সর্বাণী দত্ত
১
আষাঢ়ের সন্ধ্যে তখন নামছে, আকাশে স্নানধোয়া মেঘের আনাগোনা। অন্ধকার গ্রাস করছে পশ্চিমের পাটে ধানক্ষেতের প্রান্তর। মেঘে ঢাকা আলোয় সিঁথি গ্রামের পুরনো এক ঘর— খড়ের চাল, কাদার দেওয়াল আর পেছনে বিশাল এক অশ্বত্থগাছ— সেখানে বসে আছে তরসা মণ্ডল। একা। ঝুপ করে সন্ধে নামার আগে সে হাত পা মুছছে কাপড় দিয়ে, রান্নাঘরের মাটি ঘেঁষে বসে। তার ডান হাতে জড়ানো লাল সুতোটা অন্ধকারে যেন একটু বেশি লাল মনে হয় আজ। এই সুতো তার জীবনের অংশ— জন্ম থেকেই ছিল, মা বলত, “সুতোর মানুষ বাঁচে না মরেও না।” সে কথা অনেক আগেই মাটি চাপা দিয়েছে তরসা। তবু যখন খেয়াল করে, এই সুতোটা আজকাল নিজে থেকেই একটু একটু টান দিচ্ছে, যেন কোথাও পৌঁছোতে চায়, কোথাও একটা শেষ মাথা আছে, তখন বুকের ভিতরটা একটু কাঁপে। ছেলেবেলায় মা বলত, “এই সুতো কার বাঁধা জানিস না, কাটা যাবে না।” তবু এই নিষেধাজ্ঞার ভেতরেই একটা অদ্ভুত কৌতূহল চেপে রেখেছিল সে— কেন? কার জন্য এই সুতো? আর এই সুতো কি কেবল মায়ের বিশ্বাস, নাকি সত্যিই কোনো অতৃপ্ত আত্মার ডোর?
রাতে, খাওয়াদাওয়ার পর, একটা নিস্তব্ধ সময় আসে ঘরে। কেরোসিনের কুয়াশাভেজা আলোয় দেয়ালে কাঁপে তরসার ছায়া। পাশের ঘর থেকে কেবল পোকার ডাক, আর অদ্ভুতভাবে জানলার বাইরে অশ্বত্থপাতার মৃদু চঞ্চলতা। সে হাতখানা তুলে দেখে— লাল সুতোটা হালকা ঘেমে গেছে, যেন সে-ও শরীরের মতো নিঃশ্বাস নিচ্ছে। হঠাৎ সে ঝিমিয়ে পড়ে— ঘুম আসে কি আসে না, ঠিক বোঝে না। তখনই যেন কোথা থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে— খুব নিঃশব্দে, যেন বাতাসের ভেতর কেউ ফিসফিস করে বলে, “সুতোর শেষটা খুঁজে দে…” তরসা চমকে ওঠে, তার কপালে ঠাণ্ডা ঘাম। বিছানায় শুয়ে ছিল, কিন্তু এখন সে বসে আছে, কুয়াশার মতো কিছুর মাঝখানে। চিৎকার করতে গিয়েও শব্দ আটকে যায় গলায়। দরজার ফাঁক দিয়ে যেন হালকা আলো আসছে বাইরে থেকে— সে দেখে, লাল সুতো টান খেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে দরজার ফাঁক গলে। আশ্চর্যজনকভাবে তার হাত থেকে না খুলেই সুতো গড়িয়ে যাচ্ছে, যেন তাকে নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। সে উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু পা দুটো ভারী। ভয় আর কৌতূহলের দোলাচলে দাঁড়িয়ে, সে দরজার গায়ে কান রাখে— আর তখনই আবার সেই কণ্ঠটা, এবার যেন কিছুটা অসহায়— “আমাকে খুঁজে দে… আটকে আছি…”
ভোরের আলো যখন ঘরে ঢোকে, তখন তরসা বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে। চোখ লাল, চুল এলোমেলো। স্বপ্ন ছিল, না বাস্তব— বোঝা যায় না। তবে তার হাতের লাল সুতোটা আজ একটু বেশি গোঁজ হয়ে আছে, আর দরজার নিচে গড়িয়ে আছে সেই সুতোর একটা সরু রেখা, যেটা রাতভর কোথায় যেন গিয়েছিল। সে জানে, এটা কেবল কাকতালীয় নয়। কিছু একটা ডাকছে তাকে। কে যেন তার হাত ধরে হাঁটতে চাইছে, কে যেন আটকে আছে এই জগৎ আর পরজগতের মাঝখানে। আর সে— সে কি প্রস্তুত? আত্মা কি কেবল কল্পনা? নাকি সত্যিই কেউ… একটা সুতোর ভেতর বেঁধে পড়ে আছে, অপেক্ষায়…? তরসা জানে না। কিন্তু সেদিন ভোরে যখন সে হাতের সুতোটা আলতো করে টেনে দেখে, তখন যেন একটা গা ছমছমে শীতলতা সারা পিঠ বেয়ে নেমে আসে। কোথাও যেন বাতাস ফিসফিস করে— “শেষটা এখনও ধরা পড়েনি…”
২
তরসা মণ্ডলের ঘরটা দিনের আলোয় খুব সাধারণ। মাটির দেওয়াল, দুটো কাঠের জানলা, একটা পুরনো কাঠের আলমারি— যেটার দরজা এখন আর পুরোপুরি বন্ধ হয় না। ঘরের কোণে একটা আয়না, যার নিচে ফাটল ধরা টিনের ছোট টেবিল। এই আয়নাটাই একদিন তার স্বামী হরেন এনে দিয়েছিল হাট থেকে। “তোকে সাজতে হবে, আয়না না থাকলে কেমনে সাজবি?” বলেছিল সে। হরেন আজ নেই— বছর পাঁচেক আগে জলেভাসা লাশ পাওয়া গেছিল তার, সেই যে গেল, আর ফিরল না। কিন্তু আয়নাটা এখনও আছে। আয়নাটা মাঝে মাঝে কাঁপে— ঠিক যেমনটা করল আজ সকালে। তরসা উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল— চুল আঁচড়াচ্ছিল, হঠাৎ খেয়াল করল, তার পেছনে যেন এক ঝাপসা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। খুব হালকা, ধোঁয়ার মতো— কিন্তু স্পষ্টভাবে একটা মানুষের ছায়া। সে চোখ পিটপিট করল, ঘুরে তাকাল— কেউ নেই। আবার আয়নার দিকে তাকাতেই… সেই ছায়া— যেন একজোড়া চোখ তার চোখের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে। মুহূর্তের জন্য তার নিঃশ্বাস আটকে যায়। কুয়াশাভেজা সেই প্রতিচ্ছবির ঠিক নিচে একটা লাল রেখা— যেন কারও গলায় জড়িয়ে লাল সুতো…
আয়না থেকে চোখ সরাতেই তরসার বুক ধক করে ওঠে। এবার সে হাঁ করে দেখে— তার হাতের লাল সুতোটা মেঝেতে ঝুলে থেকে যেন নিজে থেকেই সরতে শুরু করেছে। সে বসে পড়ে, হাত শক্ত করে চেপে ধরে, কিন্তু সুতোর টান বাড়তে থাকে। হঠাৎ তার মনে পড়ে, গতরাতে সে যেমনটা শুনেছিল— “সুতোর শেষ খুঁজে দে…” এবার যেন সেই কণ্ঠস্বর আবার ফিরে আসে, কিন্তু এবার আসছে যেন ঠিক তার কানের পাশ থেকে— নিঃশব্দে, কাঁপা কাঁপা স্বরে, “ঘুমের ঘরে আমি আর নেই… আয়নার ওধারে আটকে আছি…” তরসা আয়নাটার দিকে পাথরের মতো তাকিয়ে থাকে। এবার সেই ছায়া আর দাঁড়িয়ে নেই, বরং আয়নার একপাশে একটা ছায়া-হাত উঠে আসে— যেন কারও ঘোলা আঙুল আয়নার ভিতর থেকে জানাতে চাইছে নিজের অস্তিত্ব।
তরসা চিৎকার করতে চায়, কিন্তু গলা শুকনো— চোখ বুঁজে সে প্রার্থনা করে, “মা মনসা… রক্ষা করো…” আয়নার কাচে জল জমে, যেন কেউ ভিতর থেকে নিঃশ্বাস ফেলছে।
রাত নামলে গ্রামের অন্য ঘরগুলো আলোয় ভরে উঠলেও তরসার ঘর যেন কেমন থমথমে হয়ে থাকে। ঘরের কোণে রাখা মাটির কলসির জলে হঠাৎ চুপচাপ ঢেউ ওঠে, অথচ কেউ ছোঁয়নি। তরসা জেগে থাকে— জানে কিছু একটা এই ঘরে ঢুকেছে। আয়নার নিচে মেঝেতে সেই লাল সুতো রীতিমতো জড়িয়ে গেছে— চক্রাকারে। সে ভাবতে থাকে— আয়না কি কেবল দেখার যন্ত্র? নাকি ভিতরেও কিছু জমে থাকে, রয়ে যায় কারও অপেক্ষা? তরসার বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে জমে ওঠে এক প্রশ্ন— এই সুতোর মাথা শেষ কোথায়? আর আয়নার পেছনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে কি তারই খোঁজে আছে? তার রাতের ঘুম আর আগের মতো থাকে না। প্রতিটি নিঃশব্দ মুহূর্তে সে অনুভব করে, কেউ তার পাশেই আছে— অদৃশ্য, অপরিচিত, কিন্তু খুবই… পরিচিত লাগা এক আত্মা।
৩
সকালবেলা কুয়াশার ধোঁয়াটে পথ ধরে তরসা পৌঁছায় গ্রামের এক প্রান্তে— যেখানে কাঁকর বিছানো পথটা গিয়ে মিশেছে পেঁপে গাছের পাশে এক ছোট্ট দালানে। এইখানেই থাকে হারিধন পণ্ডিত— সিঁথি গ্রামের শেষ জীবিত লোককথার ভাণ্ডার। লোকজন বলে, এককালে মন্ত্র পড়ত সে, শ্মশানে যেত, কালি-মায়ের সন্নিধানে সময় কাটাত। এখন অবশ্য সে কেবল হাঁ করে আকাশ দেখে আর নিজে নিজের সঙ্গে কথা বলে। তবে কেউ যদি কিছু জানে, তা হলে সে-ই জানে। তরসা মাথায় আঁচল টেনে ঢুকে পড়ে ছোট ঘরটায়— ভিতরটা জবা ফুলের গন্ধে আর হাভাতি ধূপের ধোঁয়ায় ভরা। হারিধন এক কোণে বসে আছে, হাতে একটা কঞ্চি। চোখ বুজে কীসব বিড়বিড় করছিল, তরসার পায়ের শব্দে মুখ তুলে বলে, “এত বছর পর তুই এলি? হাতের সুতোটা এখনও রাখছিস দেখি।”
তরসা বসে পড়ে, তার চোখে আতঙ্ক, প্রশ্ন, সন্দেহ সব। সে চুপ করে শুধু নিজের হাতটা বাড়িয়ে দেয়— লাল সুতোটা আঙুল ছুঁয়ে ঝুলছে। হারিধন খুব মন দিয়ে দেখে, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “এই সুতো বাঁধা হয়েছিল, কারও আত্মাকে আটকে রাখতে… একটা প্রাণ না থাকলেও তাকে পুরোদমে মরতে দেওয়া হয়নি।” তরসা ফিসফিস করে, “কার আত্মা, পণ্ডিতমশাই? কে আছে এই সুতোর মাথায়?” হারিধন চোখ বুজে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর নিচু গলায় বলে, “ওর নাম ছিল রুক্ষণাথ… পঁইত্রিশ বছর আগের কথা। ডাইনি অপবাদে গাছে ঝুলিয়ে মারা হয় ওকে। তবে মারার আগে কেউ একটা সুতো বেঁধে দেয় ওর হাতে— যাতে আর কোনো জন্ম না পায়, আর আত্মাও ঘুরে না বেড়ায়… কিন্তু ভুল হয়ে যায়। সে ফিরে এসেছে। ফিরে এসে সুতো ধরে রেখেছে, যার হাতেই বেঁধে দেওয়া হয়েছিল তখন— তার মায়ের ঘরে।” তরসা স্তব্ধ। সে বোঝে না ঠিক কী শুনছে, কী মানে— তার মায়ের? তার? তার হাতের সুতো তাহলে… মৃতের বন্ধন?
হারিধন কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে, “তুই ছোট ছিলি তখন। তোর মা, মৃত রুক্ষণাথের মাকে কিছুদিন সাহায্য করত। আত্মা যাতে ঘুরে না বেড়ায়, সেই ভয়ে তার শেষ ইচ্ছামতো সুতোটা তোকে বেঁধে দিয়েছিল। বলেছিল— ‘একদিন না একদিন আমার ছেলে ওর দ্বারাই মুক্তি পাবে।’ তখন কেউ জানত না… আত্মা মুক্ত করতে গেলে কী চড়া দাম দিতে হয়।” তরসার কণ্ঠ কাঁপে, “পণ্ডিতমশাই, আমি কী করব?” হারিধন তখন উঠে দাঁড়িয়ে এক পুরনো কাঁসার ঘণ্টায় ঠুকঠুক আওয়াজ দেন— তারপর বলেন, “সাবধান থাক, মা। সব কিছু জানলেই যে মুক্তি মেলে না। কিছু কিছু বাঁধন থাক, তাতেই ভালো। কিন্তু যদি সুতো টানতে চাস… শেষ দেখে ছাড়তেই হবে। রুক্ষণাথ শুধু ডাকছে না— সে চাইছে তুই ওর শেষ গল্পটা শোন, বুঝিস? মরণ যদি অন্যায় হয়, আত্মা কখনও ঘুমোয় না।”
৪
দুপুরের রোদ মাথার উপর ঝলসে পড়ছে, তবুও তরসা চলে গেল সেই পুরনো বটগাছটার দিকে— গ্রামের পশ্চিমপ্রান্তে, যেখানে একসময় চড়কপুজোর মেলা বসত, আর আজ কেবল গরু-মোষের গা ঘেঁষা খালি মাঠ আর বাতাসের মাঝে একঘেয়ে নিস্তব্ধতা। গাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে— বিশাল, বুড়িয়ে যাওয়া ডালপালা, থোকা থোকা শেকড় ঝুলে আছে যেন কারা মাথা নিচু করে ঝুলে থাকে সারাদিন। তরসা জানে, এটাই সেই গাছ— রুক্ষণাথের মৃত্যুগাছ। পণ্ডিত হারিধনের বলা কথা এখনো কানে বাজছে: “মরণ যদি অন্যায় হয়, আত্মা ঘুমোয় না…” সে ধীরে ধীরে গাছটার গোড়ার দিকে এগোয়। আচমকাই এক চাপা পঁচা ফুলের গন্ধ এসে নাকে লাগে— না, আশেপাশে কোনো ফুল নেই, তবু গন্ধটা এত তীব্র যেন গলায় উঠে আসে।
গাছের চারপাশে মাটি ফাটল ধরা, আর সেখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে পুরনো পাথরের টুকরো, কাঠের ছোট খুঁটি, শুকিয়ে যাওয়া বাসি প্রদীপের কাঁচ— যেন কেউ অনেক বছর আগে কিছু রেখে গেছে আত্মার স্মৃতিস্মারক হিসেবে। তরসা হঠাৎ চোখে পড়ে, গাছের গুঁড়িতে কোথাও কিছু খোদাই করা— সে ঝুঁকে দেখে: “রুক্ষণাথ” নামটা খুব ছোট করে লেখা, নিচে একটা তারিখ— ১২ আষাঢ়, ১৩৯১। তার বুক ধক করে ওঠে। এটাই সেই দিন, যেদিন সেই ‘ডাইনি অপবাদ’-এর ছায়ায় গ্রাম তাকে মেরে ঝুলিয়েছিল। তরসা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সেই গাছের ছায়ায় রুক্ষণাথ এখনো শ্বাস নেয়। সুতোটা আজকে অদ্ভুতভাবে তার হাতে জড়িয়ে আছে— যেন গাছের দিকে টানছে, খোঁচা দিচ্ছে মনে— “এইখানেই শেষ?”
সে গাছের গোড়ায় বসে পড়ে। বাতাস হঠাৎ স্থির হয়ে যায়। একটা পাতাও নড়ে না। অদ্ভুত, কারণ এই গাছটা সবসময় হালকা নড়ত, শেকড়েরা ফিসফিস করত বাতাসে। এবার গন্ধটা আরও ঘন হয়— যেন কেউ কচুরিপানা, বাসি ধূপ আর পচা দুধ একসাথে মিশিয়ে ফেলে রেখেছে পাশে। তরসা চোখ বন্ধ করে। মুহূর্তেই সে যেন দেখতে পায়— একটা দৃশ্য: গাছের ডালে কেউ ঝুলছে, চারপাশে লোক, মুখে অশ্রদ্ধা, ভয় আর ঘৃণার মিশ্র অভিব্যক্তি। “ডাইনি… ডাইনি…” শব্দ উঠছে। আর সেই মানুষের মুখটা… রুক্ষণাথ? নাকি… সেই ছায়া যেটা আয়নায় দেখেছিল? তরসা চোখ খুলতেই কেঁপে ওঠে। তার পায়ের নিচে লাল সুতোয় বাঁধা একটা ছোট পাথর— যেন কেউ রেখে গেছে। কিন্তু কে? সে তো একাই এসেছে…
৫
রাত তখন গভীর। চারদিকে একটা নিঃস্তব্ধতা, যা শুধু গ্রামেই মেলে— পাখির ডাক থেমে গেছে, কুকুর ঘেউঘেউ করতেও ভুলে গেছে, আর বাতাস থেমে আছে যেন শ্বাস বন্ধ করে। তরসা মণ্ডল বিছানায় বসে আছে, ঘুম আসছে না। তার মনে হচ্ছে গাছটার গন্ধ এখনও শরীরে লেগে আছে, যেন একটা অদৃশ্য ছায়া তাকে সারা শরীরে মেখে রেখেছে। ঘরের বাতি নিভে গেছে, কেরোসিন শেষ। শুধু জানলার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে মেঝেতে সাদা রেখা ফেলেছে। সেই আলোর ঠিক মাঝখানে, সে দেখে… তার লাল সুতোটা একাই ঘুরে ঘুরে মেঝের উপর সরছে। তার হাত থেকে সুতো বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গাঁটটা ঠিক আগের জায়গাতেই বাঁধা। সুতোটা যেন নিজেই রাস্তা খুঁজে নিচ্ছে— হেঁটে চলেছে কারও ডাকে। তরসার গলা শুকিয়ে আসে। ঠিক তখনই ঘরের এক কোণ থেকে খুব ধীরে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে— “তুই শুনতে পাচ্ছিস… তোকে ডাকছি আমি… তোকে ছাড়া আর কেউ ছিল না… কেউ শোনেনি আমার কথা…”
তরসা মুখে হাত চাপা দেয়— গলার ভিতরে হঠাৎ শব্দ আটকে যায়, কান দিয়ে যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। কণ্ঠটা আবার বলে— এবার একটু বেশি জোরে, একটু বেশি করুণভাবে— “আমার শরীরটা পচে গেছিল, কিন্তু কথাগুলো পচেনি… ওরা বিশ্বাস করেনি… আমি চেয়েছিলাম শুধু একজনকে সব বলি… তোকে… কারণ তুই ছিলিস আমার মায়ের ঘরে… তুই ছিলিস নিরীহ… আমার শেষ আশ্রয়…” তরসা এবার চোখের জলে ভেসে যায়— কে এই কণ্ঠ? এত বছর পরে এত কান্না কোথা থেকে আসে? জানলার কাঁচে টোকা পড়ে— ধুপধাপ… ধুপ… ধুপ… সে তাকিয়ে দেখে, কেউ নেই। কিন্তু জানলার কাঁচে ভেজা আঙুলের দাগ— যেন কেউ বাইরে থেকে হাত ঠেকিয়ে রেখেছে। তরসা উঠে দাঁড়ায় না। বরং বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে— সুতোটা তখন ধীরে ধীরে আলমারির দিকে চলে যাচ্ছে, দরজার নিচ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বাইরের অন্ধকারে।
হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে আসে, আর ঘরে ছায়া ঘনিয়ে ওঠে। তার সামনে… কেউ দাঁড়িয়ে নেই, কিন্তু সে অনুভব করে— এক জোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে যেন কেউ তার কাঁধে বসে। তরসা ফিসফিস করে বলে, “তুমি কে?” তখন আবার সেই কণ্ঠস্বর— এবার কাঁপা, নরম, ধীরে ধীরে বোঝা যায়— “আমার নাম ছিল রুক্ষণাথ। আমাকে তারা বেঁধে ফেলেছিল, কারণ আমি চুপ করেছিলাম। সত্যি বললে ওদের বাড়ি ভেঙে যেত। আমি শুধু চেয়েছিলাম… আমাকে কেউ বিশ্বাস করুক।” তরসা বলে, “আমি বিশ্বাস করি… আমি শুনতে চাই… আমি তোমার গল্প শোনার জন্য এসেছি।” তখন জানলার বাইরে দিয়ে হালকা ঝিরঝির বাতাস ঢোকে— যেন কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সুতোটা মেঝেতে থেমে যায়। তরসা অনুভব করে, অদৃশ্য এক অস্তিত্ব যেন পাশে বসে আছে— অপেক্ষা করছে, তার কথা বলার সময় এসেছে।
৬
সকালবেলা বিজন ঘোষের ঘরে ব্যস্ততা একটু বেশি। বিজন অল্প বয়স থেকেই গ্রামের “যান্ত্রিক মানুষ” হিসেবে পরিচিত— তার কাছে একটা পুরনো ক্যামেরা আছে, যেটা দিয়ে সে মাঝে মাঝে ছবি তোলে, ছাপায়, আর যাকে তাকে দেখিয়ে বলে, “আমার ক্যামেরা যা ধরে, সেটা চোখে দেখা যায় না।” বেশিরভাগ লোক সেটা হেসেই উড়িয়ে দেয়। কিন্তু গতকাল রাতে সে কিছু একটা দেখেছিল— তার জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তরসা, একা, মাথা নিচু। অদ্ভুতভাবে তখন বাতাস একটুও চলছিল না, অথচ তার জানলার পর্দা নড়ছিল ধীরে ধীরে। কৌতূহলী হয়ে ক্যামেরা তুলে ফ্ল্যাশ ছাড়ে। সেই ছবি আজ সকালেই ডেভেলপ করেছে সে— আর তারপর… চুপ। চুপ করে বসে আছে তার ঘরের এক কোণে, হাতে সেই প্রিন্ট।
ছবিটা তেমন কিছু না— প্রথমে দেখে মনে হয় তরসা দাঁড়িয়ে আছে, রাতের অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না ঠিকঠাক। কিন্তু ছবির ডান পাশে… একটু ভালো করে তাকালেই বোঝা যায়— একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। ঝাপসা হলেও চোখদুটো স্পষ্ট— যেন সাদা আঁচ দিয়ে আঁকা। সে মূর্তির গলা পর্যন্ত যেন জড়িয়ে আছে একটি সুতো— হ্যাঁ, লাল সুতো, যা ছবির ভিতরেই আলোছায়ার মাঝে আলাদা বোঝা যায়। বিজনের মুখ শুকিয়ে আসে। সে বারবার ছবিটা ঘুরিয়ে দেখে, উল্টে-পাল্টে দেখে, তবুও একই ছায়া। তখনই সে দৌড়ে যায় তরসার বাড়ির সামনে— ডাকে, “তরসাদি… শুনতে পাচ্ছো?”
তরসা তখন ঘরের কোণে বসে ছিল, আগের রাতের কণ্ঠস্বর এখনো মাথার ভিতরে ঘুরছে। সে দরজা খুলতেই বিজন ছবিটা বাড়িয়ে দেয়— কাঁপা গলায় বলে, “কাল রাতে তোর জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলি তুই… কিন্তু তোর পিছনে কে ছিল?” তরসা ছবিটা হাতে নিয়ে দেখে— তার হাত থেকে ছবিটা একবার পড়ে যায়। সে বুঝে যায়— এই প্রমাণ শুধু ক্যামেরার নয়, আত্মার সত্যতাও এর ভিতরে আছে। সে ছবিটা তুলে বলে, “ওর নাম রুক্ষণাথ। ও আমার হাতের সুতোতে বাঁধা ছিল… এখনও আছে।” বিজনের মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। সে ফিসফিস করে, “তুই এসব জানতিস?” তরসা চুপ করে থাকে। তখন হঠাৎ জানলার বাইরে হাওয়া বইতে শুরু করে— একবারে তীব্র, ঠান্ডা।
দুজনে জানলার দিকে তাকাতেই, বাইরে হাওয়া থেমে যায়। কিন্তু জানলার কাঁচে জমে থাকা শিশিরে আঁকা থাকে এক অদ্ভুত চিহ্ন— দুই চোখ, আর নিচে একটা সূক্ষ্ম রেখা, যেন গলায় সুতো। তরসা তখন ধীরে বলে ওঠে, “ও আমাকে কিছু বলার জন্য এসেছিল। কেউ ওর কথা শুনেনি আগে। এখন ওর সময় এসেছে… আর আমার দায়িত্ব।” বিজন স্তব্ধ, মুখে কথা নেই। তার ক্যামেরা হাতে কাঁপে, আর মনে মনে সে বুঝে যায়— বিজ্ঞান, যুক্তি সব কোথাও গিয়ে থেমে যায়, যখন কোনো মৃত আত্মা ছবিতে ধরা পড়ে… চোখের গভীরে এক শূন্যতা নিয়ে।
৭
গোধূলির আলো যখন গ্রামের গলি ভেদ করে ধানের গন্ধ নিয়ে আসে, তরসা তখন হাতে ছবিটা নিয়ে হাঁটছে। ছবিতে ধরা সেই ছায়া— রুক্ষণাথ— তাকে আর চোখে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার উপস্থিতি যেন এখন শরীরের শিরায় রক্তের মতো ঘুরছে। পা আপনমনে পৌঁছে যায় সেই গাছের নিচে— গ্রামের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বটগাছ, যেটার চারপাশের মাটি এতদিন ধরে চাপা রেখেছিল বহু লোককথা, কুসংস্কার আর ভুল ইতিহাস। এবার সে গাছটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়ায় ঠিকমতো— দিনের আলোয় আগেও এসেছে, কিন্তু এবার অন্য চোখে দেখছে। গাছটা যেন আজ কথা বলবে— চুপ করে বসে থাকা এক সাক্ষী, যে এতদিন শুধু দেখেছে, কিছু বলেনি।
তরসা নিচু হয়ে গাছের গুঁড়িতে হাত রাখে। গাছের গা নরম নয়, বরং যেন পাথরের মতো শক্ত আর থমথমে। হঠাৎ চোখে পড়ে, এক জায়গায় একটু আঁচড়ের মতো খোদাই করা দাগ— সে পরিষ্কার করে দেখে: “রুক্ষণাথ”— অক্ষরগুলো ফাটল ধরা, কিন্তু বোঝা যায়। নিচে ছোট করে লেখা: “১২ আষাঢ়, ১৩৯১”— সেই দিন, যেদিন এই গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে। তরসার শ্বাস আটকে আসে। সে হাত ছুঁয়ে বোঝার চেষ্টা করে— কি অনুভব করছিল রুক্ষণাথ সেই সময়? ভয়? ঘৃণা? নাকি এক নির্লিপ্ত শান্তি? হঠাৎ একটা শব্দ আসে— যেন শুকনো পাতার ওপর পা পড়ার আওয়াজ। তরসা চমকে পেছনে তাকায়— কেউ নেই। কিন্তু বাতাসে ভেসে আসে সেই চিরপরিচিত পঁচা ফুলের গন্ধ, যার উৎস নেই, কেবল স্মৃতি আছে।
তরসা এবার পেছন থেকে বটগাছটা ঘুরে দেখে— অন্য পাশে একটা জায়গায় কাঁচা সাদা রঙে আঁচড় দিয়ে লেখা: “মিথ্যা কথা বললে, মৃত্যু হয় না, পচন হয়।” এই লেখা যেন গাছের আত্মা থেকে বেরিয়েছে। তরসা বসে পড়ে, মাটিতে পা ছড়িয়ে দেয়। হাতে ছবি, পাশে লাল সুতো মাটিতে গড়িয়ে গিয়েছে অনেকটা। চোখে জল এসে যায়। সে ফিসফিস করে বলে, “আমি জানি, তোমাকে কেউ শোনেনি। এখন আমি আছি। বলো, কী হয়েছিল?” হাওয়ার একটা হালকা ধাক্কা এসে তার কানের কাছে থেমে যায়, আর তখনই শোনা যায় সেই পুরনো, ধীর কণ্ঠ— “আমি সত্যিটা বলেছিলাম… যে শুনেছিল, সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল… আমাকে মেরে ফেলল… কিন্তু এখন, তুই শুনছিস… শেষ করে দে…”
গাছের নিচে, মাটিতে চাপা এক পুরনো কাঠের বাক্স হঠাৎ চোখে পড়ে তরসার। সে খুঁড়ে তোলে— ভিতরে একটা পচে যাওয়া কাগজ, আর এক টুকরো লাল সুতো। কাগজে লেখা— “আমাকে বাঁচাতে পারিস না, কিন্তু শুনে নিস।” তরসার বুক ধকধক করতে থাকে— এই বাক্স কে রেখেছিল এখানে? কতদিন আগে? রুক্ষণাথ নিজে? নাকি তার মা? সে বোঝে, গল্পটা এখনও শেষ হয়নি। বরং আসল শুরু এখনই— কারণ সত্যির প্রথম দরজাটা সে খুলেছে মাত্র।
৮
রাত গভীর হলে ঘরের প্রতিটি অন্ধকার কোণ যেন সজাগ হয়ে ওঠে, আর তরসার ঘর এই রাতে হয়ে উঠেছে এক অলৌকিক নাট্যমঞ্চ— যেখানে দৃশ্যের চেয়ে অদৃশ্য বেশি দৃঢ়, আর নিঃশব্দের চেয়ে প্রতিধ্বনি বেশি কাঁপায়। মাটিতে বসে তরসা হাতে ধরে আছে সেই পুরনো কাগজ— যার অক্ষর ঝাপসা হলেও কথা স্পষ্ট: “আমাকে বাঁচাতে পারিস না, কিন্তু শুনে নিস।” কণ্ঠস্বরও যেন গাছের ছায়া ঘেরা বাতাস থেকে উঠে এসে মাথার ভিতরে ঘুরছে, “শেষ করে দে… শেষ করে দে…” সে বোঝে, এই খেলা শুধুই কান্না আর ছবি নয়— এই খেলা সত্যি বলার, ভয়কে ভাঙার, অন্ধবিশ্বাসকে প্রশ্ন করার। তার হাতের লাল সুতোটা হঠাৎ করে টান মারে— এবার শক্ত করে। যেন কেউ বলছে, “চল… এবার সময় হয়েছে।”
সে উঠে দাঁড়ায়। ঘরের ভিতরে বাতাস ঘুরছে বৃত্তে— দরজা কাঁপছে, জানলার পাল্লা নিজের মতো খুলে-বন্ধ হচ্ছে। সুতোর টান তাকে নিয়ে যায় তার মা’র পুরনো আলমারির কাছে— যে আলমারির নিচের খোপে মা সব পুরনো কাগজ, ধুপ, চালের থলি, আর একটা পিতলের ছোট বাক্স রাখতেন। বহু বছর পর আলমারির নিচের দরজাটা খুলে সে দেখে— সত্যি, সেই বাক্সটা এখনও আছে। খোলার পরে পাওয়া যায় কিছু পুরনো জিনিস— তার নিজের জন্মসনদ, তার বাবার মৃত্যু সনদ… আর এক কোণে ভাঁজ করা একটি কাগজ, যার গায়ে হরিণছাপ কালি। সেটা খুলতেই চোখ বড় হয়ে যায় তরসার। লেখা: “আমি সত্যি বলেছিলাম। ও বাড়ির মেয়েটা কেঁদে পড়েছিল আমার পায়ে… কিন্তু তারপর ওর স্বামী আমাকে ডাইনি বলে গাছে ঝুলিয়ে দেয়।”
নিচে স্বাক্ষর: রুক্ষণাথ মণ্ডল।
তরসার কাঁধে যেন কেউ হাত রাখে, কিন্তু আসলে কিছু নেই। সে জানে, এই লিখিত জবানবন্দি যদি কাউকে দেখানো যায়, তাহলে হয়তো সত্যি প্রকাশ পাবে— কিন্তু প্রশ্ন হল, কার কাছে? এত বছর পরে এই সত্যি কেউ মানবে কি? যারা তখনকার অন্যায় করেছিল, তারা কেউ বেঁচে নেই— কিন্তু তাদের রক্ত এখনও এই গ্রামে আছে। তরসার মনে পড়ে— হারিধন বলেছিল, “সত্যি জানলে ছড়িয়ে পড়বে, আগুন লাগবে… পারবি?” সুতো এবার টানছে বারান্দার দিকে।
তরসা দরজা খুলে বাইরে বেরোয়— খোলা আকাশ, কালো তারা, অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। হঠাৎ হাওয়ায় সেই গন্ধ আসে— পচা ফুল, ভিজে গাছের ছাল, আর এক চেনা আতর— যেন রুক্ষণাথ এসেছিল কিছু বলতে। সে কাঁপা কণ্ঠে বলে, “আমি কিছু করব… আমি মুখ খুলব… আমি সত্যিটা বলব…” তখন পেছন থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠ— এবার স্পষ্ট, আবেগভরা— “তুই শুধু বললেই হবে না… তুই বিশ্বাস করেছিস বলেই আমি বাঁধা নেই আর… কিন্তু বাকিরা জানবে, যখন তুই শেষ গাঁটটা নিজেই খুলবি।” তরসা তখন নিজের হাতের দিকে তাকায়— লাল সুতোটা আলগা হতে শুরু করেছে, যেন এক আত্মা তার বন্ধন থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। মুক্তি আসছে। তবে এই মুক্তির পরিণাম কী, জানে না সে। তবুও— সত্যির পথে দাঁড়াতে সে প্রস্তুত।
৯
সকালের আলো ঠিক পূর্ণ হয়নি তখনও— আকাশ ছাইরঙা, পাখিরা কেবল ডাকছে, আর গ্রামের মাঠে শিশির পড়া ঘাসে জুতোর শব্দ পড়লে ফিসফিস করে ওঠে। তরসা আজ যাচ্ছে খালপাড়ের দিকে— যেখানে একসময় গ্রামের দাফন-কাফনের খোঁজ রাখা হত, যেখানে পুরনো নথি মাটি চাপা পড়ে গেছে। সে একা নয়, সঙ্গে আছে বিজন— ক্যামেরা হাতে, কিন্তু মুখ থমথমে। বিজনের ছবিটা এখন তরসার অস্ত্র, আর রুক্ষণাথের সেই হাতে লেখা কাগজ তার প্রমাণ। তারা জানে, গ্রামের ইতিহাস যেমন বলেছে, সেটা ঠিক নয়— আর সেই ভাঙা ইতিহাসের নীচেই লুকিয়ে আছে রুক্ষণাথের নিরপরাধ মৃত্যুর বর্ণনা।
খালপাড়ের ঝোপের আড়ালে এক পুরনো কুঁড়েঘর— আগাছায় ঢাকা, বহুদিনের তালা জং ধরে আটকে। বিজন লাঠি দিয়ে তালা ভাঙে। ভিতরে ঢুকে তারা দেখে— কাঠের তাক ভেঙে পড়েছে, কাগজের গন্ধে বাতাস ভারী। এক কোণে একটা মাটি খুঁড়ে ওঠা অংশ— যেন কেউ একসময় কিছুর খোঁজে এখানে খুঁড়েছিল। তরসা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে হাতে হাতুড়ি নিয়ে খুঁড়তে শুরু করে— কাদা, মাটি, শুকনো পাতা সরিয়ে একসময় তার হাতে লাগে একটা লোহার বাক্স। সেটা তুলে এনে দুজনে মিলে খোলে— ভিতরে জলেভেজা কাগজ, তবুও কিছু লেখা এখনো স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় কাগজটার উপরে লেখা:
“গ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত: রুক্ষণাথ মণ্ডলের বিরুদ্ধে প্রমাণ অপ্রতুল, তদন্ত স্থগিত।”
তারিখ: মৃত্যুর একদিন আগের রাত।
তরসা আর বিজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। তাহলে? গ্রাম জানত সে দোষী নয়! তবুও তাকে মারা হয়েছিল? কেন? বিজন তখন বলে, “মানে, ওরা ভয় পেয়েছিল… সত্যি জানলে নিজেরাই ধরা পড়ত। ওর মুখ বন্ধ করতে চাইছিল।” তখন বাক্সের নিচে পাওয়া যায় একটি পুরনো চিঠি— একজন মহিলার লেখা। নাম দেখা যায়: দীপাবলি রায়চৌধুরি— সেই উচ্চবর্ণের গৃহবধূ, যাকে নিয়ে গুজব ছড়িয়েছিল। চিঠিতে লেখা:
“আমি ওর (রুক্ষণাথের) সামনে কেঁদে ফেলেছিলাম, কারণ আমি চাইনি ওর মুখ খুলুক। আমি জানতাম আমার স্বামী ভয়ংকর… কিন্তু রুক্ষণাথ আমার কোনো ক্ষতি করেনি। ওর চোখে শুধু সত্যি ছিল।”
তরসার চোখে জল এসে যায়। সে ফিসফিস করে বলে, “ও শুধু সত্যি বলেছিল… আর তার ফল হল মৃত্যু।” বিজন চুপচাপ ছবিটা বের করে আবার দেখে— ছবির ছায়াটা আজ যেন একটু ঝাপসা হয়েছে, হালকা। যেন সে শান্ত হচ্ছে। তখনই হঠাৎ ঘরের ভিতর বাতাস ঘুরে ওঠে। কাগজগুলো উড়তে শুরু করে— যেন কারও নিঃশ্বাস আবার ভরে যাচ্ছে দেহে। আর এক মুহূর্তে, ঘরের দরজার পাশে, কাদা-মাখানো জানালায় স্পষ্ট হয় এক প্রতিচ্ছবি— রুক্ষণাথ। মাথা নিচু, গলায় সুতো আর মুখে গভীর শান্তি।
তরসা চোখে চোখ রাখে তার— আর এক ঝলকে সেই ছায়া মিলিয়ে যায়। জানালার কাচে পড়ে থাকে কেবল একটা আঁচড়: “তুই শুনেছিলি… তাই আমি ঘুমোতে পারি।”
১০
রাত্রি আর প্রহরের মাঝে এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। কুয়াশা তখন যেন ঘুমোচ্ছে না, জেগে জেগে সব কিছুর সাক্ষী হতে চাইছে। তরসা মণ্ডল আজ আবার সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে— যে আয়না একদিন কাঁপে উঠেছিল, ছায়া দেখিয়েছিল, আর আজ নির্লিপ্ত। আয়নার কাচ নিঃশব্দ। জানালায় কোনো টোকা নেই, বাতাস নেই, সেই পঁচা ফুলের গন্ধও নেই। শুধু এক অনুভূতি— কিছু একটা শেষ হয়েছে, আর কিছু একটা শুরু হচ্ছে। তার হাতের লাল সুতোটা আজ আর নড়ে না। সে ধীরে ধীরে গাঁটটা ধরে, টান দেয়… এবং ঠিক তখনই— চিঁড় করে একটা শব্দ।
সুতো ছিঁড়ে যায়। খুব নরম, কিন্তু গভীর এক শব্দ— যেন শুধু সুতো না, একটা বাঁধন ছিঁড়ে গেল, একটা অতৃপ্ত আত্মা কেটে ফেলল পৃথিবীর সঙ্গে নিজের শেষ সম্পর্ক। তরসার মুখে জল এসে পড়ে— সে জানে, রুক্ষণাথ আজ শেষবারের মতো তার সঙ্গে ছিল, তার গল্প বলেছিল, তার নিরব কান্না শোনার অপেক্ষায় ছিল। সে পেয়েছে তার শ্রোতা। আর তরসা পেয়েছে তার সাহস। আজ থেকে সে জানে, গ্রামের সব কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস আর ভয়ের জাল ভেদ করে সে সত্যির পথে হাঁটতে শিখেছে।
পরদিন সকালে তরসা সোজা যায় স্কুলঘরে— যেখানে এখন পঞ্চায়েতের লোকজন জড়ো হয়েছে। তার হাতে ছবি, কাগজ আর প্রমাণ। সে দাঁড়িয়ে বলে, “এই গ্রামে একদিন একজনকে মেরে ফেলা হয়েছিল, কারণ সে শুধু সত্যিটা বলতে চেয়েছিল। তার নাম ছিল রুক্ষণাথ মণ্ডল। আমি তার জন্য এসেছি… আর আজ থেকে তোমরা কেউ ভুলে গেলে, আমি মনে করিয়ে দেব।” কারও মুখে কথা নেই। বিজন পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, ক্যামেরা হাতে— তার চোখে প্রথমবার জল।
গল্প শেষ হয় না, শুধু বদলায়।
সন্ধের ঠিক আগে, তরসা আবার বটগাছটার নিচে দাঁড়ায়। এবার আর সুতো নেই হাতে, ভয় নেই চোখে। শুধু বাতাসে এক নরম ছোঁয়া— যেন কেউ মাথায় হাত রাখল। সে হালকা হেসে বলে, “তুমি ঘুমোও… আমি জেগে থাকব।”
পেছনে বটগাছটা দাঁড়িয়ে থাকে— দীর্ঘ, নিঃশব্দ, কিন্তু এবার আর ছায়ায় নয়, আলোয় ঢাকা।
সমাপ্ত




