চৈতালী হাঁসদা
পর্ব ১: লাল মাটির পথে
পুরুলিয়ার সেউড়া গ্রামের আকাশ যেন রোজ একটু বেশি নীল হয়। লাল মাটির ধুলোয় গন্ধ মেশে মহুয়ার, বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে রোদ চুঁইয়ে পড়ে গায়ে, আর সেই নির্জন রাস্তায় শেলো হাঁটে একা, হাতে বাঁশের বানানো ঝুড়ি, কাঁধে এক পুরোনো বস্তা। সে বাঁশের শিল্পী—যার হাতের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে নানান গৃহস্থালির জিনিস, হাটে বিক্রি হয় দু’টাকা, পাঁচটাকা করে।
তবে শেলোর চোখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি, যা সহজে কারও হয় না। গ্রামে সবাই তাকে ভালোবাসে—সে কারও ঠাকুরমাকে বাজার থেকে ওষুধ এনে দেয়, কারও ছেলের স্কুলব্যাগ সেলাই করে দেয় বিনা পয়সায়। কিন্তু শেলো তেমন কারও খুব কাছের না। সে নিঃশব্দ মানুষ, বুকে পাহাড়ের মতো কিছু চাপা ব্যথা নিয়ে বাঁচে।
এই নির্জন জীবনে হঠাৎ আগমন ঘটে সুনয়নার।
সুনয়না কলকাতা থেকে এসেছে বাবার সঙ্গে। তার বাবা, সুরেশবাবু, সেউড়ার প্রাথমিক স্কুলের নতুন প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। শহরের মেয়ে সুনয়না একেবারে ভিন্ন জগতে এসে পড়েছে—না আছে মোবাইল টাওয়ার, না আছে কফি শপ, না আছে বন্ধুদের রাতজাগা আড্ডা। প্রথমদিকে তার মনে হচ্ছিল যেন শাস্তি পেয়েছে।
কিন্তু ধীরে ধীরে সে এই নতুন জগতকে দেখতে শেখে—শাল-পলাশের ডালে যেভাবে সকাল আসে, বাচ্চারা হাঁটতে হাঁটতে কবিতা মুখস্থ করে আসে, সন্ধেবেলা মহুয়ার গন্ধে চারপাশ মাতাল হয়ে ওঠে—এই সব কিছু তার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
প্রথমবার শেলোর সঙ্গে তার দেখা হয় এক বৃষ্টিভেজা সকালে।
সেদিন খুব হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। সুনয়না স্কুল থেকে ফিরছিল, রাস্তা কাদায় মাখামাখি। হঠাৎ পিছলে পড়ে যায়। ব্যথা পায়নি, তবে জামাকাপড় নোংরা। ঠিক তখনই পাশের বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে আসে এক যুবক—মাটির রঙের গায়ে মিশে থাকা, একজোড়া গভীর চোখ নিয়ে।
— “ভয় পেয়েছেন?”
সুনয়না একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়ে।
— “এই নিন,” সে তার নিজের গামছা এগিয়ে দেয়।
সুনয়না অবাক হয়, কিন্তু তার মুখে কোনও বিদ্রূপ ছিল না, বরং ছিল একরকম সহানুভূতির উষ্ণতা।
— “ধন্যবাদ,” সুনয়না বলল, গামছা নিয়ে কাদা মুছতে মুছতে।
সে চলে যায়, নামও জিজ্ঞেস করেনি। তবে ওই চোখদুটো সেদিন থেকেই রয়ে যায় তার মনে।
পরের কয়েকদিনেও সুনয়নার নজর ছিল গ্রামের সেই ছেলেটির খোঁজে। সে স্কুল যাওয়ার পথে বাঁশের ঝুড়ি বিক্রি হওয়া দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। হঠাৎ একদিন, বিকেলবেলা, সে আবার দেখে শেলোকে।
— “ওই যে আপনি সেদিন… গামছাটা… আমি ধুয়ে রেখেছি, ফেরত দেব।”
শেলো মাথা নাড়ে।
— “রাখুন, আপনাকে কাজে লেগেছিল, সেটাই যথেষ্ট।”
এই সাদামাটা বাক্যের মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্মান ছিল। কোনও প্রশ্ন নেই, কোনও কৌতূহল নেই—শুধু চোখের ভেতর গভীর একটা নদীর মতো ধৈর্য।
এরপর থেকে তাদের মাঝে দূরত্ব থাকলেও, একটা নীরব বন্ধন তৈরি হয়। সুনয়না সকালবেলা স্কুলে যাবার সময় সেই একই পথ বেছে নেয়—যেখানে শেলো বাঁশ কাটে। তারা কোনওদিন খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু চোখের ভাষা যেন ক্রমে সাহসী হয়ে ওঠে।
একদিন বিকেলে, হাটের পাশে বটতলায়, শেলো বসে ছিল একা। তার পাশে সুনয়না এসে বসে।
— “আপনি কি কিছু লেখেন?”
শেলো চমকে ওঠে।
— “মানে?”
— “আপনার চোখে সব সময় একটা গল্প লুকিয়ে থাকে। আমি ভাবছিলাম, আপনি যদি লেখেন, সেটা কেমন হতো!”
শেলো একটু হাসে।
— “আমি লিখি না। গান করি মাঝে মাঝে। তুমদাক বাজাই।”
— “তাহলে আমি শুনতে চাই একদিন।”
এ কথা শোনার পর শেলোর বুকের ভেতর যেন ঝড় ওঠে। কেউ কি আগে এমন করে বলেছে তাকে কিছু? সুনয়নার মতো করে?
এইভাবে ধীরে ধীরে শেলোর মাটির জীবনে ঢুকে পড়ে এক শহরের মেয়ে, যার চোখে ছিল স্বপ্ন, আর কথায় ছিল গান। সেউড়ার আকাশে যেন নতুন করে রঙ লাগে—একটা সম্পর্কের রঙ, যেটা এখনও নাম পায়নি, কিন্তু তার গন্ধ, ছায়া, স্পর্শ ধরা পড়ে হাওয়ার মধ্যে।
পর্ব ২: ঝুমুরের সুরে
শেলো যেদিন সুনয়নাকে প্রথম ঝুমুর শুনিয়েছিল, আকাশে চাঁদ ছিল না, কিন্তু মাঠে আলো ছিল আগুনের। বৃষ্টির পরে সেউড়ার মাঠগুলো যেন আরও লাল হয়ে ওঠে, আর সেই রঙের মধ্যে পায়ের তালে তালে নেচে ওঠে সাঁওতালরা। সেদিন ছিল বছরকার ‘চড়ক পূজা’ শেষে ছোট্ট এক মহুয়ার মেলা। বাঁশের খুঁটি ঘিরে ঘুরছিল নারকেল, পটকা আর কাঁচা তালের পিঠে বিক্রি হচ্ছিল।
সুনয়না শেলোর ডাকে মেলায় এসেছিল। মুখে কিছু বলেনি, শুধু একজোড়া কাঁথা সেলাই করা চটি পরে মাঠে নেমেছিল ও। তার পোশাক ছিল সাধারণ—হলুদ রঙের সুতির শাড়ি, লাল পাড়। চোখে ছিল সেই কৌতূহল, যা কখনও মিথ্যে হয় না।
শেলো তুমদাক কাঁধে তুলে একটা চক্রের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ঢোল বাজানো শুরু হতেই শরীর যেন তার নিজের ইচ্ছায় চলতে শুরু করে। হাত, পা, কাঁধ—সব এক আশ্চর্য সুরে ভেসে যায়। সুনয়না দূর থেকে দেখে, সেই চুপচাপ ছেলেটা হঠাৎ কীভাবে বদলে যায়—সে আর শুধু একজন বাঁশের ঝুড়ি বিক্রেতা নয়, সে যেন এক পুরুষ দেহতত্ত্বের পুরোহিত, যার শব্দে জেগে ওঠে মাটি, জল, হাওয়া।
সেই রাতেই প্রথমবার, সুনয়নার মধ্যে কাঁপন নামে।
তার বুকের মধ্যে ঢুকে পড়ে সেই তুমদাকের সুর, সেই ছন্দ, যেটা বুঝতে হলে শহরের ভাষা জানতে হয় না, জানতে হয় শুধু মাটির কথা।
নাচ শেষ হতেই শেলো সুনয়নার দিকে তাকিয়ে হাসে। মুখ ঘামে ভিজে, চোখে জ্বলন্ত আগুনের ছায়া।
— “ভালো লেগেছে?”
সুনয়না চুপ করে থাকে। তার চোখে জল।
— “ভালো লেগেছে না, মাটি ছুঁয়ে গেছি।”
শেলো একটু হেসে বলে,
— “এ মাটি, তোকে ডাকছে। তুই শুনিস?”
সেই প্রথমবার, শেলো তাকে ‘তুই’ বলেছিল। সুনয়না রাগ করেনি। বরং সেই ভাষার ভেতর সে খুঁজে পেয়েছিল নিজের জন্য এক নির্ভরতার আড়াল।
এরপরের দিনগুলোয় তাদের সম্পর্ক ঘনিয়ে আসে আরও। সুনয়না স্কুলের পড়া পড়াতো দিনের বেলা আর বিকেলে, সে হেঁটে যেত নদীর ধারে—যেখানে শেলো বসে বাঁশ কাটত। দু’জনে বসে থাকত—একজন বলে গল্প, অন্যজন বলে গান।
এক বিকেলে, আকাশে মেঘ জমে উঠছিল। হাওয়ায় গন্ধ ছিল মহুয়া ফুলের আর তার ভেতর ছিল অপেক্ষা।
— “তুই কি কখনও শহরে যাবি?” সুনয়না জিজ্ঞেস করল।
— “না। শহর আমার মতো লোকের জায়গা না।”
— “কিন্তু শহরে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা তোর মতো গান শোনে, তোর মতো করে স্বপ্ন দেখে।”
— “তাদের হয়তো শোনার ইচ্ছা আছে, কিন্তু আমার তো শোনানোর সাহস নেই।”
এই কথাটা বলেই শেলো নিচু হয়ে তাকায় মাটির দিকে। সেই প্রথমবার, সে তার বুকের ভেতরের জড়তা খোলার চেষ্টা করে। সুনয়না তার কাঁধে হাত রাখে।
— “তোর গান, তোর কথা—সবই আমায় বদলে দিচ্ছে শেলো। তুই নিজে বুঝিস না, কিন্তু তুই নিজেই একটা ভাষা। আমি তোকে পড়তে শিখছি, ধীরে ধীরে।”
এই দিনগুলো যেন ধরা পড়ে সেউড়ার আকাশে। পাখিরা অন্যরকম সুরে ডাকে, হাওয়ায় আলাদা রকমের ঘ্রাণ থাকে। গ্রামের লোকেরাও খেয়াল করে, শহরের মেয়েটা হঠাৎ হাসে বেশি, আর শেলো যেন হঠাৎ গুনগুন করে গান।
কিন্তু প্রতিটি সূর্যাস্তের পিছনে যেমন অন্ধকার লুকিয়ে থাকে, তেমনি সেউড়ার আকাশে জমে ওঠে কিছু কালো মেঘ।
সুনয়নার বাবা সুরেশবাবু একদিন সন্ধেবেলায় তাকে ডেকে বলেন—
— “তোমার কলেজে ফর্ম ফিলআপের সময় হয়ে গেছে। এই মাসের শেষেই কলকাতায় ফিরতে হবে।”
সুনয়না চুপ করে যায়। সেও জানত, এই দিন আসবেই। কিন্তু যখন সত্যি এল, তখন বুকটা যেন হঠাৎ খালি হয়ে গেল। শেলোকে কী বলবে? কীভাবে বলবে?
সেই রাতেই সে শেলোকে ডাকে নদীর ঘাটে। দু’জনেই চুপচাপ বসে।
— “আমি যাচ্ছি,” সুনয়না বলল।
শেলো কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে দূরের দিকে।
— “আমার ইচ্ছা করে, তোকে সঙ্গে নিয়ে যাই। কিন্তু জানি, তুই তোর মাটিকে ছাড়বি না।”
— “না, আমি কোথাও যাই না। আমি এখানেই থাকি। তুই চলে যাস, আমি থেকে যাব। তবে একটা কথা… তুই যদি কোনওদিন ফিরে আসিস, আমি এখানেই থাকব। ঠিক এই ঘাটে, এই নদীর ধারে।”
সুনয়নার চোখে জল আসে। সে শেলোর কাঁধে মাথা রাখে। নদীর শব্দে হারিয়ে যায় সব কথা।
সেউড়ার আকাশে সেদিন তারা খুব উজ্জ্বল ছিল। যেন তারা নিজেরাই জানত, একটা গল্প শেষ হতে চলেছে… কিংবা, একটা নতুন গল্প শুরু।
পর্ব ৩: মাটির বুকের ডাক
কলকাতা ফিরে যাওয়ার আগে শেষ কয়েকটা দিন সুনয়না যেন প্রতিটা মুহূর্তে শেলোর ছায়া খুঁজে পায়। সকালে পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙলে জানলার বাইরে তাকিয়ে ভাবে, যদি আজও দেখা হয়! দুপুরে স্কুলের জানলা দিয়ে দূরের মাঠে তাকিয়ে ভাবে, ওর বাঁশ কাটার শব্দটা কি এখনও শোনা যাচ্ছে? সন্ধ্যাবেলা বইয়ের পাতায় চোখ আটকে থাকে না, মন বারবার নদীর ধারের সেই ঘাটটার দিকেই ছুটে যায়।
অথচ শেলো দেখা দেয় না।
সে জানে, সুনয়না চলে যাচ্ছে। কথা দিতে চায় না, কারণ কথা দিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি তার মাটির মতো নয়। মাটি তো কোনদিন বলেও না কিছু, কিন্তু থেকে যায়। সুনয়না তাই শেলোর এই অনুপস্থিতি মেনে নেয়। ভিতরে ভিতরে ব্যথা জমে, কিন্তু মুখে হাসি রাখে। বাবা-মা কিছু বুঝতে পারে না, শুধু ভাবে মেয়েটা হঠাৎ এত চুপচাপ কেন।
যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যাবেলা, সুনয়না একাই হাঁটতে বেরোয়। সেউড়ার শাল গাছের পথ ধরে হাঁটে সে। হাওয়ায় আজ একরকম গন্ধ—মিশে আছে কিছু শেষ মুহূর্তের ছোঁয়া, কিছু না বলা কথার নরম ব্যথা।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা সুর ভেসে আসে।
তুম-তুম-তুম-তাক…
তাক-তুম-তাক…
শেলোর তুমদাক। সেই সুরে যে গভীরতা, তা যেন একসাথে ডাক দেয়—মাটি, আকাশ আর মনকে।
সুনয়না থেমে যায়।
পেছনে তাকালে দেখে, শেলো দাঁড়িয়ে আছে। এক হাতে তুমদাক, আরেক হাতে ছোট্ট একটা কাপড়ে মোড়া পুঁটলি। চোখে কোনো জল নেই, কিন্তু ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে।
— “তুই এলি?”
— “তুই তো ডাকছিলি,” শেলো শান্ত গলায় বলে।
তারা পাশে বসে। শেলো পুঁটলিটা বাড়ায়।
— “এইটা তোকে দিলাম। তোর জন্য বানিয়েছি। আমার হাতের একমাত্র জিনিস, যা তুই রাখতে পারিস।”
সুনয়না কাপড় খুলে দেখে—একটা বাঁশের ছোট্ট মূর্তি। সেই মূর্তিটা এক মেয়ের, যিনি হাতে তুমদাক ধরে আছেন।
সুনয়নার চোখে জল আসে।
— “তুই এটা বানালি?”
— “হ্যাঁ। তোর মতন কেউ আসেনি কোনওদিন। আর তুই যদি থাকিস আমার মাটির মধ্যে, তা হলে তোকে আর আলাদা করে খুঁজতে হবে না।”
সুনয়না চুপ করে থাকে। শুধু হাত বাড়িয়ে শেলোর হাত ধরে।
— “তুই যদি কখনও লেখ, তবে আমাকে পাঠাবি। তুই যদি গাস, তবে আমি শোনার জন্য কান পেতে থাকব।”
— “আমি তোকে কোনোদিন ভুলব না, সুনয়না,” শেলো বলে।
সুনয়না তার পিঠে হাত রাখে।
— “ভুলিস না। কিন্তু বাঁচ। গান কর। এই মাটিকে নিয়ে গান লিখ। সেউড়ার আকাশ জানবে, তুই কেমন করে ভালোবাসতে শিখেছিস।”
রাত্রে সুনয়না ঘুমোয় না। জানালার পাশে বসে থাকে সারারাত। চোখের সামনে দিয়ে চলে যায় মাঠের ছবি, নদীর ঘাট, শাল গাছের ছায়া, আর একজোড়া গভীর চোখ।
পরদিন ট্রেন ধরার সময়, শেলো আসেনি। সুনয়না চায়নি সে আসুক। বিদায় যেন তাদের গল্পের জন্য নয়।
কিন্তু যখন ট্রেন চলতে শুরু করে, জানালার বাইরে দেখতে পায়—দূরে, স্টেশনের শেষ মাথায়, শেলো দাঁড়িয়ে। কিছু বলে না, হাতও তোলে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা নিচু করে।
সুনয়না চোখের জল লুকিয়ে ফেলে।
আর সেই মুহূর্তে মনে পড়ে—মাটি কখনও শব্দ করে না, কিন্তু সেই নিঃশব্দতাই সবচেয়ে গভীর প্রতিধ্বনি তৈরি করে।
পর্ব ৪: শহরের দেয়ালে গ্রাম
কলকাতায় ফিরে আসার পর প্রথম ক’দিন সুনয়না যেন বুঝতেই পারছিল না, সে কোথায় আছে। কলেজের হস্টেলে রুমমেটদের হাসাহাসি, ট্রামের ঘণ্টা, রাস্তায় ভীড়—সবই ছিল চেনা, কিন্তু যেন খুব দূরের কিছু। মনে হচ্ছিল, তার মধ্যে একটা বিশাল ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে, যেটা সে নিজেও পূরণ করতে পারছে না।
সে ক্লাসে যায়, লাইব্রেরিতে বসে পড়ে, বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাফেতে যায়—কিন্তু মন তার কোথাও থাকে না। প্রতিবার বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে মনে পড়ে যায়, শেলোর হাতে গড়া সেই মূর্তিটা—মেয়েটা যার হাতে তুমদাক, চোখে শান্তি।
হস্টেলের আলমারির এক কোণে রাখা আছে সেই মূর্তিটা। সুনয়না প্রতিরাতেই তাকে একটু সময় দেয়। কখনও কিছু বলে, কখনও কিছু জিজ্ঞেস করে না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
একদিন ক্লাসে প্রফেসর বলছিলেন, “আধুনিক সাহিত্যে ‘মাটি’ একটা গভীর প্রতীক—যে মাটি ধরে রাখে স্মৃতি, পরিচয়, এমনকি প্রেমও।”
সুনয়নার মনে পড়ে যায়, শেলো বলেছিল—”আমি কোথাও যাই না। আমি এখানেই থাকি। তুই যদি ফিরে আসিস, আমি থাকব এই নদীর ধারে।”
তখন থেকেই সে একটা খাতা খুলে লেখে—প্রতিদিন একটু করে। সেউড়ার কথা, শেলোর কথা, তাদের মাঝের শব্দহীন কথোপকথনের কথা। আর তার লেখার শিরোনাম?
“মাটির ছায়া”।
তবে শুধু লেখার মধ্যেই আটকে থাকে না সে। হঠাৎ একদিন ঠিক করে, সে চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশ নেবে—বিষয় হবে ‘গ্রাম ও গান’। সে শেলোর ছবি আঁকে—একজন দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে, কাঁধে তুমদাক, চোখে ঝড় থেমে যাওয়ার অপেক্ষা।
তার আঁকা ছবি দেখে অনেকে প্রশংসা করে। কিন্তু সে জানে, সে প্রশংসা আসলে তার নয়—ওগুলো এসেছে সেই গ্রামের মাটি থেকে, সেই ঢেউ থেকে যা তার হৃদয়ে ধাক্কা দিয়েছিল।
প্রদর্শনীর দিন একটি সাঁওতাল বৃদ্ধা এসে দাঁড়ান ছবিটার সামনে। তাঁর চোখে জল।
— “এই ছেলে কে গো মা? আমাদের গ্রামে এমন একটা ছেলে ছিল, নাম ছিল শেলো… ওর তুমদাকের সুর এখনও মন ভুলায়।”
সুনয়নার মুখে হাসি ফোটে, চোখে জল নামে।
— “আমি তাকে চিনি। খুব ভালো করে চিনি।”
সেই রাতে সে জানে, তার লেখা শেষ হয়নি। বরং শুরু হয়েছে। এবং সে আরও জানে, যতই দূরে থাকুক, শেলো তার মধ্যে রয়ে গেছে। শহরের এই ইট-কাঠের মধ্যে, এই দেয়ালে আঁকা ছবি আর প্রতিটি কবিতার ছত্রে ছত্রে।
কারণ ভালোবাসা, ঠিক মাটির মতো—তাকে ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু সে নিজে থেকে বেড়ে ওঠে। কখনও আঁকায়, কখনও গানে, কখনও নিঃশব্দ অপেক্ষায়।
পর্ব ৫: চিঠির মতো ফিরে আসা
কলকাতার শীতে মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়—ভুলে যায় পাখির নাম, ভোরের ঘ্রাণ, এমনকি কারও চোখের রঙও। কিন্তু সুনয়না ভুলে যায়নি। শীত যত গভীর হয়েছে, ততই সে খুঁজেছে শেলোর গলার সেই উষ্ণতা, যার শব্দ নেই কিন্তু স্পর্শ আছে।
প্রতিদিন সে তার ডায়েরিতে একটা বাক্য লেখে। কখনও তা কবিতা, কখনও গল্পের খসড়া, কখনও শুধু একটা নাম—”শেলো।”
কিন্তু একটা সময়ে এসে কেমন যেন ক্লান্ত লাগে। মাটি থেকে কেটে রাখা ফুল যেমন কয়েকদিন পরে ম্লান হয়ে যায়, তেমনি একটা সম্পর্কও সময়ের অভাবে ঝাপসা হতে থাকে। তার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, “ভুলে যা, গ্রাম্য গল্প সিনেমায় ভালো লাগে, বাস্তবে নয়।” কেউ বলে, “সত্যি ভালোবাসলে তো কোনো চিঠি আসত, কোনো খোঁজ তো রাখত!”
এইসব কথাগুলো সুনয়নার মনেও ঢুকে পড়ে। এক রাতে সে ভাবে, “আমি তো শেলোকে কিছু জানাইনি এতদিন। আমিই বা তার খবর রাখি কোথায়?” তার বুকের মধ্যে একরকম অপরাধবোধ জমে ওঠে। সে সিদ্ধান্ত নেয়—চিঠি লিখবে।
চিঠিটা ছিল খুব ছোট—
**”শেলো,
জানি তুই কথা রাখিস। জানি তুই আজও সেউড়ার আকাশের নিচে তুমদাক বাজাস। আমি শুধু এতটুকু বলতে চাই—আমি তোর কথা ভুলিনি। আমার প্রতিটি লেখায়, প্রতিটি ছবিতে তুই আছিস।
আমি আবার আসব। তুই যদি তখনও থাকিস, আমিও থাকব।
— তোর, সুনয়না।”**
চিঠিটা সে পাঠায় না। কেবল রেখে দেয় নিজের একটা পুরোনো বাঁধানো ডায়েরির পেছনের পাতায়। কিন্তু সেই চিঠির ভাষা যেন তার জীবনেই একটা সুর তৈরি করে দেয়।
তার কলেজে তখন সাংস্কৃতিক উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। সুনয়না প্রস্তাব দেয়—এইবার নাটকের থিম হবে “মাটি ও ভালোবাসা”।
সে লেখে নাটকটা নিজেই—একজন শহুরে মেয়ে, যে এক সাঁওতাল ছেলের প্রেমে পড়ে। প্রথমে কলেজের অনেকেই দ্বিধায় ছিল—এমন থিম সাধারণত চলে না, কমার্শিয়াল নয়, ‘রোম্যান্টিক’ নয়।
কিন্তু যখন প্রথমবার নাটক পড়া হয়, সবার মুখ স্তব্ধ। শব্দ যেন সোজা বুকে আঘাত করে। শেলোর চরিত্রে অভিনয় করে একদম নতুন এক ছেলে, যার চোখে জ্বলে ওঠে মাটির মতো এক গভীর দৃষ্টি।
নাটক শেষে দাঁড়িয়ে থাকে সুনয়না, দর্শকদের হাততালি কানে আসে, কিন্তু চোখে ভাসে কেবল এক দৃশ্য—সেউড়ার নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছেলেটা, যার চোখে ছিল অপেক্ষা।
সেই রাতে হোস্টেল ফিরে এসে সে ডায়েরিটা খুলে দেখে—চিঠিটা লেখা পাতাটা খোলা, এবং বাতাসে উড়ে গিয়ে জানলার ধারে পড়ে আছে।
সুনয়না হঠাৎ ভাবে—চিঠিটা এবার পাঠানো উচিত। আর বিলম্ব নয়।
সে চিঠিটা ভাঁজ করে, খামের গায়ে লেখে:
প্রাপক: শেলো
সেউড়া গ্রাম
ঝালদা থানা, পুরুলিয়া জেলা
আর প্রেরকের জায়গায় লিখে—
সুনয়না, কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা।
এই চিঠির উত্তর আসবে কি না, সে জানে না। কিন্তু অনেক দিন পরে, এই প্রথম তার বুক হালকা লাগছে।
কারণ, চিঠি কখনও কেবল উত্তর পাওয়ার জন্য নয়, অনেক সময় নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্যও পাঠানো হয়।
পর্ব ৬: সেই আকাশ, সেই তুমি
একটি চিঠি কত দূর যেতে পারে? কতখানি পথ পেরিয়ে পৌঁছয় তার ঠিকানায়? পুরুলিয়ার লাল মাটির উপর দিয়ে হেঁটে, গাছের ছায়া গলে, পাখির ডাক ছুঁয়ে—সুনয়নার চিঠিটিও পৌঁছেছিল।
শেলো সেই চিঠি হাতে পেয়েছিল এক বিকেলে, নদীর ঘাটে বসে বাঁশ কেটেছিল সে। চিঠি দেখে প্রথমে অবাক হয়নি, কিন্তু খাম খুলে পড়ার পর তার মনে হল, কেউ যেন হঠাৎ নদীর মধ্যে একটা পাথর ছুড়ে দিল। জলের ঢেউ দুলে উঠল তার মনের গভীর গহ্বরে।
চিঠির প্রতিটি লাইনে ছিল অপেক্ষা, ভালোবাসা, আর অগাধ বিশ্বাস—যা কোনও প্রশ্ন করে না, শুধু আশ্রয় দেয়।
সেদিন রাতে শেলো তার তুমদাকটা একটানা বাজায়, যেন প্রতিটি শব্দের ভেতর সে সাজিয়ে রাখে চিঠির উত্তর। কোনও খামে ভরে পাঠায় না, কোনও পোস্ট অফিসে দাঁড়ায় না—কিন্তু আকাশে যে সুর ওঠে, তা বুঝি শহরের জানলার পাশেও পৌঁছয়।
কলকাতায় তখন বসন্ত। সুনয়না সেমিস্টারের পরীক্ষা দিয়ে ছুটি পেয়েছে। তার মন আবার বারবার ছুটে যায় সেউড়ার দিকে। আর সে আর অপেক্ষা করে না।
চিঠির উত্তরের আশা ছেড়ে দিয়ে, সে একদিন সকালবেলায় ট্রেনে চেপে বসে। বুকের মধ্যে চাপা উত্তেজনা, হাতে সেই ছোট্ট বাঁশের মূর্তি। আবার ফিরছে—যেখানে শুরু হয়েছিল সবকিছু।
স্টেশন থেকে নামতেই সে দেখে, কিছুই পাল্টায়নি। রাস্তাগুলো এখনও লাল ধুলোয় ভরা, মাঠে পাখির দল ওড়ে, আর আকাশ সেই আগের মতোই নীল।
সেউড়া পৌঁছোতেই গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ছুটে আসে। কেউ চিনে, কেউ না। কেউ বলেও ফেলে, “আপনি না ওই স্যারের মেয়ে?”
সে হাসে। হ্যাঁ, কিন্তু সে এখন শুধু স্যারের মেয়ে নয়—সে এখন মাটির নিজের কেউ।
নদীর ধারের সেই ঘাটে যায় সে। সূর্য তখন পশ্চিমে, আলো ঝাঁপিয়ে পড়ছে জলের উপর। আর সেখানে, ঠিক সেই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে আছে শেলো।
সে বদলায়নি একটুও। একই চোখ, একই ভঙ্গি, কিন্তু আজ তার মুখে একরাশ প্রশান্তি।
দুজন কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে।
অবশেষে সুনয়না এগিয়ে গিয়ে বলে, “তুই চিঠির উত্তর দিসনি।”
শেলো মাথা নিচু করে হেসে বলে, “আমি তুমদাক বাজিয়েছিলাম। শুনিসনি?”
সুনয়না এক পা এগিয়ে আসে। তার চোখে জল। “এই যে এলাম, এটাই তো সবচেয়ে বড় শোনা। আমি শুনেছি, বলেই এলাম।”
তারা দুজনে নদীর ধারে বসে। চারপাশে বাতাসে গন্ধ, পাখির ডানা ছুঁয়ে আসা শব্দ, আর বুকের ভেতর জমে থাকা অনেক দিনের কথা।
শেলো বলে, “তুই এবার আবার ফিরবি তো?”
সুনয়না বলে, “না, আমি আর ফিরছি না। আমি থাকব এখানেই। তোকে নিয়ে, তোদের নিয়ে, এই মাটিকে নিয়ে। আমি এখানে স্কুলে পড়াব। আর আমার লেখাগুলো এখান থেকেই বেরোবে।”
শেলোর মুখে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একরকম মৃদু আলো।
সেউড়ার আকাশ তখন অদ্ভুত শান্ত। যেন আর কোনও প্রশ্ন বাকি নেই, কোনও পথ অজানা নয়।
বিকেলের আলো ক্রমশ নরম হয়ে আসছে। দু’জন মানুষ পাশাপাশি বসে, কিছু বলে না, কিন্তু তাদের নিঃশব্দতাও যেন গান হয়ে ওঠে।
তাদের ভালোবাসা ছিল না শহরের ভাষায় বাঁধা, ছিল না কোনও চুক্তির ছায়ায়। তাদের ভালোবাসা ছিল মাটির মতো—চুপচাপ, গভীর, আর অটুট।
সেউড়ার আকাশের নিচে সেই ভালোবাসাই থেকে যায়।
(সমাপ্ত)




