অংশুমান সেনগুপ্ত
কোলাহলমুখর শহরের ভেতরেও কিছু জায়গা থাকে যেখানে সময় যেন থেমে যায়, আর মানুষ খুঁজে পায় একটুখানি নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। শহরের পুরোনো এক গলির ভেতর লুকিয়ে আছে ছোট্ট একটি ক্যাফে—“স্মৃতির ক্যাফে।” বাইরে থেকে খুব বেশি চমকপ্রদ নয়, কাঠের দরজার উপরে ঝুলছে ম্লান হয়ে যাওয়া নামফলক, জানালার কাচে প্রতিদিনের ধুলো জমে থাকে। কিন্তু দরজার ভেতরে ঢুকলেই অন্য এক জগৎ—হালকা বাদামি আলোয় সাজানো কাঠের টেবিল, দেয়ালে কিছু সাদা-কালো পুরোনো ছবি, আর কোণের শেলফে ছড়িয়ে থাকা বইপত্র। এখানে প্রবেশ করা মানেই শহরের কোলাহল ফেলে আসা, যেন অন্য এক জগতে ঢুকে পড়া। সেই সন্ধ্যাতেই অর্ণব প্রথমবার এই ক্যাফের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। বাইরে তখন বৃষ্টি শেষে ভিজে উঠেছিল রাস্তা, বাতাসে ছিল মাটির সোঁদা গন্ধ। তার চোখে ক্লান্তি আর মুখে বিষণ্ণতা স্পষ্ট ছিল, যেন সারা পৃথিবীর ভার কাঁধে নিয়ে এসেছে। সে চারপাশে তাকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল জানালার ধারে একটি টেবিলে। কোণের সেই টেবিল থেকে বাইরের রাস্তার দৃশ্যও দেখা যায়—বৃষ্টিভেজা কাচের ওপারে আলো-আঁধারি শহর। অর্ণব সেখানেই বসে পড়ল, নিঃশব্দে।
ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, কী নেবেন?” অর্ণব হালকা গলায় বলল, “এক কাপ ব্ল্যাক কফি।” তার গলায় কোনো উচ্ছ্বাস নেই, বরং এক ধরনের ভাঙাচোরা সুর। কফির অর্ডার দেওয়ার পর সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। বাইরের ভিজে আলোয় সে যেন দেখতে পাচ্ছিল নিজের অতীতের ভাঙা টুকরো—স্ত্রীর সাথে কাটানো দিনগুলো, তার আকস্মিক মৃত্যু, আর শূন্য হয়ে যাওয়া ঘরের নিস্তব্ধতা। সাংবাদিকতার ব্যস্ত আর উত্তেজনাপূর্ণ জীবনের পরে এখন তার দিন কেটে যায় ফাঁকা ঘরে বসে লেখার চেষ্টা করতে করতে। কিন্তু শব্দ আর আসতে চায় না, কলম শুকিয়ে যায় মাঝপথে। কফির কাপ টেবিলে এল যখন, তার ভেতর থেকে উড়তে থাকা ধোঁয়ার রেখাগুলো তাকে যেন ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেইসব রাতগুলোয়, যখন স্ত্রী পাশে বসে গল্প করত, আর সে কাজের ফাঁকে কফি চুমুক দিত। ধোঁয়ার প্রতিটি বাঁকে সে যেন দেখছিল হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির ছায়া। তার চোখ অন্যমনস্ক, মুখ নিস্তব্ধ, কিন্তু ভেতরে এক ভয়াবহ ঝড় বইছে—কেন এখনো বেঁচে আছে, কেন প্রতিটি সকাল এত ভারী লাগে।
ক্যাফেটি তখন প্রায় ফাঁকা ছিল। কয়েকজন ছাত্রছাত্রী বই নিয়ে বসে আছে এক কোণে, আরেকটি টেবিলে দু’জন বৃদ্ধ দাবা খেলছে চুপচাপ। কিন্তু এই ভিড়ের ভেতরেও অর্ণবের একাকিত্ব আলাদা করে চোখে পড়ে। যেন সে আলাদা এক বৃত্তের ভেতর বসে আছে—যেখানে প্রবেশ করার অধিকার কারও নেই। কফির চুমুক দিতে দিতে সে ভাবছিল—এই ক্যাফে হয়তো তার জন্য আশ্রয় হতে পারে, শহরের ভিড়ে এক ছোট্ট নির্জন দ্বীপ। কফির কাপে ধোঁয়ার ভাঁজে ভাঁজে সে চেষ্টা করছিল নিজের ভেতরের দুঃখ ডুবিয়ে দিতে। কিন্তু দুঃখ কি কখনও ডুবে যায়? তা হয়তো শুধু ভেসে বেড়ায়, আর মাঝে মাঝে মাথা তুলে উঠে আসে। অর্ণব জানে, তার জীবনের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। তবু এই ছোট্ট ক্যাফেতে বসে এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাকে ঘিরে ফেলেছিল। নিস্তব্ধতা, বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ, কফির গন্ধ আর জানালার বাইরের আলো—সব মিলিয়ে এক অচেনা প্রশান্তির আবহ। সেই মুহূর্তে পাঠক তার ভাঙা জীবনের আভাস পান—একজন মানুষ, যিনি দুঃখ থেকে পালাতে পারেন না, তবুও শান্তির খোঁজে এই ক্যাফের দরজা ঠেলে ঢুকেছেন।
–
সেই একই সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর ক্যাফের কাঠের দরজা আবার হালকা শব্দে খুলল। ভেতরে ঢুকল এক তরুণী—মীরা। গায়ের ওপর ঝোলানো হালকা শালের কোণা বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে গেছে, চুলের প্রান্তেও লেগে আছে ভেজা আভা। বাইরে থেকে আসা ম্লান আলো তার মুখমণ্ডলকে যেন আরও কোমল করে তুলল। ক্যাফের ভেতরের উষ্ণ আলোর আবরণে প্রবেশ করেও তার চোখে ছিল এক অদৃশ্য ব্যথার ছায়া। সে চারপাশে একবার তাকাল, যেন জায়গাটা ভালোভাবে বুঝে নিতে চাইছে। ভিড় তেমন নেই, তাই দ্বিধা না করে জানালার পাশের আরেকটি টেবিলে বসে পড়ল। মীরার মুখে ছিল এক নীরব হাসি—যেন সে ভেতরে যতোই ভাঙাচোরা হোক, বাইরে থেকে কাউকে সেই যন্ত্রণা দেখাতে রাজি নয়। ওয়েটার এসে তাকে জিজ্ঞেস করল কী নেবে, সে সহজ ভঙ্গিতে বলল, “এক কাপ ক্যাপুচিনো।” কফির অর্ডার দিয়ে মীরা নিজের ছোট্ট ব্যাগ থেকে একটি খাতা বের করল। খাতার ভেতরে পুরোনো কিছু গানের কথা, সুরের খসড়া, আর অসমাপ্ত নোট লেখা ছিল। একসময় সে গাইত মঞ্চে, আলো-আঁধারির ভিড়ে মানুষ তাকে হাততালি দিত, কিন্তু আজ সে সেই সব স্মৃতির আড়াল থেকে বেরোতে পারে না। প্রতারণার আঘাতে সে তার গানের জগত থেকে সরে গেছে, আর এখন কেবল এই ছোট্ট খাতার পাতায় কিছু কিছু সুর লিখে মন ভোলায়।
অর্ণব তখনও তার কোণের টেবিলে বসে বাইরের ভিজে কাচের ওপারে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই মীরাকে লক্ষ্য করল। তার চোখে ধরা পড়ল মেয়েটির ভঙ্গিমা—যেভাবে সে খাতা খুলে মাথা নিচু করে লিখছে, যেভাবে সে খোলা চুল কানের পেছনে সরাচ্ছে। অর্ণবের কাছে এই দৃশ্য অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হল, যেন তার নিজের ভাঙা স্মৃতির কোনো অংশ এই মেয়েটির ভেতরে খুঁজে পেল। সে লক্ষ্য করল মীরার হাসি—সেটা নিছক আনন্দের নয়, বরং এক ধরনের আবরণ, যার ভেতরে দুঃখ লুকিয়ে আছে। অর্ণব জানে, এমন হাসি মানুষ দেখায় কেবল তখনই, যখন ভেতরে গভীর অশান্তি থাকে। তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল—শুধু কয়েক সেকেন্ড, তারপরই দুজনেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। অর্ণব কফির কাপের দিকে তাকাল, মীরা খাতার পাতায় চোখ নামিয়ে রাখল। কিন্তু সেই ক্ষণিক দৃষ্টি বিনিময় তাদের ভেতরে এক অদ্ভুত আলোড়ন জাগিয়ে দিল। তারা কিছু বলেনি, কোনো কথা হয়নি, কিন্তু নীরবতার ভেতরেই যেন একটি সূক্ষ্ম সম্পর্কের সূচনা হয়ে গেল।
মীরা তার কফির চুমুক দিচ্ছিল ধীরে ধীরে, জানালার কাচে জমা বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে দেখছিল। অর্ণবও একইভাবে কফির কাপ হাতে নীরবে বসে ছিল। দুজনেই অচেনা, কিন্তু তাদের ভেতরের দুঃখ, একাকিত্ব আর অতীতের ভার যেন অদৃশ্য এক সেতু তৈরি করে ফেলেছিল। হয়তো দুজনেই একে অপরের কথা জানে না, নামও জানে না, তবু অচেনা দৃষ্টির ভেতরে তারা নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। ক্যাফের উষ্ণ আলো, বাইরের অন্ধকার, আর ভেতরের নীরবতা এই মুহূর্তটিকে আরও গভীর করে তুলল। সেদিন তাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি, কোনো পরিচয় হয়নি, কিন্তু তাদের প্রথম দেখা—অচেনা অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত—ভবিষ্যতের গল্পের ইঙ্গিত দিয়ে গেল। পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই অচেনা মুখই একদিন অর্ণবের জীবনের গভীর অন্ধকারে আলো হয়ে প্রবেশ করবে, আর মীরার ভাঙা স্বপ্নের ভেতরে নতুন করে জাগাবে আশার গান।
–
সেদিন বিকেলের হালকা বৃষ্টির পর “স্মৃতির ক্যাফে”-তে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এসেছিল। বাইরের রাস্তার ভেজা পিচঢালা পথে কেবল ক’জন মানুষ হাঁটছিল, আর ভেতরে ঝুলন্ত হলুদ আলোয় যেন সময় ধীর গতিতে বয়ে যাচ্ছিল। অর্ণব নিজের কোণের টেবিলে বসে কফির কাপ হাতে, আর মীরা জানালার ধারে খাতা খুলে অজানা সুরের খসড়া আঁকছিল। তারা দুজনেই ভেতরে ভেতরে বুঝছিল—অন্যজনের উপস্থিতি অচেনা হলেও এক ধরণের টান তৈরি করছে। কিন্তু কোনো কথাই হচ্ছিল না। ঠিক তখনই প্রবেশ করলেন নীরজ কাকা, ক্যাফের মালিক। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সের মানুষটি সবসময় গ্রাহকদের সাথে পিতৃসুলভ আচরণ করতেন। মিষ্টি হাসি, উষ্ণ ব্যবহারে তিনি যেন ক্যাফেটিকে একটি পরিবারে পরিণত করেছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, অর্ণব আর মীরা প্রায় প্রতিদিন একই সময়ে আসে, কিন্তু দুজনের মধ্যে কোনো আলাপ হয় না। তাই সেদিন তিনি একটু ঠাট্টা করার মনস্থির করলেন।
তিনি হেসে টেবিলের কাছে গিয়ে বললেন, “আরে, আজ তো কফির ঘ্রাণে আসনগুলোই মিষ্টি হয়ে গেছে! আপনি কফি নিলেন ব্ল্যাক, আর আপনি ক্যাপুচিনো—দুজনের পছন্দই আলাদা কিন্তু টেবিল এক কেন হবে না? আমি যদি আপনাদের একসাথে বসাই, আপত্তি আছে?” কথার ভঙ্গিতে এমন আন্তরিকতা আর মজা ছিল যে, দুজনেই অবাক হয়ে হেসে ফেলল। মীরা একটু লাজুক ভঙ্গিতে বলল, “আপত্তি কেন হবে, কাকা?” আর অর্ণব মাথা নেড়ে বলল, “যদি উনিও চান, তবে বসা যেতেই পারে।” নীরজ কাকা হাসিমুখে টেবিল সরিয়ে দুজনকে পাশাপাশি বসার ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রথমবার তারা সত্যিকারের চোখাচোখি করল, আর সেই মুহূর্তে নীরবতার দেয়াল ভাঙল। অর্ণব গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “আমি অর্ণব সেন… ফ্রিল্যান্স লেখালিখি করি।” মীরা হালকা হাসি দিয়ে উত্তর দিল, “আমি মীরা দত্ত… আগে গান গাইতাম, এখন পড়াই।” প্রথম পরিচয়ের এই মুহূর্তটি যেন কফির উষ্ণ ধোঁয়ার মতো নরম ও সহজ হয়ে এল। তারা দুজনেই বুঝল, জীবনে যতই দুঃখ থাকুক, একটুখানি পরিচয়ও মানুষকে হালকা করে দেয়।
আলাপ জমে উঠতে বেশি সময় লাগল না। নীরজ কাকার তৈরি করা পরিবেশে তারা কফি-চায়ের প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ল। মীরা ঠাট্টা করে বলল, “আপনি ব্ল্যাক কফি খান? এত তিতা জিনিস খেয়ে কীভাবে লেখার মেজাজ আসে?” অর্ণব হেসে বলল, “তিতা ছাড়া লেখার শব্দ বেরোয় না। কফির তিতা আসলে জীবনের প্রতিচ্ছবি।” মীরা একটু ভেবে বলল, “তাহলে বুঝি আমি জীবনকে মিষ্টি করে দেখতে চাই, তাই ক্যাপুচিনো।” তাদের হাসির ফোয়ারায় চারপাশ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দুজনেই বুঝল—ছোট্ট একটি আলাপ কত সহজে দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। অর্ণব মীরার খাতার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি লিখছিলেন কিছু? গান?” মীরা খানিক দ্বিধা নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, লিখি মাঝে মাঝে… যদিও এখন আর মঞ্চে গাই না।” অর্ণবের চোখে একধরনের কোমলতা ভেসে উঠল, যেন সে বুঝতে পারছে মেয়েটির কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্ট। কিন্তু সে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। তাদের প্রথম আলাপ এভাবেই শেষ হল—কফির গন্ধ, মৃদু হাসি আর ভেতরে অদৃশ্য এক বন্ধনের সূচনায়। সেই মুহূর্তে মনে হল, হয়তো এই ছোট্ট আলাপনই একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে উঠবে।
–
দিনগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল, আর “স্মৃতির ক্যাফে”-র কাঠের দরজা নিয়মিত সাক্ষী হয়ে উঠল অর্ণব ও মীরার নীরব আসার। প্রথম দিনের অচেনা দ্বিধা অনেকটাই কেটে গিয়েছিল, তবে সম্পর্ক এখনও কোনো তাড়াহুড়োর পথে হাঁটেনি। তারা প্রতিদিন আলাদা সময় আসার চেষ্টা করলেও, আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় একই সময়ে পৌঁছে যেত। মাঝে মাঝে অর্ণব আগে আসত, জানালার ধারে বসে লিখতে শুরু করত, আর মীরা হঠাৎ ঢুকে পড়লে তার খাতার ওপর ভাঁজ করা শব্দ থেমে যেত। কখনো মীরা আগে আসত, কফির চুমুক দিতে দিতে হালকা সুর গুনগুন করত, আর অর্ণব দরজা ঠেলে ঢুকলে তার চোখ অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেখানে আটকে যেত। ধীরে ধীরে দুজনের টেবিল আলাদা থাকলেও একসময় কাছাকাছি হয়ে এল। কখনো পাশাপাশি বসত, কখনো কেবল দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। আশ্চর্যভাবে, এই নীরব সান্নিধ্যই যেন তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে উঠল। তারা বুঝতে পারছিল, কথার প্রয়োজন নেই; একে অপরের উপস্থিতিই যথেষ্ট।
এই নীরবতায় ছিল অদ্ভুত প্রশান্তি। অর্ণব তার ফাঁকা খাতায় নতুন শব্দ লিখতে শুরু করল—যে শব্দ আগে আসত না। হয়তো মীরার চোখের কোমলতা, হয়তো তার উপস্থিতির উষ্ণতা, কলমকে আবার সচল করল। সে লিখছিল না কেবল খবর বা বেদনার গল্প, বরং লিখছিল অনুভূতি—এক ধরনের জীবনের ছন্দ, যা অনেকদিন হারিয়ে ফেলেছিল। মীরার ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন হচ্ছিল। সে তার খাতা থেকে পুরোনো গান মুছে নতুন কিছু সুরের খসড়া লিখতে শুরু করল। মাঝে মাঝে সে চুপচাপ অর্ণবের লেখা দেখতে চাইত, আবার অর্ণবও নিঃশব্দে শুনত মীরার গুনগুন। তারা কোনো কথা বলত না, কিন্তু এই বিনিময় ছিল ভাষার চেয়ে গভীর। দুজনেই অনুভব করছিল—ভেতরের দুঃখ ভাগাভাগি করা যায় না সবসময় শব্দে, কখনো কখনো কেবল নীরবতা দিয়েই তা সম্ভব হয়। ক্যাফের উষ্ণ আলো, কফির ধোঁয়া আর জানালার বাইরে বৃষ্টির ছন্দ মিলেমিশে যেন তাদের নীরবতার সুর তৈরি করছিল।
সময় যত এগোতে লাগল, এই অভ্যাস আরেকটি পরিচয়ে রূপ নিল। নীরজ কাকা মাঝেমাঝে ঠাট্টা করতেন—“তোমরা তো দেখছি কফির থেকেও চুপচাপ বসে থাকতে ভালোবাসো!” অর্ণব ও মীরা কেবল মুচকি হাসত, কারণ তারা জানত এই নীরবতায়ই তারা একে অপরকে সবচেয়ে কাছাকাছি পায়। কখনো অর্ণব তাকিয়ে দেখত, মীরার চোখে হঠাৎ যেন এক টুকরো ঝড় খেলে গেল, আবার মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। কখনো মীরা দেখত, অর্ণবের ঠোঁটে অর্ধেক শব্দ এসে থেমে গেছে, হয়তো ভেতরে ভাঙা স্মৃতির ভারে সে আটকে যায়। কিন্তু এসব মুহূর্তে তাদের দুজনের দৃষ্টি মিলত, আর সেই মিলনই তাদের ভেতরে এক গভীর বোঝাপড়ার জন্ম দিত। তারা বুঝতে শুরু করল, একসাথে থাকা মানেই শুধু কথা নয়—বরং একসাথে নীরবতা ভাগ করে নেওয়া। আর এই নীরবতাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠছিল তাদের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা, সবচেয়ে বড় সেতুবন্ধন।
–
অর্ণব ও মীরা সেই দিনের মতোই ক্যাফের পরিচিত কোণায় বসেছিল। বাইরের আকাশে মেঘ জমে উঠেছিল, মাঝে মাঝে রাস্তায় গাড়ির হর্ণ ভেসে আসছিল। ক্যাফের ভেতরে নীরব সুর বাজছিল, যেন সময়ের সব ক্ষতকে শান্ত করার জন্য। কয়েকদিন ধরে নিয়মিত দেখা করার পর এদিন প্রথমবার তারা একে অপরের চোখে গভীর কিছু খুঁজছিল। অর্ণবের দৃষ্টি জানালার বাইরে হলেও, ভেতরের অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল তার আঙুলের কাপে হালকা কাঁপনে। মীরা বুঝতে পারছিল, আজ সে শুধু চুপ করে থাকতে পারবে না—একটা সময় এসেছে যখন অর্ণবকে নিজের ভিতরের অন্ধকারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। কিন্তু অর্ণব আগে মুখ খুলল। গলা খানিকটা ভারী করে সে বলল, “তুমি কি কখনো কাউকে হারিয়েছ, যাকে ছাড়া মনে হয় পৃথিবী থেমে গেছে?” মীরা চমকে তাকাল, তার চোখে অর্ণবের নীরব কষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠল।
অর্ণব ধীরে ধীরে তার গল্প বলতে শুরু করল। কয়েক বছর আগের এক দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী মারা যায়। সেই দিনটির কথা সে আজও ভোলেনি। হাসপাতালে সাদা চাদরে ঢাকা তার স্ত্রীর নিথর দেহ—সেই দৃশ্য যেন প্রতিদিন তার চোখে ফিরে আসে। অর্ণব বলল, “আমার জীবনের প্রতিটি সকালেই মনে হয় আমি অর্ধেক মানুষ হয়ে বেঁচে আছি। সংসারের হাসি-খুশি, ছোটখাটো তর্ক-বিতর্ক—সব কিছু যেন শূন্য হয়ে গেছে। এমনকি ঘড়ির কাঁটা পর্যন্ত আমার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সময়ের মতো মনে হয়।” তার কথায় এমন এক নিঃশব্দ বেদনা ছিল, যা শব্দের চেয়েও ভারী। মীরা শুনছিল, কিন্তু তার চোখে জল টলমল করছিল। যেন অর্ণবের ব্যথা তার নিজের ভেতরেও প্রতিধ্বনি তুলেছিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মীরা বলল, “তুমি যেটা হারিয়েছ, সেটা ভাগ্য কেড়ে নিয়েছে। আমার ক্ষেত্রে, আমায় ঠকিয়েছে যাকে আমি ভেবেছিলাম আমার মানুষ।”
মীরা তার কণ্ঠে হালকা কষ্টের সুর নিয়ে নিজের অতীত উন্মোচন করল। কয়েক বছর আগে সে এমন একজনকে ভালোবেসেছিল, যাকে বিশ্বাস করেছিল নিজের পৃথিবী হিসেবে। কিন্তু সেই মানুষটাই তার বিশ্বাস ভেঙে দিল—প্রেমের নামে প্রতারণা করে। মীরা বলল, “আমার মনে হয়েছিল, আমি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু হঠাৎ করেই সব ভেঙে গেল। আমি শুধু একজন মানুষকে নয়, নিজের আত্মবিশ্বাসকেও হারিয়ে ফেললাম।” তার চোখে তখনো সেই ভাঙনের ব্যথা ছিল। দুজনেই নীরবে বসে রইল কিছুক্ষণ, যেন শব্দ তাদের অনুভূতির বোঝা সামলাতে পারছে না। বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, কাঁচের জানালায় জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল। সেই মুহূর্তে তারা দুজনেই বুঝতে পারল—অর্ণবের ক্ষতি আর মীরার প্রতারণা ভিন্ন হলেও, ব্যথার রঙ এক। ভাঙা অতীতের ছায়া তাদের একসাথে বসতে বাধ্য করেছে, আর হয়তো এই ছায়াই ধীরে ধীরে তাদের নতুন আলো খুঁজে নিতে সাহায্য করবে।
–
ক্যাফের সেই সন্ধ্যাটা ছিল একেবারে অন্যরকম। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল, জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ পড়ছিল, আর ভেতরে ক্যাফেটা ভরে উঠেছিল কফির সুবাস আর অদ্ভুত এক শান্ত পরিবেশে। নীরজ কাকা হঠাৎ করে হেসে উঠে বললেন, “আজ একটু জমজমাট হোক, আমি পিয়ানো বাজাবো। তবে গান তো চাই।” তাঁর চোখ ঘুরে গিয়ে থামল মীরার মুখে। মুহূর্তেই মীরা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। সে চুপচাপ হাসল, কিন্তু চোখে দ্বিধা লুকানো যাচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল, গান গাওয়া মানেই যেন নিজের হৃদয়ের পুরোনো ক্ষত আবার প্রকাশ করা। কিন্তু সেই মুহূর্তে অর্ণব এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলল, “তুমি গাও, মীরা। হয়তো এ গান তোমার ভেতরের ব্যথাকে নতুন অর্থ দেবে।” তার কণ্ঠে ছিল এমন এক আন্তরিকতা, যা মীরার ভেতরের দ্বিধা ধীরে ধীরে ভেঙে দিতে শুরু করল।
মীরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। নীরজ কাকার আঙুলে পিয়ানো বাজতে শুরু করল, হালকা এক সুরে। সেই সুর যেন ক্যাফের প্রতিটি দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ছিল। মীরা চোখ বন্ধ করে গাইতে শুরু করল একটি পুরোনো বাংলা গান—যেটি সে একসময় খুশির দিনে গাইত, আর এখন সেই গানই তার কাছে হয়ে উঠেছিল স্মৃতির অচেনা দরজা। তার কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা ব্যথা, আর সুরের সাথে মিশে যাচ্ছিল তার অদৃশ্য কান্না। ক্যাফের প্রতিটি মানুষ যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, আর অর্ণব তাকিয়ে ছিল শুধু তার দিকে। সেই গানের প্রতিটি শব্দ অর্ণবের বুকের গভীরে গিয়ে আঘাত করছিল, যেন তার নিজের হারিয়ে যাওয়া অতীতও গান হয়ে ফিরে আসছে। কিন্তু সেই আঘাতের ভেতরে এক নতুন উষ্ণতা ছিল, যা তাকে টেনে নিচ্ছিল জীবনের ভিন্ন আলোয়।
গান শেষ হতেই পুরো ক্যাফে হাততালি দিয়ে উঠল। কিন্তু মীরার চোখে জল চিকচিক করছিল, আর অর্ণব ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গিয়ে তার পাশে দাঁড়াল। সে কোনো কথা বলল না, শুধু তাকিয়ে থাকল মীরার দিকে। মীরা মাথা নিচু করে বসে পড়ল, কিন্তু তার ঠোঁটে লুকিয়ে থাকা হালকা হাসি অর্ণব বুঝতে পেরেছিল। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, হয়তো এই গানটাই শুধু নয়—বরং এই অচেনা মেয়েটাই তাকে আবার নতুনভাবে বাঁচতে শেখাবে। অর্ণব অনুভব করল, দীর্ঘদিন অন্ধকারে ঘেরা তার হৃদয়ে হঠাৎ করে একটা আলো ঢুকে গেছে, আর সেই আলোর নাম মীরা। নীরব ক্যাফের কোণায়, কফির ধোঁয়া আর বৃষ্টির শব্দে মিশে, তাদের দুজনের গল্প যেন নতুন পথে পা রাখতে শুরু করল।
–
ক্যাফের সেই নিরিবিলি কোণায় বসতে বসতে এখন অর্ণব ও মীরার জীবনের ছন্দ যেন একসাথে মিলতে শুরু করেছে। প্রথমদিকে কথার সংখ্যা ছিল সীমিত, কিন্তু এখন অর্ণবের খসড়া থেকে পড়া কয়েকটা লাইন কিংবা মীরার ঠোঁটে নতুন কোনো সুর গুনগুন করে ওঠার মধ্য দিয়ে তাদের নীরবতা শব্দে ভরে ওঠে। অর্ণব প্রায়ই তার অসম্পূর্ণ গল্পের টুকরো মীরাকে শোনাতে থাকে—কখনো প্রেমের কাহিনী, কখনো একাকীত্বের বর্ণনা, কখনো আবার স্মৃতির গভীরে চাপা ব্যথা। মীরা মন দিয়ে শোনে, তার চোখে মাঝে মাঝে সেই অদৃশ্য আঘাতের ছায়া ধরা পড়ে, যা অর্ণবকে আরও কাছে টেনে আনে। মীরাও অর্ণবকে শেখায় নতুন গান, গানের সুরে এমন এক নিরাময়ের ছোঁয়া থাকে যেন সেই সুর অর্ণবের বুকের ভেতর জমে থাকা অন্ধকারকে আলতো করে ভেঙে দেয়। এভাবে প্রতিদিন তাদের আলাপ, গল্প, গান—সবকিছু মিলে নিঃশব্দে দুজনের ভেতরেই এক অচেনা অনুভূতির জন্ম দেয়, যাকে তারা হয়তো নাম দিতে সাহস পায় না, কিন্তু তা সত্ত্বেও অনুভব করতে বাধ্য হয়।
দিন গড়ানোর সাথে সাথে তাদের এই সম্পর্কের গভীরতা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্ণব বুঝতে শুরু করে, মীরার হাসির আড়ালে যে ক্ষতচিহ্ন লুকানো আছে, সেই ক্ষত মুছে ফেলার জন্য তার নিজের ভেতর থেকেও এক অদ্ভুত টান কাজ করছে। আর মীরা আবিষ্কার করে, অর্ণবের কণ্ঠে গল্প পড়ার ভঙ্গি যেন তার নিজের জীবনের ভাঙা সুরকে নতুন অর্থ দেয়। তারা একে অপরের ভেতরকার যন্ত্রণাকে নতুনভাবে চিনতে শুরু করে—কথায়, দৃষ্টিতে, কিংবা নিছক নীরবতায়। এক বিকেলে যখন ক্যাফের বাইরে বৃষ্টি নামছিল, অর্ণব মীরাকে একটি গল্প শোনাচ্ছিল যেখানে নায়ক শোকের অন্ধকার পেরিয়ে আলো খুঁজে পায়। গল্প শুনতে শুনতে মীরার চোখ ভিজে ওঠে। অর্ণব তখন প্রথমবার অনুভব করে—তার গল্প আর শুধু নিজের জন্য লেখা নয়, বরং মীরার জন্যও হয়ে উঠছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মীরাও ভেতরে ভেতরে টের পায়, অর্ণব তার জীবনে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ফিরিয়ে আনছে, যেটা অনেকদিন ধরেই হারিয়ে গিয়েছিল।
এই অচেনা টান দুজনকে প্রতিদিন আরও কাছে টেনে আনে। ক্যাফের চার দেওয়ালের বাইরেও তারা একে অপরকে খুঁজে পেতে শুরু করে—হয়তো ফোনে রাত অবধি কথা, হয়তো নতুন কোনো গানের রেকর্ডিং শোনা, কিংবা অর্ণবের লেখা লাইন নিয়ে আলোচনা। তাদের ব্যথা আর একাকীত্ব ধীরে ধীরে ভাগ হয়ে যায়, আর সেই ভাগাভাগির ভেতরেই জন্ম নেয় এক অদৃশ্য বিশ্বাস। তারা দুজনেই জানে, এখনও অনেক দাগ বাকি আছে, অনেক অন্ধকার রয়ে গেছে, তবু একে অপরের উপস্থিতি সেই দাগকে নরম করে দেয়। অর্ণব অনুভব করে, মীরা তার লেখার খাতার ভেতর নতুন আলো জ্বেলে দিচ্ছে; আর মীরা বুঝতে পারে, অর্ণবের গল্পগুলো তার সুরকে নতুন ডানা দিচ্ছে। নীরবতা, গান, গল্প—সব মিলে তারা যেন একে অপরের ভেতরের অন্ধকার মুছে নতুন রঙে আঁকতে শুরু করে। সম্পর্কের এই পরিবর্তন, এই অচেনা টান, তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়—যা তারা আগেভাগে অনুমানও করতে পারেনি।
–
ক্যাফের পরিচিত কোণে বসেও অর্ণব আর মীরা আগের মতো স্বাভাবিক ছিলেন না। নীরজ কাকার হাসি, গানের সুর, কিংবা কফির গন্ধ—সবই যেন এক অদ্ভুত অচেনা শূন্যতায় ঢাকা পড়েছিল। অর্ণব নিজের ভিতরে একটি চাপা ভয় টের পেত, যা প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল। তার মনে হত, যদি আবার কাউকে জীবনের অংশ করে নেয়, তবে সেই মানুষটিকে হারানোর সম্ভাবনাও বাড়ে। স্ত্রীকে হারানোর যন্ত্রণা এখনও তাকে শেকলবন্দি করে রেখেছে, আর সেই যন্ত্রণা যেন নতুন করে বাঁচতে বাধা দিচ্ছে। মীরার চোখে তিনি অনুভব করেন অদ্ভুত উষ্ণতা, কিন্তু সেই উষ্ণতাই তাকে আতঙ্কিত করে তোলে। তিনি নিজের মনে নিজেকে বোঝান—এটা কেবল বন্ধুত্ব, এর বেশি কিছু নয়। তবু, যখন মীরার চোখে চোখ রাখেন, তিনি জানেন নিজের বলা কথাটা কতটা ভঙ্গুর।
মীরার দিক থেকেও অবস্থা সহজ ছিল না। তার হাসি আগের মতো দীপ্তি ছড়াত না, কথাবার্তায়ও দ্বিধার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। প্রতারণার তিক্ত স্মৃতি তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিত—বিশ্বাস করা মানে আবার আঘাত পাওয়া। অর্ণবের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো তাকে ভরসা দিলেও হৃদয়ের ভেতর তৈরি হওয়া দেয়াল অটুট রয়ে গেছে। অনেক সময় সে ভাবত, অর্ণবকে নিজের জীবনের কথা এতটা খোলাখুলি কেন বলল? যদি একদিন অর্ণবও তাকে ছেড়ে চলে যায়? তার চোখে যে নির্ভরতা খুঁজে পাচ্ছিল, তা কি স্থায়ী নাকি কেবল সময়ের খেলা? এই অনিশ্চয়তাই তাকে বারবার পিছিয়ে আসতে বাধ্য করছিল। তাদের মাঝে যে সেতুটি গড়ে উঠেছিল, তার মাঝখানে যেন হঠাৎ এক বিশাল ফাঁক তৈরি হয়ে গেছে।
এই অদৃশ্য ফাঁক দুজনের সম্পর্ককে ভারী করে তোলে। তারা এখনও প্রতিদিন দেখা করত, কথা বলত, কিন্তু সেই স্বতঃস্ফূর্ততা আর থাকল না। নীরবতা আরামদায়ক হওয়ার বদলে চাপা অস্বস্তিতে ভরপুর হয়ে উঠল। অর্ণব কথার মাঝখানে থেমে যেত, মীরা জোর করে হাসার চেষ্টা করত। মনে হত, দুজনেই ভেতরে ভেতরে হাত বাড়াতে চাইছে, অথচ দেয়ালের আড়াল পেরোতে পারছে না। নীরজ কাকা মাঝে মাঝে লক্ষ্য করতেন তাদের আচরণ, কিন্তু কিছু বলতেন না—তিনি জানতেন, এই ভয় আর দ্বিধা কেবল তারাই কাটিয়ে উঠতে পারবে। আর হয়তো এই ভয়ের দেয়াল ভাঙার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, অথবা আবারও হৃদয়ের ভাঙন।
–
ক্যাফের ভেতরে সেই দিনটা ছিল ভিন্ন রকম। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল, জানলার কাঁচে ছোট ছোট ফোঁটা এসে পড়ছিল, আর ভেতরে নীরজ কাকার ক্যাফেটি উষ্ণ আলোয় ঝলমল করছিল। অর্ণব আর মীরা দুজনেই আলাদা টেবিলে বসেছিল, একে অপরের দিকে তাকানোর সাহস করছিল না। তাদের চোখে ভয়, দ্বিধা আর অনিশ্চয়তার ছায়া ভাসছিল—যেন ভালোবাসা তাদের দুজনকে কাছে টানছে, অথচ অতীতের আঘাত আবার পিছু টেনে ধরছে। নীরজ কাকা এ দৃশ্য অনেকদিন ধরে লক্ষ্য করছিলেন। তিনি জানতেন, এ দুই আত্মার ভেতরে অনেক ব্যথা জমে আছে, কিন্তু সেই ব্যথাকে জড়িয়ে তারা যেন ভুলে যাচ্ছে যে আলোও আছে, উষ্ণতাও আছে। তাই তিনি সেদিন নিজেই তাদের একসাথে বসিয়ে দিলেন, যেন কথার সেতুটা আবারো গড়ে ওঠে।
অর্ণব আর মীরা প্রথমে কিছু বলতে পারছিল না। টেবিলের ওপর রাখা ধোঁয়া ওঠা কফির কাপের দিকে তারা শুধু চেয়ে থাকছিল, যেন নিঃশব্দ কণাগুলো তাদের ভেতরের অনিশ্চয়তা বুঝতে পারছে। তখনই নীরজ কাকা হেসে ধীরে ধীরে বললেন, “ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়, বরং হারানোর ভয় ভুলে এগিয়ে যাওয়া।” এই কথাটা যেন আঘাত করল অর্ণবের বুকের গভীরে। সে বুঝতে পারল, তার স্ত্রীর মৃত্যু তাকে কেবল ভয় শিখিয়েছে, কিন্তু ভালোবাসার রঙ ভুলিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, মীরার চোখে জল এসে ভেসে উঠল—প্রতারণার দগদগে ক্ষত আজও শুকোয়নি, কিন্তু সেই ক্ষতকে আঁকড়ে ধরেই সে নিজেকে বন্দি করে রেখেছিল। নীরজ কাকার কথার মাঝে তারা দুজনেই উপলব্ধি করল—তারা একে অপরের কাছে আসার পথ খুঁজছে, অথচ ভয়ই সেই পথ আটকাচ্ছে।
ধীরে ধীরে তাদের চোখ একে অপরের চোখে মিলল। প্রথমবার তারা অনুভব করল, ভয়কে যদি না ছাড়ে তবে জীবন আবারও অন্ধকারে ডুবে যাবে। অর্ণব হাত বাড়াল, কিছু না বলে মীরার হাতের ওপর রাখল। মীরা সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু হাত সরিয়ে নিল না। সেই মুহূর্তে ক্যাফের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বাইরে বৃষ্টির শব্দ যেন সুরে পরিণত হলো। অর্ণব ও মীরা দুজনেই বুঝল, ভালোবাসা আসলে কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, এটি সাহস—অতীতের দেয়াল ভেঙে নতুন পথচলার সাহস। নীরজ কাকা দূর থেকে হাসিমুখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, যেন তিনি জানতেন এ আলোই তাদের সম্পর্কের আসল সূচনা।
–
প্রথম আলোয় ভেসে আসা সকালের রোদ জানালার কাচ ছুঁয়ে অর্ণব ও মীরার মুখে এসে পড়ে। তারা দুজন পাশাপাশি বসে আছে—কফির কাপ হাতে, চোখে এক অদ্ভুত শান্তি। এতদিনের ব্যথা, ভাঙাচোরা স্মৃতি আর দুঃখ যেন এই মুহূর্তে মিলিয়ে যেতে থাকে। নীরবতার মধ্যে কোনো অস্বস্তি নেই, বরং আছে একধরনের পরিপূর্ণতা। অর্ণব মৃদু হাসিতে মীরার দিকে তাকায়, আর মীরা সেই হাসি ফিরিয়ে দেয়—শব্দহীন এক প্রতিশ্রুতির মতো। সকালের আলোয় তাদের দৃষ্টি মিলনের ভেতর দিয়ে নতুন যাত্রার আভাস দেয়, যেখানে ভয় আর দ্বিধা ধীরে ধীরে গলে যায়।
কফির উষ্ণতা তাদের আঙুলে যেমন জড়িয়ে থাকে, তেমনি সম্পর্কের উষ্ণতাও মনের ভেতর গড়ে ওঠে। মীরা মনে করে—যত ভাঙা অতীতই থাকুক না কেন, জীবনের নতুন সকাল সবসময়ই অপেক্ষা করে থাকে। অর্ণবও অনুভব করে, ভালোবাসা মানে শুধু হারানো নয়, বরং নতুন করে খুঁজে পাওয়া। জানালার ওপারে পাখির ডাক, রোদ্দুর আর শহরের কোলাহল এই মুহূর্তে যেন পেছনে হারিয়ে যায়। বাকি থাকে শুধু দুজন মানুষের ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য সেতু, যা বিশ্বাস, বোঝাপড়া আর মায়ার ওপর দাঁড়িয়ে। নীরজ কাকার “স্মৃতির ক্যাফে” যেন এই প্রেমের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে।
শেষ দৃশ্যে তাদের কোনো ঘোষণা নেই, কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতিও নেই—শুধু কফির ধোঁয়া, সকালের আলো আর নীরব দৃষ্টির বিনিময়ে তৈরি হয় এক নতুন অধ্যায়। তাদের ভেতরের ভয়, দ্বিধা আর একাকীত্ব ধীরে ধীরে মুছে যায়। স্মৃতির ক্যাফে আর শুধুই ব্যথার ঠিকানা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে আশ্রয়, যেখানে হারানো মন খুঁজে পায় শান্তি, আর ক্ষতবিক্ষত হৃদয় খুঁজে নেয় নতুন শুরু। জানালার বাইরে যে সূর্য উঠছে, সেই আলোয় অর্ণব ও মীরা বুঝে নেয়—তাদের গল্প শেষ হয়নি, বরং এটাই এক সত্যিকারের শুরুর সকাল।
***




