Bangla

সুধানী : এক নদীর আত্মকথা

Spread the love

সুমন দাস


আমার জন্ম হয়েছিল এক নিঃশব্দ সকালে। পাহাড়ের বুক চিরে একটুখানি ঝরনা যখন নেমে আসছিল, তখন কেউ জানত না সেই জলধারা একদিন নদী হবে। না, আমি হিমালয়ের বিশাল বরফগলা স্রোত নই, আমি সুধানী — এক শান্ত, সরল, কিন্তু গভীর জীবনবোধে পরিপূর্ণ নদী। আমার জন্মস্থানটি ভারতের পূর্ব হিমালয়ের এক অজানা কোণে, যেখানে নীল পাহাড় আর সবুজ বন একে অপরকে জড়িয়ে রাখে চুপিচুপি।

প্রথমে আমি ছিলাম এক ছেলেখেলার ঝরনা। বনভূমির কচি ঘাস আমার পায়ে খেলত, বুনো ফুলেরা হাসিমুখে তাকিয়ে থাকত আমার দিকে। পাখিরা এসে আমার জলে ঠোঁট ডুবিয়ে যেত, আর শালগাছের ছায়া আমাকে আগলে রাখত মায়ের মত। আমি শিখে নিচ্ছিলাম প্রবাহের ভাষা — পাথরের প্রতিবন্ধকতা কিভাবে পেরোতে হয়, কোন বাঁকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে হয়, আর কখন জোরে ছুটে যেতে হয়।

আমার প্রথম বন্ধু ছিল এক বুনো হরিণছানা। সে প্রতিদিন ভোরে আমার ধারে এসে দাঁড়াত, জলের শব্দে কান পাতত। আমি তখনও কথা বলতে শিখিনি, কিন্তু সে বুঝত — নদীও কথা বলে, শুধু মানুষের ভাষায় নয়।

পাহাড়ি অঞ্চল পার করে আমি যখন প্রথম জনবসতির কাছে পৌঁছলাম, এক নতুন অভিজ্ঞতা আমাকে ঘিরে ধরল।

সে এক শান্ত পাহাড়ি গ্রাম — নাম ছিল নাওরংপারা। কুঁড়েঘর, ধোঁয়া-ওঠা রান্নাঘর, আর সরল মুখের মানুষ। তারা আমাকে দেখত ভক্তির চোখে — যেন আমি কোনও দেবতা। বৃদ্ধা মাটির হাঁড়ি নিয়ে আমার ধারে আসতেন, জলে হাত ডুবিয়ে বলতেন, “তুই তো বাঁচাস মা, তোর জলেই তো হাঁড়ি চড়ে।”

আমি গর্বে ফেঁপে উঠতাম, আবার লাজুক নদীর মত নিঃশব্দে এগিয়ে যেতাম। একদিন এক বালক এসেছিল — বয়স দশ কি বারো। তার চোখে ছিল স্বপ্নের জ্বালা। সে বসে বসে আমার জলরেখা আঁকত কাঠকয়লার টুকরো দিয়ে। আমি দেখতাম, সে আমার বুকে কীভাবে তার কল্পনার নৌকা ভাসায়, কীভাবে আমার ভাঁজে ভাঁজে কল্পনার রাজ্য গড়ে তোলে। তার নাম ছিল নয়ন। আমি প্রথম বার মানুষের ভালোবাসা অনুভব করলাম তার চোখে।

সময় গড়িয়ে চলল। আমি বড় হতে লাগলাম। নদীর যেমন নিয়তি — আমাকে শহরের দিকে এগোতেই হয়। বনভূমি আর গ্রামের নির্জনতা পেরিয়ে আমি এলাম এক ব্যস্ত শহরের উপকণ্ঠে — প্রথমে ছোটো ছোটো দোকান, তার পর ইটের দালান, রাস্তা, সেতু, কলকারখানা। প্রথম দিনেই আমি টের পেলাম — এখানে আমার জায়গা নেই। নোংরা পাইপের মুখে আমাকে ঠেলে দিল, বর্জ্য পদার্থে আমার জল কালচে হতে শুরু করল। আমার গন্ধে কাঁদা আর কেমিকালের গন্ধ এসে মিশে গেল। আমি আর পাখিদের ডাক শুনতাম না, বরং শুনতাম গাড়ির হর্ন, কলের ধ্বনি, আর মানুষের অভব্য কথাবার্তা। তবে এখানেও কিছু ভালোবাসা ছিল। এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক প্রতিদিন সকালে এসে আমার ধারে বসতেন। কানে ছিল সোনার হেডফোন, হাতে খবরের কাগজ। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতেন — “তুই জানিস, ছোটবেলায় তোর জল কত পরিষ্কার ছিল! আমি তোর জলে স্নান করতাম, এখন তো হাত দিতে ভয় পাই।”

আমি কেঁদে ফেলতাম ভিতরে ভিতরে — কিন্তু জল কি কাঁদতে পারে? আমার বুকের ওপর তৈরি হলো বাঁধ, আমার গতিকে থামিয়ে দিল মানুষ। তারা বলল, “এই জল সংরক্ষণ করতে হবে।”

আমি বুঝি — জলের সংরক্ষণ দরকার, কিন্তু নদীর তো প্রবাহই জীবন! আমি থেমে গেলে আমি আর নদী থাকি না। এর মাঝে আমার স্রোতের ধারে এক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হলো — ‘লোকসংস্কৃতি ও পরিবেশ গবেষণা কেন্দ্র’। সেখানে পড়াশোনা করত অনেক শিক্ষার্থী, তাদের একজন ছিল কৃতীকা।

সে প্রতিদিন বিকেলে আমার কাছে আসত। হাতে স্কেচবুক, পাশে ক্যামেরা। সে আমার ছবি তুলত, আমার জলরেখা আঁকত, আর বলত, “তুই এক কবিতা সুধানী, তোকে নিয়ে একদিন বড় কিছু লিখব।”

আমি অপেক্ষা করতাম, যেন নতুন কোন কবির কলমে উঠে আসবে আমার গান। কিন্তু তারপর একদিন সে আর এল না। শুনলাম, শহরের বাইরে বড় চাকরি পেয়ে গেছে। আমার বুকটা হালকা হল — যেন কেউ এক খণ্ড ভালোবাসা টেনে নিয়ে গেছে।

আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আমার বুক জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে প্লাস্টিক, মৃত মাছ, মানুষের অযাচিত আবর্জনা। কোথাও কোথাও আমার জল কালো হয়ে উঠেছে।

তখন একদল পরিবেশকর্মী এগিয়ে এল। তারা ব্যানার হাতে হাঁটল শহরের রাস্তায় — “সুধানীকে বাঁচাও”, “নদী মানে প্রাণ”, “নদী থামলে আমরা থামি”।

আমি প্রথম বার বুঝলাম, আমিও কারো কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্দোলনের নেত্রী ছিল অঞ্জনা। সে বলত, “নদী শুধু জল নয়, নদী মানে সভ্যতা, নদী মানে ইতিহাস। আমরা যদি সুধানীকে বাঁচাতে না পারি, তবে আমাদের ভবিষ্যৎও ডুবে যাবে।”

অবশেষে আদালতের আদেশে আমার উপর ফেলা কলকারখানার নিকাশী বন্ধ হল। শহরের একপাশে তৈরি হল সুধানী পার্ক, যেখানে আমার তীরে আবার ফিরে এল পাখিরা, শিশুরা।

আজ আমি বয়স্ক — অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি। আমার শরীরে এখনও দাগ আছে, কিন্তু আমি নতুন করে বাঁচতে শিখেছি। নয়ন এখন একজন লেখক — সে এখন শহরের পরিচিত নাম। তার লেখা একটি বই: “সুধানীর কাছে ফিরে” — একবারে আলোড়ন তুলেছে পাঠকদের মনে।

সে আবার এসেছিল এক বিকেলে। আমার ধারে বসে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলল, “তুই তো আমার প্রথম বন্ধু, সুধানী। তোর জলেই আমার প্রথম কবিতা ভেসে ছিল।”

আমি তখন শান্ত — স্রোতের শব্দে তাকে বললাম, “আমি আজও আছি, নয়ন, শুধু একটু ধুলো মুছে দেখবি তো!”

আমি জানি, আমার গল্প এখানেই থেমে যায় না। আমার গন্তব্য এখনও দূরে — কোন অজানা মোহনার দিকে আমি চলছি। আমি জলের মতো, আর জল তো একজায়গায় থাকে না। আমি আজও কথা বলি — গোধূলিতে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির রাতে, শিশুর চেঁচামেচির মধ্যে, কিংবা একজন পরিবেশপ্রেমীর চোখের জলে।

আমার নাম সুধানী। আমি শুধু নদী নই — আমি এক অনুভব, এক ইতিহাস, এক আত্মকথা।

1000022613.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *