পর্শ করতেই হবে। এভাবেই কমলা কাকিমার ভবিষ্যদ্বাণী গ্রামের মানুষদের মনে সন্দেহ, ভয়, আর কৌতূহলের নতুন ঢেউ তুলল—শব্দ সত্যিই কি দেবীর অভিশাপের কারণে হারিয়ে গেছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ভয়ংকর রহস্য লুকিয়ে আছে?

ডাঃ অরিন্দম ছিলেন শহরের মানুষ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে শিক্ষিত, যুক্তিবাদী, আর অতিপ্রাকৃত বিষয়ে ভীষণ সংশয়ী। গ্রামের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র গোপাল মাস্টারের অনুরোধে তিনি কয়েক দিনের জন্য বেলতলা গ্রামে এসেছিলেন। সারা গ্রাম জুড়ে শব্দ হারিয়ে যাওয়ার অদ্ভুত কাণ্ড দেখে তিনি প্রথমেই ধরে নিলেন—এটা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং মানসিক প্রভাব। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, গুজব আর সম্মিলিত কল্পনার প্রভাবে এক ধরনের mass hysteria তৈরি হয়েছে, আর সবাই বিশ্বাস করে বসেছে যে শব্দ সত্যিই অদৃশ্য হয়ে গেছে। অরিন্দম গ্রামের মানুষদের ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে বোঝানোর চেষ্টা করলেন—“তোমাদের কানে শব্দ পৌঁছচ্ছে না মানেই শব্দ নেই, এমনটা নয়। এটা হয়তো মানসিক রোগের মতোই। ভয় আর বিশ্বাস মিলে এই সমস্যা তৈরি করেছে।” তার যুক্তি শুনে কেউ কেউ স্বস্তি পেলেও বেশিরভাগ মানুষ অবিশ্বাসী চোখে তাকাল। কমলা কাকিমার অভিশাপ-তত্ত্বের পর ডাক্তারবাবুর যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা যেন গ্রামবাসীর কাছে দুর্বল মনে হলো। তারা ভাবল, শহরের মানুষ গ্রাম্য রহস্য কী বুঝবে?

অরিন্দম কিন্তু থেমে রইলেন না। তিনি কিছু পরীক্ষা করতে চাইলেন। তিনি বাঁশের লাঠি দিয়ে গাছের গায়ে আঘাত করলেন, কিন্তু কোনো আওয়াজ বেরোল না। তিনি নিজের হাততালি দিলেন, মুখ খুলে উচ্চস্বরে চিৎকারও করলেন, কিন্তু বাতাস নিস্তব্ধ রইল। তাঁর বৈজ্ঞানিক মনে অস্বস্তি জমতে শুরু করল। তিনি নিজেকে বোঝাতে চাইলেন—“শব্দতরঙ্গ হয়তো আমাদের কানে পৌঁছচ্ছে না, কিন্তু কোথাও তো তার অস্তিত্ব আছে। এটা কেবল perception-এর সমস্যা।” তিনি গ্রামের মানুষকে বললেন, এটা আসলে collective neurological phenomenon। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল অপ্রত্যাশিত ঘটনা। অরিন্দম হঠাৎ অনুভব করলেন, তার কানের ভেতর দিয়ে যেন হিমেল বাতাস বয়ে গেল। বুক কাঁপিয়ে একটা অদ্ভুত শিহরণ নেমে এলো তার শরীরে। সেই নীরবতার মধ্যেই স্পষ্ট শুনতে পেলেন এক ক্ষীণ ফিসফিস কণ্ঠ—যেন কেউ খুব কাছ থেকে তার কানে বলছে, “আমাকে ফিরিয়ে আনো।” শব্দটি এতটাই হঠাৎ আর অপ্রত্যাশিত ছিল যে তিনি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ বিস্ফারিত, কপালে ঘাম। তিনি বুঝলেন, এটা কল্পনা নয়—এটা সত্যিই তিনি শুনেছেন।

অরিন্দম স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক মন যেন মুহূর্তে ভেঙে গেল। তিনি এতক্ষণ যেটাকে mass hysteria ভেবেছিলেন, সেই নীরবতার মধ্যে থেকে হঠাৎ ভেসে আসা রহস্যময় ফিসফিস তাকে কাঁপিয়ে দিল। গ্রামবাসী কেউ কিছু টের পেল না, কারণ তারা তো কিছু শুনতেই পাচ্ছে না। কিন্তু অরিন্দম জানলেন—কেউ বা কিছু এই নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে, আর সে তাকে ডেকেছে। “আমাকে ফিরিয়ে আনো”—এই কথার মানে কী? কে ফিরতে চাইছে? কোন শক্তি বা সত্তা তাদের শব্দ কেড়ে নিয়ে বন্দি করে রেখেছে? অরিন্দমের মনে ভয়ের পাশাপাশি জন্ম নিল এক তীব্র সংশয় আর কৌতূহল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, হয়তো তিনি সেই একমাত্র মানুষ যিনি এখনো কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছেন। এই অভিজ্ঞতা তার শহুরে যুক্তিবাদী মনকে ভেঙে দিলেও, এক নতুন দায়িত্বও তার কাঁধে চাপাল। তিনি আর সহজভাবে এটাকে মানসিক সমস্যা বলে উড়িয়ে দিতে পারলেন না। সেই রাতে, একা বসে তিনি নিজের ডায়েরিতে লিখলেন—“আজ আমি ফিসফিস কণ্ঠ শুনেছি। কেউ বলেছে—আমাকে ফিরিয়ে আনো। যদি সত্যিই শব্দ কোথাও বন্দি থাকে, তবে তাদের মুক্ত করার দায়িত্ব এখন আমারও।” এই উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে অরিন্দম বুঝতে পারলেন, তিনি আর শুধু বাইরের লোক নন—তিনি এখন এই গ্রামের রহস্যের অংশ হয়ে গেছেন।

রাহুলের বয়স কম, কিন্তু কৌতূহল তার রক্তে মিশে আছে। গ্রামের সবাই যখন আতঙ্কে একে অপরের দিকে তাকিয়ে নীরব হয়ে পড়ছে, তখনও সে চুপচাপ থাকতে পারল না। আগের রাতে সে ছায়ামানবদের দেখা পেয়েছিল—কালো রূপ, বাতাসে ভেসে থাকা অদ্ভুত সত্তারা, যারা ছোট ছোট কালো পাত্রে শব্দ সংগ্রহ করছিল। সেই দৃশ্য মনে পড়লেই তার শরীর শিউরে ওঠে, কিন্তু কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। সে সিদ্ধান্ত নিল, সত্যিটা জানতে হবে। তাই এক রাত, সবাই যখন নিস্তব্ধ ঘুমে ডুবে, রাহুল আবার বেরিয়ে পড়ল। হাতে কেবল একটা মশাল, আর চোখে ঝলমল কৌতূহল। আকাশে চাঁদ ম্লান হয়ে গেছে, চারদিক ঘন অন্ধকার। রাহুল নিঃশব্দে মাঠ পেরিয়ে এগোল সেই পুকুরের দিকে, যেখানে ছায়ামানবদের গতিবিধি আগের রাতে সে লক্ষ্য করেছিল। পুকুরের ধারে পৌঁছে সে হঠাৎ দেখল, জলের উপরে অস্পষ্ট নড়াচড়া—যেন কালো কুয়াশার দল। ধীরে ধীরে সেগুলো আকার নিল মানুষ-সদৃশ রূপে।

রাহুল একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল, আর চোখ বড় বড় করে দেখতে লাগল। ছায়ামানবেরা একে একে পুকুরের ধারে জড়ো হচ্ছে। তাদের হাতে কালো মাটির মতো দেখতে অদ্ভুত পাত্র। প্রতিটি পাত্রের ভেতরে যেন কিছুর ক্ষীণ কম্পন—রাহুল জানে ওগুলোই শব্দ। কোনো পাত্রে কুকুরের ঘেউঘেউ, কোনো পাত্রে শিশুর কান্না, কোনোটা আবার মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি। শব্দগুলো বন্দি হয়ে আছে, বাঁচার আর্তি করছে, অথচ বেরোতে পারছে না। রাহুলের বুক কেঁপে উঠল। হঠাৎ ছায়ামানবদের মধ্যে থেকে একজন বেরিয়ে এলো—সে বাকিদের তুলনায় অনেক বড়, তার শরীর যেন আরও গাঢ় অন্ধকারে মোড়া। রাহুল বুঝল এটাই তাদের নেতা। নেতার ভেতর থেকে ভয়ংকর অথচ শান্ত এক ফিসফিস ধ্বনি ভেসে এলো। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো—যেখানে অন্য কেউ কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছে না, রাহুল কানে খুব স্পষ্টই শুনতে পেল সেই ফিসফিস, “শব্দই শক্তি।” তার গা শিউরে উঠল। সে শুনতে পেল নেতার কণ্ঠে যেন প্রাচীন কোনো রহস্যের ভার—“নীরবতায় মানুষ তার সত্য চিনবে।”

রাহুল বুঝতে পারল, এরা শুধু শব্দ চুরি করছে না—এরা এক ভয়ংকর উদ্দেশ্যে সব শব্দ জমাচ্ছে। কিন্তু কী সেই উদ্দেশ্য? কেন তারা নীরবতার মধ্যে মানুষকে নিজের সত্য দেখতে বাধ্য করতে চাইছে? রাহুলের মনে হাজার প্রশ্ন জাগল। সে দেখল, নেতা ধীরে ধীরে কালো গর্তের দিকে এগোল—পুকুরপাড়ের নিচে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত অন্ধকার খাদ, যেন পৃথিবীর গভীরে নামার পথ। ছায়ামানবরা একে একে তাদের পাত্রগুলো সেই গর্তে ঢেলে দিচ্ছে। প্রতিটি শব্দ গর্তে পড়তেই অদ্ভুত কাঁপুনি উঠছে মাটিতে, যেন শব্দগুলো মিশে যাচ্ছে এক অজানা অন্ধকার শক্তির ভেতর। রাহুলের মনে হলো, এই গর্তই হলো শব্দের কারাগার। সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকল, ভয় পেল যে তারা যদি তাকে দেখে ফেলে তবে সেও শব্দহীন অন্ধকারে বন্দি হয়ে যাবে। তবুও ভেতরে ভেতরে এক প্রবল দৃঢ়তা তৈরি হলো—সত্যিটা সে জানবেই। এই ছায়ামানবদের রহস্য ফাঁস করতেই হবে, নয়তো গ্রাম তো বটেই, হয়তো সারা পৃথিবী চিরকালের জন্য নীরব হয়ে যাবে। সেই মুহূর্তে রাহুল বুঝল, তার দায়িত্ব এখন অনেক বড়—সে শুধু কৌতূহলী কিশোর নয়, এই রহস্য উন্মোচনের যাত্রার অন্যতম পথিক।

মীরা ছিল গ্রামের প্রাণ। তার গলায় সুরের ঝংকার ছিল, তার গানেই বেলতলা গ্রাম অনেক সময় সন্ধ্যা কাটাত। কিন্তু শব্দ হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে সে যেন প্রাণহীন হয়ে পড়েছিল। প্রথম দিকে সে চেষ্টা করেছিল গান গাইতে, কিন্তু নিজের কণ্ঠের আওয়াজ না পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। সে ভেবেছিল, সুর ছাড়া তার অস্তিত্বই যেন অর্থহীন। কিন্তু কয়েকদিন পরে তার ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগতে শুরু করল। যখন সবাই নীরব হয়ে গেছে, তখনও মীরা টের পেল—তার বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা সুর বাজছে। সেটা শোনা যায় না, কিন্তু হৃদস্পন্দনের মতো তা টের পাওয়া যায়। যেন তার রক্তের ভেতরে গানের তরঙ্গ বয়ে চলেছে। এক সন্ধ্যায়, একা বসে থাকতে থাকতে মীরা হঠাৎ হাত দিয়ে নিজের বুক স্পর্শ করল, আর তখনই সে অনুভব করল—এখানে, এই ভেতরে, শব্দ এখনো বেঁচে আছে। শব্দ কেবল বাইরে হারিয়ে গেছে, কিন্তু মানুষের ভেতর থেকে তাকে মুছে ফেলা যায় না। সেই উপলব্ধি মীরাকে নতুন সাহস দিল।

পরদিন ভোরে, মীরা উঠোনে বসে পড়ল। গলায় সুর তুলতে গেল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। তবু সে হাল ছাড়ল না। সে মনে করল তার গানের প্রতিটি রাগ, প্রতিটি সুরের কম্পন। হঠাৎ তার মনে হলো, শব্দের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ছন্দ। যদি ছন্দ জাগানো যায়, তবে হয়তো সুরও ফিরে আসবে। সে তবলা খুঁজল, কিন্তু শব্দ তো নেই। তাই নিজের দুই হাত একসঙ্গে জোড় করে হাততালি দিল। প্রথমে কেবল নীরব হাততালি, কিন্তু তাতে যে ছন্দের দোলা আছে, সেটা তার শরীরের ভেতরে কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে সেই ছন্দ বাড়াতে লাগল—টালি, বিরতি, আবার টালি। তার হাতের ছন্দে যেন অদৃশ্য স্রোত তৈরি হলো। আশ্চর্যজনকভাবে, সে টের পেল চারপাশের বাতাসে কিছু কম্পন ছড়িয়ে যাচ্ছে। যদিও কানে কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না, তবুও মাটির গায়ে, দেয়ালের গায়ে, বাতাসের ভেতর দিয়ে সেই ছন্দ কাঁপুনি তুলছে। গ্রামের কয়েকজন তার দিকে তাকিয়ে থাকল বিস্ময়ে। আর তখনই ঘটল অদ্ভুত ঘটনা। দূরে কোথাও থেকে মৃদু শব্দ ফিরে এলো। প্রথমে খুব ক্ষীণ—মন্দিরের ঘণ্টার মতো হালকা ঝংকার, যেন খুব দূর থেকে ভেসে আসছে। গ্রামবাসীরা চমকে উঠল।

মীরা থামল না। সে চোখ বুজে তালে তালে হাত বাজিয়ে যেতে লাগল, আর নিজের ভেতরের সুরের কম্পনকে বাহিরে ছড়িয়ে দিতে লাগল। ধীরে ধীরে সেই অদৃশ্য কম্পন যেন আকাশে ছড়িয়ে পড়ল, মাটির নিচে প্রবাহিত হলো। মানুষ হঠাৎ টের পেল—কিছু হারানো শব্দ ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। একটা কুকুর ভয়ে ঘেউঘেউ করল, আর সেই আওয়াজ তারা শুনতে পেল। আবার কোথাও একটা কাক ডাকল। শিশু কেঁদে উঠল, আর সেই কান্নার শব্দ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামবাসীরা বিস্ময়ে মীরার দিকে তাকাল। তারা বুঝল, মীরার সুরই প্রথম ভাঙল নীরবতার দেওয়াল। যদিও সব শব্দ ফেরেনি, কিন্তু সেই মুহূর্তেই এক আশার আলো জ্বলে উঠল সবার মনে। মানুষ ভাবল—যদি একজন মানুষের ভেতরের সুর এত শক্তিশালী হয়, তবে হয়তো সবাই মিলে একদিন সব শব্দ ফিরিয়ে আনতে পারবে। মীরা জানল, দেবী চাইছেন মানুষ নিজের ভেতরের সুর চিনুক, নিজের ভেতরের শক্তি আবিষ্কার করুক। আর সে হলো সেই যাত্রার প্রথম স্ফুলিঙ্গ। তার চোখে জল ভরে উঠল, কিন্তু এবার সেই কান্না হতাশার নয়—আনন্দের, বিশ্বাসের। শব্দ হারালেও, সুরকে কেউ দমাতে পারবে না।

গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় গোপালবাবু ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে নীরবে লিখছিলেন। তার চারপাশে গ্রামের কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে, সবাই অস্থির। ডাক্তার অরিন্দমও পাশে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে ছিলেন। এতদিন তিনি এটাকে মানসিক অসুখ ভেবেছিলেন, হয়তো সম্মিলিত কোনো ভ্রম। কিন্তু মীরার হাততালির পর যখন কিছু শব্দ সত্যিই ফিরে এল, তখন তার বৈজ্ঞানিক যুক্তিগুলো ধসে পড়তে শুরু করল। গোপালবাবু চক থামিয়ে বোর্ডের দিকে তাকালেন। তিনি ইশারায় অরিন্দমকে বললেন কিছু একটা লিখতে। অরিন্দম একটা কাগজে লিখলেন—“আমাদের ভয় কোথায় জমে?” তারপর দু’জনের চোখে চোখ পড়ল, আর একই সঙ্গে যেন একটা উপলব্ধি তাদের ভেতরে কাঁপন তুলল। গোপাল মৃদু হাসলেন, তারপর লিখলেন—“শব্দ শুধু সুর নয়, শব্দ হলো আমাদের ভেতরের আবেগের প্রতিফলন। ভয়, দুঃখ, কান্না—সব মিলেই তো শব্দ।” অরিন্দম যেন হঠাৎ এক জট ছাড়িয়ে ফেলার আনন্দ পেলেন। তিনি ফিসফিস করে নিজেকেই শুনতে পেলেন, “তাহলে ছায়া মানুষ আমাদের ভয়ই সংগ্রহ করছে… আমাদের দুঃখ, যন্ত্রণা, হতাশা। এগুলোই শব্দ হয়ে জমছে।”

গ্রামবাসীরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। গোপাল লিখলেন—“ছায়া মানুষ নিজেরা সৃষ্টি হয়নি। তারা আমাদেরই সৃষ্টি।” এই কথাটা যেন একটা বজ্রাঘাতের মতো সবাইকে নাড়িয়ে দিল। গোপাল বোঝাতে লাগলেন—যতদিন মানুষ ভয় পাবে, দুঃখে কাতর হবে, হতাশায় ভুগবে, ততদিন সেই আবেগগুলো ছায়ার আকারে জন্ম নেবে। সেই আবেগগুলোই শব্দ হয়ে বেরোয়, আর ছায়া মানুষ সেগুলো সংগ্রহ করে অন্ধকার গর্তে জমায়। অর্থাৎ শব্দ আসলে কোথাও হারায়নি—শব্দ আমাদের ভেতরের যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ হয়ে অন্য রূপে বন্দি হয়েছে। ডাক্তার অরিন্দম মাথা নাড়লেন। তার বৈজ্ঞানিক মন হয়তো অদৃশ্য ছায়া মানুষকে বিশ্বাস করতে চাইছিল না, কিন্তু তিনি নিজেই তো শুনেছিলেন সেই ফিসফিস কণ্ঠ—“আমাকে ফিরিয়ে আনো।” এখন তিনি বুঝলেন, সেই কণ্ঠ আসলে মানুষের ভেতরের চাপা পড়ে যাওয়া সত্তার ডাক। মানুষের ভেতরকার ভয়, দুঃখ আর আশা একসঙ্গে মিলেই শব্দ তৈরি করে। আর যতক্ষণ না মানুষ সেই ভয় ভেঙে বেরোবে, ততক্ষণ ছায়ারা শক্তিশালী হতে থাকবে।

গোপালবাবু উঠে দাঁড়িয়ে গ্রামের সবাইকে কাগজে লিখে দেখালেন—“যদি ভয় কেটে যায়, তবে শব্দ আবার ফিরবে।” গ্রামের লোকেরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। এতদিন তারা ভেবেছিল কোনো দেবীর অভিশাপ, কোনো শয়তানি খেলা, কিংবা ভয়ংকর অজানা শক্তি এই নীরবতা নামিয়েছে। কিন্তু সত্যি হলো—এই নীরবতার জন্ম তাদের নিজেদের ভেতর থেকে। মানুষ যত ভয় পেয়েছে, যত দুঃখ জমিয়েছে, তত শব্দ ছায়ার হাতে বন্দি হয়েছে। এখন মুক্তির পথ একটাই—নিজেদের ভয়কে স্বীকার করা, দুঃখকে মেনে নেওয়া এবং সাহস নিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ানো। অরিন্দম সবার দিকে তাকিয়ে কাগজে লিখলেন—“যখন আমরা ভয়কে শক্তিতে রূপান্তর করব, তখনই শব্দ ফিরে আসবে।” মানুষ যেন প্রথমবার আশার আলো দেখতে পেল। তারা বুঝল, মুক্তি কারও হাতে নেই, মুক্তি তাদের নিজেদের ভেতরে। সেই সন্ধ্যায় বেলতলা গ্রামে অদ্ভুত এক নীরব উল্লাস ছড়িয়ে পড়ল। শব্দহীন হয়েও সবাই যেন নতুন করে শুনতে পেল নিজের হৃদয়ের আওয়াজ। আর সেই ভেতরের আওয়াজই একদিন বাইরের শব্দ হয়ে ফিরে আসবে—এই বিশ্বাসে মানুষ আবার বেঁচে উঠল।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল, আর বেলতলা গ্রামের মাঠে গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়েছিল। সবার চোখে-মুখে উদ্বেগ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জেগেছিল নতুন আশা। গোপালবাবু ব্ল্যাকবোর্ডে শেষ নির্দেশ লিখে দিলেন—“একসাথে ছন্দ তোলো।” গ্রামের মানুষরা প্রথমে দ্বিধা করছিল, এতদিন শব্দহীন পৃথিবীতে হাততালির কোনো মানে হয়নি, কিন্তু আজ তারা জানত এই প্রচেষ্টার ভেতরে লুকিয়ে আছে মুক্তির সম্ভাবনা। ধীরে ধীরে হাত উঠল, তারপর পড়ল বুকে, আবার উঠল, আবার পড়ল—মাপা তালে, একসাথে। হাততালির কম্পন বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মীরা চোখ বন্ধ করে দাঁড়াল, তার বুকের ভেতর সেই অদৃশ্য সুর আবার জেগে উঠেছিল। সে ঠোঁট নাড়ল, গানের চেষ্টা করল। প্রথমে নিজের কণ্ঠ শুনতে পেল না, কিন্তু হাততালির ছন্দ তার বুকের ভেতর প্রতিধ্বনির মতো বাজতে থাকল। তারপর যেন হঠাৎ কোথাও অচেনা দরজা খুলে গেল—তার গলার ভেতর থেকে ভেসে উঠল এক ক্ষীণ শব্দ, ম্লান হলেও নিঃসন্দেহে একটা সুর। মুহূর্তেই সবাই চমকে উঠল। হাততালি আরও জোরালো হলো, ছন্দ আরও দৃঢ় হলো। তারপর, যেন বজ্রপাতের মতো, পুকুরের দিক থেকে এক অদ্ভুত কম্পন উঠল, আর সেখান থেকেই আসতে লাগল অজস্র শব্দ—একসাথে, বিশৃঙ্খল অথচ প্রাণবন্ত।

পুকুরের গহ্বর থেকে যেন উন্মুক্ত হলো এক অদৃশ্য ভাণ্ডার। হঠাৎ চারদিক ভরে গেল পাখির ডাক, গরুর ঘণ্টার টুংটাং, বাচ্চাদের হাসি, মন্দিরের ঘণ্টার ঝংকার। বাতাসে দুলে উঠল গাছের পাতার শো শো শব্দ, কুকুররা আনন্দে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল, এমনকি কেউ চিৎকার করে উঠলে সেই কণ্ঠও স্পষ্ট হয়ে উঠল। গ্রামের মানুষরা প্রথমে থমকে গিয়েছিল, তারপর তারা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল—কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে, কেউবা আনন্দে লাফাচ্ছে। এতদিনের নীরবতা ভেঙে গিয়ে আবার পৃথিবী ভরে উঠল চেনা সুরে। মীরা এবার সত্যি সত্যি গান গাইতে শুরু করল, আর তার কণ্ঠ যেন গ্রামের বুকের ওপর বয়ে যাওয়া নদীর মতো গর্জে উঠল। অরিন্দম দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখলেন—তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বাইরে, তবুও নিঃসন্দেহে সত্য। গোপালবাবুর চোখ ভিজে গেল, তিনি চক থামিয়ে শুধু নীরবে আকাশের দিকে তাকালেন। মনে হচ্ছিল, বেলতলা গ্রাম যেন এক অলৌকিক শক্তির হাত ধরে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মানুষরা বুঝতে পারল, ভয়কে হারিয়ে তারা নিজেদের ভেতর থেকে সুর ফিরিয়ে এনেছে।

কিন্তু এই উল্লাসের ভেতরেও একা দাঁড়িয়ে ছিল রাহুল। সবার উচ্ছ্বাস থেকে আলাদা হয়ে সে মাঠের কোণায় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে কেবল শুনছিল। তার কানে ভেসে এল না পাখির ডাক, না ঘণ্টার ধ্বনি, না মানুষের হাসি। বরং তার কানে এসে আঘাত করল এক ভৌতিক ফিসফিসানি—কাঁপা, ভাঙা, অথচ ভয়ঙ্কর স্পষ্ট। সেই কণ্ঠ বলল, “সব শব্দ ফিরেছে… কিন্তু আমার সংগ্রহ এখনো শেষ হয়নি…” রাহুলের গলা শুকিয়ে গেল। সে চারপাশে তাকাল, কেউ টের পেল না, কেউ শুনল না। শুধু সে-ই শুনছে। তার মনে হলো পুকুরের কালো গহ্বর এখনো অশান্ত, এখনো ফুঁসছে। ছায়ামানবেরা হয়তো সরে গেছে, কিন্তু তাদের নেতা এখনো লুকিয়ে আছে অন্ধকারে, নতুন শব্দের অপেক্ষায়। গ্রামের মানুষরা খুশির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে, অথচ রাহুল জানে—অভিশাপ পুরোপুরি কাটেনি। অমীমাংসিত সেই ফিসফিস যেন আকাশের নিচে প্রতিধ্বনি তুলছিল, শুধু তার কানে। সেই রাতে বেলতলা গ্রাম আবার শব্দে ভরে উঠল, কিন্তু রাহুল বুঝল, নীরবতার ছায়া এখনো একদিন ফিরে আসবেই। আর তার ভেতরে জমে থাকা সেই ভয় কেবল বাড়তে থাকল। গল্প সেখানেই থেমে গেল—অপূর্ণ, রহস্যে মোড়া, ঠিক যেমন ভোরের আগের অন্ধকার কখনো পুরোপুরি সরে যায় না।

—–

1000058699.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *