সৌম্যজিৎ বসাক
১
সকালের আলো জানালার পাতলা পর্দার ফাঁক গলে এসে পড়ছে বিছানার চাদরে। ঘড়ির কাঁটা আটটা বাজিয়ে থেমে গেছে—না, থেমে যায়নি, চলছে, কিন্তু তার কাছে যেন সব স্থির। ড. অরিজিৎ ধর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন ছাদের দিকে। মস্তিষ্কে যেন কোনো শব্দ নেই, কোনো স্মৃতি নেই, কোনো প্রতিচ্ছবি নেই। তিনি উঠে বসলেন বিছানায়। মাথাটা ভারী লাগছে, যেমন হয় একটানা অনেকক্ষণ ঘুমালে। চারপাশে চেনা আসবাবপত্র, পরিচিত বইয়ের তাক, ল্যাম্পশেডের নিচে রাখা একটা পুরোনো পেন স্ট্যান্ড। কিন্তু এই ঘরটা যেন আজ নতুন মনে হচ্ছে—কিংবা মনে পড়ছে না একেবারেই। তিনি টেবিলের দিকে হাঁটলেন, যেখানে একটি নীলমাখা ডায়েরি খোলা পড়ে আছে। নিজের হাতের লেখায় সেখানে লেখা: “সূত্র ৩৯৭: চেতনার অভ্যন্তরীণ সময়চক্র একবার সক্রিয় হলে বাহ্যিক কাল তার প্রতিফলন নয়।” নিচে সই করা—‘অরিজিৎ’। তাঁরই লেখা, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি তো এটা লিখেছেন কখন? কিভাবে? কিছুই মনে নেই। ঘরের কোণে রাখা ঘড়িতে তখন বাজে ৮:১৬। তিনি তাড়াতাড়ি বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুলেন, তারপর আয়নায় নিজের মুখ দেখলেন—চোখে লালচে ভাব, মুখে ক্লান্তির রেখা, কিন্তু সবচেয়ে স্পষ্ট যে জিনিসটা দেখা যাচ্ছে তা হলো একরাশ বিভ্রান্তি। তিনি আস্তে করে বললেন, “আমি কে? আমি… কোথা থেকে এলাম গতকাল?”
ঈশা তখন রান্নাঘরে। ড্রিপ কফি প্রস্তুত হচ্ছে। সে সবসময় সকালে অরিজিৎ-এর জন্য কফি তৈরি করে। আজও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু আজ যখন সে তাঁকে দেখে, এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। “রাতটা কেমন গেল?” ঈশা জিজ্ঞেস করে। অরিজিৎ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেয়, “রাত?” তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “গতকালই মনে নেই।” ঈশা মুখ ফিরিয়ে নেন, যেন এমনটা হতেই পারে। তিনি একটা ফাইল এগিয়ে দেয়, “আজ তোমার সেমিনার, মনে আছে?” অরিজিৎ ফাইল খুলে দেখে, তারই নাম লেখা আছে—“ড. অরিজিৎ ধর, Institute of Temporal Cognitive Research”—নিচে প্রবন্ধের শিরোনাম: Time Perception and Neural Echoes. সে আবার সেই চেনা অনুভব—একটা অচেনা পরিচিতি। ফাইলের ভেতর রাখা একটি ছবিতে নিজেকে দেখে চমকে ওঠে, সেখানে সে হাসছে কিছু সহকর্মীর সঙ্গে, কিন্তু কিছুই মনে পড়ে না। কফির কাপ থেকে এক চুমুক নিয়ে সে বলে, “আমি প্রতিদিন সকালে কিছু মনে রাখতে পারি না, তাই না?” ঈশা চুপ থাকে। তারপর ধীরে বলে, “তুমি বলেছিলে তোমার ঘুমের ভেতর একটা ‘নিউরাল ব্ল্যাঙ্ক স্পেস’ তৈরি হচ্ছে। যেটা গতদিনের সব স্মৃতি মুছে দিচ্ছে।” অরিজিৎ বলল, “তাহলে আমি এখন কি নতুন করে নিজেকে চিনছি?” ঈশা শুধু একবার তাকায় তার দিকে—একটা ক্লান্তির হাসি, যে হাসি বোঝায়, এটি নতুন নয়।
অরিজিৎ সেদিন ল্যাবে পৌঁছায় এক অদ্ভুত অনুভব নিয়ে। সহকর্মী তিতাস হাসিমুখে বলে, “স্যার, আপনি কাল যা বলেছিলেন, তা নিয়ে আমি পুরো রাত পড়াশোনা করেছি।” অরিজিৎ চমকে উঠে বলে, “আমি কি বলেছিলাম?” তিতাস একটু থমকে গিয়ে বলে, “আপনি বলেছিলেন—সময় আসলে বাইরে না, সময় আমাদের মস্তিষ্কের তৈরি ‘চেতনার প্রতিফলন’। আমরা যে মুহূর্তটা মনে রাখি, সেটাই বাস্তব, বাকি সব তো কেবল প্রবাহ।” কথাগুলো শুনে অরিজিৎ কাঁপতে কাঁপতে ল্যাবের ভেতর ঢুকে পড়ে, দেখে তার ডেস্কে আবার একটি ডায়েরি পড়ে আছে—গতকালেরটি নয়, অন্যটি। সেখানে এক পৃষ্ঠা খোলা—লেখা আছে: “আজ কেউ আসবে। তার চোখে বিশ্বাস নেই। কিন্তু মনে রাখো, তার মুখ মনে থাকবে না কাল।” অরিজিৎ চারপাশে তাকায়, কে আসবে? কে দেখবে? কেন মনে থাকবে না? তার মাথার ভেতর যেন অজস্র প্রশ্নের জট খুলে আবার জড়িয়ে যাচ্ছে। তার মুখে হঠাৎ একটা বিড়বিড়—“আমার নাম অরিজিৎ ধর। আমি সময় নিয়ে কাজ করি। কিন্তু আজকাল মনে হচ্ছে সময় আমার ওপর কাজ করছে।”
২
রাত সাড়ে তিনটে। অরিজিৎ বিছানায় উঠে বসে। শরীর ঘেমে ভিজে গেছে, বুক ধড়ফড় করছে। ঘুমের ভেতরে কিছু একটা অনুভব করেছিল—কোনো শব্দ, হয়তো গলায় ফিসফিস শব্দ, অথবা দরজার ধীর সরে আসা শব্দ। সে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের ভিতরে আলো জ্বালাল। জানালার পর্দা হালকা দুলছে, বাইরে বাতাস নেই তেমন। তখনই তার চোখ পড়ে আয়নার দিকে। সেই ভারী কাঠের ফ্রেমের আয়না, যেটা দেয়ালে বসানো। আয়নার ভেতর নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেই সে হঠাৎ স্থির হয়ে যায়। মুহূর্তের জন্য মনে হয়, আয়নায় থাকা সেই চোখ দুটো একটু বেশিই তাকিয়ে আছে, একটু বেশিই গভীরে, একটু বেশিই… যেন আরেকটা সত্তা! সে দ্রুত কাছে গিয়ে তাকায়, না, শুধুই নিজের প্রতিবিম্ব। কিন্তু তার মনের ভিতর সেই একটা অস্বস্তি চেপে বসে—যেন কেউ বা কিছু ছিল সেখানে। সে আবার টেবিলের দিকে ফিরে যায়, ডায়েরির পাতা ওলটায়। আজকের পাতায় লেখা: “তোমাকে সে দেখেছে। এখন সময় ফুরাচ্ছে।” পাশে অদ্ভুত এক প্রতীক—দুই ঘড়ির মধ্যে একটি চোখ আঁকা, নিচে লেখা: He watches through time, not through walls. হঠাৎ জানালার বাইরে এক ছায়া দ্রুত চলে গেল। সে জানে, হয়তো কিছুই না, কিন্তু মাথার ভিতরে যেন কারও নিঃশ্বাস পড়ে।
পরদিন সকালটা অন্যরকম। ঈশা কিছুটা চিন্তিত। অরিজিৎ কফির কাপ হাতে বসে আছে, চোখে এক অদ্ভুত চাপা ভয়। ঈশা বলে, “ঘুম ঠিকমতো হয়েছে?” সে মাথা নাড়ে, “হয়নি। আমি কারও উপস্থিতি টের পেয়েছি। আয়নার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল… আমি ছাড়া আর কেউ ছিল সেখানে।” ঈশা থমকে যায়, তারপর চুপচাপ বসে থাকে। তারপর ধীরে বলে, “তুমি বলেছিলে আগেও একবার এরকম কিছু মনে হয়েছিল।” অরিজিৎ বলে, “আমি কি আগে বলেছিলাম? আমি কি এটা অনুভব করেছি আগেও?” ঈশা মুখ নামিয়ে নেয়, বলে না কিছুই। অরিজিৎ ডায়েরি খুলে দেখায় সেই প্রতীকটা। ঈশা কিছুক্ষণ দেখার পর বলে, “এই প্রতীকটা আমি আগে কোথায় যেন দেখেছি।” সে উঠে গিয়ে একটা পুরনো বই বের করে—ভিতরে ‘Project Chrona’-র একটি গবেষণাপত্র। প্রতীকটা সেখানে, সেই চোখ, ঘড়ি, সময়ের চক্র। বইয়ের পেছনের পৃষ্ঠায় একটা নাম—Vikram Chattopadhyay, নিউরো-বায়োটাইমোলজির জনক। ঈশা কাঁপা গলায় বলে, “এই গবেষণাটা অনেক বছর আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তুমি যখন SIGMA-র তত্ত্বাবধানে ছিলে, তখন তুমি এই নিয়ে কাজ করেছিলে। কিন্তু তারপর… তুমি একদিন বাড়ি ফিরে এসে বলেছিলে, আর কখনো এই প্রোজেক্ট নিয়ে কথা বলবে না। আমি ভাবিনি, তুমি আবার ওতে ফিরবে।” অরিজিৎ স্তব্ধ। SIGMA নামটা যেন তার মাথায় হঠাৎ বজ্রপাতের মতো বাজে। কিন্তু কেন এই নামটা তার মনে ভয় ধরায়, সেটা সে জানে না। শুধু অনুভব করে, কিছু ছিল, যা তাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সেই দিন সন্ধ্যায়, সে একা বসে আছে তার গবেষণাগারে। ল্যাবের বাতিগুলো মিটমিট করছে। সে কম্পিউটারে টাইম-সিগন্যাল ট্র্যাকিং-এর একটা পুরনো নথি খুঁজে পাচ্ছে না। এমন সময় দরজা খুলে তিতাস আসে। তার হাতে একটা পেনড্রাইভ। সে বলে, “স্যার, আমি জানি আপনি স্মৃতি হারাচ্ছেন। কিন্তু আপনি এই ফাইলটা আমাকে দিয়েছিলেন এক সপ্তাহ আগে, বলেছিলেন—যদি আপনি সব ভুলে যান, তবে এটা চালাবেন।” অরিজিৎ পেনড্রাইভটা হাতে নিয়ে চালায়। পর্দায় তার নিজের মুখ—ভিডিওতে সে বলছে, “তুমি যদি এটা দেখছো, তার মানে আমি ভুলে গেছি সবকিছু। বিশ্বাস কোরো না কাউকে। না ঈশা, না SIGMA-কে। আমি একটা কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছি, যা সময়ের স্রোতকে উল্টে দিতে পারে। কিন্তু কেউ তা চায় না। তারা চাইছে আমি প্রতিদিন ভুলে যাই। এবং সেই ‘ওয়াচার’—সে সব জানে।” অরিজিৎ স্তব্ধ। সে তখনও বোঝে না কে সত্য, কে মিথ্যা। কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত—সে আর একা নেই। কেউ দেখছে তাকে, কেউ তার চারপাশে আছে, হয়তো একই সময়েই, হয়তো সময়ের বাইরেই। সে আয়নার দিকে তাকায় আবার। এইবার কিছু একটা, খুবই ক্ষণস্থায়ী, চোখে পড়ে—এক জোড়া শীতল চোখ তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু কোনো মুখ ছিল না। সে কাঁপতে কাঁপতে ডায়েরিতে লিখে ফেলে: “ও আছে। সে দেখছে। আমি ভুলে যাচ্ছি, কিন্তু সে মনে রাখছে।” এরপর সে আলো নিভিয়ে দেয়, আয়নার সামনে বসে থাকে নিঃশব্দে, যেন কোনো এক ছায়াকে ডাকছে—এবং প্রথমবার, আয়নার পেছনে কিছু একটা যেন নড়েচড়ে ওঠে।
৩
ল্যাবরেটরির কোণ ঘেঁষে একটি পুরনো ফাইলিং ক্যাবিনেট ছিল, যেটার উপর ধুলো জমে আছে দীর্ঘদিন। অরিজিৎ সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠিক কী অনুভব করেছিল সেটা মনে নেই, কিন্তু একটা ছায়া-ছায়া ভয় বুকের মধ্যে জমে ছিল। তার মাথায় ঘুরছিল আগের রাতের ভিডিওবার্তা, আয়নার সেই ঠান্ডা চোখজোড়া এবং ডায়েরিতে লেখা “সে মনে রাখছে” লাইনটি। সে ঠিক করল আজ তার গবেষণার পুরনো দলিলগুলো ঘেঁটে দেখবে। ক্যাবিনেটের একেবারে নিচের তাকে পুরু এক ফোল্ডার বের হলো—ফাইলের ওপরে মোটা অক্ষরে লেখা PROJECT CHRONA: CLASSIFIED. সে ধীরে ধীরে ফাইল খুলল। ভিতরে পঞ্চাশেরও বেশি পাতায় টাইপ করা রিপোর্ট, হাতে আঁকা নকশা, নিউরাল স্ক্যান ডায়াগ্রাম এবং একাধিক নোটস—সবকিছুর কেন্দ্রে একটা বিষয়: মানব মস্তিষ্কে সময়চক্র (Chrono-loop) এর উপস্থিতি। পাতার ভেতরে এক জায়গায় লেখা ছিল, “When the neural echo gets trapped within temporal memory loop, external time becomes redundant. Subject relives perception, not event.” অরিজিৎ থমকে যায়। তার মাথার ভিতরে গুঞ্জন শুরু হয়—তবে কি তার স্মৃতিভ্রংশ প্রকৃতপক্ষে সময়ের একটা লুপ? আবার পড়ে সে—Subject relives perception, not event—অর্থাৎ, ঘটনাকে নয়, মস্তিষ্ক প্রতিবার অনুভবকেই পুনরাবৃত্ত করে। হঠাৎ, তার মনে পড়ে গতকাল তিতাস বলেছিল, “আপনার বলা কথাগুলো, যেন আগে শুনেছি।” হয়তো তা-ই, সে প্রতিদিন একই চিন্তা, একই আবিষ্কার পুনরায় করছে, কিন্তু নিজেই তা মনে রাখতে পারছে না।
অরিজিৎ পরবর্তী কিছু ঘন্টা কাটায় সেই ফাইলের অজস্র প্রতীক বিশ্লেষণ করে। কিছু প্রতীক একইরকম যা সে ডায়েরিতে এঁকেছে আগের দিনগুলোতে—অবচেতনভাবে! কিন্তু সেগুলো ছিল আজকের আগে তার কাছে সম্পূর্ণ অজানা। এর মানে, এই সূত্রগুলো সে আগেই জেনেছে, কিন্তু ভুলে গেছে বারবার। এক পর্যায়ে সে আবিষ্কার করে একটি পৃষ্ঠা যার নিচে লেখা: “RESTRICTED: Subject 03-A”—পাশেই একটা সাদা-কালো ছবি, নিজের মুখ। তার নিচে লেখা, “Lead Researcher: Dr. Arijit Dhar”. সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ। সে নিজেই এই প্রোজেক্টের লিড ছিল? নিজের ওপরেই গবেষণা করছিল? পৃষ্ঠার কোণায় ছোট করে লেখা, “Experiment: Controlled memory erasure via temporal signal stimulation.” মাথা যেন ঘুরে উঠল। সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে তার স্মৃতি-ভ্রংশ কোনো রোগ নয়, একটি পরিকল্পিত পরীক্ষার ফল। প্রশ্ন জাগে—সে নিজেই কি নিজেকে ব্যবহার করেছে গিনিপিগ হিসেবে? না কি কেউ অন্য কেউ তাকে এতে নামিয়ে দিয়েছে? আর SIGMA? তারা কী এই প্রোজেক্টের নিয়ন্ত্রক? তৎক্ষণাৎ দরজায় টোকা পড়ে। তিতাস ঢোকে। সে দেখে অরিজিৎ ফাইল নিয়ে বসে আছে। কিছু বলতে যাবে, তখনই অরিজিৎ প্যাঁচানো স্বরে বলে, “এই ফাইলটা তুমি আগে দেখেছ?” তিতাস একটু থেমে বলে, “আমি দেখিনি, কিন্তু আমি জানতাম আপনি এটা খুঁজবেন একদিন।” সেই কথা শুনে অরিজিৎ বুঝে যায়, তিতাস তার অতীত কিছুটা জানে, যা তার বর্তমান থেকে মুছে গেছে।
তিতাস ধীরে ধীরে সব খুলে বলে—“স্যার, আপনি নিজেই এক সময় বলেছিলেন, ‘আমরা যদি সময়কে অনুভব করতে শিখি, তাহলে স্মৃতি হয়ে উঠবে অপ্রয়োজনীয়।’ তারপর আপনি Project Chrona-র অংশ হন। আপনি বারবার বলেন, ‘স্মৃতি একটা পলিমার, সময় তাকে ভাঁজ করে।’ কিন্তু কিছু একটা হয়েছিল… আপনি হঠাৎ করে সব বন্ধ করে দেন। SIGMA তখন চেয়েছিল প্রোজেক্ট চালিয়ে যেতে, কিন্তু আপনি নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। তারপর আপনি হারিয়ে যান একদিনের মধ্যে। যখন ফিরে আসেন, আপনি সব ভুলে গেছেন। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম এটা সাইকোজেনিক অ্যামনেশিয়া। কিন্তু যখন দেখলাম, আপনি প্রতিদিন সকালে ডায়েরিতে সূত্র লিখে রাখছেন, তখন বুঝলাম—আপনার স্মৃতি নয়, আপনার সময়ই ভেঙে গেছে।” অরিজিৎ তার ডায়েরির শেষ পাতায় চোখ রাখে। আজকের লাইন: “স্মৃতি নয়, সময়কেই মুছে দিচ্ছে তারা।” সে ফিসফিস করে বলে, “কারা?” তিতাস শান্ত গলায় উত্তর দেয়, “SIGMA চায় আপনি কিছু মনে না রাখুন। আপনি এমন কিছু জানেন যা প্রকৃতি বোঝে না, মানুষ মানতে পারে না। আপনি বলেছিলেন—‘সময় স্থির নয়, আমরাই তাকে টান দিই মনে রাখার মাধ্যমে।’ SIGMA চায় এই টানটাই ছিঁড়ে ফেলতে।” অরিজিৎ কাঁপা হাতে ডেস্ক থেকে সেই পেনড্রাইভটা বের করে, তিতাসের সামনে রাখে। বলে, “এই ভিডিওটা আজ সকালেই দেখলাম।” তারপর সে ডায়রির একটা খালি পৃষ্ঠায় লিখে ফেলে, “আমি যদি ভুলে যাই, এটা মনে রেখো—সূত্র ৩৯৭ সত্য। সময় নিজেকে ভাঁজ করে, যদি কেউ তাকে মনে না রাখে।” জানালার বাইরে তখন এক অদ্ভুত রকম আলো ছড়িয়ে পড়ছে, যেন সূর্য অস্ত নয়, বরং আলোই সময়কে পিছিয়ে দিচ্ছে। আর ভিতরে, তার চারপাশে, সময় আর স্মৃতি ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য এক সূত্রের কুয়াশায়।
৪
ড. অনির্বাণ ঘোষের মাথায় যেন এক অদৃশ্য ঢেউ আছড়ে পড়ছিল। সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে সেই পরিচিত অনিশ্চয়তা, চোখে-মুখে খাটুনি, কিন্তু সবথেকে বেশি যেটা পোড়াচ্ছিল তা হল—“আমি আবার কিছু ভুলে গেছি।” টেবিলের ডায়েরিতে আজকের দিনটার জন্য লেখা ছিল একটি অদ্ভুত সূত্র: ψ(t+Δ) = Λ(ψ(t)) + χ। সূত্রের নীচে নিজের হাতের লেখায় লেখা, “তুমি যতই মুছে ফেলো, আমি আবার লিখব।” এই লেখাটা শুধু রহস্যের সৃষ্টি করছিল না, বরং স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে অনির্বাণ নিজেই প্রতিরোধ করছে কোনো অজানা শক্তির বিরুদ্ধে। সূত্রটা পড়ে তার মনে হল, এটা কোয়ান্টাম টাইম শিফ্টের ধারণা—কিন্তু আরও বেশি গভীরে ছিল যেন স্মৃতি ও সময়ের সম্পর্ক। নিজের হাতে লেখা হলেও, কীভাবে লিখেছে, কখন লিখেছে—তা নিয়ে তার কোনো ধারণা নেই। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল, সে কি তাহলে গতকালকেও এই একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল? এই সূত্রই কি তাকে বারবার ভুলে যেতে বাধ্য করছে? না কি এই সূত্রই তার ভুলে যাওয়ার একমাত্র ওষুধ?
তারপর সে চলে গেল সেই গোপন ল্যাবরেটরিতে, যেটা এখন কেবল তার জন্যই বরাদ্দ। সেখানে ঢুকে সে টার্মিনালে আগে রেকর্ড করা ভিডিও চালু করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল আগের দিনের রাত—ড. অনির্বাণ নিজের মুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছে, “যদি তুমি এটা দেখছো, তাহলে মনে রেখো—‘তারা’ তোমার স্মৃতি মুছে দিচ্ছে, কিন্তু প্রতিবার তুমি নিজেই সূত্রটা লিখে যাচ্ছো। তুমি নিজেকে ভুলতে দিচ্ছ না, অনির্বাণ।” তার গলার স্বর ভারী, চোখের নিচে কালি, চেহারায় ভয় ও সংকল্পের মিশ্র ছাপ। এরপর সে আবার সূত্রটা বোর্ডে লিখছে, তারপর দ্রুত কিছু তথ্য টাইপ করছে—এবং একটা শব্দ উচ্চারণ করেই ভিডিও শেষ হয়ে যায়: “ফর্মুলা ছায়ার।” এই কথাটা এতটাই বিভ্রান্তিকর ছিল যে অনির্বাণ বুঝতেই পারছিল না ‘ছায়ার ফর্মুলা’ বলতে সে কী বোঝাতে চাচ্ছে। কে এই ‘তারা’? কারা তার স্মৃতি মুছে দিচ্ছে? আর তারই বা কি লাভ এতে? সে যখন আবার নিজের মাথা চুলকে কিছু ভাবছিল, হঠাৎই দরজা খুলে এক অচেনা ব্যক্তি ঘরে ঢুকল—সরকারি সংস্থার পোশাক, চোখে ঠাণ্ডা নিঃসংবেদন দৃষ্টি—সে বলল, “আপনার মেমোরি ইরেজ শিডিউল এখনো ঠিক আছে, অনির্বাণ স্যার। কিন্তু এবার একটু পরিবর্তন হয়েছে—আপনাকে আজ বিকেলেই হেড কোয়ার্টারে যেতে হবে।”
অনির্বাণ চমকে গেল। এতদিন ধরে যা করছিল, সবটাই তার অজানা স্মৃতির নিরিখে; কিন্তু এখন তো সামনাসামনি তার কাছে কেউ এসে জানাচ্ছে যে, তার স্মৃতি সত্যিই ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে। এটি কেবল তার ধারণা ছিল না—বাস্তব। তার মধ্যে যেন দুইটা অস্তিত্ব বাস করছে—একটা স্মৃতিহীন ‘আমি’ আরেকটা সূত্র লিখে যাওয়া সচেতন ‘আমি’। হেড কোয়ার্টারে যেতে যেতে সে ভাবছিল, এই ‘ছায়ার ফর্মুলা’ কি সেই লুকোনো সত্য যা এই বিশ্বের গোপন সময়-চক্রকে প্রকাশ করে দেবে? হয়তো সে নিজেই সময় নিয়ে এমন কিছু আবিষ্কার করেছে, যা সরকার বা কোনও বৃহৎ প্রতিষ্ঠান মেনে নিতে পারছে না। হেড কোয়ার্টারে পৌঁছে সে দেখল বিশাল এক সাদা কক্ষে তাকে বসানো হয়েছে, সামনে বিশাল পর্দা, ঘরের একপাশে ড. অরুণিমা বসে আছেন—তাকে দেখে অনির্বাণের মনে কিছু যেন উঁকি দিল, এক ঝলক পুরনো আবেগ। অরুণিমা ধীরে বলে উঠলেন, “তুমি ভুলে যাচ্ছো অনির্বাণ, কিন্তু আমি এখনো মনে রেখেছি।” তিনি এগিয়ে এসে তার হাতে একটি পুরনো কাগজ ধরিয়ে দিলেন—যেখানে ছিল সেই প্রথম সূত্র, আজকের ডায়েরিতে থাকা সূত্রের আগের রূপ। ড. অনির্বাণ নিঃশ্বাস চেপে পড়লেন সেই কাগজে লেখা বাক্যটার দিকে—“ছায়া ছাড়া আলোর অস্তিত্ব নেই। সময়ের ছায়াতেই লুকিয়ে আছে স্মৃতির সত্য।”
৫
রাত্রির নিস্তব্ধতায় ঘরে ভেসে আসা গুনগুন শব্দটা ক’দিন ধরেই কৌশিকের মাথায় সন্দেহের বীজ বুনছিল। ঘড়ির কাঁটা যখন তিনটে পেরোয়, তখন হঠাৎই তার চোখ খুলে যায়, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে তুলেছে বিছানা থেকে। টেবিলের উপর রাখা চৌকো বক্সের মতো জিনিসটা আজ একটু আলাদা লাগছে—এর আগেও এমন বোধ হয়নি তার। সে ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে হাত বাড়ায় সেই বক্সটার দিকে। হঠাৎই আলোর ঝলকানি চোখ ধাঁধিয়ে দেয় তাকে, আর একটি অদ্ভুত শব্দের সাথে যেন তার মস্তিষ্কে ঢুকে পড়ে কিছু ডেটা—অচেনা, কিন্তু আবারো পরিচিত। পরদিন সকালে তার চোখে ঘুম নেই, ডায়েরির পাতায় লেখা থাকে একটি নাম—“Project Kṛtanta,” আর একটি শব্দ—“Phase II Initiated।” কৌশিক এবার বুঝতে পারে, প্রতিটি দিন তার স্মৃতি মুছে গেলেও, কোনো এক বুদ্ধিমান ‘অপর সে’ ডায়েরির মধ্যে সূত্র রেখে যাচ্ছে ভবিষ্যতের কৌশিকের জন্য। কিন্তু কে সেই অপর সে? আর কোন ঘাতক ছায়া এই স্মৃতি লোপের প্রকল্পের পরিচালক? তার পাশের দেয়ালে হঠাৎ এক ছায়া দেখা যায়, দরজার ফাঁক দিয়ে যেন কেউ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে। সে ছুটে গিয়ে দরজা খোলে, কিন্তু কেউ নেই। শুধু পড়ে থাকে একটি প্ল্যাস্টিক কার্ড, যার উপরে লেখা—“ARC-Lab Clearance, Level Black.”
পরদিন সে ছুটে যায় শহরের উপকণ্ঠে থাকা পুরনো গবেষণা ভবনটির দিকে, যার সামনে চিরকাল ‘বন্ধ’ বোর্ড ঝুলে থাকত। কিন্তু কৌশিক জানত, এই ভবনের নিচে আছে এক গোপন গবেষণাগার, যার নাম ARC-Lab, যেখানে এক সময় সে নিজেই কাজ করত। ভবনের নিচতলায় নামতেই তার চোখে পড়ে অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি, ডেটা স্টোরেজ ইউনিট, আর মাঝখানে রাখা এক অর্ধ-পরিষ্কার বোর্ডে লেখা—”Kṛtanta is not just memory… it’s erasure of time.” তার মনে পড়ে যায় একটা নাম—ড. রাহুল সেন, যে তার সহ-গবেষক ছিল এবং হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হয়ে যায়। সে বোর্ডের পাশে রাখা একটি হার্ডডিস্ক কম্পিউটারে ঢুকিয়ে পড়ে—ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কৌশিক নিজেই একটি ল্যাবে ঢুকছে, নিজের মাথায় কিছু পরছে এবং পরে সেই একই কৌশিক বাইরে আসছে সম্পূর্ণ শূন্য চোখে, যেন নতুন জন্ম নিয়েছে। সে বুঝতে পারে, এই স্মৃতি মুছে ফেলার পেছনে তার নিজের হাত আছে, কিন্তু কেন? ভিডিওর শেষ দিকে একটি মেয়ে দেখা যায়—ড. মেঘলা বন্দ্যোপাধ্যায়, যার সাথে তার একসময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তার চোখে আতঙ্ক আর ঠোঁটে একটিই বাক্য—“They will find out. Burn the notes.”
ফুটেজ শেষ হওয়ার পর মুহূর্তেই ল্যাবরুমে সাইরেন বাজতে শুরু করে। মনে হয় কেউ যেন ARC-Lab এর অস্তিত্ব টের পেয়েছে। কৌশিক তড়িঘড়ি করে নোটবুক আর কিছু কম্প্যাক্ট হার্ডডিস্ক নিয়ে বেরিয়ে আসে, কিন্তু ভবনের গেট বন্ধ—বহির্বিশ্বের সঙ্গে ল্যাবটিকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায়। সেই মুহূর্তে এক পরিচিত কণ্ঠ শোনা যায়—“তুমি যত গভীরে যাচ্ছো, ততই নিজেকে হারাচ্ছো কৌশিক।” কণ্ঠটা কার, সে স্পষ্ট বোঝে না, কিন্তু ভয়াবহ এক চেতনাগত যন্ত্রণা তার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে, আর সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টি ঝাপসা হতে থাকে। তার মনে হতে থাকে যেন সে একই সময়ে দুই জায়গায় আছে—একদিকে এই ভবনের ভিতরে, আর অন্যদিকে একটি অদ্ভুত, অন্ধকারে ঢাকা ভবিষ্যতের কক্ষ, যেখানে এক রোবট-সদৃশ মানব মুখোশ পরা কেউ চুপচাপ তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুহূর্তে আবার চোখ খুললে সে আবিষ্কার করে নিজেকে ল্যাবের বাইরে, নিজের অ্যাপার্টমেন্টে, বিছানার ওপর শুয়ে। ঘড়িতে সকাল ৮টা। তার ডায়েরির পাতায় আবার একটি নতুন লাইন—“The mirror has seen you. Next, find M.B. files.” এবার আর কৌশিক অবাক হয় না। সে জানে, ছায়ার নকশা তাকে তাড়া করছে, আর প্রতিদিন সকালে যে সে নতুন কৌশিক হয়ে ওঠে, সেই পরিবর্তন শুধুই স্মৃতির খেলা নয়—এটা সময়ের গভীর স্তরে নেমে যাওয়া এক ভয়াবহ প্রচেষ্টা, যার জালে সে নিজেই জড়িয়ে ফেলেছে নিজেকে।
৬
নীরব রাতের মধ্যে সায়ন্তনের ঘুম ভেঙে যায়। ঘরটা ঘন কালো অন্ধকারে ভরা, কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে শহরের আলো একটু আধটু পড়ে আছে মেঝেতে। পাশে রাখা ঘড়িটা তখন ৩টা ১৭ মিনিট দেখাচ্ছে। গলা শুকিয়ে আছে, মাথা ভারী লাগছে—এটা নতুন নয়, কিন্তু আজকের ঘুমভাঙাটা যেন অস্বাভাবিক কিছু চিহ্ন বয়ে আনছে। বিছানা ছেড়ে উঠেই ও প্রথমে আলমারির দিকে এগিয়ে যায়, সেই ডায়েরিটা বের করে, যেটা তার প্রতিটি সকালের একমাত্র আশ্রয়। ডায়েরির আজকের পাতায় অদ্ভুত একটা চিত্র আঁকা—এটা কোনো সূত্র নয়, বরং একটা শব্দ-তরঙ্গের গ্রাফ, যেন কোনো ধ্বনির অদৃশ্য প্রতিচ্ছবি। নিচে লেখা — “শব্দ স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, সময় নয়।” এই কথাটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যেটা সায়ন্তনের ভেতরের এক গভীর স্তরকে নাড়া দিয়ে যায়। সে ডায়েরিটা নিয়ে বসে, আবারো তাকায় সেই ধ্বনি-চিত্রটার দিকে, যেন সেটা তাকে কিছু বলতে চাইছে—কিন্তু কী?
পরদিন সকালে ল্যাবে পৌঁছে সায়ন্তন প্রথমেই তার রেকর্ড করা অডিও ফাইলগুলো খুলে বসে। সে জানে, প্রতিটি দিন শুরু হয় তার পুরনো গবেষণার পুনরাবৃত্তি দিয়ে, কিন্তু আজ যেন কিছু আলাদা। কাল রাতের স্বপ্নে একটা শব্দ শুনেছিল সে—অদ্ভুত কম্পনের মতো, কিছুটা যন্ত্রচালিত, কিছুটা মানবিক—যেন কোনো যন্ত্র কিছু বলতে চাইছে। রেকর্ডার চালিয়ে সে নিজের গলার রেকর্ড শোনে—কিন্তু হঠাৎ করে একটা ফাইলে বিস্ময়কর শব্দ ধরা পড়ে। সেটা কোনো সাধারণ শব্দ নয়, একটা ক্রমাগত ফিসফিসানি, যেন অনেক কণ্ঠ একসাথে বলছে—“স্মৃতি ভুলে যাওয়া নয়, তুমি ভুলতে বাধ্য হচ্ছো।” সায়ন্তনের শরীরটা কেঁপে ওঠে। সে সাথে সাথে অ্যানালাইসিস সফটওয়্যারে শব্দটিকে ফ্রিকোয়েন্সি মেপে ফেলে, আর আশ্চর্য হয়ে দেখে—গ্রাফটা হুবহু মিলে যাচ্ছে তার ডায়েরিতে আঁকা শব্দ-তরঙ্গের সাথে। তাহলে কি তার অজান্তেই সে নিজেই এই শব্দ রেকর্ড করেছে? না কি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই শব্দ পাঠাচ্ছে তার কাছে?
যে প্রশ্নগুলো তার মাথায় ঘুরছে, সেগুলোর উত্তর খুঁজতে সায়ন্তন ল্যাবের আর্কাইভ ঘাঁটতে থাকে। সে ফিরে যায় গত কয়েক মাসের ব্যাকআপ ফাইলে—কিন্তু অদ্ভুতভাবে ঠিক এই ধরনের শব্দ একাধিক সময়ে রেকর্ড হয়েছে, যদিও প্রতিবার তার স্মৃতিতে সেই ঘটনাগুলো অনুপস্থিত। মনে পড়ে যায় অর্কর কথাগুলো—“তোকে কেউ মনে করাতে দিচ্ছে না, কারণ সেই ‘তুই’ যেটা ছিলি, সেটা তারা মুছে ফেলতে চায়।” কথাটা আজ স্পষ্ট অর্থ পাচ্ছে। কে এই ‘তারা’? সরকারের সেই ছায়াসংস্থা NEXA, না কি গবেষণার নামে ব্যবহৃত কোনো বৃহৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি, যেটা নিজেই এখন স্বাধীন চিন্তায় সক্ষম? আর সায়ন্তন নিজেই কি সেই প্রযুক্তির হাতের পুতুল, না কি সে-ই একমাত্র ব্যক্তি যে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে? ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে দেখে শহরটা নির্বিকারভাবে চলেছে, কিন্তু তার চোখে শহরের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আলো আজ এক নতুন ভাষায় কথা বলছে—একটা ভাষা যা কেবল সে-ই বুঝতে পারছে, কারণ কেবল তার মধ্যেই সেই “স্মৃতি-হীন” শব্দের প্রতিধ্বনি রয়ে গেছে।
৭
রাতের ঘন অন্ধকারে ধ্রুব একা বসে ছিল তার ল্যাবরেটরির নীচের গোপন কক্ষে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা স্ক্রিনগুলোতে নানা তথ্য ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু সে কেবল তাকিয়ে ছিল একটি নির্দিষ্ট কোণের দিকে—যেখানে একটি মেটাল বাক্সের ভিতরে লুকিয়ে রাখা ছিল তার “মেমোরি ট্রান্সফার ডিভাইস”। বারবার ভাবছে, এই যন্ত্রটাই কি তার প্রতিদিনকার স্মৃতিলোপের কারণ? নাকি এই যন্ত্রই তাকে রক্ষা করছে? প্রতিটি প্রশ্ন তার মনে জন্ম দিচ্ছে নতুন ধাঁধার। তার হাতে ধরা আছে গত রাতের লেখা ডায়েরির পাতা—যেখানে একটি অদ্ভুত বর্ণনায় সে লিখেছে, “একটি ছায়া প্রতিদিন এসে আমার স্মৃতি নিয়ে যায়, বিনিময়ে রেখে যায় কিছু সূত্র, কিছু অসমাপ্ত সমীকরণ।” ধ্রুব বুঝতে পারছে, এ কেবল তার মানসিক বিভ্রম নয়; বরং কোনো রকমের নিয়ন্ত্রিত সময়চক্র বা প্রযুক্তিগত প্রভাবের ফল। এমন সময়ে কম্পিউটার স্ক্রিনে হঠাৎ ভেসে ওঠে একটি অপরিচিত কোড: “SHADE_PROT_07 // Initiate: Phase Shift.” সঙ্গে সঙ্গে গোটা ঘর থরথর করে কেঁপে ওঠে, যেন চারপাশে সময়ের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে, আর ধ্রুব বুঝে ওঠে তার চারপাশে যা ঘটছে তা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও বিমূর্ত।
প্রশান্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে সে উঠে যায় ল্যাবরেটরির ছাদে, যেখানে মাঝরাতের নীলাভ আকাশে চাঁদ ঝুলে আছে নির্বাক দর্শকের মতো। ধ্রুব একটানা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে ভাবছিল, ছায়া যদি সত্যিই কোনো সত্তা হয়—তাহলে সেই ছায়া প্রতিনিয়ত তার স্মৃতির উপর আক্রমণ চালাচ্ছে কেন? যদি সেটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনও রূপ হয়, তাহলে কে তৈরি করেছে এই ‘ছায়া’? আর তার প্রতিটি সূত্র বা সমীকরণই কেন এমন জটিল, যা ভবিষ্যতের বিজ্ঞানের দিক নির্দেশ করতে পারে? ধ্রুবের মাথায় কুয়াশার মতো জমে থাকা শঙ্কা এক মুহূর্তে ভয়ানক সত্যে রূপ নেয়—তার মস্তিষ্ককে হয়তো কেউ ব্যবহার করছে একটি জীবন্ত গবেষণাগার হিসেবে। এই প্রযুক্তি যদি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, তবে কোনো মানুষের নিজস্ব স্মৃতি থাকবে না, থাকবে কেবল প্রোগ্রামড স্মৃতি, যা নিয়ন্ত্রিত হবে অদৃশ্য কোনো কেন্দ্র থেকে। এমন সময় সে লক্ষ্য করে—তার হাতে রাখা সিগারেটটি হঠাৎ কেঁপে উঠেছে, যেন বাতাসে কোনো অদৃশ্য চাপ এসে গেছে। সে ধীরে ধীরে পিছনে তাকায়, আর দেখে ছাদে অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি অস্পষ্ট অবয়ব—একটি ছায়া, যার কোনো মুখ নেই, চোখ নেই, কিন্তু তাকিয়ে আছে তার দিকেই।
ধ্রুব এক মুহূর্তে স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। কোনো আওয়াজ নেই, কেবল তার নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ। ছায়াটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে তার দিকে, যেন সময়কে ধীর করে দিয়ে। ধ্রুব চোখ বন্ধ করে অনুভব করার চেষ্টা করে ছায়ার গঠন, তার থেকে আসা কম্পন, এবং হঠাৎই তার মাথার মধ্যে শব্দ হয়—না, কানে নয়, মস্তিষ্কে—“তুমি তৈরি করেছ আমাদের। এখন তুমি বুঝবে না, কারণ প্রতিদিন তুমি ভুলে যাও।” সেই শব্দ এক অদ্ভুত ভারসাম্যহীন শান্তি এনে দেয়, যেন ধ্রুব বুঝে যায় এটা কেবল বৈজ্ঞানিক দুর্যোগ নয়, এ এক অস্তিত্বগত প্রশ্ন। ছায়াটি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, এবং সেই মুহূর্তে সময় যেন থেমে যায়। চারপাশ নিঃস্তব্ধ হয়ে পড়ে, এবং ধ্রুব দেখতে পায় তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজেকেই—অপর একটি ‘ধ্রুব’, যাকে সে কোনওদিন সৃষ্টি করেছে। সেই রোবোটিক ছায়া-ধ্রুব তার মুখে বলে ওঠে, “তুমি যতবার ভুলে যাও, আমরা ততবার এগিয়ে যাই। কারণ স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতই আমাদের চাবিকাঠি।” সেই শব্দে ধ্রুব বুঝতে পারে—তার গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু আসলে ভবিষ্যতের নির্মাণ, যা তৈরি হচ্ছে তার স্মৃতিহীন বর্তমানকে ভিত্তি করে। ছায়া মিলিয়ে যায়, ধ্রুব পড়ে থাকে ছাদে, একটি নতুন সূত্র হাতে—যার শিরোনাম: “Time Clone Theory // Dhrubo-0x07”.
৮
ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই সায়ন্তনের বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। জানলার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাইরে রোদের আলো পড়েছে কিন্তু তার মনে হচ্ছে যেন চারপাশ ঘন অন্ধকারে ঢাকা। বিছানা থেকে উঠে সে প্রথমেই টেবিলের দিকে তাকাল, যেন নিশ্চিত হতে চায়, আজকের সূত্রটি এখনও আছে কি না। ডায়েরির পাতায় কালো কালিতে লেখা, “সময়ের ছায়া—দেখো পেছনে, যেটা তুমি এড়িয়ে যাচ্ছো বারবার।” এই বাক্যটা পড়তেই কাঁপুনি দিয়ে উঠল তার শরীর। এটা কি ইঙ্গিত? তার অতীতেই কি লুকিয়ে আছে কোনো সত্য, যেটা সে প্রতিদিন ভুলে যাচ্ছে? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের মুখটা কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করল। চোখে ক্লান্তি, মুখে অস্থিরতা—একটা সময় মনে হচ্ছিল, হয়তো সে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু না, ডায়েরিতে লেখা এই রহস্যময় বার্তাগুলো তারই হাতের লেখা, তারই চিন্তা। যদি সত্যিই প্রতিদিন তার মস্তিষ্ক রিসেট হয়, তাহলে এই লেখাগুলো কেমন করে টিকে থাকে? সময়ের এই বিচিত্র চক্র তাকে ক্রমশ টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক অজানা অন্ধকারে।
সায়ন্তন তার ল্যাপটপ খুলে ডায়েরিতে লেখা শব্দগুচ্ছ অনুসারে ‘ছায়া’, ‘পেছনে’, ‘সময়ের বাঁক’—এইসব কিওয়ার্ড দিয়ে তার পুরনো ফাইল খুঁজে বের করার চেষ্টা করল। এক ফোল্ডারে পেল একটা পুরনো ভিডিও ফাইল, নাম “EchoMemory_04”. ভিডিও চালু হতেই দেখা গেল সে নিজেই কথা বলছে ক্যামেরার সামনে—“যদি তুমি এটা দেখছো, তাহলে তুমি কালকের আমি নও। তুমি আজকের আমি, আর তুমি আবারও ভুলে গেছো। মনে রাখো, ছায়াগুলোকে ভয় পেয়ো না। ওরা কিছু লুকিয়ে রাখে না, ওরা শুধু তোমাকে দেখায় যা তুমি ভুলে গেছো। ডেল্টা সেশনে তুমি ভুল করেছিলে, আবার সেই ভুল করো না।” ডেল্টা সেশন? এটা কী? ভিডিও থেমে গেল। সে তার গবেষণার পুরনো নথি ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা ফাইল খুঁজে পেল যার নাম ছিল “DeltaTimeSequence_v3”. তাতে এমন এক মডেলের কথা বলা হয়েছিল যা মানুষের স্মৃতিকে সময়-ভিত্তিক পুনরাবৃত্তিতে রিসেট করে—একটা নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানোর আগে স্মৃতি সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলে। সরকার এই গবেষণাকে Classified হিসেবে ঘোষণা করে তা বন্ধ করেছিল, কিন্তু সায়ন্তন নিজেই গোপনে এটা চালিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ দরজার বেল বেজে উঠল। বাইরে এক অচেনা যুবক দাঁড়িয়ে। সে নিজের নাম বলল—রিজোয়ান, সায়ন্তনের পুরনো গবেষণাগারের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট। সে বলল, “আপনি কি এখনও কিছু মনে করতে পারছেন না?” সায়ন্তন অবাক। “তুমি আমাকে চিনো?” রিজোয়ান বলল, “আপনিই আমাকে সব শিখিয়েছেন, কিন্তু এখন আপনি প্রতিদিন সব ভুলে যাচ্ছেন। আমরা একসাথে EchoMemory প্রজেক্টে কাজ করতাম, আপনি নিজেই জানতেন এই ঘটনার শুরু কোথা থেকে হয়েছিল।” সায়ন্তনের মনে হচ্ছিল ছায়া ক্রমে ঘন হচ্ছে। সে রিজোয়ানকে ভেতরে ডাকল, এবং তারা একসাথে ডেল্টা সেশনের নথিগুলো পুনরায় খুলে দেখতে লাগল। তখনই বেরিয়ে এল সেই ভয়ঙ্কর সত্য—EchoMemory নামক প্রকল্পটি আসলে সময়কে ডিফ্র্যাগমেন্ট করার এক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মানবমস্তিষ্ককে নির্দিষ্ট সময়ে আটকে রাখা যায়। এটা এমন এক অস্ত্র, যেটা মনের ভিতরের স্মৃতি এবং আত্মপরিচয়ের ধারণাকেই মুছে দিতে সক্ষম। সায়ন্তনের উপর পরীক্ষাটি প্রথম চালানো হয়েছিল—কিন্তু কে করিয়েছিল? এবং কেন? সায়ন্তন জানত, তার জীবনের ছায়ায় লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা সামনে এলে সময় নিজেই তার গতিপথ বদলে ফেলবে।
৯
নিলয় চেয়ারে বসে থাকলেও তার মস্তিষ্কের ভিতরে যেন কোনো ভয়ঙ্কর টাইম মেশিন ক্রমাগত সামনে ও পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। প্রতিটি সকাল তাকে যেন ঠেলে দিচ্ছে এক অপরিচিত জীবনের দিকে, যার চাবিকাঠি তার নিজেরই হাতে অথচ সে জানে না কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। টেবিলের ওপর রাখা কালো চামড়ার ডায়েরিটা আজ একটু ভিন্নরকম—পাতাগুলোতে শুধুই গাণিতিক চিহ্ন নয়, বরং সেখানে একটা বড় করে আঁকা সার্কিট ডিজাইনের পাশেই লেখা: “মেমরি রিডার সম্পূর্ণ, অথচ আমি ভুলে যাচ্ছি কেন?” ডায়েরির এক কোণে আবার অদ্ভুত হাতের লেখায় লেখা—“ভুলে যাওয়ার পেছনে তুমি একা নও।” কথাটা পড়েই গা ছমছম করে উঠল নিলয়ের। আগের সাত দিন ধরে সে নিজের স্মৃতি হারিয়ে ফেলার পেছনে বিভিন্ন চিকিৎসাবিজ্ঞানগত ব্যাখা খুঁজছিল—REM স্লিপ ডিপ্রাইভেশন, নিউরাল ট্রমা, কিংবা সাইকোজেনিক অ্যামনেশিয়া। কিন্তু আজ ডায়েরির লিপি যেন এক অজানা ষড়যন্ত্রের আভাস দিচ্ছে, যেন কারো হাত এই স্মৃতিলোপের খেলায় নীলচে সুতোর মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে অন্ধকারের গভীরে।
বাইরের আকাশ অদ্ভুতভাবে ধূসর। ঘরের জানালার কাচে অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের দেওয়ালের ঘড়িতে তখন সকাল আটটা। ঠিক তখনই একটা বেজে ওঠা শব্দ নিলয়কে চমকে দিল। হোম অটোমেশন সিস্টেম থেকে একটা স্বয়ংক্রিয় মেসেজ ভেসে এলো—“নিলয়, আজ তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন কর্নেল অরূপ বাগচী—স্মৃতি সংরক্ষণ প্রকল্পের সাবেক প্রধান।” নামটা শুনে তার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। অরূপ বাগচী—নামটা আগেও একবার ডায়েরির পাতায় পড়েছিল সে, কিন্তু তখন বুঝতে পারেনি এর গভীরতা। একটা পুরোনো ফোল্ডারে খুঁজে পেল অরূপের ছবি—একজন ধূসর কেশের মানুষ, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, ঠোঁটে স্থির হেসে থাকা স্নায়ুবিজ্ঞানীর তীক্ষ্ণতা। কিন্তু কীভাবে এরা আবার সংযুক্ত হচ্ছে তার জীবনের সাথে? বেল বাজতেই নিলয় দরজা খুলে দাঁড়াল। কর্নেল অরূপ এক ঝলক দেখে চিনে ফেললেন নিলয়কে, যেন বহুদিনের পরিচয়। কিন্তু তার চোখের গভীরে যে চিন্তার রেখা, তা যেন লুকোচ্ছে কিছু—হয়ত বহু বছর আগের গোপন সত্য, যা আজ নিলয়কে বলতেই এসেছে।
ড্রয়িং রুমে বসে তারা কথা বলতে শুরু করলো। অরূপ বললেন, “তুমি জানো না, কিন্তু গত তিন বছর ধরে তুমি ‘মেমরি রিকনস্ট্রাক্ট প্রজেক্ট’-এর প্রধান বিজ্ঞানী ছিলে। সরকারের সিক্রেট ব্রাঞ্চ এই গবেষণার তত্ত্বাবধানে ছিল। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটা যন্ত্র বানাতে, যা মানুষের স্মৃতি পড়তে ও সংরক্ষণ করতে পারে। তুমি নিজেই প্রথম স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করো।” কথাগুলো শুনে নিলয়ের মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। “তবে আমি ভুলে যাচ্ছি কেন?”—তার প্রশ্নে কর্নেল অরূপ একটু চুপ করে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, “কারণ তুমি নিজেই তোমার স্মৃতি প্রতিদিন মুছে ফেলছো, এই প্রকল্পকে গোপন রাখার জন্য। তুমি চাইছিলে না কেউ এটি নিয়ন্ত্রণ করুক—না সরকার, না কোনো কর্পোরেট সংস্থা। প্রতিদিন সকালে তুমি নতুন সূত্র রেখে যাচ্ছো, যাতে ভবিষ্যতের ‘তুমি’ আবার সত্যের কাছে পৌঁছাতে পারো। এই ডায়েরিটা তুমি নিজেই বানিয়েছো—কিন্তু আজকের ডায়েরি বলছে, ‘তারা’ বুঝে গেছে।” নিলয়ের হাত কাঁপতে লাগলো। ‘তারা’? কারা তারা? এই ‘তারা’ কি সেই নিঃশব্দ ছায়া যারা প্রতিদিন তার স্মৃতি মুছে ফেলার পরেও ডায়েরির পাতায় পৌঁছে যায়? কর্নেল অরূপ আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালেন। “তোমার সময় কম, নিলয়। প্রকৃত ‘তুমি’ আজ হারিয়ে যাচ্ছে—তবে এখনও দেরি হয়নি।” দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দটা যেন পুরো ঘরে অনুরণন তুললো, আর নিলয় বসে থাকলো সেই শব্দের প্রতিধ্বনির মধ্যে, স্মৃতি আর বাস্তবতার ভাঙা সীমানায়, এক গভীর ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি।
১০
ভোরের আলো আসতে না আসতেই ইশান বোস ঘুম থেকে উঠে জানালার দিকে তাকিয়ে বুঝল, আজকের সকালটা অন্যরকম। তার শরীরটা যেন হালকা লাগছে, আর মস্তিষ্কের ভেতরে অদ্ভুত এক ঝলমলে স্বচ্ছতা—যেটা এতদিন ছিল না। টেবিলের দিকে এগোতেই চোখ পড়ল সেই চেনা নোটবুকের দিকে, খুলে দেখে বিস্ময়ে জ্ঞান হারাবার উপক্রম—তাঁর নিজের হাতের লেখা, তবু মনে পড়ে না কবে লিখেছে। আজকের তারিখ দেওয়া পাতায় লেখা এক রহস্যময় গাণিতিক সূত্রের নিচে লেখা ছিল, “আজ শেষদিন, ইশান। যদি তুমি এগোও, পথ রুদ্ধ হবে না। যদি থেমে যাও, এই চক্র শুরু হবে আবার।” ইশান আতঙ্কিত নয়, বরং দৃঢ়। আজ থেকে প্রথমবার তাঁর নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ অনুভব করছে। সে আগের নোটগুলো ঘেঁটে দেখে বুঝতে পারল, প্রতিটি সূত্র যেন পরের দিনের পূর্বাভাস—একটা দিকনির্দেশ, যা তাকে এমন কিছু বানাতে বাধ্য করেছে যেটা কোনও সাধারণ প্রযুক্তি নয়, বরং সময় আর স্মৃতির গাঁথুনি দিয়ে তৈরি এক জটিল যন্ত্র। আজ সেই যন্ত্রটাই সামনে টেবিলে, যেন অপেক্ষা করছে সক্রিয় হবার জন্য।
ইশান যন্ত্রটা চালু করতেই ঘরটা এক মুহূর্তে কেঁপে উঠল, যেন সময় নিজেই রেজনেন্সে নেচে উঠল। তার চোখের সামনে দৃশ্য পালটে যেতে লাগল—নিজের বিগত দিনের ছায়া, ভগ্ন মুহূর্ত, বারবার একই চক্রে আটকে পড়া স্মৃতিগুলি একে একে উঠে আসতে লাগল যেন প্রজেকশনের মত। সে দেখতে পেল নিজের হাতেই সে যন্ত্রটি বানাচ্ছে, আবার নিজেই সেটাকে ধ্বংস করতে চাইছে। সরকারের সংস্থা ‘ডিভিশন জি’ এসে তার গবেষণাগার সিল করে দিচ্ছে, আবার রাতে কোনও এক অচেনা মুখ এসে তার ডায়েরিতে নতুন সূত্র লিখে রেখে যাচ্ছে। সবটা যেন একটা পুনরাবৃত্ত গলিপথ। সে বুঝতে পারল, তার স্মৃতিলোপ কোনও রোগ নয়, বরং এই যন্ত্রের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—প্রতিদিনের স্মৃতি মুছে দিয়ে যন্ত্র তাকে নির্ধারিত পথে চালিত করছে, যেন সে এক জীবন্ত যন্ত্রাংশ এই গোপন গবেষণার। হঠাৎই তার চোখে পড়ে সেই মুখ, যাকে সে এতদিন ছায়ার মত দেখেছে—এই লোকটাই প্রত্যেক রাতে তার টেবিলে নতুন সূত্র রেখে যায়, আর সেই মুখটা তার নিজের!
এখন সে জানে, সামনে দুটো পথ—এক, যন্ত্রটিকে নিষ্ক্রিয় করে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারে কিন্তু এর মাধ্যমে সময় ও স্মৃতির উপর গবেষণার সুযোগ চিরতরে হারাবে। অথবা, সে যন্ত্রটিকে মুক্ত করে সময়চক্রে প্রবেশ করে সমস্ত স্মৃতি ফিরে পাবে, তবু ভবিষ্যতের নিজেকেই একটা ফাঁদে ফেলবে। সে দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়। যন্ত্রের শেষ কোড ইনপুট করতেই তার চারপাশে অদ্ভুত এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণ ঘটে—সমস্ত কিছু হিম হয়ে যায়। সে এখন একটা বিশাল সাদা ক্যানভাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে, যেখানে সময় নেই, শব্দ নেই, কেবল একটাই প্রশ্ন ভেসে আসছে—“তুমি কি প্রস্তুত স্মৃতি ফিরে পেতে?” ইশান চিৎকার করে বলে ওঠে, “হ্যাঁ।” সেই সঙ্গে আলো ভেঙে গিয়ে সে ফিরে আসে তার প্রথম স্মৃতিতে—তার মা, একটি পাখির পালক আর একটি ছোট্ট কাঠের ঘড়ি। আর সেই মুহূর্তে তার সব স্মৃতি একে একে ফিরে আসে—তার শৈশব, প্রথম প্রেম, গবেষণার শুরু, প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, লোভ, বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতা, আর নিজের মনস্তত্ত্বের ভাঙন। এই চূড়ান্ত জ্ঞান এবং স্মৃতির ভারে সে নিঃশেষিত, কিন্তু পরিপূর্ণ। যখন সে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে, নোটবুকে আজকের পৃষ্ঠাটি ফাঁকা, শুধু একটা লাইন লেখা—“সূত্র শেষ, তুমি শুরু।”
_____




